ঘুটঘুট শব্দে ইসমাতের ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ খুলে তাকাতেই চমকে গেল। এই ভোর সকালে সাহিদ তার আলমারি ঘেটে জামা-কাপড় সব এদিক সেদিক করে ফেলেছে। কী মনে করে সাহিদ ইসমাতের দিকে তাকাল। ইসমাত খুবই এলোমেলো অবস্থায়! নিজের হুঁশ-জ্ঞান হতেই ইসমাত দ্রুত কম্ফোর্টারে নিজের গা ঢেকে চেঁচাল,
--"এটা কী ধরণের অসভ্যতা সাহিদ? উইদাউট পারমিশন তুমি কোন সাহসে আমার রুমে ঢুকেছ? এই তোমার প্রাইভেসি দেওয়ার নমুনা?"
সাহিদ হাতের কাজ থামিয়ে ইসমাতের দিকে তাকাল।
--"সো হোয়াট?"
--"সো হোয়াট কি? চাইনিজ বললাম আমি?"
সাহিদ ইসমাতের গায়ের দিকে লক্ষ্য করে বলল,
--"আমি এসেছি তো কী হয়েছে? আই ক্যান কাম! আপনার আবার কিসের প্রাইভেসি? আপাদমস্তক প্যাকেট হয়েই তো আছেন।"
ইসমাত চোখ গরম করে বলল,
--"ওয়াচ ইওর মাউথ, সাহিদ!"
সাহিদ মোটেও পাত্তা দিল না ইসমাতকে। সে আবারও ঘাটতে শুরু করল। ইসমাত অস্ফুট স্বরে বলল,
--"তোমার কী সমস্যা আমার আলমারি নিয়ে?"
--"আমার ব্ল্যাক টাউজার খুঁজছি, ওয়ার্কআউটে যাব। ইডিয়েট মেইড আপনার আলমারিতে রেখেছে শুনলাম!"
--"তো সেটা ভদ্রভাবে আমাকে বলা যেত না?"
সাহিদ কপালে বিরক্তির ভাজ ফেলে বলল,
--"হাউ নাইভ ইউ আর, ইসমাত। আপনি আমার থেকে ভদ্রতা আশা করেন?"
ইসমাতের আবারও গা জ্বলে উঠল। সে কোনোমতে নিজেকে গুছিয়ে, খোলা চুল বেঁধে এসে সাহিদকে সরিয়ে দিল। ইসমাত একদম কাছেই ট্রাউজারটা পেল। সেটা সাহিদের মুখের ওপর ছুঁড়ে মেরে বলল,
--"কিছু খুঁজতে হলে চোখ থাকতে হয়।"
সাহিদ বলল,
--"আই হ্যাভ!"
বলেই সাহিদ কথা না বাড়িয়ে চলে যেতে নিলে ইসমাত বলল,
--"ওয়েট! আমার আলমারি এলোমেলো করে কোথায় যাচ্ছ? এক্ষুণি এসে গুছিয়ে দাও।"
সাহিদ পিছে না তাকিয়েই যেতে যেতে বলল,
--"ডু ইওরসেল্ফ!"
ইসমাত চেঁচাল পেছন থেকে কয়েকবার, কিন্তু সাহিদ শুনলে তো। ইসমাত রাগে অন্ধ হয়ে রান্নাঘরে গেল, কফি বানাল নিজের জন্য। মাথাটা বেশ ধরেছে। এই অবস্থায় সে কিছুতেই অফিস যেতে পারবে না। কফি বানাতে বানাতে দেখল সাহিদ তৈরি হয়ে যাচ্ছে ওয়ার্কআউটের জন্য। ইসমাতের হাতে কফি দেখে সাহিদ বলল,
--"আমাকেও এক মগ দিন।"
ইসমাত কটাক্ষ করে, গলায় তেজ ছড়িয়ে সাহিদের কথাই রিপিট করে বলল,
--"ডু ইওরসেল্ফ! রাতে তো খাবার ডাস্টবিনে ফেলেই দিয়েছ।"
সাহিদের গম্ভীর মুখটায় রাগের ছাপ প্রকাশ পেল। সে জুতোর ফিতে বাঁধা বাদ দিয়ে লম্বা লম্বা ধাপে রান্নাঘরে চলে এলো। ইসমাত ফিরেও তাকাল না। কিন্তু তখনই সাহিদ তার চুমুক না দেওয়া মগটা কেড়ে নিয়ে বলল,
--"ডিড মাইসেল্ফ!"
--"কি হচ্ছে? ওটা আমার কফি!"
--"হু কেয়ার্স?"
সাহিদ কফি নিয়ে চলে গেল। ইসমাত কপালে আঙুলের বিচরণ চালিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করল। সাহিদ গরম কফিটা কয়েক চুমুকে গিলে ফেলল। যেন তার যাওয়ার তাড়া আছে। কফির মগটা অবহেলায় রেখে আবারও সে চলে গেল জুতার কাছে। ইসমাত যখন দেখল তার রাগটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, তখন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
--"সাহিদ, ইউ আর নট আ কিড! আমার ঘর এলোমেলো করেছ তুমি! এখন ভাগছ। আমার অফিস আছে, আমি কত দিক সামলাব?"
--"ফ্রাইডেতেও ড্যাড আপনাকে কামলা খাটাতে নিয়ে যায়? সো অবিডিয়্যান্ট বউমা!"
সাহিদ আর একটা কথাও না বাড়িয়ে বেরিয়ে গেল। হাতে তার গাড়ির চাবি। সাহিদ জিমে গেলে গাড়িই নিয়ে যায় সবসময়। পেছনে বিমূঢ় ইসমাত। সে দ্রুত গিয়ে নিজের মোবাইল চেক করল, হ্যাঁ। আজ সত্যিই শুক্রবার। কাজের চাপে নাকি মানসিক চাপে কে জানে, ভুলেই গিয়েছিল আজ কি বার। তবে এ থেকে এটাও বোঝা যায়, ইসমাত সাহিদকে মোটেও বিশ্বাস করে না। এমনও না যে সাহিদ তার বিশ্বাস ভাঙার মতো কিছু করেছে, তবুও সে বিশ্বাস করে না।
নিজের ঘরে মাথা চেপে থম মেরে বসে রইলো ইসমাত। ঘড়িতে বাজছে সাড়ে সাতটা। এই মিষ্টি সকালে তার মেজাজ ফুরফুরে হওয়ার কথা থাকলেও তা কোনোক্রমেই হচ্ছে না। এখন আবার নিজ থেকে উঠে গিয়ে কফি বানাতেও ইচ্ছে হচ্ছে না, অথচ কফিটা তার খুব প্রয়োজন। আলমারির দিকে পিঠমুখী হয়ে বসেছে সে। নয়তো কাপড়ের স্তূপ চোখে পড়লে যতটুকু নিয়ন্ত্রণ রয়েছে তাও উড়ে যাবে। দুহাতে মুখ চেপে আপনমনে আওড়াল,
--"ওহ আল্লাহ, সেইভ মি।"
আধঘণ্টা এমন ভাবে বসে থেকেই কাটল তার। এর মাঝে শব্দের সাথে মোবাইল বেজে উঠল। ফোনের দিকে তাকাতেই দেখল ইফরা কল দিয়েছে। ইসমাত দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে কল রিসিভ করল। যেহেতু ভিডিও কল ছিল, কল রিসিভ করতেই ইফরার ঘুম ঘুম মুখটা ভেসে উঠল। ইফরা এই মুহূর্তে গাড়িতে বসে আছে। ইসমাত ভ্রু নাচিয়ে বলল,
--"কোথায় যাচ্ছিস?"
ইফরা পিটপিট করে মোবাইল স্ক্রিনে তাকাল। হতাশ গলায় বলল,
--"আর কোথায়, শুটিং এ যাচ্ছি।"
--"বিরক্ত কেন?"
--"বিরক্ত হবো না? গতকাল শুটিং সেরে আড়াইটায় বাড়ি গেছি, ঘুমালাম কখন? আবারও সকাল সকাল ছুটতে হচ্ছে। ওহ গড! আমি কোথাও হারিয়ে যেতে চাই আপু।"
ইফরা ইসমাতের ছোটো বোন। বাবা-মা গত হওয়ার পর থেকে এখনো দুই বোন একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। ইফরা এখন ছাব্বিশ বছর বয়সী যুবতী। তাও এখনো বড়ো আপু ছাড়া থাকতে পারে না।
ইসমাত জিজ্ঞেস করল,
--"দাদী কোথায়?"
--"জানি না।"
--"একই বাড়িতে থেকেও জানিস না?"
--"জেনেই বা কী হবে? ধরে বিয়ে দেওয়া ছাড়া দাদী আর কি পারে? তুমি ম্যাচিউরিটির এক্সকিউজ দিয়ে বিয়ে করতে পারো, আমি নই।"
ইসমাত এই মুহূর্তে পারিবারিক কেচ্ছা শুনতে চায় না। তাই সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করল,
--"এত সকালে কেন কল করেছিস সেটা বল।"
--"ঘুম চলে আসছে, ঘুমালে সারাদিন মাথা ব্যথায় ভুগতে হবে। তাই পথটুকু তোমার সাথে কথা বলে টাইম পাস করছি।"
--"চুইঙ্গাম চিবা।"
--"নো থ্যাঙ্কস!"
ইফরা ইসমাতকে ছাড়ল না। সে বিভিন্ন ব্যাপারে ফটরফটর করেই গেল। কিছুদিন আগে কোন পার্টিতে গিয়েছিল ইন্ডাস্ট্রির, সেখানে নাকি কে বা কারা তাকে কুপ্রস্তাব দিয়েছে, বিছানায় শুলেই নাকি ভালো পাবলিসিটি। ইফরা আবার কখনোই ইসমাতের মতো ঠান্ডা নয়, তার মুখের ওপর জবাব দেওয়ার স্বভাব আছে। হাসি-মুখেও জঘন্য অপমান করার রোগও আছে। সেটাই সেদিন খুব করেছে সে। এ নিয়ে কতবার বড়ো বোনের কাছে বকা খেয়েছে সে। সেই পার্টি নিয়েও একেকজনের গুষ্ঠি উদ্ধার করতে ভুলল না সে।
ইসমাত এতে বেশ হতাশ হলো। এই মেয়েকে নাকি দেশের মানুষ ছোট পর্দার সুন্দরী আর নরম ব্যবহারের অভিনেত্রী ভেবে দিন পার করছে। হাসির প্রেমে পড়ার কত রেকর্ড আছে তার। অভিনয় জগতের মূল আকর্ষণ তার এই হাসিটাই। অথচ 'ইফরা তায়্যেবা'-র ব্যবহার আর চতুরতা বাকি সবার থেকে ভাবনারও বাইরে। তার বোনের আসল রূপ সে ছাড়া আর কে জানে?
ইসমাত বলল,
--"বুঝেছি, আর ক্ষেপার দরকার নেই। আমাকে তোর সেটের এড্রেস পাঠিয়ে দে, আমি শুটিং দেখতে যাব নাহয়।"
ইসমাতের এই কথাতে ইফরার ঘুম উড়ে গেল। বাঁকা হেসে সেটের এড্রেস টেক্সট করে বলল,
--"বাব্বাহ, সংসারী আপুর তবে শ্বশুরবাড়ি থেকে ছুটি মিলল?"
ইফরার কটাক্ষ ইসমাতের ভালো লাগল না। চোখ রাঙিয়ে বলল,
--"আজ ফ্রাইডে।"
ইসমাত বুঝল ইফরাও বারের হিসেব রাখেনি। ইফরাকে দেখল তখনই 'বার' চেক করতে।
--"ওহ সরি সরি। আমার একদমই খেয়াল ছিল না। তা তোমার জুনিয়র ট্রাবলটা কোথায়?"
--"ট্রাবলটা আমার ঘরের বারোটা বাজিয়ে দিয়ে শরীর পেটাতে গেছে।"
--"মানে? তোমার ঘরে কেন আসছে?"
ইসমাত পেছনের ক্যামেরা দিয়ে ঘরের বেহাল দশা দেখে ইফরা রেগে গেল,
--"ঠাটিয়ে দুটো লাগিয়ে দিতে পারলে না?"
--"তুইও আমাকে কম জ্বালাসনি ইফরা, তাই বলে আমি তোর গায়ে হাত তুলেছি?"
--"আমি অন্য হিসাব।"
ইফরা আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। সে তার নির্দিষ্ট মন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছে। তাই তখনের মতো দুই বোনের আলাপে ইতি ঘটল। ইসমাত জানিয়ে দিল, সে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছালে জানাবে।
জামা-কাপড় সব ঠিক করে ইসমাত গেল সাহিদের ঘরে। সাহিদের ঘরটা তার তুলনায় বেশ বড়ো। বড়ো ঘরটার দেয়ালের রং অফ হোয়াইট আর গ্রে রঙের মিশেলে। একটা কিং সাইজের বিছানা একপাশে, আলমারি বেশ বড়োসড়ো একটা, একটা মিরর, আর অন্যদিকে তাকালে একটা বড়ো টেবিল, যেখানে সাহিদের গেমিং পিসি সাজানো। ওই পাশটায় তাকালেই মনে হয় সে কোনো গেমিং এরিয়াতে প্রবেশ করেছে। সাহিদ সবকিছু অপরিষ্কার রাখলেও গেমিং পিসির আশপাশটা পরিষ্কার রাখে। তার সবচেয়ে পছন্দের জায়গা ঘরের এই কোণটাই।
সাহিদের ঘরে অন্যকারো আসা-যাওয়ার অনুমতি নেই। এলেও সাহিদের অনুমতি প্রয়োজন, খুব কমই অনুমতি দেয় সে। তবে সেই অনুমতির ধার ইসমাত ধারে না। সে অগোছালো জিনিসগুলা দেখল, ছেলেটা এই ঘরেও আলমারির সামনে কাপড়ের স্তূপ করে রেখেছে। ইসমাতের রাগ হলো বেশ। তবে সে ওসব ছুঁয়েও দেখল না। তার এত ঠ্যাকা পড়েছে নাকি এই অভদ্রের পূঙ্খানুপুঙ্খ সবকিছু তার নিজ হাতে গুছিয়ে দেওয়া লাগবে? অবশ্য সে সব না করলেও অগোছালো বিছানাটা গুছিয়ে দিয়ে চলে আসল। এই ঘরটা তারও হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তারা দুজনই সেপারেশন বেছে নিয়েছে।
ওদের রান্নাঘরটা বেশ বড়ো। ইন্টেরিয়রের আধুনিক কাজ এটাকে আরও সৌখিনতার ছোঁয়া দিয়েছে। এই এপার্টমেন্টটা অনেক বড়ো। কত বর্গফুটের তা আপাতত ইসমাতের মনে নেই। এটা বিয়ের উপহারস্বরূপ শ্বশুর দিয়েছেন। বড়ো বড়ো তিনটি বেডরুম, বাথরুম এটাচ করা, আলাদা লিভিংরুম.. কিচেন, ডাইনিং এরিয়া নিয়ে মোটামুটি বেশ বিস্তর। লিভিং রুমের সাথে একটা বড়ো বারান্দা আছে, এছাড়া আর কোনো রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দা নেই। তবে ফ্লোর টু সিলিং কাচের জানালা সব ঘরেই আছে।
রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ইসমাত দ্বিধায় পড়ে গেল। আজ গ্রোসারি নেই, গতকালকে সাহিদের সাথে বললেও ছেলেটা তার কথাকে গুরুত্ব দেয়নি। এখন ব্রেকফাস্ট বানাবে কি বানাবে না সেই নিয়ে দোটানায় পড়ল। বানাবেই বা কি? ঘরে তো তেমন কিছুই নেই। আছে শুধু ডিম আর পাউরুটি। কিছুক্ষণ ভাবনা-চিন্তার পর ভাবল নিজের জন্য একাই বানাবে। সাহিদেরটা নিজে বুঝে নিক।
কিন্তু এর মাঝে কল বেজে উঠল। ইসমাত ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই নড়েচড়ে উঠল। শাশুড়ি কল দিয়েছে। এই সময়টায় শাহেলার কল আতঙ্কের মতোই লাগে তার। সে কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারছে উনি কি বলবেন। যতই হোক, এটা টানা-হেঁচড়ার সংসার তার। ইসমাতকেই সব একপাক্ষিক সামলাতে হয়। তাদের প্রাণপ্রিয় ছেলেও ইসমাতের হাতেই। ইসমাত কল রিসিভ করে সালাম দিল। ওপাশ থেকে দূর্বল গলায় সালামের উত্তর এলো। ইসমাত চিন্তিত সুরে বলল,
--"তুমি ঠিক আছ আম্মু?"
ইসমাতকে 'আম্মু' আর 'তুমি' সম্বোধনে আনতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে শাহেলার। তবুও যেন মেয়ে এখনো ফর্মালিটি মেনে চলে। আপনের মতো মিশতে পারে না মেয়েটা। শাহেলা সেই হতাশা আড়াল করে বলল,
--"আছি তো ঠিক। আমার আবার কী হবে?"
কিন্তু ইসমাতের তা লাগল না। শাহেলা খুবই দূর্বল। গত বছর হার্টে রিং পরানো হয়েছে। বেশিরভাগ সময়ই তিনি অসুস্থ থাকেন। খাওয়া-দাওয়াতেও ওনার এখন অনেক বাছ-বিচার করতে হয়। ভাগ্যিস ও বাড়িতে যৌথ পরিবার থাকে, নয়তো শাহেলাকে একা ছাড়াটা ভয়েরই। এছাড়াও ওনার জন্য নির্ধারিত কাজের লোক, রান্নার শেফ সবই আছে। এত টাকা ইনকাম করে কি হবে যদি না মাহফুজ সাহেবের পরিবারই ভোগ করতে না পারে?
শাহেলার অসুস্থতার জন্যে ইসমাত সবসময় চেষ্টা করে ওনাকে কোনো প্রকার চাপ না দিতে। কিন্তু ভদ্রমহিলার চাপ কিংবা ভয় একজনকে ঘিরেই, তার একমাত্র ছেলে। ছেলের জন্য সব করতে পারার মতোন মা তিনি। হবে নাই বা কেন? কত দোয়ার ফল তাদের এই সন্তান।
--"আম্মু, মিথ্যে বলবে না।"
--"আচ্ছা ঠিক আছে, বলছি। একটু প্রেশারটা হাই। আমার ছেলে কোথায়? কল ধরছে না। ব্রেকফাস্ট করেছ?"
ইসমাত চুপসে গেল ব্রেকফাস্টের কথা শুনে। শাহেলা যদি জানতে পারেন তার ছেলের বউ ছেলেকে না খাইয়ে রাখার পরিকল্পনায় আছে, তবে আরেক কেলেঙ্কারি বাঁধবে। ইসমাত রয়েসয়ে বলল,
--"জিমে গেছে আম্মু। আর ব্রেকফাস্ট করিনি, সবে ডিম বের করলাম।"
--"কী বানাবে?"
--"টোস্ট। ঘরে আপাতত পাউরুটি আর ডিম আছে। বাজার করতে হবে।"
হয়ে গেল! ইসমাতের মনে হলো তার এই কথা বলাটাই ভুল হলো! শাহেলা হা-হুতাশ লাগিয়ে দিলেন। বাজার নেই কেন? ছেলে আর ছেলের বউমা কি খাবে? তার ছেলে কি খাবে? ছেলের তো খাওয়া-দাওয়ার এমনিতেই ঠিক নেই, ঠিক মতো ঘরে বসে খেতে না পারলে কীভাবে কি চলবে? এভাবে জীবন চলবে? ইত্যাদি।
ইসমাত এসব শুনে রাগ করল না, কখনোই করে না। বরং মা-হারা মেয়ে হয়ে মায়ের মমতা দেখতে তার মন্দ লাগে না। খুব ছোটোবেলায় মা-বাবাকে হারিয়েছিল তো, সামনা-সামনি এরকম অভিজ্ঞতা কখনো নেওয়া হয়নি। ভদ্রমহিলা মাঝেমধ্যে ছেলের জন্য স্বার্থপরতার আচরণ করেন অবশ্য, তবে এতেও ইসমাতের খুব একটা সমস্যা হয় না। সে এখন এই বাড়ির প্রতিটা মানুষকে হারে হারে চিনে গেছে। শুধু সাহিদ কখন কি করবে, এটাই একমাত্র মাঝেমধ্যে বুঝে উঠতে পারল না।
ভদ্রমহিলা তখনই আদেশ করলেন, লাঞ্চের আগে আগে যেন সাহিদকে নিয়ে ও বাড়ি চলে যাই। ওখান থেকেই নাহয় জুম্মার নামাজে যাবে। ইসমাত অবাক হলো। একবার ওই বাড়িতে ঢুকলে ডিনারের আগে ফেরার সুযোগ নেই। সে তো এদিকে ইফরাকে কথা দিয়েছে আজ সে দেখা করতে যাবে। মেয়েটা নিশ্চয়ই আশা করে থাকবে? ইসমাত কিছুটা আমতা আমতা করে বলল,
--"আন্টি, আজকে ভেবেছিলাম আমার বোনের শুটিং সেটে যাব।"
--"অন্যদিন যাবা, আজকে এখানেই আসো। আমার শরীরটাও তো ঠিক নেই। তোমাদের দেখলে ভালো লাগত।"
শাহেলার কথার ধাঁচে নরমের চেয়ে স্পষ্ট হুকুম টের পাওয়া গেল। এই হুকুমে গাইগুই করার কোনোপ্রকার সুযোগ রাখেননি তিনি। ইসমাত হতাশ হলো, দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সামনের চুলগুলো আবারও পেছনের দিকে সরিয়ে নিয়ে বলল,
--"ঠিক আছে আম্মু। যাব। তোমার ছেলে আসুক।"
--"হুঁ৷ যা রান্না করার করো। আমার ছেলেটা নিশ্চয়ই জিম থেকে ফিরে খাবার খুঁজবে। ছেলেটার যত্ন নিয়ো। তোমার হাতেই তো তুলে দিলাম আমার টুকরাটাকে।"
--"জি।"
শাশুড়ির সাথে কথা শেষ হতেই ইসমাত ইফরাকে টেক্সট দিল যে, আজ সে যেতে পারবে না। কেন যেতে পারবে না সেটাও জানিয়ে দিল। কিন্তু ইফরা অনলাইন নেই, নিশ্চয়ই সে শুটিং এ ব্যস্ত।
—————
আগে রাগ উঠলে সাহিদ ভাঙচুর করত, ঘরের দফারফা করত। কিন্তু এখন তার সেই ভাঙচুরের স্বভাবটা কমে এসেছে। এখন সে জিমে এসে পাঞ্চিং ব্যাগে উম্মাদের মতো একের পর এক ঘুষি বসায়। থামাথামির নাম থাকে না। নিঃসন্দেহে এই ব্যাগের বদলে মানুষ হলে তার হুদিশ পাওয়া যেত না। সাহিদ পুরোপুরি না হলেও একটু অন্তত রাগ ঝেড়ে দিতে পারে। কিন্তু এখানে সে প্রায়ই কল্পনা করে, মানুষ হলে কি এমন মন্দ হতো?
যখন সাহিদ উম্মাদনায় ব্যস্ত থাকে তখন তার আশপাশ কেউ ঘেঁষে না। কিন্তু আজ ঘেঁষল। তার প্রাণপ্রিয় বন্ধু সাব্বির। সে এসেই কাছাকাছি ট্রেডমিলে উঠে বলল,
--"কিরে, রাগ কমেনি?"
সাহিদ তার কাণ্ডে বিরতি টেনে সাব্বিরের দিকে তাকাল। ঘামে জর্জরিত সে, চুলগুলোও একদম ভিজে আছে ঘামে। ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলছে। একপাশে বসে ব্যাগ থেকে পানির বোতল নিয়ে ঢকঢক করে খেল। যেন সাব্বিরের প্রশ্নের উত্তর দিতে তার কোনো তাড়া নেই। সাব্বিরের রক্তিম চোখও সাহিদের চোখ এড়াল না।
--"এই রাগ আমার ইহজনমেও কমবে না।"
সাব্বির হাসল। বেশিক্ষণ ট্রেডমিলে না থেকে এবার বন্ধুর পাশে এসে বসল। সাহিদ দুই পায়ে কনুইয়ের ভার দিয়ে মেঝের দিকে একমনে তাকিয়ে আছে। এখনো অল্পস্বল্প হাঁপাচ্ছে। সেদিকেই নজর স্থির করে সাহিদ বলল,
--"গতকাল গিলে আজ আবার জিমে এসেছিস কেন?"
সাব্বির হো হো করে হেসে দিল। সাহিদ তবে ধরতে পেরেছে তার নেশা এখনো কাটেনি। অবশ্য সে ধরতে গেলে বাকিদের থেকে কমই খেয়েছে, ওরা তো এখনো বেহুঁশ হয়ে আকিবদের বাড়িতে পড়া। মেয়েরা অবশ্য নেই।
--"তুমি কি ভেবেছ মাম্মা, তুমি এক বোতল ভাঙবা আর আসবে না? আকিবের স্টকে আরও ছিল। দামিটা কালকে খেতে পারি নাই তো কি হয়েছে, এমন কত দিন আসবে।"
--"যে ধান্দায় এসেছিস সেটা বল।"
সাব্বির ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
--"তুই গতকাল চলে যাওয়ার পর জান্নাত অনেক কান্নাকাটি করেছিল।"
সাহিদ এতে বেশ বিরক্ত হলো।
--"সো হোয়াট? এসব গল্প শুনতে চেয়েছে কে?"
--"এমন করছিস কেন? মেয়েটাকে আর কত কষ্ট দিবি?"
সাহিদ সাব্বিরকে ফিরে দেখল না। আবারও পানিতে চুমুক দিতে দিতে বলল,
--"আই নেভার ফরগিভ লায়ার্স, ডুড!"
--"কিন্তু তোকে সত্যি ভালোবাসে।"
সাহিদ এবার গরম চোখে তাকাল।
--"ডাম্বেলটা হাতের কাছেই আছে। তুই ভালো করে জানিস তোকে মার্ডার করতে চাইলে আমাকে কেউ আটকাতে পারবে না।"
সাব্বির বলল,
--"তো ভুল কী বলেছি? তোকে আমি কতবার করে বলেছি যাকে বিয়ে করেছিস তাকে ডিভোর্সটা দিয়ে দে। এভাবে জীবন কাটানো যায়? এক বছর তো কাটালি, কিছু হয়েছে? ওই মহিলার থেকে জান্নাত হাজারগুণে ভালো। বেস্ট এভার!"
সাহিদ তাচ্ছিল্য করে বলল,
--"বেস্ট এভার? ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন, আমার ওয়াইফ কখনো ওর মতো মিথ্যে বলে না, কারো নামের ফায়দা তুলে সুযোগও খুঁজে না। আই হেইট শো-অফ গার্লস। আমি বিয়ে না করলেও জান্নাতকে কখনোই মাফ করতাম না। আর রইলো.."
সাহিদ থামল। ঘাড় বাঁকিয়ে সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
--"ডোণ্ট ডেয়ার টু স্যে দিস 'ডিভোর্স' ওয়ার্ড। ইট'স মাই অওন বিজনেস। বাই।"
সাহিদ যখন বাড়ি ফিরল, তখন ইসমাত ইতিমধ্যেই ব্রেকফাস্ট করতে বসে গেছে। ইসমাত দেখল, সাহিদের মন-মেজাজ যাওয়ার সময়ে যেমন ছিল এখন তেমনটা নেই। বিপদসংকেত টের পেয়ে ইসমাত নড়েচড়ে বসল, যেকোনো বিপদের জন্য প্রস্তুত রইল। সাহিদ শুরুতেই দেখল তেল চিটচিটে ডিম টোস্ট। এটা দেখে সাহিদের মেজাজ আরও বিগড়ে গেল।
--"আপনি কি টোস্ট বানাতে আদৌ জানেন? মনে তো হচ্ছে হাফ কেজি তেল এই প্লেটে। রাঁধতে না জানলে বানান কেন? আপনি জানেন না আমি তেল এভয়েড করি? আর কিছু ছিল না?"
ইসমাত গরম চোখে তাকিয়ে বলল,
--"না ছিল না। এটা খেয়ে উদ্ধার করো।"
--"নো ওয়ে। এসব ভেজাল সাহিদ খায় না। দেখলেই মনে হচ্ছে টেবিলটা উলটে দেই।"
--"অন্যের রাগ বাড়িতে এসে দেখানো বন্ধ করো! খেলে খাও নয়তো বসে থাকো। তোমার মায়ের আদেশ, ছেলেকে না খাইয়ে যেন ও বাড়ি না নেই।"
আরও বিরক্ত হলো সাহিদ,
--"আমার ইম্পোর্টেন্ট গেম আছে, ওবাড়ি যেতে পারব না।"
--"সেটা নিজের মাকে গিয়ে বলো।"
--"আপনি বলতে পারেন না?"
--"বলব তো। এই খাবার না খেলে আমি সোজা আম্মুকে কল দিব। বাকিটা উনি বুঝবেন।"
--"মমকে বলেন আর নয়তো ড্যাড, হু কেয়ার্স? বাট আমি এই তেল খাব না।"
সাহিদ প্লেটটা হাতে নিয়ে ফেলতে গেলে ইসমাত তৎক্ষণাৎ আটকাল।
--"খবরদার ফেলবে না। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আমি বানিয়েছি, আমি খাব। তুমি না খেলে আমার কি?"
সাহিদ রাগে ফুঁসছে। সে ইসমাতের দিকে খুবই শব্দ প্লেটটা ছুঁড়ে দিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল। প্লেটের খাবার অক্ষত আছে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল ইসমাত। সাহিদ এখানে সেখানে খাবার খুঁজল। কিন্তু তেমন কিছুই নেই। সাহিদ রান্নাঘর থেকে চেঁচাল,
--"ঘরে কী খাবার-দাবার কিছু নেই?"
--"এনে দিলে তো থাকবে। তুমি মহা ব্যস্ত মানুষ, গ্রোসারির কথা বললে তো নাক ফুলাও এমন যেন কোন রাজপুত্র! এনে খাও।"
সাহিদ দাঁতে দাঁত পিষল। অবশেষে দুটো পাউরুটির স্লাইস দেখে সেগুলাতে মাখন লাগিয়ে মুখে পুরতে পুরতে নিজের ঘরে চলে গেল। ইচ্ছে তো করছে তার পুরো ঘর জ্বালিয়ে দিতে। জীবনেও এটুকুতে পেট ভরবে না তার। এর মাঝে আবার ভেতর থেকে চেঁচাল সে, আলমারি এখনো কেন অগোছালো পড়ে আছে? ইসমাত সেসব শুনেও শুনল না। নিজের ঘর গুছিয়েছে বলে কি সাহিদেরটা গুছিয়ে দিবে নাকি? তার এত সময় নেই।
এর মাঝে কলিংবেল বাজল। দারোয়ান কিছু খাবার দিয়ে গেছে। ইসমাতই বলেছিল ব্রেকফাস্টের জন্য কিছু কিনে আনতে। সে আন্দাজ করেছিল সাহিদ এই খাবার দেখে মেজাজ খারাপ করতে পারে। তাই বুদ্ধি করে আগেই দারোয়ানকে জানিয়ে দিয়েছিল। ইসমাত সেই পলি নিয়ে সাহিদের ঘরে ঢুকে বিছানায় পলিটা রেখে বলল,
--"রাজপুত্রের ব্রেকফাস্ট এসেছে। এটা খেয়ে উদ্ধার করবেন। সাথে গ্রোসারি এবার তুমি আনবে। একা ঘর আমিই সামলাব তা হচ্ছে না। আর খবরদার যদি দেখেছি এই খাবার ডাস্টবিনে গেছে। নয়তো এর থেকেও বড়ো ডাস্টবিন করব তোমার ঘর।"
--"হুমকি দিচ্ছেন?"
--"হুমকি? প্লিজ, আমার এত সময় নেই। এগারোটায় বের হবো আমরা, দ্যাটস ইট।"
·
·
·
চলবে……………………………………………………