হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - পর্ব ২৭ - রাই কথা - ধারাবাহিক গল্প

হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - রাই কথা
          আয়নার জীবনের মূলমন্ত্র ছিল আর্থিকভাবে কোনোভাবেই অন্যকারো উপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে না ও আইনুন নাহারের মতো জীবন যাপন মরলেও করা যাবে না। তাকে এরজন্য কেউ স্বার্থপর ভাবলে তার কোন সমস্যা নাই। নিজের ভালো আগেভাগে বুঝে নেওয়ার জন্য বাঁকা চোখে তাকালেও কিছু করার নেই। তার মতে সে বাস্তববাদী এবং এই বাংলাদেশের মেয়েদের মাথায় বুদ্ধি থাকলে তারাও তাই করবে। আয়না কোনোদিন একজনের ভরসায় হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। মাহির তাকে বিয়ে করে শহরে আনার প্রতিটি পদে যেকোনো সম্ভাব্য হেরফেরের বিপরীতে তার প্ল্যান এ,বি,সি,ডি তৈরি ছিল। 

কিন্তু স্রষ্টার মর্জি অনুসারে তার হৃদয় জীবনে প্রথমবারের মতো বিদ্রোহ করে প্ল্যান এ,বি,সি,ডি কে বায়পাস করে আয়নাকে ডুবিয়েছে!
তার সুখ-শান্তির সমাপ্তি হয়েছে। এখন এক সুদর্শন যুবকের মনের ওপর তার দিন নির্ভর করে। 

আয়নার যখন এই মহাবিপদের আভাস পায় সে প্রথমে মেনে নিতে পারেনি। হতভম্ব ও অবিশ্বাস কাটিয়ে সে পরিস্থিতির সাথে সমঝোতা করে নেয়। মনে ভালোবাসা জন্ম নিয়েছে তো ভালো, মাহিরের তো তা জানার প্রয়োজন নেই। কি করবে সে জেনে?
আয়না তো তার খেয়াল রাখবেই। কেন মুখে বলতে হবে?

সবাই জানে ভালোবাসা যে প্রথমে এজহার করে, তাকে সারা জীবন নত হয়ে থাকতে হয়। অপরজনের পাল্লা সব বিষয়েই ভারী থাকে।

কিন্তু তারপর সে জানতে পারল মাহিরের গল্প। সেই ছোট্ট দশবছরের মাহির তার সামনে ধরা দিতে লাগল। যুবক মাহিরের সাথে অন্যায় করা গেলেও এই নিষ্পাপ মাহিরের সাথে করার সাধ্য তার নেই। পৃথিবী তাকে দুঃখ ছাড়া সুখ দেয়নি। তারপরেও ছেলেটা হতাশার ঊষর ভূমি খুঁড়ে আশার জল বের করেছে। আয়না নিজেও তার জীবনকে মরুভূমির মতো রুক্ষ মনে করতো, সে নিজেকে তেমনভাবেই তৈরিও করে, কিন্তু মাহির? সে তো মরুর বুকেও পুষ্প ফোটায়।

কতো ভিন্নতা! তবু সে বলে তারা নাকি অভিন্ন। আয়নার মাঝে সে নিজেকে দেখতে পায়। একদম প্রথম দেখা থেকে। যখন তার সাথে অন্যকারো নাম ছিল। মাহিরের সাথে দ্বিতীয়বার দেখা হওয়ার ও সম্ভবনা ছিল না। আয়নার দু-চোখের ধ্বংসাবশেষের সাথে সে পরিচিত ছিল। পুরো পৃথিবীর জন্য, তারই ভার সমান ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা নিয়ে জীবনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে।

মাহির সে রাতে প্রাণভরে স্রষ্টার কাছে অপরিচিত মেয়েটির সুখের জন্য প্রার্থনা করে। 

আয়না সে কথা শুনে অবাক হবে না হাসবে ভেবে পায়৷ না! পরদিনই তো মাহিরের সাথে নাম জুড়ে যায় তার।

সেদিন জ্বরপীড়িত পুরুষালী অধরে ইচ্ছে মতো অত্যাচার করে সে ক্ষ্যান্ত হয়। ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে মাথা ভর্তি রাগ তারপর আয়নার গালে ও নাকের ডগায় গিয়ে লালিমা হিসেবে স্থান পায়। আয়না যতই রাগ হয়, মাহির ততই হাসে। তার আনন্দের সীমা নেই। চোখ যেন ঝিকমিক করছে তাই! 

শেষমেশ তার নাকের ডগায় আঙ্গুল ছুঁইয়ে বলল, তোমাকে পাফার ফিসের মতো লাগছে। সো এডোরেবল!

আয়না অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, হয়েছে আর বলতে হবে না!

মাহির ঘাড় বাকিয়ে বলল, কেন না? স্ত্রীকে না বললে কাকে বলবো? কার জন্য জমিয়ে রেখেছি?

আয়নার উৎসাহ জাগল, আচ্ছা? তবে এর আগে কাউকে বলোনি?

মাহির চোখের সামনে আট নম্বর বিপদ সংকেত দেখতে পারল। আকারে-ইঙ্গিতে যে তার আগের রিলেশনর খবর জানতে চাইছে তা সে বুঝতে পারল। এর আগ পর্যন্ত এসব কিছু নিয়ে তার প্রশ্ন ছিল না। তার ফোনেও আয়নার আগ্রহ ছিল না, এমনকি ফিমেল কলিগ কল করলেও নির্বকারভাবে অন্যদিকে চলে যেতো। আহা! কতো উদার স্ত্রী ছিল মাহিরের! কিছু পুরুষের ড্রিম ওয়াইফ বটে।

আর এখন? কনফেস করার একদিন না যেতেই স্কুল-কলেজের হালখাতা নিয়ে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মাহির সুযোগ ছাড়ল না। টিপ্পনী কেটে বলল, বাহ! ভালোবাসার কথা বলার সময় তো এতো তাড়া ছিল না আপনার? এখন একবারে সব জানতে চান?

আয়না বিব্রত হলো। মুখ গম্ভীর রেখে মানসম্মান বাঁচানোর চেষ্টা করল, বলতে না চাইলে বলবে না। অনেক হাসবেন্ডরাই বিপদ এড়াতে এসব এভোয়োড করে। বানিয়েও বলতে হবে না।

মাহির বলল, থাক রেইজবেইটিং করতে হবে না। কলেজে একটা প্রেম শুরু হয়েছিল, তবে তিন মাসের বেশি এগোতে পারেনি।

আয়না কালকূট গিলে বলল, কেন? কি করেছিলে তুমি?

-তুমি একটু গার্লস গার্ল হওয়া থামাবে? তোমার তো আমার সাইডে থাকা উচিত। তবে বয়ফ্রেন্ড হিসেবে আমি বিলো এভারেজ ছিলাম। সময় দিতে পারতাম না। ভালো জায়গায় ডেট এফোর্ড করতে পারতাম না। সারপ্রাইজ দিতে পারতাম না। ফ্লেক্স করার ম্যাটেরিয়াল ছিলাম না। এক্সামে যখন সিট আলাদা পড়ে তখন থেকেই ওর ইন্টারেস্ট শেষ হয়ে যায়। এই হলো কাহিনি! ও আর স্কুলে আমি হাবাগোবা নার্ড ছিলাম। ফ্রেন্ডসই ছিল না তেমন।

-ইউনিভার্সিটি উঠেও না?

-তখন আমি সিজি ধরে রাখার জন্য নাক-মুখ বইয়ে ডুবিয়ে রাখতাম। স্কলারশিপ আর ইটার্নশিপ নিয়ে ঘাটাঘাটি করতাম। গেটটুগেদার বা হ্যাংআউটের সময় দিতে পারিনি। তখন একজন অ্যাপ্রচ করেছিল, কিন্তু আমার ব্যস্ততাকে অহংকার ধরে নেয়। এরপর বিভিন্ন ফেইসবুক গ্রুপে শুরু হয় রিউমারস, বুলিয়িং, বানোয়াট ঘটনা। খুব খারাপ হয় না ব্যাপারটা! পুরোপুরি আইডি ডিএক্টিভেট করে ফাইনালটা মনোযোগ দিয়ে দিতে পেরেছিলাম।

কথাগুলো শুনে আয়না কিছুক্ষণ ওর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠছে তার। কি অবলীলায় তিক্ত,অসম্মানজনক অভিজ্ঞতাগুলো আয়নাকে শোনাচ্ছে। এতো আগের ঘটনা তাও অপরপক্ষকে দোষারোপ করছে না। গোপনীয়তা রক্ষার জন্য নাম ও নিচ্ছে না।
​আয়না একটু ইতস্তত করল। মনের ভেতর একটা জরুরি প্রশ্ন অনেকক্ষণ ধরে খচখচ করছে, কিন্তু সেটা মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করবে কি না তা নিয়ে দ্বিধায় ভুগছিল। অবশেষে সে একটু ঝুঁকে বসে নিচু গলায় বলল, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?

​মাহির ওর দ্বিধা দেখে একটু হাসল। চোখ দুটো বুজে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, হুম, করেন। হাজারটা জিজ্ঞেস করেন। এখন আবার একদম পারমিশন নিয়ে ইন্টারভিউ শুরু করলেন যে?

​আয়না তবুও আরও কয়েক সেকেন্ড সময় নিল। ওর ডান হাতের আঙুলগুলো নিজের শাড়ির কুঁচি নিয়ে খেলা করছে। তারপর সে মাহিরের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
​-তোমার মায়ের ওই ঘটনার পর... আর তারপর কলেজের বা ইউনিভার্সিটির এই মেয়েগুলোর এমন ব্যবহারের পরও, তোমার কখনো মেয়েদের ওপর তীব্র কোনো রাগ বা ঘৃণা জন্মায়নি? এখনকার জেনারেশনের অনেক ছেলেই তো মেয়েদের ঘৃণা করার জন্য, তাদের ছোট করার জন্য স্রেফ একটা অজুহাত খোঁজে। সেখানে তুমি কীভাবে নিজেকে এত সংযত রাখলে? সবার প্রতি এত রেসপেক্টফুল, কম্প্যাশনেট আর ভদ্রই বা কীভাবে থাকতে পারলে?

​প্রশ্নটা শুনে মাহিরের মুখের চটুল হাসির রেখাটা মিলিয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন উত্তরটা সে নিজের ভেতরের অনেক গভীর থেকে হাতড়ে আনছে।
​একটা লম্বা শ্বাস ফেলে আয়নার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল, 
এমন না যে কখনো আমার প্রচণ্ড রাগ বা ফ্রাস্টেশন হতো না। শুধু একজনের ওপর না, পুরো দুনিয়ার সব মেয়ের ওপর। মাঝে মাঝে তো আমার মনে হতো, সব নারীই বোধহয় এমন স্বার্থপর হয়, যারা নিজের সুখের জন্য আপনজনদের ফেলে যেতে পারে। কিন্তু মানুষ যখন আস্তে আস্তে বড় হয়, তখন সে চারপাশের বাস্তবতাকে আরও গভীরভাবে দেখতে শেখে।
আমি যখন আহমেদ নিবাসে বড় হচ্ছিলাম, তখন আমি দেখেছি চাচী কীভাবে ডাবল শিফট চাকরি করে এই পুরো পরিবারকে টিকিয়ে রেখেছিলেন। তিনি সারাদিন খাটতেন। এমনকি দাদীরও এই যৌথ পরিবারটাকে আগলে রাখার জন্য তার ত্যাগটাও আমি ছোটবেলা থেকে দেখেছি। আমার মনে হয়েছে আমার মা যা করেছেন, সেটা তার ব্যক্তিগত চয়েস বা তার মানসিক দুর্বলতা ছিল। তার সেই একটা ভুলের দায় তো আমি পৃথিবীর অন্য কোনো মেয়ের ওপর চাপাতে পারি না। একটা মানুষ খারাপ বা দুর্বল হতেই পারে, কিন্তু তার জন্য পুরো লিঙ্গটাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো তো কোনো বুদ্ধিমানের কাজ না।

​সে আয়নার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো করে বুড়ো আঙুল দিয়ে ঘষতে ঘষতে বলল, আর স্কুল-কলেজের ওই মেয়েটা বা ইউনিভার্সিটির ঘটনা? ওগুলো তো স্রেফ ইমম্যাচিউরিটি। অল্প বছরের মেয়ে তার বয়সের হুজুগে একটা ভুল ধারণা তৈরি করে আমাকে নিয়ে রিউমার ছড়িয়েছে। তার সেই বোকামির জন্য আমি যদি আজীবন নারীবিদ্বেষী হয়ে বসে থাকতাম, তবে ক্ষতিটা কার হতো বলো? আমার নিজের মানসিক শান্তিটাই নষ্ট হতো। আমি সবসময় বিশ্বাস করি, রেসপেক্ট বা সম্মান জিনিসটা কোনো জেন্ডার দেখে আসে না, এটা মানুষের নিজের ভেতর থেকে আসে। আমি যদি অন্যকে সম্মান না দিতে পারি, তবে আমি নিজে কীভাবে সম্মান আশা করব?

আয়না বিমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। কিভাবে এতো উন্নত চিন্তাধারার বিনয়ী সুপুরুষ তার ভাগ্যে পড়ল? এরপর কি আর আয়নার জীবন নিয়ে কোনো অভিযোগ করা সাজে? 

মাহির তুড়ি বাজিয়ে তার ধ্যান ভাঙ্গে, তো মিসেস? নিজের খবর বলুন? এই অধম ছাড়া আর কয়টা হৃদয় ভেঙ্গেছেন?

আয়না মুখ বিকৃত করে বলে, ইশ! ওইসবে আমি ছিলাম না কোনোদিন।

-নট ইভেন রাহা-

-নামটা নাও শুধু? তারপর দেখো তোমার কি অবস্থা করি বদ লোক!

-আচ্ছা নিবো না সে নাম। কিন্তু সত্যি? কখনো না?

-না রে ভাই। আমি বোকা নাকি? ছেলেমানুষ আবার ভালো হয়?

মাহির তৃপ্ত হয়ে বিড়বিড় করে বলে, জীবনে ভাবিনি এটা বলব, কিন্তু অলমোস্ট পুরুষ বিদ্বেষী স্ত্রীর জন্য লাখ লাখ শুকরিয়া খোদা!

—————

আয়নার সাথে রফিক সরকারের শহরে আসার পর প্রথমবার কথা হয়। তিনি নিজেই কল করেন। আয়না কাপড় গুছানো বন্ধ করে চুপচাপ বিছানায় বসে। দুপুরবেলার সময় হওয়ায় চারপাশ নীরব আছে। সবাই খেয়ে দেয়ে ভাতঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আয়না দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কল রিসিভ করে সালাম দেয়। অনেকগুলো শান্তির দিন পার করে পুরনো দুঃস্বপ্নের স্বর কানে ভেসে আসে, টাকা পেয়েছো?

আয়না বলে, কিসের টাকা?

-যেটা বেহায়াগিরি করে দাবি করলে? কোট কাচারির ভয় দেখালে? ব্যাংকে ট্রান্সফার হয়েছে আজ। আমি এক কথায় মানুষ।

-নিজের ন্যায্য পাওনার জন্য বেহায়াগিরি করতে হলো, সেটা তো আপনার ব্যর্থতা। যাই হোক ধন্যবাদ।

রফিক সরকার ফোন রাখলেন না, ওখানে শুনেছি ছাঁদে থাকো? কাজের লোকের চেয়েও শোচনীয় অবস্থা। চাকরিও নাকি যায় যায় অবস্থা! তাও তেজ কমে না?

-এই চিলেকোঠার মতো শান্তি আমি আমার পুরো জীবনে আর কোথাও পাইনি, বিশ্বাস করবেন আপনি?

-এখন এটা না বলে উপায় কি? শুনো মেয়ে মাথা নোয়াতে শেখো। চুপচাপ সব ফেলে নিশিখালি ফিরে আসো। আমি তোমার জীবন গুছিয়ে দিবো। এখন অন্তত নিজের ভালোটা বুঝতে শেখো।

আয়নার খুব মজা লাগল, আপনি ধরে বেঁধে এই ছেলের সাথে বিয়ে দিলেন এখন তাকে ছেড়ে আসতে বলছেন? তবে সত্যি কি জানেন এটা আমি আরো আগেই এক্সপেক্ট করছিলাম। বিয়ের পরদিন যখন সে চোখে চোখ রেখে আপনার দু পয়সার যৌতুক মানা করেছিল, আসলে সে তখন আপনার আধিপত্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছিল। এটা যেমন আপনি বুঝেছেন আমিও বুঝেছি। এরপর থেকেই তাকে আপনার পছন্দ না। এই ছেলে আমার নাক কাটতে তো আপনাকে সাহায্য করবেই না, উল্টো ঢাল হয়ে গেছে। আপনার জন্য আসলে কষ্টই হয়।

রফিক সরকার হুংকার দিয়ে বলে, ওর জন্যই যে আফজালের এই অবস্থা আমি জানি না মনে করেছ! 

আয়না বলল, আমিও জানি। কি করার আছে বলেন?

-এটা মোটেও শেষ না। তোর অহংকার পতন হবেই। যেদিন সে ব্যবহার করে আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলবে বুঝবি? ভাবছিস আমার আঙ্গুলের বাইরে চলে গেছিস? নাকে খত দিয়ে এখানেই ফিরতে হবে। দুইদিন যাইতে দে খালি। এইরকম অবাধ্য, অহংকারী মেয়ে কোনো ব্যাটা রাখবে না। নারীর কোন ফিতরতটা আছে তোর কাছে? এরকম কত মহিলা স্বামী নিয়া অহংকার কইরা চুরমার হইছে দেখোস না?

আয়নার হাত কাঁপছে। গলা শুকিয়ে আসছে। কথাগুলো কাঠের পেরেকের মতো মাথায় বিঁধছে। কিন্তু সে আর রফিক সরকারকে তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে দিবে না। নিজের সুখ নষ্ট করতে দিবে না।

-প্রবাদে আছে রতনে রতন চিনে আর……

রফিক সরকার হুংকার দিয়ে উঠলেন। ওপাশে নিশ্চিত তোলপাড় চলছে। 

-এতো বড়ো সাহস তোর?

আয়না সেসব তোয়াক্কা না করে বলল, আমার স্বামীর ব্যক্তিত্বের ধারের কাছেও আপনি আসতে পারবেন না। সেসব আবর্জনার চিন্তাভাবনা আমাকে শুনিয়ে লাভ নেই। আমাকে ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করবেন সেদিন শেষ। শুনে রাখুন আমার মা'কে দিয়ে আমাকে মাপতে আসলে ঠকবেন। আমি আইনুন নাহার নই। পৃথিবীতে কেউ আমাকে ভাঙতে পারবে না। খোদ মাহির ও না। আমার জীবন কখনো কারো জন্য উৎসর্গ থাকবে না। কারো ধোঁকায় আমি ভঙ্গুর হবো না, কারো কাছে ভালোবাসা ভিক্ষাও করবো না। কেউ যদি আমাকে ছেড়ে চলে যায় ভবিষ্যতে, সেটা তার ক্ষতি। আমি তাও সংগ্রামে করে টিকে থাকবো।

ওটা ভিন্ন আলাপ যে আমার স্বামী আমাকে ভাঙ্গতে নয় গড়তে চায়। আমাকে মাটির পুতুলের মতো যত্নে মুড়িয়ে রাখে। এ বয়সে এসেও কিশোরী কালের শখ পূরণ করতে পাগলামি করে। অথচ সেসময়ের কোনো দায় তো তার নেই।
আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল কি জানেন? আপনার ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে নিজের জন্য সব সুখের দরজা বন্ধ রাখা। আমি যদি আমার আগের চিন্তা অনুযায়ী তটস্থ হয়ে বাঁচি তাহলেও তো আপনার জিত। এটা বুঝতে পারিনি। 
আমি প্রাণ খুলে বাঁচবো। আমার স্বামীকে অনেক ভালোবাসবো। তার থেকে চেয়ে চেয়ে অনেক ভালোবাসা নিবো। ভবিষ্যতের চিন্তা করে বসন্ত রুখবো না।

তারপর আর রফিক সরকারের সাথে আয়নার আর কোনো ফোনালাপ হয়নি।

—————

যখন শীত এসে প্রকৃতিকে কঠোর, রুক্ষ, নির্জীব করে দেয়, কেউ তা থামাতে পারে না। সে নিজের নিষ্ঠুরতম রাজত্ব অবশ্যই কায়েম করে। ঠিক তেমনই একদিন তার আয়ুকাল সমাপ্ত হয়। দামামা বাজিয়ে, সগৌরবে ঋতুরাজ এসে হাজির হয়। কোনো কঠোরতা তাকে আটকাতে পারে না। কোনো বাঁধন মানে না সে। ঊষর ভূমি উর্বর হয়। বসন্তকে কেউ দমাতে পারে না।

আয়না বহুদিন পর রেডিতে নব ঘুরিয়ে গান শুনছে। রবীন্দ্র সংগীত সাথে সাথে গুনগুন করে ঘর গোছাচ্ছে। মাত্রই একটা ক্লায়েন্টকে তার কাজ বুঝিয়ে দিয়ে আড়মোড়া ভেঙে টেবিল থেকে উঠেছে সে। এরমধ্যেই মাহিরের কল আসল। 

আয়না বলল, কি ব্যাপার একটু আগেই না ব্রেকে কল দিলে?

মাহির উৎসাহী সুরে বলল, দারুণ একটা ব্যাপার হয়েছে।

-কি? তাড়াতাড়ি বলো?

-আমার এক বন্ধুর কথা বলেছিলাম না? যে ওই ছিনতাই হওয়া টাকা নিয়ে খোঁজ করছিল? 

-আবার সেসব ভাবছো? উনি তো আশা রাখতে বারণ করেছিল।

-সে আজ ফোন দিয়ে জানালো টাকাগুলো ট্রেস করতে পেরেছে!

-সত্যি? ইয়া আল্লাহ! 

-আলহামদুলিল্লাহ! পুরোটা হয়তো না। বাট মেজোরিটি রিকোভারি সম্ভব হবে বলেছে। আর এরজন্যই আমি-

ধরাম করে দরজা খোলার শব্দে আয়না চমকে উঠল। তার হাত গিয়ে ঠেকলো বুকে। সামনে মাহির দাড়ানো। তার একহাতে আইসক্রিম। বেচারা আয়নার চেয়েও বেশি বিস্মিত। 

আয়না মাহিরের একটা সাদা শার্ট পড়ে আছে যেটার শেষ প্রান্ত গিয়ে ঠেকেছে হাঁটুর বেশ খানিকটা উপরে। হাতা হয়তো গুটিয়েছিল কিন্তু এখন খুলে হাতের আঙুল পর্যন্ত ঢেকে ফেলেছে। মাহির বড়সড় ঢোক গিলল। সারাদিন শেষে তার মনে হলো গলার টাইটা বেজার টাইট হয়ে আছে। হাসফাস লাগছে তার।

আয়না লজ্জায় মূর্তিতে পরিনত হয়েছে। আমতা আমতা করে বলল, শাড়িতে পানি পড়ে গিয়েছিল, কাজের মাঝে ছিলাম। এটা সামনে ছিল তাই আর কি? আর কেউ তো এসময় এখানে একদম আসে না। তোমার না আজকে দেড়ি হওয়ার কথা? এতো আগে আসলে?

সারপ্রাইজ দিতে এসে নিজেই মহাসারপ্রাইজড হয়ে গেছে মাহির আহমেদ।

হালকা আবহাওয়াটা চোখের পলকে উধাও হয়ে সেখানে বিপজ্জনক রকমের গভীর মাদকতা ভর করল।
তার চোখের দৃষ্টি অবাধ্য হয়ে আয়নার ওপর আটকে রইল। চওড়া শার্টের ভেতর এই নরম, শুভ্র রূপ তাকে পুরো এলোমেলো করে দিচ্ছে। গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ।

পরিস্থিতি সামলাতে আয়না কোনোমতে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে চোখ সরিয়ে বলল, তুমি... তুমি কি আগে ফ্রেশ হয়ে নেবে?

মাহির কোনোমতে গলা ঝেড়ে বলল, হ্যাঁ, সেটাই ভালো।

মুখ দিয়ে বললেও দুজনের কেউই তখন স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল না। অদৃশ্য টান দুজনকে এক জায়গায় তাদের জমিয়ে রেখেছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বাথরুমে যাওয়ার মাত্র কয়েক মুহূর্ত পরেই মাহির হুড়মুড় করে আবার ঘরে ফিরে এল। আয়না শান্তির নিঃশ্বাসটাও নিতে পারল না! 
তবে এবার তার মুখে বিস্ময় নেই, আছে তীব্র অস্বস্তি আর চাপা উত্তেজনা। সে বেশ রুক্ষ গলায় সরাসরি জিজ্ঞেস করল, আমি এখন ঠিক কী পরব বলতে পারো? তুমিই তো আমার শার্ট পরে বসে আছ।

ওর গলার ঝাঁঝালো সুর দেখে আয়না পুরো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সে তো ইচ্ছে করে মাহিরের ক্ষতি করতে এটা পরেনি! অপ্রস্তুত হয়ে সে বলল, আমি এখনই আলমারি থেকে অন্য একটা শার্ট বের করে দিচ্ছি তোমাকে।

-লাগবে না!

মাহির সটান জবাব দিল, আমি আজকে ওটাই পরতে চাই।

আয়না এবার বেশ অসহায় বোধ করল। ভুরু কুঁচকে বলল, কী অদ্ভুত! আমি অলরেডি এটা পরে আছি, তুমি হুট করে এই শার্টটাই কেন পরতে চাচ্ছ?

এই একটা প্রশ্ন মাহিরের এতক্ষণের ধরে রাখা সমস্ত ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। এক কদম এগিয়ে এসে নিজের বুকের বাঁ-পাশে আঙুল নির্দেশ করে রুদ্ধশ্বাসে বলল, পরবোই তো! কেন পরতে গেলে? তুমি আসলেই জানো না, আয়না? এই শার্টটায় তোমাকে আজ এই অবস্থায় দেখার পর আমার এই ভেতরটায় কী হচ্ছে, তুমি তার কিচ্ছু জানো না! তুমি আমাকে পাগল করে ছাড়বে!

মাহিরের তীব্র আকুলতা আর অধিকারবোধের বহিঃপ্রকাশ সে আর চেপে রাখতে পারছে না। নিজের এত ব্যক্তিগত একটা পোশাকে নিজের স্ত্রীকে এত কমনীয় রুপে কাছে দেখে সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে।

আয়না চরম লজ্জায় লাল হয়ে গেল। নিজের আত্মপক্ষ সমর্থন করতে সে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বিড়বিড় করে ফিসফিসাল, সবকিছুতেই এত আদিখ্যেতা... এত সমস্যা হওয়ার তো কিছু নেই।

 অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে ধরা গলায় একা একাই আওড়াল,
এমনিতে তো ভালো করে শাড়ি পড়ে সেজেগুজে সামনে এলেও কখনো কিছু করো না। যেন ঋষি-মুনি! ওই চুমু পর্যন্তই তো। আর এখন একটা শার্ট পরাতেই যত দোষ!

সে ভাবতেও পারেনি মাহিরের কান এত তীক্ষ্ণ। ওর শেষের কথাগুলো মাহিরের কানে পৌঁছানো মাত্রই ও স্তব্ধ হয়ে গেল।

আয়নার এই নালিশ মাহির আহমেদের ভেতরের শেষ সংযমটুকু চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। সে ঝড়ের বেগে ঘুরে দাঁড়াল। ওর চোখ দুটো তখন নেশাতুর জেদে জ্বলজ্বল করছে।

সে এক লহমায় সমস্ত দূরত্ব মুছে আয়নার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, তুমি আসলেই ইম্পসিবল, আয়না! তোমাকে সামলানো আমার সাধ্যের বাইরে।

কথাটা শেষ হতে না হতেই মাহির তার সুস্থ হাতটা দিয়ে আয়নার কোমর জড়িয়ে ধরে ওকে নিজের বুকের সাথে একদম পিষে ফেলল। আয়না কিছু বুঝে ওঠার বা নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই, মাহির ওর ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট দুটো মিশিয়ে দিল।

এই আদরে আগের মতো কোনো সতর্কতা বা নম্রতা ছিল না। এটা ছিল বন্য, মরিয়া এবং দমবন্ধ করা এক ঝড়। এতদিনের জমানো সমস্ত দূরত্ব, না-বলা আকুলতা, শারীরিক আকর্ষণ আর মানসিক আত্মসমর্পণ, সব যেন এই একটি স্পর্শে একাকার হয়ে গেল। 

আয়না প্রথমে শিউরে উঠে মাহিরের শার্টের কলারটা খপ করে মুঠো করে ধরল, তারপর নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে এই ব্যাকুলতার জবাব দিতে লাগল।
যখন মাহির একটু দূরে সরল, দুজনেই তখন সমানভাবে কাঁপছে। আয়না নিশ্বাস নিতে পারছে না, আর মাহিরের চিরচেনা শান্ত, সংযত রূপটা আজ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। চিলেকোঠার এই নিঝুম ঘরে আজ তারা এমন এক অদৃশ্য দাগ পার হয়ে গেল, যেখান থেকে আর পেছনে ফেরার কোনো পথ নেই। ভালোই তো! তারা সে পথ মাড়াতে চায়ও না।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, চুম্বনের মাঝেই মাহির অনবরত কথা বলে যাচ্ছিল।
এক সেকেন্ডে ওকে শোনাল বেজায় বিরক্ত আর ওলটপালট হয়ে যাওয়া পুরুষের মতো,তুমি এটা ইচ্ছে করে করেছ। আজকের এই দিনটাতেই কেন তোমাকে আমার শার্ট পরতে হলো?তোমার কোনো আইডিয়া আছে তুমি আমাকে কী অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছ?

ঠিক তার পরের সেকেন্ডেই ওর গলার স্বর মায়ায় একদম গলে জল হয়ে গেল
আমার লক্ষ্মী সোনাটা আমার! একবার দেখো নিজেকে...তোমাকে এত অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর লাগছে যে আমি সত্যিই পাগল হয়ে যাচ্ছি।

এই তীব্র বিপরীতধর্মী রূপ আয়নাকে একদম মাতাল করে দিল। আয়না ওর কথাগুলো ঠিকঠাক মাথায় গুছিয়ে নেওয়ার আগেই মাহির আবার ওকে চুমু খেল। প্রতিবার যখনই আয়না একটু নিশ্বাস নেওয়ার জন্য নিজেকে সামলাতে চাচ্ছে, মাহির তখনই ওকে আরও শক্ত করে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে যেন একবার মুখ ফুটে ছুঁয়ে ফেলার পর সে আর কোনোভাবেই এই শরীরী আর আত্মিক দূরত্ব সহ্য করতে পারছে না। সে নিজের কপালটা আয়নার ভেতরের দিকে সামান্য ঠেকিয়ে রাখল, তারপর হুট করেই আবার চুমু খেল ওর ঠোঁটের কোণে, তারপর গালে, তারপর চোয়ালে।

-তুমি খুব আনফেয়ার! খুব!

মাহির ওর গায়ের চামড়ায় ঠোঁট ছুঁইয়ে খুব নরম করে নালিশ করল, আমার সাথে বড্ড অন্যায় করো তুমি।

অথচ মুখে অনবরত নালিশ করলেও, ওর হাতের স্পর্শ অসম্ভব কোমল আর যত্নশীল।

ওর আঙুলগুলো খুব সাবধানে আয়নার এলোমেলো চুলের ভেতর বিলি কাটছিল, আর ওর অধর দুটো আরও নিচে নেমে এসে আয়নার গলার কাছে এসে থমকাল। টান দিয়ে শার্টের কয়েকটা বোতাম ছিঁড়ে ফেলল। 
লোভনীয় তামাটে জায়গায় মাহিরের তপ্ত ওষ্ঠাধর ছোঁয়া মাত্রই আয়নার নিশ্বাস-প্রশ্বাসের গতি একদম এলোমেলো হয়ে গেল। আয়নার এই তীব্র প্রতিক্রিয়া টের পেয়ে মাহির আধ-সেকেন্ডের জন্য একটু থামল, তারপর হালকা হাসির শব্দ শোনা গেল ওর গলায়। বোঝা গেল সে নিজেও এই আচ্ছন্নতায় সমানভাবে কাবু।
-এই তো…
গলার কাছে মুখ রেখেই মাহির ফিসফিস করে বলল, এখন এসে আমাকে বলো যে আমার শান্ত থাকা উচিত।

কতো খারাপ! একি অনাচার! 

আয়না তখন কোনো কিছু ভাবার বা যুক্তি খোঁজার অবস্থায় ছিল না, সে কেবল এক তীব্র আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছিল। মাহিরের এই ভালোবাসা প্রকাশ বড্ড তীব্র, ব্যাকুল, তৃষ্ণার্ত! আয়নার বুকের ভেতরটা এক মিষ্টি যন্ত্রণায় টনটন করে উঠল। সে তপ্ত চুম্বনের মাঝেই অনবরত আয়নার রূপের প্রশংসা করে যায়।

-আমার সুন্দর মেয়েটা! তোমার থেকে এত দারুণ মিষ্টি সুবাস আসে! একই ঘরে এক সাথে থেকেও আমি তোমাকে কতটা মিস করেছি, তুমি জানো না।

এতটা বছর ধরে আয়না নিজেকে শিখিয়ে এসেছে কারো কাছ থেকে কোনো মায়া বা কোমলতা না চেয়ে কীভাবে একা একা টিকে থাকতে হয়। কিন্তু মাহির আজ ওকে এমন তীব্রতায় নিজের করে চাইল, যা ওকে একই সাথে সমূলে কাঁপিয়ে দিল আবার পূর্ণতায় ভরিয়ে দিল। ধীরে ধীরে আয়নার ভেতরের সমস্ত জড়তা আর দ্বিধা উবে গেল। কেবল মাহিরের ভালোবাসাকে গ্রহণ করার বদলে সে নিজেও এবার সমান তীব্রতায় সাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

সে নিজের দু-হাত বাড়িয়ে মাহিরের মুখটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল, ওর কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো দিয়ে এবার সে নিজে থেকে মাহিরকে খুব সুন্দর করে, সজ্ঞানে চুমু খেল বুক উজাড় করা অধিকারবোধ নিয়ে। আয়নার মাহির! শুধুমাত্র আয়নার মাহির সে!

আয়না যখন নিজের পুরো অস্তিত্ব দিয়ে জবাব দিল, মাহির আহমেদ ওরফে চির-সংযমী পুরুষটা এবার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। সে আয়নার ঠোঁটের মাঝেই একটা তৃপ্ত, ভারী নিশ্বাস ছাড়ল এবং নিজের সুস্থ হাতটা দিয়ে ওকে নিজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে পিষে ধরল।
আয়না খুব স্পষ্ট টের পাচ্ছিল এই মানুষটা ওর জন্য কতটা ব্যাকুল আর ওলটপালট হয়ে গেছে। সেই চেনা শান্ত, সংযত মাহির আজ স্রেফ ওর একটা ছোঁয়ায় নিজের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কেমন করে ভেঙে পড়ছে, এই উপলব্ধিটা আয়নার সারা শরীরে এক অদ্ভুত উষ্ণ আর মাদকতাময় অনুভূতির জোয়ার এনে দিল।

উত্তেজনা আর তীব্রতার পারদ যেন প্রতি সেকেন্ডে আরও উঁচুতে উঠছিল। একপর্যায়ে মাহির তার শেষ যে সামান্যতম আত্মসংযমটুকু অবশিষ্ট ছিল, তা-ও হারিয়ে ফেলল। আয়নার ঠোঁটে এক নাগাড়ে দমবন্ধ করা চুম্বন এঁকে দিতে দিতেই সে ব্যাকুল অধৈর্যতায় ওকে পেছনের দিকে ঠেলে বিছানায় শুইয়ে দিল। ঠিক তার পরের মুহূর্তেই সে নিজেও ওর ওপর ঝুঁকে এল। দুজনের ওজনে জাজিমটা সামান্য দেবে গেল, আর মাহিরের ওষ্ঠাধর বারবার, অনবরত খুঁজে নিতে লাগল আয়নার ঠোঁটজোড়া। 
আয়না তখন ঠিকঠাক চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। গাল দুটো লজ্জায় আর উত্তেজনায় লাল, নিশ্বাস ভীষণ অসম, আর হাতের আঙুলগুলো নিরুপায় হয়ে আঁকড়ে ধরে আছে মাহিরের শার্ট। আর ঠিক তখনই, এই তীব্র আচ্ছন্নতার মাঝেই, হুট করে মাহিরের চোখে পড়ল আয়নার চোখের কোণের চিকচিক করতে থাকা জল।
 ওর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।

আয়না মৃদু হেসে আশ্বস্ত করল। সেটা কোনো ভয় কিংবা কষ্টের কান্না ছিল না। এটা মানুষের বুকে সুখের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে বুক চিরে বেরিয়ে আসে। এই দৃশ্যটা দেখা মাত্রই মাহিরের বুকের ভেতরটা এক তীব্র মায়ায় মুচড়ে উঠল। ওর গতি আচমকাই কিছুটা শ্লথ হয়ে এল। সে নিজের কপালটা আয়নার কপালে ঠেকিয়ে জোরে জোরে তপ্ত নিশ্বাস ফেলতে লাগল।

-আয়না!

এতক্ষণ পর নিজের স্ত্রীর এই রূপ দেখে ওর গলার স্বরটা যেন সামান্য কেঁপে উঠল। কিন্তু ঠিক তখনই আয়নার চোখ দুটো আকস্মিক এক উপলব্ধিতে বড় বড় হয়ে গেল।
তাকে অগ্রসর হতে দেখে আয়না বলল, 
তোমার হাত! হাতে চাপ পড়ছে!

এতক্ষণে ওর মাহিরের ইনজুরির কথা ঠিকঠাক মনে পড়েছে। হাতের প্লাস্টারটা প্রায় খুলে যাওয়ার মতো, চোটও অনেকটাই শুকিয়ে এসেছে, কিন্তু ওটা এখনো পুরোপুরি ঠিক হয়নি। এখনো হাতটা নড়াচড়ায় কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। আচ্ছন্ন ভাবটা এক নিমেষে কেটে গিয়ে আয়নার চোখে-মুখে তীব্র দুশ্চিন্তা ফুটে উঠল। সে খুব সাবধানে নড়াচড়া করার চেষ্টা করল, যাতে কোনোভাবেই মাহিরের চোট পাওয়া হাতে কোনো আঘাত না লাগে।

আয়নার এই অসময়ের দুশ্চিন্তা মাহিরকে প্রায় পাগল করে তোলার জন্য যথেষ্ট ছিল। সে তাকে চেপে ধরল।
সে এক বুক হতাশ আর ক্ষ্যাপাটে নিশ্বাস ছাড়ল, চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল ওর। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে বলল, ওহ, তো এখন তোমার আমার হাতের জন্য চিন্তা হচ্ছে?
ওর গলার আওয়াজে এক মরিয়া আকুলতা,
ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাক গে হাত, আই ডোন্ট কেয়ার। আমি আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করতে পারছি না।

এই দৃঢ় ঘোষনা আয়নাকে মিষ্টি যন্ত্রণায় দুমড়ে দিল। 
আয়না এবার আর ঘাবড়ে গেল না, বরং ওর ভেতরের সমস্ত অনমনীয়তা এক নিমেষে গলে মোহনীয় কোমলতায় রূপ নিল।

সে আদরের সাথে নিজের দুই হাতে ক্ষিপ্ত, ব্যাকুল মাহিরের মুখটা তুলে ধরল। ওর শান্ত ভালোবাসা দিয়ে সে একটু একটু করে এই ক্ষ্যাপাটে পুরুষটাকে শান্ত করতে চাইল।

এবার সে নিজে থেকে মাহিরকে ধীরে ধীরে চুমু খেল। ওর আঙুলগুলো খুব আলতো করে মাহিরের চুলের ভেতর বিলি কাটতে লাগল, আরনিচু গলায় অস্ফুটে স্বরে ভালোবাসার কথা আওড়াতে লাগল।

মাহিরও ধীরে ধীরে সেই কোমলতার কাছে নতি স্বীকার করল, গলে গেল একদম।

সে কাঁপানো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। আয়নার স্পর্শের ওপর ভর করে নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তারপর চতুরতার সাথে আয়না ওদের অবস্থানটা বদলে দিল।
মাহির কিছু বুঝে ওঠার আগেই, আয়না ওদের দুজনকে ঘুরিয়ে দিল, যার ফলে এবার মাহির নিচে বিছানায় পিঠ ঠেকাল আর আয়না চলে এলো ওর ওপরে। এই আচমকা উলটপুরাণ মাহিরকে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত করে দিল। এক সেকেন্ডের জন্য সে স্রেফ স্তব্ধ হয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে রইল, ওর চোখে স্পষ্ট বিস্ময়। 

আয়নার মুখ এখনো লজ্জায় আর আবেগে লাল হয়ে আছে, সে এক বুক ভালোবাসা নিয়ে ওপর থেকে মাহিরের দিকে তাকাল। তারপর নিজে থেকে ঝুঁকে এসে এবার প্রথম চুমুটা সে-ই খেল। স্বামীর হাতে কোনো চোট লাগতে দিবে না সে!

কোনো লজ্জা ছিল না আর। কোনো দ্বিধা বা জড়তাও ছিল না। নিজের দু-হাতে মাহিরের মুখটা আগলে রেখে সে আলতো করে চুমু খেতে লাগল। মাহিরের নিশ্বাস তৎক্ষণাৎ আটকে গেল। ওর চেহারায় অসহায় ও পরম তৃপ্তির ভাব ফুটে উঠল। সে বুঝতে পারে আয়না শুধু ভালোবাসার উত্তর না, সে আজ বুক চিরে ওকে নিজের একমাত্র আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছে।

আর এই অনন্য উপলব্ধিটা আজ রাতে মাহিরকে অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে অনেক বেশি গভীরভাবে ছুঁয়ে গেল।

রেডিওতে তখনো বাজছে, হে সখা! মম হৃদয়ে রহো…..

দীর্ঘ শীত শেষে তাদের জীবনে শুভ, রঙিন বসন্ত এসেছে। দুজন দুজনকে কড়ায়-গণ্ডায় অর্জন করে নিয়েছে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp