পবনপত্র - পর্ব ২৫ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
মঙ্গলবার।
আগামী সপ্তাহ থেকে দূর্গাপূজার ছুটি শুরু হবে। স্কুল-কলেজ, টিউশন—সবই বন্ধ থাকবে অনেকদিন। এই কয়েকদিন যদি তামান্নার সাথে দেখা না হয়, তাহলে দীর্ঘদিন আর দেখাই হবে না। তার তো সপরিবারে ঢাকায় যাওয়ার কথা। কবে যাবে–মৌমিতা সেটা জানে না। সেসব কথা মাথা থেকে বের করে দিয়ে মেয়েটা বারান্দায় এসে থামে। আজ ব্যবহারিক ক্লাস নেই। একাদশ শ্রেণির ব্যবহারিক থাকতেও পারে, না-ও থাকতে পারে। সে আশেপাশে তাকায়। বাদলের সাথে দেখা হয়ে গেলে মন্দ হয় না।

কলেজের মাঠে কিছু কিছু জায়গায় পানি জমেছে। কাদায় মাখামাখি অবস্থা। মৌমিতা নিচে তাকিয়ে খুব সাবধানে হাঁটছে। সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েকটা ছেলে, হাসাহাসি করছে। রাশেদও আছে সেখানে, তবে একটু দূরত্বে। হাসিতে অংশ নিলেও সে বাকিদের মতো আড্ডা দিচ্ছে না সম্ভবত।
পাশের গাছটার পেছনে দাঁড়ায় মেয়েটা। ছেলেগুলোর মাঝে আরেকজনকে খুঁজতে থাকে। খুঁজে পাওয়া গেলো না। ধৈর্যচ্যুতি ঘটলে সে চাপা স্বরে ডেকে ওঠে, “রাশেদ?”

ছেলেটা প্রথমে অন্যদিকে তাকিয়ে শব্দের উৎস খোঁজে, তারপর মৌমিতার দেখা পায়, “জ্বী আপু?”

মৌমিতা উপলব্ধি করলো যে সে ঠিক কী করতে যাচ্ছে। তবু ইতস্তত করে বললো, “বাদল কোথায়?”

“জানি না। আবার হারিয়ে গেছে!”

“ওহ। কিছু বলে যায়নি?”

রাশেদ একটু এগিয়ে আসে, “কখনোই বলে যায় না। মাঝে মাঝেই এভাবে হারিয়ে যায়। যখন ইচ্ছা হয়, তখন ফেরে। কিন্তু কোথায় যায়, সেটা জানি না। জিজ্ঞেস করেছিলাম। বলে না কিছু।”

“ওহ।”

মেয়েটা অন্যমনস্ক হয়ে যায়।
হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টা একটু অস্বস্তিকর ঠেকলো তার কাছে। বাদলের মাঝে পালিয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা আছে। এ ধরনের মানুষেরা চায়, সবকিছু তাদের ইচ্ছেমতোই হোক। যদি তা না হয়, তাহলে তারা পরিচিত জগৎ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে। যেখানে তাদের খেয়াল-খুশির গুরুত্ব নেই, সেখানে তারাও থাকতে পারে না। পালিয়ে যায়। এই মানুষগুলো সর্বাবস্থায় নিজেকে তুষ্ট রাখতে চায়। তাদের মানসিকতাই এমন হয়—পেলে সব পাবে, নইলে সব হারাবে।

মৌমিতাকে অমন গম্ভীর দেখে রাশেদ বলে, “কলেজের পেছনের গলিটাতে যায় মাঝে মাঝে। এখন কোথায় গেছে, জানি না। তবে ওদিকে না যাওয়াই ভালো। অনেক কুকুর—”

বাকি ছেলেগুলো লক্ষ করার আগেই মৌমিতা হাঁটতে শুরু করে। রাশেদের পুরো কথাটা শোনা হয় না।
ঐ গলিতে আসলেই অনেক কুকুর। সাথে কিছু বদলোকও থাকে মাঝে মাঝে। একা একা সেখানে যাওয়াটা মোটেও নিরাপদ নয়। তবু মেয়েটা সেদিকেই রওনা হয়।

ফাঁকা রাস্তা। কুকুর আজ তুলনামূলক কম। দুই-তিনটে কেবল শুয়ে আছে প্রাচীর ঘেঁষে। তবে আরেকটু এগোতেই অনেকগুলো কুকুর দৃশ্যমান হলো। চায়ের দোকানের সামনে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওদের হয়তো খাওয়া-দাওয়া চলছে। আরও সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতেই মৌমিতা দেখলো, দোকানের বেঞ্চটাতে একটা ছেলে বসে আছে। রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে শান্তভাবে বিতরণ করছে প্রাণীগুলোর মাঝে। ছেলেটা বাদল।
মৌমিতা আর দ্বিধা করলো না। দেয়ালের পাশ দিয়ে হেঁটে কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো। তবে কয়েকটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ওঠে তাকে দেখে। বাদল পেছনে ঘোরে। সে রুটি দেখিয়ে ইশারা করতেই কুকুরগুলো দৌড়ে আসে। এই ফাঁকে মৌমিতা দোকানের ঐ বেঞ্চটার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
দোকানদার নেই, সম্ভবত ঘরের ভেতরে গেছে। বাদল ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, “এদিকে আসতে মানা করেছিলাম।”

মৌমিতার ধমক দিতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু সে হেসে ফেললো ভুলক্রমে। অপ্রস্তুত হয়ে প্রসঙ্গ বদলানোর চেষ্টা করলো, “এখানকার সবগুলো কুকুরই কি পাগল?”

“না।” বাদল মাথা নাড়ে, তারপর আঙুল উঁচিয়ে খুব আগ্রহ সহকারে দেখাতে থাকে, “আমি আপনাকে বলি, এই যে, এই কয়টা পাগল। ঐ কোণের কালোটা... কান খাঁড়া করে আছে, ওটা পাগল। তারপর... যেটা জিভ বের করে আছে...”

কথাগুলো মেয়েটার কানে ঢুকলো না। একদৃষ্টে বাদলের মুখের দিকে চেয়ে রইলো। কথা বলতে গেলেও তার গালে টোল পড়ে। ছেলেটার চুলে খড়কুটো সদৃশ কিছু একটা আটকে আছে। মৌমিতা সেদিকে হাত বাড়াতে গিয়ে চমকে উঠলো। তৎক্ষণাৎ হাত সরিয়ে সংযত হয়ে দাঁড়ালো। সে সীমানা ভুলে যাচ্ছে, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে! বাদল তার এতো কাছেরও কেউ নয়।
নিজের অস্বাভাবিক অবস্থা আড়াল করার চেষ্টা করলো মৌমিতা, বাদলের কথায় মনোযোগ দিতে চাইলো। তখনই ছেলেটা বলে উঠলো, “কথা বলছেন না যে?”

“কী বলবো?”

বাদল পেছনে ঘুরলো, অবাক হয়ে বললো, “এতোক্ষণ ধরে কী বললাম, কিছুই শোনেন নাই?”

“শুনেছি তো। আমি আরকি, আমাকে... বাসায় যেতে হবে।”

“এগিয়ে দেবো?”

প্রশ্নটা শুনে মৌমিতা চৈতন্য হারিয়ে ফেললো। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে মগজে জোর দিয়ে ভাবতে লাগলো, 'হ্যাঁ' বলবে, নাকি 'না' বলবে। বাদল ততোক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে, “আস্তে আস্তে হাঁটবেন। আর ওদেরকে ভয় পাওয়ার দরকার নাই। এমনি কিছু করবে না।”

মৌমিতা সাত-পাঁচ না ভেবেই তার পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করলো, “ভালোই জানো তুমি!”

“এটা তো মোটামুটি সবাই জানে। কুকুর দেখলে ছোটাছুটি করা যায় না, নাহলে পেছনে লাগে। অবশ্য মেয়েরা ভয় পায় বেশি। একটুতেই দৌড়াতে শুরু করে।”

এভাবে মেয়েদের প্রসঙ্গ টানার ব্যাপারটা মৌমিতা একেবারেই পছন্দ করে না। কিন্তু সে অনেক চেষ্টা করেও বিরক্ত হতে পারলো না। আজ তার চিত্ত মুগ্ধ হতেই বেশি আগ্রহী। বাদল এখনও কী কী বলছে, সেসবে মনোযোগ দেয়ার ফুরসত পেলো না সে। এই সুনসান গলিতে পাশাপাশি পা ফেলে হেঁটে যাওয়ার মাঝে একটা নিষিদ্ধ ভালোলাগা রয়েছে, সেটাই তাকে আচ্ছন্ন করে রাখলো পুরোটা সময়। ছেলেটাকে এখন জুনিয়র বা অন্যকিছু মনে হচ্ছে না। তাকে কেবল বাদল মনে হচ্ছে। যার কাছে মৌমিতার ব্যক্তিগত সিন্দুকের চাবি রয়েছে। যে এমনকিছু জানে, যা আর কেউ জানে না।

“আপনার বাড়ির সবাই ভালো আছে?”

মেয়েটার সব অনুভূতি উড়ে গেলো। আসমান থেকে ধাম করে যেন তাকে বাস্তবতায় নামিয়ে দিলো কেউ।
বাদল প্রকৃতপক্ষেই ছোট মানুষ। পাশের মানুষটার মুখে সামান্য কথা ফোটানোর উদ্দেশ্যে সে একেবারে বাড়ির খবর নিতে শুরু করেছে। মৌমিতা নতুন করে টের পেলো, বাদলের সাথে হেঁটে যাওয়াটা সহজ হতে পারে, তবে অন্য কোনো পথচলা নেহাতই কঠিন।

“হ্যাঁ। তোমার বাড়িতে? ভালো আছে সবাই?”

“হুম।”

“কয় ভাইবোন তোমরা?”

“এক ভাই, এক বোন।”

“তুমি ছোট?”

“হুম।”

“তোমার বাবা কী করে?”

“রবিউল স্যারের ক্লাসে যাবেন আজকে?”

“হ্যাঁ? ওহ হ্যাঁ, যাবো।”

গলির মুখে এসে থামলো দু'জন। মৌমিতা রিকশা খুঁজতে লাগলো। বাদলও খানিকক্ষণ রিকশা খোঁজার ভান করলো। তারপর নিজের পায়ের দিকে তাকালো। জুতোর উপরিভাগের সাহায্যে মাটিতে হিজিবিজি দাগ কাটতে কাটতে বললো, “একটা কথা বলি?”

“বলো।”

“আপনি ডায়েরিতে... আমার ব্যাপারে কিছু একটা লিখবেন? শুধু দুই লাইন। ভালো হোক, খারাপ হোক। আপনার যেটা ইচ্ছা।”

মৌমিতা তার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকায়, “আমি ডায়েরিটা আর ফেরত নেবো না।”

“ফেরত দেবোও না! শুধু চাচ্ছিলাম, বাদলের নামটা আপনার ডায়েরিতে থাকুক। আপনি সবাইকে নিয়ে নিজের অনুভূতি লিখেছেন, সেজন্য... আমি অবশ্য অতো বিশেষ কেউ নই, তবু। আপনার ইচ্ছা। না লিখলে নাই।”

“পারবো না লিখতে।”

মৌমিতার কথাটা তুলনামূলক কর্কশ শোনালো। বাদল মাথা দোলায়, “আচ্ছা।”

রিকশায় উঠে মৌমিতা আর কোনোদিকে তাকালো না। চোয়াল শক্ত করে বসে রইলো শুধু। বেশ কিছুদূর আসার পর ধাতস্থ হয় সে। পেছনে ঘুরে অস্থির হয়ে ছেলেটাকে খুঁজতে থাকে। তবে তার ছায়াটুকুর দেখাও মেলে না। হয়তো আবার গলির ভেতরে চলে গেছে, হোস্টেলে ফিরে গেছে।
সামনে ঘুরলো মৌমিতা। দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মনে মনে বললো, “তুমি খুব বিশেষ একজন। খুবই বিশেষ। এতোটাই, যে তোমাকে নিয়ে একটা শব্দ লেখারও সাধ্য নেই আমার।”

আরও কিছু সময় মূর্তির মতো বসে থাকার পর মৌমিতা খুব ধীরস্থিরভাবে কপাল চাপড়ালো। নিজের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে বলে উঠলো, “জুনিয়র!”

—————

মার্জিয়া খুব লাফালাফি করছে ইদানিং। আজ দুটো দিন পর ছুটি শুরু। সে পরিকল্পনা করে রেখেছে, বন্ধের মাঝে কী কী নতুন খাবার বানাবে।
গোসল করার পরেই রান্নাঘরে গিয়ে মুড়ি মাখতে শুরু করলো সে। দুপুরের খাবারের জন্য অপেক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। তাকে খোলা চুলে এসব করতে দেখে রাবেয়া রেগে গেলেন, “তুমি এগুলো কী করো মার্জু? চুল খোলা কেন? পরে খাবারে চুল পেলে জোবেদার দোষ।”

“আমার চুল কি আমি চিনি না? তরকারিতে আমি অন্যরকম চুল পেয়েছিলাম।”

“মাথাটা মোছো ভালো করে। নাহলে তোমারও জ্বর আসবে। খোদা! একটা মানুষও যদি একটু ভালো হয়! সবাই উল্টাপাল্টা কাজ করবে, অসুখ ধরাবে। এদের জন্য চিন্তা করতে করতে মাথাটাই খারাপ হয়ে গেলো আমার। আমি যখন থাকবো না, তখন কীভাবে চলাফেরা করবা তোমরা? সবকিছু বুঝিয়ে দিতে হয়। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয়। তোমরা কি ছোট বাচ্চা? বাপ-মা তো সারাজীবন থাকবে না—”

“আম্মা! আপনি প্রতিটা কথায় এই প্রসঙ্গ আনেন কেমনে? এতো হতাশ কেমনে থাকেন সবসময়?”

“তোমাদেরকে দেখলেই হতাশ লাগে! নিজের খেয়াল রাখতে পারো না এখনও। আজীবন কি মায়ের কোলেই পড়ে থাকবা? যখন নিজের সংসার হবে, তখন আর কেউ কিছু দেখিয়ে দিবে না। নিজেকেই করতে হবে সব। পরিবারের প্রতিটা মানুষের খেয়াল রাখতে হবে।”

মার্জিয়া নিম্নস্বরে বলে ওঠে, “এমনভাবে বলছেন যেন আমি কালকেই বিয়ে করে চলে যাচ্ছি!”

“তোমার আপাকে ডাকো তো—”

“কেন? আপা বিয়ে করবে কালকে?”

“পাগলি! গিয়ে শুনে আসো ওর শরীরটা এখন কেমন আছে।”

মৌমিতা পড়ার টেবিলে বসে রয়েছে মাথায় হাত দিয়ে।
গতদিন রবিউল স্যার এই অধ্যায়টা শেষ করে দিয়েছেন। ক্লাসে না যাওয়ার কারণে বেশ ঝামেলা হয়ে গেছে। অন্যকারও খাতা থেকে তুলে নিয়েও লাভ হবে না। কয়েকটা গাণিতিক সমস্যা সে কিছুতেই সমাধান করতে পারছে না। উত্তরগুলো বইয়ে দেওয়াই আছে। কিন্তু তাতেও বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে। স্যারের কাছ থেকে আলাদাভাবে বুঝিয়ে নেওয়ার কথা ভাবতেও যেন যার সব শক্তি ফুরিয়ে আসছে।
এরপর আর অসুস্থ হওয়া যাবে না। অমনোযোগীও হওয়া যাবে না। বোর্ড পরীক্ষার তেমন দেরি নেই। এবার সামান্যতম ফাঁকিবাজি করলেও ভরাডুবি হবে। সর্বনাশ হয়ে যাবে।

মার্জিয়া এলো। মুড়ির বাটিটা বোনের সামনে রাখলো। এক থাবা নিজের মুখে পুরে অস্পষ্টভাবে বললো, “মুড়ি কাও।”

মৌমিতা অপ্রসন্ন হয়ে বলে, “এখন ভাত খেতে হবে। পেটে জায়গা রাখা লাগবে।”

“তোমার খিদা লাগে নাই?”

“না।”

“তাহলে আমিই খাই।” মুড়ির বাটি কোলে নিয়ে মেয়েটা খাটে পা ঝুলিয়ে বসলো, “আজকে টিউশনে যাবা নাকি? আকাশ খারাপ।”

“যেতে হবে। অনেক পড়া জমে গেছে।”

একটা কথা আছে—যতো গর্জে, ততো বর্ষে না। আজকের আবহাওয়া সেরকমই। সকাল থেকে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে। সূর্যটা ঢেকে গেছে। তবে বৃষ্টির দেখা নেই। একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। দুয়েক ফোঁটা পানি পড়লেই এই রাস্তাটা ডুবে যেতো। তখন টিউশনে আসা সম্ভব হতো না। দুইহাত দোলাতে দোলাতে রাশেদ এগুলোই ভাবছিলো। চারপাশে তাকিয়ে সে বড় একটা শ্বাস নেয়। বায়ু দূষণমুক্ত। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিপাতে ধূলোবালি কমে গেছে অনেকখানি। যদিও কাদার পরিমাণ বেড়েছে। সে বাদলের দিকে তাকালো, “পূজার ছুটিটা একটু তাড়াতাড়ি দিলে ভালো হতো, তাই না? বাড়িতে যেতাম।”

বাদলের দৃষ্টি সড়কের ঐপাড়ে, “অতো আগে আগে ছুটি নিয়ে কী হবে? কতো পড়া বাকি আছে!”

রাশেদ তার দৃষ্টি অনুসরণ করে ক্লাসের জানালার দিকে তাকালো। কৃত্রিম আফসোসের সুরে বললো, “বুঝেছি বন্ধু! দিনে দিনে স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছিস তুই।”

বাদল অভিযোগটাকে মাথা পেতে গ্রহণ করলো। ওদিক থেকে চোখ সরিয়ে বললো, “জানি।”

আগের ব্যাচটার ছুটি দিয়েছে। দ্বাদশ শ্রেণির মেয়েদের ব্যাচ। সবার শেষে বের হয় মেয়েটা। মাথার ওড়নাটা টেনে ঠিকঠাক করে। বাদল তার দিকে দেখে না বেশিক্ষণ। কয়েক ঘণ্টা আগে এই মেয়েটা খুব কর্কশভাবে একটা কথা বলেছিলো। ডায়েরিতে দুটো লাইন লেখার প্রস্তাবটা নাকচ করে দিয়েছিলো। কিন্তু সেটাও সুন্দর করে বলেনি। এই তুচ্ছ কারণে জন্ম নেয়া অভিমানটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। অযথা অন্যদিকে ঘুরে চোখাচোখি এড়ালো ছেলেটা।

তৃতীয় বেঞ্চে মৌমিতা বসে। তবে এখন এই আসনটা বাদলেরও। টেবিলে নিজের নামটা লিখেছিলো সে। অভিমান করে নিজ হাতেই কালি ঢেলেছিলো তার উপরে। নতুন করে আর লেখা হয়নি। সে লিখতেও চায় না। বেঞ্চে নাম লিখে লাভ কী? যেখানে সে নিজের নামটা দেখতে চেয়েছে, সেখানে তো আর মৌমিতা খন্দকার লিখবে না।

স্যার ভেতরে গেছেন। রাশেদ বাদলের দিকে ঝুঁকে আসে কিছুটা, “পড়াশোনায় মনোযোগ দে বাদল। এমনি এমনি সময় নষ্ট করিস না। শেষ পর্যন্ত তুই ছাড়া আর কেউই থাকবে না তোর নিজের বলতে।”

বাদল হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন করে, “হঠাৎ এই কথা বলছিস কেন?”

“তুই নিজে একবার ভেবে দ্যাখ। বুঝতে পারবি।”

বাদল বিরক্তি দেখালো। উপলব্ধিও করলো। ভবিষ্যতের কথা বাদ, এই মুহূর্তেও আপন বলতে কাউকে খুঁজে পেলো না সে।
তার বোনের সংসার টিকে আছে একটা সুতোর উপর। ঐ সুতোয় সে নিজেও ঝুলে রয়েছে। হারুন ভাইয়ের বিনিয়োগেই এতো দূরে এসেছে সে। আকাশকুসুম চিন্তা করার অধিকার লাভ করেছে। সে যদি সময় নষ্ট করে তবুও, তাহলে সব হারিয়ে যাবে। হারুন ভাই, বৃষ্টি আপা... মৌমিতা খন্দকার। রাশেদের কথায় আঘাত পেলেও মনে মনে সে ঠিকই জানে, পায়ের তলার মাটিটা আগে শক্ত করতে হবে।
কয়েকদিন আগেও পথটা বেশ মসৃণ ছিলো। কিন্তু এখন সব জটিল হয়ে যাচ্ছে। কেননা সে যা চায়, তা নীতিবিরুদ্ধ, সমাজবিরুদ্ধ। একজন সিনিয়র মেয়ের সমকক্ষ হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায় তার একজন আপন মানুষ বলতে এখনও কেউ নেই। সেই স্থানটা সে যার জন্য বরাদ্দ রেখেছে, তাকে পাওয়াটাও সহজ হবে না। এর থেকে সহজ উপায় আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু বাদল সহজ কিছু চাচ্ছে না এখন আর। সে শুধু মৌমিতাকে চায়।

—————

রিপন ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলে মার্জিয়া বলে ওঠে, “মামা, চা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।”

“এখনই আসছি।”

মার্জিয়া জানে, রিপন এতো তাড়াতাড়ি ফিরবে না। সে জুনায়েদের দিকে তাকায়, “চা কেমন হয়েছে?”

“ভালো।”

মেয়েটা বিড়বিড় করলো, “শুধু ভালো!”

“নয়তো কী বলবো? অমৃত হয়েছে!”

মার্জিয়া আশা করেনি কথাটা জুনায়েদের কান পর্যন্ত গেছে। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। অনাত্মীয় পুরুষ মানুষের সাথে একা একটা ঘরে এভাবে রয়ে যাওয়া ভালো দেখাচ্ছে না। সে টেবিলের উপর থেকে ট্রে তুলে বাইরের দিকে পা বাড়ায়।

“তোমাদের মধ্যে জ্বর কার এসেছে? তোমার, নাকি তোমার বোনের?”

“আপার। কিন্তু এখন ভালো আছে।”

“একটু বেশিই ভালো আছে বোধহয়!”

“জ্বী?”

“ওকে বলো, ভালো করে পড়াশোনা করতে। চাচার নামটা যেন না ডোবায়।”

“কী যে বলেন! আপা তো পড়াশোনায় ভালোই। জ্বর আসায় সেভাবে পড়তে পারেনি ঠিকই। কিন্তু এখন আবার ভালো করে পড়ছে।”

“পড়ছে, নাকি অন্যকিছু করছে—সেই খবর তো আর তুমি রাখো না।”

“আপনি কী বলছেন, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“মৌমিতা প্রেম করে, এটা জানো তুমি?”

মার্জিয়ার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো, নাস্তার ট্রে-সহ হাতদুটো কেঁপে উঠলো তার। জুনায়েদকে সে যথেষ্ট সম্মান করে, তবে আপার বিরুদ্ধে এমন অপবাদ শুনে চুপ করে থাকতে পারলো না। তীক্ষ্ণ স্বরে গর্জে উঠলো, “আজেবাজে কথা বলবেন না।”

“মোটেও আজেবাজে কথা বলছি না আমি। বিশ্বাস না হলে তোমার বোনকে জিজ্ঞেস করে দেখো। কলেজের পেছনের ঐ গলিটার কথা শোনোনি কখনও? আমি মৌমিতাকে ওখানেই দেখেছি। একটা ছেলের সাথে হাঁটছিলো। এমনভাবে হাঁটছিলো যে ও টেরই পায়নি, আশেপাশে কেউ আছে কিনা! বোর্ড এক্সামের আগে এসে এইসব কারবার করছে। দেখো, রেজাল্ট কেমন হয়।”

মেয়েটা ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকে। কথাগুলো সে বিশ্বাস করতে পারছে না। আপা যদি সত্যিই এমন কিছু করতো, তাকে জানাতো নিশ্চয়ই। এছাড়া এমনকিছু সে কেনই বা করতে যাবে? এতোটা অবিবেচক নয় তার আপা। কিন্তু জুনায়েদ এতো আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথাগুলো বললো যে মার্জিয়া সেগুলো পুরোপুরি উপেক্ষা করতে অপারগ।

রিপন ভেতরে আসে। দাঁড়িয়েই চায়ের কাপে চুমুক দেয় একবার, “আরে! আসলেই ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।”

মার্জিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। আতঙ্কে তার শরীর কুঁকড়ে আসছে। জুনায়েদ ভাইয়ের জায়গায় যদি অন্যকেউ থাকতো? যদি আব্বা দেখে ফেলতেন?
আপা এমন করতে পারে না। হ্যাঁ, ভালো লাগতেই পারে কাউকে। তবে তাই বলে প্রকাশ্যে কোনো ছেলের সাথে, কলেজের পেছনের গলিতে হাঁটতে পারে না মৌমিতা। অথচ এটাকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেয়ারও কোনো উপায় দেখা গেলো না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp