মৌমিতা শিউলি গাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়ালো। ভেজা ঘাসের উপর ফুল পড়ে আছে। ফুলগুলোকে জুতোর তলায় পিষে ক্লাসের প্রায় সবাই যাচ্ছে ল্যাবের দিকে। ব্যবহারিক ক্লাস রয়েছে আজকেও। তবে সেখানে যাওয়ার বিন্দুমাত্র শক্তি নেই মেয়েটার। সে দু'হাতের তালু ঘষতে ঘষতে চারপাশে তাকায়। শীত শীত লাগছে। গতকাল ওভাবে বৃষ্টিতে ভেজা ঠিক হয়নি। সর্দি লেগে গেছে। মাথায় একটা ভোঁতা যন্ত্রণা। সবকিছুই অসহ্য লাগছে। মনটাও অস্থির। গাছতলার দিকে অকারণে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো সে। ঝাঁকে ঝাঁকে শিক্ষার্থী যাচ্ছে সেদিক দিয়ে। তারপর সে চোখ বোলায় মাঠের চতুর্দিকে।
টিফিনের সময় লাইব্রেরিতে অনেক সময় নষ্ট করতে হয়েছে। মনোযোগ দেয়া যায়নি কোনো বইয়ে। কেউ বিরক্ত করতে আসেনি। ক্লাসগুলো কেটে গেছে একঘেয়েমিতে। এখন আবার ব্যবহারিকের কথা ভাবতেই মাথাটা ভয়াবহভাবে ঘুরতে লাগলো।
মৌমিতা হাঁটতে শুরু করলো। মনে প্রশ্ন আসে, কলেজের পেছনের গলিটাতে গেলে কেমন হয়? হঠাৎ যদি দেখা হয়ে যায় কারও সাথে?
আনমনে এদিকে এগিয়ে আসতে থাকা ছেলেটার দিকে চোখ যায় মৌমিতার। মাথার ভেতরে খসড়া তৈরি করে ফেললো সে। মনে মনে কয়েকবার তা অনুশীলন করার পর, ছেলেটা কাছে আসতেই সে বলে উঠলো, “শোনো!”
উচ্চারিত শব্দটা তার নিজের কানেই বেশ কটু শোনালো। তবে কাজ হয়েছে। ছেলেটা তার দিকে ঘুরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে।
“তোমার নাম?”
“রাশেদ।”
“ওহ। আচ্ছা, আ... ঐ যে... বাদল কলেজে আসেনি?”
“না।”
“হোস্টেলে আছে?”
রাশেদ ইতস্তত করে, “না... আসলে, ও বাইরে কোথাও গেছে। কিছু বলে যায়নি।”
“কোথায় গেছে?”
“বলেনি। মাঝে মাঝেই এভাবে বেরিয়ে যায়, না বলেই।”
“ওহ।” মৌমিতা মাথা নাড়লো। নিজেকে ঠেলে ঠুলে প্রস্তুত করলো পরবর্তী কথাটা বলার জন্য, “ওকে জানিয়ে দিও, আমি ওর খোঁজ করেছি।”
রাশেদ মাথা নাড়ে।
মেয়েটা হাঁটতে শুরু করলো মূল ফটকের দিকে। বাঁকা হেসে সামনে তাকায় ছেলেটা, বিড়বিড় করে বলে, “আপনি নিষেধ করলেও আমি জানাতাম!”
