খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - পর্ব ১৭ - মুশফিকা রহমান মৈথি - ধারাবাহিক গল্প

খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - মুশফিকা রহমান মৈথি
          পৃথিবীর সকল প্রাণীরা আপাতপক্ষে নিতান্ত অসহায়। সবথেকে বেশি অসহায় আমরা, মানুষ। তাদের নিজের জীবনের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কোনো ক্ষমতাবলেও তাদের পক্ষে জানা সম্ভব নেই আগামী সেকেন্ডে তাদের সাথে কি হবে। অথচ আমাদের সেই জীবন নিয়ে কত পরিকল্পনা। সুখে থাকার প্রবল তেষ্টা আমাদের। কিন্তু শেষমেশ কিছুই আমাদের হাতে নেই। কিন্তু এই ক্ষমতাহীন আমরা নিজেদের নিয়ে বড়াই করি। দর্প দেখাই। ভাবি আমরা চাইলেই সব পারব। আমরা কি কেউ জানতাম, শুক্রবারের সেই পিকনিক থেকে ফেরার কালে আমাদের সাথে এমন কিছু ঘটবে যার রেশ সারাটাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। 

আমি মাথায় চট লাগার পর আমি ভেবেছিলাম আমি মরেই গেছি। পার্থিব কোনো শব্দ আমার কানে আসছিল না। আমার মস্তিষ্ক কেমন শূণ হয়ে গিয়েছিলো। স্নায়ুর অসাড়তা কাটালো যখন নীরবতা চিরে আমার মেয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। পাশে ফিরে তার দিকে তাকাতেই দেখলাম কৃপার মাথা ফুলে গেছে। ব্যথায় সে কাঁদছে। অথচ তার কান্নার শব্দটা এতো ক্ষীণ। আমি দেখলাম আমার সাহেব জ্ঞান শূণ্য। তার মাথা থেকে গলগল করে রক্ত পড়ছেন। তিনি আমাদের দিকে পেছনে ঝুঁকে এসেছিলেন তিনি। ওভাবেই ঝুলে আছেন। ডান হাতটা অসাড়। মিষ্টি আপু কাঁতরাচ্ছেন ব্যথায়। বাচ্চাটা ঠিক আছে তো? আলো আঁধারীর মায়ার তার ব্যাথাতুর মুখটা দেখা গেলো না। আর শাহনেওয়াজ সাহেবের মাথাটা স্টেয়ারিংয়ের উপর ঝুলে ছিলো। বর্ষনের রাতের আলো আধারীতে মনে হচ্ছিলো তিনি খুব ক্লান্ত হয়ে চোখ বুজে রেখেছেন। আমার চোখ কেমন ভারী হয়ে এলো। মাথাটা টনটন করছে। উষ্ণ তরল আমার কপাল বেয়ে নেমে আসছে আমি ঠিক টের পাচ্ছি। কিন্তু শরীর নাড়ানোর কোনো ক্ষমতা নেই। গলা দয়ে স্বর বের হচ্ছে না। কালো ধোঁয়ায় গাড়ি ছেয়ে গেছে। চোখ জ্বলছে খুব। কানে আসছিলো কৃপার কান্নার শব্দ আর বাহিরের বর্ষার নির্দয় আর্তনাদ। আমি যেন কোনো ঘোরের মধ্যে ছিলাম। আমার জ্ঞান ছিলো, কিন্তু আমার শরীর নিস্পন্দ। মেয়েটা আমাকে জড়িয়ে কাঁদছে অথচ আমার তাকে জড়িয়ে ধরার শক্তি নেই। 

বেশ কিছুসময় কাটলো ওভাবেই। হঠাৎ কানে এলো বাহিরের হট্টোগোল। এম্বুলেন্সের শব্দ কানে আসছে। মনে হচ্ছে দূর থেকে ভেসে আসছে। দুটো গাড়ির দূর্ঘটনা অবশেষে কারোর চোখে পড়েছে। এম্বুলেন্স এসেছে। আমাদের পাঁচটা প্রাণকে তারা গাড়ি থেকে বের করলো। আমি তখনো তাকিয়ে রয়েছি, কিন্তু কিছু বলার ক্ষমতা নেই। যেন কেউ গলা টিপে রেখেছে। 

