খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - পর্ব ১৬ - মুশফিকা রহমান মৈথি - ধারাবাহিক গল্প

খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - মুশফিকা রহমান মৈথি
          জীবনের জটিল অংকে কখনো অনবরত প্লাস চিহ্নটি আসে না। মাঝে মাঝে মাইনাস চিহ্নটিও আসে। লাভ যেখানে আছে, সেখানে ক্ষতি তো থাকবেই। সুখের পেছনে মৃদু পায়ে দুঃখও আসে। পূর্ণতার সাথে অপূর্ণতা-- এটাকেই জীবন বলে। নয়তো কি একেবারে ম্যাড়মেড়ে, একঘেয়ে জীবন হবে না বলুন! আমার জীবনেও তাই অনেকগুলো মাইনাস চিহ্ন এসেছে। তবে মাইনাস গুলো এসেছে প্লাসের পরে। তাই কাটাকাটি করে কিছু থেকে গেছে। আমার তাতে আফসোস নেই বিন্দুমাত্র। হ্যা, ওই মুহূর্তে সেই মাইনাসের মোড়কে আসা বিপদগুলোকে প্রচুর বিশাল ঠেকেছিলো। 

মিষ্টি আপুর মা হবার সংবাদে খুশির লহর বইলো আমাদের বাড়িতে। মিষ্টি আপুর জীবনটা এতোটাই সুখে মোড়া থাকুক এটাই আমার কাম্য ছিলো। সবথেকে আনন্দিত ছিলেন শাহনেওয়াজ সাহেব। তিনি নতুন গাড়ি কিনেছেন৷ এই সুসংবাদের উছিলায় তিনি আমাদের পিকনিকে নিয়ে যেতে চাইলেন। পিকনিকটা ঢাকার বাহিরে। তার গাড়িতে করে আমরা যাবো। সকাল সকাল বের হব আর ফিরবো সন্ধায়। ঘুরতে যাবো শুনতেই আমার আর মিষ্টি আপুর চোখ চকচক করতে লাগতো। মা অবশ্য বললেন,
"তোমরা ঘুরে আসো। আমি তোদের ছোট খালার বাড়ি ঘুরে আসবো। অনেকদিন হয়েছে রুবির বাড়ি যাই না! এতোদূরের জার্নি আমার পা সইতে পারবে না।"

মায়ের কথা ঠিক। বাতের ব্যথার সাথে আজকাল তার মাজাতেও ব্যথা। এতোদূরে যাওয়া আসায় তার অনেক কষ্ট হবে। তবে আমার ভালো লাগছিলো। বিয়ের পর বাপের বাড়িতেই আমার যাওয়া হয়েছে গুনে গুনে। সেখানে একটু ঘুরতে যাওয়ার লোভ মনে তো জন্মাবেই। কিন্তু সেই আনন্দ টেকসই হলো না বেশি সময়। প্রায় সাথে সাথে সাহেব বলে উঠলেন,
"না, না অহেতুক এমন আয়োজন করার মানে নেই। এতোদূরে মিষ্টির এই শরীরে না যাওয়াটাই উচিত।"

কথাটা শুনতেই আমার আর মিষ্টি আপুর মুখ চুপসে আমসত্ত্ব হয়ে গেলো। কৃপাধারী হুতুমের একটা বাগড়া না বাঁধালে কি শান্তি আছে! আমার মেয়েটা লাফাতে লাফাতে বললো,
"বুম বুম। বুম বুম!"

আহারে! এই একুশ মাসের মেয়েটাও জানে ঘুরতে যাবার আনন্দ। অথচ আমার কৃপাধারী হুতুম বুঝলে হয়। আমি তার দিকে তাকালাম খুব অসহায় ভঙ্গিতে। কিন্তু তিনি প্রচন্ড নিরুৎসাহিত ভঙ্গিতে বললেন,
"যা গরম পড়েছে, এতে এই অনর্থক পিকনিক করার মানে নেই। দেখা যাবে পিকনিক করতে যেয়ে ছেলেপুলে অসুস্থ হলো।"
"অনর্থক বলবেন না ভাইজান, জায়গাটা সুন্দর। একেবারে গ্রামের বাড়ি টাইপ ফিল দিবে। মাহমুদ থাকলে ওকেও নিয়ে যেতাম। আমি আসলে মিষ্টির জন্যই যেতে চাইছি। মিষ্টির বাসায় থাকতে থাকতে মনে কেমন পানসে ভাব চলে এসেছে। ডাক্তার বলেছে ওর মন যত ভালো থাকবে, বাচ্চার শরীর তত ভালো থাকবে। আর মিষ্টি একা যেতে চাইছে না। চলুন না ভাইজান। গেলে আপনারও ভালো লাগবে।"

ইশ! কি বিচক্ষণ স্বামী! শাহনেওয়াজ সাহেবের এই গুণটি আমার সবথেকে ভালো লাগে। তিনি বরাবর মিষ্টি আপুর কথা চিন্তা করেন। তিনি যে মিষ্টি আপুকে খুব ভালোবাসে তাতে কোনো রাখঢাক নেই। শাহনেওয়াজ সাহেব অনেক বোঝানোর পরও আমার সাহেব রাজী হলেন না।মাও অনেক গুতালেন। মেয়েটা বড় হচ্ছে। ওকে।নিয়ে একটু ঘুরাঘুরি তো মন্দ না। কিন্তু আমার সাহেব এই গরমে পিকনিকে যাবেন না। আমার খুব রাগ হলো, মুখ ভোঁতা করে বসে রইলাম আমি। মিষ্টি আপুর মনটা খারাপ হয়ে গেলো। শাহনেওয়াজ সাহেবও হতাশ হলেন। এই কাঠের মানবকে বোঝানো কারোও কাম্য নয়। এদিকে আমার মেয়েটা বুম বুম করতে করতে ফেনা তুলে দিল।

রাত বাজে সাড়ে আটটা। বাহিরে মেঘের গর্জন। ঘরের দেওয়ালও একটু পর পর সেই গর্জনে কেঁপে উঠছে৷ কৃপাকে অনেক কষ্টে ঘুম পাড়ালাম। তারপর শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলাম আমার ঘুমন্ত মেয়েটার দিকে। দু বছর তখনো হয় নি। আরোও তিনমাস বাকি। মেয়েটা এতো ত্যাঁদর হয়েছে কি বলবো! দিনকে দিন শুধু ত্যাদরামি বাড়ছে। এখনো স্পষ্ট কথা বলা শিখে নি সে। গুটি কয়েক শব্দ বলে, তাও সেই শব্দগুলো হয় আদো আদো। নুডুলস উচ্চারণ করতে পারে না সে। বলে "নাম নাম"। পিঁপড়াকে বলে "পিপ্পা"। মিষ্টি আপুকে ডাকে, "পিপি"। তার উচ্চারণ গুলো শুনতে ভালো লাগে। যেদিন খাট থেকে লাফাতে লাফাতে পড়ে গেলো। আমি যেই শুধালাম,
" কোথায় ব্যথা পেলে!"

বললো,
"পুতপুত!"

প্রথমে বুঝলাম না। পরে বুঝলাম সে তার পাছায় ব্যথায় পেয়েছে। এতো হাসি পেলো! এই আদো আদো বুলিতে আমাকে যখন ডাকে "আম্মু", যত দুষ্টুমি করুক আমার মন জুড়িয়ে যায়। কিন্তু সেই সাথে যখন দেখি জানালার গ্রিল বেয়ে উঠছে বা খাট থেকে লাফিয়ে টেবিলের উপর চড়ে বসছে তখন মনে হয় উল্টো ঝুলিয়ে পিটাই। বাংলাদেশি বাচ্চাদের পাছায় যতক্ষণ না মার পড়বে তারা আসলেই শুধরায় না। আমার মেয়ের কথাই বলি, সাহেব আমার জন্য একটা লিপস্টিক আর তিব্বত স্নো নিয়ে এসেছিলেন। আমিও ভুলোমনা, জিনিসগুলো রেখেছিলাম ড্রেসিং টেবিলের নিচের থাকে। মেয়ে যে আমার পা উঁচিয়ে হাত বাড়ালেই সেগুলোর নাগাল পায় তা আমার মনে ছিলো না। রান্না শেষ করে ঘরে এসে দেখি সে ওই লাল লিপস্টিক মুখে মেখে লাল হনুমান সেজে বসে আছে। আর ক্রিম ঘাটতে ঘাটতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তার চোয়ালে সদ্য উঠা চারটে দাঁত বের করে বললো,
"লান্না, লান্না!"

আমার ক্রিম হয়ে গেলো তার রান্না। আমার খুব রাগ হলো। কিন্তু সেই রাগ গিলে নিলাম। কারণ ওই সুন্দর মুখখানার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারলাম না। 

বাহিরে বৃষ্টি বেড়েছে। এখনো ফিরে নি সাহেব। ঘড়ির কাটা নয়টার ঘরে দাঁড়ালো। ঠিক তখন বাজলো কলিংবেল। আমি দরজা খুলতেই দেখলাম হাতভর্তি বাজার হাতে বৃষ্টিতে একেবারে ভিজে টুইটুম্বর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আমার সাহেব। মুখখানা গম্ভীর নয়। বরং তাকে খুব প্রসন্ন মনে হলো। আমার হাতে বাজারের ব্যাগটা তুলে দিয়ে বললেন,
"ইলিশ এনেছি!"

আমি অবাক স্বরে বললাম,
"এতো বাজার হঠাৎ!"
"এতো প্রশ্ন ভালো লাগে না। খেতে ইচ্ছে হয়েছে এনেছি। ভেঁজে দেওয়ার কৃপা করলে ভালো হয়!"

আমি চোখ কুচকে বললাম,
"এই রাতে কে ইলিশ কাটবে!"
"আমি কি অবিবেচক? কেঁটেই এনেছি। ধুয়ে এখন শুধু ভাঁজতে হবে!"
"কিন্তু কি উপলক্ষ্য?"
"বললাম না, আমার খেতে ইচ্ছে করছে!"

আমি সাহেবের দিকে সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার হাতের ব্যাগটা নিলাম। মিনমিন করে বললাম,
"আপনার না ইলিশের গন্ধ পছন্দ না!"

বলেই চলে যেতে নিলাম, ঠিক তখন-ই সাহেব আমার শাড়ির আঁচল টেনে ধরলেন। আমার আঁচলে নিজের ভিজে মাথা মুছতে মুছতে বললেন,
"এতো প্যানরপ্যানর, ঘ্যানর ঘ্যানর করা কেন! আগে খেতাম না এখন খাই। আগে তো গ্যাদা মেয়ে মানুষও ভালো লাগতো না। এখন তার সাথে দিব্যি সংসার করে যাচ্ছি। যন্ত্রণা করে করে মাথার পোঁকা খাচ্ছে। কিছু মানা করলে মুখ ফুলাচ্ছে। ঠুন্না তো মারতে পারছি না।"
"আঁচল ছাড়ুন। এহ, ভিজিয়ে দিচ্ছেন তো! আমার শাড়ি বদলাতে হবে।"

তিনি একেবারেই পাত্তা দিলেন না আমাকে৷ রীতিমতো আমার শাড়ির আঁচল ভিজিয়ে দিয়ে বললেন, 
"বেশ করেছি। শাড়ি কি কম? দিনে দশবার বদলালেও অভাব হবে না। আচ্ছা, একমিনিট"

বলেই একটা প্যাকেট বের করে আমার খালি হাতে ধরিয়ে বললেন,
"কৃপা করে বদলে ফেলে আমাকে ধন্য করুন। একটু মাথা কি মুছেছি মহাভারত অশুদ্ধ করে ফেলেছি যেন!"

বাজারের ব্যাগ রেখে প্যাকেটটা ফাঁক করে দেখলাম একটা সবুজ রঙা শাড়ি! আমি অবাক হয়ে বললাম,
"আপনি এতো দিলদরিয়া হলেন কেন বলুন তো! খুব করে জানি এই ইলিশ আর শাড়ি আমার জন্য এনেছেন। কাহিনী কি বলুন তো!"
"বাহবা! আমার গ্যাদা দেখছি এখন মাথাও ঘামাতে পারে!"
"কি হয়েছে বলুন তো!"

সাহেব হাসলেন। এই গুমরোমুখো মানুষের হাসিটা যে কি চমৎকার। তার চাহনী যতটা ভয়ংকর। তার হাসি ততটাই মোহনীয়। আমার দিকে এগিয়ে বললেন,
"এখন থেকে আমাকে স্যার বলে সালাম ঠুকবে!"
"কেন শুনি?"
"আমার প্রমোশন হয়েছে।"

প্রমোশনের কথাটা শুনতেই আমার মনটা ভালো হয়ে গেলো। সাহেব যতটা পরিশ্রম করেন এই প্রমোশনটা তার প্রাপ্য। গতবছর থেকে এই প্রমোশনটা আটকে ছিলো। অফিসের বড়কর্তার শালা প্রমোশন পেলো, অথচ আমার সাহেবের প্রমোশন আটকে গেলো। সকালবেলা এজন্যই হয়তো মেজাজ খরখরে ছিলো। আমি সেই সুযোগে বললাম,
"তাহলে শাহনেওয়াজ সাহেবকে বলি আমাদের পিকনিকটা শুক্রবার হোক!"

সাহেব আমার গাল টেনে বললো,
"বুদ্ধি দিন দিন পাকছে দেখি পেয়ারার৷ যেই দেখলো আমার মন ভালো অমনি আবদার!"
"আহ! চলুন না। বিয়ের পর কি আমি আবদার করেছি?"
"আগে আমার ইলিশ মাছ ভেঁজে খাওয়ানো হোক!"

আমি অমনি ফড়িং এর মত লাফাতে লাফাতে ইলিশ মাছ ভাজতে গেলাম। অবশেষে সাহেবের মন গললো। তিনি সম্মতি দিলেন। 

শুক্রবার দিনটায় আমরা গেলাম গাজিপুরের ওই জায়গায়। জায়গাটা আসলে একটা রিসোর্ট। রিসোর্টটা শাহনেওয়াজ সাহেবের বন্ধুর। রিসোর্ট হলেও জায়গাটা বানানো হয়েছে গ্রামের মত করে। দোচালা তিন চারটে ঘর। গাছে ঘেরা সেই ঘর গুলো। এতো গাছ, এতো মনোরম একটা পরিবেশ যে সেখানে গেলে ফিরতে ইচ্ছে করে না। সেদিন হয়তো মেঘেরাও কৃপা করলো সাহেবের উপর। কালো মেঘে ঢেকে আছে আকাশ। রোদ নেই একেবারে। একটু পর পর ঠান্ডা বাতাস ছুটছে। সেই পরিবেশে পিকনিক করার মজাই আলাদা। ঘন ঘন পাখির ডাক শুনছি। পাখির ডাক তো শহরের ইট পাথুরে ঘরে শুনতে পাওয়াই যায় না। পুকুর আছে বিশাল। তাও ঘাটলা করা পুকুর। আমাদের খাবার দাবারের ব্যবস্থা করা হলো ওখানেই। মেয়ে আমার ছাড়া পেয়ে দৌড় লাগালো। সাহেব তার পেছনে ছুটলেন। বদ্ধ ঘরে থাকতে থাকতে আমার কৃপাটাও হয়তো হাপিয়ে গেছে। তাই খোলা এই পরিবেশে এসে সে মুক্ত বিহঙ্গিনীর মতো ছুটছে। শাহনেওয়াজ সাহেব বড্ড সতর্ক। তার স্ত্রীকে তিনি একমুহূর্ত কাঁধছাড়া করলেন না। আমি সাহেবকে খোঁচা দিয়ে বললাম,
"শিখুন, শিখুন। আপনার ছোট অথচ কি দায়িত্বজ্ঞান!"

আমার দিকে কঠিন ভাবে তাকিয়ে সাহেব বললেন,
"তো এখন মাথায় নিয়ে কি নেত্য করবো! আসুন, আমার মাথায় আসুন। আমার মাথায় এসে তাকধুমাদুম নাচুন! যন্ত্রণা!"

রোমান্সের ইনি কি বুঝেন? আমি হাল ছেড়ে দিলাম। খাওয়া দাওয়া শেষে আমরা একটু ঘুরে দেখতে লাগলাম আশপাশটা। আমি গেলাম পুকুরের দিকে। আমার সাথে কৃপাও। ঠিক তখনই ঝুমঝুমিয়ে নেমে এলো বৃষ্টি। শীতল বারিধারা গায়ে লাগতেই আমার রুহ অবধি জুড়িয়ে এলো। কি শান্তি। হাত মেলে আমি ভিজতে লাগলাম। আমার পরনে সাহেবের দেওয়া সবুজ শাড়ি। পুকুরের সিড়িতে তখন পানি জমেছে। কৃপা সেই পানিতে লাফাচ্ছে আর খিলখিলিয়ে হাসছে। আর বলছে,
"বিত্তি, বিত্তি!"

আমি দু হাত মেলে ভিজছি। ঠিক তখন ই গমগমে স্বর কানে এলো,
"এই বৃষ্টির মধ্যে ব্যাঙয়ের মতো কোদাকোদি করার কি মানে? বলি বয়স কি হাটুতে নেমে এসেছে! নিজে লাফাচ্ছে মেয়েকে নিয়ে লাফাচ্ছে! যন্ত্রণা, যতসব"

বলেই মেয়েকে টেনে ঘাটে নিয়ে তার মাথা মুছিয়ে দিতে শুরু করলেন। আমি কঠিন চোখে তাকালাম সাহেবের দিকে। এতো মনোরম একটা পরিবেশ নিতান্ত পাথর হৃদয়ের মানুষই এমন উক্তি করতে পারে। কোথায় আমার সাথেও একটু ভিজবে। তা না! মেয়ে আমার ঠান্ডা হয়ে গেছে ভিজে। ফলে তিনি কঠিন চোখে আমার দিকে চাইলেন। তার বাঘের মতো চাহনীকে এখন আমার ভয় লাগে না। তাই নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললাম,
"যার আপনার মতো হুতুমের সাথে বিয়ে হয়েছে তার পক্ষে মানুষ থাকা সম্ভব না। কারণ মানুষের পক্ষে আপনাকে বিয়ে করা সম্ভব না। আমি না হয় একটু ব্যাঙ হলাম!"

আমার কথা শুনে তিনি রাগী স্বরে বললে,
"বেশ জ্বর বাঁধাও গে! আমি সেবা করবো না!"

বলেই মেয়েকে নিয়ে ঘরে চলে গেলেন। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এই হুতুম বৃষ্টির মানে বুঝে না। বৃষ্টি মানে ফড়িং এর হুল্লোড়, বৃষ্টি মানে এক দলা বিষন্নতা। আবার বৃষ্টি মানে নীরব প্রেম, মাখামাখা আহ্লাদ। আমি শেষ সিড়িতে পা ভিজিয়ে বসলাম। পানিটা কি শান্ত লাগছে। বৃষ্টিতে আমার গা ভিজে ঠান্ডা হয়ে গেছে তবুও উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না। ঠিক তখনই আমার মাথায় ছাতা ধরলেন কেউ। আমি না দেখেই তার ঘাড়ে মাথা রাখলাম। তিনি রুক্ষ্ণ গলায় বললেন,
"ঠান্ডা লাগবে!"
"লাগুক! আপনি আছেন তো!"
"আর যখন আমি থাকবো না?"
"কোথায় যাবেন!"
"টেকনিক্যালি যেহেতু আমি গ্যাদার থেকে চৌদ্দ বছর বড়। তাহলে আমার মৃত্যু চৌদ্দ বছর আগেই হবে! চৌদ্দ বছর আমি ছাড়া থাকতে হবে!"

কথাটা শুনতেই আমার বুকে কামড় লাগলো। তার কাঁধ থেকে মাথা তুলে ভেজা চোখে তাকালাম। এতোসময় ভেজার কারণে আমার অশ্রুও বৃষ্টির পানিতে একাকার হয়ে গেছে। আমি তার দিকে চাইতেই সাহেব বললেন,
"কি?"
"খবরদার, এই কথা বলবেন না!"
"না বললে কি আমি মরবো না? সবাই কি থাকে পৃথিবীতে সবসময় থাকে!"

তার কথাগুলো আমার কানে গলিত লোহার মত লাগছিলো। আমার বুকটা ভার হয়ে গিয়েছিলো। আমি উঠে দাঁড়াতেই তিনি আমার হাত টেনে ধরলেন। বললেন,
 "কি গ্যাদার রাগ হলো নাকি!"

আমার গলা ধরে এসেছে। কথা বলতে ইচ্ছে হলো না। সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। আমার দিকে ঝুঁকে আমার ঠোঁটে একটা গভীর চুমু আঁকলেন। তার চোখে এক অদ্ভূত মাদকতা দেখলাম। তিনি আমার চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে বললেন,
"গ্যাদাকে এখন বড় হতে হবে! যেন চৌদ্দ বছর আমি ছাড়া থাকতে পারা যায়! তাই এই পাগলামিগুলো করা যাবে না।"

আমি এবার শব্দ করে কেঁদে উঠলাম। নাক টানছি ক্রমাগত। সাহেব আমার গালে চুমু খেলেন, কপালে চুমু খেলেন। তার গালের দাঁড়ির খোঁচা লাগছে আমার গালে। তিনি আমার মুখটা দু হাতে ধরলেন। কিছুসময় দেখলেন আমাকে। তারপর বললেন,
"গা ঠান্ডা হয়ে গেছে। বুদ্ধি শুদ্ধি হবে না তাই না?"

আমি একটা শাড়ি নিয়ে এসেছিলাম। কাপড় বদলে সেই শাড়িটা পড়লাম। বৃষ্টি থামার নাম নেই। আমরা সেই বৃষ্টিতেই রওনা দিলাম। ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। রাস্তায় বিদ্যুৎ নেই সেকারণে। হেডলাইটের আলোতে যা একটু দেখা যাচ্ছিলো রাস্তা। গাড়ি চালাচ্ছিলেন শাহনেওয়াজ সাহেব। সামনে সাহেব বসা। পেছনে আমি, মিষ্টি আপু আর কৃপা। গাড়ি চলছিলো খুব সাবধানে কারণ রাস্তা খারাপ। হঠাৎ একটা প্রাইভেট কার ওভার টেক করে শো করে চলে গেলো। প্রাইভেট কারটা আমাদের পাশ কেটে বেরিয়ে গেলো এমনভাবে, যেন এই ঝড়বৃষ্টির রাতটা তার ব্যক্তিগত। কাদা ছিটকে এসে উইন্ডশিল্ডে পড়লো ছপাৎ করে। শাহনেওয়াজ সাহেব বিরক্ত হয়ে একবার শুধু বললেন,
“পাগল নাকি!”

সাহেব তাকে বললেন,
"সাবধানে চালান!"

তারপর শাহনেওয়াজ সাহেব আবার দুই হাতে স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরলেন। বৃষ্টি তখন আরোও তীব্র বেগ নিয়েছে। ওয়াইপার দুটো পাগলের মতো দুলছে, তবু কাঁচের ওপারে পৃথিবীটা ঝাপসা। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের চমকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য রাস্তা দেখা যাচ্ছে। হেডলাইটের আলোর পক্ষে সম্ভব হলো না এই তীব্র বর্ষণে আমাদের পথ দেখানো। রাস্তাটা আরোও গিলে খাচ্ছিলো অন্ধকার।

আমি ঠিক তখনই খেয়াল করলাম, সামনে যেই প্রাইভেট কারটা গেলো সেটার ব্রেক লাইট হঠাৎ জ্বলে উঠেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সবকিছু ঘটে গেলো একসাথে।

গাড়িটার পেছন দিক আচমকা স্লিপ করলো। ভেজা রাস্তায় চাকা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এঁকেবেঁকে ঘুরে গেলো। মনে হলো কেউ যেন খেলনার গাড়িকে আঙুল দিয়ে ঠেলে দিয়েছে।
“আস্তাগফিরুল্লাহ!” 

বলেই মিষ্টি আপু চিৎকার করে উঠলেন।

শাহনেওয়াজ সাহেব সঙ্গে সঙ্গে ব্রেক চাপলেন।
চাকার ঘর্ষণে একটা বিকট শব্দ উঠলো। কিন্তু আমাদের গাড়িটাও স্লিপ করলো। বুকের ভেতরটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গেলো। সামনের প্রাইভেট কারটা তখন রাস্তার পাশে থাকা একটা বৈদ্যুতিক খুঁটিতে সজোরে ধাক্কা খেলো।শব্দটা এত জোরে হলো, মনে হলো বজ্রপাত মাটিতে নেমে এসেছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই শাহনেওয়াজ সাহেব গাড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু ভেজা রাস্তা স্টিয়ারিংয়ের কথা শুনলো না। গাড়ির পেছন দিকটা কাদায় পিছলে গিয়ে রাস্তার ধারে অর্ধেক নেমে গেলো। কৃপা আমার গলা ধরে ভয়ে কাঁদতে লাগলো। সাহেব যেন কিছু একটা আঁচ পেলেন। তিনি পেছন দিকে ঝুকে এলেন। 
তারপর আরেকটা ধাক্কা খেলো আমাদের গাড়িটা। আমার মাথা সজোরে গিয়ে লাগলো সামনের সিটে। কাঁচ ভাঙার শব্দ কানে এলো। এরপর পেলাম ধোঁয়ার গন্ধ। কানের ভেতর এক অদ্ভুত ভোঁ ভোঁ আওয়াজ হচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো পৃথিবী থেমে গেলো। শুধু বাইরে তীব্র বৃষ্টি পড়ছিলো। অথচ আমাদের গাড়িতে নেমে এসেছে নীরবতা।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp