--"মিস ইসমাতের মতিগতি তো ভালো দেখছি না। দেখলাম বসের সাথে খুব খাতির। বসের একটা ছেলেও আছে, ভার্সিটি পড়ুয়া হবে হয়তো। সেই ছেলের সাথেও কতদিন দেখলাম ঘুরে বেড়ায়। আন্টিজির মনে কি চলছে বল তো?"
সোহানের কথায় ব্যাগড়া দিয়ে স্বপ্না নামের আরেকজন কলিগ কটাক্ষ করে বলল,
--"আন্টিজি বলছ কেন? সেদিনও তো দেখলাম মিস ইসমাতের আশেপাশে ঘুরছ, জেলাস নাকি?"
আরমান হো হো করে হেসে দিয়ে বলল,
--"আমি শিওর রিজেক্ট খেয়েছে। এজন্যই এসেছে আমাদের কাছে বদনাম করতে। ত্রিশ ছুঁইছুঁই মহিলার সাথে ভার্সিটির ছেলে? নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে।"
সোহানের মুখ ভার হয়ে এলো মুহূর্তেই। একটা মেইল ইগো কাজ করছে তার মধ্যে খুব। এই মেইল ইগোর চক্করে সে অন্ধ হয়ে আছে। সে বড়ো আশা নিয়ে ইসমাতকে প্রপোজ করেছিল, কিন্তু এই মেয়ে কোনোপ্রকার দয়া-মায়া না দেখিয়ে মুখের ওপর রিজেক্ট করে দিয়েছে। এটা তার ইগো হার্ট করেছে। কতবার কতভাবে ইসমাতের ক্ষতির চিন্তাও করেছে সে, কিন্তু সেই সাহস তার নেই। তাই তো শেষমেষ গুজবের পথই বেছে নিতে হলো। মুখে হাসি ফুটিয়ে খুবই নিখুঁত অভিনয়ের সাথে বলল,
--"আন্টিজির বড়লোক পুঁচকে ছেলে লাগবে যে আরমান ভাই। তার কি আর আমার মতো মার্কেটিং পোস্টের পঁয়ত্রিশ বয়সীতে হবে?"
সোহান খুবই নেতিবাচক এক ইঙ্গিত দিল, যা স্বপ্নার শুনে ঘিন লাগার কথা। একটা মেয়ে হয়ে নিশ্চয়ই আরেকটা মেয়ের নামে এসব শুনতে বাজে লাগবে তার। কিন্তু স্বপ্নার মাঝে সে রকম কিছুই দেখা গেল না। বোঝাই যাচ্ছে, ইসমাতের প্রতি তার নিজস্ব ঈর্ষাও কম নয়। সে সোহানকে উলটো উসকে দিয়ে অবাক হয়ে বলল,
--"কী বলছ? আমি তো শুনেছি বসের ছেলে এখনো ভার্সিটি পঁড়ুয়া.. তার সাথে? ছি ছি ছি! আমার তো ভাবলেই কেমন গা গুলাচ্ছে।"
আরমানও অবিশ্বাস্য চোখেই তাকিয়ে রইলো। সোহান বলল,
--"তাহলে ভেবে দেখো, যখন আমি দেখেছিলাম তখন কেমন লেগেছে। মিস ইসমাত আসলে যতটা স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড আর সাইলেন্ট থাকার চেষ্টা করে ততটা ভালো মানুষও নয়। মা বলতেন যারা চুপচাপ থাকে বেশি এদের মধ্যে ঘাপলাও থাকে বেশি। আজ সত্যি হলো।"
তাদের মাঝের আবির নামের আরেকজন কলিগ বলল,
--"তাই তো বলি, বসের সাথে এনার এত মিল-মোহাব্বত কেন। ভালো পোস্টেও আছে ইসমাত। এমন কি বড়ো মিটিং গুলোতেও ইনভেস্টরদের সামনে মিস ইসমাতকে রাখা হয়, তার বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। মানে আমরা এত বছর চাকরি করছি আর এই বছর দুয়েকে আসা মেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল! আমাদের পরিশ্রমের কোনো দাম নাই? নিশ্চয়ই স্বজনপ্রীতি করেছে।"
স্বপ্না বলল,
--"স্বজনপ্রীতি তো নিশ্চয়ই। এমনও হতে পারে যে ওই ছেলের সাথে.. ছি ছি! তওবা, আল্লাহ মাফ করুক। এই মহিলাকে ভালো ভেবেছিলাম, শেষমেষ কিনা গোল্ড ডিগার বের হলো, তাও নাকি ছোটো ভাইয়ের বয়সী.. ছিহ! আমার তো রূচিতেও বাঁধছে ।"
আরেক কলিগ তন্নি এসে বলল,
--"কাকে ছি ছি করছ? ছেলে তো দেখতে দারুণ। হট, হ্যান্ডসাম। আমি তো আফসোস করতাম এই ছেলে আমার থেকে ছোটো কেন? মিনিমাম আমার থেকে দুই-তিন বছর ছোটো তো হবেই, আমারই হবে সাতাশ। কিন্তু এদিকে যে ইসমাত আপায় গুটি এত চালাকির সাথে গিলে নিবে কে জানত? তার তো একদম লাইফ স্যাটেল! শুনেছি ওই ছেলে বসের একমাত্র উত্তরাধিকারী।"
অফিস আওয়ার প্রায় শেষ, কাজের বিশেষ চাপ নেই। তাই তো কিছু মাথা একজোট হয়েছে রমরমা পরচর্চায়। তাদের সবার চক্ষুশূল 'ইসমাত শানজে'। যাকে এই দল ঠিক সহ্য করতে পারে না। এই অবধি কত ধরণের গুজব যে এসেছে, তবে কোনোটাই আজকের মতো করে খুব একটা জমেনি। ইসমাত তাদের থেকে দূরের এক কাচের কেবিনে বন্দী হয়ে কী-বোর্ডে আঙুল চালাতে ব্যস্ত। ঊনত্রিশ বছর বয়সী যুবতীর চোখে রিমলেস ক্যাট আই চশমা, মনোযোগ তার মনিটরে স্থির। চশমার ফাঁকফোকরে দেখা যাচ্ছে চোখের নিচের কালচে দাগ। মুখ জুড়ে কাঠিন্যের পাশাপাশি একরাশ ক্লান্তি। তার মনোযোগের ব্যঘাত ঘটাল তারই এক কলিগ, সারাহ।
--"এখনো কাজ করছ? অফিস আওয়ার তো শেষ।"
ইসমাত নজর ওঠাল।
--"হ্যাঁ, শেষ একটা কাজ ছিল ওটারই এন্ডিং টানার ছিল। তুমি যাচ্ছ না?"
সারাহ সেই ব্যাপারে কিছু বলল না। হঠাৎ থেমে গিয়ে মিনমিন করে বলল,
--"ওরা আবারও তোমাকে নিয়ে বাজে বকছে। আজ তো মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের সোহান লিমিটক্রস করে ফেলেছে। তোমার নাকি বসের ছেলের সাথে এফফেয়ার আছে। দ্যে মিনস.. ঘনিষ্ঠতা। তুমি কেন কিছু বলো না ইসমাত? এরা তো অলরেডি মাথায় চড়ে বসেছে।"
সারাহ'র সাথে ইসমাতের ভালো সখ্যতা। অন্যান্যদের সাথেও ইসমাত আন্তরিক থাকার চেষ্টা করলেও তার জমেছে সারাহ'র সাথেই। ওরা কাছাকাছি বয়সী, শুধু কয়েক মাস এদিক ওদিক। সারাহ সাধারণ কর্মজীবি, বাকিদের সাথে ডেস্কেই বসে। ইসমাত সব শুনে নীরব রইলো, যা সে প্রতিবারই থাকে।
ইসমাতের নজর তার মনিটর থেকে সরল না। নীরব ঘরটাতে কী-বোর্ডের শব্দই শুধু শোনা যাচ্ছে। সারাহ অপেক্ষায় দাঁড়ানো, ইসমাত কিছু তো বলুক। তার অপেক্ষা দীর্ঘ হলো না। ইসমাত যথেষ্ট স্পষ্ট ভাষায় বলল,
--"ওদের মুখ আছে, বলতে দাও সারাহ। এখানে আসি নিজের কাজ করতে, মাস শেষে এর জন্য স্যালারিও পাই। ওদের যদি আরেকজনের পেছনে বিনা বেতনে সময় খরচ করার ইচ্ছে থাকে, আমি কী করে আটকাই বলো? লেট দেম টক।"
সারাহ আবারও হতাশ হলো। ইসমাত সেই হতাশা দেখল না। সে নিজের প্রফেশনালিজম মেইনটেইন করল। সারাহ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
--"থাকো তবে, আমি যাই। আমার বাচ্চা বাসায় আমার অপেক্ষা করছে। কল করেছিল।"
--"হু, হু। বাই!" ইসমাতের ব্যস্ত গলা।
সারাহ যেই কেবিন থেকে বেরুলো ওমনি ইসমাত নজর তুলল। তার মিথ্যে ব্যস্ততা ফেলে সে আরামদায়ক চেয়ারে পিঠ মেশালো। সেভাবেই ছোটো ছোটো চোখে কেবিন থেকে দেখল অদূরে, কিছু মাথা তখনো পরচর্চায় ব্যস্ত। কিছুক্ষণ আগের আত্মবিশ্বাসী, কাঠিন্য মুখটায় নমনীয়তা আসল। সাথে ভেসে উঠল অসম্ভব ক্লান্তি। যেন কোনো এক অসম্ভব ভারী কোনো বস্তু সে প্রতিনিয়ত ঘাড়ে করে বয়ে বেড়াচ্ছে। এই বোঝার দায় কারোই না, তাও বোঝা বইতে হয় তার। ইসমাত পরপর দু'বার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পানির বোতলটা নিয়ে ঢকঢক করে কতখানি পানি গিলে তৃষ্ণা মেটাল।
এই কেবিনটাতে সবকিছু আছে। এসি, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, নীরবতা সবই। খাবারের কিছু লাগলেও স্টাফকে বললেই তা দ্রুতই হাতের নাগালে চলে আসে। তবুও যেন কোনো একটা কিছুর কমতি অনুভব হয় তার। সেই কমতিটা হলো স্বস্তি। ভাগ্যক্রমে সে এই "আয়াজি এলিট" - এর হেড অফিসের ভালো পোস্টে আছে। অথচ এত ভালো জবেও তার সুখ সুখ অনুভূতি কাজ করে না।
ইসমাত আলস্য সময় বেশিক্ষণ কাটাতে পারেনি। এর মাঝেই তার মোবাইলে একটা টেক্সট এলো। ইসমাতকে অবাক হতে দেখা গেল না, যেন জানে কে টেক্সট করেছে। সে ধীরে-সুস্থে মোবাইল হাতে নিল। একটা আননোন নাম্বারের টেক্সট, যেন ইসমাত কখনো এই নাম্বার সেভ করারও প্রয়োজনবোধ করেনি। তবুও এই নাম্বার তার খুব চেনা-পরিচিত। সে পড়ল বাংলিশ বার্তাটি।
--"নিচে আসুন, ওয়েট করছি।"
ব্যাস! এটুকুই! এর আগেপিছে আর কিছু নেই। এই একই মেসেজ ইসমাত সিরিয়ালে আরও কতগুলো দেখল। শেষ এই মেসেজ দেখল গত সোমবারের। আজ বৃহস্পতিবার। ইসমাত দেরী করে না, সব গুছিয়ে পিসি অফ করে সে বেরিয়ে যায়। একবার আয়না দেখারও প্রয়োজনবোধ করল না। সে তো আর ডেটে যাচ্ছে না, যেমন খুশি দেখাক। ফর্মাল স্যুট ঠিক আছে কিনা আর চুলটা বাঁধা ছাড়া আর কিছুই দেখল না।
পার্কিং-লটে আসতেই দেখল একটা গাড়ি দাঁড় করানো। এই গ্রে রঙের অতি দামী গাড়িটা ইসমাতের চেনা। সে কোনো কিছু না বলেই পেসেঞ্জার সিটে উঠে বসল। ড্রাইভিং সিটে বসে আছে এক সুদুর্শন যুবক, যার পোশাক থেকে শুরু করে চুল অবধি প্রতিটা ভাজে ভাজে আভিজাত্য লুকিয়ে আছে। সে ইসমাতের দিকে তাকানোর প্রয়োজনবোধ অবধি করল না। ইসমাতকে হাতে ধরিয়ে সিটবেল্ট বাঁধিয়ে দিতেও সে ইচ্ছুক নয়। দুজন দুদিকে তাকানো। ছেলেটা গাড়ি স্টার্ট দিতেই ইসমাত বলল,
--"আসার প্রয়োজন ছিল না।"
--"হুঁ, ছিল না। কিন্তু ড্যাড আপনাকে খুকি মনে করেন তো। পাছে যদি তার বউমাকে কেউ তুলে নিয়ে যায়?" ছেলেটার গলায় অসম্ভব বিরক্তি। যেন ইসমাত তার গলার কাঁটা।
ইসমাত এবার পুরোপুরি তাকাল ছেলেটার দিকে। চব্বিশ বছর বয়সী এই ছেলে। নাম তার সাহিদ মুস্তাহাব। নাম আর চেহারার মতো আচরণও সুন্দর হওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু ইনি জানেই না, ভদ্র ব্যবহার কী করে করতে হয়। আছে শুধু ইগো, মেজাজ আর শিরায় শিরায় বেয়াদবি। প্রতিবারের মতো আবারও বিরক্ত হলো ইসমাত। গা জ্বালানো কথা বললে গায়ে তো লাগবেই। এই ছেলে তো ইগো হার্ট করে বসে।
--"খুঁকি তো আর নই, তাই তোমারও এত দয়া করে নিতে আসার দরকার ছিল না।"
সাহিদের নজর রাস্তায় স্থির। একমনে ড্রাইভিং এ ব্যস্ত সে। থেমে উত্তর দিল,
--"দয়া আপনাকে নয়, আমার নিজেকে করতে হয়। হেল এজ অলয়েজ!"
ইসমাতের কপালের রগ কেমন শিরশির করে উঠল। সে বহু কষ্টে নিজেকে সামলে নিল। এক বছর ধরে এটাই করে যাচ্ছে— সাহিদের সমস্ত ত্যাড়া কথাকে এড়িয়ে চলা। নয়তো তার জীবনও যে চলবে না। ইসমাত চোখ বাইরের দিকে স্থির করল। সিটবেল্ট লাগিয়ে নিতে নিতে বলল,
--"আজকে রান্না করতে পারব না, গ্রোসারি সব শেষ হয়ে গিয়েছে।"
সাহিদকে এই বিষয়ে বেখেয়াল দেখাল। তার এসব সংসারধর্মের প্রতি একদমই আগ্রহ নেই। এই ছেলেটার যে হাসবেন্ড হিসেবে দায়িত্ব-কর্তব্য আছে সেসব নিয়েও প্রচুর উদাসীন সে। খুবই বেপরোয়া গলায় উত্তর দিল,
--"ডিনার অর্ডার করলেই হয়।"
ইসমাত অকাজের কথা না বাড়িয়ে দ্রুত খাবার অর্ডারের এপসে ঢুকে পড়ে। সে সাহিদের পছন্দ একটু আকটু জানে, সাহিদের মা শাহেলা হকের থেকেই শুনেছে। সেই অনুযায়ী খাবার অর্ডার করে দিল। কী এক বাজে অভিজ্ঞতা। বিয়ে হয়েছে বছরখানেক অথচ আজ অবধি দুজন বসে কখনো প্রাণ খুলে দুটো পছন্দ-অপছন্দের কথা বলেনি। ইসমাত তাও সাহিদের মায়ের থেকে শুনেছে। সাহিদের তো তার সম্পর্কে জ্ঞান পুরোই শূন্য। এসব নিয়ে আজকাল আর আফসোস করে না ইসমাত। সে এই বিয়েকেও কখনো দায়িত্বের চাইতে বড়ো করে কিছু দেখেনি।
তাদের বিলাসবহুল এপার্টমেন্টের পাকিং-এ এসে গাড়ি থামল। সেই গাড়ির চাবি সাহিদ ইসমাতকে হস্তান্তর করে তার পাশেই পার্কিং করা বাইকের দিকে এগিয়ে গেল। যাওয়ার আগে গাড়ির পেছন সিট থেকে হেলমেট নিতেও ভুলেনি। কিছুক্ষণ আগেও সাহিদ তাকে ডিনার অর্ডার করতে বলেছিল। আর এখন সাহিদ সেসবের পরোয়া না করে বাইক নিয়ে এক টানে বেরিয়ে গেল। অথচ বাইকের জন্য বাড়ি থেকে তার অসংখ্য নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। কিন্তু, কে শোনে কার কথা? এবারও কেন যেন ইসমাতের দুঃখ হলো না। মনে পড়ে গেল সারাহ'র কথাগুলো।
সারাহ র হতাশা ভরা প্রশ্নের প্রতি-উত্তরে ইসমাত মিনমিন করে আওড়াল মির্জা গালিবের শায়েরী।
"যদি দুঃখের বেলায় আকাশের সাথেই
কথা বলতে হয়,
তবে সুখের বেলায় মানুষ কেন?"
·
·
·
চলবে……………………………………………………