পবনপত্র - পর্ব ২১ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          মৌমিতার মেজাজটা দিন দিন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। সে নিজেও তা জানে, ভালোভাবেই। আশেপাশের সব মানুষের সাথে সে খারাপ আচরণ করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। সবাই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। শুধু একজন ছাড়া।

যার কারণে মৌমিতার এমন অবনতি, সেই বাদল এখনও অনুরক্ত। তাকে অনেক তেতো কথা শুনিয়েও কাজ হয়নি। ডায়েরিটাও উদ্ধার করা যায়নি।
ছেলেটা তাকে আপু ডাকতে নারাজ। ম্যাডাম বলে ডাকে, নইলে কোনো সম্বোধন ছাড়াই কথা বলে। এমনিতে বয়সে ছোট, তবে আচরণ একটু বেশিই অপরিণত।

টিউশন থেকে শুরু করে লাইব্রেরি, তারপর ল্যাব, ব্যবহারিক ক্লাসেও সে মৌমিতার আসনে বসে পড়ে। অন্য কোনো ছেলেকে বসতে দেয় না। টিউশন ক্লাসে বেঞ্চে নাম লিখে রেখেছিলো নড়বড়ে অক্ষরে। সেদিন দেখা গেলো, ঘষে মেজে আরও গাঢ় করে লিখেছে সেটা। আকারে-ইঙ্গিতে সে বারবার বুঝিয়ে দিচ্ছে, মৌমিতার জীবনে তার জায়গা চাই-ই।
ছেলেটাকে শায়েস্তা করা উচিত!

“আপা?”

মৌমিতা জানালা থেকে চোখ সরিয়ে বোনের দিকে তাকালো। মার্জিয়ার মুখটা অত্যন্ত গম্ভীর। বেশ কিছুদিন হলো দু'জনের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। সাধারণত এই যুদ্ধ এতোদিন স্থায়ী হয় না। তবে এবার উভয় পক্ষই পরস্পরের প্রতি বেশ ক্ষুব্ধ, তাই লড়াই দীর্ঘ হচ্ছে। যদিও যৌক্তিক কোনো কারণ নেই এর পেছনে।

“আম্মা তোমাকে ডাকছেন।”

“যাচ্ছি।”

জোবেদা এসেছে।
জহির মিঞার বড় দুই ছেলে বিবাহিত। চাকরির সূত্রে তারা স্ত্রী, সন্তান নিয়ে বাইরে থাকে। ছুটি না পেলে আসে না।
জহিরের বাড়িতে রান্নাবান্নাসহ যাবতীয় কাজকর্ম জোবেদাই করে। সকালে এসে বিকেলের দিকে বাড়ি যায়। তার বয়স তেমন বেশি না। একটা ছোট ছেলে আছে, তাকে বাড়িতে রেখেই কাজে আসে।

পরিচয় পর্ব শেষ। ভদ্রমহিলাকে প্রথম দেখায় বেশ ভদ্রই মনে হলো। মৌমিতার ঘরে এসে বালতি হাতে সে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। ঘরটা খুঁটে খুঁটে দেখতে লাগলো। তবে সেটাকে চোরের দৃষ্টি বলে ভ্রম হওয়ার উপায় নেই। তার চোখে শুধুই কৌতূহল। ঘরের এক কোণে গিয়ে ভেজা কাপড়টা মেঝেতে ফেলে জোবেদা। এরপর দক্ষ হাতে কাজ শুরু করে দেয়।
মহিলার হাবভাব দেখা শেষ হলে, মৌমিতা আবার নিজের পড়ায় মনোযোগ দিতেই যাচ্ছিলো।

“তুমি মারুফ ভাইয়ের বড় বেটি?”

“জ্বী।”

“কোনো ভাই তো নাই, না?”

“নাহ।”

“আহারে!”

মৌমিতা সরু চোখে জোবেদার দিকে তাকালো। এই প্রসঙ্গে ‘আহারে’ বলার কারণ কী?
ভদ্রমহিলা মনের সুখে বালতির পানিতে কাপড়টা ধুয়ে নেয়। তারপর চিপতে চিপতে পানি বের করে। সে যে এতো গুরুতর একটা মন্তব্য করে ফেলেছে, এটা নিয়ে তার বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই!

মারুফ সাহেব মেয়েদের পড়াশোনার খরচ নিয়ে চিন্তিত। দুটো মেয়েই বিজ্ঞানের ছাত্রী। বই-পুস্তক লাগে অনেকগুলো। আর টিউশন স্যারদের বেতন তো আছেই। মাসে মাসে এসবের পেছনেই সবচেয়ে বেশি অর্থব্যয় হয়। সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় রীতিমতো।
রাবেয়া বিছানার একপাশে বসে আছেন। মনোযোগ দিয়ে টাকা গুনতে থাকা মারুফকে দেখলেন তিনি। একটু হতাশা নিয়ে বললেন, “মেয়েদেরকে সায়েন্সে পড়ানোটা উচিত হচ্ছে না। একে তো আমাদের অভাবের সংসার। তার উপর দুই মেয়ে। অন্য কোনো বিষয়ে ভর্তি করালে এতো খরচ হতো না। আপনি তাড়াহুড়ো করে ঝামেলা করলেন।”

“কোনো ঝামেলা হয়নি রাবেয়া, তুমি বেশি চিন্তা করছো।”

“একজনকে তো চিন্তা করাই লাগবে। আপনি করেন না, তাই আমিই করি।”

“এতো চিন্তা করে লাভ কী?”

“ব্যবসায়ী মানুষের সাথে কথা বলে শান্তি নেই। সবকিছুতেই লাভ-ক্ষতির চিন্তা।”

“কিছুক্ষণ আগেই তো বললে, আমি কোনো চিন্তা করি না।”

রাবেয়া বিরক্ত হলেন। আঁচল দিয়ে কপাল মুছে উঠে দাঁড়ালেন, “আপনি কি কখনো সোজা কথা বলতে পারবেন না?”

“সোজা কথা বলার বয়স শেষ।”

“বয়স বাড়লে মানুষ আরও সরল-সোজা হয়। যাই হোক, কাপড়গুলো তুলতে হবে। বৃষ্টি আসবে মনে হচ্ছে।”

মারুফ মাথা ঘোরালেন। খাটের ওপাশে জানালা, কপাট খোলা। শোঁ শোঁ করে বাতাস আসছে সেদিক দিয়ে। রোদ নেই। ভরদুপুর, অথচ পড়ন্ত বিকেলের মতো অনুজ্জ্বল দেখাচ্ছে বাহিরটা। আজ দোকানে না গেলে কেমন হয়? ওসমানকেও জানিয়ে দিতে হবে তাহলে।
তিনি উঠে দাঁড়ালেন। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে। তবু অলসতাকে প্রশ্রয় দিলেন না। এই শুক্রবারে ছুটি নিলে ক্ষতি নেই। একটু বিরতি দরকার। টানা কাজ করেছে বলে ওসমানকে বকশিশ দিতে হবে।

—————

বৃহস্পতিবার।
মার্জিয়া স্কুলে চলে গেছে। মৌমিতা এখনও প্রস্তুত হয়নি কলেজে যাওয়ার জন্য। ধীরে ধীরে চুল আঁচড়াচ্ছে। রাবেয়া ঘরে ঢুকে এই দৃশ্য দেখলেন, ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, “কলেজে যাবা না?”

“না।”

“কেন?”

“যাওয়ার ইচ্ছা করছে না।”

“তুমি কলেজ এতো মিস দিচ্ছো কেন, মৌ? টিউশনেও ঠিকমতো যাচ্ছো না। কী হয়েছে?”

“কিছু হয়নি।”

“কিছু তো একটা হয়েছে।”

“কিচ্ছু হয়নি আম্মা।”

“তাহলে এতো ফাঁকি দিচ্ছো কেন? পড়াশোনা কেমন চলছে এখন?”

“ভালোই চলছে।”

“আগে তো পরীক্ষার খাতাগুলো এনে আমাকে দেখাতা। এখন দেখাও না কেন? আর পরীক্ষা হয় না?”

মৌমিতা একটা হাতখোঁপা বেঁধে মায়ের দিকে ঘোরে। তার কণ্ঠস্বরে বিরক্তি ঝরে পড়ে, “সবসময় কি দেখানোর দরকার আছে? কারও বাবা মা-ই এভাবে খাতা দেখে না। এতো উপরের ক্লাসে ওঠার পর কারো অভিভাবক এসব অযথা জিনিসে সময় নষ্ট করে না।”

“অযথা জিনিস? তোমার রেজাল্ট যে আর আগের মতো ভালো হচ্ছে না, সেটা আমি জানি।” রাবেয়া চৌকাঠ থেকে খানিকটা এগিয়ে এলেন, “মৌ, তোমার হয়েছেটা কী?”

“এখন কিছু না হলেও আমি জোর করে বলবো যে কিছু হয়েছে?”

“তোমার আচরণ দিন দিন এমন বিচ্ছিরি হচ্ছে কেন, সেটা বলো! একটা কথাও ভালো করে বলছো না। কলেজে গিয়ে কী করো তুমি?”

সে উত্তর দিলো না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় গিয়ে বসলো। কথা বলতে আর ভালো লাগছে না। রাবেয়া চুপচাপ তাকে পর্যবেক্ষণ করলেন একটু। তারপর কাছে গিয়ে নরম কণ্ঠে বললেন, “কী হয়েছে মা? কলেজে কোনো ঝামেলা হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে?”

মায়ের এই হঠাৎ স্বর পরিবর্তনে মৌমিতার তেজ মিইয়ে যায়, একরাশ আবেগ এসে জড়ো হয় চোখের কোণে। তবু সে সটান হয়ে বসে থাকে, মাথা নিচু করে। কণ্ঠনালীতে অনেকগুলো কথা দলা পাকিয়ে থেকে যায়। রাবেয়া মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন, চুলের ভেতর দিয়ে আলতো করে আঙুল বোলাতে লাগলেন, “এভাবে কলেজ মিস দিলে তো পড়ায় পিছিয়ে যাবা। শরীরটা কি খারাপ লাগে? অসুস্থ মনে হয়? মুখটাও একেবারে শুকিয়ে গেছে।”

থুতনিতে হাত দিয়ে মেয়ের মুখখানি উঁচু করে তুললেন তিনি। মুখের উপর থেকে চুলগুলো সরালেন, “যাও তো, রেডি হও। আজকে কলেজে যাও। কাল তো শুক্রবার। সারাদিন বিশ্রাম নিও কালকে। কিন্তু আজকে শরীরটা যদি খারাপ লাগে, তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে চলে আসবা।”

মৌমিতা আচ্ছন্নের মতো উঠে দাঁড়ালো।

“তোমাদের আব্বা এতো কষ্ট করে তোমাদের জন্য। তার শরীরটাও খারাপ থাকে। তবু এই গরমের মধ্যে ঐ দোকানটাতে গিয়ে বসে থাকতে হয়। চাইলেও কাজ ফাঁকি দেওয়া যায় না। ব্যবসা প্রতিদিন একভাবে চলে না। তবু মানুষটা দিনরাত খেটে যাচ্ছে।
দুইটা মেয়েকে শখ করে সায়েন্সে ভর্তি করালো। এখন এতো টাকা ঢালতে হয় এসবের পেছনে। জীবনে কিছু একটা করতে হবে। বুঝেছো মৌ? নাহলে সব বৃথা। মানুষটা নিজের জন্য একটা পয়সাও খরচ করে না। এই মেয়েদুটোর চিন্তায়...”

“আম্মা, আপনি বাইরে যান। আমি কাপড় বদলাবো।”

গতকাল বৃষ্টি হয়েছিলো। উঠোনে পানি জমেছে। শুকনো পাতা পড়ে আছে পুরো আঙিনায়। সকালের নরম রোদে সব ঝিলমিল করছে। ফুলের টবগুলো পানিতে টইটুম্বু্র। পানি ফেলে দিতে হবে। এদিকে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। জমানো পানিতে মশা ডিম পাড়ে। ঐ পানিটুকু ফেলে দিলেই তাদের সব বংশধর শেষ। কতো তুচ্ছ জীবন!

মৌমিতা খুব কষ্টে জুতোয় পা ঢোকালো। এটাও তার কলেজে না যাওয়ার অন্যতম একটা কারণ। এতো কষ্ট করতে ভালো লাগে না। এর চেয়ে বাড়িতে শুয়ে শুয়ে ফেলুদার সিরিজটা শেষ করে ফেলা অনেক বেশি লাভজনক। এবং আরামদায়কও বটে।
সে বারান্দার দরজাটা খুলতেই মারুফ তাকে ডাকলেন, “মৌ মা? রিকশা ভাড়া আছে?”

রিকশা ডাকা আরেক ঝামেলা। নাটোরের সব রিকশাওয়ালা বোধহয় চুক্তি করেছে, এই গলিতে আসবে না। একেবারে মোড় পর্যন্ত হেঁটে যেতে হয়। কিন্তু সেই হিসেবে ভাড়াটা কমে না। এর চেয়ে পুরো রাস্তা পায়ে হেঁটে যাওয়াই ভালো। মৌমিতা মাথা না ঘুরিয়েই বললো, “না।”

মারুফ বুকপকেটে হাত দিলেন, “আচ্ছা, দিচ্ছি।”

মেয়েটা বারান্দা থেকে নেমে যায়, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে, “আমার জন্য অনেক খরচ করেছেন। এতো খরচ করে আর লাভ নাই। আমি হেঁটে যাবো।”

মারুফ টাকাসহ হাতটা বাড়িয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। মৌমিতার আচরণ আগে থেকেই অদ্ভুত। তবে এতোটা রূঢ় সে কখনোই ছিলো না। হঠাৎ করে এমন কী হলো মেয়েটার?

মৌমিতা দেরি করে ঢুকেছে ক্লাসে। স্যারের বক্তৃতার মাঝখানে এসে পৌঁছেছে। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে তাকাতেই তার মুখে আঁধার নামলো। এর থেকে অনেক তাড়াতাড়ি আসার সুযোগ পেয়েও সে কলেজ ফাঁকি দিয়েছে কেবল দেরি হওয়ার ভয়ে। কেননা সে কোনোভাবেই এরকম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে চায় না। তবে বিপদ যখন আসে, চারপাশ থেকেই আসে।
মেয়েটা মাথা নিচু করে শেষের দিকের একটা বেঞ্চে গিয়ে বসে। এতোগুলো চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে, ভাবতেই আরও আড়ষ্ট হয়ে বসলো সে। আরও কতো বিড়ম্বনা বাকি আছে? মৌমিতার মনে হলো, আজকের দিনটা খুব খারাপ কাটবে।

টিফিনের বিরতি দিয়েছে। লাইব্রেরিতে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ, বিধায় মেয়েটা নিজ বেঞ্চে মাথা রেখে চোখ বুজে বসে থাকে। সহপাঠীদের দিকে তাকাতে কেন যেন ভীষণ সংকোচ কাজ করছে তার।
এই সামান্য ঘটনা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবে না নিশ্চয়ই। সবার জীবনেই আরো অনেককিছু আছে। কলেজে কে কতো দেরিতে এসেছে, কে কতোটা লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়েছে—এসব নিয়ে চিন্তা করার সময় নেই কারও। কেউই মনে রাখবে না। তবুও সে মাথা উঁচু করতে পারে না। সহজ হতে পারে না। তার জীবন এতোটা জটিল তো ছিলো না কখনও। সবকিছু এতো জটিল হয়ে যাচ্ছে কেন?

সুরাইয়া নিঃশব্দে পাশে এসে বসলো। মৌমিতাকে চমকে দেয়ার উদ্দেশ্যেই হুট করে পিঠে চাপড় বসালো সে, “কী রে! কী অবস্থা তোর? অসুস্থ নাকি?”

এই আকস্মিক আক্রমণে মেয়েটা মুখ তুললেও সোজা হয়ে বসলো না। কোনোমতে মাথা নেড়ে বললো, “না। ভালো আছি।”

“শুকিয়ে গেছিস, তাই বললাম। তামান্না আজকেও আসেনি?”

“উঁহু।”

একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নামলো তাদের মাঝে। সুরাইয়া একটু প্রস্তুতি নেয়, তারপর বলে ওঠে, “কালকে যে ঝামেলাটা হলো, বাপরে বাপ—”

“কিসের ঝামেলা?”

“তুই জানিস না?”

পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে মৌমিতা সোজা হয়ে ভালোভাবে বসে। জোর করে একটু কৌতূহল দেখায়, “না তো। আমি শুনিনি কিছু।”

“তোকে নিয়ে ঝামেলা হলো, আর তুই-ই জানিস না!”

“আমাকে নিয়ে?”

“হ্যাঁ।” সুরাইয়ার চোখ-মুখ চকচক করছে। সে ঘুরে বসলো। কলেজের যেকোনো ঝামেলার খবর থাকে এই মেয়েটার কাছে। আর সেসব সংবাদ প্রচার করতেও সে ওস্তাদ! পেছনের বেঞ্চে কনুই ঠেকিয়ে আরাম করে বসলো সে। তারপর বলতে লাগলো, “শুভর কথা মনে আছে? তোকে পছন্দ করতো...”

মৌমিতার কৌতূহল বিরক্তিতে রূপ নিলো। এসব নিয়ে গল্প করার মন-মানসিকতা এখন নেই তার।
একাদশ শ্রেণিতে শুভ নামের একটা ছেলে তাকে পছন্দ করতো। তাদের নিয়ে গুজবই রটেছিলো বেশি। সত্য-মিথ্যা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। সেই পুরোনো কাসুন্দি নিয়ে আবার ঘাঁটাঘাঁটি হচ্ছে? ব্যাপারটা খুবই অস্বস্তিকর।

“মুখটা ওরকম করলি কেন? শোন! কালকে বাদল শুভর বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে একেবারে। ওদের যে কী নিয়ে ঝামেলা হলো, বুঝলাম না কিছু। তবে তোর নামটা আমি শুনেছি। তোকে নিয়েই ঝামেলা করেছে।
ভাবতে পারিস? কতো বেয়াদব ছেলে! সিনিয়রদের সাথে এইরকম আচরণ। আমি তো অভিযোগ দিতে দিতে হাঁপিয়ে গেছি। এদের কোনো শিক্ষাও হবে না, লজ্জাও হবে না। তোকে দিয়ে দরখাস্ত লিখিয়ে নেওয়া ঠিক হয়নি। অনেক ক্ষেপে গেছে। আর এদের নামে হাজারটা অভিযোগ করেও তো লাভ নেই...”

মৌমিতা মাথা ঘোরায়। বেঞ্চের উপর হাত গুটিয়ে আবার হেলান দেয়ার চেষ্টা করে। সুরাইয়া তার এই নিভু নিভু আগ্রহ দেখে নিজের আগ্রহের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, “শুভ তোকে পছন্দ করে—এটা জানার পর বাদল এমন পাগলামি করলো কেন?”

“ওটাকে পাগলামি বলে না। বেয়াদবি বলে।”

“ঐ আরকি! ছেলেটা তোর পেছনে এমনভাবে পড়েছে...” ইচ্ছে করেই কথাটা আর শেষ করলো না সুরাইয়া। দরজার দিকে চোখ রেখে ব্যস্ত হয়ে বললো, “আমি যাই মৌ। এখনই বেল দিবে।”

“আচ্ছা।”

—————

ব্যবহারিক ক্লাসে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। তবু মেয়েটা গুটি গুটি পায়ে পুরোনো ভবনের দিকে এগোতে থাকে।
তিনতলায় ল্যাব, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে এতোদূর। বারান্দার সামনে পানি জমেছে, কাদা হয়ে গেছে। স্বস্তির কথা হলো, এখানে ভিড় নেই বললেই চলে। অনেকেই অনুপস্থিত। কেউ কেউ আবার ক্লাস শেষ করেই বাড়ি চলে গেছে। ব্যবহারিক ক্লাসে রয়ে গেছে হাতে গোনা কয়েকজন।

বারান্দায় পা ফেলে সিঁড়ির দিকে ঘুরতেই মৌমিতার চোখ যায় গাছতলায়। বাদল দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। একাদশ শ্রেণির হয়তো কোনো ব্যবহারিক নেই আজকে।

গুটিকয়েক শিক্ষার্থী, এলোমেলো হয়ে বসেছে সবাই। মৌমিতা তবু সামনের দিকের কোনো বেঞ্চে বসলো না। তার নির্ধারিত আসন চতুর্থ বেঞ্চের কিনারা। সেখানে ব্যাগ রাখতে গিয়ে সে আবিষ্কার করে, সিট-বেঞ্চে একটা ভাঁজ করা কাগজ। মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে সেটার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর কাগজটা হাতে নিয়ে বসে পড়লো।

স্যার এখনও আসেননি, ক্লাস শুরু হতে বেশ দেরি আছে। মৌমিতা চারপাশে চোখ বুলিয়ে নেয় একবার। তার মনে কোনো ভয় কিংবা দুশ্চিন্তা দেখা দিলো না। এখন থেকে এসব ছোটখাটো ব্যাপারে আর মাথা ঘামাবে না বলেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। সে নিশ্চিন্ত মনে ধীরে সুস্থে কাগজের ভাঁজ খুললো।

“ম্যাডাম,
আপনার সাথে সামনাসামনি কথা বলতে গেলে একটু অসুবিধা হয়। আপনি চুপ করে থাকেন। আমি একা কথা বলি। আর সোজাসুজি তো বলেন না কিছু। শুধু বাঁকা কথা বলেন। তাই মনে করলাম, আপনাকে আপনার পদ্ধতিতেই কথাটা জানাব।
আমার হাতের লেখা ভালো না। আমি গুছিয়ে লিখতেও পারি না। তবু লিখছি। কারণ আর উপায় দেখছি না।

আপনার ডায়েরি আমি একটা শর্তে ফেরত দিতে পারি। ওটা আমার কাছে থাকা না থাকা বড় কথা নয়। আপনি থাকতে পারবেন কি? সারাজীবন? অপেক্ষা করতে বললেও রাজি। বাদল অপেক্ষা করতে পারে—এটার প্রমাণ চাইলে আবার দিতে পারি।
আর কিছু লিখতে পারছি না। আপনি তো বুদ্ধিমতী। বুঝে নিবেন আশা করি।

ইতি
বাদল”

নিজের জিনিস ফেরত পাওয়ার জন্য শর্ত পূরণ করতে হবে! তাও আবার এমন শর্ত, যার কোনো আগামাথা নেই।

মৌমিতা দাঁতে দাঁত চেপে ধরলো রাগে। দুয়েকটা গোপন কথা জেনে গিয়েছে বলে, সেটার দোহাই দিয়ে তাকে মানসিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে ছেলেটা। এটাকে প্রেমের সংজ্ঞায় ফেলা মূর্খতা। এভাবে পরোক্ষ হুমকি দিয়ে কারও মনে জায়গা করে নেওয়া যায় না। আর বাড়াবাড়ি করারও একটা সীমা থাকে।

মৌমিতা ল্যাব থেকে বেরিয়ে দ্রুত নেমে এলো নিচতলায়। বারান্দা থেকে বাইরে বের হলো, পা রাখলো কর্দমাক্ত ঘাসের উপর।
বাদল এখনও গাছতলায় দাঁড়িয়ে আছে, ব্যাগের ফিতে গুটাচ্ছে মন দিয়ে। কয়েক মিটার দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার উপস্থিতি অল্প টের পেলো হয়তো। ভুলক্রমে একবার তাকালো সেদিকে, তারপর আরেকবার তাকালো সচেতনভাবে। মেয়েটার অভিব্যক্তি বুঝতে পারলো না। তবু আচ্ছন্নের মতো পা ফেলে এগিয়ে আসতে লাগলো ছেলেটা।

মাঠে তেমন জনমানব নেই। মৌমিতা ঐ জনশূন্য ময়দানের দিকেই দৃষ্টি ফেরালো। সে পরিকল্পনা করেছিলো, এবার কষে একটা চড় বসাবে ছেলেটার গালে। কিন্তু দূরত্ব যতো কমলো, তার দুর্বলতা বাড়তে লাগলো ততোই।

বাদল সামনে এসে দাঁড়ালো, বেশ কাছাকাছি। তবে তার চোখে মুখে বিভ্রান্তি। সে কোনো শব্দ উচ্চারণ করার আগেই মৌমিতা চিঠিটা তুলে ধরলো মুখ বরাবর, মুখের পাশাপাশি নিজের সমস্ত দুর্বলতাও আড়াল করলো। তারপর টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেললো কাগজটা। মুহূর্তের মধ্যে তা টুকরো টুকরো করে সরাসরি ছেলেটার মুখের উপর ছুঁড়লো। তার প্রতিক্রিয়া দেখারও অপেক্ষা করলো না। হনহন করে ফিরে গেলো ক্লাসে।

রসায়নের ব্যবহারিকে দুটো বিক্রিয়া করতে দেয়া হয়েছিলো। দুটোই ভুল করেছে মৌমিতা। কিছুতেই মন বসাতে পারেনি কাজে। তার মাথাটা ঝিমঝিম করছে।
সে ক্লাস শেষে বাকিদের সাথে বেরিয়ে এলো মাথা নিচু করে। করিডোর ধরে হাঁটলো চুপচাপ। বাতাসের তেজ বেড়ে গেছে।
নিচতলার বারান্দায় এসে ঘাসের দিকে তাকালো মেয়েটা। কাগজের টুকরোগুলো হয়তো তীব্র বাতাসে উড়ে গেছে কোথাও। তাদের চিহ্নমাত্র দেখা গেলো না।
মৌমিতা মাঠে নেমে আসে। ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়েই কৌতূহলবশত গাছতলার দিকে তাকায় একবার। ঢালাইয়ের উপর ছেলেটা বসে আছে এখনও। সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে রয়েছে। দুই হাতের মাঝখানে যত্ন করে ধরে রেখেছে কিছু একটা।

মেয়েটার দম বন্ধ হয়ে আসে।
কাগজের টুকরোগুলো হাওয়ায় উড়ে যায়নি। ছেলেটা কুড়িয়ে নিয়েছে। ওগুলোই হাতের মাঝে নিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে কোনো একদিকে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp