খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - পর্ব ২০ - মুশফিকা রহমান মৈথি - ধারাবাহিক গল্প

খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - মুশফিকা রহমান মৈথি
          আমার প্রশ্নের উত্তর পেতে আমার খুব একটা অপেক্ষা করতে হলো না। ঠিক সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই আদনান ভাই উপস্থিত হলেন আমাদের বাসায়। সেদিন ছিলো শুক্রবার। সাহেবের ছুটি। তিনি সকাল থেকে ঘরেই ছিলেন। শুক্রবার আমার সাহেবের রুটিন হয় ভিন্ন। তিনি ভোরে উঠেন। নামাজ পড়তে যান। এসে চা খাবেন। সেদিনের নাস্তা হয় পরোটা নয় খিঁচুড়ি। সেটা খেয়ে বাজারে যাবেন। গরুর মাংস কিনবেন। এসে আমার হাতে ধরিয়ে বলবেন,
 “পেয়ারা ভুনা করে রাধবে।“

বারোটার মধ্যেই তার গোসল শেষ হবে। একেবারে মাড় দেওয়া একটা পাঞ্জাবী পড়বেন। আতর লাগাবেন। তারপর তিনি রওনা দিবেন জুম্মা নামাজে। তিনি প্রায় নেওয়াজকেও নামাজে নিয়ে যান। নেওয়াজ হাটা শিখেছে কিন্তু কথা এখনো বলতে পারে না। সাহেবের মতে এখন থেকেই নেওয়াজকে শিখাতে হবে। ধীরে ধীরে সে নিজেই আল্লাহর প্রতি আসক্ত হবে। তিনি আসার পর মেয়েকে নিয়ে খেতে বসবেন। এখন নেওয়াজও মামার সাথেই খেতে বসে। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর তিনি একটু ঘুমাবেন। উঠবেন আসরের নামাজের সময়। শুক্রবার তিনি সব নামাজ মসজিদেই পড়ার চেষ্টা করেন। সেদিন আসরের নামায পড়ে এসে দেখলেন আদনান ভাই এসেছেন আমাদের বাসায়। তার আগমন এমন একটা সময় হবে আমি আশাও করি নি। তিনি মিষ্টি আর ফলমূল নিয়ে এসেছিলেন সাথে বাচ্চাদের জন্য খেলনা। মিষ্টি আপু একবারও ঘর থেকে বের হলেন না। তবে মা খুব খুশি হলেন। নামাজ পড়ে এসে বাহিরে পুলিশ দেখে প্রথমে হকচকিয়ে গিয়েছিলেন সাহেব। পরে তার সেই বিমূড়তা কাটলো। তিনি বেশ খুশি হলেন। আদনান ভাই ব্রাইট ছেলে বলে তার দাবি ছিলো। সে এখন একটা বড় পোস্টে আছে এটা তাকে বেশ আনন্দ দিলো। প্রথমে অনেক কথাবার্তা হলো। তারপর বেশ ইতস্ততভাব নিয়ে বললেন,
 “ভাইজান, আমি আপনার কাছে একটা অনুরোধ নিয়ে এসেছি। জানেন ই তো আমার মা-বাবা নেই। আমার অভিভাবকও তেমন কেউ নেই। একজন চাচা আছেন অবশ্য। কিন্তু তিনি নামমাত্র। তাই নিজের ব্যাপারে নিজেকেই বলতে হয়। আমি আসলে একটা উটকো আবদার করতে এসেছি। জানি না আপনি কি করে বিষয়টা নিবেন। তবে আমি আসলে মিষ্টিকে বিয়ে করতে চাই।“

আদনান ভাইয়ের এই নাটকীয় প্রস্তাবে আমার বাড়িতে বজ্রপাত হলো। ভীষণভাবে হকচকালেন আমার শ্বাশুড়ি। এমন ছেলে তার মেয়েকে নিজ থেকে বিয়ে করতে চায়, এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। কিন্তু আমার সাহেব স্পষ্ট স্বরে বললেন,
 “সেটা তো সম্ভব নয়।“
 “কেন ভাইজান?”
 “আমার বোনের একবার বিয়ে হয়েছে। তার স্বামী মারা গেছেন ঠিকই কিন্তু আমার একটা আঠারো মাসের ভাগ্না আছে। তুমি একজন ব্যাচেলর ছেলে, আমার বোনকে বিয়ে করার সাথে সাথে আমার ভাগ্নেকেও পিতৃপরিচয় দিতে হয়। এই জমানায় একটা বিধবা মেয়েকে বিয়ে করাই বিশাল ব্যাপার, সেখানে একটা বাচ্চার বাবা হওয়া। তুমি পারবে না। আমি তোমার উপর কিছু গসিয়ে দিতে চাই না। আর আমার বোন আমার কাছেই আছে। আমি যতদিন বেঁচে আছি আমি আমার বোন আর ভাগ্নেকে ঠিকই আশ্রয় এবং সুরক্ষা দিব। তাই তোমার আবদার আমি গ্রহণ করবো না।“
 
আদনান ভাই হালকা স্বরে বললেন,
 “যদি আমি নেওয়াজকে দত্তক নেই তবুও না?”
 
সাহেবের কপালে তীব্র ভাঁজ পড়লো। অত্যন্ত পাথুরে স্বরে বললেন,
 “তুমি আসতে পারো।“

আমি খুব হতাশ হলাম। আদনান ভাইয়ের দৃষ্টিতে আমি স্বচ্ছতা দেখতে পেলাম। অথচ সাহেব তাকে ফিরিয়ে দিলেন। এই সাহেবকে নিয়ে আর পারা যায় না। আদনান ভাইয়া হতাশ হয়ে সেদিন ফিরে গেলেন। ঠিক সেভাবে ক্লান্ত পায়ে ফিরলেন যেভাবে মিষ্টি আপুর বিয়ের দিন ফিরেছিলেন। শ্বাশুড়ি মা ম্রিয়মান গলায় বললেন,
 “ছেলেটা তো ভালো ছিলো।“

রাতে খাবার টেবিলে থমথমে পরিবেশ। সাহেব কোনো কথা বলছেন না। শ্বাশুড়ি মা উশখুশ করছেন। তিনি কিছু বলতে চাইছেন। কিন্তু ভয়ে বলতে পারছেন না। মিষ্টি আপুর মুখে তীব্র বিষাদের ছায়া। তিনি সবটাই জানেন। এই বিষয়ে তিনি একটিবারও কথা বলতে চাইলেন না। আমি পরিস্থিতি বুঝেও চুপ থাকতে পারলাম না। খুব শান্ত স্বরে বললাম,
 “আমি আদনান ভাইয়ের সাথে মিষ্টি আপুর বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবে অমত করার কোনো কারণ পাই নি। অহেতুক কেন প্রস্তাবটা ফেরানো হলো?”
 
আমার প্রশ্নে সাহেব তীক্ষ্ণ চোখে চাইলেন আমার দিকে। আমি কোনো ভাবান্তর না দেখিয়েই শান্ত চোখে তার দিকে চেয়ে উত্তরের প্রতীক্ষা করতে লাগলাম। মিষ্টি আপু দ্রুত প্লেট নিয়ে উঠে যেতেই আমি শুধালাম,
 “তুমি কোথায় যাচ্ছো?”
 “নেওয়াজ ঘরে একা।“
 “ও তো ঘুমোচ্ছে। তুমি বস। তোমার সাথেও কথা আছে।“
 “আমি এই বিষয়ে কোনো কথা বলবো না ভাবী।“
 “কেন?”
 “কারণ আমার এতে মত নেই।“
 “সারাটা জীবন একাই থাকার পরিকল্পনা?”
 “একা কোথায়? নেওয়াজ আছে, তোমরা আছো?”
 “কতদিন? মিষ্টি আপু একটা গোটা জীবন বাকি তোমার জন্য। একটা সময় হাঁপিয়ে যাবে। প্রতিটা মানুষের একটা সঙ্গী প্রয়োজন।“
 
এর মধ্যে সাহেব হুংকার ছাড়লেন,
 “আমরা কি মরে গেছি?”
 “নেওয়াজের মামা আপনি, বাবা নন। ভুলে যাবেন না। নেওয়াজের বাবা প্রয়োজন।“
 “নেওয়াজ আদনানের ঔরস নয়। আবেগে সে এখন এই কথা বলছে। ভবিষ্যতে সে যে নেওয়াজকে প্রত্যাখ্যান করবে না সেটার কি নিশ্চয়তা? ভুলে যেও না, সে একটা ব্যাচেলর ছেলে। একটা সময় তার নিজের পরিবারের শখ হবে তখন?”
 “আদনান ভাই এমন মানুষ নন। আমি তার চোখে স্বচ্ছতা দেখেছি। সে মিষ্টি আপুকে ভালোবাসে, এখনো।“

কথাটা শুনতেই সাহেব নড়ে চড়ে উঠলেন। মিষ্টি আপু মাথা নত করে ফেললেন। অনধিকার চর্চা হচ্ছে। কিন্তু আমি মুখ খুললাম,
 “আদনান ভাই বরাবর মিষ্টি আপুকে ভালোবাসতেন। তখন বেকার ছিলেন। আপনার কাছে তাকে চাইবার মুরোদ ছিলো না। এখন তার সেই যোগ্যতা হয়েছে। তাই তিনি মিষ্টি আপুকে বিয়ে করতে চাইছেন। তিনি নেওয়াজ সহ মিষ্টি আপুকে আপন করতে চাইছেন। একটু ভেবে দেখবেন। আপনার বোনের একটা পুরো জীবন বাকি। নেওয়াজের একটা ভবিষ্যত আছে। জীবন সবাইকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না। মামাবাড়ি মানুষ হওয়া ছেলেমেয়েদের সমাজ কি চোখে দেখে সেটা তো আপনার অজানা নয়। আজ আমি ভালো, কাল যে আমি ভালো থাকবো সেটার কি নিশ্চয়তা? আমার সাথে মিষ্টি আপুর বনিবনা নাও হতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা ছেলেটার পিতৃস্নেহ পাওয়ার অধিকার আছে।“

সাহেব সেদিন খুব ভাবলেন। অবশেষে তার মনটা নরম হলেও, মিষ্টি আপু মোটেই রাজী হলেন না। বাবা আর বাবা হওয়ার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। পরের সপ্তাহে আদনান ভাইকে ডেকে পাঠালেন সাহেব। মিষ্টি আপু এবং আদনান ভাইকে ছাদে পাঠানো হলো কথা বলার জন্য। আমি দরজার বাহিরে চুপিসারে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তাদের কথা শোনার আগ্রহ হচ্ছিলো। আদনান ভাইয়া গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন মিষ্টি আপুর দিকে, আপু খুব শান্ত স্বরে বললেন,
 “আপনার এই দয়ার কারণটা আমার জানা নেই আদনান ভাই। তবে, আমার এই বিয়েতে মত নেই। শুধু মাত্র অবলা বলেই আপনার ঘাড়ে উঠে বসবো বিষয়টায় আমায় লজ্জা লাগছে। উনি মারা যাওয়ার পর থেকে আমার বেঁচে থাকার একটাই সম্বল আমার ছেলে। আমার ছেলের মুখের দিকে তাকালে আমার সাথে হওয়া সব অন্যায়গুলো ঠুংকো লাগে। আমার ছেলেই আমার সব। সেখানে আপনাকে দেবার মত আমার কাছে কিছুই নেই। এখন যদি আপনাকে আমি বলি আমি আর সন্তান চাই না, কারণ আমার ভয় হয় নিজের বাচ্চা হলে আপনি নেওয়াজকে অবহেলা করবেন; সেটা কি অন্যায় হবে না বলুন। আপনার একটা ভবিষ্যত আছে।“

আদনান ভাই মলিন হাসলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
 “মিষ্টি, একবার তুমি এই সব চিন্তা বাদ দিয়ে আমার হাতটা ধরতে পারো? ভবিষ্যতের চিন্তাটা না হয় ভবিষ্যতে ছেড়ে দাও। একবার আমাকে ভরসা করতে পারো?”

মিষ্টি আপু স্তব্ধ চোখে চাইলেন। আদনান ভাই হাসি প্রশস্ত করে বললেন,
 “জানো মিষ্টি, যেদিন তোমার বিয়ে হয়েছিলো সে রাতে আমি খুব কেঁদেছিলাম। নিজের জীবনের উপর খুব বিতৃষ্ণা হচ্ছিলো। কেন আমার পাওয়ার ভাগ্যে কিছু নেই? ভেবেছিলাম কখনোই বিয়ে করবো না, কারণ তোমাকেই বোধহয় আমি সবথেকে বেশি চেয়েছিলাম। আগে যদি জানতাম আমার চাওয়ার কারণে তোমার জীবনে দুঃখ আসবে, আমি তোমাকে চাইতাম না।“

একটু থেমে বললেন,
 “আমি নেওয়াজকে কখনো অবহেলা করবো না। কারণ আমার ওর মাঝে নিজেকে দেখতে পাই। বাবার মৃত্যুর পর আমার মা অন্য জায়গায় বিয়ে করেন। সেই পক্ষ আমাকে গ্রহণ করে নি। তাই আমাকে অনাথের মতই বড় হতে হয়েছে। যদিও মা মারা গেছেন খুব দিন হয় নি, তবুও আমাকে বলতে হয়েছে আমার মা মারা গেছেন। আমি কখনোই চাইবো না, আরেকটা শিশু আমার মত বড় হোক। আমার মতো কষ্ট করুক। আমার আত্মীয়স্বজন কেউ নেই। আমার সম্পত্তি খুব একটা নেই, তবে আমার মৃত্যুর পর তা তুমি আর নেওয়াজ ই পাবে। যেখানে আমি বিয়ে করার ইচ্ছেই ছিলো না, সেখানে পরিবার বানানোর তো প্রশ্নই উঠে না। এখন তুমি বলো, আমি যদি তোমার থেকে কখনো কিছু না চাই, তাহলে কি আমাকে বিয়ে করা যায়?”

মিষ্টি আপু ঠিক উত্তর দিলো শোনার আগেই আমার মাথায় গাট্টা পড়লো। পেছন থেকে হিনহিনে স্বর কানে এলো,
 "লজ্জা করে না, লুকিয়ে লুকিয়ে মানুষের প্রাইভেট কথা শুনছো! এগুলো আমার একদম অপছন্দ।"

আমি পেছন ফিরে তার দিকে মুখ ভেংচি কেটে বললাম,
"না করে না, লজ্জার আঁচার বানিয়ে খেয়ে ফেলেছি। মনে নেই আপনার! গতকাল তো আপনিও খেয়েছেন।"

সাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। অতঃপর আমার হাত টানতে টানতে নিচে নিয়ে গেলেন। আর শোনাই হলো না মিষ্টি আপু কি বললো? 

তবে তিনি বিয়েতে রাজী হয়েছিলেন। বিয়ের আগের দিন তিনি আমাকে ডেকে বলেছিলেন,
 “তুমি এমন জোর না করলেও পারতে। যে মানুষটা নিজে রাত জেগে আমার বাচ্চাকে সামলেছে সে আমার সাথে কাইজ্জা করবে এও বিশ্বাস করতে হবে?”
 
আমি হেসে বলেছিলাম,
 “জীবনটা অনেক বড় মিষ্টি আপু। একা একা এতো পথ দূর্বিসহ লাগবে। আজ হয়তো তোমার মনে হচ্ছে আমরা জোর করছি। কিন্তু একটা সময় ঠিক বুঝবে।“

বিয়েটা হয়েছিলো খুব সিমসামভাবে। ভাগ্যিস আমি জোর করেছিলাম। মিষ্টি আপুকে দেখলে এখন কি যে শান্তি লাগে! মানুষটা চিরকাল এভাবেই সুখে থাকুক। আদনান ভাই নেওয়াজ ঠিক নিজের ছেলের মতো করে ভালোবাসা দিয়েছেন। কখন মনে হয় নি ছেলেটি তার নয়। নেওয়াজ বাবা বলতে পাগল। সে জানেও না আদনান ভাই তার বাবা নন। কখনো জানার সুযোগ দেয় নি আদনান ভাই। যে পিতৃস্নেহ থেকে কখনো ছেলেটা বঞ্চিত ছিলো সেই পিতৃস্নেহ আদনান ভাই তাকে দিয়েছেন। যেদিন মিষ্টি আপুর বিয়ে হয়েছিলো আমার সাহেবের ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি ছিলো। 

—————

সময়ের কালপ্রহরে ধীরে ধীরে প্রিয় মানুষগুলো যার যার নীড়ে ফিরলো। মিষ্টি আপুর বিয়ে হয়ে গেলো। মাহমুদ ক্যাপ্টেন হবার পর তার বিয়ে হল। মেয়েটা শ্বাশুড়ির পছন্দের। সে বউ নিয়ে ফিরে গেলো চট্টগ্রাম। বাড়িতে কেবল আমি, সাহেব, মা এবং কৃপা। মায়ের সেবার খুব জ্বর হলো। জ্বর মোটেই কমে না। জ্বর থাকলো চারদিন। সেখান থেকে নিউমোনিয়া হলো। সাহেব খুব ছোটাছুটি করলেন। লাঙ্গস এ পানি ঢুকলো। মিষ্টি আপু তখন রংপুর বেড়াতে গিয়েছিলেন। তিনি রংপুর থেকে চলে এলেন মায়ের খবর শুনে। সামান্য জ্বর থেকে এতো ভয়ংকর অবস্থা হবে বুঝতেও পারি নি। মাকে আইসিউতে ভর্তি করা হলো। অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ে কিন্তু তার শ্বাসকষ্ট কমে না। ছয়দিন আইসিউতে থাকার পর সাতদিনের দিন আমার শ্বাশুড়ি মারা গেলেন। সেই সাতটাদিন আমার সাহেবের উপর ঝড় গিয়েছিলো। আমি আর মিষ্টি আপু সকাল থেকে আইসিউর বাহিরে বসে থাকতাম। আটটার পর থেকে সাহেব ডিউটি করতেন। খাওয়া দাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। রাত দেড়টার দিকে ডাক্তার জানালেন মা মারা গেছেন। মাহমুদ এলো পরদিন। আমি সাহেবের চোখে কোনো অশ্রু দেখি নি। তিনি শুষ্ক চোখে মায়ের নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে রইলেন অনেকটা সময়। 

যোহর বাদে মায়ের মাটি দেওয়া হলো। সব কাজ সাহেব দাঁড়িয়ে থেকে করলেন। তিনি পাথরের মত হয়ে গিয়েছিলেন। কান্নাকাটি নেই। কোনো দুঃখবিলাপ নেই। যেন এমনটা হবার ই কথা ছিলো। জানাজা পড়িয়ে এসে আমাকে বললেন,
 “পেয়ারা, আমি একটু ঘুমাবো। আমাকে ডেকো না কেমন?”

আমি তাকে ডাকলাম না। সাহেব ঘুম থেকে উঠলেন এশার নামাযের পর। আমি চা বানিয়ে ঘরে এসে দেখি তিনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি শূণ্য। কেমন শুষ্ক, মলিন। আকাশের দিকে যেন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন উদাসীন চিত্তে। আমি তার পাশে দাঁড়ালাম। খুব আস্তে করে তার বাহুতে হাত রাখলাম। তিনি ক্লান্ত স্বরে বললেন,
 “এতোদিন আমার খুব ক্লান্ত লাগতো, এতো দায়িত্ব, এতো মানুষের দায়ভার। মনে হতো আর না জানি কতদিন বইতে হবে। মাঝে মাঝে বিরক্ত হতাম। তবুও এই কাঁধ থামে নি। মা, মাহমুদ, মিষ্টি। মিষ্টির বিয়ে হল, মাহমুদ তার জীবনে দাঁড়িয়ে গেছে, আজ মাও চলে গেলেন। আজকে আমার সব দায়িত্ব শেষ। এখন আমি মুক্ত। অথচ আমার কেমন যেন ফাঁকা লাগছে। মনে হচ্ছে আমার বুঝি করার কিছু নেই। আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। আবার প্রশ্নও হচ্ছে, আমি কি সব ঠিকঠাক করেছি? কোনো অপূর্ণতা ছিলো না তো?”

আমি তার মাংসপেশিতে মাথা ঠেকিয়ে বললাম,
 “কে বলেছে আপনার দায়িত্ব শেষ, আমি আর কৃপার দায়িত্ব তো আছে। আর আপনি নিজেই দেখুন না। আজ আপনার ভাইবোনেরা সবাই নিজ নিজ জায়গায় কি সুখে আছে। সেটাই তো পূর্ণতা”

সাহেব মলিন হাসলেন। আমি অনেকটা সময় তার হাত ধরে রইলাম। কালো আকাশটা সেদিন আরোও কালো লাগছিলো। তবে বৃষ্টি হলো না। না আকাশে, না সাহেবের চোখে।

এটুকু লিখেই কলম থামলো কাননের। কাজের মেয়েটা চেঁচাচ্ছে,
 “খালাম্মা, খালুজানে এখনো বাড়ি ফিরে নাই।“

কথাটা কানে যেতেই প্রৌঢ় চোখে ঘড়ির দিকে তাকালো কানন। বয়সটা আসলেই হয়েছে। চশমা ছাড়া কিছু দেখতে পারে না। চশমাটা একবার আঁচলে মুছলো সে। ঘড়িতে সাতটা বাজে। এতো দেরি হয় না তার সাহেবের। সে কি আবার পথ হারালেন? চিন্তায় কপালের কুচকানো চামড়ায় তীক্ষ্ণ ভাঁজ পড়ল। ডায়েরিটা বন্ধ করে কানন উঠে নিচে গেলেন। কাজের মেয়েটা খুব চিন্তিত গলায় বললো,
 “খালুজানে মনে হয় আবার বাড়ি ভুইল্ল্যা গেছে। আপনে উনারে একা বাইর হইতে দেন কেন? মাথায় ব্যামো লইয়্যা এখন কই কই ঘুরতাছে। ফোনও নেয় নাই।“

এবার একটু চিন্তিত হলেন কানন। দরজা খুলে বের হলেন। সদরে দাঁড়িয়ে রইলেন স্বামীর প্রতীক্ষায়। স্বামীর একটা নতুন রোগ হয়েছে। ভোলারোগ। ইংরেজীতে বলে ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমার্স রোগ (Dementia & Alzheimer's)। রোগটা ধরা পড়েছে দু বছর। সেবছর ডেঙ্গুতে ভোগার পর থেকেই মুহাইমিন সরকার কেমন যেন ভুলোমনা হয়ে গিয়েছিলেন। কলম কোথায় রাখলেন, বই কোথায় কিছুই তার মনে থাকতো। গরম পানির সুইচ দিয়ে ভুলে যেতেন। ঔষধ খেতে ভুলে যেতেন। একদিন শুধালেন,
"ভাত খেয়েছি?"

খুব ছোট ছোট ঘটনা। কানন ভাবলো বয়সের দোষ। হবে নাই বা কেন? বয়স কি কম হয়েছে? আটষট্টি বছর বয়স তখন। এখন কি যুবকদের মতো ব্রেইন থাকে? একদিন তিনি সান্ধ্যভ্রমণে যেয়ে বাড়ি ভুলে গেলেন। সেই বাড়ি আর খুঁজে পান না। কানন এদিকে অস্থির। কৃপাকে ফোন করে জানাতেই মেয়ে ছুটে এলো। কৃপার বিয়ে হয়ে গেছে। তার এখন একটা সাত বছরের মেয়ে আছে। মুহাইমিন ফিরলেন রাত এগারোটায়। তার চোখ মুখ বিভ্রান্ত। পরদিন মেয়ে বাবাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলো। এমআরই, সিটিস্ক্যান সব করানোর পর ডাক্তার জানালেন, আলঝেইমার্স। ব্রেইনে কিছু প্রোটিন জমা হয়ে তার স্নায়ুকোষের নিউরণগুলো ক্ষয়ে যাচ্ছে। কিছু ঔষধ তাকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে আসলে খুব একটা কাজ হবে না। বয়স হয়েছে। উপর থেকে আগে একবার ব্রেইন স্ট্রোক হয়েছে। সুতরাং নিজেদেরকে প্রস্তুত রাখতে হবে, একদিন রোগী নিজের পরিচয়ও ভুলে যাবেন। নিজের আত্মীয়দের ভুলে যাবেন। হতাশ হলে চলবে না। 

কানন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। লোকটা এখন অনেককিছুই ভুলে যায়। নিজের মেয়েকেও মাঝে মাঝে চিনতে পারে না। কাজের মেয়েটাকে একদিন চোর বলে কি হুংকার। একটাই স্বস্তি এখনো কাননকে সে ভুলে নি। কাননকে সে মনে রেখেছে। কানন মিষ্টি এবং কৃপাকে ফোন করিয়ে জানালো। মাহমুদ এলো। ঘরে সবাই চিন্তিত। মুহাইমিন ফিরলেন রাত দশটায়। কানন উৎকুণ্ঠিত স্বরে শুধালো,
 “মোবাইল বাদে কেন বের হলেন আপনি? কোথায় ছিলেন?”

মুহাইমিনের চোখ মুখে কেমন অপরাধবোধ। কিন্তু সেটা প্রকাশ না করেই বললো,
 “আমি গ্যাদা নাকি? যতসব। এতো হাউকাউ করার কি আছে?”

লোকটা আজকে আবার পথ ভুলেছে। কানন কড়া স্বরে বললো,
 “কাল থেকে আর একা একা বের হবেন না। মজনু আপনার সাথে?”
 “কেন আমি কি আবুইদ্দা?”
 “হ্যা, আপনি তার থেকেও অধম। আমি বলেছি এর উপর যেন কথা না হয়।“

স্বামীকে তীব্রভাবে শাষালেন কানন সরকার। মুহাইমিন গজগজ করে নিজের ঘরে যেতেই আবারো হুংকার ছাড়লেন,
 “পেয়ারা, এই পেয়ারা। দেখো ঘরে একটা চুন্নি ঢুকেছে। পেয়ারা, কোথায় তুমি?”

কানন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আবার কাজের মেয়েটাকে তিনি চিনতে পারছেন না। কৃপা অবাক কণ্ঠে বললো,
 “বাবা কাউকে চিনে না অথচ মাকে ঠিক চিনে খেয়াল করেছো পিপি?”

মিষ্টি হেসে বললেন,
 “ভাইয়া যে তোমার মাকে খুব ভালোবাসেন। তাই তাকে ভুলেন নি।“

কানন মৃদু হাসলেন। এই লোকটা যদি তাকে ভুলে যেত তাহলে সত্যি খুব অসহায় লাগতো তার। সব খারাপের মধ্যে এই একটা দিকই সান্ত্বনা। ঘরে গিয়ে কাজের মেয়েকে নিচে যেতে বললেন তিনি। স্বামীকে শুধালেন,
 “কি সমস্যা? ও তো আমাদের ঘরেই থাকে। মাহফুজা নাম ওর। ওকে বারবার চুন্নি বলেন কেন?”
 “চুন্নি লাগে তাই বলি।“

লোকটা স্বীকার করবেন না, তার যে মনে নেই। কানন এবার শান্ত স্বরে বললেন,
 “পাঞ্জাবীর ভেতরের চিরকুটটা পেয়েছিলেন?”
 
মুহাইমিন এবার একটু শান্ত হলেন। বিছানায় বলে পাঞ্জাবীটা খুলতে খুলতে বললেন,
 “হ্যা, অনেক পরে পেলাম। আমি সেই গুলশান চলে গিয়েছিলাম জান”
 “হাটতে হাটতে?”
 “হ্যা।“

কানন তার পাশে বসে তার চামড়া কুচকানো হাততা নিজের হাতে নিয়ে অনুরোধের স্বরে বললো,
 “আর এমন একা বের হবেন না। আমার কলিজায় কামড় লাগে। মাহমুদ তো থানায় ফোন দিত। এমনটা আর করবেন না।“
 “আচ্ছা আচ্ছা হইছে, একদিন একটু হারায়ে গেছি পৃথিবী মাথায় করে ফেলছে। যন্ত্রণা, যতসব।“

—————

মুহাইমিন তখন ঘুমে। কানন লিখতে বসেছে। কলম চলছে। 
 “আমি জানি একদিন সাহেব আমাকেও ভুলে যাবেন। সেদিন আমার জীবনে হয়তো সত্যি দুঃখ নেমে আসবে। উনাকে হারানোর থেকে মনে হয় সেই দুঃখটাই আমাকে বেশি গ্রাস করবে। আমি চাই আমার মৃত্যু যেন তার আগে হয়। অন্তত তার চোখে অচেনা হবার কষ্টটা থাকবে না। এই ডায়েরিটা আমি সাহেবের জন্য লিখছি। যেদিন তিনি আমাকে ভুলে যাবেন এই ডায়েরি পড়ে যদি একটু স্মরণ হয়!“

এতোটুকু লিখেই থামলো সে। তারপর ডায়েরিটা ডেস্কে রেখে শুতে এলেন। মুহাইমিন তখন ঘুমে। কানন তার ঘুমন্ত মুখখানা একবার দেখে ঘুমাতেই যাবেন ঠিক তখন খেয়াল করলেন তার হাতে কিছু একটা মুঠোবন্দি। মুঠোর ফাঁক থেকে উঁকি দিচ্ছে তা। খুব আস্তে সেই মুঠো খুলতেই একটা সাদা কাগজ পেলেন। তাতে লেখা,
 “তুমি ব্রাশ করে ডেস্কের তৃতীয় ড্রয়ারের ডায়েরিটা পড়বে।“

কানন কিছুসময় হতভম্ব রইলো। তারপর ধীর পায়ে সেই ডেস্কের কাছে গিয়ে তৃতীয় ড্রয়ার খুললেন। খয়েরি মলাটের একটা ডায়েরি। ডায়েরিটা খুলতেই দেখলেন তার অনেকগুলো ছবি। এখনকার, আগের, বিয়ের পরের। কানন অবাক হলেন। ছবিগুলো টেবিলে রেখে ডায়েরি খুললেন। প্রথম পাতাতেই লেখা,
 “আমার একটা গ্যাদা বউ আছে। নাম পেয়ারা। ওর সাথে আমার যখন বিয়ে হয়েছিলো তখন ওর বয়স ছিলো মাত্র আঠারো।“
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp