সাহেবের বন্ধুর এমন উক্তিটা শুনতেই আমার মস্তিষ্ককোষগুলো কেমন অসাড় হয়ে গেলো। আমি সাথে সাথেই তাকালাম সাহেবের দিকে। সাহেবের মুখে কোনো ভাবান্তর লক্ষ্য হলো না। অবশ্য আমার সাহেব চিরটাকালই হুতুমপেঁচার মতো। তার মুখ দেখলে বোঝার উপায় নেই সে কি দুঃখী নাকি সুখী। ভ্রু কুঁচকে ধাঁরালো দৃষ্টিতে তাকানোই তার স্বভাবে। এবারও তাই হলো। শুধু দৃষ্টিটা একটু বেশি তীক্ষ্ণ হলো। তার বন্ধুর সস্তা রসিকতার বিরক্তিটাও প্রকাশ পেলো। খুব গম্ভীর স্বরে বললো,
"বয়স হয়েছে এখনো বুদ্ধি হয় নি! মুখ খুললেই গন্ধ ছড়াতেই হবে!"
"তুমি মামা প্রেম করবা আর আমরা সেটা বলতেও পারবো না।"
সাহেব কখনো প্রেম করতেন এই কথাটাই আমার হজম হচ্ছিলো না। আমি ফের সাহেবের দিকে তাকালাম। এই কাটখোট্টা, খচ্চর, হুতুম প্রেম করতো! কি করে করতো! যে মানুষ চরম আবেদনময়ী মুহূর্তে যন্ত্রণা! যতসব! বলতে পারে সে কি না পার্কে বা পুকুরের ধারে প্রেমিকা নিয়ে ঘুরতো! বাদাম খেতো! চিঠি লিখতো! কি লিখতো,
"কৃপা করিয়া আমার প্রেম নিবেদন গ্রহণ করিলে উপকার হয়!"
নাকি লিখতো,
"ওই মসৃণ চুলগুলো খোঁপায় যেন বাঁধা থাকে। এমন করে শাকচুন্নির মতো খুলে রাখার হেতু আমি দেখি না। আমার ভালো লাগে না। কৃপা করে চুল বাঁধিয়া রাখিলে ভালো হয়!"
আমার মাথায় সাহেবের চিঠিগুলোও হুতুমমার্কাই মনে হচ্ছিলো। কারণ আহ্লাদ এই পুরুষের দ্বারা হতে পারে সেটা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। নাকি আহ্লাদ সে করতো। প্রেমে ভীষণ ভাবে পরাজিত হয়ে তিনি এমন কংক্রিট হয়ে গেছেন। বন্ধু তো বললেন-ই লায়লা-মজনুর প্রেম! আমার মাথায় আরোও কল্পনা এলো। সাবানা রাজ্জাকের মতো গাছের ফাঁকে দৌড়াদৌড়ির দৃশ্য, সাহেবের প্রেমেমগ্ন হয়ে প্রেমিকার বাসার সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে সিগারেট পুড়ানোর দৃশ্য! আরোও অনেক দৃশ্য মাথায় আসছিলোই, অমনি পাশ থেকে গমগমে স্বর কানে এলো,
"যে উত্তম সুচিত্রার সিনেমা মাথায় চলছে তা যেন এখনই বন্ধ করা হয়!"
আমি কঠিন নয়নে তার দিকে তাকালাম। আমার বয়েই গেছে তাকে উত্তম আর রুপসা নামক নারীকে সুচিত্রা ভাবার। সে উত্তম কুমার? উত্তম কুমার না হাতি! আমার চোখের ভাষা সাহেব হয়তো পড়তে পারলেন। চ সূচক একটা শব্দ করলেন সাথে সাথে। বন্ধুদের হাসিতামাশা বন্ধ করতে ভীষণ কড়া স্বরে বললে,
"বুলবুল, থেমে যা। বউ বাচ্চা আছে, মার খাস না!"
"ও বাবা, ক্ষেপছিস কেন! আমি কি মিথ্যে বলছি! রুপসাকে তোর পছন্দ ছিলো না? রুপসা তোর প্রতি পাগল ছিলো না? রুপসা যে তোকে লায়লার থেকেও বেশি ভালোবাসতো তা পুরো ভার্সিটির ক্যাম্পাস জানতো। কজনের ভাগ্য হয় ধনী বংশীয় মেয়ের হাতের রান্না খাওয়ার!"
"আমরা শুধু বন্ধু ছিলাম!"
"বন্ধু তো আমরাও ছিলাম, কই আমাদের জন্য রুপসা উতলা ছিলো না।"
সাহেবের আর দাঁড়াতে ইচ্ছে করলো না। সে তার বন্ধুকে,
"থাক তুই নিজের কল্পনা নিয়ে"
বলেই আমার হাত ধরে অন্য টেবিলে চলে এলেন। আমার দম বন্ধ লাগছিলো। যদিও ঘটনা দশ বছর পুরোনো, আমি ওই সময় দশ বছরের খুকি ছিলাম। সুতরাং সাহেবের জীবনে আমার উপস্থিতি বেমানান। তবুও নিজের মানুষকে অন্যের সাথে ভাগ করার ব্যপারটা আমার বুকে ছোরাঘাত করছিলো। অস্বস্তিতে আমাত বুক ছেয়ে গেছে। এতো সুন্দর একটা সন্ধ্যা এমন না হলেও পারতো। কৃপাটা একটু কান্নাও করছে না। নয়তো বাড়ি যাওয়ার বাহানা করতাম। তবে এর থেকেও বিশ্রী অনুভূতির বেড়াজালে আটকালাম যখন রুপসা নামক মানুষটার সাথে আমার দেখা হল।
অনুষ্ঠানে রুপসাও এসেছিলেন। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। এতো সুন্দরও নারী হয়। লম্বা, ছিপছিপে গড়ণ। চুল মাজা অবধি। অবাধ্য চুলগুলোকে খোঁপায় বাঁধে নি। দামী একটা জামদানী শাড়ি পড়েছিলো। মিষ্টি গোলাপী রঙটা মিশে ছিলো তার দেহে। কে বলবে এই নারীর বয়স তখন চৌত্রিশ। তার মুখশ্রীতে একেবারেই বয়সের ছাপ নেই। তার সৌন্দর্য্য যে শুধু কামুক আমি তা বললো না, চেহারাতে এক অদ্ভূত মায়া আর লাবণ্যের সাথে আভিজাত্য ছিলো। একেবারে সুচিত্রা সেন। এই নারী দশ বছর পূর্বে কতটা সুন্দরী ছিলেন আমি কল্পনাও করতে পারলাম না। শুধু শূন্য দৃষ্টিতে সেই নারীকে দেখছিলাম। তার সাথে কেউ আসে নি। তিনি একাই এসেছেন। সাহেবের ক্লাসের সবাই যে তাকে কোনো না কোনো সময় হৃদয় দিয়েছিলো সেটা টের পেলাম সবার আগ্রহঘেরা সম্ভাষণে। আহা! কি গদগদ ভাব। নারীটি আসতেই সবার মধ্যমনি হলেন। শুধু সাহেব-ই তার টেবিলে বসে বসে স্যুপ খাচ্ছিলেন। তার আগ্রহ নেই এসবে। আমি হা করে ওই নারীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে স্যুপ ঠান্ডা করে ফেললাম। সাহেব সেটা লক্ষ্য করতেই আমার উদ্দেশ্যে বললেন,
"সিনেমার ষোলকোলা পূর্ণ হল! যন্ত্রণা, যতসব!"
আমি ঠেশ দিয়ে বললাম,
"ইনি আপনার প্রেমিকা!"
সাহেব আমার দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বললেন,
"মাথা ভর্তি পোঁকা খালি! বুদ্ধিটা কই থাকে!"
আমি মনে মনে বললাম,
"বাসায় যেয়ে টের পাবেন বুদ্ধি কই থাকে!"
আমার অস্বস্তিতে স্যুপ খাওয়া হলো না। গলায় আঁটকে যাচ্ছিলো। সন্ধ্যাটা একেবারে তিক্ত লাগছে। এই হাসি তামাশা আমার মনের শান্তি একেবারেই গিলে ফেলেছে। অসহ্য যন্ত্রণায় আমি যখন অস্থির, ঠিক তখন আমার সন্ধ্যাটা সর্বোচ্চ রকম নষ্ট করে দিতে রুপসা নামক ভদ্রমহিলা আমাদের টেবিলে এগিয়ে এলেন। খুব মিষ্টি তার গলার স্বর,
"মুহাইমিন যে! আছো কেমন?"
সাহেব তার স্যুপ খাওয়া অক্ষত রেখে নিতান্ত ভাবলেশহীন স্বরে বললেন,
"ভালো।"
রুপসা একটু থামলেন। কিছুক্ষণ সাহেবের দিকে তাকিয়ে আমার দিকে তাকালেন। মৃদু হেসে বললেন,
"খাবার সময় সালাম দিতে হয় না তাই দিলাম না। আমি রুপসা হক। তুমি নিশ্চয়ই মুহাইমিনের স্ত্রী? নাম কি তোমার? সরি তুমি বললাম। মনে হলো তুমি অনেক ছোট!"
"আমি কানন সরকার। আর এই আমাদের মেয়ে মুশফিকা বিনতে মুহাইমিন!"
আমি আমার ঠোঁটে জোরপূর্বক হাসি আঁকলাম। সেই হাসিটা যে মেকি তা কি রুপসা হক বুঝলেন। হয়তো না। সুন্দরী মেয়েরা বোকা হয়। তিনি তার প্রমাণ দিয়ে আমাদের টেবিলেই বসলেন। সাহেবকে শুধালেন,
"তুমি কি এখনো ফ্যামিলি ম্যান নাকি নিজের কথা ভাবো?"
সাহেব খাওয়া থামালেন। শান্তচোখে তাকালেন রুপসা হকের দিকে। তারপর বাঁকা হেসে বললেন,
"আমার ফ্যামিলির কথা ভাবাই নিজের কথা ভাবা! আমি তো নিজেকে আলাদা করতে পারি না। কি আর করার আমি এমন ই!"
তার কথায় যে ব্যাঞ্জনা ছিলো তা আমি না বুঝলেও রুপসা হক ঠিক বুঝলেন। খুব শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলেন সাহেবের দিকে। তারপর চোখ সরিয়ে আমার মেয়ের দিকে তাকালেন। আমার মেয়ে কার্বন কপি আমার সাহেবের। বিষয়টা তিনিও লক্ষ্য করলেন। মিষ্টি করে বললেন,
"তোমাদের বাবুটা অনেক সুন্দর। মাশাআল্লাহ! তুমি কি পড়াশোনা কর? নাকি সংসারের পাটাতনে পিষছো!"
রুপসা হক কি আমাকে তাচ্ছিল্য করলেন! আমার তার কথা বলার ঢং ভালো লাগলো না। আমি খুব শান্ত স্বরে বললাম,
"সব ই করছি। আমার সংসারটা মাশাআল্লাহ খুব সুন্দর! খুব আদুরে! তাই পিষার প্রশ্ন আসে না!"
রুপসা হক হাসলেন। এই নারীর হাসিও খুব ভয়ংকর। সাহেব ঘড়ির দিকটা একবার দেখলেন। আমাকে বললেন,
"চলো, রাত হয়ে গেছে!"
রাত হয় নি। সন্ধ্যা মাত্র ফুরিয়েছে। কিন্তু সাহেব আর থাকলেন না। সবাই অনেকবার থেকে যাওয়ার কথা বললেও তিনি বললেন,
"মা বাড়িতে একা। আমাদের ফিরতে হবে!"
সাহেবের এমন হুট করে মত পরিবর্তনের কারণ না বুঝলেও আমার জন্য ভালোই হল। আমি ওই অনুষ্ঠানে আর থাকতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিলো পালাতে পারলেই বাঁচি। সারাটা রাস্তা আমার মন মেজাজ খারাপ ছিলো। কোনো ভাবেই এই রুপসা নামক রমনীকে মাথা থেকে সরাতে পারছিলাম না। কিভাবে সরাবো। বারবার একটা উৎকট চিন্তা আসছিলো। এই রুপসার সাথে কি সত্যি প্রেম ছিলো সাহেবের! মেয়েটি কি তাকে প্রতারণা করেছে! সাহেব তাকে ভালোবাসতো! যদি তাদের প্রেম থেকেও থাকে তবে তাদের বিচ্ছেদের সময়কাল দশ বছর। দশ বছরে অনুভূতি সহ মানুষটাই উবে যায় মন থেকে। তবুও আমার অন্তস্থল ছিলো অস্থির। হয়তো মানুষটা আমাকে ভালোবাসে না বলেই আমার মনের অবস্থা এমন। এমনটা মনে হবার কারণও সাহেব। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমি সাহেবের বাকি দায়িত্বের মত একখানা দায়িত্ব। কখনো মুখ ফুটে লোকটা বলে না "কানন আমি তোমাকে ভালোবাসি!"। মাঝে মাঝে মুখে বলার প্রয়োজন হয়। অন্তত মনের শান্তির জন্যই মুখে বলার প্রয়োজন হয়!
—————
বাড়ি ফেরার পর আমি সাহেবের সাথে একবারও কথা বললাম না। সাহেব আমার অভিমান, ক্ষোভ টের পেলেও গা করলেন না। খুব স্বাভাবিক তার কর্মকান্ড। এসে শার্ট খুললেন। ফ্যানের নিচে নিজের নগ্ন শরীরটা রাখলেন বহুক্ষণ। তারপর আমাকে হুকুম করলেন,
"এক কাপ চা পেলে ভালো হত। এখন কি পেয়ারার কৃপা হবে?"
আমি তীক্ষ্ণ চোখে তাকালাম তার দিকে। তিনি আমার দৃষ্টির ধাঁরে কিঞ্চিত বিস্মিত হলেন। একেবারে অবুঝ শিশুর মতো শুধালেন,
"কি?"
"আমার মাথা!"
বলেই কোল থেকে কৃপাকে বিছানায় রাখলাম, সে হাত পা ছুঁড়ে খেলতে লাগলো। একটু পর পর,
"বু.... বু...."
করতে লাগলো। কৃপার এখনো স্পষ্ট বুলি ফুঁটে নি। "বু, দা, বা, আম" এগুলো সে বলে। আমাকে দেখলেই "আম" "আম" করে হাত বাড়িয়ে দেয়। সাহেবকে ডাকে "বা"। আমি যেতে গেলেই আমার মেয়ে "আম" "আম" করে ডাকলো। আমি তাকে বললাম,
"বসেন মা জননী, মহারাজের রাত বিরাতে চা খাওয়ার শখ হয়েছে। করে আনি।"
সাহেব আমার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন। আমি মোটেই পাত্তা দিলাম না। কিছুক্ষণ বাদে চা বানিয়ে কটাস করে রাখলাম টেবিলে। কৃপার দিকে তাকাতেই দেখি মেয়ে আমার কান্ড করেছে। সে হাগু করে সেই হাগু হাতে মেয়ে আগ্রহ ভরে দেখছে। ভাগ্যিস ওয়ালক্লথে রেখে গিয়েছিলাম। এদিকে আমার সাহেবের খেয়াল নেই। তিনি যে কিছু একটা খুঁজছেন। আমি এসেই চেঁচিয়ে উঠলাম,
"আপনি ওর দিকে দেখবেন না। দেখুন মেয়ে কি করেছে!"
সাহেব তাজ্জব হয়ে মাথা তুলে তাকালেন। এরপর কৃপাকে দেখতে তিনি বিছানায় তাকাতেই তার চোখ বড়বড় হয়ে গেলো। নিজেকে বাঁচাতে কিছু বলতেও পারলেন না। আমার মাথায় আগুণ জ্বললো। কি অবস্থা! আর আমার মেয়ে আমাকে দেখে হাসছে। নিচের চোয়ালে দাঁত উঠবে উঠবে ভাব। এখন হাসলে এতো সুন্দর লাগে। কিন্তু আমার মন গললো না। সেই রাতে গরম পানি করলাম। মেয়েটাকে দ্রুত হাতে পরিষ্কার করলাম। ওয়ালক্লথটার অবস্থা করুন। ওই ফেলে দিতে হলো। এর পর পাউডার দিতে দিতে মেয়েকে বললাম,
"তুই দেখতেই শুধু সুন্দর। কিন্তু স্বভাব-চরিত্র কিছুই সুন্দর না। একেবারে বাপের মতো!"
সাহেব আমার দিকে আড়চোখে তাকালেন। আমি বেশ টের পেলাম তার চাহনী। পাত্তা দিলাম না। একেই মনে দাবানল জ্বলছে। এতো পাত্তা দিতে পারবো না। মেয়েকে দুধ খাইয়ে অনেক কষ্টে ঘুম পাড়ালাম। মাশাআল্লাহ ঘুমন্ত কৃপাকে দেখলে মনে হয় আমি একটা অমূল্য রত্ন পেয়েছি। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি আমি। কৃপাকে বালিশে শুইয়ে মশারী টাঙ্গাতেই যাব, অমনি টের পেলাম আমি মাটিতে নেই। আমাকে রীতিমতো তুলোর বস্তার মতো কাঁধে তুলে নিয়েছেন। আমাকে কাঁধে তুলে তিনি বসালেন টেবিলের উপর। তার এমন কাজে আমি রীতিমত হতভম্ব। তিনি আমার বিস্ময়কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আমার দুপাশে হাতের বেড়িগেট দিলেন। আমার দিকে ঝুঁকে এসে গাঢ় স্বরে শুধালেন,
"কি হয়েছে? মটকা এতো গরম কেন? নকটামি না করে ঝেড়ে কাশ!"
সাহেবের কথায় আমার দৃষ্টি স্থির হলো। বহুসময় তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কি ভাবলেশহীন চেহারা! যেন কিছুই বুঝেন না। তার তো আগে বোঝার কথা! আমার দগ্ধ হৃদয়ের খোঁজ যে জানে না তার উপর রাগ করে কি লাভ! আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। আমার গলা ধরে এলো। কথা বলতে ইচ্ছে হলো না। সাহেব আমার চোয়ালটা ধরে আমার মুখ তার দিকে ফেরালেন। আমার চোখে চোখ রেখে বললেন,
"বলতে বলেছি না কি সমস্যা?"
আমি সাথে সাথেই ক্ষিপ্র স্বরে বলে উঠলাম,
"ওই মহিলার সাথে কি সম্পর্ক ছিলো আপনার?"
"কোন মহিলা!"
এবার যেন নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলাম না। তার পাঞ্জাবির কলার ধরে নিজের দিকে টেনে ক্ষোভে ফেটে পড়ে বললাম,
"বুঝতে পারছেন না? ন্যাকা সাজেন? নকটা তো আপনি! সত্যি করে বলেন প্রেম করতেন ওই মহিলাকে?"
"কি মনে হয়! আমি প্রেম করতাম?"
কি নির্লিপ্ত ভঙ্গি! আমার গলা ধরে এলো! প্রায় কাঁদো কাঁদো স্বরে অধৈর্য্য হয়ে বললাম,
"তো কি করতেন শুনি? ডুগডুগি বাজাতেন? লায়লা মজনুর প্রেম ছিলো! আহা! কি সুন্দর! আমার বরের প্রেম ছিলো আমি ই জানি না।"
"ওরা বাড়িয়ে বলেছে। আমাদের মধ্যে প্রেম ছিলো না!"
"তো কি ছিলো!"
আমার চোখ টলমল করছে। ক্ষোভে গলা কাঁপছে। সাহেব স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীর স্বরে বললেন,
"রুপসা আমাকে পছন্দ করতো এটুকুই। আমাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব ছিলো।"
"আর আপনি! ভালবাসতেন?"
সাহেব একটা হাসলেন মৃদু। আমার কপালে এসে পড়া চুলগুলোকে যত্নে কানের পেছনে দিয়ে বললো,
"এই ভালোবাসা জিনিসটা কি! খায় না মাথায় দেয়!"
আমি তার হাত সরিয়ে দিলাম। ক্ষিপ্ত স্বরে বললাম,
"মজা করবেন না। মোটেই মজা করবেন না! এবার বুঝেছি কেন আমি আপনার যন্ত্রণা! আমার সাথে কেন দুটো মিষ্টি করে কথা বলা যায় না। আপনি আসলে ওই মহিলার বিরহ সহ্য করতে পারেন নি। তাই আমাকেও আপনার অপছন্দ!"
সাথে সাথেই খ্যাক করে উঠলেন সাহেব,
"এই তোমার মনে হয় আমি কারোর বিরহে দশ বছর হেন্দানো মানুষ? আমাকে আড়াই বছর দেখে একবারও মনে হয়েছে আমার মনে এতো পুলক!"
কথা সত্য! এই খাইষ্টা লোকের মনে মোটেই পুলক নেই। নয়তো আড়াই বছরে কি একটাবারও বলা যায় না,
"কানন, তুমি অনেক সুন্দর!"
আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। তিনি আবার আমাকে তার দিকে ফেরালেন। এবার তার দৃষ্টি নরম হলো। গাঢ় স্বরে বললেন,
"মানুষের গল্প বানিয়ে মজা লাগে, তাই বানায়। আমার সাথে রুপসার সম্পর্কটা শুধু বন্ধুত্বের ছিলো। হ্যা, ওপাশ থেকে বেশ তীব্র হাড়ভাঙ্গা প্রেম ছিলো হয়তো! কিন্তু বড়লোকের মেয়েরা মধ্যবিত্ত ছেলেদের সাথে শুধু প্রেম করতে পারে। যেই দায়িত্বের পাহাড় দেখে অমনি সুর সুর করে পালিয়ে যায়। রুপসা যেই দেখলো আমার উপর আমার অসুস্থ বাবা, একটা অসহায় মা, দুটো ভাই বোন যারা নিজের পায়েও দাঁড়ায় নি ও ভয়ে পালালো। প্রেম বা ভালোবাসা যে আখ্যাই দাও না কেন তা জানালা দিয়ে সোজা পানাপুকুরে!"
আমি ধীরে স্বরে বললাম,
"আপনি তাকে আটকান নি!"
"আমার এসবে যায় আসে না। কোনো মানুষ চলে যেতে চাইলে যাবে, তার মর্জি। আমি পা ধরে বসে থাকবো নাকি! আমার তাকে আটকানোর কি ঠেকা!"
"তাহলে আমি চলে গেলেও আমাকে আটকাবেন না?"
এবার সাহেবের দৃষ্টি বদলালো। ভ্রু কুঁচকে গেলো। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে গেলো। অতঃপর কঠিন ধমক দিয়ে বললেন,
"তুমি আর ওই রুপসা এক? এই তুমি কি অন্যমানুষ। তুমি আমার গ্যাদা পেয়ারা। ওয়ান পিস। তাই যেতে চাইলেই যেতে দিচ্ছে কে! মাথার পোকাগুলোকে একটু বিশ্রাম দেও। আলতু ফালতু যতসব যন্ত্রণা নিয়ে বসে থাকবে। ধ্যাত! কৃপা করে এবার কি মটকা ঠান্ডা হলো!"
আমার মটকা ঠান্ডা হলো না। বরং আরোও দমবন্ধ করা অনুভূতিতে মনটা তরল হয়ে গেল। নিজেকে আটকাতে পারলাম না। হু হু করে কেঁদে উঠলাম। এখন রুপসা সাহেবের জীবনের কোথাও নেই। কিন্তু একটা সময় হয়তো ছিলো যা এখন সাহেব স্বীকার যাচ্ছেন না। হয়তো রুপসা তার দায়িত্বে ভরা কাঁধের পাশে দাঁড়ালে গল্পটা ভিন্ন হত। আমাকে কাঁদতে দেখে সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, হতাশ গলায় বললেন,
"এই কারণে আমার গ্যাদা মেয়ে বিয়ের শখ ছিলো না। আস্তো একটা যন্ত্রণা ঘাড়ে উঠেছে। এদের ক বললে কলিকাতা বুঝে। কলাও হয় ক তে। এই কাঁদো কেন?"
"আমার ইচ্ছে! আমার ইচ্ছে আমি কাঁদবো। আমার কষ্ট হচ্ছে! আমার ঈর্ষা হচ্ছে। হয়তো রুপসা আপনার ভালো রুপ দেখেছে যা আমার ভাগ্যে নেই। আমি সেই মুহাইমিন সরকারকে হয়তো কখনো দেখতেই পারবো না। আমি পারবো একটা হুতুমকে।"
আমার কথা শুনে হুট করেই হেসে ফেললেন সাহেব। আমার চোখ মুছিয়ে গালে চুমু খেলেন। মাথার চুলগুলোয় হাত বুলিয়ে বললেন,
"আমার সবচেয়ে ভালো রুপ কেবল আমার পেয়ারার জন্যই বরাদ্দ। এর থেকে ভালো রুপ আমি দেখাতে পারবো না। রিয়ালিটি মেনে নেও! এখন কি সারারাত এই ফ্যাসফ্যাসানি হবে? আমার অসহ্য লাগে এই ফ্যাসফ্যাসানি।"
উনি হাসলেও আমি পাগলের মতো কাঁদছি। তিনি আমাকে চুমু খাচ্ছেন। আমি একটা সময় তার হাত ধরে বললাম,
"আমাকে ভালোবাসেন তো!"
তিনি স্থির, গাঢ় দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে। দৃষ্টিতে কাঠিন্য ছিলো না। ছিলো শুধু নীরব কিছু কথা। যা ওই বয়সে আমি ধরতে পারি নি। কিছু বলতেন হয়তো কিন্তু সময় পেলেন কই! ওমনি কৃপা চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। তাই আমার গালে হালকা কামড় দিয়ে বললেন,
"যাও আমার পার্ট টু কাঁদে!"
আমি অসহায়ের মতো চাইলাম। সেদিন আমার মনটা স্থির হলো না। কারণ আমাত সাহেব সোজা বাংলা বলতে পারেন না। রুপসা কাহিনী পরে আমার কাছে খোলসা হলো। রুপসা আপু ছিলেন বড়লোকের দুলালী। দেখতেও তিনি ছিলো অলীক সুন্দরী। সুতরাং ক্যাম্পাসের ছেলেদের হৃদয় ওখানেই বধ। তার পায়ের কাছে নিজেকে লুটিয়ে দেওয়াও যেন খুব সামান্য বিষয়। অথচ আমার সাহেব ছিলেন নির্লিপ্ত। তার নির্লিপ্ততা রুপসা হকের কৌতূহলের কারণ। সেই কৌতূহল থেকে আকর্ষণ। আর তা থেকে হৃদয় হারানো। প্রথমে বন্ধুত্বের বাহানা তারপর মায়ায় ফেলানোর প্রচেষ্টা। কৃপাধারী হুতুম তখন নির্লিপ্ত। ফলে বিষয়টা অনেকটা জেদ-ই ছিলো। যেখানে এতো এতো পুরুষ রুপসা হকের হাসিতে প্রাণ দেয় দেয় ভাব সেখানে এই পুরুষ এতো নির্লিপ্ত কেন। তবে সেই জেদ বেশিদিন টেকসই হলো না যখন জানলেন আমার সাহেব কোনো বিশেষ মানুষ নন। একজন নিতান্ত মধ্যবিত্ত পুরুষ। যাকে তেইশ বছর থেকে পুরো সংসারের দায়ভার নিতে হয়েছে। এই পুরুষদের পাশে দাঁড়ানোর মতো সাহস রুপসা হকের হলো না। তাই প্রেম পরিণতি পেলো না। এটা অবশ্য জেনেছি সাহেবের এক বন্ধুর থেকে। ফলে আমার মন শান্ত হলো! আমার কৃপাধারী হুতুমের পক্ষে প্রেম অসম্ভব!
—————
বাচ্চার মা হওয়া এভারেস্টের থেকে কঠিন কাজ। এই বিষয়টা কৃপা আমাকে হাড়ে হাড়ে বুঝালো। কৃপা যতটা বড় হচ্ছে, মেয়েটা তত বেশি দস্যু হচ্ছে। মেয়েটি হাটতে পারা মানে আমার মাথায় চিন্তার পাহাড়। ধীরে ধীরে লম্বা হচ্ছে। হাতের কাছে কিছু রাখাই বিপদ। তবে আমার থেকে বিপদে আছেন সাহেব। মেয়ে আমার পিকাসোর ছোট নাতনী। সাহেবের কাপড় চোপড়েই সে বেশি আঁকাবুঁকা করে। মনে আছে একদিন সাহেবের সাদা শার্টে কলম দিয়ে দাঁড়িয়ে দফারফা করে দিলো। সাহেব শার্ট বের করেছিলেন অফিসে পড়বেন বলে। রান্না করছিলাম, এর মধ্যেই সাহেবের হুংকার,
"পেয়ারা, পেয়ারা!"
আমি ছুটে গিয়ে দেখি, আমার মেয়ে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। আর সাহেব কোমড়ে হাত দিয়ে ক্ষুদ্ধ চোখে শার্ট হাতে দেখছেন। তার মুখ লাল হয়ে আছে। আমি তা দেখে হাসতে হাসতে বললাম,
"বকুন বকুম! বলুন যন্ত্রণা যতসব!"
সাথে সাথেই আমার দিকে কঠিন চোখে তাকালেন সাহেব। কৃপার বকাটা আমার খেতে হলো। আমার গাল জোরে টেনে বললেন,
"যেমন মা তার তেমন মেয়ে। এই শাস্তি তুলে রাখলাম। সুদে আসলে আমি নিব!"
"কিভাবে?"
"আজকে রাতে পার্ট টু মায়ের সাথে ঘুমাবে!"
আমার গাল লাল হয়ে গেলো। বুঝতে বাকি রইলো না কি বুঝাচ্ছেন। এই লোকটার আজ কৃপা পাওয়ার শখ। সেই সময় শাহনেওয়াজ সাহেব এবং মিষ্টি আপু আমাদের বাড়ি আসলেন মিষ্টি হাতে। অতঃপর জানলাম মিষ্টি আপু মা হতে চলেছেন। আমাদের ঘর যেন সুখে টুইটুম্বর। কিন্তু সুখ চিরটাকাল কি থাকে! সুখের সাথে বিপদও আসে ধীরে পায়ে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………