দুপুর প্রায় দেড়টা।
মৌমিতা কাপড় বদলে বিছানায় শুয়ে পড়লো। আজ সে গোসল করবে না। কেমন যেন জ্বর জ্বর লাগছে। মার্জিয়া কিছু একটা রাঁধছে। রান্নাঘরে শোরগোল হচ্ছে খুব। জোবেদা খালা চেঁচামেচি করছে।
ভ্রু কুঁচকে চোখ বুজলো মৌমিতা। চারপাশের পরিবেশটা খুব অস্পষ্ট মনে হলো, যেন ঘোরের মধ্যে রয়েছে। জ্বরের এই পর্যায়টা তার ভালোই লাগে।
সে কতোক্ষণ এভাবে শুয়ে রইলো, বুঝতে পারলো না। ছোট বোনের উচ্চস্বরে তার ঘোর কাটলো। মার্জিয়া মাছের ডিমের চচ্চড়ি বানিয়েছে। তার অভিযোগ, জোবেদা মাতব্বরি করে সেটাতে বেশি লবণ ঢেলেছে। এই কোলাহলের মাঝেই মারুফ ফিরেছেন বাড়িতে, তার কণ্ঠও শোনা যাচ্ছে।
মৌমিতা উঠে বসলো। চোখ বন্ধ করেই মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ। ব্যথাটা সারেনি। একটু বরং বেড়েছে। কপালের একটা রক্তনালী ঢিপঢিপ করছে। সে দুই হাতে তা-ই চেপে ধরে থাকে। এখনই হয়তো আম্মা খেতে ডাকবেন।
আরও কিছু সময় বসে থাকার পর তার কিছু একটা মনে পড়ে গেলো। হন্তদন্ত করে খাট থেকে নেমে পড়লো। ধীরপায়ে হেঁটে পড়ার টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। বইয়ের স্তূপের মাঝে ধূসর ডায়েরিটা খুঁজে বের করে। ভেতরের পাতাগুলোর মধ্য থেকে বের করে চিরকুটটা।
কবিতাটি তার নিজের লেখা। তবে এখানকার লেখাটা মৌমিতার নয়।
ছেলেটা জানিয়েছিলো তার হাতের লেখা ভালো না। কই? অতোটাও তো খারাপ না!
সেদিন বহুব্রীহি বইটা মৌমিতা নেয়নি। কিন্তু সেটার ভেতরে রাখা এই কাগজের টুকরোটা সাথে করে এনেছে, সযত্নে তুলে রেখেছে।
চিরকুট ভাঁজ করে সে আবার ডায়েরির মাঝে রাখলো। চেয়ারে বসে পড়লো কোনোমতে। মাথাটা অস্বাভাবিক হারে ঘুরছে। নিজের কপালে হাত রেখে বুঝতে চেষ্টা করলো, জ্বর এসেছে কিনা। বোঝা গেলো না। আজ টিউশন ক্লাসে না গেলেও চলবে। যে অধ্যায়টা স্যার পড়াচ্ছেন, তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ওখানে গেলে আজকাল বাদলের দেখা মেলে না! বেঞ্চে লেখা তার নামটার উপরে কালি ঢেলেছে কেউ। ছেলেটাই ঢেলেছে হয়তো। অভিমান করেছে কিনা, কে জানে?
মৌমিতা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। চেয়ারে হেলান দিয়ে ছাদের দিকে তাকালো। খুব অদ্ভুত একটা কাজ করার ইচ্ছে হচ্ছে তার। বেঞ্চের ওখানে বাদলের নামটা আবার লিখলে কেমন হয়? ছেলেটা বসলে তো ঐ আসনেই বসবে, তাই না? তার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে তখন? সে যেভাবে পেছনে ঘুরঘুর করতো, তার সেই ব্যাকুলতা কি ফেরত আসবে আবার?
মেয়েটা সোজা হয়ে বসলো। সে জানে, বেঞ্চে বাদলের নাম লেখা তার পক্ষে সম্ভব নয়। ডায়েরির উড়ন্ত পাতাটাকে ডানহাতে আটকে ধরলো সে। এক কোণে ছোট করে লিখলো নামটা। লেখাটা বাদলের মতো হয়েছে কি? হয়নি। মৌমিতা আনমনা হয়ে বসে রইলো। হুঁশ ফিরতেই উপলব্ধি করলো, ডায়েরিতে এই নাম কেউ দেখে ফেললে ঝামেলা হবে। কলমটা হাতে নিয়ে সে নামটির উপর ধরলো। তবে সেটাকে তৎক্ষণাৎ কেটে দিতে পারলো না। আশেপাশে মেঘের আদলে বাঁকা রেখা টানলো। ভেতরটা যত্ন করে ভরাট করলো তারপর। বাদলের নামটা আবার ঢেকে গেলো কালো কালির আড়ালে।
—————
রাশেদ ঘড়ির দিকে তাকায়। বিরক্তি প্রকাশ করে বলে, “এখনই বের হতে হবে। বাদল আসলোই না।”
তার দৃষ্টি অনুসরণ করে আমজাদও ঘড়ির দিকে দেখে, “ওকে জিজ্ঞেস করতে পারিস না কোথায় যায়? এই ব্যাটার চিন্তায় বয়সের আগেই বুড়ো হয়ে যাচ্ছি আমি।”
“এতো চিন্তা করেন কেন?”
“তুই যে কানের কাছে এসে মশার মতো প্যানপ্যান করছিস, বাদল নাই, বাদল নাই—”
“আচ্ছা, আর কিছু বলবো না। গেলাম আমি।”
রাশেদ বেরোনোর উদ্দেশ্যে দরজা খুলতেই বাদল ভেতরে ঢুকে পড়ে, নির্লিপ্তভাবে নিজের টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। তাকে নিয়ে এই ঘরে যে তর্ক শুরু হয়ে গিয়েছিলো, সেই বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই, আগ্রহও নেই। সে খাটের এক কোণে গিয়ে বসলো। বাকি দু'জনকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বিব্রত হয়ে বললো, “কী?”
আমজাদ ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করে, “কোথায় ছিলি?”
“বাইরে।”
“বাইরে কোথায়? এতোক্ষণ ধরে কোথায় থাকিস? কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না।”
বাদল নিরুত্তর। রাশেদ তাড়া দেখায়, “টিউশনে যাবি না? বের হ।”
সে মাথা নাড়ে, “যাবো না আজকে।”
“কালকেও তো যাসনি। এতোগুলো পড়া কোথায় পাবি পরে?”
“আকাশ কেমন অন্ধকার... দ্যাখ, স্যার পড়ায় কিনা। একটু বৃষ্টি হলেই তো ওদিকে বন্যা হয়ে যায়।”
রাস্তায় জমে থাকা পানির কথা মনে পড়তেই রাশেদও আগ্রহ হারিয়ে ফেললো। মাথা নেড়ে বললো, “হ্যাঁ হ্যাঁ। বাতাস উঠেছে জোরে। থাক, আজকে না যাই।”
আমজাদ হতাশ ভঙ্গিতে বলে, “ফাঁকিবাজ! তোদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক টেনশন হয় আমার।”
রাশেদ আর কিছু শুনলো না। চেয়ারের উপর বেশ ব্যস্তভাবে ব্যাগটা রাখলো। তারপর প্রায় ছুটে গিয়ে বসলো বাদলের পাশে, “তুই কোথায় হারিয়ে যাস মাঝে মাঝে?”
“আজাইরা! শান্তিতে একটু বের হতেও পারবো না?”
“না, আরকি... একজন তোর খোঁজ করছিলো।”
“কে?”
“তুই বল দেখি, কে হতে পারে?”
“ধুর! ভালো লাগছে না। বললে বল, না বললে নাই।”
“আচ্ছা বলি।”
“বল।”
“মৌমিতা খন্দকার।”
বাদল ভ্রু কুঁচকে রাশেদের দিকে তাকালো, “ফাজলামি করা বাদ দিয়ে নিজের কাজ কর।”
“সত্যিই। তোর কথা জিজ্ঞেস করেছিলো। জিজ্ঞেস করছিলো, তুই কলেজে এসেছিস কিনা, কোথায় গেছিস। তারপর বললো, বাদলকে জানিয়ে দিও আমি ওর খোঁজ করেছি।”
ছেলেটা কোনো বাহ্যিক আগ্রহ দেখালো না। মৌমিতা তার খোঁজ করবে কেন? ডায়েরির জন্য? নাকি আবার কোনো অভিযোগ করবে? মাথা থেকে এসব চিন্তাকে একপ্রকার জোর করে সরিয়ে ফেললো সে। রাশেদকে উদ্দেশ্য করে বললো, “কালকের নোটগুলো দে।”
রাশেদ উঠে গেলো। বাদল বড় একটা শ্বাস ফেলে হাতের পিঠ দিয়ে কপাল মুছলো। হাত মুখ ধোয়া উচিত ছিলো। কেমন ধূলো মেখে আছে শরীরজুড়ে। খাট থেকে নামতেও ইচ্ছে করলো না। নিজের এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে সেগুলোকে ঠিক করার চেষ্টা করলো সে। আকাশটা বেশ অন্ধকার। বাতাসের সাথে উড়ে আসা শুকনো পাতা জানালার কপাটে ধাক্কা খাচ্ছে। জিজ্ঞাসাগুলো আরও ঘনীভূত হচ্ছে মস্তিষ্কে।
মৌমিতা কি তাকে একটু বেশিই ঘৃণা করে? তার মন থেকে ঐ ঘৃণাটুকু মুছে ফেলার কি কোনো উপায় নেই? নাকি নিজেকে সরিয়ে নেয়াই সবচেয়ে ভালো হবে?
