আমি হতবাক, নির্বাক। ইনি আমার সাহেব-ই তো। আমার চোখ অক্ষিকোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলো। এই কাঠখাইস্টা লোক কিনা আমার খোঁপায় গোলাপ গুঁজলেন? আমার বহুদিনের শখ ছিলো এটা। বহু দিন বললে ভুল হবে। বছর পেরিয়ে গেছে। অনাকাঙ্খিত কিছু পেলে মন আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে। হৃদয় তরল হয়। আমার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো না। সাহেব তা হলে জানেন আমার ফুল পছন্দ? আমার চোখ টলমল করে উঠলো মুহূর্তেই। আবেগী স্বরে শুধালাম,
"এই ফুল আমার জন্য?"
"না আমার দশটা বউ আছে। আজকে তোমার নাম্বার তাই তোমাকে দিলাম। যন্ত্রণা, যতসব"
ব্যাস আমার আবেগের উপর একেবারে ঠান্ডা পানি ঢেলে দিলেন মহাশয়। উলটো আমার খোঁপা থেকে ফুলটা খুলে বললেন,
“থাক, তোমার তো লাগবে না। আমি আমার অন্য বউদের-ই দিয়ে দিব।“
বলেই যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আমি খপ করে তার কলারটা টেনে ধরে বললাম,
“মশকরা করেন আপনি?”
“গ্যাদা পেয়ারা দেখি পেয়ারা মাখার মতো ঝাল হয়ে গেছে!”
বলেই আমার গাল টানলেন সাহেব। আমার কপালে আসা চুলগুলো আলতো হাতে কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে কিছুসময় তাকিয়ে রইলেন আমার মুখের দিকে। তার দৃষ্টি নরম। কোনো রুক্ষতা নেই। মনে হলো তিনি পরম যত্নে তার প্রিয় জিনিসকে দেখছে। ঠোঁটের কোন বাঁকালেন কিঞ্চিত। আমার মুখ তখনও রাগে লাল হয়ে আছে। এই হুতুমটা এমন কেন? একটু আদর করতে পারেন না। আমি অনুযোগের স্বরে বললাম,
“আপনি কি জানেন আপনি একটা খারাপ লোক। আপনাকে মোটেই ভালোবাসা উচিত না। মানুষ তার বউকে কত শত মিষ্টি কথা বলে। আর আপনি?”
সাহেব হাসলেন এবার। তারপর ঝট করে আমাকে কোলে তুলে নিলেন। আমি আকস্মিক ঘটনার টাল সামলাতে তার গলা পেঁচিয়ে ধরলাম। আমার হাতের নখ বিঁধলো তার গলায়। অথচ তিনি নির্বিকার। খুব আস্তে বললো,
“তোমার সাত জন্মের ভাগ্য আমার আহ্লাদের ভাগীদার হয়েছো?”
“এই আপনার আহ্লাদের নমুনা?”
“এর থেকে বেশি আহ্লাদ করলে মাথায় উঠে নেত্য করবে। এমনিতেও তো কম নেত্য করো না। তখন আমার আছাড় মারতে ইচ্ছে হবে।“
“ওহ তাই বুঝি?”
“সন্দেহ আছে?”
“আমাকে আছাড় মারতে পারবেন?”
তিনি আমার চোখে চোখ রাখলেন। শান্ত দৃষ্টি যেন অনেককিছু বলে দিল। এই দীঘির মতো শান্ত দৃষ্টিতে ডুবে গেলেও হয়তো ক্ষতি নেই। আমি তার গলায় মুখ গুজলাম। তিনি পরম যত্নে আমাকে নিজের সাথে লেপ্টে রাখলেন। একবার কোমল স্বরে ডাকলেন,
“পেয়ারা?”
“হু?”
কিছুসময় আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আমার মুখখানা খুব আলতো করে ছুঁলেন। তার না বলা কথায় কি জানে ছিলো। তিনি গাঢ় চুম্বন আঁকলেন আমার কপালে। চুমু গাঢ় হতে লাগলো। তার গালের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি বিঁধলো আমার নরম ত্বকে। তার এই আদরটা আজ ভিন্ন লাগলো। কোনো ব্যস্ততা নেই। যেন অনেক সময় হাতে। তিনি খুব যত্নে আমার প্রতিটা অংশে বিচরণ করলেন। আমি আবেদনময়ী সেই মুহূর্তের আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠলাম। আমার চোখ থেকে যখন জল গড়ালো তিনি তা শুঁষে নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে রইলেন তার উষ্ণ আলিঙনে। কতটা পথ পাড়ি দিলাম। তাই না? একটা সময় তার সেই স্পর্শ ভয় হত। অথচ এখন সুখময় লাগে। মনে হয় তার বুকের এই উষ্ণতার আচ্ছাদনেই আমার মৃত্যু হোক। সাহেব ছাড়া এই পৃথিবীটা বড্ড মলিন। আমি কিভাবে থাকবো এই মানুষটি ছাড়া? সাহেব নেই এমনটা কল্পনা করলেও আমার বুকটা ধরাস করে উঠে। ভাবতেই আমার চোখ ভিজে এলো। তিনি হুট করে সতর্ক হলেন। কুন্ঠিত স্বরে শুধালেন,
“কষ্ট হচ্ছে?”
আমি উত্তর দিতে পারলাম না। বুক ভার হয়ে গেল। কথাগুলো জমাট বেঁধে গেলো। আমি সাহেবকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে ডুকরে উঠলাম। সাহেব বিপন্ন চোখে চাইলেন। আমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। শেষমেশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“আমি ভেবেছিলাম আমার গ্যাদা বুঝি বড় হয়ে গেছে, হাহ!”
—————
আজ সাহেবের নতুন অফিস। সাহেব আবার আগের জীবনে ফিরে যাবেন। এই চাকরির বেতনটা আগের থেকে কম। খুব বড় কোম্পানিও না। তবুও সাহেব এই চাকরিটা করার জন্য উদ্গ্রীব। কারণ এই গত চারমাসের বেকারত্ব তাকে জর্জরিত করে ফেলেছে। অভাবের দিনগুলোর কথা মনে পড়তেই অন্তস্থল থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। আমি মনের মত করে সাহেবের জন্য চা বানালাম। গত কালকের একটু দুধ ছিলো। এই কয়েকমাসে সাহেব দুধ চা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। দুধ কিনতে হত বারবার। যা দুধ কিনতেন তা শুধু কৃপা আর মায়ের জন্যই বরাদ্দ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেই তিনি খেঁকিয়ে বললেন,
“বয়স হয়েছে আমার, দুধ চা খেয়ে খেয়ে অসুস্থ হব নাকি?”
কি এমন বয়স? ছত্রিশ বছর কি অনেক বেশি? ঘরে এসে দেখলাম সাহেব একটা জামার সাথে কুটকুট করছেন। আমাকে দেখেই ভ্রুকুটি কুঁচকে বললেন,
“বোতাম লাগাতে পারো? একটু লাগিয়ে দাও তো। ছিড়ে গেছে।“
“পারবো না কেন? শার্ট টা খুলে দিন।“
“দেরি হচ্ছে। সময় নেই। এভাবেই পারলে কর। নয়তো লাগবে না।“
আমি চায়ের কাপটা রেখে বিরক্তি নিয়ে বললাম,
“আর পারি না আপনাকে নিয়ে। দেখি আমার দিকে ফিরুন”
লোকটার বুকের কাছে আমার মাথা। এতো জিরাফের সমান লম্বা হতে কে বলেছে। আমি এদিক ওদিক তাকালাম। একটা টুল খুব দরকার। নয়তো পায়ের আঙ্গুলের উপর ভর করে এই জিরাফের কলার অবধি হাত নিয়ে বোতাম লাগানো দূর্বিসহ ব্যপার হবে। সাহেব বিষয়টা যেন লক্ষ্য করলেন তার সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। আমার সামনে এসে ঝুঁকলেন খানিকটা। বিদ্রুপ করে বললেন,
“গ্যাদু হাত যায় না আমার কলারে? রাতের বেলা তো ঠিক শাকচুন্নির মতো লম্বা হয়ে যায়।“
আমি চোখ ছোটছোট করে তাকালাম তার দিকে। কলারটা টেনে ধরে তাকে আরও নিজের দিকে ঝুঁকালাম। সাথে সাথেই তিনি মাজা ধরে বললেন,
“করতেছো কি? এখনই তো আমার মাজাটা অক্কা পাইতো।“
“বেশ হইতো। বুইড়ার রঙ্গ শেষ হয় না! আরেকটা টু টা করলেই সুই ফুঁটিয়ে দিব।“
সাহেব আমার গালে একটা জোরে কামড় বসালেন। এই লোকের এই এক বদঅভ্যাস। আমি তাকে ঠেলে কড়া স্বরে বললাম,
“কি সমস্যা?”
“লাল পেয়ারা খেতে ইচ্ছে হলো।“
“আসল বড় নকটা তো আপনি। বুইড়া বয়সে ভীমরতি।“
আমি ঝটপট তার বোতামটা সেলাই করে মুখটা উচিয়ে সুঁতোটা কাটতে যাবো, অমনি তিনি আমার কোমড় চেপে নিজের কাছে নিয়ে এলেন। তার হৃদস্পন্দন স্পষ্ট। আমি সুতো কেঁটে তার দিকে তাকাতেই দেখলাম। অদ্ভূত প্রগাঢ় নয়নে চাইলেন আমার দিকে। আমি ভ্রু নাচিয়ে বললাম,
“কি?”
বরাবরের মতোই মানুষটা কিছু বললো না। আমার কোমড় ছেড়ে দিলেন। চা তখন ঠান্ডা হয়ে গেছে। সাহেব সেই ঠান্ডা চাই খেলেন। বাঁকা হেসে বললেন,
“এই ক মাসে তো দুধ চায়ের স্বাদ ভুলে গিয়েছিলাম।“
—————
দুঃখের সময়গুলো যতটা প্রলম্বিত হয় খুশির সময়গুলো ততটাই দ্রুত যায়। আমাদের জীবনের গতি আগের মত হয়ে গেল। সাহেব নতুন চাকরিতে মনোযোগ দিলেন। এদিকে মিষ্টি আপুর ডেলিভারি দিন ঘনিয়ে এলো। তখন পৌষ মাস। শীত ধীর পায়ে নেমে এসেছে ধরনীতে। সজীবতা শুষে শীতলতা বিরাজ করলো। পাতা শুকিয়ে এসেছে। বিকালটা হয় তাড়াতাড়ি। ছয়টা বাজার আগেই তখন সন্ধ্যা নামে। এমন এক পৌষের বিকালে মিষ্টি আপুর ব্যথা উঠল। কি চরম ব্যথা। আমি তখন বাচ্চাদের ড্রয়িং শেখাচ্ছিলাম। জরিনা আপা আর কৃপা রান্নাঘরে কিছু একটা আকাম করছিলো। জরিনা আপার নতুন কাজ হলো বিকেল হলেই আতরাঙ্গি কোনো একটা নাস্তা বানাবে। কখনো তা ভালো হয় কখনো না। হঠাৎ শুনলাম মিষ্টি আপুর চিৎকার,
“ভাবি, ভাবি”
আমি বাচ্চাদের ড্রয়িং করতে দিয়ে ছুটে গেলাম তার ঘরে। মিষ্টি আপুর ঘরে গিয়ে দেখলাম তিনি পেট আঁকড়ে ব্যথায় কুকড়াচ্ছেন। পানি ভেঙ্গেছে। সেই পানিতে তার পেটিকোট, মেক্সি ভিজে গেছে। মিষ্টি আপু আর্তনাদ করে বললেন,
“ভাবি, খুব ব্যথা করছে। আমি আর পারছি না।“
আমার মুখ রক্তশূণ্য হয়ে গেলো। সাহেব ঘরে নেই। আমি একা কি করে মিষ্টি আপুকে নিয়ে যাবো? জোরে জোরে কিছু সময় শ্বাস ফেললাম। দ্রুত কয়েকটা জামা একটা থলেতে নিলাম। জরিনাকে বললাম,
“জরিনা আপু, বেবি ট্যাক্সি ঠিক কর একটা”
“তুমি একা লয়ে যাইবা?”
“এখন এসবের সময় নেই। তুমি দ্রুত কর।“
বাচ্চাদের ছুটি দিয়ে দিলাম। মাকে বললাম,
“আপনি কৃপাকে রাখুন। আমি মিষ্টি আপুকে নিয়ে হাসপাতাল যাচ্ছি।“
মা আমার হাত ধরে বললেন,
“পারবা?”
“আল্লাহ আল্লাহ করুন।“
সেদিন আমার মধ্যে অন্য এক কাননকে খুঁজে পেলাম। যে ভয়ে ফ্যাচফ্যাচ করে না। যে সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আমি কাছের হাসপাতালে নিয়ে গেলাম তাকে। সেখানে ল্যান্ডলাইনে সাহেবের অফিসে জানিয়ে দিলাম। সাহেব শুনতেই প্রথম প্রশ্ন করলেন,
“তুমি একা ওকে নিয়ে এসেছো?”
“হ্যা, না আসলে দেরি হয়ে যেত। উনাকে এখনই ভেতরে নিয়ে গিয়েছেন। আপনি দ্রুত আসুন। রক্ততো লাগবে।“
সন্ধ্যা ছয়টা পনেরোতে মিষ্টি আপুর ছেলে হলো। ছোট একটা দেহ নার্স আমার কোলে দিলেন। মিষ্টি আপুর হুবহু জেরক্স কপি। কি কান্না দুধ খাবার জন্য। সাহেব তত সময় পৌছে গেলেন। আযান দিলেন তিনি ছেলের কানে। আমার মনে হলো আজ যদি শাহনেওয়াজ বেঁচে থাকতেন পৃথিবীর সকল সুখের ঝুলি এনে মিষ্টি আপুর কোলে ঢেলে দিতেন। মানুষটা নেই। এই ছেলেটি বাবার ছায়া বাদে বড় হবে। আমি জানি সাহেব কখনো তাকে কোনো কিছুর অভাববোধ করতে দিবেন না। তবুও আফসোস হলো খুব। মিষ্টি আপু তখন ক্লান্ত। খুব পরিশ্রম গিয়েছে। ঔষধ দেওয়া হয়েছে। তাই ঘুমিয়ে আছেন। আমি মনে মনে দোয়া করলাম আল্লাহ যেন এই ছেলেটার ভাগ্যে কোনো দুঃখ না রাখে। পৃথিবীতে আসার আগেই জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখটা সে ভোগ করেছে। আর কোনো দুঃখ যেন তাকে না ছোঁয়।
—————
মিষ্টির আপু শাহনেওয়াজ সাহেবের নামের সাথে মিলিয়ে ছেলের নাম রাখলেন নেওয়াজ। কৃপার ভাইয়া বাবু সে। মেয়েটা আমার সারাদিন ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবে। নেওয়াজ খুব শান্ত বাচ্চা। হয়তো ছোটকাল থেকেই সে বুঝেছে তার মাকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। মাঝে মাঝে মনেই হয় না ঘরে বাচ্চা আছে। আমি সাহেবকে বলি,
“নেওয়াজও বাচ্চা, আপনার মেয়েও বাচ্চা। তিনটা মাস কি জ্বালানটাই না জ্বালালো।“
সাহেব বাঁকা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলেন,
“বাচ্চারা মানুষ বুঝে।“
আমি চোখ ছোট ছোট করে শুধালাম,
“কি বুঝাতে চাইছেন? আমি খারাপ বলে আমাকে বেশি জ্বালাতন করেছে?”
“বাহ তুমি তো সেই বুদ্ধিমান”
অসহ্য লোকটাকে নিয়ে আর পারলাম না।
—————
আমাদের দিনগুলো খুব দ্রুত কাটতে লাগলো। দেখতে দেখতে আমার মেয়ে চার বছর হয়ে গেল। নেওয়াজের বছর আঠারো মাস। আমাদের ব্যবসাটা পুরোদমে চলছে। আমাদের মাহমুদ সাহেবের ক্যাপ্টেন হবার অপেক্ষা। তারপর তার বিয়ের কথা চালানোর জন্য আমি প্রস্তুত। তবে আমার শ্বাশুড়ি মায়ের খুব ইচ্ছে মিষ্টি আপুকে বিয়ে দিবেন। কতটুকুই বা বয়স তার। মাত্র আঠাশ বছর। একটা ছেলেকে নিয়ে কি করে বাকিটা জীবন কাটাবে সে এই ভাবনা তাকে খুব ভাবায়। একবার উশখুশ করে সাহেবের কাছে কথাটা বলেও ছিলেন। সাহেব কঠিন ভাষ্যে জানিয়েছেন,
“মিষ্টির বিয়ে আমি দেব না। আমি আমার বোনকে ফেলে দিচ্ছি না।“
কথা ঠিক। তবে জীবনের এই সময়টায় একটা সঙ্গীর খুব প্রয়োজন হয়। আমি যাই করি না কেন, আমার মনে একটা সাহস আছে আমার সাহেব আছেন। তিনি সামলে নিবেন আমাকে। অবশ্য সাহেবের কথার যুক্তিও আছে। নেওয়াজকে নিজের ছেলের মত করে আপন করে নিবেন এমন মানুষই বা কোথায়? কত এমন দেখেছি, দ্বিতীয় বিয়েতে বাচ্চাকে গ্রহণ করা হয় না। মাঝে বাচ্চাটার ভবিষ্যতটা ভেসে যায়। আমি মাকে ভুংভাং বুঝাই। শান্ত রাখি। তবে একদিন আমার সকল চিন্তার অবসান ঘটলো। এমন একজন মানুষ এলেন আমাদের জীবনে যিনি শুধু মিষ্টি আপুকেও না বরং নেওয়াজকেও গ্রহণ করতে চাইলেন। মানুষটা আর কেউ নন, আদনান ভাই।
আদনান ভাইয়ের সাথে আমাদের দেখা হয়েছিলো এক দোকানে। আমি আর মিষ্টি আপু বাজার করতে গিয়েছিলাম। আদনান ভাই সেখানে এসেছিলেন ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে একটা অভিযানে। তাকে এতবছর পর দেখে আমি সত্যি হতবাক হয়েছিলাম। পুলিশসহ বেশ কয়েকটা দোকানে তিনি তল্লাশী করে ডেট উত্তীর্ণ জিনিসপত্র বের করেছিলেন। সেই সময় আমাদের চোখাচোখি হয়। তিনি-ই প্রথমে কথা বলেছিলেন,
“কানন না? কি খবর?”
আমি স্বাভাবিক থাকলেও মিষ্টি আপু খুব অস্বস্তিতে পড়লেন। তিনি প্রায় নিজেকে গুটিয়েই ফেলেছিলেন। আদনান ভাই তাকে দেখে বললেন,
“তুমি কেমন আছো মিষ্টি?”
“জি ভালো।“
“শাহনেওয়াজ সাহেব ভালো আছেন?”
মিষ্টি আপু উত্তর দিলেন না। আপু মৃদু স্বরে বললাম,
“উনি মারা গেছেন প্রায় দু বছর।“
“ওহ। সরি, জানতাম না।“
“আপনি আপনার খবর বলুন না।“
“আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো আছি। একজনের দোয়ায় এখন আমি আর বেকার নেই। তিন বছর হয়েছে আমার চাকরিটা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে।“
“আর বিয়ে শাদী?”
আদনান ভাই প্রতীভ হাসলেন। মৃদু স্বরে বললেন,
“তোমার ছেলে মেয়ে কেমন আছে? শেষবার যখন দেখেছিলাম তখন তো এক্সপেক্টিং ছিলে।“
“আমার একটা মেয়ে হয়েছে। আর মিষ্টি আপুর একটা ছেলে। মাশাআল্লাহ খুব ভালো আছে তারা।“
“মাহমুদ?”
“ল্যাফটেনেন্ট আমাদের মাহমুদ সাহেব। আপনি কিন্তু বাসায় আসবেন?”
তিনি গভীর নয়নে চাইলেন মিষ্টির আপুর দিকে। মিষ্টি আপু মাথা নত করে রইলেন পুরোটা সময়। যেন পালাতে পারলেই বাঁচেন। আদনান ভাই বললেন,
“আচ্ছা, আসবো।“
“ভাবিকে নিয়ে আসবেন।“
“ভাবি নেই কানন। আমার বিয়ে হয় নি।“
আমার মুখ ভোঁতা হয়ে গেলো। আদনান ভাই আমাকে সেদিন লিফট দিতে চাইলেন। কিন্তু মিষ্টি আপু নিলেন না। আমি সেদিন আদনান ভাইয়ের চোখে ঠিক সেই গাঢ়ত্ব দেখলাম যা চারবছর আগে দেখেছিলাম। আদনান ভাই কি এখনো মিষ্টি আপুকে ভালোবাসেন? প্রশ্নটা বারবার আমার মনে ঘুরপাক খেলো? খুব কি মন্দ হবে যদি আদনান ভাইয়ের সাথে মিষ্টি আপুর বিয়েটা হয়? আদনান ভাই কি মিষ্টি আপু এবং নেওয়াজকে একসাথে মেনে নিতে পারেন না?
·
·
·
চলবে……………………………………………………