খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - পর্ব ১৮ - মুশফিকা রহমান মৈথি - ধারাবাহিক গল্প

খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - মুশফিকা রহমান মৈথি
          যখন বিপদ আসে, হয়তো একত্রে আসে। সৃষ্টিকর্তা আমাদের পরীক্ষা নেন। আমাদের ধৈর্য্যের পরীক্ষা। যে যত ধৈর্য্যশীল হবে, তার পক্ষে বিপদের সময়টাতে ততটা সহজ থাকা সম্ভব। যেমনটা আমার সাহেব। সাহেবকে দেখে বোঝার উপায় ছিলো না যে তার মাথায় কতগুলো চিন্তা। মেয়ে ছোট, বোন গর্ভবতী, মা অসুস্থ। সব কিছু মিলে একটা যাচ্ছে তাই অবস্থা। কিন্তু সাহেব অনড়। তিনি পরদিন থেকে প্রতিদিন সিভির ফাইল হাতে সকাল আটটায় বের হতেন নতুন চাকরির খোঁজে। ফিরতেন রাত আটটায়। তাকে দেখে আমাদের মনে একটু সাহস জন্মাতো। কিন্তু সেই সাহস পরমুহূর্তেই দমে যেত যখন রাতে শুকনো মুখে সাহেব ফিরতেন। তার শুকনো মুখটা দেখলে আমার বুকটা ভার হয়ে উঠতো। মানুষটা তার ভাবমূর্তির পরিবর্তন করতো না। প্রস্তরের মতো কঠিন একটা ভাব অক্ষত রেখে আমাকে বলতো,
 “গরম পানি দাও।“

সাহেবের চাকরি চলে যাওয়ায় আমাদের পরিবারের উপর এভারেস্ট সম বিপদ নেমে এসেছে। এভারেস্ট সম কারণ আমাদের পরিবারের আয়ক্ষম ব্যক্তি শুধুমাত্র সাহেব ছিলেন। মাহমুদ তখনও ল্যাফটেনেন্ট হয় নি। তার ট্রেনিং চলে চট্রগ্রামে। তাকে শুধু শাহনেওয়াজ সাহেবের মৃত্যুর সংবাদটি-ই জানানো হয়েছিলো। বাকি কোনো কুৎসিত ঘটনা সাহেব তাকে চিঠিতে জানান নি যেন, সেই কুৎসিত ঘটনাগুলো মাহমুদের জীবনে কোনো প্রভাব না ফেলে। প্রথম একমাস সাহেবের জমানো টাকা দিয়ে কোনো মতে চালিয়েছিলাম। পরের মাস থেকে অভাব এসে দাঁড়ালো আমার ঘরে। জমিজমা কিছু ছিলো অবশ্য কিন্তু সেগুলো বিক্রি করলেন না সাহেব। তার কথা, 
 “আমি পঙ্গু হয়ে গেছি নাকি যে জমি বিক্রি করে আমাকে খেতে হবে?”

প্রতিদিন তিনি পকেটে বিশটাকা নিয়ে বের হতেন চাকরির খোঁজে। চাকরি গুলো হতে যেয়েও হতো না যখন তারা জানতে পারতেন আগের চাকরিটা কেন চলে গেছে। রাতের বেলা শুকনো মুখে তিনি বাড়ি ফিরতেন। ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে ঘরে চলে যেতেন। রাতে যখন মাঝে মাঝে আমার ঘুম ভাঙতো আমি দেখতাম সাহেব পায়চারী করছেন। তবুও আশাহত হতেন না। অভাব যখন চরমে তখন আমি জরিনা আপাকে ছেড়ে দিতে চাইলাম। কারণ তার বেতনের টাকায় মিষ্টি আপুর ডাক্তারের খরচ হয়ে যাবে। জরিনা আপাকে যখন কথাটা বললাম, তিনি চেতে বললেন,
 “এই মাতারী, তোমার টাকায় কি আমি বড়লোক হয়ে যাব? লাগতো না এই টাকা।“

তিনি কাজ ছাড়লেন না। আমি অসহায়ের মত বললাম,
 “তুমি বিনা বেতনে চাকরি করবা?”
 “তোমার খাইস্টা জামাই চাকরি পাইলে বাকিগুলো নিয়া নিমু। এতো চিন্তা করন লাগতো না”

বললেই কি হয় চিন্তা করা লাগবে না। চিন্তাগুলো এমনি এমনি চলে আসে। বিয়ের পর থেকে যে বাড়িতে আমি মাছ বা মাংস ছাড়া কোনো রান্না দেখি নি, সেই বাড়িতে এখন মাছ আনা হয় সপ্তাহে একদিন। মাংস আনা হয় মাসে একদিন। সাহেবের নির্লিপ্ততাও একদিন ভেঙ্গে গেলো যখন খেতে বসে আমার মেয়ে বায়না ধরলো সে মুরগী আর পোলাও খাবে। তার সবচেয়ে প্রিয় খাবার সেটা। পাশের বাড়ির ছোট মেয়েটার জন্মদিন ছিলো আগের দিন। সেখান থেকে কৃপার জন্য খাবার এসেছিলো। সেজন্য কৃপা পরদিনও খাওয়ার সময় বললো,
 “মুগগী খাব। ইতা খাব না।“

 সাহেব কিছুসময় স্থির চোখে মেয়ের দিকে চেয়ে রইলেন। তার চোখে আমি অসহায়ত্ব দেখলাম। এক লুকানো ব্যথা ফুঁটে উঠলো। সাহেব কোনোমতে খেয়ে উঠে গেলেন। আমি তার জন্য চা বানিয়ে ঘরে গিয়ে দেখলাম তিনি নেই। তাকে পেলাম ছাঁদে। এক কোনায় নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছেন। আকাশের দিকে মুখ করে ছিলেন বলে আমাকে খেয়াল করলেন না। আমি তার পাশে দাঁড়ালাম। তার মুখের দিকে চাইতেই আঁতকে উঠলাম। সাহেবের মুখখানা ভীষণ মলিন। চোখজোড়া বিষন্ন। ব্যর্থতা সেই দৃষ্টি থেকে চুয়ে চুয়ে পড়ছে। আমার মনে হলো এই মানুষটাকে ছুঁলেই তিনি ভেঙ্গে গুড়িয়ে যাবেন। আমি সেই প্রথমবার এতো ভঙ্গুর দেখেছিলাম। তার কাঁধে হাত রাখতেই তিনি কাতর স্বরে বললেন,
 “আমার পকেটে পাঁচ টাকা আছে কানন, আমার মেয়েটা মুরগী খেতে চায়। অথচ আমি কি দূর্ভাগ্য বাপ ওকে কিনা খাওয়াতে পারছি না।“

আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম সাথে সাথে। আমার কঠিন সাহেবকে ভেঙ্গে যেতে দেওয়া অন্যায় হবে। আমার বুকটা খামচি মেরে উঠলো। মনে হলো তিনি ভেঙ্গে গেলে আমরা চারটা প্রাণী ভেসে যাব। আমি তার পিঠে হাত বুলিয়ে বললাম, 
 “আপনি চিন্তা করবেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে দেখবেন! আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছেন আল্লাহ তা'আলা। সব ঠিক হয়ে যাবে।"
"আমি কি খুব লোভী মানুষ, কানন! আমার চাহিদা কি খুব অতিরিক্ত! তাই আল্লাহ আমার উপর বেরাজ? আমি তো শুধু আমার পরিবারকে নিয়ে সুখে থাকতে চাই। এই চাহিদাটা কি খুব বেশি?"