ছেলেটা জড়োসড়ো হয়ে দেয়াল ঘেঁষে বসলো। মেয়েটাকে সে এতো সহজে ছাড়তে পারবে না। তার ভাবনা সে মাথা থেকে ঝাড়তেও পারবে না। তবে মেয়েটার মতামতের তোয়াক্কা না করে নিজের অনুভূতি চাপিয়ে দিয়ে সে ইতোমধ্যেই মাঝখানে একটা দেয়াল তুলে দিয়েছে। নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরেছে। এই অপ্রীতিকর ঘটনাগুলো কোনোভাবে মেয়েটার স্মৃতি থেকে মুছে দেয়া যায় না? সবকিছু নতুন করে শুরু করা যায় না?
—————
মার্জিয়া দরজার সামনে এসে থামে। রাস্তায় কোনো যানবাহন নেই। যদিও সে হাতে সময় নিয়েই বেরিয়েছে। স্কুল তেমন দূরে না। তবে এই গরমের মধ্যে পায়ে হেঁটে যাওয়ার কথা কল্পনাও করা যায় না। আব্বা রিকশা ভাড়া দিয়েছেন আগেই। রিকশা নিতে হবে।
জুনায়েদকে বের হতে দেখে মেয়েটা সেদিকেই দৃষ্টি থামায়। দুই কদম পিছিয়ে দাঁড়ায়। ছেলেটা এদিক দিয়েই যাবে, এই সময় এদিকেই তার কাজ থাকে।
মার্জিয়া টের পেলো, জুনায়েদ ভাই তার দিকে তাকাচ্ছে না। খুব ব্যস্তভাবে হাঁটছে। তাকে অতিক্রম করে চলেও যাচ্ছে প্রায়।
“কোথায় যাচ্ছেন?”
ছেলেটা অনিচ্ছা নিয়েই পেছনে ঘুরলো, “শ্বশুরবাড়ি।”
“আপনার শ্বশুরবাড়ি ঐদিকে?”
“যেদিকেই হোক। তুমি স্কুলে না গিয়ে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”
“রিকশা নাই।”
জুনায়েদ আশেপাশে তাকায়। শুধু রিকশা কেন, যতোদূর চোখ যায়, তারা দু'জন ছাড়া আর কেউই নেই। খানিকক্ষণ এপাশ-ওপাশ পর্যবেক্ষণ করার পর ছেলেটা আফসোস করে বলে, “এখানে রিকশা পাওয়া যাবে না। মোড় পর্যন্ত হাঁটতে হবে।”
সে আবার যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই মার্জিয়া বলে উঠলো, “আপনি কী যেন করতে চেয়েছিলেন?”
“কী?”
“কামরাঙা...”
জুনায়েদ সাথে সাথে কোনো উত্তর দিলো না। মনে মনে রিপনকে দু' চারটে গালি দিয়ে হাসিমুখে বললো, “পরে ব্যবস্থা করবো সেটার। এখন আসি। কাজ আছে।”
হেসে হেসে বলতে শুরু করলেও, শেষ কথায় গিয়ে সে একটু গম্ভীর হয়ে গেলো। তারপর হাঁটতে শুরু করলো। মেয়েটা একটা ক্ষুদ্র শ্বাস ফেলে রাস্তার অপরপাশে তাকায়।
জুনায়েদ ভাইয়ের আচরণ আসলেই মাঝে মাঝে খুব বিভ্রান্তিকর লাগে। রিপন মামার সংস্পর্শে এসে এই মানুষটাও বাঁকা কথা বলতে শুরু করেছে। তাই বলে সবার সাথেই এভাবে কথা বলতে হবে নাকি!
জোবেদা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মৌমিতার খাওয়া দেখলো এতোক্ষণ। মেয়েটা এঁটো থালা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই সে বলে ওঠে, “এতোটুকু ভাত খাইলে শরীর চলে? পাখির খাওনও তো এর চাইতে বেশি হয়।”
মৌমিতা মুখ ভোঁতা করে রান্নাঘরে ঢোকে। খুটখাট শব্দ করে বাসন মাজতে শুরু করে। উত্তপ্ত চামড়ায় শীতল পানির ছোঁয়া লাগতেই সে কেঁপে উঠলো। জ্বরটা বোধহয় এসেই গেছে। সর্দির জ্বালাতনে রাতে ঘুম হয়নি। সকালে ওজু করার পর থেকে ঠাণ্ডাটা আরও বেড়ে গেছে। শরীরটা গতকাল থেকে খারাপ লাগছে ঠিকই, তবে সে কাউকে কিছু জানায়নি। মুখ ফুটে কিছু বলার বেলায় মেয়েটা ভীষণ অলস। আর তা যদি হয় নিজের অসুবিধা সংক্রান্ত কিছু, তবে তা নির্দ্বিধায় এড়িয়ে যাওয়াটাই যেন সুবিধা!
কলেজের পোশাক পরিধান করে আলমারি থেকে পুরু ওড়নাটা বের করলো মৌমিতা। বৃষ্টির সময়ে বাইরে বেরোলেই কানের ভেতর শোঁ শোঁ করে বাতাস ঢোকে। কানদুটো আজ ভালোভাবে ঢাকতে হবে।
সে বেশ ক'দিন হলো রিকশা ভাড়া নিচ্ছে না। হেঁটেই যাওয়া-আসা করছে কলেজে, টিউশনে। আজকেও রাস্তায় নেমে হাঁটতে লাগলো। পরিবেশটা খারাপ না।
রাস্তার দু'পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের পাতাগুলো দোল খাচ্ছে। সেগুলোয় জমে থাকা পানি ঝরে যাচ্ছে অল্প অল্প করে। বাতাসটা ঠাণ্ডা। শ্বাস নিতে গেলেই একেবারে ছুরির মতো তীক্ষ্ণ হাওয়া নাক চিরে ফুসফুসে ঢুকে যাচ্ছে। মেয়েটা বিরাট একটা শ্বাস টেনে নেয় বুকের ভেতর। জ্বরটা ভালোভাবেই আসুক!
আজ উপস্থিতি কম। যদি আর তেমন কেউ না আসে, তবে স্যারেরা দায়সারা ক্লাস নেবেন। বৃষ্টির দিনে এমনই হয়।
জানালার পাশে বসেও মৌমিতার মনে হলো, এখানে পর্যাপ্ত আলো নেই। অন্যদিন এ সময়ে রোদ ওঠে। আজ আকাশটা কালো মেঘে ছেয়ে আছে। রোদের দেখা মিললেও তা খুবই অল্প। কেমন যেন ম্লান হয়ে গেছে সূর্যের আলোটা।
পূর্ণিমার চাঁদের আলোর উজ্জ্বলতা তিন-চার গুণ বাড়ালে যেমন একটা আবছা স্বপ্নীল দীপ্তি তৈরি হবে, চারপাশটা ঠিক তেমনই দেখাচ্ছে। ঘোর ঘোর লাগছে।
মৌমিতা হাতের আঙুলগুলো নড়াচড়া করলো। চোখের সামনে নিজের ঐ গতিবিধিও ঝাপসা দেখালো। ঘোর লাগা ভাবটা হয়তো জ্বরের কারণে আসছে। শরীরের তাপমাত্রা খুব জলদি বেড়ে যাচ্ছে। দুশ্চিন্তা করার মতো বিষয়। কিন্তু মেয়েটা নিজের অস্পষ্ট হাতখানির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো।
শেষ বেঞ্চটার কিনারায় বসেছে বাদল। খাতা থেকে কিছু পড়া টুকে নিচ্ছে। তার এবং দেয়ালের মাঝখানে বসেছে রাশেদ। গালে হাত দিয়ে খাতার দিকে তাকিয়ে রয়েছে সে। স্যার নিজের মতো বক্তৃতা দিয়ে চলেছেন। তিনি যদি ঘুণাক্ষরেও টের পান, তার ক্লাস চলাকালীন কেউ অন্য বিষয়ের নোট লিখছে, তবে ছাত্র দুটোর বেশ বড়সড় শাস্তি হতে পারে। বাদলের সেটা নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। এই বিষয়গুলো নিয়ে তার মধ্যে ভয় কাজ করে না। কে কী বললো, কে কী ভাবলো—তাতে তার কিছুই যায় আসে না। যদিও একটা মানুষের কাছে আজকাল সে নিজেকে ‘ভালো’ প্রমাণ করতে মরিয়া। শুধু এই একজনের ভাবনাই তাকে প্রভাবিত করতে পেরেছে।
রাশেদ বোর্ডের দিকে তাকালো একবার, “একটা জিনিস খেয়াল করলাম। তোর সাথে আমার একটা মিল আছে।”
বাদল লেখা থামায় না, শান্তভাবে প্রশ্ন করে, “কী?”
“কেউ চুপচাপ থাকলে আমারও ভালো লাগে না। মেজাজ খারাপ হয়।”
“ওহ।”
রাশেদ তার দিকে ঘুরে বসে, উদাস কণ্ঠে বলে, “তুই এতো চুপচাপ আছিস কেন? কথা বল।”
“কী বলবো?”
“আগে যেসব উল্টাপাল্টা কথা বলতি, সেগুলোই বল নাহয়। যেটা মন চায়, সেটাই বল।”
বাদল এক মুহূর্তের জন্য লেখা থামায়। নোটখাতার দিকে তাকিয়ে থাকে খানিকক্ষণ। হাতের লেখাটা ভীষণ বাজে হচ্ছে, পড়াই যাচ্ছে না। তার হাতে মূলত জোর নেই। কলমটা ধরে রেখেছে নড়বড়ে আঙুলে। লিখতেও ভালো লাগছে না। খাতার একপাশে আলতো করে কলম রাখলো সে। সেদিকে তাকিয়েই দ্বিধান্বিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো, “একটা কথা বলি?”
“হ্যাঁ। বল?”
“আমি কি খুব খারাপ?”
রাশেদ থ হয়ে বসে রইলো। গাল থেকে হাতটা নামিয়ে বললো, “মানে?”
“মানে, মানুষ হিসেবে। আমি কি... খুবই খারাপ?”
ছেলেটা মাথা ঘুরিয়ে সরাসরি রাশেদের চোখের দিকে তাকায়। কোনো মিথ্যে নয়, আপাতত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আর নির্ভুল উত্তর চায় সে। রাশেদ থতমত খায়, আমতা আমতা করে বলে, “তুই খারাপ হতে যাবি কেন?”
সে তবু তাকিয়ে থাকে, আরও দুয়েকটা কথা শোনার অপেক্ষায়। রাশেদের মুখভঙ্গি দেখে অবশেষে দৃষ্টি ফেরায় বাদল। নিজের অসহায়ত্ব যথাসম্ভব আড়াল করে দায়সারাভাবে বলে ওঠে, “আমি খারাপই। আমি জানি।”
রাশেদ প্রতিবাদ করতে গিয়েও কিছু বলতে পারলো না। প্রশ্নটা সে এখনও ভালোভাবে বোঝেনি। হঠাৎ এমন প্রশ্ন করার কারণটাও সে জানে না। তবে উপলব্ধি করলো, পাশে বসে থাকা মানুষটিকে সে ভালো-খারাপের সংজ্ঞায় ফেলতে পারছে না।
বাদল কলমটা বাম হাতে ধরলো। মলাটের অপরপাশে লেখার চেষ্টা করলো কিছু একটা। নতুন করে আবিষ্কার করলো, তার বাম হাত লেখালেখির জন্য মোটেও প্রস্তুত নয়। সে পৃষ্ঠা ওল্টায়। মনোযোগ দিয়ে নোট লিখে নেয়ার ভান করে।
শন শন শব্দে বাতাস বইছে। জানালার বাইরের অন্ধকারাচ্ছন্ন মাঠটার দিকে তাকালো বাদল। মনে মনে চাইলো, মৌমিতার সাথে যেন আজ দেখা হয়ে যায়। ব্যাগের ভেতর ডায়েরিটা রাখা। সেটা ফেরত দেওয়া তার উদ্দেশ্য নয়। সে কেবল মেয়েটার সাথে কথা বলতে চায়। এমনি এমনি তো আর কথা বলা যায় না। কোনো না কোনো প্রসঙ্গের দরকার পড়ে। ডায়েরিটাকে এই কাজেই ব্যবহার করা হবে। কাজটা অতোটাও গুরুতর না নিশ্চয়ই? তারই ফেলে যাওয়া সম্পদটাকে পুঁজি করে, শেষবারের জন্য হলেও বাদল তার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতে চায়।
·
·
·
চলবে……………………………………………………