আমাদের হাসপাতালে আনার পর আমার ঘোর কাটলো। আমার মাথার রক্ত দ্রুত বন্ধ করার চেষ্টা করা হলো। আমার মাথায় সেলাই লাগলো সাতটা। বাম হাত ফুলে ঢোল। এই হাতেই আমি কৃপাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে ছিলাম। সামনের সিটে চাপ পড়ে হাত ফুলে গেছে। অনেক সময় পর আমার মস্তিষ্ক সচল হলো। অনুভূত হচ্ছে দেহের যন্ত্রণাগুলো। কি তীব্র যন্ত্রণা। আমার ভ্যাবলামো কাটতেই আমি পাগলের মতো কৃপাকে খুঁজলাম। সেই ভয়ংকর দুমড়ানো গাড়িটার কথা মনে পড়তেই আমার বুকের ভেতরটা অস্থির হয়ে গেলো। দমবন্ধ করা একটা অস্বস্তি আমার গলা টিপে ধরল। সেই ভয়ংকর দূর্ঘটনার পরিণতি কি হবে তা আমার মস্তিষ্ক কল্পনা করতে লাগলো। ব্যগ্র হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়ার্ডবয়কে ক্ষীণ স্বরে শুধালাম, 
 “আমার পরিবারের সবাই বেঁচে আছেন তো?”

 ওয়ার্ডবয় কেমন পাংশু হাসলো। তারপর দেখিয়ে দিলো দুটো বেড। সেই দৃষ্টি অনুসরণ করতেই দেখলাম আমার পাশের বেডে কৃপা বসে আছে। তার হাতে একটা চকলেট। মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ। হাতে সেলাইনের ক্যানোলা। আমার মেয়েটা খুব যত্ন করে হাতের চকলেট খাচ্ছে। তার মুখখানা কেমন ফুলে গেছে। ব্যথায় অনেক কেঁদেছে নিশ্চয়ই। আমার মেয়ে বেঁচে আছে এটা অনুধাবণ হতেই আমার চোখ ভিজে এলো। ইচ্ছে হলো মেয়েটাকে জড়িয়ে বুকের ভেতর নিয়ে নেই। কিন্তু হাতে ব্যান্ডেজ আমার। 

আমার বামপাশের বেডে সাহেব। তার চোখ বন্ধ। সাহেবের হাতে এবং কাঁধে প্লাস্টার, ব্যান্ডেজ। মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ। ওয়ার্ডবয়কে উগ্রীব হয়ে শুধালাম,
 “উনার কি হয়েছে?”
 “ডান কাঁধের হেয়ারলাইন ফ্রাকচার হয়েছে। মাথায় সেলাই লেগেছে। কিন্তু আল্লাহর রহমত খুব গুরুতর না। তবে আমরা ওয়ার্ডে শিফট করবো। উনি কেবিনে যাবেন না।“
“আর বাকিরা? মানে আমাদের সাথে যে আরেকজন পুরুষ আর মহিলা ছিলেন। মিষ্টি আপু, উনি প্রেগনেন্ট।“

ওয়ার্ডবয় আমার সেলাইনয়ের নবটা ঠিক করে বললেন,
 “হ্যা, উনাকে আইসিউতে শিফট করা হয়েছে। উনার খুব ব্লিডিং হয়েছে। রক্ত দেওয়া হয়েছে। বাচ্চার পালস মনিটরিং চলছে।"
"আর শাহনেওয়াজ সাহেব?"
"যিনি ড্রাইভিং সিটে ছিলেন?"
"জি"
"উনি লাইফ সাপোর্টে আছেন। উনার অবস্থা খুব খারাপ। স্টেয়ারিং বুকে লেগেছে। ফুসফুস ফুটো হয়ে গিয়েছে। ইন্টারনাল ব্লিডিং হয়েছে অনেক। হার্টের রক্তনালী ছিঁড়ে গেছে। ব্রেইন কাজ করছে না। বাঁচবে কি না বলতে পারছি না। দোয়া করুন।"

কথাটা শুনতেই আমি থম মেরে গেলাম। মিষ্টি আপু আইসিউতে, তার অবস্থা ভালো না। এদিকে শাহনেওয়াজ সাহেবের এই অবস্থা। আমার হাতপা কাঁপছে। কেমন ঠান্ডা হয়ে গেলো। বুকের ভেতরটা আরোও অস্থির হয়ে উঠলো। শাহনেওয়াজ সাহেবের কিছু হয়ে গেলে কি করে সামলাবো মিষ্টি আপুকে। তার যে গোটা জীবনটা শাহনেওয়াজ সাহেবকে নিয়ে। বিয়ের পর থেকে ধীরে তিনি মিষ্টি আপুর সর্বস্ব জুড়ে নিজেকে বিস্তার করেছেন। যে বিয়েটা একটা সময় শুধু দায় ছিলো সেই বিয়েটা মিষ্টি আপুর হাসির কারণ হয়ে গিয়েছিলো। কি জবাব দিব! আমার মিষ্টি আপুটা সদ্য সুখের দেখা পেয়েছে। একটা নিষ্পাপ প্রাণ কি তার বাবার ছায়া পাবে না? আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চাইলে কি তিনি দিবেন আমার মিষ্টির আপুর সুখটা! আমি হাত জড়ো করে আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চাইলাম যেন মিষ্টি আপুর সুখ অক্ষত থাকে।

নাহ, দোয়াটা কবুল হলো না! হয়তো ভবিতব্য এটাই ছিলো। শাহনেওয়াজ সাহেবকে বাঁচানো গেলো না। হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে গিয়েছে তার। ফুসফুস আর কাজ করছিলো না। প্রচুর ইন্টারনাল ব্লিডিং হয়েছে। ফলে লাইফসাপোর্ট থেকেই ঘোষণা হলো, 
"তিনি মৃত!"

মিষ্টি আপুর জীবন থেকে সব সুখটুকু মুছে দিয়ে তিনি সেদিন মধ্যরাতে অজানার দেশে রওনা দিলেন। আর সেই ঘটনা আমাদের জীবন বদলে দিলো। 

মিষ্টি আপু এবং বাচ্চা দুজনই সুস্থ আছে বলে তাদের কেবিনে শিফট করা হলো। আমরা তখন ই কিছু জানাই নি তাকে। সাহেব কেমন পাথর হয়ে গেলেন। তিনি শুষ্ক চোখে শুধু বোনকে দেখছিলেন। শাহনেওয়াজ সাহেবের বাড়ির লোকেরা এলেন। তারা লাশ নিয়ে গেলেন দাফনের জন্য। একটিবারও খোঁজ নিলেন না, মিষ্টি আপু আর বাচ্চা কেমন আছে। 

 আশ্চর্যজনক বিষয় ঘটলো এরপর। পুলিশ এলো হাসপাতালে। সাহেব তখনও ওয়ার্ডে। তার প্লাস্টার খোলা হয় নি। জানা গেলো, সাহেব এবং আমাদের নামে পুলিশ কেস হয়েছে। আমরা নাকি শাহনেওয়াজ সাহেবকে মেরে ফেলেছি। নয়তো গাড়িতে পাঁচজন অথচ মৃত্যু একজনের হবে কেন! আমি থমকে গেলাম। মিষ্টি আপু তখন কেবিনে। মনিটরিং এ রাখা হয়েছে। সাহেবের কাঁধে ফ্রাকচার। আমার ছোট কৃপার মাথাটা ফুলে আছে। ব্যথায় ঘুমাতে পারে না। আমার মাথার সেলাই খোলা হয় নি। অথচ বলে কি না আমরা শাহনেওয়াজ সাহেবকে মেরে ফেলেছি! পুলিশ এলেন। আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ হলো। গাড়িটা নাকি স্টেশনে নেওয়া হয়েছে। তখনও আমাদের নামে ওয়ারেন্ট বের হয় নি। ইনভেস্টিগেশন চললো। বলা হলো,
"আমরা যেন পালানোর কোনো চেষ্টা না করি!"

পরে জানতে পারলাম এই নোংরামির কারণ। শাহনেওয়াজ সাহেব তার সম্পত্তির অর্ধেকটা তার মা এবং অর্ধেকটা মিষ্টি আপুর নামে উইল করেছিলেন।এই সংবাদ মিষ্টি আপুও জানতেন না। একারণেই তার বোন এবং ভাইয়েরা একটা মিথ্যে কেস সাজালেন। যেন মিষ্টি আপু সেই সম্পত্তিটা না পায়। একবার প্রমাণ করতে পারলেই হলো যে মিষ্টি আপু বা আমরা শাহনেওয়াজ সাহেবকে খুন করেছি। তাইলে সম্পত্তি তারা পেয়ে যাবে। কি নোংরামি!

অথচ আমার মিষ্টি আপুর সেই সম্পত্তির প্রতি লোভ ছিলো না। তার তো শুধু তার শাহনেওয়াজ সাহেবকে চাই। যখন শাহনেওয়াজ সাহেবের মৃত্যু সংবাদ তাকে দেওয়া হলো তিনি প্রথমে বিশ্বাস করতে চাইলেন না। ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। বললেন,
"কি ফাজলামো করছো ভাবী? আচ্ছা, সর উনাকে দেখবো!"

আমি নীরব রইলাম। কি উত্তর দিব। যখন বাস্তবতা অনুভূত হলো মিষ্টি আপু কেমন যেন উন্মাদ হয়ে গেলেন। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। বার বার বলতে লাগলেন,
"তুমি মজা করছো তাই না? উনি আমাকে একা ফেলে যেতেই পারেন না। উনি আমাকে বলেছেন, মিষ্টি আমি তোমার হাত ছাড়বো না।"

তার হৃদয়গ্রাহী সেই আর্তনাদ এখনো আমার শরীরে কাঁটা দেয়। এক পলক শাহনেওয়াজ সাহেবকে দেখার জন্য তিনি ছটফট করতেন। কিন্তু তার দাফন হয়ে গেছে। মিষ্টিআপুর ভাগ্যে শেষ দেখাটাও ছিলো না। তারা দেখতেই দিলো না। শেষ পর্যন্ত পাগলামি মাত্রা ছাড়া হলে মিষ্টি আপুকে সিডাটিভ দেওয়া হল। তখন শান্ত হয়ে পড়ে থাকলেন বিছানায়। আমার শ্বাশুড়ি মেয়ের এমন হাল দেখে আঁচলে মুখ চেপে কাঁদতেন। আমার সাহেব সামনেও আসলেন না। হয়তো বোনের এই অবস্থা তিনি সহ্য করতে পারবেন না। 

 শাহনেওয়াজ সাহেবের মা মিষ্টি আপুকে আর ওইবাড়িতে ঠাঁয় দিলেন না। তিনি অস্বীকার করলেন মিষ্টি আপুর বাচ্চাকেও। যখন তিনি বলেছিলেন,
"আমার ছেলের খুনিদের আমার ঘরে জায়গা নেই! আমার ছেলের কবরের কাছেও যেন এরা না যায়।"

আমার ইচ্ছে হয়েছিলো তার চুলের মুঠি চেপে ধরি। সাহেব খুব ক্ষেপেছিলেন এমন আচারণ দেখে। সামান্য সম্পত্তির জন্য এতো নিচ কাজ করবে তারা। গজগজ করে বলেছিলেন,
"এমন ছোটলোক জানলে কোনোদিন এই ঘরে বিয়ে দিতাম না!"

মিষ্টি আপু তার হাত ধরে কাতর স্বরে বলেছিলেন,
"ভাইয়া, উনি খুব ভালো মানুষ। উনি আমাকে কখনো কষ্ট দেন নি। আজ উনি থাকলে এমনটা হতে দিতেন না। উনি ছোটলোক না। জানি তোমার ঘাড়ে আবার চেপে বসেছি। তবে উনাকে দায় দিও না!"
"এই ঘাড়ে চেপে বসছিস মানে? আমি কি কখনো বলেছি সেটা? এই আমি কি অপদার্থ নাকি? এই মুহাইমিন সরকারের এতোও খারাপ দিন আসে নি যে আমার বোনকে খাওয়াতে পারবো না। শোন, এই ভাই এখনো আছে! এই বাড়ি তোর। তাই কোনোদিন এইকথা বলবি না।"

সাহেব তার বোনকে আগলে নিলেও শাহনেওয়াজ সাহেবের বিয়োগের ক্ষতটা কতটা গভীর ছিলো তার আমরা কল্পনাও করতে পারি নি। আমার হাসিখুশী মিষ্টি আপু কেমন নিস্প্রভ হয়ে গেলো। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতেন। আর বলতেন,
"ভাবী উনি থাকলে এখন অফিস যেতেন। উনি সকালে আমার মাথায় চুমু এঁকেই বের হতেন। আচ্ছা ভাবি, যদি এতো তাড়াতাড়ি উনার যাবার কথা ছিলো, তাহলে আমাকে এতো ভালোবাসায় মোড়ালেন কেন? আমার মনে হয়েছিলো এই কয় বছরে আল্লাহ আমার জীবনে সব সুখ ঢেলে দিয়েছেন। ভাবি! উনার বদলে আমার মৃত্যু হত। উনাকে কেনো আল্লাহ নিয়ে গেলেন। আমার বাচ্চাটা জানতেও পারলো না তার বাবা তাকে কতটা ভালোবাসতো। জানো ভাবি, উনার একটা বদ অভ্যাস ছিলো। অফিস থেকে এসেই আমার পেটে হাত দিয়ে বললেন,
"বাবু, মাকে কষ্ট দেও নি তো!"

আচ্ছা ভাবি! আল্লাহ কেন আমার সুখ এভাবে কেড়ে নিলেন!"

মিষ্টি আপু শুধু প্রলাপ বলতেন। উনার চোখের নিচে কেমন কালি জমে গিয়েছিলো। আমি শুধু বুঝাতাম,
"আপনাকে বাচ্চাটার জন্য এখন শক্ত থাকতে হবে। ভুলে যাবেন না। ও কিন্তু শাহনেওয়াজ সাহেবের শেষ স্মৃতি।"

তার প্রলাপ শুনে আমার শ্বাশুড়ি শুধু কাঁদতেন আর বলতেন,
"আমার মেয়েটার সাথে এমন কেন হলো!"

সত্যি কেন আমাদের মিষ্টি আপুর সাথে এমন হলো! আমার সাহেব কঠিন হাতে আমারের ঘরকে সামলে নিয়েছিলেন। মিষ্টি আপুর যেন কোনো অসুবিধা না হয় সেটাই তিনি নিশ্চিত করলেন। 

—————

আমরা ভেবেছিলাম শাহনেওয়াজ সাহেবের গত হওয়াটাই আমাদের জীবনের সব থেকে কষ্টের ঘটনা। কিন্তু আমাদের বিপদ যে তাতেই সীমাবদ্ধ নয় তা টের পেলাম যখন সাহেবের নামে ওয়ারেন্ট হলো। এক সকালে আমাদের বাড়ি পুলিশ এলো। সাহেব তখন নাস্তা করছিলেন। প্লাস্টার খোলায় অফিস যাবার জন্য প্রস্তুত তিনি। ঠিক তখন ই এলো পুলিশ। জানতে পারলাম শাহনেওয়াজ সাহেবের খুনের দায়ে আমার সাহেবকে এরেস্ট ওয়ারেন্ট বের হয়েছে।

শাহনেওয়াজ সাহেবের ভাইয়েরা পুলিশকে টাকা খাইয়ে সাহেবের বিরুদ্ধে একটা মিথ্যে মামলা দায়ের করালেন। গাড়ির ব্রেক আগ থেকেই ফেইল ছিলো এমন একটা মিথ্যে প্রমাণ সাজালেন। ফলে কেইস আমাদের অনুকূলে গেলো না। ব্রেক ফেল থাকায় শাহনেওয়াজ সাহেবের দূর্ঘটনা ঘটেছে। সেদিন বৃষ্টি ছিলো, ফলে দূর্ঘটনা ঘটা সহজ। তাই এই সব কিছু পরিকল্পিত ছিলো। এমন ভাবেই সব পরিকল্পিত যেন সবাই বেঁচে থাকে আর শুধু শাহনেওয়াজ সাহেব মারা যান। ফলে মিষ্টি আপু সব সম্পত্তি পাবেন আর এই সব করেছেন আমার সাহেব। কি নোংরামি! সামান্য সম্পদের জন্য আমার সাহেবের মতো সৎ মানুষকে খুনী বানিয়ে দিলো?

পুলিশ এসেছিলো চারজন। তারা আমার সাহেবকে হ্যান্ডকাফ পড়ালেন। আমার সাহেব এক অবিশ্বাস্য চোখে সেই বদ্ধ হাতের দিকে চেয়েছিলেন। তার কপাল কুঁচকে এলো। তিনি কঠিন স্বরে শুধালেন,
"প্রমাণ কি?"

পুলিশের একজন বললেন,
"প্রমাণ ফরেন্সিক রিপোর্ট। এবার চলুন। ভালোয় ভালোয় গেলে আমরা দুর্ব্যবহার করবো না।"

 যখন আমার সাহেবকে নিয়ে যাচ্ছিলো আমি তাকে জাপটে ধরে ছিলাম। পাগলের মতো বলেছিলাম,
"আমার সাহেব কিছু করে নি। উনি এমন করলে নিজের পরিবারকে কেন বিপদে ফেলতেন।"

আমার মেয়ে তার বাবাকে ধরে নেওয়া দেখে কি কান্না! প্রচুর ভয় পেয়েছিলো সে। সে আমার সাহবের পা ধরে রেখেছিলো। ছোট ছোট হাতে তার বাবাকে সে যেতে দিবে না। পুলিশের দয়া হলো না। তারা টেনে হিচড়ে একেবারে আসামীর মতো তাকে গাড়িতে ঢোকালেন। আমার সাহেব চোয়াল শক্ত করে অবিচল ছিলেন। দৃঢ় প্রস্তরের মতো শক্ত রইলেন তিনি। গাড়িতে উঠার সময় তিনি আমাকে আদেশ করলেন,
"কিছু হবে না। আমি যাব আর আসবো। তুমি মিষ্টি আর মাকে সামলাও। আর কেঁদো না। আমি আসছি!"

সাহেব এলেন না। তাকে কোর্টে চালান করা হলো। পর দিন যখন তাকে দেখতে গেলাম আমার মনে হলো কেউ আমার বুকে ছোরাঘাত করছে। আমার সাহেবের মুখটা শুকিয়ে গেছে। তারা মারধোর করে নি। তবে তার ময়লা জামা, বাড়ন্ত দাড়ি আর শুষ্ক চোখজোড়া আমার হৃদয়ে হুল ফোঁটালো। আমি নিজেকে শক্ত রাখতে পারলাম না। অসহায় স্বরে বললাম,
"সব আমার জন্য। আমি আবদার না করলে এগুলো কিছুই হত না। আমার জন্য সব হয়েছে!"

সাহেব রুক্ষ্ণ স্বরে বললেন,
"আমি মরে গেছি? এমন ফ্যাসফ্যাস করছো কেন তুমি! একদম আমার সামনে ফ্যাসফ্যাস করবে না। তোমার জন্য কিছুই হয় নি। যা হবার তাই হয়েছে। আর এমন মরাকান্না করতে হলে বাসায় করবে। আমার সামনে না!"

বলেই সেই কারার ভেতর থেকে হাতটা বের করে আমার চোখ মুছিয়ে দিতেন। 

জেল, থানা, পুলিশ, কোর্ট যে মধ্যবিত্তদের জন্য কত বড় অভিশাপ সেই সময় আমি হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। বাবা একজন উকিলের কাছে নিয়ে গেলেন। তার চাহিদা আকাশসম। আমি সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি তার চেম্বারে বাবার সাথে বসে থাকতাম। কৃপা থাকতো আমার সাথে। ছোট মেয়েটাকে কিনে দিতাম একটা ৩ টাকার চিপস। সারাদিন ও ওটাই খেত। সন্ধ্যা হলে হতাশ, শুষ্ক মুখে আমরা মা মেয়ে ফিরতাম। উকিলের পরামর্শ থাকতো,
"সমঝোতা করে নিন। খুনের মামলায় আসলে আমাদের করার কিছু থাকে না। বেইল খুব টাফ।"

বাসায় এসে ক্লান্ত শরীরে হেসেলে যেতাম। কৃপা মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়তো। মা অসহায়ের মত শুধাতেন,
"ব্যবস্থা হলো? বেইল হলো মুহাইমিনের।"

আমি নীরব থাকতাম। এর মধ্যে মিষ্টি আপু কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন। শাহনেওয়াজ সাহেবের ভাই-বোনদের কাছে অনুরোধ করলেন যেন কেস তোলা হয়। তারা সরাসরি প্রস্তাব দিলেন,
"সম্পত্তি ছেড়ে দাও।"

মিষ্টি আপু বিনা দ্বিধায় সব সম্পত্তি তিনি ছেড়ে দিবেন। তার অনাগত সন্তানের কথাও ভাবলেন না। তিনি তার ভাইকে জেলে পঁচতে দেখতে পারবেন না। ফলে সাথে সাথেই কেস তুলে নিলো তারা। সাতদিন পর আমার সাহেব অবশেষে জেল থেকে বাড়ি ফিরলেন। 

সাহেবের মুখখানা শুকিয়ে গেছে। সেই ময়লা জামাটাই তার গায়ে। দাঁড়িগুলো বেড়ে গেছে। পরিপাটি সাহেবকে কেমন ভেসে আসা খড়কুটোর মতো লাগছিলো। তিনি যখন বাড়িতে ফিরলেন, প্রথমে শুষ্ক স্বরে বললেন,
"আমাকে একটু গরম পানি দেও। আমি একটু গোসল করবো!"

আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার দীর্ঘশ্বাসে অবাধ আক্ষেপ ছিলো। হয়তো নিজের এই অসহায়ত্ব তার সহ্য হচ্ছিলো না। 

সাহেবের জেলে যাওয়া নিয়ে পাড়াতে অনেক রটনা রটলো। সত্য নিয়ে মাথাব্যথা কারোর নেই। তবে মুহাইমিন সরকারের নাকউঁচু দর্প চূর্ণবিচূর্ণ দেখতেই তাদের যেন আনন্দ। বাড়ি বয়ে লোক আসতো। খোঁচা মেরে কত কথা বলতো। আমাদের অবর্তমানে আমাদের নিয়ে বিদ্রুপ হত। কিছু মানুষ অন্যের বিপদে উল্লাস করে। তবে সেই মানুষের সংখ্যা যে এতো বেশি তা কে জানতো! 

সাহেবের জেলে যাওয়ার ঘটনা ছড়াতে ছড়াতে তার অফিসেও জানাজানি হলো। বিষয়টা হেড অফিস অবধি পৌছালো। সাহেবকে জবাবদিহি করতে হলো অনেক। কিন্তু সেই জবাবদিহিটা খুব একটা কাজে দিলো না। একদিন ভরসন্ধ্যায় সাহেব বাড়ি ফিরলেন। তার মুখখানা মলিন। ঘরে প্রবেশ করতেই আমি বললাম,
"গরম পানি দিব?"
"দেও! শোনো!"
"বলুন!"

সাহেব ম্লান স্বরে বললেন,
"এখন থেকে খরচ কমিয়ে ফেলতে হবে। মেপে মেপে চলতে হবে।"
"কেন বলুন তো!"
"কানন, আমার চাকরিটা আর নেই! এখন তোমার সাহেব বেকার!"

কথাটা বলেই ক্লান্ত শরীরটা টেনে উপরে চলে গেলেন। আমি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলাম। আল্লাহ আমাদের কি পরীক্ষাটা নিচ্ছেন?
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp