সাব্বির পরপর সাত দিন সাহিদকে ভার্সিটিতে পায়নি। এমনকি তাকে আড্ডার জন্য ডাকলেও সাহিদ কোনোপ্রকার সাড়া দেয়নি। জিমে গেলেও সাব্বির সাহিদকে হাতের নাগালে পায় না। যেন সাহিদ আগেই বুঝে যায় সাব্বির কখন যাবে। সবসময়ই সাব্বির যাওয়ার আগে দিয়েই সাহিদ চলে আসে আর নয়তো জিমে অনিয়মিত যায়। সাহিদের বাড়িতেও যে যাবে সেই সুযোগ নেই। ছেলেটা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে, বন্ধুদের নাকি তার ফ্ল্যাটে গিয়ে আড্ডা দেওয়া বারণ। হয়তো সাহিদ তাদেরকে ইসমাতের মুখোমুখি করাতে চায় না বলেই এমন করে। কিন্তু আজ সাব্বির যেই নিষেধাজ্ঞাকে এক পাশে ফেলে বাইক নিয়ে এনে থামাল সাহিদদের এপার্টমেন্টের গ্যারেজে। বন্ধু হয়ে বন্ধুর নিষেধাজ্ঞা না ভাঙলে আর কে ভাঙবে?এই সন্ধ্যাবেলায় সাহিদ বাড়ি থেকে বের হবে না। সে জানতে পেরেছে আজ অনলাইনে গেমের ম্যাচ আছে। সাহিদ কিছুতেই এই ম্যাচ হাতছাড়া করবে না।
গ্যারেজে সবে অফিসের গাড়ি থেমেছে। সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে ইসমাত। ইসমাতকে দেখে সাব্বির দমে গেল। লম্বাটে, ধবধবে ফর্সা করে মেয়েটাকে দেখে তার দমে যাওয়ারই কথা। পাঁচ ফুট পাঁচ-ছয়ের কাছাকাছি হবে হয়তো উচ্চতা। তাছাড়া মেয়েটার চোখ-মুখের ধারাল ভঙ্গি, এটিটিউডের সাথে সাব্বিরের পাশ কাটিয়ে যাওয়া সবই তাকে মুগ্ধ করল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে হবে হয়তো কোনো বিজনেস ওম্যান। ভাব-ভঙ্গি তাই বলছে। সাব্বির মন্ত্রমুগ্ধের মতো পিছু নিল। ইসমাত লিফটের সামনে এসে দাঁড়াল। সাব্বিরও সামান্য দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল। তার মোটেও যার তার সাথে কথা বলার অভ্যেস নেই। তাও আবার এই গ্যারেজে, অচেনা একজন মেয়ের সাথে— প্রশ্নই ওঠে না। তারও সাহিদের মতোই হেডম আছে। তবে মাত্রাতিরিক্ত ইগো, রাগ এসব নেই। হেডমের থেকেই সে আগ বাড়িয়ে মেয়েটাকে বিরক্ত করল না।
কিছুদিন আগে সাব্বিরের ব্রেকআপ হয়েছে। এ নিয়েও সে মাথা ঘামায় না, তার এসব প্রেম পীরিতে এত একটা মাথা ব্যথা নেই। জীবনে একবারই প্রেমে পড়েছিল, কিন্তু সেই একবারেই তার সুযোগ আসেনি। মেয়েকে পটানোর আগেই পাখি উড়াল দিল অন্য কোথাও, অনেক খুঁজেও আর পায়নি। সেই থেকে আজ অবধি যত রিলেশনশিপে জড়িয়েছে, কোনোটাতেই সিরিয়াস ছিল না। মেয়েরাই আগ বাড়িয়ে আসে প্রতিবার, তার বাপের টাকা আছে। সাব্বির সেই বাপের টাকারই কিছু খরচ করে, তারপর ব্রেকআপ! এভাবেই তো চলছে জীবন।