আমার ঘাড়ে গরম তরলের অস্তিত্ব অনুভূত হলো। আমি তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখলাম। তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলাম। মনে হলো আমি একটা বাচ্চাকে জড়িয়ে রেখেছি। তার অশ্রু আমার কাঁধ ভিজিয়ে দিচ্ছিলো। আমি আকুল স্বরে বললাম, 
 “আল্লাহ তার বান্দাদের কখনো ফেলে দেন না। আমাদের ধৈর্য্য ধরতে হবে এটুকুই। কঠিন সময়টা কেঁটে যাবে। আর কদিন মাত্র। আর আপনি খুব ভালো বাবা। আপনার মত বাবা, স্বামী, ছেলে, ভাই পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আমরা ভাগ্যবান। কখনো নিজেকে ব্যর্থ ভাববেন না। আপনি আছেন বলেই আমরা এতোটা নিশ্চিন্ত জীবন কাটাচ্ছি। আপনি ভেঙ্গে পড়লে আমাদের কি অবস্থা হবে বলুন তো? এই সময়টা কেঁটে যাবে। রাতের পরই দিন আসে। আমাদের সুদিনও আবার ফিরে আসবে।“

সাহেব আমাকে জড়িয়ে ধরে রইলেন অনেক সময়। তার অশ্রুগুলো এতো ভারী মনে হলো। আমার কঠিন সাহেবের সেই জীর্ণ, ভঙ্গুর অবস্থাটার কথা আমি কখনোই ভুলতে পারি না। সেটাই প্রথম এবং সেটাই শেষ। সেই বিকেলেই সাহেব আমার সামনে প্রথম এবং শেষবারের মতো কেঁদেছিলেন। 

মাহমুদ ল্যাফটেনেন্ট হবার পর প্রতিমাসে সে এক অংশ টাকা পাঠাতো। সাহেবের কড়া নির্দেশ ছিলো যেন এই টাকাটা শুধু মা এবং মিষ্টির জন্যই ব্যবহৃত হয়। আমি বুঝেছিলাম কেন! যে মানুষটি এতোকাল বটবৃক্ষের মতো সব সামলে এবং আগলে এসেছেন, রক্ত পানি করে তাদের প্রয়োজন মিটিয়েছেন সে কি করে তার ছোটভাইয়ের টাকা খাবে? তার নিজের মধ্যে একটা হীনমন্যতা কাজ করতো। লজ্জাও পেতেন কিঞ্চিত। মা মাহমুদকে তার চাকরি চলে যাবার কথা জানানোতে খুব রেগেও গিয়েছিলেন। 

সাহেবের যুদ্ধ তখনও চলমান। এরমধ্যে আমি একটা টিউশন পেলাম। ছোট একটা মেয়েকে ড্রয়িং শেখাতে হবে। মাসে আমাকে একশ টাকা দেওয়া হবে। ড্রয়িং এর জন্য একশ টাকা তখন অনেক। সামনে কৃপার জন্মদিন আমি খুশিমনে রাজী হয়ে গেলাম। সাহেবকে জানাতেই তিনি শুধু “হু” বললেন। 

মিষ্টি আপুর তখন পাঁচ মাস চলে। শাহনেওয়াজ সাহেবের মৃত্যুর শোক তার জীবন থেকে তখনও কাটে নি। তবুও বেঁচে থাকা কারণ বাচ্চাটি যা শাহনেওয়াজ সাহেবের শেষ স্মৃতি এবং মিষ্টি আপুর শেষ সম্বল। মা প্রতিদিন বাহিরের দরজার কাছে বসে রইতেন একটা সুখবরের আশায়। কিন্তু সেই সুখবরটা এলো না তিনমাস ধরে। এই তিনটা মাস ঠিক কি করে চালিয়েছি সেটা কেবল আমি এবং সাহেব জানি। সাহেবের জমানো টাকাগুলো সব শেষের পথে। দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম পায়চারি করতেন সাহেব। আমি রাতে মাঝে মাঝে তাকে টেনে এনে শোয়াতাম। বুকে মাথা রেখে বললাম,
 “ঠিক হয়ে যাবে। দেখবেন কালকেই একটা চাকরি হয়ে যাবে।“

আমার জোড়াতালির সংসারে হঠাৎ আল্লাহ এক ফেরেস্তাকে পাঠালেন। আমাদের সামনের বাসার নতুন ভাড়াটে দীতি আপা। দীতি আপা চাকরি করতেন একটা বড় অফিসে। তিনি এক বিকেলে এসে আমাকে এবং মিষ্টি আপুকে অনুরোধ করলেন,
 “আমার কাল অফিসে খুব বড় অনুষ্ঠান। বিশ জনের রান্না। মিষ্টির রান্না তো এলাকায় খুব প্রচলিত। জানি তোমার শরীরের অবস্থা ভালো নেই। কিন্তু আমার যে তোমার সাহায্যের খুব প্রয়োজন। বাজারের খরচ আমার আর রান্না বাবদ তোমাকে আমি পাঁচশ দিব।“

মিষ্টি আপু আমার দিকে চাইলেন। আমার তার হাত চেপে বললাম, 
 “আমি আর জরিনা আপু আছি। তুমি হ্যা বলে দাও।“

মিষ্টি আপু হ্যা বলে দিলেন। ব্যাস আমরা তিনজন মিলে রান্না করলাম সেই বিশজনের রান্না। প্রথমে হিমসিম খেলেও আমরা ঠিক একটার মধ্যে তাদের টিফিন পৌছে দিলাম। রান্নার বেশ প্রশংসা হলো। মিষ্টি আপুর রান্নার টাকা তো থেকেই গেলো, উপর থেকে সেই বাজারে আমাদের তিনদিন চলে গেলো। বাসায় ফিরে যখন সাহেব দেখলেন এলাহি আয়োজন। তিনি শুধালেন,
 “আমি তো পুইশাঁক আর কার্প মাছ কিনে দিয়েছিলাম। এগুলো কোথা থেকে এলো?”

আমি তাকে সব বললাম। তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। রাতে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। কিন্তু সেটা যখন-ই সাহেবকে বলতে গেলাম দেখলাম তিনি ঘুমিয়ে কাঁদা। অবশ্য সেই সকালে বের হন। সারাদিন চাকরির জন্য হন্ন্যে হয়ে ঘুরেন। ক্লান্ত হওয়াই স্বাভাবিক। তবে আমার মাথায় যে বুদ্ধি এল তা আমি কিছুতেই দমাতে পারলাম না। 

পরদিন মা এবং মিষ্টি আপুকে আমার নতুন ব্যবসার বুদ্ধিটা জানালাম। আমরা ক্যাটেরিং বিজনেস করবো। অফিস টু অফিস খাবার দিব। রোজের খাবারের দাম হবে বিশ টাকা। মেন্যুর উপরে সেই দাম। যে যেমন মেন্যু খাবে তার দাম তেমন। মিষ্টি আপু চিন্তিত স্বরে বললেন,
 “এতো টাকা দিয়ে কি আমাদের থেকে কেউ খাবার কিনবে? মাসে ছয়শ টাকা?”
 “চেষ্টা করেই দেখি না”
 “টাকা লাগবে না? ব্যবসা বললেই কি শুরু হয়?”
 “টাকাটা না হয় আমি ব্যবস্থা করবো।“
 “আর কাস্টোমার? কাকে বিক্রি করবে?” 
“এক কাজ করি, অফিসে অফিসে যেয়ে খোঁজ নেই?”
 “কি বলছো? এটা কি সম্ভব?”
 
আমি বিনয়ের স্বরে অনুরোধ করলাম,
 “একটু চেষ্টা করেই দেখি না?”

মিষ্টি আপু যেন একটু নরম হলেন। প্রথমে দীতি আপুকে জানালাম আমাদের বুদ্ধির কথা। তিনি হাসিমুখে বললেন,
 “এমনটা হলে তো খুব ভালো হয়। দাঁড়াও আমার অফিসে আমি জানাচ্ছি।“

দীতি আপুই প্রথমে আমাদের কাস্টোমার এনে দিলেন। তার অফিসে চারজন দূর থেকে আসেন। তাদের সকালবেলা লাঞ্চ আনা হত না। ফলে তাদের দিয়েই আমরা আমাদের যাত্রা শুরু করলাম। আর আমাদের মূলধন দিলেন আমার বাবা। বাবার পেনশনের এক অংশ টাকা আমাকে দিলেন তিনি। তাই দিয়ে আমরা টিফিন ক্যারিয়ার কিনলাম। সাহেব তখনও জানেন না। তিনি জানলেন তৃতীয় দিন। আমি আর মিষ্টি আপু সেদিন টিফিন দিতে দীতি আপুর অফিসে গিয়েছিলাম। আসার পথে আরেকটা অফিস বিল্ডিং এ ঢুকলাম। যদি আর কয়েকটা কাস্টোমার হয় তাহলে আমাদের ব্যবসাটা পুরোদমে শুরু হয়ে যাবে। আমার বিকালের টিউশন বেড়েছে। মোট পাঁচজনকে ড্রয়িং শেখাই। মোট পাঁচশত টাকা মাসে পাই। সেখানে এই ব্যবসা থেকে বেশি কিছু আসলে আমাদের অভাব শেষ হয়ে যাবে। সেই অফিসেই আমাদের সাহেবের সাথে দেখা। সাহেব সেখানে ইন্টারভিউ দিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের দেখেই সরু চোখে তাকিয়ে শুধালেন,
 “এখানে কেন?”

আমি শুকনো ঢোক গিলে বললাম,
 “কাজে এসেছি।“
“কি কাজ?”

আমি তাকে সব খুলে বলতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। কঠিন তীক্ষ্ণ চোখে আমার দিকে তিনি চেয়ে ছিলেন। সেই ভয়ংকর সিংহের মতো চাহনী। এখনই শিকারকে চিরে ফালাফালা করে দিবেন। মিষ্টি আপু আমার বাহু ধরে ভয়ে শিটিয়ে গেলেন। আমার ভয় লাগলো না। তিনি কঠিন স্বরে বললেন,
 “চল বাসায়।“

বাসায় এসে যে সাহেব ফেঁটে পড়বেন আমি আন্দাজ করেছিলাম। এবং তার অন্যথা হল না। তিনি চিৎকার করে উঠলেন,
 “আমি কি তোমাদের তিন বেলার খাবারের ব্যবস্থা করছি না? তাহলে আমার ঘরের মেয়েরা বাহিরে যাবে কেন? মানছি আমার চাকরি নেই, কিন্তু আমি তো অভুক্ত রাখি নি তোমাদের!”
 “কে বলেছে আমরা অভুক্ত বলে পথে নেমেছি? পথে তো নামি নি। একটা ব্যবসা করতে চাইছি।“
 “আমি কি এতটা অপারগ?”
 “আপনি অপারগ সেটা কখন বললাম? কিন্তু আপনার সহযোগী হওয়াটা তো অন্যায় না। আমরা শুধু আপনার এই চিন্তাটা ভাগ করে নিতে চাই, যেন রাতে আপনি ঘুমাতে পারেন। একটা কথা শুনে রাখুন, আমরা কেউ আপনাকে ছোট করার জন্য এই ব্যবসাটা করছি না। এই পরিবারটার দায়ভার শুধু একা আপনার নয়। এটা আমাদের সবার পরিবার। আমাদের নিজেদেরও লজ্জা লাগে যখন রাতের বেলা আপনি শুকনো মুখে ফিরেন। দু লোকমা খেয়ে উঠে যান যেন পাতিলে ভাতের অভাব না পড়ে। হেটে হেটে এক অফিস থেকে আরেক অফিস ছুটেন যেন একটা চাকরি হয়। রাতে ঘুম হয় না আপনার, ভাবেন আগামীকাল কি খাওয়াবেন আমাদের। আমাদের আপনাকে এভাবে দেখতে ভালো লাগে না। তাই যদি আমার টিউশন পড়ানো আর এই রান্নার ব্যবসায় কিছু উপার্জন হয় আর আপনি একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন তাহলে ক্ষতি কি? আমাদের উদ্দেশ্য আপনাকে নিচু করা নয়।“
 “হ্যা, এজন্য আমার শ্বশুরের থেকে তুমি টাকা নিয়েছো? এটা আমাকে নিচু করা নয়?”
“আমি ধার এনেছি। লাভ হলে মুনাফা সহ চুকিয়ে দিব। সেটা আপনার চিন্তা করতে হবে না। আমি মনে করি না এতে আপনাকে অসম্মান করা হয়েছে। আমার বাবার একমাত্র মেয়ে আমি। সুতরাং তার থেকে ধার আনা আপনাকে অসম্মান করা নয়।“
 
সাহেবের কপালের ভাঁজ মিলিয়ে গেলো না। দৃষ্টি নরম হলো না। বরং রাগে গজগজ করতে করতে তিনি বললেন,
 “হ্যা, এখন সবার মাথার শিং গজিয়েছে। সবাই বোঝা শুরু করেছে। আমার কি প্রয়োজন? আমি তো একটা বেকার, ব্যর্থ মানুষ! যতসব।“

সাহেবের উৎকুণ্ঠার কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম। তিনি আমাদের উপর রেগে ছিলেন না। তিনি আসলে নিজের উপর রেগেছিলেন। সেদিন আমি আমার সাহেবকে পড়তে পারছিলাম। 

রাতে তিনি খেলেন না। বিদ্যুৎ নেই। আমি একটা মোম নিয়ে ছাঁদে গেলাম। তীক্ষ্ণ, ঝাঁঝালো বিড়ির গন্ধ। সাহেব বিড়ি খান ভেবে অভাব হলাম। মোমটা রাখলাম কর্ণিশে। বাতাস তখন নেই। আকাশটা মেঘহীন। আমি খুব নরম স্বরে বললাম,
 “কেন এতো রাগ করছেন বলুন তো? নিজেকে দোষ দেওয়া বন্ধ কবে করবেন?”
 “ঘরে যাও গ্যাদা, ভালো লাগছে না আমার।“
 “জানি, নিজের উপর আপনি বিরক্ত। এতোটা যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও চাকরিটা হচ্ছে না। হয় তারা ঘুষ চাচ্ছে নয় তারা আপনার জেলে যাওয়ার কথা শুনে পিছিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখানে আপনার দোষ নেই।“
 “আমার চাকরি থাকলে আজ আমার বউ আর বোনকে এই ভরদুপুরে কোনো অফিসে হকারি করতে হতো না”
 “কে বলেছে আমরা হকারি করছিলাম। শুধু গিয়েছিলাম আমাদের ব্যবসার কথা জানাতে। কাস্টোমার না জানলে ব্যবসা বাড়বে কি করে?” 
 
সাহেব চুপ করে রইলেন। আমি তার বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে বললাম,
 “জানেন মিষ্টি আপু এই কদিন একবারও কাঁদে নি। এই অবস্থায় সে রান্নাঘরের মোড়ায় বসে আমাকে আর জরিনা আপাকে দেখিয়ে দিচ্ছিলো রান্নাটা কি করে করতে হয়। তার চোখমুখ চকচক করছিলো। এই আয়টা তার নিজের। সে এই কাজগুলো করতে খুব ভালোবাসে। আর সে আপনাকেও খুব ভালোবাসে। আপনার এই অবস্থার জন্য বারবার নিজেকে দোষ দেয়, আপনার চাকরি চলে যাওয়ার জন্য নাকি সে দোষী। এই অবস্থায় এমন আফসোস করাটা কি ঠিক? সে যদি আপনাকে সাহায্য করে একটু স্বস্তি পায় ক্ষতি কি বলুন? আর যে ভাইবোনের জন্য আপনি এতো কিছু করেছেন আজ সেই ভাইবোন আপনার ঢাল হচ্ছে, সেটা কি মন্দ। আমার তো মনে হয় আপনার আনন্দিত হওয়া উচিত। কারণ কজন ভাইবোন আছে যে নিজের কথা না ভেবে ভাইয়ের কথা ভাবে? জানেন মাহমুদ কি বলেছে? মাহমুদ বলেছে সে এখন থেকে পুরো বেতনটা পাঠিয়ে দিবে। তাও আপনাকে চিন্তা করতে মানা করেছে। আমরা শুধু চাই আপনি ভালো থাকুন। যেমন আপনি চান আমরা ভালো থাকি। চাওয়া পাওয়াটা দুপক্ষেই মধ্যেই হোক না। একা একা আর কত ভার বইবেন? এই বিপদটা একটু মিলেমিশেই পার করি? শুনেছি বাবার অসুস্থতার সময় আপনি একা সব করেছেন। তখন আপনার পাশে কেউ ছিলো না। এখন তো তেমনটা না। আমরা সবাই আছি। তাহলে কেন নিজেকে এতো চাপ দিচ্ছেন। নিজেকে দেখেছেন? আমার হাট্টাগাট্টা সাহেব একদম শুকনো পাটকাঠির মত হয়ে গেছে। আমার সত্যি ভালো লাগে না আপনাকে এমন দেখতে!”

আমার কথার একটা উত্তরও দিলেন না সাহেব। আমি ফোঁশ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এই নীরবতা কাঁটার মতো লাগছে। যেই চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াবো, অমনি আমার হাত টেনে ধরলেন সাহেব। বললেন,
 “জ্ঞান ঝাড়া শেষ হলে এখন কৃপা করে চুপটি করে আমার কাছে দাঁড়িয়ে থাকলে ভালো হয়।“

—————

সাহেব আর আপত্তি করলেন না আমাদের ব্যবসায়। আমাদের কাস্টোমারও বাড়লো। চারজন থেকে দশজন। একটা চুক্তি হলো আমার আর মিষ্টি আপুর মধ্যে। যদিও আমাদের ইচ্ছে ছিলো না। তবুও সাহেব করালেন। রুক্ষ্ণ স্বরে বললেন,
 “আমি চাই না আমার বোন আর বউয়ের মধ্যে টাকার জন্য চুলোচুলি হোক। আমার শ্বশুরের টাকা ফেরত দেওয়ার পর যা আয় হবে, খরচ বাদ দিয়ে তা দু ভাগে বন্টন করা হবে।“

মজার কথা জানেন তো, আমাদের ব্যবসাটা এখনো আছে। নাম “কানন-মিষ্টি অন্নভান্ডার”—এখন আমরা রান্না করি না। আমাদের অনেক স্টাফ। মতিঝিলের পুরো চেইন আমাদের। ওখানে বড় বড় অনেক অফিসে আমরা খাবার দেই। এখনো আমাদের চুক্তি চলছে। 
—————

আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা প্রায় শেষের পথে নিয়ে এলেন। সন্ধ্যা তখন হবে হবে। আযান শেষ। আমার ছাত্রছাত্রীরা সব চলে গেছে। নামায পড়ে আমি চা বানাতে গেলাম রান্নাঘরে। ঠিক তখন ই কলিংবেল বাজলো। আমি খুলতেই দেখলাম সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন বিশাল ইলিশ হাতে। ইলিশের দাম চড়া। এতো টাকা তিনি কোথায় পেলেন। তখন ইলিশের সিজনও না। আমি হতবাক মুখে তার দিকে তাকাতেই তিনি মিষ্টি হেসে বললেন,
 “চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি পেয়ারা শুনছো?”

আমি স্তব্ধ চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আনন্দগুলো অশ্রুরুপে ঠাঁয় পেলো আমার চোখে। এতোটা আনন্দিত বোধ হয় কৃপাকে প্রথম কোলে নেবার পরই হয়েছিলাম। সেদিন আমাদের পরিবারে খুশির বন্যা বয়ে গিয়েছিলো। মা খুশিতে কেঁদে দিয়েছিলেন। রাতে বেশ জম্পেশ খাওয়া দাওয়া হয়েছিলো। সরষে ইলিশ রেঁধেছিলাম। খাওয়ার পর সব গুছিয়ে ঘরে এসে দেখলাম কৃপাকে মায়ের ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছেন সাহেব। আমি কারণ জিজ্ঞেস করতেই তিনি আমার খোঁপায় প্রথম বারের মত একটা গোলাপ গুঁজে বলেছিলেন,
 “কৃপা করে আমার গ্যাদা পেয়ারাটাকে কিছু সময়ের জন্য ধার দেওয়া যায়?”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp