নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া - পর্ব ০৪ - লাবিবা ওয়াহিদ - ধারাবাহিক গল্প

নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া
          মাহফুজ শাহ'র 'শাহ মঞ্জিল' ঢাকার কোলাহল থেকে কিছুটা দূর, পূর্বাচলে। মাহফুজ সাহেব বরাবরই শান্তিপ্রিয়, ঝামেলা পছন্দ করেন না। এজন্য গুলশান, বনানীতে তার বাড়ি থাকলেও এই পূর্বাচলের বাংলোতেই তিনি ঘাঁটি গেড়েছেন। থাকছেনও অনেক বছর ধরে এই শান্তির নীড়ে। এই বাড়িটা মাহফুজ সাহেব মনের মতো সাজিয়েছেন। আর ভেতরটা সাজিয়েছেন শাহেলা নিজে। মাহফুজের এত বড়ো সম্রাজ্যে তার আপন ভাই না থাকলেও বোন আছে দুজন। তবে মামাতো ভাই একজন আছেন, তিনি পরিবারসমেত শাহ মঞ্জিলেই থাকে। এই পরিবারে আবার চার ছেলে-মেয়ে। দুই ছেলের বউ আছে, বাচ্চা আছে। আরেক মেয়েও বিবাহিত। তবে ছোটো মেয়ে তর্ষা অবিবাহিত, এই বাড়িতেই থাকে। 

ইসমাত সুন্দর এক আনারকলি লাল জামা পরে এসেছে সাহিদের সাথে। এসেই দেখল শাহেলা হুইলচেয়ারে করে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে। সকলকে তীক্ষ্ণ গলায় আদেশ করছেন। প্রায় মাসখানেক পর ছেলে আর ছেলের বউ আসছে, আয়োজনের কোনো কমতি রাখবেন না। অথচ ছেলে আর ছেলের বউ যে তার পেছনে দাঁড়ানো সে খেয়াল নেই। সাহিদ নীরবে মায়ের কর্মকাণ্ড দেখল। কিন্তু মা বলে ডাকল না। অথচ তার মা বলে ডাকার কথা। একটা নীরব অভিমান তার গলায় সে ভীড় করল, যার ফলে গলা দিয়ে শব্দ বেরুলো না। একজন মেইড শাহেলার উদ্দেশে বলল,
--"সাহিদ স্যার এসেছেন।"

শাহেলা তখনই পিছে চেয়ে দূর্বল হাসি দিল। মেইড তার হুইলচেয়ার চালিয়ে ছেলের কাছে নিয়ে গেল। শাহেলা হাঁটতে পারেন না এমন নয়। তিনি আসলে বেশি চললেই তার হাঁপানির সমস্যা হয়। আগের মতো ছুটতে পারেন না, অথচ এই পুরো বাড়িটা নিজ হাতে শাহেলাই সাজিয়েছিলেন। অথচ উপরের ঘরগুলোকে তিনি সবসময় দেখতে যেতে পারেন না। তার উপর এত বড়ো বাড়ি, এখান থেকে ওখানে যেতে যেতে হয়রান হতে হয়। একসময় বড়ো বাড়ির শখ ছিল। আল্লাহ পূরণ করেছেন কিন্তু সেই শখের বাড়িতে এখন শান্তিতে চলাচল করতে পারেন না, সিঁড়ি বাইতে পারেন না। উলটো স্বামীর কাছে অভিযোগ করেন, এত বড়ো বাড়ির কী দরকার ছিল? আগের বাংলো নাকি এই বাড়ির চেয়ে ঢের ভালো।

 মাহফুজ সাহেব বুদ্ধি করে লিফট সিস্টেম রেখেছেন, কিন্তু সেটা শাহেলা ব্যবহার করতে চান না। এতে নিজেকে আরও অকেজো অনুভব হয়। 

ছেলের কাছে আসতেই শাহেলা উঠে দাঁড়িয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন। আজ কাঁদলেন না ছেলেকে দেখে, প্রতিবারই কাঁদেন। কারণ সাহিদ তার কান্না দেখতে পারে না, মাকে প্রতিবার বকা লাগাবে,
--"মম! আ'ম অলরাইট, স্টপ ক্রাইং! এভাবে কাঁদলে কিন্তু আমি আর আসব না বাড়ি।"

এবার আর এই হুমকি শোনার সাহস হলো না ওনার। চোখ ভরে এলেও নিজেকে সামলে নিলেন। মা-ছেলের জড়িয়ে ধরা শেষ হলে ইসমাতও এগিয়ে আসল। শাহেলা বউমাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে বললেন,
--"দেরী হলো যে?"

ইসমাত সাহিদের দিকে একপলক তাকিয়ে বলল,
--"জ্যাম ছিল।"

যদিও এটা ডাহা মিথ্যে, তবুও ইসমাতের বলতে হলো। সে নিশ্চয়ই চাইবে না মা ছেলের মাঝে বিবাদ সৃষ্টি করতে। এমনিতেই এই বিয়ে নিয়ে শাহেলা সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকেন, দুইদিন পরপর বিভিন্ন কারণে ঝগড়াঝাটির কথাও শাহেলার কানে পৌঁছে যায়। তখন শাহেলা তাকে কল করে এক গাদা কথা শোনাবেন। সাহিদ অবুঝ, বুঝে কম চেঁচায় বেশি, বাচ্চা মানুষকে বোঝালেই হয়, ধৈর্য ধরো, সব ঠিক হয়ে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদিসহ আরও কত কি। নির্ঘাত ইসমাত হয়েছে অতিরিক্ত ঠান্ডামেজাজী মানুষ, মুখ বুজে সহ্য করে যায়। ইচ্ছে তো করে সাহিদকে তুলে আছাড় দিতে। কিন্তু মেয়ে হয়ে এটা তার পক্ষে সম্ভব না। 

শাহেলা যে ছেলেকেও ধমকান না এমন না। ছেলে তার কাউকে ভয় পায় না, নিজের বাবা-মাকেও না। কিন্তু বাবা-মা সর্বদা ধমকে, হুমকি দিয়ে সোজা আঙুল করে রাখার চেষ্টা করছেন। নয়তো তাদের ছেলে ছিল আরও বেশি উগ্র, বদমেজাজী, একরোখা জেদি। একে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভবের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যখন, তখনই শাহেলা হার্ট এট্যাক করলেন।

 ছেলেকে ঘরে ফেরানোর অযুহাতে প্রতি বাবা-মায়ের মতো ওনারাও একই কাজ করলেন, জোর-জবরদস্তি ছেলেকে বিয়ে দিলেন। তাও যার তার সাথে নয়। এমন একজনের সাথে যে কিনা তার ছেলেকে সঠিক পথে আনলেও আনতে পারে। ইসমাতের মতো বুঝদার মেয়ে তাদের আশেপাশে আর দুটো ছিল না। বয়স বড়ো কোনো বিষয় না। কোথাও লেখা নেই যে বয়সে বড়ো মেয়ের সাথে বিয়ে দেওয়া যাবে না। বিয়ের পরিস্থিতি অবশ্য ভিন্ন ছিল।

তাদের বিয়েটা এখনো গোপন। ইসমাতের বিশেষ অনুরোধেই এই ব্যবস্থা। সাহিদও চাচ্ছিল না জানাজানি হোক, তার ইমেজ নষ্ট হবে। যেখানে তার জীবন নিয়ে এত এত পরিকল্পনা, যেখানে সাহিদ বিয়েতে রাজিই নয় সেই বিয়ে ঢোল পিটিয়ে বলার মতো মূর্খ নয় সে। তবে এই চাওয়ার বিরুদ্ধে আছেন মাহফুজ সাহেব। তার বড়োই ইচ্ছে ছিল সবাইকে জানিয়ে দিবে তার একমাত্র ছেলের বিয়ের সম্পর্কে। কিন্তু বাঁধ সাধলেন শাহেলা, ওনারা বহু কষ্টে ছেলেকে বিয়ে করিয়েছেন, ছেলের এটুকু ইচ্ছে না মানলে আবার হিতে-বিপরীত হবে। এজন্য ভয় বুকে জড়িয়েই ছেলের ইচ্ছে তিনি মেনে নিলেন। বিয়ের গল্প নাহয় আরেকদিন শোনা যাবে। 

মাহফুজ সাহেব তবুও দমে রইলেন না। ছেলের সবকিছুর ওপর নজরদারি করলেন। ছুঁতো খুঁজতে লাগলেন কীভাবে বিয়ের খবরটা জানাজানি করাবেন, সেক্ষেত্রে পুরোপুরি সফল না হলেও কয়েক মাস আগে সাহিদের বন্ধুদের জানিয়ে দিলেন। সেই থেকে সাহিদের বন্ধুরা প্রায়ই তাকে কটাক্ষ করে, টিটকারি করে। সাহিদের রাগের কারণে অবশ্য কেউই সাহস করেনি কারো সাথে এ সম্পর্কে টু-শব্দ করার। তাই এখনো বিয়ের খবরটা অত একটা জানাজানি হয়নি। 

ওরা সোফায় বসতেই মাহফুজ সাহেব এলেন পাঞ্জাবি পরে আতর মেখে তৈরি হয়ে। তিনি ব্যবসায়িক কাজে চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন, আজ সকালেই ফিরলেন। মেইডকে ইশারা করে ছেলের কাছে পাঞ্জাবি আর সুগন্ধি পাঠালেন। ভালো-খারাপ জিজ্ঞেস না করে বললেন,
--"যাও রেডি হয়ে নাও। জামাআতের জন্য লেট হচ্ছে।"

সাহিদ প্রবল বিরক্তি নিয়ে উপরে চলে গেল। মাহফুজ সাহেব ব্যস্ত হয়ে পড়ল ছেলের বউমাকে নিয়ে। মাহফুজ সাহেব আবার প্রচণ্ড বউমা ভক্ত। মেয়েটা এক কথায় জিনিয়াস। আগে থেকেই তার ভাল্লাগত ইসমাতকে। কাজের প্রতি ডেডিকেশন, অনেস্টি তাকে বেশ মুগ্ধ করত। তিনি কখনোই স্বজনপ্রীতি পছন্দ করতেন না। তবুও মৃত বন্ধুর মেয়ে ভেবে সুযোগ দিয়েছিলেন। ইসমাতের বাবারও একটা ব্যবসা ছিল। বেশ ভালোই। ইসমাতের বাবার অনুপস্থিতিতে সেই ব্যবসা ছিল ইসমাতের দুই চাচার হাতে। ইসমাত সর্বোচ্চ এক বছর সেই অফিসে ছিল। এরপর চাচারা অসৎ ভাবেই সেই কোম্পানি হাত করে নিল। ইসমাতকে টিকতে দিল না। এ নিয়ে ইসমাত কেস করেও লাভবান কোনো সমাধান পায়নি। যতই হোক, এই কোম্পানি ইসমাতের মরহুম বাবা হুইল করে যায়নি। যেহেতু ভদ্রলোকের কোনো ছেলে নেই তাই কোম্পানির ভাগ চাচারাই নিয়ে নেন। 

ইসমাতের দাদীকে দিয়েছিল জায়গা-জমি, এছাড়া কোম্পানিতে সে নিজেও ভাগ পাননি। যেই কোম্পানি নিয়ে এত দ্বন্দ্ব, এত যুদ্ধ.. একসময় ইসমাত হাল ছেড়ে দেয়। তার চাচারা এমনিতেও কখনো তাদের দুই বোনের ঠিকঠাক খোঁজ-খবর নেয়নি। খুঁজেছে শুধুই স্বার্থ। তাই এই মেরুদণ্ডহীন মানুষদের সাথে যুদ্ধ করে সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছু না। তাই অত্যন্ত ঘৃণা আর রাগ নিয়ে তাকে অন্য কোম্পানি জয়েন করতে হয়েছে। যতই হোক, তার তো পেট চালাতে হবে। এক কেস নিয়ে আর কত বছর ছুটতে হবে?

ইসমাত যখন অন্য কোম্পানিতে অর্থাৎ আয়াজী এলিট-এ এলো, তার বছরখানেকের মাথায় শোনা গেল তাদের পুরাতন কোম্পানি ব্যাংকরাপ্টের মুখে পড়েছে। ঠিক ইসমাত আর সাহিদের বিয়ের আগে দিয়ে। ইসমাত ধারণা করে মাহফুজ সাহেবই এই কাজ করিয়েছেন। মাহফুজ সাহেব ততদিনে অনেক মুগ্ধ হয়েছেন ইসমাতের কাজ দেখে। তিনি অবশ্যই চাইবেন না এত ভালো একজন কর্মচারী হাতছাড়া করতে। তাই ইসমাতের শেষ আশাও বাতিল করলেন পুরাতন কোম্পানি ব্যাংকরাপ্টের মুখে ফেলে। সেই কোম্পানি এখন কেউ চিনে না, সেটা এখন এই আয়াজী গ্রুপেরই অংশ হয়ে গিয়েছে। মাহফুজ সাহেব প্রচন্ড চতুর লোক। চতুর না হলে এই ব্যবসায়িক মাঠে থাকা যায় না। ইসমাত অবশ্য এই সবই বুঝতে পারে। তার গায়েও যে বইছে ব্যবসার রক্ত। 

ইসমাত এ নিয়ে কখনো প্রতিবাদ করেনি। ইসমাত এতটাও মানব দরদী নয়— যে.. চাচারা তাকে, ইফরাকে এবং তার দাদীকে ভুগিয়েছে, তাদের জন্য সে কীভাবে দয়া করবে? চাচারা আপন ভাতিজিদের ওপর যেমন দয়া-মায়া দেখায়নি, সে দেখাবে তার প্রশ্নই ওঠে না। বাবার স্বপ্নগুলো ছিল এক কোম্পানিকে ঘিরে। ইসমাত চেয়েছিল মরহুম বাবার সেই স্বপ্নগুলো পূরণ করার চেষ্টা করবে। যারা মরহুম ভাইয়ের ইচ্ছে থেকেও নিজেদের লোভকে প্রাধান্য দিয়েছে তাদের সেই লোভই ধ্বংস করেছে। ইসমাত এখন তাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। দাদী শুরুর দিকে তাদের গোপনে সাহায্য করলেও তিনিও একসময় ছেলেদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলেন। তিনিও বুঝেন, ইসমাতের সাথে এটা বেঈমানি হবে। 

নিজের রুমে যাওয়ার মাঝে সাহিদের দেখা হয়ে গেল তর্ষার সাথে। তর্ষাকে দেখেও দেখল না সাহিদ। পাশ কেটে চলে যেতে নিলে তর্ষা তার পথ আগলে সালাম দিল। সাহিদ তাও অদেখা করে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিল কিন্তু তর্ষা তা হতে দিল না। কুড়ি বছর বয়সী তরুণী আবারও তার পথ আগলে বলল,
--"সালাম দিয়েছি। কেউ সালাম দিলে উত্তর দিতে হয়।"

সাহিদের কপালে অসংখ্য বিরক্তির ভাঁজ, মুখ যেমন তেঁতো হয়ে আছে। এতে করে বোঝাই যাচ্ছে কখন জানি সব রাগ তর্ষার ওপর ঝেড়ে দেয়। তাই সে তর্ষার মুখেও তাকাল না। প্যান্টের বেল্টে নিজের বাম হাত চেপে কাট কাট গলায় বলল,
--"তুই কবে থেকে সালাম দিস আবার?"

তর্ষার গায়ে লাগল কথাটা। তবুও সে বলল,
--"কেন? সালাম দিতে পারি না? সালামের উত্তর দাও এবার।"

তর্ষার ত্যাড়ামিতে সাহিদ বলল,
--"ওয়ালাইকুম আসসালাম। হ্যাপি?"

তর্ষা হাসল।
--"এভাবে একটু আমার কথা শুনলেই তো পারো।"

সাহিদ তর্ষাকে আপাদমস্তক দেখল। তর্ষা সেলোয়ার-কামিজ পরেছে, যা অনেকটাই বিরল। তর্ষা ওয়েস্টার্নে অভ্যস্ত। এ নিয়ে কেউ কখনো তাকে বাঁধা দেয়নি। তর্ষা সাহিদের নজর উপলব্ধি করে হেসে বলল,
--"ভালো লাগছে তাই না? গতকালই যমুনা থেকে নিয়ে এলাম। মা বলল যেকোনো ছেলে আমাকে দেখলেই সেন্সলেস হয়ে যাবে।"

--"সেন্সলেস হোক বা মরে যাক, আমি তোর এসব আব্লামি শুনতে দাঁড়িয়েছি?"

তর্ষার মুখে আঁধার নেমে এলো। সাহিদ প্রত্যেকবার তার মুড নষ্ট করতে পারদর্শী। এমন সময়ই পেছন থেকে ইসমাত এগিয়ে এলো। তর্ষার ইসমাতকে দেখে গা জ্বলে উঠল। ইসমাত এত সুন্দর ড্রেস কেন পরেছে? সে না বিজনেস ওম্যান, সে এতটা শালীনতা দেখিয়েই কি সাহিদের মায়ের মাথা নষ্ট করেছে? শাহেলা কি দেখে না ইসমাতের বুকে ওড়না নেই? তাহলে তার বেলায় এত রাখ-ঢাক কিসের? ইসমাত ভ্রু কুঁচকে বলল,
--"কী হচ্ছে এখানে?"

তর্ষা মুখে ঝামটা দিয়ে বলল,
--"এমনিতেই, ভাইয়ার সাথে একটু কথা বলছিলাম। এতে নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা নেই?"

--"না, নেই। কিন্তু কথা বলার সময় থাকে। এখন নামাজের টাইম, তোমার জেঠু নিচে অপেক্ষা করছে তর্ষা। সাহিদ নামাজ থেকে ফিরলে কথা বলে নিয়ো।"

তর্ষা গা পিত্তি জ্বলে উঠল। সাহিদের সাথে সে কথা বলবে কি বলবে না তা কি এখন এই মহিলার থেকে শুনতে যাবে সে? তার জায়গাটা তো দখল করেই বসে আছে এই মহিলা। তাহলে এখন এত কিসের অহংকার ইসমাতের? তর্ষা সাহিদকে ছাড়তে চাইছিল না, কিন্তু সাহিদ কারো ধার ধারে না। এমন সময়ই ইসমাতের পেছন থেকে তর্ষার মা ঝর্ণা গম্ভীর স্বরে মেয়েকে ডাকলেন, তার সাথে নিচে যেতে বললেন। এই মুহূর্তে মায়ের হুকুম অমান্য করতে পারল না। রেগে-মেগে লম্বা লম্বা পা ফেলে মায়ের সাথে চলে গেল। 

ইসমাত সাহিদের পিছু নিল, এতে সাহিদ বিরক্ত হয়ে পিছে ফিরল,
--"কী সমস্যা আপনার? এই বাড়িতে আসলে আপনার মনে পড়ে আপনি আমার বউ?"

ইসমাতের মুখেও অবশেষে বিরক্ত প্রকাশ পেল। 
--"হ্যাঁ পড়ে। কারণ এখানে আসলে আমাকে প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে মনে করিয়ে দেয়া হয় তুমি আমার হাসবেন্ড। একটা অভদ্র হাসবেন্ড!"

শেষ বাক্যটা ইসমাত মিনমিন করে বলল। 
--"ডোন্ট ফলো মি।"

--"তোমার মতো ছেলেকে ফলো করার মতো দূর্দিন আসেনি আমার। নেহাতই তোমার মা পাঠালেন।"

--"মমকে বলে দিবেন আমি কোনো বাচ্চা নই।"

বলেই সাহিদ হনহন করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। ইসমাত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই ঝগড়া-ঝাঁটি করতে করতে এক বছর কাটিয়ে দিয়েছে। আর কত বছর কাটাবে? ইসমাত আসতে চায়নি উপরে। কিন্তু শাশুড়ির কথাবার্তায় আজ অন্যরকম সুর। এই সুর ইসমাত চেনে। তিনি বাচ্চার কথা আকারে ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু ইসমাত সেটা না বোঝার ভান করে রইলো। তাচ্ছিল্যের সাথে হাসল সে। বিয়েটাই যেখানে অনিশ্চয়তার, সেখানে ফ্যামিলি প্ল্যানিং তো দুসাধ্যের ব্যাপার। নিজের জীবন উনুনে তুলেছে বলে মাসুম বাচ্চারও তুলবে নাকি? সাহিদ রুমে দাঁড়িয়েই পাঞ্জাবি পরতে পরতে দেখল ইসমাতের তাচ্ছিল্যের হাসি। সেই তাচ্ছিল্য নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা হলো না তার।

দুপুরে খাওয়ার সময়ে তর্ষা বেশ চেষ্টা করল সবাইকে নিজ থেকে সার্ভ করার। বিশেষ করে শাহেলাকে। তর্ষার ছোটো ভাবী তো শুনিয়ে শুনিয়ে মাহফুজ সাহেবকে বলছে, 
--"এই কয়েকদিন তর্ষা বেশ সাহায্য করেছে চাচী আম্মুকে। আজকের প্রেশারটাও তো তর্ষাই মাপল।"

ইসমাত নিরিবিলি সার্ভ করছে শ্বশুর-শাশুড়িকে। কেউ ছোটো ভাবীর কথায় বিশেষ গুরুত্ব না দিলেও সাহিদ কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
--"ডাক্তারি পড়ছে পেশেন্টের সেবা করার জন্যই। ইট'স নট এনি বিগ ডিল ভাবী!"

তর্ষার উজ্জ্বল মুখের আলো নিভে গেল৷ এতে চরম অসন্তুষ্টি দেখাল তর্ষার মাকে। তর্ষার মা ঝর্ণা ছোটো বউকে চোখ রাঙানি দিলেন। কি দরকার খামাখা নাক কাটার? এই ছেলের কথার কোনো ছিঁড়ি আছে? শাহেলা ছেলেকে থামালেন,
--"চুপ কর সাহিদ, মেয়েটা অনেক হেল্প করেছে আমাকে। এভাবে বলতে নেই। আপনজনদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয়।"

--"আমার এত সময় নেই মম। ইফ ইউ হ্যাভ টাইম, গো এহেএড!"

মাহফুজ সাহেব এবার মুখ খুললেন। গম্ভীর গলায় ছেলেকে ডাকলেন,
--"সাহিদ!"

সাহিদ এবার চুপ করল। এই খাওয়া-দাওয়ার মাঝে তার বাবার সাথে লাগার ইচ্ছে নেই। নয়তো টেবিল জুড়ে যা সাজানো খাবার আছে সব মেঝেতে লুটোপুটি খাবে। ইসমাত দেখল সাহিদের পাত খালি। শাশুড়ি তাকে চাপ দেওয়ার আগেই সাহিদের পাতে চিংড়ি তুলে দিল। সাহিদ এতে গরম চোখে তাকাল। শাহেলা তা লক্ষ্য করে বললেন,
--"বউমা, সাহিদের চিংড়িতে এলার্জি জানো না? চিংড়ি তো তোমার জন্য করা হয়েছে।"

ইসমাত সাহিদের গরম চোখকে এড়িয়ে বলল,
--"ভুল হয়ে গেছে।"

তর্ষা নিজের পাত এগিয়ে দিল। ইসমাত ততক্ষণে সাহিদের পাশে বসেছে খেতে। নীরবে তর্ষার প্লেট এগিয়ে দেওয়া দেখল সে।
--"সাহিদ ভাই, চিংড়িটা আমাকে দাও।"

সাহিদ প্রবল ইগো নিয়ে বলল,
--"নো থ্যাঙ্কস, একবার চিংড়ি খেলে তেমন কিছু হয় না।"

সাহিদ এই বিষয়টাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। জেদ ধরে সে চিংড়ি বাছল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর খাওয়ার রুচি হলো না। সে তার খোসা ছাড়ানো চিংড়িটা ইসমাতের পাতে দিতেই ইসমাত তড়িৎ তাকাল। 
--"আমাকে দিলে কেন?"

সাহিদ না তাকিয়েই বলল,
--"খাওয়ার মুড নেই।"
--"আমি চেয়েছি?"

--"তাও আপনি খেতে বাধ্য। খবরদার সিনক্রিয়েট করবেন না।"

—————

আজও অফিসে আরেক গল্প। সবাই আজও ইসমাতকে নিয়ে কানাঘুষা করছে। তবে আজ বড়ো স্যার এসেছে অফিসে, তাই সবাই নীরব। যা চলছে নিজস্ব মেসেঞ্জার চ্যাটগ্রুপেই। সোহান, স্বপ্নারা খেয়াল করল ইসমাতের বসের অফিসে আসা যাওয়া। কিন্তু ইসমাত তাদের কাউকেই বিশেষ পাত্তা দেয় না। সময় নেই তার। 

সে অফিসে যাই বলবে সবই কাজের কথা। কাজের বাইরে তাকে বিশেষ মাথা ঘামাতে দেখা যায় না। সোহান এতকিছু করেও ইসমাতের থেকে মন ঘুরাতে পারছে না। মেয়েটার ফর্মাল স্যুট, তীক্ষ্ণ নজর, রিমলেস ক্যাট আই চশমা সবকিছুই বেশ আকর্ষণীয়। তার প্রেমে পড়াটা দোষের কিছু না। কিন্তু কেন যে মেয়েটা তাকে প্রতিবার রিজেক্ট করে দেয়। বাকিদের সাথে যতই বলুক ইসমাত চরিত্রহীনা, কিন্তু তার আকর্ষণ সোহান কাটাতে পারে না। বড়োলোক ছোটো ছেলের মধ্যে এমন কি দেখে এই মেয়ে? কী সমস্যা?

ইসমাত আছে আরেক টেনশনে। সামনে নাকি সাহিদের পঁচিশতম জন্মদিন। গতবছর একপ্রকার বিয়ের রাগ থেকেই সাহিদ জন্মদিন পালন করেনি। কিন্তু এবার করতে হবেই। মাহফুজ সাহেবের এলিট শ্রেণির মানুষদের সাথে ওঠাবসা। এছাড়া আজ নয়তো কাল সাহিদেরই এই গ্রুপের গুরুদায়িত্ব নিতে হবে। তাই জন্মদিনকে অযুহাত করে তার সকলকে ইনভাইট করতে হবে, সাহিদকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। এমনিতেই ছেলেকে বিভিন্ন পার্টিতে নিয়ে যান তিনি, তবে তইনি চান এবার সমস্ত এটেনশন তার ছেলেকে ঘিরেই হোক। ছেলের মাস্টার্স শেষ হবে এই বছরেই। এখনই সৎ সুযোগ সব গুছিয়ে নেওয়ার। কিন্তু এসবের ভার পড়েছে ইসমাতের ওপরও। ইসমাত কোনো রকমে সবকিছু মাহফুজ সাহেবের পি.এ'র ঘাড়ে দিয়ে চলে আসতে নিচ্ছিল এমন সময়ই সোহান এসে তার সম্মুখে দাঁড়াল। ইসমাতকে উপর-নীচ দেখে বলল,
--"মিস. ইসমাত!"

--"বলুন।"

--"আমি মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের। চিনেছেন?"

--"জি।"

--"আপনাকে আমি প্রপোজ করেছিলাম, কী ভাবলেন সে বিষয়ে?"

--"সেদিন কানে শুনেননি?"

ইসমাতের কাট কাট উত্তর আবারও সোহানের গায়ে কাঁটা ফুটাল। 
--"দেখুন, আমরা কলিগ। আপনাকে পছন্দ করাটা অস্বাভাবিক না। আমি আপনাকে তো খারাপ প্রস্তাব দিচ্ছি না। বিয়েই তো করতে চাইছি।"

ইসমাতের গা গুলালো, তবে সে শক্ত রইলো।
--"সেদিনই আমার উত্তর দিয়েছিলাম আপনাকে। নেক্সট টাইম আমাকে বিরক্ত না করলে খুশি হব। এক্সকিউজ মি।"

বলেই ইসমাত ফাইল দেখতে দেখতে চলে গেল। এই পুরো কাণ্ডটা দেখল আবার মাহফুজ সাহেবের পি.এ। মোবাইলে কারো নাম্বারে টাইপ করে কল দিল। ওপাশ থেকে উত্তর এলে মধ্যবয়সী পি.এ রমজান সাহেব বললেন,
--"মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের ব্যাপারে খোঁজ করে জানাও। একজনকে আউট করার নির্দেশ আছে।"
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp