এ্যাজেলিয়া রাজ্যে একটি অনন্য সুন্দর আয়োজন হয়। সেখানে রাজ্যের সকল বণিক ও বাণিজ্য নিয়ে মেলা বসে। মেলার আয়োজন শুরু হয় বেশ জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে। এবারও যথারীতি সেই আয়োজন শুরু হয়েছে। হৈচৈ পরিপূর্ণ চারপাশ। বিভিন্ন রাজ্যের রাজাদেরও এইখানে উপস্থিত হতে দেখা যায়। রানি নিজেও বেশ কিছু রাজ্যে আমন্ত্রণ পাঠান। এত বড়ো বাণিজ্যিক মেলা দেখা যায় না বললেই চলে। এর আলাদাই সৌন্দর্যতা।
রানির ভেজা চুলগুলোতে ধূপের ধোঁয়া দিচ্ছে তার নতুন দাসীটি। ঘুরিয়ে, ফিরিয়ে বেশ যত্নসহকারে সে রানির কেশ সামলাচ্ছে। যত্নে খামতি নেই এক বিন্দুও।
রানি চোখ বন্ধ করে আছেন। ধূপের ঘ্রাণে চারপাশটা পবিত্র লাগছে বড়ো। হ্যাব্রো এলো দরজার বাহিরে। এসেই অনুমতি চাইল,
“আসব, রানি?”
রানির চোখ আগের মতোই বন্ধ। অনুমতি দিলেন সঙ্গে সঙ্গেই, “আসো।”
অনুমতি পেতেই হ্যাব্রো কক্ষে প্রবেশ করল। দাঁড়াল দরজা থেকে একটু দূরত্বে। রানির থেকেও বেশ দূরে।
রানি তার খাসদাসীটিকে বেরিয়ে যেতে বললেন। তিনি আজকাল রাজ্য সম্পর্কিত কথায় অন্য কাউকে রাখেন না। কাউকেই বিশ্বাস করেন না বলা যায়। এবার চোখ খুলে সরাসরি হ্যাব্রোর দিকে তাকালেন। রানির গায়ে তেমন ভারি বস্ত্র নেই। সদ্য স্নানের পর তিনি খুব কোমল পোশাক পরেন। সেটিই এখন গায়ে। কোনো জড়োয়া গহনা নেই, কোনো বাড়াবাড়ি সাজসজ্জা নেই। অথচ কী সুন্দর লাগছে তাকে! স্বর্গের অপ্সরাও যেন কিছু নয় এই রূপের কাছে। হ্যাব্রো এক পলকও দেখার আস্পর্ধা করল না। তার সেই অধিকার নেই যে।
“তোমার শরীর সুস্থ হয়েছে তো? এখনি কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়লে কেন? কর্ম করার জন্য গোটা জীবনটাতো আছে নাকি? আপাতত বিশ্রাম নিলেও পারো। আমি তো আছিই।”
“আমি সুস্থ আছি, রানি। রাজ্যের জন্য আমার চিন্তাবোধ হয়। বিশ্রাম নিতে গেলো বিশ্রাম নিতে পারি না।”
“এ্যাজেলিয়া রাজ্য তোমাকে আর আমাকে উন্মাদ করে দিয়েছে, বুঝলে? তা বলো কী বলবে?” রানি বেশ হাসতে হাসতেই বললেন। হ্যাব্রো খেয়াল করেছে আগের রানির সঙ্গে এই রানির কিছু সুক্ষ্ম পার্থক্য দৃশ্যমান। আগে রানি কখনোই এমন স্নিগ্ধ হাসতেন না। হাসতেন তবে সেটা সবসময় দম্ভ নয়ত তাচ্ছিল্যময় হাসি। এত নরম স্বরে কথাও কম বলতেন। কণ্ঠ সবসময় তার রুক্ষ ও কর্কশ থাকতো।
জীবন বদলেছে, জীবনের গতিধারা বদলেছে এবং রানিও তার কিছু কিছু আচরণ সংগোপনেই ছাড়ছেন।
“কী হলো? ভাবছো কি? কিছুই যে বলছো না!”
হ্যাব্রোর মনে হলো রাজ্যের কথা পরেই না-হয় বলবে। রানির এই হাসিটি নষ্ট করার মতো আগ্রহ তার হচ্ছে না।
“না রানি, মেলাতে কখন যাবেন সেটিই জিজ্ঞেস করতে এসেছিলাম। তাহলে আমি সবাইকে প্রস্তুত হতে বলতাম!”
“এটাই কি বলতে এসেছো? মনেতো হচ্ছে না।” রানি চট করেই ধরে ফেললেন হ্যাব্রোর কথা ঘুরানোর বিষয়টি। কিন্তু হ্যাব্রোও কি আর বোকা ব্যক্তিটি নাকি? সে-ও খুবই জোড়ালো ভাবেই উত্তর দিলো,
“হ্যাঁ হ্যাঁ, এটিই জানতে এসেছিলাম।”
“আচ্ছা! একটু পরই বের হবো। তৈরি করো সব।”
“আর রানি, চিত্রশিল্পী হেমলক পিয়ার্সও কি যাবেন সঙ্গে?’
“তিনি ফিরে যাননি?”
রানির প্রশ্নে হ্যাব্রো থতমত খেলো। রানির সঙ্গী রাজ্যে ফিরে গিয়েছে কি-না সেটা রানি জানেনই না? মানুষটা এতই উদাসীন সঙ্গীর প্রতি? কেন?
প্রশ্ন করার ধৃষ্টতা দেখালো না হ্যাব্রো। কেবল মাথা নাড়িয়ে বলল, “না, যাননি।”
“তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করে নিও সে যাবে কি-না।”
হ্যাব্রো ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে ফিরে যেতে নিলো। কিন্তু যেতে নিয়েও দাঁড়াল আবার। মাথা নত করে সংকোচ নিয়ে বলল, “আমি কি একটি প্রশ্ন করতে পারি, রানি?”
“অবশ্যই।”
“আপনি হেমলক পিয়ার্সের প্রতি কি কোনো কারণে অভিমান করেছেন? মার্জনা করবেন অনাধিকার চর্চা করছি বলে।
রানি তাকিয়েই ছিলেন হ্যাব্রোর দিকে। তিনি জানতেন হ্যাব্রো এমন কিছুই জিজ্ঞেস করবে। তাই তিনি স্বাভাবিক ভাবেই নিলেন সমস্তটাই। যথারীতি তার বলার ভঙ্গি বজায় রেখেই বললেন,
“আমি কোনো সম্পর্কের প্রতিই তেমন প্রীতি এ যাবতকালে দেখাইনি হ্যাব্রো। তা তুমি অবগতই। তাই হেমলক পিয়ার্স গেলেন না থাকলেন তাতেও আমার বিশেষ জানার আগ্রহ নেই।”
“মার্জনা করবেন। আপনি যে বিষয়টি বললেন তার সাথে আমি বোধহয় একমত হতে পারছি না।”
“কোন বিষয়টি?”
“এই যে কোনো সম্পর্কের প্রতি আপনি প্রীতি দেখান না সেই বিষয়টি নিয়ে। আর কেউ না জানলেও আমি জানি, রানি আপনি প্রতিটি সম্পর্কের প্রতি কতটা অনুগত্য। আপনার খাসদাসী ছিলো রেবেকা, সে যাওয়ার পর আপনার আর কোনো খাসদাসীর প্রতি সেই টান, বিশ্বাসটি আমি আর দেখিনি। আপনার সখী ছিলো যামিনী, তার পর আর কেউ সেই স্থান নিতে পারেনি ও পারবেও না। আপনি আমাকে যেই স্নেহ দিয়েছেন এই জীবনে সেই স্নেহ আমি আমার মাতার নিকট হতেও পাইনি বোধহয়। আপনি প্রতিটি সম্পর্কে ভীষণ যত্নশীল। তবে তার প্রকাশভঙ্গি আলাদা। সবাই না দেখলেও আপনার সেনাপতি ঠিকই দেখে সেসব। আপনারই ছায়াতলে ছিলাম কি-না, এতটুকু দৃষ্টি তো রাখতেই হয়।” শেষ বাক্যটা বলার সময় হ্যাব্রো হাসলো একটু।
রানি কিছুটা বিস্মিত হলেন সাথে অপ্রস্তুত। কিন্তু প্রকাশ করতে চাইলেন না। আলগোছেই কৃত্রিম গাম্ভীর্যতা নিয়ে নির্দেশের স্বরে বললেন,
“এত বিশাল বিশাল কথা না বলে রথ তৈরি করো। আমার বের হওয়ার সময় হয়েছে। যাও।”
হ্যাব্রো তবুও হাসল। কুর্নিশ করে বেরিয়ে গেলো হাসতে হাসতেই। সে যেন রানিকে বুঝে ফেলার আনন্দ লুকিয়ে রাখতে পারছে না। রানি বুক ভরে শ্বাস নিলেন। হ্যাঁ, তিনি প্রকাশ করতে পারেন না প্রীতি। অহংকার, দম্ভ, রাগ, ঘৃণা তার দেহের সাথে এমন করেই মিলেমিশে ছিলো এ অব্দি যে প্রেমটুকু প্রকাশ করার আর বিশেষ সুযোগ হয়ে উঠেনি। কিন্তু তিনি দেখলেন, এই আচরণ তাকে তার মাতার মতোই বানিয়ে দিয়েছে। অথচ তিনি কখনোই তার মাতার মতো হতে চাননি, চান না।
—————
হেমলকের বাহু এত সুন্দর চওড়া যে রোদের আলো প্রথমেই ছুঁতে চায় সেই বাহু। সূর্য এসে লাগে তার চওড়া বুকে। রানির কক্ষের বাহিরে থাকা উন্মুক্ত অলিন্দে দাঁড়ানো সে। রানির অপেক্ষাতেই ধ্যানমগ্ন। সে যতই রানিকে বুঝতে চায় ততই ডুবে যায় কোন এক ঘোর গভীরতায়। আজকাল তো আরও বেশি রহস্যময়ী লাগে তার কাছে রানিকে। রানির জায়গায় অন্য কেউ হলে প্রশ্ন বাণে হেমলককে জর্জরিত করে ফেলত। অভিযোগ, অভিমানে নিস্তার পাওয়ার সম্ভাবনাই ছিলো না। অথচ রানি নিজের মাতার বিষয়ে জানার পর এতটাই নিস্তব্ধ হয়েছেন যে মনে হয় কিচ্ছুটি হয়নি। কোনো হেলদোল হয়নি। আর হেমলকের ভয়টাই এখানে। রানি সমস্তকিছু এমন নীরবে হজম করে ফেলার নারীটি নন। তাই মনে বোধহয় ভেবেই রেখেছেন হরেক রকমের ভাবনা। কিন্তু কী সেটা? হেমলক মরিয়া হয়ে উঠেছে সেই ভাবনাটুকু জানতে। রানি তাকে সান্নিধ্য দিচ্ছেন, ছোঁয়ার অধিকার দিচ্ছেন অথচ কোথাও একটা যেন দূরত্ব তার। এই দূরত্ব কোনো দাম্পত্য জীবনে মানায় না। এত এত দিনেও এতটুকু কাছে সে আসতে পারল না রানির? এতটুকু পাশের হতে পারল না সে?
মনের হরেক ভাবনার ভেতরেই রানি কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। বের হতেই সর্বপ্রথম তার চোখ পড়ল হেমলকের দিকে। হেমলকের দুশ্চিন্তায় ভরা মুখশ্রী। খুব গভীর ভাবে কিছু একটার চিন্তা করছে! রানি একবার তাকে একা রেখে সরে যেতে চাইলেন কিন্তু মস্তিষ্ক তাকে আটকে দিলো ঠিক। তিনি হেমলকের মুখোমুখি দাঁড়াতে অস্বস্তিবোধ করেন ভীষণ। হেমলকের মুখটির সামনে এসে দাঁড়ালেই তার মনে পড়ে যায় নিজের মাতার কথা। মাতার সমস্ত জীবনে করা কৃতকর্মের কথা। যার জন্য হেমলক একটি দারুণ শৈশব হারিয়েছে। হারিয়েছে নিজের কৈশোরকাল টুকুনও। সেগুলো ফিরিয়ে দেওয়া ক্ষমতা রানির নেই। কেবল অপরাধবোধে চূর্ণ হয় হৃদয়।
“কীসের এত ভাবনা আপনার, চিত্রশিল্পী হেমলক? এখনোতো রাজাসনে আরাম করে বসলেন অব্দি না। এখনই এত ভাবনা কীসের?”
রানির ভাসা ভাসা বাক্যে হেমলকের সংশয়ের প্রশ্নবাণ চ্যুত হলো। সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে তাকাল রানির দিকে। রানি তার থেকে কিছুটা দূরেই দাঁড়ানো। স্পষ্ট দৃষ্টি তার মুখের দিকে।
হেমলক প্রসঙ্গ পাল্টে প্রশ্ন করে, “রাজসিংহাসনে আমি কখনো বসবও না। সেসব আমার জন্য নয়।”
“তাহলে কার জন্য? রাজ্যের জ্যেষ্ঠ্য পুত্র আপনি। দায়িত্ব এভাবে পাশ কাটিয়ে গেলে হয়?”
“দায়িত্বের কথা আসছেও বা কোথা থেকে? সেই সিংহাসন তোমার, সম্রাজ্ঞী। তুমিই তো সেখানের সব!”
রানি হাসলেন প্রতিত্তোরে। তবে উত্তর দিলেন না।
হেমলক এতে উতলা হলো আরও। এগিয়ে গিয়ে রানির দু'টো বাহু মৃদু চেপে ধরল নিজের হাতে। পুনরায় জিজ্ঞেস করল, “সিংহাসনের পদ বদলের কথা বললে কেন? তুমি কি ভাবছো বলোতো? তুমি আমায় ছেড়ে দিবে না তো?”
শেষের প্রশ্নটি করার সময় হেমলকের কণ্ঠ শোনালো অসহায়। রানি ঢোক গিললেন। তার মুখের অভিব্যক্তিতে কিছুই বুঝবার উপায় নেই। হেমলক তবুও চোখ দুটো পড়তে চাইল। কিন্তু ফলাফল শূন্য। বুঝতে পারল না কিচ্ছুটি।
রানি আশ্বস্ত করলেন, “ছাড়ব না। তবে দু'টো সিংহাসনও আমি সামলাতে পারব না। যদি আপনি সিংহাসনে বসেন তবেই আমি ছাড়ব না আপনাকে। নতুবা…”
“নতুবা? ছেড়ে দিবে! এত সহজ সব?” হেমলকের কণ্ঠে অবিশ্বাসের ছোঁয়া। রানি সেই প্রসঙ্গে আর একটি বাক্যব্যয় করলেন না। বরং তাড়া দিলেন, “চলুন, সবাই অপেক্ষা করছে। এসব কথা পরেও হবে।”
হেমলক নাছোড়বান্দা নিজের প্রশ্নে। নতুন করে আরও একটি প্রশ্ন সংযুক্ত করে বলল, “তুমি কবে ফিরছো রাজ্যে বলো। নয়ত আমি এখান থেকে এক বিন্দুও নড়ব না। আমি কিন্তু এক কথার মানুষ, রানি।”
বাহুতে থাকা হাতটিও কথার তালে শক্ত হলো। রানি ভেতরে গিলে নিলেন এক বুক হতাশা। বাহিরে আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতেই বললেন,
“যাবো ফিরে। আজ ঘুরে আসি আগে মেলাটি? চলুন।”
হেমলক এবার একটু স্বস্তি পেলো যেন। যাক, অবশেষে রানি ফিরবেন তার রাজ্যে তা-ও কি কম? বুকের ভেতর অনুশোচনার একটি কাঁটা গেঁথে আছে ভীষণ। রাজ্যে ফিরেই সে কাঁটাটি সে উপড়ে ফেলতে চায়। এই খচখচানিটা তাকে শান্তি দিচ্ছে না।
—————
রাজপ্রাসাদ থেকে বাণিজ্যমেলার দূরত্ব খুব বেশি নয়। রানি তার রাজঘোড়ার নিজস্ব রথটি করে এসেছেন সেই মেলা প্রাঙ্গণে। বেশ জন সমাগম। রানির জন্য পথটুকু খালি করে দিচ্ছে সকলে। হ্যাব্রো হাঁটুতে করেই রানি নামালো রথ থেকে। হেমলকও নামল সঙ্গে।
রানিকে দেখতে পেয়েই জয়ধ্বনিতে মুখরিত হলো প্রাঙ্গন। সকলের চোখ হাসছে। রানিকে পেয়ে তারা মন থেকেই যে আনন্দিত বোধ করছে তা তাদের আচরণে স্পষ্ট। প্রজাদের চোখে এত আনন্দ রানি আগে দেখেননি কখনো। তার প্রতি এত প্রীতিও তেমন ছিলো না প্রজাদের। কিন্তু যামিনীর শাসনের পর প্রজারা রানির মর্ম যেন আরও অধিক বুঝতে পারছে আজকাল।
রানি চোখ ঘুরিয়ে সবাইকে দেখলেন।
হ্যাব্রো রানিকে চারপাশটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতে লাগল। হেমলকও হাঁটছে পাশাপাশিই। এবং অবাক না হয়ে পারছে না। এত সুন্দর আয়োজন এর আগে সে কোথাও দেখেনি। এ্যাজেলিয়া রাজ্যের সমস্তটাই যেন অন্যরকম। রানি রাজ্য পরিচালনা করেন কতটা ভক্তি নিয়ে তা এই সমস্ত শৌখিনতা দেখলেই বোঝা যায়। এদিকটা দিয়ে রানির সাথে হ্যাভেনের চূড়ান্ত মিল পায় সে। রানির সাথে হ্যাভেনের বেশকিছু জায়গা যেন ভীষণ মিল। হ্যাভেনের সেই রাজ্য নিয়ে কৌতূহল, প্রেম রানির সাথে ভীষণ মিলে। অথচ তার সাথে? রানির একটি বিন্দুও মেলে না। এজন্যই কি রানির অনীহা এত তার প্রতি? তার মনেও কি হ্যাভেনের সাথে মিলে যাওয়া জিনিসগুলো ঘুরপাক খায়? এজন্যই কি তিনি হেমলককে কাছের ভাবতে পারেন না?
নিজের ভাবনাতেই নিজে বিরক্ত হয় হেমলক। রাগও হয়। ঈর্ষা হয় মৃত হ্যাভেনের প্রতি। নিজের শখের নারীর জন্য অন্তর পুড়ে যায়।
রানি হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করলেন এবার মেলাতে বেশ কিছু পরিবর্তন রয়েছে। বেশ অনেক বণিক মেলাতে উপস্থিত নয়। তাদের অঞ্চলেরই বণিক! তাছাড়া বাহিরের রাজ্য থেকে যেসব বণিক আসে তাদের সংখ্যাও এবার তুলনামূলক কম ও সীমিত। একবার তিনি মনে মনে ভাবলেন, তিনি কি ভুল ভাবছেন? কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো, তিনি ভুল ভাবছেন না। অনুপস্থিতিগুলো তার চোখে লাগছে বড্ড। হ্যাব্রো কি খেয়াল করেনি? তার কাছেতো তথ্য থাকার কথা! সে কি এই কমটা ধরতে পারেনি? না-কি পেরেও বলেনি?
রানি দাঁড়িয়ে পড়লেন পথের মাঝেই। কোনো ভণিতা ছাড়াই স্পষ্ট প্রশ্ন ছুঁড়লেন,
“হ্যাব্রো, এবার এত কম বণিক কেন? অন্যান্য বারতো আরও অধিক থাকে? এবার কিছু রাজ্যের বণিকও আসেনি! তুমি এ বিষয়টা খেয়াল করোনি না-কি আমাকে অবগত করতে ভুলে গিয়েছ?”
রানি স্পষ্ট ছোঁড়া প্রশ্নে হ্যাব্রো জিভ দিয়ে ওষ্ঠ ভিজিয়ে নেয়। একপলক তাকায় মন্ত্রীমহোদয়ের দিকে। সে-ও যথারীতি হ্যাব্রোর দিকেই তাকিয়ে আছে।
রানির কাছে ঘোলাটে ভাবটা যেন এখন স্বচ্ছ হয়ে উঠে।
“কোনো সমস্যা হয়েছে? কী হয়েছে? দ্রুত বলো।”
হ্যাব্রো অপরাধীর মতো মাথা নত করে ফেলে। বিড়বিড় করে বলে,
“রাজা জহুররাজ বেশ কিছু রাজ্যকে আমাদের বিরুদ্ধে খ্যাপিয়েছেন। যতটুকু জানলাম, তিনি না-কি সবার মস্তিষ্কে নারী তান্ত্রিক শাসন, শোষন নিয়ে বিরূপ ধারণার জন্ম দিচ্ছেন। বিভিন্ন আলোচনাতেই আপনার নাম উঠছে আজকাল। তাই সেসব রাজ্যের রাজারা তাদের বণিকদের পাঠাননি। আর আমাদের রাজ্যের কিছু বণিকরা আটকে গিয়েছে সেই বাণিজ্যের অঞ্চলে। রাজা জহুররাজই না-কি রাজ্যে আসতে দিচ্ছেন না।”
“আর এই সংবাদটি তুমি আমায় এখন দিচ্ছো তাই না?”
“না, আসলে ভেবেছিলাম…”
“ভেবেছিলাম? কী ভেবেছিলে? আমার রাজ্য নিয়ে তুমি ভাবার কে? আমি যেখানে উপস্থিত সেখানে তুমি ভাবতে গিয়েছোই বা কেন? এত হটকারিতা করার আস্পর্ধা হলো কীভাবে তোমার? আমায় তুমি বিস্মিত করলে। তোমরা এত সাহস!”
বেশ তীব্র ভাবে কথা বললেন রানি। এতটাই তীব্র যে লজ্জায় হ্যাব্রোর মুখটি নত হয়ে গেলো। হেমলকও তাজ্জব বনে গেলো। রানি রাজ্য নিয়ে কারো সাথেই আপস করেন না। নিজের এত কাছের সেনাপতিকেও এমন বাক্য বাণ ছুঁড়ে দিতে ভাবছেন না! কী পাষাণ তিনি!
“মার্জনা করবেন, রানি। আমি ক্ষমাপ্রার্থী।”
রানি যতটাই তেজ কণ্ঠে ততটাই নম্রতা দেখালো হ্যাব্রো। রানি চারপাশে তাকালেন। রাজ্যের আসন্ন সংকটের কথা তার মস্তিষ্কে বেশ চাপ প্রয়োগ করছে যদিও তবুও তিনি নিজেকে সংযত করে নিলেন। আর যাই হোক রাজ্যবাসীকে ভীত করা যাবে না। এত রাজ্যের ক্ষমতাই নষ্ট হবে। তিনি চতুর ব্যক্তি হয়ে এমন ভুল করতে পারেন না মোটেও। তাই সামলে নিলেন নিজেকে। সবাইকে যার যার কাজ করতে বলে চাপা স্বরে হ্যাব্রোর উদ্দেশ্যে বললেন,
“জহুররাজকে আজকেই পত্র পাঠাও। আমি বলেছিলাম আমার রাজ্য নিয়ে তিনি হেলাফেলা যেন না করেন। তার ফল ভালো হবে না। এখন তিনি তা বুঝবেন। যুদ্ধের জন্য আহ্বান দাও তাকে। নারীর ক্ষমতা কি এবার তিনি বুঝুক। একেতো তার ভগ্নিপতি এত নোংরা কাজ করেছিলো সেটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ ছিলো বলেই শাস্তি দিয়েছিলাম কিন্তু তাকে তখন কিছু বলিনি এখন তার এত বাড় বেড়েছে? এবার তার হিসেব আমি বুঝে নিবো।”
“যুদ্ধের আমন্ত্রণ করব!”
“হ্যাঁ, যু দ্ধের। আমার শাসনতন্ত্রের নিয়ম তিনি ভেঙেছেন। আমাকে আক্রমণ না করা অব্দি আমি আক্রমণ করি না। তিনি আমায় আক্রমণ করেছেন এর ফলস্বরূপ তাকে নিঃস্ব বানিয়ে ছাড়ব আমি। আমি, রানি কামিনীকাঞ্চন এটা প্রতিজ্ঞা করলাম।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………