জানালা দিয়ে একটা নিয়ন আলো মেঝে ছুঁচ্ছে। ওইযে? ছাদের রেলিং ঘেঁষে একটা লম্বালম্বি কালো রডের উপর লাইট বাঁধা? ওখান থেকে আবছা হলদে রঙ লুকিয়ে-চুরিয়ে চিলেকোঠার ভেতর ঢুকতে চায়। মেরিন জানালার পর্দা আরেকটু পাশ চাপাতেই দমকা হাওয়া মিহি মিহি সুরে শরীর ছুঁয়ে দিলো। সেখান থেকে সরে এবার অযথাই ভাঁজ করা কাপড়গুলো বিছানায় ছড়িয়ে দিলো মেরিন। আবার ভাঁজ করতে বসলো। সামনাসামনি চেয়ারে তারফান মাথা ঝুঁকিয়ে বসে আছে। পাদুটো দু'দিক করে মাঝে হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। নাক লাল, বুক-পিঠের শার্ট ঘামে ভিঁজে চুপচুপ করছে। কপাল বেয়ে প্রকাশ্যভাবে ঘামের একটা বিন্দু গালে গড়িয়ে পড়তেই চোখ ফিরিয়ে নিলো মেরিন। কাপড় ভাঁজ করতে করতে বললো, ‘গোসল সেড়ে আসুন। ঠান্ডা লেগে যাবে।’
তারফান জবাব দিলো না। নিশ্বাসের আনাগোনা ভীষণ অশান্ত হয়ে আছে। বুকের উঠা-নামা, ধুকপুক টের পেয়ে নিজেই আঁতকে উঠছে তারফান। এতটা… এতটা কখন ভালোবেসে ফেলেছে সে এই মেয়েটিকে? তাকে হারানোর এত বিচ্ছিরি ভয়! চোখ মুদে আসতে চাইলো। ঠোঁট কাঁপলো, ‘এমন স্বাভাবিক ভাবে কথা বলবে না মেরিন!’
‘কিভাবে বলবো? আপনি আমার থেকে কি আশা করেন?’ বলতে বলতে তপ্ত নিশ্বাস থামিয়ে দিলো মেরিনকে।
ছোট থেকে ভীষণ আদরে পেলে বড় হওয়া মেরিন অভিমান করতে জানে ভালো। অভিমানে চুপসে যায়। চুপ করে নিশ্চুপ অভিযোগগুলো ভেতরে দাবিয়ে রাখে। এবারও রাখলো, ‘গোসল না করলে হাত-মুখ ধুয়ে আসুন। মা নাস্তা করতে নিচে যেতে বলেছেন।’
সন্ধ্যাবাতি নিভে গেছে সেই কক্ষন! কারেন্ট নেই বোধহয়। আবছা হলদে বাতির মিটিমিটি আলোয় মেরিনের সুন্দর মুখটার দিকে কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে রইলো তারফান। মেয়েটা আনমনে তার দেওয়া গোলাপফুলগুলো আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে। নরম আদর করছে। বাতাসের হালকা পরশে আচমকাই শিউরে উঠলো তারফান। মনে হলো, এই মুহূর্তে, এই ক্ষণে মেরিনের অভিমান না ভাঙ্গালে খুব দেড়ি হয়ে যাবে। ঘুটঘুটে কালো অন্ধকারে ফের একবার ডুবে যাবে তারফান। কথাটা মস্তিষ্কে গাঁথতেই পাগল পাগল হয়ে উঠলো সে। গলা কাঁপলো, শব্দ জড়িয়ে গিয়ে উন্মাদ শোনালো, ‘এই! এ-এই মেরিইন!’
মেরিন তাকাচ্ছে না। উত্তর দিচ্ছে না। গোলপ ছোঁয়া তার পাঁচ আঙুল আস্তে আস্তে সরে এলো৷ আবারও কাপড় ভাঁজ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সে। তারফানের দিকে তাকানোর সময় কই?
তারফান ঢোক গিলে ডাকলো, ‘শ-শোনো না! এই মেরিন!’
পাষাণ মেয়ে তবুও তাকালো না। তেছড়া কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়লো, ‘কি হয়েছে?’
অথচ এ দফায় তারফানের শব্দ ভাণ্ডার ফুরিয়ে গেল। কি বলবে বুঝে পেল না। সে আগে কখনো কারো প্রেমে পড়েনি। ভালোবাসেনি। প্রেমিকার মতোন বউকে কিভাবে আদরে-যত্নে আগলে রাখতে হয়, জানে না। এইযে, মেয়েটা মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে চেয়ে আছে। নজর লুকুচ্ছে। তারফানের বুঝি কষ্ট হচ্ছে না? হচ্ছে। হচ্ছে বলেই হাত-পায়ে ভীষণ কাঁপন যারপরনাই অনুভব করতে পারলো তারফান। বুকের ওপর অস্পষ্ট ভারি চাপ। কণ্ঠ নড়বড়ে হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো, ‘কি করলে তোমার অভিমান ভাঙ্গবে মেরিন? কি করতে হবে বলো। আমি সব করবো।’
মেরিন কাপড় ভাঁজ করা থামিয়েছে। না তাকিয়ে জবাব দিলো, ‘আমাকে আরেকটু সময় দিন।’
অল্পসল্প ভয়, আত ঙ্ক আর অনুরোধ নিয়ে তারফান তড়িৎ বললো, ‘নাহ্!’
‘কি না?’
‘তোমাকে সময় দিলে তুমি হারিয়ে যাবে।’
একাধারে দু'মিনিট তাকিয়ে রইলো মেরিন। সুপুরুষের মতোন দেখতে স্বার্থপর লোকটার চোখে চোখ রাখলো। রক্ত লাল, গভীর, সমুদ্র স্বচ্ছ চোখ। বেশিক্ষণ তাকানো গেল না। দৃষ্টি ঝুঁকাতেই একবিন্দু অশ্রুজল হাতের পিঠে টুপ করে পরলো, ‘হারাবো না।’
এক সেকেণ্ড, দুই সেকেণ্ড, তিন সেকেণ্ড! আচমকা উঠে দাঁড়িয়েছে তারফান। দৈত্য শরীরের ধাক্কায় চেয়ার বিকট শব্দে মেঝেতে পড়ে মৃদু গড়াগড়ি খাচ্ছে। একদম অস্পষ্ট। গড়াগড়ির মাত্রা ভালো করে দেখতেও পারলো না মেরিন। তারফানের অভিব্যক্তি চট করে ধরতে পারলো না। তার স্বামী, তারফান ওয়াহাজ বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে এসে তার কোল দখল করে নিয়েছে। লম্বালম্বি শুয়ে কোমড় জড়িয়ে ধরেছে প্রবল শক্তি প্রয়োগে। পেটের কাছটায় চোখ-নাক-ঠোঁট দাবিয়ে দিতেই মেরিন কেঁপে উঠলো, ‘কি করছেন? তারফান!’
জবাব নেই। কাঁধের দিকটায় দু'হাতে ধাক্কা দিতে গিয়েও থেমে গেল মেরিন। একদম শান্ত হয়ে গেল। তারফান কাঁপছে, হাঁপাচ্ছে। থেমে থেমে হাতের বাঁধন শক্ত করে জাপটে ধরছে মেরিনকে। হাঁপানোর মাত্রা অস্বাভাবিক হতেই মেরিনও এবার তারফানকে আগলে নিলো। ঘন চুলের গভীরে হাত ডুবিয়ে আশ্বস্ত করলো, ‘শান্ত হন।’
জানালা ভেদ করে স্পষ্ট আকাশ দেখা যায়। সফেদ জ্বলজ্বলে চাঁদকে ঘিরে কত কত তারা! তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে তপ্ত নিশ্বাস ফেললো মেরিন। ঘন চুলের ভেতর হাত বুলাতে গিয়ে ভাবলো, তার এখন রেগে চিল্লানোর কথা না? অভিমানে আষ্টেপৃষ্টে তারফানের ভুল ধরিয়ে দেওয়া উচিত না? উচিত! কিন্তু লোকটা অভিনয় ভালো পারে। তারচে’ ভালো বুঝতে পারে মেরিনকে। মেরিনের দুর্বলতা জানে। তাকে দুর্বল করতেই বুঝি এমন জাপটে ধরেছে? হাঁপিয়ে উঠে বলতে চাইছে, ‘মেরিন, তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি। তুমি অভিমান করলে আমার কষ্ট হয়।’
সত্যিই হয়? মনের অস্থিরতা দমানো গেল না। মৃদু গলায় মেরিন জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি আমাকে সত্যি ভালোবাসেন?’
তারফান ততক্ষণে শান্ত হয়েছে। ভীষণ ভাবে নিজেকে মিশিয়ে রেখেছে মেরিনের সঙ্গে। জবাবে বললো, ‘বাসি।’
‘প্রতিশোধের কারণে আমাকে বিয়ে করেছেন?’
তারফান সামান্য চুপ থেকে বললো, ‘আমার মতো মানুষের সঙ্গে আমি প্রথমে তোমাকে জড়াতে চাইনি, মেরিন। কিন্তু তোমাকে ছাড়া আমি থাকতেও পারছিলাম না। তোমাকে বিয়ে করলে ওই লোক-কে ধরা সহজ হয়ে যাচ্ছিল। আবার তোমাকেও পাচ্ছিলাম। আমি তোমাকে কখনো এসব জানতে দিতাম না। ভেবেছিলাম ওই লোক ধরা পরলে আমাদের আর পিছুটান থাকবে না। আমি তোমাকে নিয়ে ভালো থাকতে পারবো।’
‘তাই বলে বিয়ের দিন? এমনি ধরা যেত না?’
‘যেত বোধহয়। আমি বিয়ের আগ দিন পর্যন্ত হায়দারকে খুঁজেছি। পাইনি। এমন না যে তোমাকে বিয়ে করলেই হায়দারকে পেতাম। বিয়েতে ও আসবে কি আসবে না তার ঠিক ছিল না। কেবল সবকিছু রেডি করে রেখেছিলাম। ও আসলে ওকে পরিকল্পনা মতো ধরবো, নয়তো বিয়ের পর আবারও খুঁজবো। শুধুমাত্র প্রতিশোধের কারণেই আমি তোমাকে বিয়ে করিনি মেরিন। ভালোবেসে করেছি। এখন কিভাবে ভালোবাসি, কখন ভালোবাসি জিজ্ঞেস করোনো। আমি ওসব দেখাতে পারি না। কষ্ট দিয়ে ফেলি। আমার জন্য তুমি কষ্টও পেও না মেরিন। আমি এমনই। পারলে শুধরিয়ে দিও। আমি শুধরে যাবো।’
মেরিন অনেক্ষণ চুপ থাকলো। চুলের গভীরে আদুরে পরশ বুলাতে বুলাতে দৈবাৎ শুধালো, ‘আপনার কি সত্যি বাবা নেই? প্রথম প্রথম বলেছিলেন এপনাদের বাবা আপনাদের ছেড়ে চলে গেছে— ওসব মিথ্যা ছিল?’
উত্তরে তারফান অস্পষ্ট আওয়াজ তুললো, ‘হু।’ পরপরই কেমন করে যেন বললো, ‘তুমি কি আমাকে এখন ঘৃণা করো মেরিন?’
মেরিন চমকে উঠে শুধালো, ‘কেন? ঘৃণা কেন করবো?’
‘জারজদের সবাই ঘৃণা করে মেরিন। আমরা নিজেরাই করি।’
দম আটকে মেরিন বললো, ‘ঘৃণা করলে আপনাকে এভাবে আগলে নিতাম না। আমি শুধু, এত সত্য একসাথে নিতে পারছি না। আপনি আমাকে কখনো বিশ্বাস করে দেখেননি। একবার বলে দেখতেন, সমস্যা জানাতেন। আমি কি বুঝতাম না? হয়তো প্রথমে অবাক হতাম। কিন্তু আপনাকে ঘৃণা করা আমার পক্ষে সম্ভব না তারফান।’ বলতে বলতে আটকে রাখা নিশ্বাস ধীরে ধীরে বাতাসের সঙ্গে মিলিয়ে গেল। করুণ সুরে হাঁসফাঁস করলো মেরিন। অভিমান দুমড়ে উঠলো, ‘আমার পুরোটা জীবন আমি আপনাকে দিয়ে দিয়েছি তারফান। আমাকে দিয়ে দিয়েছি। আপনি কেন একটু বিশ্বাস করে আমাকে পুরো আপনি দিতে পারলেন না?’
‘স্যরি।’ ইংরেজি পাঁচটি অক্ষরের অতি ক্ষুদ্র শব্দ। শব্দটা উচ্চারণ করতে গিয়ে গলায় বিঁধলো তারফানের। কিভাবে ক্ষমা চাওয়া চায়? কিভাবে মেরিনের অভিমান ভাঙানো যায়? অস্থির হয়ে প্রশ্ন করলেও ফলাফলা শূন্য। উত্তর কেউ দিচ্ছে না। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মেরিনকে ছেড়ে উঠে বসলো তারফান। জোরে জোরে নিশ্বাস নিলো-ফেললো। জিজ্ঞেস করলো, ‘স্যরি বললে কি সমাধান হয়ে যাবে মেরিন? আমি স্যরি বলি? তোমার অভিমান কমবে?’
মেরিন বলতে চাইলো, ‘বলুন। কমে না-কি দেখি।’ অথচ অকপটে কিছুই বলতে পারলো না।
ছাদের রেলিংয়ের হলদে বাতি হঠাৎ নিভে গেছে। কারেন্ট চলে এসেছে বুঝি? সন্ধ্যে বাতিটা সেই তক্ষুণি জ্বলে উঠলো। বাড়িওয়ালা কোত্থেকে যেন এই আজগুবি বাতি খুঁজে এনেছে। কারেন্ট থাকলে জ্বলে না। আবার কারেন্ট চলে গেলে নিভু নিভু করে। তারফান আপাতত ওসবে নজর দিলো না। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশের মোলায়েম বদনের রমণীটির দিকে তাকাতেই থমকালো যেন। কাজল কালো চোখ দুটো দীঘির মতোন টলমল করছে। কত অভিযোগ, অনুযোগ!
তারফান তৎক্ষণাৎ ‘স্যরি’ শব্দটা উচ্চারণ করলো। বারবার করলো। একটু ঝুঁকে মেরিনের গোলগাল মুখ হাতের আঁজলায় পুড়ে দু'চোখের পাতায় চুমু খেল সে। নিগূঢ় স্বরে বললো, ‘মেরিন, এই অভদ্র মিথ্যুককে তুমি ক্ষমা করে দাও।’
মেরিন কিছু বললো না। তারফানের বাহুতে আস্তে করে হাত রাখলো। যা বোঝার বুঝে গেল তারফান। মেরিনকে আগলে হঠাৎই বিছানায় শুয়ে পরলো। গলায় মুখ গুঁজলো, ঝড় তুললো। ঠোঁটের কাছটায় এগিয়ে অধৈর্য চুমু আঁকতেই নিশ্বাস প্রগাঢ় হলো মেরিনের। তারফানকে আটকাতে গিয়েও পারলো না। অস্থির ভঙ্গিমায় সে তাকে চুমু খাচ্ছে। পুরুষালি নরমহীন হাত সবে সবে পেট ছুঁয়ে শাড়ির আঁচল সরিয়েছে। বুকের উঠা-নামা কেমন উন্মাদের মতোন দেখলো তারফান। সূক্ষ্ণ একটা কামড় বসাতেই মেরিন লজ্জায় হাঁসফাঁস করলো, ‘থামুন!’
‘হু? থামবো?’
সঙ্গে সঙ্গে থেমে গিয়ে মেরিনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলো তারফান। মেরিন উত্তর দিচ্ছে না। লজ্জায় পিষ্ট হয়ে তার বুকে মুখ গুঁজেছে। তারফান মুহূর্তেই পরনের শার্ট খুলে ফেললো। নাম না জানা উত্তেজনায় দফায় দফায় চমকে উঠলো। চট করে মেরিনের ঠোঁটে চুমু খেয়ে গাঢ় নয়নে তাকালো সে। পারদ সমান ভরাট, ভারি গলায় নাম মাত্র জানতে চাইলো, ‘আজকে না খেয়ে থাকলে হবে না?’
·
·
·
চলবে……………………………………………………