ওরা দুইজন একই লিফটে উঠল। ফ্লোর বাটন সাব্বিরই চাপল। লিফটে দুজন একাকী দাঁড়িয়ে। সাব্বির চাইলেই চান্স মারতে পারত। এখানে কেউ তাকে ঠেকানোর নেই। সে বারবার আড়চোখে দেখছে ইসমাতকে। তার এই কথা বলতে চাওয়াটা মূলত কৌতুহল থেকে। তেজী নারীদের প্রতি ছেলেদের আলাদাই একটা আকর্ষণ, কৌতুহল থাকে। সাব্বিরেরও সেই একই কৌতুহল হচ্ছে। রুশানের গার্লফ্রেন্ড নেই, সিঙ্গেল আছে। সে এখানে সাব্বিরের জায়গায় থাকলে নির্ঘাত ফ্লার্টিং শুরু করে দিত। তাদের বন্ধুদের মধ্যে ছ্যাঁচড়ামির অভ্যেস নেই, তবে হাই সোসাইটিতে মন মতো কাউকে পেয়ে গেলে কেউই সুযোগ হাতছাড়া করে না। শুধু সাহিদটাই হয়েছে ব্যতিক্রম। ছেলেটার আজ অবধি একটা গার্লফ্রেন্ড হলো না অথচ সে নাকি বিয়ে করে নিয়েছে।
ইসমাতের মন-মেজাজ ভালো নেই। সে আজ দ্রুত অফিস থেকে এসেছে, যেহেতু অফিসে মাহফুজ সাহেব আছেন, কাজের চাপও তেমন একটা নেই। এখন গ্রোসারি যা টুকিটাকি এনেছিল সেসব আবার আনাতে হবে। আবার তার মাংস খাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে, নিজ হাতে রেঁধে না খেলে শান্তি নেই। সাহিদটাও ফোন ধরছে না, অবশ্য কখনো সে কল ধরেও না। ধরলে সাহিদকে দিয়ে কিছু আনাতে পারত। কিন্তু সে কি আর এসব আনতে যাবে? তা তো কল্পনায়ও সম্ভব না। আর কি, ইসমাতের এখন দ্রুত ফ্রেশ হয়ে আবারও ছুটতে হবে বাজারের জন্য, কি যে জঘন্য। এ নিয়েই মূলত ইসমাত চটে আছে।
মাহফুজ সাহেব আছেন আবার অন্য পেরাশানিতে। তিনি ভেবেছিলেন ছেলের মাস্টার্স প্রায় শেষ, অথচ ওনার পি.এ রমযান সাহেব বললেন সাহিদের নাকি বিবিএসই শেষ হয়নি। এখন ওনার এই পেরাশানি যে— ছেলে কোন ক্লাসে পড়ছে সেটাই ভদ্রলোক জানেন না৷ এতই বুঝি তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন? ইসমাতের এতে হাসি পায়। সত্যি! বড়লোকদের কত ধরণের মিষ্টি মিষ্টি সমস্যা থাকে। আগে শুনত ছোটো ছোটো বিষয় এরা পাত্তা দেয় না। অথচ ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র বিষয়কেও এরা তালরূপী সমস্যা মনে করেন। হাস্যকর হলেও এটাই চলছে।
ইসমাত দেখল লিফটের ছেলেটা তাদের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে কলিংবেল চাপছে। ইসমাত পেছন থেকে বলল,
--"এক্সকিউজ মি?"
পেছন থেকে মেয়েলি থমথমে গলা শুনে সাব্বির পিছে ফিরে তাকাল। সেই লিফটের মেয়েটাই। চোখের নজর কী দূর্দান্ত। হিলের ঠকঠক শব্দ হচ্ছে টাইলসের ফ্লোরে। ইসমাত নিজের ব্লেজার ঠিক করতে করতে আবারও তাকাল সাব্বিরের দিকে। সাব্বির তার দিকে বোকা চোখে তাকানো। সাব্বিরের উচ্চতা ছয় ফুট ছুঁইছুঁই। তাও মেয়েটাকে কত লম্বা লাগছে তার। সাহিদ তো লম্বায় ছয় ফিট দুই। বাপ-দাদার বংশীয় উচ্চতা পেয়েছে।
--"জ-জি?"
ইসমাত হাতের মাধ্যমে ইঙ্গিতে বোঝাল সরে দাঁড়াতে। সাব্বির ইসমাতের হাতে চাবি দেখেই দ্রুত সরে দাঁড়াল। ইসমাত বড্ড উদাসীনতায় ফ্ল্যাটের দরজা খুলল। সাব্বির অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে। সে তো ঠিকঠাক ফ্ল্যাটেই এসেছে, কোনো ভুল হয়নি। তাহলে এই মেয়ে কী করছে এখানে? সাব্বির কৌতুহল চেপে রাখতে না পেরে বলল,
--"এটা সাহিদ মুস্তাহাবের ফ্ল্যাট, রাইট?"
অচেনা ছেলেটার মুখে সাহিদের নাম শুনে ইসমাত তড়িৎ তাকাল ছেলেটার দিকে। উপর-নীচ দেখল। দেখেই মনে হচ্ছে সাহিদের বন্ধু-টন্ধু হবে। ইসমাত তবুও ভদ্রতা বজায় রেখে বলল,
--"জি, আর আপনি?"
সাব্বির নড়েচড়ে উঠল।
--"আমি সাব্বির, সাহিদের বন্ধু।"
ইসমাত তার নাম জানতে চায়নি, তবুও সে বিষয়ে কিছু বলল না। ইসমাত ভেতরে প্রবেশ করতে করতে বলল,
--"আসুন।"
সাব্বির আর ইসমাতের পরিচয় জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না। তার ধূর্ত মস্তিষ্ক ইতিমধ্যেই এটা জানান দিয়েছে এটাই সাহিদের বউ। সাব্বির বাইরে দাঁড়িয়েই কপাল চাপড়াল। এই দৃশ্য সিসি ক্যামেরায় রেকর্ড হচ্ছে সে নিয়েও বেচারার কোনো মাথা ব্যথা দেখা গেল না। শেষমেষ বন্ধুর বউয়ের ওপর সে কুনজর দিয়েছে। ছি ছি! কিন্তু প্রশ্ন একটা থেকেই যায়। উনি যদি সাহিদের বউই হন তাহলে এত ইয়াং কেন লাগছে? সাহিদ তো স্পষ্ট বলেছিল তার ওয়াইফ কয়েক বছরের সিনিয়র। এর মানে ত্রিশ ছুঁইছুঁই তো হবেই। এই ছেলে কী কোনো ভাবে তাদের সাথে মিথ্যে বা রসিকতা করেছে? কিন্তু.. সাহিদ তো রসিকতা করার মতো ছেলে নয়।
সাব্বির ভেতরে এসে দেখল সাজানো-গোছানো বড়োসড়ো একটা ফ্ল্যাট। ইসমাত ততক্ষণে নিজের রুমে ঢুকে দরজা লক করে দিয়েছে। যার বন্ধু সেই বুঝুক, তার এসবে মাথা ঘামিয়ে কাজ নেই। এর চেয়ে ভালো লম্বা একটা গোসল দিক।
সাব্বির নিজের বুঝ মতো সাহিদের রুম পেল। রুমে ঢুকেও গেল। গিয়ে দেখল সাহিদ তার পিসিতে বুদ। খুবই অভিজ্ঞ হাতে আঙুল গুলো যন্ত্রের মতো চলছে কী-বোর্ড এবং মাউসে। কানে তার কালো এয়ার হেডফোন। সাহিদ পাতলা কালো সেন্ডো গেঞ্জি আর শর্টস পরিহিত। হাতের কাছে কফির খালি মগ। এই ঘরেই সাহিদ ছোটোখাটো একটা কফি মেকার রেখেছে। তা লক্ষ্য করেই সাহিদের অগোছালো বিছানায় বসল সাব্বির। মনিটরের দিকে তাকিয়ে একমনে অপেক্ষা করছে কখন এই গেম শেষ হবে। লেভেল শেষ করলেই সাথে সাথে খপ করে ধরবে।
ভালোই হয়েছিল ইসমাত এসে দরজা খুলেছে। নয়তো এখানের যা অবস্থা, সাহিদ শুনতেই পেত না যে সাব্বির কলিংবেল চাপছে। উলটো তার লম্বা সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। সাহিদ ফ্ল্যাটে ঢুকতে দিত কিনা সে তো পরের বিষয়। গেম শেষ হতেই সে হাত দুটো উপরের দিকে তুলে আড়মোড়া ভাঙল। পরপর গেমিং চেয়ার ঘুরিয়ে পিছে তাকাতেই দেখল সাব্বির বসা। সাব্বিরকে দেখে সাহিদের চোখ-মুখে ক্লান্তির পাশাপাশি বিরক্তি এসে ভর করল।
--"কোন খুশিতে এখানে আসছিস? কে ঢুকতে দিল?"
--"ফর্মাল স্যুট পরা, লম্বাটে, খোলা চুলের একটা মেয়ে। তোর ফ্ল্যাটের চাবি আছে মানে ওটা তোর বউ, রাইট?"
সাহিদ বুঝল ইসমাত ফিরেছে। যদিও তাদের কারোই আসা-যাওয়ার খোঁজ-খবর কেউ পায় না। সাব্বির যে টপিকে কথা বলতে এসেছে সে টপিক ভুলে বলল,
--"শালা বদমাইশ! তুই না বলেছিলি তোর বউ তোর চেয়ে বড়ো? তাহলে এই মেয়েকে আমাদের বয়সী লাগে কেন? তুই কী আমাদের সাথে মিথ্যা বলেছিস?"
--"আর ইউ ইনসেন? তুই আমাকে এসব বলতে আসছিস?"
সাব্বিরের মুখ করুণ দেখাল।
--"বিশ্বাস কর সাহিদ। যখন শুনলাম তোর বউ তোর থেকে এইজে বড়ো, আমি ভেবেছিলাম হবে হয়তো কোনো আন্টি। এজন্যই তোকে বারবার ডিভোর্স নিতে বলতাম। কিন্তু আমার তো আজ আঙ্কেলের পছন্দকে এপ্রিশিয়েট করতে ইচ্ছে করছে। আঙ্কেল-আন্টির পছন্দ আছে বলতে হবে। ছেলের জন্য খাঁটি জিনিস খুঁজে এনে.."
সাব্বির কিছু বলার আগেই গেমিং রিমোটটা সাব্বিরের মাথা বরাবর ছুঁড়ে মারল সাহিদ। কিন্তু ঠিক সময়ে সাব্বির ক্যাচ ধরল। একটুর জন্য কপাল বেঁচেছে।
সাহিদের মনে হচ্ছে তার কানে যেন কেউ গরম আলকাতরা ঢালছে। ইসমাতের প্রশংসা শুনলেই তার এই অনুভূতি হয়। মাহফুজ সাহেব প্রায়ই এই বিষ ঢালেন তার কানের সামনে। সেই থেকেই সাহিদ চটে যায়।
--"আই সেইড শাট আপ সাব্বির! ইফ ইউ ওয়ান্ট টু স্পিক ইউজলেস থিংস দ্যান গেট আউট!"
সাব্বির দ্রুত প্রসঙ্গ বদলে ফেলল। ঠাণ্ডা করল বন্ধুকে। নিজেই কফি বানাতে উদ্যত হয়ে বলল,
--"রিল্যাক্স, আমি ওসব আর কিছুই বলব না। তোর খবর বল, সাতদিন কই হারিয়ে ছিলি বাল?"
সাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফেলে মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করল। আজীবন নাকের ডগাতেই তার রাগ চেপে থাকে। তাই অল্প সময়ে রাগ মাথার তালুতে উঠলেও নামানো বেশ কঠিন। সাহিদ সিগারেট তুলে তা জ্বালাল। লম্বা টানে ধোঁয়া উড়াল। সাব্বির কফি বানালেও সেই কফি ওখানেই রাখল, ভুলেও সাহিদের হাতের কাছে আনল না। পাছে যদি সাহিদ গরম কফি ছুঁড়ে দেয়? এজন্য আগে বুদ্ধি করে ঠান্ডা করতে দিল। সাব্বির সিগারেট চাইলে সাহিদ এগিয়ে দিল। দুই বন্ধু একসাথে সুখটান দিতে লাগল। কিছুক্ষণ দুজনই চুপচাপ থাকল আর দুটো করে সিগারেট শেষ করল। বদ্ধ ঘরে সিগারেটের ধোঁয়া বন্দী হয়ে রইলো। কিন্তু এই ধোঁয়াতে দুজনের কিছুই হলো না।
সাব্বির থেমে বলল,
--"আ'ম সরি, দোস্ত। আমার মোটেও উচিত হয়নি জান্নাতের পক্ষ দেওয়া। তুই আমার বন্ধু, তোকে ওর থেকে বেশি আমি চিনি। তুই কখনোই অল্পতে রিয়্যাক্ট করিস না। জান্নাতের ভুল ছিল বলেই করছিস। আমি আর কখনোই জান্নাতের কথা বলব না। আই প্রমিস। ইভেন যদি ওরা কেউ জান্নাতকে আমাদের সার্কেলে আনার চেষ্টা করে সবার আগে আমাকে কৈফিয়ত দিবে ওরা। ডিল?"
সাহিদ বন্ধুর দিকে তাকাল। খুবই শান্ত, নীরব সেই চোখ জোড়া। সামনের চুলগুলো এলোমেলো হয়ে দুই ভাজে কপালে এসে পড়েছে। সাহিদ থেমে বলল,
--"কফিটা দিবি না?"
সাব্বির হো হো করে হাসল। সে বুঝেছে সাহিদের রাগ পড়ে গেছে। সাহিদ কফির মগ হাতে নিয়েই বড়ো জানালার থাই খুলে দিল৷ মুহূর্তেই হুড়মুড়িয়ে বাইরের হাওয়া ঘরে প্রবেশ করল। সিগারেটের উটকো গন্ধটাও মৃদু হয়ে আসছে। সাহিদ সিগারেটের গন্ধ অপছন্দ করে এমনও নয়, তবে ঘরে জমে থাকাটা পছন্দ করে না। কফি ঠান্ডা দেখে সাব্বিরকে এক বিশ্রী গালি দিল সে।
দুই বন্ধুর আড্ডা চলল আরও ঘণ্টাখানেক। দুজনে মিলেই সিদ্ধান্ত নেয় আগামীকাল ওরা বাইক নিয়ে মাওয়া যাবে, সন্ধ্যার পর। শুনেছে আজকাল নাকি ইলিশ উঠেছে। সাহিদ সবসময় স্বাস্থ্যকর খাবারকে প্রাধান্য দেয়। তাও সে মাওয়াতে গিয়ে ইলিশ খায়। ছেলেটার ইলিশ মাছ বেশ পছন্দ। কাঁটাযুক্ত মাছ পছন্দ করে বলেই হয়তো কথাবার্তা দিয়ে আরেকজনের গায়ে কাঁটা ঠুকে দেয়।
সাব্বির বন্ধুর সাথে বেরিয়ে লিভিংরুমে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো.. রুম থেকে বের হতেই অদ্ভুত এক ঘ্রাণ তাদের নাককে সুড়সুড়ি দিল। রোজমেরী, রসুনের পাশাপাশি অদ্ভুত এক সুঘ্রাণ। সাহিদ রান্নাঘরের দিকে তাকালে বুঝল ধোঁয়াটা ওদিক থেকেই আসছে।
সাব্বিরও কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ইসমাতকে রান্নাঘরে কিছু বানাতে দেখে হোঁচট খেল। কিছুক্ষণ আগের বিজনেজ ওম্যানের থেকে ভিন্ন এই রূপ। যেন সাধারণ সেলোয়ার-কামিজ পরিহিত পাক্কা গৃহিনী। ইসমাত ফিরেও দেখল না ওদের। দূর থেকে বুঝল ইসমাত স্টেক করছে। সেটারই সুগন্ধ মৌ মৌ করছে ঘরজুড়ে। সাব্বির মনে মনে হাসল। যাক, আজ তবে তার খাতির ভালোই হতে চলেছে। অন্তত ডিনার বাইরে করার আশা করা লাগবে না। সাহিদ খালি মুখে পাঠিয়ে দিলেও ভাবী নিশ্চয়ই এই কাজ করবে না। দুজনের শব্দ পেয়ে ইসমাত ওদের দিকে তাকাল। ইসমাতের চুল উঁচু করে বাঁধা।
বন্ধু আর বন্ধুর বউয়ের মাঝে থাকতে চাইল না সাব্বির। হোক বন্ধুর অমতের বিয়ে, তবুও ভদ্রতা বলে একটা ব্যাপার আছে।
--"তোরা থাক, আমি গিয়ে লিভিংরুমে বসি। ভাবী, স্পেশাল কিছু করছেন বুঝি মেহমানের জন্য?"
ইসমাত কিছুটা অপ্রস্তুত হলো সাব্বিরের মুখে "ভাবী" ডাকটা শুনে। এর আগে কখনো কেউ তাকে ভাবী ডাকেনি। সাহিদও কিছুটা নড়েচড়ে বন্ধুর মাথায় চাপড় দিল। যার মানে হচ্ছে সাব্বির যেন চুপ করে। কিন্তু সাব্বির তা শুনল না। ইসমাত থেমে থেমে বলল,
--"জি, ডিনার করে যাবেন।"
ইসমাত যা করছে, যা বলছে সবটাই ভদ্রতার খাতিরে। কিন্তু সাব্বির খুশি হয়ে গেল। সে লিভিংরুমে চলে গেল আর সাহিদ এলো কিচেনে। ইসমাত আর পিছু ফিরে তাকাল না। সে বাটারটা আরও ভালো করে স্টেকে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সাহিদ ইসমাতকে আপাদমস্তক দেখল। বন্ধুর বলা কথাগুলো তার মাথায় একটু হলেও প্রভাব ফেলেছে। আসলেই ইসমাতের বয়স অনুযায়ী তাকে এত বড়ো লাগে না। ইসমাত বেশ ডায়েট মেইনটেইন করে। আর ইয়োগা তো করেই। সেক্ষেত্রে ইসমাতের এই ফিগার কিংবা চেহারা নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই। হ্যাঁ, তার মুখে একটু হলেও বয়সের ছাপ পড়েছে, কিন্তু তা বোঝা যায় না সহজে।
--"কি মনে করে আমার বন্ধুর জন্য স্টেক করছেন?"
ইসমাত পিছে না ফিরেই বলল,
--"বিফ এনেছি নিজের জন্য। একা তো খেতে পারি না তাই সবার জন্যই বানাচ্ছি।"
ইসমাত স্টেকের পাশাপাশি সবজিও করল। পায়েশ করতে চেয়েছিল কিন্তু সময় নেই। সাহিদ বুকে আড়াআড়ি করে হাত বেঁধে নীরবে ইসমাতের রাঁধুনী রূপ দেখল। মিনমিন করে বলল,
--"নিশ্চয়ই পোড়া স্টেক খাওয়ানোর ধান্দায় আছে।"
কিন্তু দেখা গেল স্টেক যখন ইসমাত সুন্দর করে সার্ভ করল, তখন বোঝা গেল কতটা পার্ফেক্ট কুক হয়েছে। সাব্বির অবাক হলো এত ভালো রান্না দেখে। ইসমাত রান্নাবান্না আগে থেকেই জানে। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়েই অল্প বয়সে এসব শিখতে হয়েছিল। তাই এসব পারাটা অসম্ভব কিছু না। ছোটো বোনের আবদার পূরণ করতে কতকিছু শিখেছে সে। দাদু আর কতই বা তাদের জন্য রাঁধবে। তাই অল্প বয়সেই রান্নার চাকরি ইসমাতের নিতে হয়েছিল। এই অবধি আসাটা তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। তবুও সে ঠিকই প্রচন্ড ধৈর্যের মধ্যে দিয়ে এই অবধি এসেছে। এতেই সে শুকুরিয়া আদায় করে।
সাব্বির তো প্রশংসায় পঞ্চমুখ। স্টেকের ছবি তুলে তাদের নিজস্ব চ্যাটগ্রুপে সেন্ড করল, দেখাল সবাইকে। সঙ্গে লিখেছে, "মেড বাই ভাবী"। ইসমাত সাহিদের দিকে তাকাল, আর সাহিদ ইসমাতের দিকে। সাহিদের জন্য এসব নতুন নয়। আগেও বহুবার ইসমাতের রান্না খেয়েছে কিন্তু কখনো প্রশংসার সুযোগ হয়নি। ইচ্ছাও নেই তার। প্রশংসা করলে মানুষের ভাব বেড়ে যায়। সেখানে সাহিদ নিজেই তো আবার একা তিনজন মানুষের ভাব নিয়ে ঘোরে। তাই অকৃতজ্ঞের মতো সে শুধু খেতেই জানে। অপরদিকে সাব্বির প্রতি বাইটে প্রশংসার ঝড় তুলছে।
ইসমাত খাওয়ার পাশাপাশি রমযান সাহেবের পাঠানো অনুষ্ঠানের ফাইলগুলো দেখছে। সাহিদের বার্থডে আগামী মাসের শুরুর দিকে। সেই নিয়েই প্রস্তুতি চলছে। ইসমাত যতদূর শুনেছে পড়াশোনা শেষ না হলেও সাহিদের জন্য এই বার্থডে পার্টি দরকারি। মাহফুজ সাহেব তো মিডিয়া পাড়ার মানুষদেরও ইনভাইট করবেন। অভিনেতা, অভিনেত্রী, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং বিখ্যাত ব্যান্ডকেও রাখবে। এদিকে সাহিদ এসব কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের দু'চোখে দেখতে পারে না। কি যে হ-য-ব-র-ল হবে এই পার্টি, কে জানে?
দুই বন্ধু তখন আগামীকালের মাওয়া ড্রাইভ নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। সাহিদ অবশ্য শুধু হু হা করছে। তার পেশিবহুল গায়ের অংশগুলো কেমন দৃশ্যমান, ইসমাতের তাকাতেও কেমন লাগছে। তবে সে এটুকু বুঝতে পারল সাহিদ আগামীকাল বাড়ি থাকবে না। বন্ধুদের সাথে কোথাও যাওয়া মানে মধ্যরাতের আগে ফিরবে না। ইসমাত স্বস্তি পেল। পরিকল্পনা করল আগামীকাল অফিস থেকে দ্রুত ছুটি নিয়ে বোনের শুটিং স্পটে যাবে। কতদিন পর যে বোনের সাথে তার দেখা হবে।
সাব্বিরের এবার যাওয়ার পালা। সাহিদ ওকে এগিয়ে দিল। সাব্বিরের আজ বেশ ফুরফুরে লাগছে। প্রাণের বন্ধুর বিবাহিত জীবন যতটা গুমোট ভেবেছিল ততটাও নয়। বরং সাহিদের জন্য ইসমাতকে তার প্রচন্ড যোগ্য মনে হয়েছে। এত অভিজ্ঞ নারী, কমই দেখেছে সে। অন্তত দুজনকে দেখেই তার মন থেকে 'মেইড ফর ইচ আদার' বাক্যটা বেরিয়ে আসতে চাচ্ছিল। অথচ এতদিন চিন্তিত ছিল যে বন্ধু বিপাকে পড়েছে। কিন্তু না, বিয়ে করে উলটো সাহিদের জন্য ভালো হয়েছে। যতটুকু বুঝল এদের দুজনের মাঝে শুধু ইগোর সমস্যা, এছাড়া দুজন দুজনকে স্বাভাবিক ভাবেই সহ্য করে যাচ্ছে। কেউ কারো কাজে সমস্যাও সৃষ্টি করছে না। কিন্তু তার বোকা বন্ধু জানেই না এই করে বিবাহিত জীবন চলে না। পার্টনারের কাছাকাছি গেলে ইগো হার্ট হয় না। সাব্বির এসব আজ আর বলতে গেল না। আজ অনেক জ্বালিয়েছে। বাইকের কাছাকাছি আসতেই সাব্বির হেসে হেসে বলল,
--"বন্ধু, ভাবীকে ডিভোর্স দিস না। পারলে ওইদিন ডিভোর্সের কথা বলায় দুটো থাপ্পর দে, তাও দিস না। আমি আজ আমার সেসব কথা তুলে নিলাম। ভাবী তোর বউ হিসেবেই পারফেক্ট!"
সাহিদ সত্যি সত্যি সাব্বিরকে চড় লাগিয়ে দিল। ডিভোর্সের জন্য না। ভাবী ভাবী বলে কানের মাথা খাওয়ার জন্য। সাহিদ গরম চোখে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
--"গেট লস্ট!"
সাব্বির হো হো করে হাসতে হাসতে হেলমেট পরে এক টানে বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেল। সাহিদ গরম চোখে তার যাওয়া দেখল।
--"হারামিটায় নতুন গান পাইছে! ভাবী মাই ফুট!"
সাব্বিরের হাইওয়্যেতে গিয়ে মনে পড়ল, সে তো ভাবীর নামই শুনল না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………