গত নিশীথে সব যখন ঘুমে অচেতন তখন মেয়ের হোস্টেলের ম্যাট্রন ফোন করেছিল। পত্রটার খুব জ্বর, জ্বরের ঘোরে আবোলতাবোল বকছে। সাথে পত্রলেখার পায়ে আঘাত লাগার কথাও জানান। তারপর থেকেই পপী চৌধুরী স্বস্তি পাচ্ছেনা। মেয়েটা অভিমান করে কিছু বলেও নি তাকে। মেয়েটার প্রতি তার অগাধ বিরক্তি, ভালোবাসা দুটোই হয়। বিরক্তি প্রকাশ করতে পারলেও ভালোবাসা কমই প্রকাশ করে সে। মেয়েটা পোড়া কপাল নিয়ে দুনিয়ায় আসলো কেন? আসলি তো তাও এই নিষ্ঠুর স্বার্থপর মায়ের পেটেই! কোনো ভালো মায়ের কোলেও তো ঠায় জুটতে পারতো।
"পপী, তুমি পত্রলেখাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে আসো। এই অবস্থায় হোস্টেলে একা কি করে থাকবে?"
স্বামী কারিম মোল্লার কথায় পাপী ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে বলল, "এখানে কি করে আনি কারিম? জারিফকে তো চেনোই..."
"পত্রলেখা বাড়িতে থাকলে ও কিছু করার সাহস পাবে না। বরঞ্চ বাইরে থাকলে ভয় বেশি। ও মেন্টাল গোছের মানুষ। কখন কি করে বসে। ঘরে সবার মাঝে উল্টোপাল্টা কিছু করার সাহস পাবে না। আর তুমি যেই ভয়টা পাচ্ছো সেরকম জারিফ করবে না। জারিফ হয়তো হুমকি ধামকি দিয়ে পত্রলেখাকে কাজি অফিস..."
"আমি এটাও চাই না কারিম। জারিফ হয়তো পত্রলেখাকে বিয়ে করবে, ভালোবাসবে কিন্তু ওঁর ভালোবাসাটা সম্মানের কখনোই হবে না, অসুস্থ ভালোবাসা। আমি চাই আমার পত্রকে সম্মানের সাথে ভালোবাসবে এমন কেউ ওঁর জীবনে আসুক। তাছাড়াও জারিফ আমার দেবর হয় কারিম, এমনটা ভাবতেও কি করে পারো?"
"কি জানি, জারিফ প্রথমবার কোনো মেয়ের প্রতি ইন্টারেস্ট দেখালো। তাও এতোটা পাগলপণা। আই থিংক ও পত্রলেখাকে ভালো রাখতে পারতো। তাছাড়াও ও বলছিল, তোমার যেহেতু সম্পর্কে সমস্যা তাহলে না হয় ও অন্য কোথাও গিয়ে থাকলো পত্রকে নিয়ে।"
"প্লিজ কারিম, তুমি তোমার পাগল ভাইকে সাপোর্ট করা বাদ দাও। মেয়েটা আমার, ওঁর বিষয়ে আমাকেই না হয় ভাবতে দাও?"
কারিম মোল্লা এ বিষয়ে আর কথা বললো না। যার মেয়ে সেই ভাবুক। পপী চৌধুরী মেয়ের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়ে। বাগানে দেখা হয় জারিফ মোল্লার সাথে। তিনি উপেক্ষা করে চলে যেতে চাইলেন। কিন্তু জারিফ মোল্লাই এগিয়ে আসলো। কোনো প্রকার ভণিতা ছাড়াই বলল,
“দেখেন ভাবী, ভালোভাবেই প্রস্তাব রেখেছিলাম। যথেষ্ট অনুরোধ করা হয়ে গেছে। আপনারা আমার ভালোমানুষীর মান রাখেন নাই। এরপর যা হবে তার জন্য আপনারা দায়ী। আমার একটাই নীতিমালা, যা আমার পছন্দ তা আমি যেমনই হোক আমার করে ছাড়বো। আর তা আমার না হলে আর কারোরই হবে না। যাস্ট ওয়েট এন্ড সি।”
যেমন এসেছিল তেমনি ভাবে বাগান পরিষ্কার করতে চলে যায়। পপী চৌধুরী ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে তাকিয়ে রয়। কিসের ইঙ্গিত দিয়ে গেলো জারিফ?
—————
“আব্বা, গফুরের বউ তো কেস তুলতে চাচ্ছে না। দেড় লাখ অফার করেছিলাম। ফিরিয়ে দিয়ে বলেছে, স্বামী হত্যার বিচার চায়, টাকা চায় না সে। স্বামীকে নাকি ভালোবাসে।”
“এতোই যখন ভালোবাসা, তারে খবর দেন যে সোহরাব আইতাছে। লাইলীরে মজনুর কাছে পাঠাবো। বারো বাড়ির বারো না*ঙ নিয়া ঘুরে আর গায়ে ফিরে, আমি সতি সাবিত্রী! গাড়ি পাঠান আব্বাজান। আমি আজকেই গাঁও যামু।”
“আরে আব্বা শান্ত হন। মাথা গরম করেন কেন? আমি দেখছি তো ব্যাপার খানা। আপনার আসার দরকার নাই। আপনার আম্মা আর আপারা আমার উপরে চিল্লাচিল্লি করবে। আর কটাদিন থাকেন সায়রার ওখানে। মামলা ডিসমিস হলে আমিই খবর দিবো। দুই দুইটা মার্ডারের মামলা, তাঁর উপর প্রত্যক্ষ সাক্ষী আছে কয়েকজন।”
“জলদি করেন আব্বা। আমার মাথা গরম হইলে কিন্তু সবকয়টার খবর কইরা দিমু। রাখি ফোন!”
ফোন কেটে পকেটে ঢুকায় সোহরাব। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের বাগানটা দেখে। বেশ দৃষ্টিনন্দন, দেশি-বিদেশি ফুলের হাঁট বসেছে যেন। সোহরাব ঝুঁকে একটা কাঠগোলাপ তুলে নেয়। হঠাৎ সোহরাবের মনে হলো পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে। সে পিছু ফিরতেই রসকষহীন গলা শোনা গেলো।
“হোয়াই ডিড ইউ পিক দ্য ফ্লাওয়ার্স ফ্রম মাই প্ল্যান্ট?”
সোহরাব কাঠগোলাপ নিজের কানে গুঁজে নিয়ে বলল, “বাংলায় বলেন ম্যাডাম। আমি গাঁওয়ের ক্ষ্যাত, ওত ইংরেজি বুঝি না!”
অরুণিতার কপাল কুঁচকে যায়। এমনিতে তো কালো ভাল্লুকের মতোই লাগে, কিন্তু কানে কাঠগোলাপ গোজায় একটু সুদর্শন লাগছে। মেয়েলী লাগছে না, বরং পুকি টাইপ কিছু একটা লাগছে। এন্ড ওল ক্রেডিট গোস ট্যু অরুণিতা সরকার। কারণ কাঠগোলাপ গাছটা তাঁরই। যাইহোক অরুণিতা এক কথা দুবার বলা পছন্দ করে না। তাই প্রসঙ্গ বদলে স্বভাব সুলভ রসহীন কণ্ঠে বলল,
“একটু আগে কার সাথে কথা বলছিলেন? আমি সব শুনে নিয়েছি। এ টু যেট।”
সোহরাবের মাঝে সেরকম কোনো ব্যাপার লক্ষ্য করা গেলো না। সে বুকে হাত ভাঁজ করে জানালার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নিষ্পলক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো অরুণিতার উপর।
“কিছু বলতেন ম্যাডাম?”
অরুণিতার কপালের ভাঁজ দৃঢ় হয়। লেজ কাটা বাঁদর হঠাৎ ভালো মানুষ সাজছে যে? অরুণিতার মনোভাব বুঝে সোহরাব হেসে বলল, “ সিংহির ডেরায় এসে সিংহিকে বিরক্ত করার মতো সাহস সোহরাব শেখের নেই ম্যাডাম। তাছাড়াও আমি তো গাইয়া ভুত, ক্ষ্যাত, অভদ্র আরও কত কিছু। ভাবলাম একটু ভদ্র সাজি।”
অরুণিতা বাঁকা দৃষ্টি ক্ষেপন করে। নিশ্চয়ই মাম্মামকে বলা তাঁর কথা শুনে নিয়েছে! কষ্ট পেয়েছে কি? পাক, তাঁর কি?
“কিছু বলতেন ম্যাডাম জি?”
অরুণিতার ভোঁতা নাক সিকায় ওঠে। অতিরিক্ত জি হুজুরি যে চোরের লক্ষন। তবে সে ওতশত ভাবলো না। যা জানতে এসেছে তাই শুধালো,
“আপনি নাকি পাঁচ বোনের এক ভাই। সবাই আপনাকে অনেক ভালোবাসে।”
সোহরাব হাসলো, “ভালোবাসে মানে? জান হারায় আমার উপর। আমার গায়ে মশা পড়লেও সবাই ঢাল তলোয়ার কামান নিয়ে বেরোয় মশা নিধন করতে। আমাকে ছাড়া তাদের দিন শুরুই হয় না। আব্বাজান আম্মাজানের থেকে আপারা বেশি স্নেহ করে। তাদের সংসারে হাজারো ব্যস্ততা থাকলেও রোজ তিনবেলা ফোন করে হালচাল জিজ্ঞাসা করে, বাবু কি করছিস, বাবু খেয়েছিস, বাবু সজনে ডাঁটা দিয়ে শুঁটকি রেঁধেছি কষ্ট করে খেয়ে যা, না গেলে নিজেই হাজির তরকারি নিয়ে। আমি যদি ভুলক্রমেও হাঁচি দিই সবাই চিন্তার অতলে ডুবে যায়। ডাক্তার, ওষুধ পত্র, ফল পাকুর হাজির আমার সামনে। ওহ্ হ্যাঁ বলতে ভুলে গেছি বাবু আমার ডাকনাম। সবাই আদর করে ডাকে।”
অরুণিতা অনেকটা অবিশ্বাস্য মনে তাকিয়ে ছিলো। এমনও হয় নাকি! লোকটা বাড়িয়ে চড়িয়ে বলছে। সে সোহরাবের শেষোক্ত কথায় ঠেস মেরে বলে, “বুড়ো ঢ্যামনা অথচ ডাকনাম বাবু।”
সোহরাব ঠোঁট চেপে হেসে বলল, “আমিও এটাই বলতাম। তখন আপারা গাল টেনে দিয়ে বলে, তুই তো আমাদের কাছে এখনও সেই ছোট্ট বাবু সোনা।”
“আষাঢ়ে গল্প শোনানো বন্ধ করুন। আপনি হুট করে এসে বাবা মায়ের চোখের মণি হয়ে যাবেন আর আপনার বোনেরা আপনাকে মাথায় তুলে রাখবে, তাই না? পাগল ভেবেছেন আমাকে?”
সোহরাব যেন বুঝতে পারলো অরুণিতার মনোভাব। হাতে পায়ে বড় হলেও মনটা এখনো বাচ্চামোতে ভরপুর। সে খুবই সুক্ষ্মতার সাথে বলল, “ সব রিজিকের উপর নির্ভরশীল। যার রিজিক যতটুকুন সে ততটুকুনই পাবে। আমার রিজিকে আল্লাহ পাক বাবা মায়ের যতটা ভালোবাসা স্নেহ লিখে রেখেছেন, তা আমি পাচ্ছি। আবার আমার আপাদের ভাগের টুকু তাঁরা পেয়েছে। হয়তো কেউ কম, কেউ বেশি। তবে আমার জানামতে বাবা মা তাঁর সব সন্তানকেই সমান চোখে দেখে। হয়তো কারো ক্ষেত্রে প্রকাশ কম হয়, আবার কারো ক্ষেত্রে বেশি। আবার কেউ বাবা মায়ের থেকে বেশি ভালোবাসা আদায় করে নিতে পারে, কেউ জড়তায় কাছে ভীড়ে না। যে সন্তান বাবা মায়ের সাথে লেগে থাকবে সহজভাবেই বাবা মা তাঁকে একটু বেশি কাছে টানবে। কিন্তু তাঁর মানে এই না ওকে বেশি ভালোবাসে, আমাকে বাসেই না। ব্যাপারটা মানসিকতার উপর বর্তায়, হিংসা বিদ্বেষ পোষণ করলে খারাপ দিকটাই আগে চোখে পড়বে। আর ভালোবেসে দেখলে ভালো দিক। আমার আপারা তো আমাকে ভালোবেসেই গ্রহণ করে নিয়েছে। হিংসে করেই বা কি করবে? তাদেরই তো আপনজন। একসময় বাবা মা থাকবে না, তখন তাদের আপন বলতে এই একটা ভাইই তো থেকে যাবে। একটা বিপদ হোক, সবার আগে ভাই হাজির হবে সেখানে। আবার ভাইয়ের কিছু হলে সবার আগে বোনের চোখেই জল চলে আসে। ভাই বোনের বন্ধনটা রক্তের সাথে আত্নারও বুঝলেন ম্যাডাম? দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্ক এটাই। ভাই মানেই ভরসার স্থান, সে হোক ছোট বা বড়।”
লম্বা ভাষণের পর সোহরাব হাততালির আশায় ছিলো। কিন্তু গোমড়া মুখো মেয়েটার হেলদোল নেই। মুখের ভাব দেখে মনবাড়ির হদিশ পাওয়া বড্ড মুশকিল। এতো কঠিন মেয়ে সে দুটো দেখে নি। এইটুকু মেয়ে অথচ ভাব দেখায় তিন চার বাচ্চার মা হয়ে গেছে। দুটো চটকানা দিলে একদম লাইনে এসে যেতো। তাদের নীরাবতার মধ্যেই হঠাৎ চপর চপর পায়ের শব্দে ভেসে আলো। সোহরাব বাম দিকে তাকায়। বাড়ির ছোট কর্তা হাজির।
প্রহর এগিয়ে আসে তাদের দিকে। বোনের হাতটা নিজ হাতের মুঠোয় ভরে সোহরাবের উদ্দেশ্যে বলল, “কালো ভাল্লুক, তুমি কি আমার আপুনিকে বিরক্ত করছো?”
“আমার ঠ্যাকা!” সোহরাব মুখ বিকৃত করে বলে উঠলো।
প্রহর চোখ পিটপিট করে প্রশ্ন করে, “ঠ্যাকা কি?”
“তোর আপার বোচা নাক।”
প্রহর বোনের দিকে তাকায়। অরুণিতার নাকের পাটা ফুলে যায়। রাগত স্বরে সোহরাবকে বলল, “আপনার নাক বোচা।”
সোহরাব নিজ কানের ফুল বিনা ছুঁয়ে অরুণিতার কানে গুঁজে দিয়ে বলল, “রাগলে খারাপ লাগে না। যাইহোক আজ ঝগড়ার মুড নাই। হয়তোবা এটাই শেষ দেখা। খুব শিগগিরই আপনাদের শহর থেকে চলে যাচ্ছি। শহরের কিছু মানুষ আমাকে সহ্যই করতে পারছে না। না পারুক, কিন্তু আমি তো আমার ছোট্ট গাঁওয়ের অঘোষিত নবাব সাব। যাকে দেখলেই কপালে হাত তুলে লম্বা সালাম দেওয়া হয়। আপনাদের কাছে গাইয়া ভুত, ক্ষ্যাত হলেও তাদের কাছে আমি মানেই গোটা কুন্তল গাঁও।”
অরুণিতার সুক্ষ্ম দৃষ্টি সোহরাব শেখের গমন পথে। নিজের ঢোল পেটা কেউ এর থেকে শেখো !
“আপুনি কালো ভাল্লুক চলে যাবে কেন? কালো ভাল্লুক বলে ডেকেছি বলে রাগ করেছে? আমি তো ভালোবেসে কালো ভাল্লুক ডাকি!”
অরুণিতো ছোট ভাইয়ের দিকে তাকায়, “ওনাকে ভালোবাসো তুমি?”
“কেন ভালোবাসবো না?”
প্রহরের পাল্টা প্রশ্ন আসতে দেরি হয় না। অরুণিতা বিড়বিড় করে বলে, “কেন ভালোবাসবে?”
“কালো ভাল্লুক তো আমার দুলাভাই হয়!”
অরুণিতার কি হলো কে জানে। দাঁত কটমট করে বলল, “খবরদার আমাকে আপুনি ডাকবি না। তুই আর তোর দুলাভাই দুটোই বদ।”
অরুণিতা ধপাধপ পা ফেলে চলে যায়। প্রহর হা করে তাকিয়ে রইল আপুনির দিকে। বকলো কেন তাঁকে?
ক্ষণিকের মেহমান খুব একটা দেরি করলো না। নাশতা খেয়েই সকলের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। মেহমান মূল ফটক পেরিয়ে না যেতেই পাতা মেহমানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এ যুগের ছেলে হয়েও কতটা বিনয়ী, ভদ্র আর সুন্দর মন মানসিকতার। অরুণাভ বিরোধীতা করতে গিয়েছিল কিন্তু কাজে দেয় নি। পাতা কিছুই শুনতে রাজি না। অরুণাভ অরুণিতা হতাশ হয়ে মায়ের দিকে তাকায়। জানে না ক্ষণিকের মেহমান তাঁদের মাকে কি এমন জাদু করে গেলো যে মুখ থেকে প্রশংসার ঝুলি ফুরোচ্ছেই না।
—————
হাতে লাল রঙের বক্সিং গ্লাভস। হাতা কাটা লাল জার্সি ভিজে চিপচিপ। বাবড়ি চুল চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঘাম ঝড়ছে। চিকনা চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। ধারালো অস্ত্রের মতো চাহনি স্পিডি ব্যাগকে ক্ষতবিক্ষত করতে প্রস্তুত। কৎ শব্দে ঢোঁক গিলে নিলে অ্যাদম'স অ্যাপলের ওঠানামা রুদ্ধদ্বার নিস্তব্ধ কক্ষকে ভৌতিক অনুভূতি করায়। স্পিডি ব্যাগে অরুণাভ ভোর সরকারের বিরামহীন আঘাত, আঘাতের শব্দ পরিবেশকে আরও রোমাঞ্চকর করে তোলে। হঠাৎ ফোনের রিংটোনে ভাটা পড়ে সবে। অরুণাভ তোয়ালে টেনে ঘাম মুছে। গ্লাভস খুলে রাখলো। ঝাঁপসা গ্লাস সরিয়ে নিজ ঘরে ফিরে এসে বিছানা থেকে ফোনটা তুলে। রিসিভ করে কানে ঠেকালো। কিছুই বলল না। ক্ষণপল পর ওপাশ থেকে চেনা পরিচিত কণ্ঠস্বর শোনা গেলো।
"ইচ্ছে করে ফোন টোন করি নি আমি। হাতে চাপ লেগে চলে গেছে।"
অরুণাভও গম্ভীর গলায় পাল্টা জবাব দিলো, "রিসিভ করি নি, চাপ লেগে হয়ে গেছে।"
"মা'কে মোরগ পোলাও রাঁধতে বলি নি। একাই রেঁধেছে। কেউ একজন এসে যেন খেয়ে যায়। নাহলে মা রাগ করবে।"
ওপাশ থেকে আবারও ভেসে আসে গোলা বারুদ। অরুণাভ কম নাকি! সেও ছুঁড়লো, "আন্টিকে বলা হোক অরুণাভ ডায়েটে আছে। কোচ ভাত অবদি খেতে দিচ্ছে না। মোরগ পোলাও সেখানে বিলাসীতা।"
"কি বলছিস? মোরগ পোলাওয়ের কি হবে এখন?"
"কি আর হবে! আন্টির সুপুত্র গিলবে সব।"
টুটুলের মনটা খারাপ হয়ে যায়। বন্ধুর সাথে ভাব জমাতে মাকে দিয়ে জোর করে মোরগ পোলাও রেঁধেছে। নেটফ্লিক্সে নতুন রিলিজ পাওয়া রোমান্টিক হরর মুভি সিলেক্ট করে রেখেছে। বন্ধুকে ডেকে জমিয়ে আড্ডা দিবে।
"কেউ একজন কি ফোনটা কাটতে ভুলে গেলো? আমি কাটবো?"
অরুণাভের ঠেস দেওয়া কথায় টুটুল জ্বলে পুড়ে উঠলো, "কাটবিই তো। এতো দিন আমাকে ছাড়া চলতো না। ক্রিকেট পাড়ায় গিয়ে নিত্যনতুন বড়লোক বন্ধু বানাইছোস। বেনিফিট পাস, এখন আমি কোন চ্যাটের বা*ল। আমারে তো আর ভাল্লাগবে না।”
অরুণাভ রাগলো না। অতি শান্ত সুরে বলল, "আমি তো স্বার্থপর মানুষ। তোর উপর অহেতুক অধিকার দেখাই। আমার সাথে বন্ধুত্ব করা তোর জীবনের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা গার্লফ্রেন্ড বানাতে পারিস না আমার জন্য। আমি কুফা তাই এদিক সেদিক হলেই বন্ধুত্ব ছিন্ন করার কথা ওঠাস। আমার ব্যবহারে ত্যক্তবিরক্ত হস। তাই ভাবলাম দুরত্বই সই। তোকে একা ছেড়ে দিই। অবশ্য একা কোথায় তুই? ওই চিঠিপত্র আছে না! ফ্রেন্ড উইথ লটস ওফ বেনিফিট!”
প্রথমে শান্ত থাকলেও শেষের দিকে নিজের ভেতরকার ক্ষোভ প্রকাশ না করে থাকতে পারলো না অরুণাভ। সেদিনের পর চার মাস! ১২০ দিন পর অরুণাভের কথা মনে পড়লো? নো ম্যাসেজেস, নো মিসড কল!
ফোনের ওপাশের টুটুলও চুপ থাকলো না। গর্জে উঠে বলল, “লিমিটে থেকে কথা বলবি অরু। পত্রলেখা আমার ফ্রেন্ড, যাস্ট ফ্রেন্ড।”
“যা…স্ট ফ্রেন্ড হুঁ? লাড্ডু ছিলি না ওঁর উপর? পটিয়ে বিয়ে করার ধান্দায় ছিলি…”
“ওটা আমি মজায় মজায় বলেছি। তোকে বিরক্ত করার জন্য। তাছাড়াও একটু একটু ভালো লেগেছিল কিন্তু মেয়েটা বোবা। তাই মনের ঘরে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছি।”
অরুণাভের কপালে ভাঁজ সৃষ্টি হয়, “এটা কোনো রিজন হলো তালা ঝোলানোর?”
টুটুল দাঁতে নখ খুঁটতে খুঁটতে বলে, “আরেকটা আছে?”
“কি?” অরুণাভের কণ্ঠে কৌতুহল। টুটুল ভোঁতা মুখে বলে, “ব্রো, শি’জ গট আ ক্রাশ ওন ইয়্যু।”
“হোয়াট!”
অরুণাভ চেঁচিয়ে ওঠে। টুটুল দাঁত কেলিয়ে বলল, “বাকিটা জানতে গরীবের বাড়িতে বিনা পয়সায় ভিজিট করুন।”
টুট টুট টুট করে ফোন কেটে যায়। অরুণাভের ভ্রু কুঁচকে যায়। টুটুলের কথার মানে কি? এই চিঠিপত্র টা নিশ্চিত আরেকটা ঝামেলা পাকাবে। ডাঈনী একটা। যবে থেকে দেখা হয়েছে একটার পর একটা ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। কুফা মেয়ে! বিড়বিড় করতে করতে অরুণাভ কাপড় চোপড় নিয়ে ওয়াশ রুমে চলে যায়।
—————
পাতা কোমড়ে হাত চেপে পায়চারি করছে। হাত পায়ে পানি ধরে ফুলে ফেপে আছে। ডাক্তার বলেছে নিয়ম করে হাঁটতে, টুকটাক কাজ করতে। অথচ সারাটাদিন পাতার শুয়ে বসে কাটে। করার মতো একটা কাজও নেই তার। অলস বসে থাকায় মেজজটাও খিটখিটে হয়ে গেছে। কেউ ভালো কথা বললেও সে খিটখিট করে। হুটহাট মেজাজ গরম হয়ে থাকে। এই তো সকালটা ফুরফুরে কাটলেও হুট করে কি হলো অফিস যাওয়ার সময় লোকটার উপর অহেতুক মেজাজ দেখালো। কি কি বলেছিল তা পাতার মাথায় নেই। তবে ভালো কিছুও বলে নি সে নিশ্চিত। লোকটা মুখ কালো করে কিছু না বলেই চলে যায়। ভাবতেই খারাপ লাগা কাজ করছে তার।
এখানেই শেষ নয়। মেয়েটা স্কুল যাওয়ার আগে কিছু বলার জন্য এসেছিল। পাতা বিরক্ত হয়ে বলেছিল তাঁর শরীর ভালো নেই পরে শুনবে। মেয়েটাও মুখ কালো করে বাড়ি ছাড়ে। ছোটজন তো ভয়ে কাছেই ভিড়ে না তেমন। পাতা নিজ পেটে হাত রাখে। বিড়বিড় করে বলে,
“বুঝতে পারছি তো সব। বাকি তিনটের থেকে বেশি বদের হাড্ডি হবি তুই। মাকে জ্বালিয়ে মারবি।”
অবাক করা বিষয় সাথে সাথেই পেটে লাথি অনুভব করে পাতা। কিঞ্চিত ব্যথা পায়। তবে পাতা হাসে। পেটে হাত রেখে বলে,
“তবে রে দুষ্টু! তর সইছে না? এখনি বেরিয়ে আসবি?”
আবারও বাচ্চা মুভ করে। পাতার চোখে পানি এসে যায়। কি সুন্দর অনুভূতি! পেটের ভেতরে থেকেও মাকে অনুভব করতে পারছে। মায়ের কথায় সাঁড়া দিচ্ছে। এমন যন্ত্রণাময় সুখানুভূতি শুধু গর্ভবতী মায়েরাই অনুভব করতে পারে। দুটো প্রাণ একসাথে জুড়ে থাকে কি-না। পাতা স্বীয় পেটে হাত বুলিয়ে বলে,
“জাদুসোনা, এই শেষ মুহূর্তে এসে মাকে যা লজ্জা দিলি! আসবি যখন, জলদি জলদি চলে আসতি। এই বুড়ো বয়সে মা তোর খেয়াল রাখবে কি করে? কতদিনই বা খেয়াল রাখবে। কখন ফিরে যাবার ডাক চলে আসে! তখন কে আদর সোহাগ দিয়ে বড় করবে শুনি?”
“আম্মুউউ, কার সাথে কথা বলছো?”
দোতলা থেকে বড়ছেলের ডাক শোনা গেলো। পাতা সোফায় বসে বললো, “দুষ্টুর সাথে।”
“ইজ দ্য বেবি মুভিং?”
পাতা লাজুক হাসলো। অরুণাভকে আর পায় কে। সে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে আসে। মায়ের সামনে বসে বাচ্চাদের মতো আবদার করে, “ক্যান আই টাচ হার…ওর হিম?”
পাতার গাল ভারী হয়। অস্বস্তি বোধ হয়। অরুণাভ কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে অনুনয় করে, “প্লিজ আম্মু?”
অস্বস্তিতে ঘাট হলেও ছেলের আবদার ফেলতে পারে না পাতা। ছেলের একহাত বাড়ন্ত পেটে রেখে মাথা নেড়ে বলে, “কথা বলো ওঁর সাথে। দেখবে রেসপন্স করছে!”
অরুণাভ পেটের কাছে কান ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে ডাকে, “হেয় লিটল বাডি! হোয়াটস আপ? ইজ দ্যাট এভরিথিং ওকে হেয়ার?”
পাতা চোখ পিটপিট করলো। বাচ্চা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে না। অরুণাভ আবারও ডাকে কিন্তু তাঁর অনাগত ভাই বা বোন সাঁড়া দিলো না। সে দুঃখী দুঃখী মুখ বানিয়ে মায়ের দিকে তাকায়। এবার পাতা ডাকলো,
“এই দুষ্টু, ভাইয়ের সাথে কথা বলবি না?”
আশ্চর্য একটু আগেই সাঁড়া দিচ্ছিলো। এখন দিচ্ছে না। পাতাও দুঃখী মুখ বানালো। অরুণাভ হেসে বলল, “মায় ব্যাড! কোনো ব্যাপার না। যখন আসবে ভাইকে ছাড়া কিছুই বুঝবে না।”
পাতা হাসলো। অরুণাভ উঠে দাঁড়ালো। অধিকারবোধের সাথে বলল,
“মনে রেখো আম্মু? ভাবনা, ওলাফের মতো এই বেবিও সবার আগে তাঁর বড় ভাইয়ের কোলে আসবে। নাহলে আমি কষ্ট পাবো।”
“আচ্ছা বাবা ঠিক আছে। কিন্তু এখন কোথায় বেরুচ্ছো? খবরদার! আমাকে একা বাড়িতে রেখে যাওয়ার প্ল্যান করলে কিন্তু ভালো হবে না।”
অরুণাভ অপ্রস্তুত হেসে বলল, “আসলে জরুরি কাজ আছে। যাবো আর আসবো।”
“নাহ্”
“আম্মু প্লিজ? ইটস্ ইমার্জেন্সি।”
“না বলেছি। আর কিসের ইমার্জেন্সি? ম্যাচ তো নেই আজ। তবে?”
অরুণাভ ঘার ডলে। কিছু বলতে নিবে এরইমধ্যে কলিং বেল বেজে উঠলো। পাতা ইশারা করে বলে, “যাও দরজা খোলো।”
অরুণাভ মূল ফটকের দিকে যেতে যেতে বলল, “একটু পরেই ভাবুক চড়ুই, ওলাফ চলে আসবে। আমি একটু টুটুলদের বাড়িতে যাবো। বেশিক্ষণ থাকবো না।”
“টুটুলকেই ফোন করে আসতে বলো।”
“ওঁর ঠ্যাং ভাঙা। আসতে পারবে না। আমাকেই যেতে হবে।”
অরুণাভ ক্ষণিকের মধ্যে বন্ধুর ঠ্যাংটাও ভেঙে দিলো। গলা খাঁকারি দিয়ে দরজা খুলে দেয়। দরজায় দন্ডায়মান মানবীকে দেখে মুখের আদল পরিবর্তন হয়।
“তুই এখানে?”
আনিকা ছোট ছোট চোখে চায়। বেইজ জিন্স, অক্সফোর্ড শার্ট। আধ ভেজা চুল থেকে ম্যান শ্যাম্পুর স্মেল আসছে। গম্ভীর গম্ভীর ভাবটা স্যুট করে বান্দার সাথে। আনিকা মুগ্ধ হলেও তা প্রকাশ করলো না। অরুণাভকে ধাক্কা দিয়ে বলল, “সর, তোকে পরে দেখে নিবো। আগে চাচিমণিকে বলি তার গুনধর ছেলের কীর্তন। কোথায় চাচিমনি?”
অরুণাভ দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। ছোট্ট করে বলে, “ড্রয়িংরুম।”
আনিকা তাঁর দিকে কড়ছা দৃষ্টি ফেলে ভেতরে চলে যায়। পাতা আনিকাকে দেখে ঝলমলে হাসি উপহার দিয়ে বলল, “আনিবুড়ি যে! কেমন আছো?”
বলেই উঠতে নেয় পাতা। আনিকা ছুটে এসে বাঁধা দেয়। নিজেও চাচির পাশে বসে বলে, “আমার কথা পরে বলি। আগে বলো তুমি কেমন আছো? ওলাফ, অরু আর বেবি কেমন আছে? এ বাড়িতে এসে আমাদের ভুলেই গেছো। একটা ফোনও করো না।”
পাতা ভাতিজি অভিমানে হাসে। আড়চোখে ছেলের দিকে তাকাতে ভুলে না। গম্ভীর মলিন মুখ খানা দেখলেই মায়া হয়। তাঁর হাসিখুশি চঞ্চল ছেলেটা এক রাতের ব্যবধানে কেমন বদলে গেছে। আগের মতো প্রাণ খুলে হাসে না, মজা করে না। তাঁর এই পরিবর্তনের পেছনে আনিকার হাত আছে সে জানে।
“ফোন করলে যদি বিরক্ত হও তাই করি না। তাছাড়াও রুবি আপু চাইছে না আমরা তোমার সাথে সেরকম যোগাযোগ রাখি।”
পাতা বলতে চায় নি। মুখ ফসকেই বেরিয়ে গেছে। সে আফসোস করলো। অরুণাভের মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে ওঠে। চাচিমণি আম্মুকে বলেছে এই কথা? হাউ ডেয়ার শি!
আনিকার চোখে মুখেও বিস্ময়। সে বিস্মিত সুরেই বললো, “আমি এটা বিশ্বাস করি না। আম্মু এটা কখনোই বলতে পারে না। আম্মু রোজ তোমাদের কথা বলে…”
অরুণাভ নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারলো না। তাজা ফুলে শোভা ছড়ানো ফুলদানি মেঝেতে আঁছড়ে ফেলে আনিকার উপর চেঁচিয়ে ওঠে, “তাহলে কি আম্মু মিথ্যে বলছে? আনিকা আমার মাথা খারাপ হওয়ার আগেই কেটে পর এখান থেকে। উনি নিজেকে ভাবেন কি হ্যাঁ? কিছু বলি না বলে মাথায় উঠে নাচবে? জনে জনে অপমান করে…”
“ভোর?”
মায়ের ডাকে কথা থামালেও মুহুর্তেই সেই ধারা ফিরিয়ে এনে বলে, “আম্মু প্লিজ। ওই মহিলার সাহস কি করে হয় তোমাকে অপমান করার? ওনার মেয়ের সাথে যোগাযোগ করার জন্য কে মরে যাচ্ছে শুনি? দুনিয়ায় মেয়ের অভাব পড়েছে নাকি? যে আনিকা সরকার না হলে দেবদাস হয়ে ঘুরে বেড়াবো।”
আনিকার মেঘ জমা চোখ দুটো টলমল করছে। বারিধারা ভুপতিত হতেই তা মুছে নেয় আনিকা। অপমানে থমথমে গলায় বলে, “আমার মা কিংবা আমি বলি নি আমার জন্য দেবদাস হয়ে ঘুরে বেড়াও। দুনিয়ায় আরও সুন্দর সুন্দর মেয়ে আছে। আর তুমি তাদের কোলে নিয়ে ঘুরেও বেড়াচ্ছো আজকাল। আর আমি বোকা অনুশোচনায় ছাই হচ্ছিলাম। যে আমি ফিরিয়ে দেওয়ায় ছেলেটা কষ্ট পেয়েছে, আমার উপর অভিমান করে দূরে দূরে থাকছে। অবশ্য আমি ফিরিয়ে দিই নি। যাস্ট সময় চেয়েছিলাম কিছুদিন। ভাগ্যিস চেয়েছিলাম। নইলে কি করে দেখতাম, মানুষ এতো দ্রুত রং বদলায়। কারো আবেগে গা ভাসাই নি, নাহলে নিজেই ভেসে যেতাম।”
অরুণাভ বিরক্ত মুখে বলে, “তুই না নিজের নাটক ওফ কর এখন…”
“ভোর একদম চুপ। কোথায় যাছিলে যেন? যাও?”
পাতা ভোরকে সরানোর চেষ্টা করে। অরুণাভ বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে রইলো। বলল, “আমি আছি, তুমি এটাকে বের করো।”
“থাকতে আসি নি এখানে। চলেই যাবো। তার আগে আমার চাচিমণির সাথে কথা আছে। চাচিমণি তোমার ছেলেকে সরাও এখান থেকে।”
আনিকা নাক টেনে টেনে দৃঢ়তার সাথে বলে উঠলো। ভোর তাঁর সাথে এরকম দুর্ব্যবহার করতে পারলো? সে ভোরের জন্য আব্বু আম্মু, নানু সবার সাথে তর্কবিতর্ক করেছে, স্টিল করে যাচ্ছে। বন্ধু বান্ধবদের কথায় কান দেয় নি। সবসময়ই চেয়েছে সে তাঁর পঁচা ভোরের লাল টুকটুকে বউ হবে। কিন্তু ভোর!
পাতা উঠে এসে ছেলেকে ঠেলে সরাতে চায়। অরুণাভ এক চুল পরিমানও সরলো না। থমথমে মুখে বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে রইলো। বিরক্ত পাতা বাহুতে ঘুষি মেরে বলে, “তোমাকে পরে দেখে নিচ্ছি। আর আনিবুড়ি কি বলবে? পার্সোনাল কিছু? তাহলে চলো ঘরে যাই।”
আনিকা উঠে দাঁড়ালো। অরুণাভের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বললো, “এখানে বললেও সমস্যা নেই। তোমার আদরের ছেলের ব্যাপারেই কিছু বলতে চাইছি। তুমি কি শুনবে?”
পাতা চিন্তিত হয়। কি বলবে আনিকা? আনিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভোরের সাথে আমার টম-জেরীর সম্পর্ক তা তো জানোই। তবুও কেন যেন আমার মনে অদ্ভুত ইচ্ছে জাগে। চাচ্চু সবসময় বলতো ভোরের জন্য লাল টুকটুকে বউ আনবে। আমি ভাবতাম লাল টুকটুকে বউ এলে তো ভোর আর আনির সাথে খেলবে না, ঝগরা করবে না, মারামারি করবে না। সারাক্ষণ বউয়ের সাথে থাকবে। তাই আমি বুদ্ধি খাটিয়ে চাচ্চুর কাছে বলি আমাকে ভোরের লাল টুকটুকে বউ বানিয়ে নাও। চাচ্চু শুধু হাসতো। বড় হওয়ার পরেও আমার এই ইচ্ছেটা রয়ে যায়। আম্মু ভোরকে তেমন একটা পছন্দ করে না। পছন্দ না করার একশ একটা কারণ আছে। কারণ গুলো কিন্তু ফেলে দেওয়ার মতো না। তবুও আমি ভোরের বউ হবার স্বপ্ন দেখে এসেছি। টুটুলের মাধ্যমে আমি জানতে পারি ভোর আমাকে ভালোবাসে। আমার তো খুশির অন্ত রইলো না। মেঘ না চাইতেই জল টাইপ কিছু। আমি চাইতাম ভোর আমাকে প্রপোজ করুক। কিন্তু ও এতো ভীতু, জানা ছিলো না। আমিই প্রেসার দিয়ে পেটের খবর বের করেছি। এরপর কি হয়েছে তোমরা তো জানাই। যা জানো না, তা হলো তোমার ছেলে গোপনে কোর্ট ম্যারেজ করতে চেয়েছিল। আমি শুরুতেই বিরোধীতা করেছিলাম। কিন্তু ওর আবেগভরা কথায় একসময় গলে যাই।”
পাতা অবাক দৃষ্টিতে তাকায় ছেলের দিকে, “কোর্ট…ম্যারেজ তোমার বাবা জানে?”
“না” অরুণাভের স্পষ্ট গলা। পাতা অশান্ত হয়ে বলল, “পরিবারকে না জানিয়ে তোমরা এটা কি করে করতে পারো? আই কান্ট বিলিভ! আমি নিজেই তো মানতে পারছি না। লোকটা জানলে…”
পাতা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। অরুণাভ মাকে বসিয়ে দেয়। ছুটে গিয়ে পানি আনে। আনিকা ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল, “চিন্তার কিছুই নেই চাচিমণি। আমরা সেরকম কিছুই করি নি। অবশ্য তোমার ছেলে জেঁকে ধরেছিল। কিন্তু আমি মনে শান্তি পাচ্ছিলাম না। বয়সই কত আমাদের? এই বয়সে বিয়ে! তাও পরিবারকে না জানিয়ে! আমি আগের দিন রাতে ওকে ডেকে বোঝাই। সময় চাই। তোমার ছেলে বলেছিল যত সময় লাগে নে। ও অপেক্ষায় থাকবে। কিন্তু তোমার ছেলে চারমাস না যেতেই অন্য জায়গায় পিছলে পড়েছে।”
“একদম ফালতু কথা বলবি না? এখানেই পুঁতে ফেলবো। নিজের মতো ভাবিস নাকি? আমার ভালোবাসায় কোনো খাদ নেই। খাদ একটাই ভুল মানুষকে ভালোবেসেছি। ছলনা তুই করেছিস। কি ভেবেছিস টাকি তুই? আমি জানতে পারবো না? তৈমুর নেওয়াজের সাথে তোর ভেঙে যাওয়া বিয়ে আবারও জোড়া লাগানো হচ্ছে, খুব শিঘ্রই জুড়েও যাবে। এখন এখানে এসেছিস নাটক করতে।”
অরুণাভ এক চুল ছাড় দিলো না বলতে। আনিকা একদৃষ্টে পাতার দিকে তাকিয়ে। পাতা কি বলবে ভেবে পেলো না। তাঁর শরীর খারাপ লাগছে। প্রেসার বাড়ছে বোধহয়!
“চাচিমণি তোমার ছেলেকে চুপ করতে বলো। আমি কিছু বলছি না কি?”
পাতা ভোরকে থামিয়ে বলল, “আনিকাকে বলতে দাও। আনি তুমি বলো?”
আনিকা বরফ শীতল গলায় বলল, “আমি নিজ চোখে দেখেছি। এখন বলো, পত্রলেখার সাথে তোমার ছেলের কিসের সম্পর্ক? কেন সে আমাকে মিথ্যে বললো, মেয়েটা টুটুলের গার্লফ্রেন্ড। ওঁর কিছুই না। চেনেও না।”
পাতা মনে করার চেষ্টা করে। পত্রলেখা নামটা সে অনেকবার শুনেছে। কিন্তু কোথায় শুনেছে মনে করতে পারে না। তাঁর মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। সে ছেলের দিকে তাকায়। অরুণাভ আনিকার দিকে তাকিয়ে। চোখে মুখে অবাকতার রেশ। আনিকা কাঁদছে। ভোরের দিকে আঙুল তুলে কান্না বিজরিত সুরেই বলল, “তুমি ওকে জিজ্ঞেস করো পত্রলেখার সাথে ওঁর কিসের সম্পর্ক। কেন ওকে বুকে আগলে রাখবে? কেন মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস দেবে। আবার কোলেও নিয়েছিল।”
“আম্মু, মেয়েটা অসুস্থ হয়ে রাস্তায় পড়েছিল। আমি যাস্ট মানবতার খাতিরে হেল্প করতে এগিয়ে গিয়েছিলাম। তুমি প্লিজ ওর উল্টাপাল্টা কথায় কান দিও না। আর তোকে এসব কে বলেছে?”
অরুণাভ আনিকার উপর তেতে উঠলো। আনিকা তাঁকে অগ্রাহ্য করে পাতার উদ্দেশ্যে বলল, “চাচিমণি তুমি কি পত্রলেখার পরিচয় জানো?”
অরুণাভ হঠাৎ স্তম্ভিত হয়। অনুভূতিহীন চোখে আনিকার পানে তাকিয়ে। এই মেয়েটা এমন কেন? কি চাইছে ও? পাতা বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কে সে?”
“চাচ্চুর এক্স ওয়াইফ বর্ষা চৌধুরীর বোনের মেয়ে। আর সেই মেয়ের সাথে তোমার ছেলের ওঠাবসা। অথচ কি ফন্দিই না এঁটে বলেছিল টুটুলের গার্লফ্রেন্ড হয়।”
পাতা ছেলের দিকে তাকায়। অরুণাভের মস্তক নত হয়ে আসে। সে আনিকার আচরণে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে। মেয়েটা চাইছে কি? মেয়েটা কি তাঁর সাথে চিঠিপত্রকে দেখে হিংসায় জ্বলছে? কেন জ্বলবে? তাঁর বুক ভরা ভালোবাসাকে নিয়ে এক্কাদোক্কা খেলে শেষ মুহূর্তে এসে বস্তা পঁচা আবেগ বলে ফিরিয়ে দিয়েছিল।
পাতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনিকাকে বলল, “আমি জানি পত্রলেখার বিষয়টা। ভোর অনেক আগেই বলেছে আমাকে। মেয়েটা অসুস্থ ছিল, সেন্সলেস হয়ে পড়েছিল রাস্তায়। তাই হেল্প করেছে। ওর জায়গায় অন্যকেউ হলেও হেল্প করতো। তুমি বিষয়টা নিয়ে বেশি ভাবছো তাই তোমার কাছে দৃষ্টি কটু লাগছে। তাছাড়াও বর্ষা চৌধুরী যেমনই হোক, ভোরের জন্মদাত্রী সে। যতই আবেগ বিবেকের কথা বলা হোক নারি কাটা সম্পর্কটাকে ভুলে যাওয়া কষ্টকর। আর পত্রলেখাকে নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।”
আনিকা অবাক চোখে চাচির দিকে তাকিয়ে, “তুমি কিছু বলবে না?”
পাতা বিভ্রান্ত হয়ে বলল, “কি বলবো?”
“কি বলবে মানে? ও ওই মেয়ের সাথে কেন সম্পর্ক রাখবে হ্যাঁ? আমার সাথে রিলেশনে আছে ভুলে গেছে ও? আমি কিন্তু এসব সহ্য করবো না। তোমার ছেলেকে খুন করে ফেলবো।”
পাতা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাখলো। আনিকা রেগে ঘেমে অস্থির। ভোরের সাথে অন্য একটা মেয়েকে দেখে তাঁর কলিজা এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে যাবার উপক্রম। সে অনুভব করেছে ওই বদরাগী ছেলেটার প্রতি তাঁর ভালোলাগা ছাপিয়ে ভালোবাসাও আছে। ওকে ছাড়া তাঁর চলবে না। সে পুর্বের মতো তেজস্বী স্বরেই বলল,
“ওই মেয়ের আশেপাশে দেখলে ওঁর খবর আছে। আমি ফোন করে দেখা করতে বললে লুকোচুরি খেলবে আর অন্য মেয়েদের কোলে নিয়ে ঘুরবে? ওকে তো আমি…!”
আনিকা তেড়েফুঁড়ে যায় অরুণাভের দিকে। চুলের মুঠি ধরতেই নিবে অরুণাভ হাতের কব্জি চেপে ধরে মুচড়ে দেয়। আগুনঝরা দৃষ্টি ক্ষেপন করে বলে, “নিজের গন্ডিতে থাক আনি।”
“আমি নিজের গন্ডিতেই আছি। তুই পথ ভুলে অন্যদিকে ভিড়ছিস। আমার সাথে এমনটা করতে পারিস না তুই। আমাকে ধোঁকা দিতে পারিস না।”
আনিকা ধরা গলায় প্রত্যুত্তর করে। অরুণাভ আনিকার হাত ঝটকা মেরে ছেঁড়ে দিলো। গম্ভীর মুখে বলল, “আমি ধোঁকা দিচ্ছি? এখনি বিয়ে শাদিতে জড়াবি না। ক্যারিয়ার হ্যান ত্যান কত বুঝ! সময় নিলি। তারপর কি হলো? সেই বিয়ের পিঁড়িতেই বসছিস।”
কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলছে না। পাতা দুজনকে থামানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে দু'জনকে। দুটোই আগুনের গোলা! এদের ভাব অসম্ভব! এঁরা কেউ কাউকে বোঝার চেষ্টাই করে না।
—————
ইদানিং অফিসে ব্যস্ততা বেড়েছে। অরুণ সরকার হাঁফ ছাড়ার ফুরসত পায় না। মধ্যাহ্ন গড়িয়ে অপরাহ্ন উঁকি দেয় অথচ কাজের চাপে মধ্যাহ্ন ভোজ গ্রহণ করা হয় নি। অন্ততপক্ষে ওষুধ গুলো খাওয়া উচিত ছিলো। সকাল ও রাতের ওষুধ পেটে গেলেও দুপুর বেলার ওষুধ অরুণ সরকারের ঘরের বিনে জমায়েত হয়। কবে যে পাতাবাহারের কাছে হাতেনাতে ধরা খায় কে জানে! এমনিতেই দিন দিন শরীরে নানান অসুখ বসতি গড়তে মরিয়া। নাহ্ শরীর চলছে না। পেটকে শান্ত করতে হবে। সুজনকে কল লাগানোর জন্য ফোন হাতে নেয়। তবে ফোন করার প্রয়োজন পড়ে না। সে হাজির। অরুণ ল্যাপটপের সাটার বন্ধ করে সুজনকে বলে,
“আসো, তোমাকেই কল করতে যাচ্ছিলাম।”
“আপনি কল করার আগেই আমি হাজির বস। কিছু বলতেন বস?”
“হুম হু!”
“সে না হয় বললেন, তাঁর আগে এই খামটা দেখুন তো। রানার দিয়ে গেলো! ই-মেইলের যুগেও রানার! আমি তো অবাক হয়েছি।”
অরুণ সরকারের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে, “কিসের খাম? কি আছে ওতে?”
“আপনিই খুলুন বস। হয়তো কোনোকিছুর রিপোর্ট।”
অরুণ হাতে নেয় খামটা। প্রেরকের নাম দেখে খামটা ড্রয়ারে রেখে দিলো, “পরে দেখবো। আগে খাওয়ার মতো কিছু আনো তো! আ’ম হাঙরি!”
“জি বস! কি খাবেন?”
“যা কিছু, সাথে কড়া লিকারের চা।”
সুজন মাথা নেড়ে চলে যায়। অরুণ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। ড্রয়ার টেনে খুলে খামটা দেখে। বের করার সাহস হয় না। আবারও বন্ধ করে রেখে দেয়! কি আছে ওই খামে?
ছুটির ঘণ্টা বেজে গেছে। বাচ্চারা শোরগোল করে দলবেঁধে বেরিয়ে যাচ্ছে স্কুল থেকে। অরুণিতা গেইট ম্যানকে বলে ভেতরে চলে আসে। গম্ভীর মুখে আশেপাশে তাকায়। কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তির দেখা নেই। অনেকক্ষণ অপেক্ষায় থাকলো, তবুও তাঁর আসার নাম গন্ধ নেই। অপেক্ষা জিনিসটা বড্ডো অপছন্দ অরুণিতার। সে ধৈর্য হারিয়ে নিজেই এগিয়ে যায়। দেখতে পায় তাঁর পাঁচ বছরের ভাইটি দুই হাতে চোখ ডলে কাঁদতে কাঁদতে এদিকেই আসছে। অরুণিতার কপালে ভাঁজ পড়ে।
“কাঁদছিস কেন?”
প্রহর মাথা তুলে চায়। বোনকে দেখে দৌড়ে এসে কোমড় জড়িয়ে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দেয়। অরুণিতা অবাক হয় বৈ কি। হাতটা ধরতেই প্রহর ‘উহ্ হুঁ’ সুরে কঁকিয়ে উঠলো। অরুণিতা হাতের দিকে তাকায়। কনুই বাজেভাবে ছিলে গেছে, রক্ত আসছে। সে হাত ধরে উল্টেপাল্টে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
“কিভাবে ব্যথা পেলি?”
“জীবন আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। গালে জোরে থাপ্পড়ও মেরেছে। মুসা আমার চুল ধরে টেনেছে।”
অরুণিতা মুখের দিকে তাকায়। ফর্সা গালে তিন আঙুলের দাগ চেয়ে আছে। তাঁর চোয়াল শক্ত হলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুই কি করছিলি?”
“আমি কিছুই করি নি। ওঁরা পিঙ্কির চুলে বাবলগাম লাগিয়ে দিয়েছিল। পিঙ্কি খুব কাঁদছিল জানো? তাই আমি ম্যামকে বলে দিয়েছি। ম্যাম ওদের পানিশমেন্ট দিয়েছে। তাই ওঁরা আমাকে পানিশমেন্ট দিয়ে শোধবোধ করে নিলো।”
প্রহর কাঁদতে কাঁদতেও সব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলো। অরুণিতা নাকের পাটা ফুলিয়ে বলে, “এই পিঙ্কি কে? ওঁর জন্য কিসের এতো দরদ? ওঁর মুখ নেই? ও নালিশ করতে পারে নি টিচারের কাছে?”
“পিঙ্কি আমার গার্লফ্রেন্ড হয়। ও খুব ভালো মেয়ে।” প্রহর কান্নার মাঝেও পিঙ্কির প্রশংসা করলো।
অরুণিতার চোখ কপালে। কি বলছে এই ছেলে? সে ভাইয়ের আপাদমস্তকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, “গার্লফ্রেন্ড হুঁ? রাতে বিছানা ভাসিয়ে দেয় আর উনি এখনি গার্লফ্রেন্ড পটিয়ে রেখেছে! মাম্মামকে বলে চারহাত এক করার ব্যবস্থা করছি, কি বলিস?”
প্রহর চোখ পিটপিট করে বলল, “আমার তো দুটোই হাত।”
“আর দুটো তোর পিঙ্কির!”
“এক করে কি হবে?”
“তোর মাথা হবে।”
“মাম্মামের মতো বকছো কেন তুমি?”
বলতে বলতে ঝরঝরিয়ে কেঁদে ওঠে বাচ্চাটা। অরুণিতা ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে ভাইয়ের হাতে ঢেলে দেয়। খানিকটা কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করে, “ওরা মারছিলো আর তুই কি করছিলি?”
প্রহর জলভরা চোখে চায় বোনের দিকে। ফুঁপিয়ে বলে, “আমি কিছু করি নি।”
“কেন? তোর হাত পা ছিলো না?”
প্রহর কান্নার মাঝেই ফ্যালফ্যাল চোখে চায়। নিজ হাত পা দেখিয়ে বলে, “আছেই তো!”
অরুণিতা আবার বলে, “তোকে ভাত মাছ খাওয়ায় না তোর মা? গায়ে বল নেই?”
“আছে তো, আমার অনেক বল।”
“তো চুপচাপ মার খাচ্ছিলি কেন? ওদের মারতে পারিস নি?” অরুণিতা আকস্মিক চোখ রাঙিয়ে ধমকে ওঠে।
প্রহর ঠোঁট উল্টিয়ে বলল, “ওঁরা তো আমার বন্ধু। বন্ধুকে কেউ মারে?”
“ওঁরা কি তোকে আদর করেছে?”
“নাহ্ মেরেছে!”
“তো তুই কেন দরদ দেখাচ্ছিস?”
“মারলে ওঁরা তো ব্যথা পাবে। তখন তো আমারই খারাপ লাগবে।”
অরুণিতা ফোঁস করে শ্বাস ফেলে ভাইয়ের দিকে হতাশ বদনে তাকায়। এই ছেলেকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। অরুণিতার রাগও লাগে, আবার কষ্টও হয়। মাথায় টোকা মেরে বলে, “তুই ব্যথা পেয়েছিস ওদের খারাপ লাগে নি?”
“নাহ্ ওঁরা হাসছিল।”
অরুণিতার ইচ্ছে করে নিজ ভাইয়ের গালেই দুটো লাগিয়ে দিতে। এতো ভালো কেন হতে হবে? অসহ্য। অতিরিক্ত ভালোমানুষে এলার্জি আছে তাঁর। সে ভাইয়ের বাহু ধরে টেনে নিয়ে যায়। রাগী গলায় বলে,
“আমি দাঁড়িয়ে থাকবো তুই ওদের থাপড়াবি।”
প্রহর আবারও ঠোঁট উল্টিয়ে বলে, “কিন্তু ওঁরা তো আমার বন্ধু!”
অরুণিতা চোখ পাকায়, “বেশি কথা বলবি তো তোকেই মারবো। কোথায় ওঁরা?”
প্রহর বলে না। তবে তীক্ষ্ম বুদ্ধিসম্পন্ন অরুণিতার মুজলিমদের খুঁজে পেতে খুব বেশি কসরত করতে হলো না। প্রহরের সাথে তাঁকে দেখেই বাচ্চাদুটো নিজেদের মধ্যে গুসুর সুফুর করছিলো। অরুণিতা ভাইয়ের হাত ধরে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বাচ্চা ছেলে দুটোর মুখের রং উড়ে গেল। প্রহর বোনের হাত ধরে ভীতু চিত্তে তাকিয়ে আছে। অরুণিতা থমথমে মুখে প্রশ্ন করে,
“এরাই?”
প্রহর ছোট্ট করে সম্মতি জ্ঞাপন দিতেই ছেলে দুটো
একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তারা ভাবতেও পারে নি প্রহর তাদের নামে নালিশ করবে। অরুণিতা নিশ্চিত হলো। প্রথমে শান্ত স্বরেই শুধালো,
“মেরেছিস কেন ওকে?”
জীবন নামক বাচ্চা ছেলেটা কাঁচুমাচু মুখে বলল, “মারিনি, ওই খেলার সময় ভুলবশত লেগে গেছে। কি রে প্রহর বল?”
প্রহর উপরনিচ মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। অরুণিতা ভাইকে চোখ রাঙায়। প্রহর পরক্ষণেই ভোল পাল্টে না বোধক মাথা নেড়ে বলল, “তোমার মাম্মাম শেখায় নি—মিথ্যে বলা পাপ? তুমি আমাকে থাপ্পড় মেরেছো, ধাক্কা দিয়ে ফেলেও দিয়েছো। দেখো আমার হাত থেকে কত রক্ত বের হচ্ছে? আর মুসা আমার চুল ধরে টেনেছে। আমি অনেক ব্যথা পেয়েছি।”
ছেলে দুটো ভাবেও নি প্রহর তাদের ফাঁসিয়ে দিবে। তাঁরা ভয়ে জড়সড় হয়ে থাকে। অরুণিতা হুট করে জীবন নামক বাচ্চার হাত মুচড়ে ধরে। জীবন কেঁদে উঠলো ব্যথায়। মুসা পালিয়ে যাবার ফন্দি আঁটতেই অরুণিতা অপর হাতে মুসার চুলের মুঠি টেনে ধরে। প্রহরকে দেখিয়ে বলল,
“দেখেছিস ওকে? ভাই হয় আমার। আরেকবার ওর পিছু লাগলে মেরে বালি চাঁপা দিয়ে দিবো।”
ধমকে একজন তো প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলেছে। মেয়ে মানুষের গলায় এতো গাম্ভীর্যতা? প্রহর বোনের স্কুল ব্যাগ টেনে ধরে মিনমিনে গলায় বলে, “আপুনি ছাড়ো। ওঁরা আমার বন্ধু হয়।”
অরুণিতা দাঁত কটমট করে বলে, “তোর বন্ধু, আমার তো আর না।”
ঝাড়িতে প্রহরের মুখটা চুপসে যায়। অরুণিতা গুনে গুনে বিশবার ছেলে দুটোকে কান ধরে উঠবস করায়। প্রতিবার উঠবসে প্রহরকে ‘স্যরি’ বলা আবশ্যক ছিলো। উঠবস শেষ হতেই অরুণিতা রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে, “যা ভাগ?”
ছেলে দুটো দৌড়ে পালায়। প্রহর বোনের দিকে তাকিয়ে আছে। অরুণিতা তার দিকে ফিরে বলল, “কাল যদি কিছু বলতে আসে আমাকে জানাবি।”
প্রহর মুখ কালো করে সম্মতি দিলো। অরুণিতা তাঁর বাহু ধরে টেনে নিয়ে যায়। গেইট পেরিয়ে পার্কিং জোনে উপস্থিত হয় দুই ভাইবোন। প্রহর অবাক হয়ে বলে, “মাম্মামের স্কুটি এখানে কি করছে? মাম্মাম এসেছে আমাদের নিতে?”
অরুণিতা তাঁর প্রশ্নের জবাব দিলো না। স্কুটি পাহাড়া দেওয়া বান্ধবীকে বিদায় দিলো। প্রহরকে বসতে ইশারা করে। প্রহর ব্যাপারখানা বুঝতে পেরে চোখ দুটো রসগোল্লার মতো বানিয়ে বলল, “তুমি আবারও মাম্মামের স্কুটি নিয়ে স্কুলে গিয়েছিলে? মাম্মাম তোমাকে খুব বকবে, দেখো।”
“আই ডোন্ট কেয়ার! উঠে বস জলদি?”
অরুণিতা ভাবলেশহীন গলায় বলল। প্রহর উঠে বসলে সাবধান করলো, “একদম তিড়িং বিড়িং করবি না। শক্ত করে ধরে বসবি।”
প্রহর প্রতিবারের ন্যায় দুই হাতে শক্ত করে বোনের কোমড় জড়িয়ে ধরে। বোনের পিঠে গাল ঠেকিয়ে বলে, “এভাবে ধরলে হবে না?”
অরুণিতা পিছু ঘুরে ভাইয়ের মাথায়ও হেলমেট বাঁধতে বাঁধতে বলল, “খুব হবে।”
“আপুনি আমার হাতে ব্যথা করছে।”
“আমি কি করতে পারি?”
“আদর করে আমার ব্যথা কমিয়ে দিতে পারো, তাই না?”
অরুণিতা আবারও প্রহরের দিকে ফেরে। প্রহর গাল বাড়িয়ে রেখেছে। অরুণিতা ঠোঁট বাঁকিয়ে ক্ষীণ হাসলো। গাল টিপে দিয়ে বলল, “আদর দিলে ব্যথা কমে না বোকা। ওটা পাপা এমনিই বলে। চল তোকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই।”
অরুণিতা স্কুটি স্টার্ট দেয়। প্রহর খালি বসে থাকার মতো ছেলে না। সে প্রথম প্রশ্ন ছুঁড়লো, “তুমি স্কুল ড্রেস কেন পরো নি? টিচার বকেছে নিশ্চয়ই!”
স্কুল ড্রেস পড়ে স্কুটি চালালে ট্রাফিক পুলিশ ধরে গার্ডিয়ান ডাকবে। তাই আউট ড্রেস পরে পুরোদস্তুর প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। সঙ্গে আছে মাম্মামের আইডি, ড্রাইভিং লাইসেন্স। সন্দেহের অবকাশ রাখে নি অরুণ সরকারের অতি ধুরন্ধর একমাত্র আদরের কন্যাটি। অরুণিতা ছোট ভাইয়ের প্রশ্নের জবাব দিলো না। জবাব দেওয়া মানে ওকে প্রশ্রয় দেওয়া। কান খেয়েই ফেলবে।
প্রহরের হাতের ক্ষত খুব গভীর না হলেও ফেলে দেওয়ার মতো না। ডাক্তার ড্রেসিং করিয়ে সফেদ ব্যান্ডেজে মুড়ে দিলো। প্রেসক্রিপশনে কিছু ওষুধ লিখে পঁচিশ শো টাকার বিল ধরিয়ে দেয়। অরুণিতা পার্স খুঁজে শ পাঁচেকও বের করতে পারলো না। আগে থাকতো, পাপার ওয়ালেট থেকে যত খুশি তত নিতো। পাপা কখনো বলে নি —এতো টাকা কেন নিচ্ছো! কোথায় খরচ করছো। তবে এখন বিষয়টা ভিন্ন। ভাইয়া সকালে টিউশনিতে ড্রপ করে দিয়ে শ’দুয়েক দেয়। তাতেই গরীবের তালিকায় নাম লেখানো অরুণিতার দিন চলে। স্কুলে বন্ধু বান্ধবদের উপর বে-হিসেবী খরচ করা অরুণিতা এখন পইপই হিসেব করে চলে।
“তোমাদের হয়ে গেছে, ফিস মিটিয়ে যেতে পারো।”
ডাক্তারের কথায় অরুণিতার টনক নড়লো। সামান্য একটা চোটে পঁচিশশো টাকা! এঁরা ডাক্তার নাকি ডাকাত! সে খানিকটা ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল, “ডক্টর, মে আই ইউজ ইয়্যুর ফোন? অ্যাকচুয়ালি, আই নিডেড টু কল মাই পাপা।”
ডাক্তার ফোনটা বের করে দিলো। অরুণিতা বাবার নাম্বার ডায়াল প্যাডে তুলে কতক্ষণ চেয়ে রইলো। তারপর কেটে মায়ের নাম্বারে কল লাগালো। রিং হলো, তবে রিসিভ হলো না। মাম্মাম অচেনা নাম্বার খুব কম রিসিভ করে। সে পরপর ভাইয়ের নাম্বারে কল লাগায়, রিসিভ হয়। অরুণিতা বলল,
“ভাইয়া, ইটস্ অরুণিতা। আই নীড ইয়্যুর হেল্প।”
অরুণাভ স্ক্রিণে অচেনা নাম্বারটা আবারও দেখে নেয়। বিস্মিত হয়ে বলে, “ভাবুক চড়ুই? এটা কার নাম্বার? কোথায় তুমি? স্কুল ছুটি হয়েছে না? ড্রাইভার আঙ্কেল আসে নি নাকি? এ্যাঁই ভাবনা কথা বলছো না কেন?”
“তুমি বলতে দিলে না বলবো? আ’ম গুড। ওলাফ স্কুলে পরে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে। হাতে লেগেছে একটুখানি। ডাক্তারের কাছে এনেছি। ব্যান্ডেজ করে পঁচিশশো টাকা বিল ধরিয়ে দিলো। আমার কাছে টাকা নেই। কি করবো এখন?”
“ডাক্তারের কাছে ফোন দাও! আমি কথা বলছি!”
অরুণিতা ডাক্তারের দিকে তাকালো। সৌজন্যবোধক হাসি দিয়ে ফোনটা বাড়িয়ে দেয়। ডাক্তারের সাথে কি কথা হলো কে জানে। ডাক্তার ফোন রেখে মুচকি হেসে অরুণিতাকে বলল, “অপেক্ষা করো, তোমার ভাইয়া আসছে বললো।”
অরুণিতা ডাক্তারের উদ্দেশ্যে নিরস হাসলো। প্রহরকে নিয়ে এক কোণে বসলো। প্রহর কিছুক্ষণ পর নিজ টুল ছেড়ে বোনের কোলে এসে বসলো। দেয়ালে টাঙানো কঙ্কালের ছবি দেখিয়ে বলে, “আপু দেখো ভূত?”
অরুণিতা ভাইয়ের ব্যান্ডেজ করা হাতটা বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “ওটা ভূত না, মানুষের কঙ্কাল। সবার দেহে মাংস বাদ দিলে এরকম কঙ্কাল থাকে। তোরও আছে।”
“তোমারও? মাম্মাম, পাপা, ভাইটুস, নতুন আপুনির?”
অরুণিতা কোনোমতে মাথা নাড়লো। প্রহর কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে থাকে কঙ্কালটার দিকে। প্রশ্ন করে, “আপুনি এটা কার কঙ্কাল?”
“জানি না।”
“ওটা ছেলেমানুষের কঙ্কাল, নাকি মেয়ে মানুষের?”
“জানি না!”
“ডাক্তার আঙ্কেল তুমি জানো?”
প্রহর পরের প্রশ্ন ডাক্তারের দিকে ছুঁড়লো! ডাক্তার হেসে চশমার ফাঁকে কঙ্কালটা দেখে নিয়ে ভাবুক স্বরে জবাব দিলো, “কোনো ছেলের হবে। কেন বলোতো?”
“কেন?” প্রহরের কণ্ঠে অদম্য কৌতূহল।
ডাক্তার প্রহরের দিকে তাকিয়ে বলল, “কঙ্কালটা মেকআপ করে নি। তাই ও ছেলে। মেয়ে হলে আটা ময়দা, লিপস্টিক ছাড়া ছবিই উঠতো না।”
প্রহর খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। হাসলো ডাক্তারও। তারপর আর কি? দুই বাঁচালে জমে ক্ষীর। প্রহর তো ডাক্তারের কোলে বসে স্টেথোস্কোপ কানে রেখে ডাক্তার বসেছে। নার্স রুগি সেজেছে। অরুণিতা হাতঘড়িতে সময় দেখে নেয়। আধাঘণ্টা হয়ে গেলো, ভাইয়া এখনো আসছে না কেন?
অরুণাভ আসে আরেকটু পর। প্রহর তাকে দেখেই সব ফেলে ‘ভাইটুস’ বলে ছুটে আসে। অরুণাভ ছোট ভাইকে কোলে তুলে নেয়। হাতের ব্যান্ডেজ দেখে চিন্তিত মুখে বলে, “কতটা লেগেছে আমার জানটুসের! কিভাবে পড়ে গিয়েছিল হুঁ?”
“পড়ে যায় নি, ওঁর বন্ধুরা মেরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে।” অরুণিতা এগিয়ে এসে জানালো।
প্রহর ভাইয়ের গলা জড়িয়ে মিষ্টি হেসে বলল, “আপুনি ওদের বকে দিয়েছে।”
“দুষ্টু ছেলেদের বন্ধু কেন বানিয়েছো তুমি? আমার জানটুসটাকে কতটা ব্যথা দিয়েছে! ব্যথা করছে না?”
প্রহর না বোঝায়। ডাক্তারকে দেখিয়ে বলে, “ডাক্তার আঙ্কেল ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছে।”
অরুণাভ ভাইয়ের গালে ঠোঁট চেপে ধরে। পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে দেয় অরুণিতাকে। অরুণিতা ডাক্তারের বিল পরিশোধ করে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বেরিয়ে আসে ক্লিনিক থেকে। অরুণাভ বোনকে বলে,
“ভাবনা, তুমি উইদাউট পারমিশন স্কুটি নিয়ে স্কুলে গিয়েছিলে! এ কেমন ছেলেমানুষী বলো? আল্লাহ না করুক যদি এদিক সেদিক হয়ে যায়!”
অরুণিতা দুই হাতে ভাইয়ের বাহু জড়িয়ে ধরে ভাবলেশহীন মুখে বলল, “আমি খুব ভালো ড্রাইভ করতে পারি। ডোন্ট নীড ট্যু ওয়ারি ব্রো!”
“বাড়ি চলো আম্মু তোমার পিঠে আজ লাঠি ভাঙবে। আর আমি কিছুই করতে পারবো না।”
অরুণিতা গায়ে মাখলো না। ভাই জানে, মানে মাম্মাম তাঁর নাগাল পাবে না। হ্যাঁ বকা শুনতে হবে এটা সুনিশ্চিত।
“বাঁচতে চাইলে চাবি দাও?”
“তুমি ওলাফকে নিয়ে গাড়িতে যাও, আমি স্কুটিতে আসছি।”
“আমি গাড়ি আনি নি। সিএনজি রিজার্ভ করে এসেছি। তুমি চাবি দাও আমার হাতে, নইলে ধরা পড়বে।”
অরুণাভ গমগমে সুরে আদেশ করে। অরুণিতা চোখ পিটপিট করে। ধরা পড়বে মানে? যাইহোক স্কুটি চালানোর নেশায় সে অনুনয় করে, “ব্রো প্লিজ? তুমি জানো আমি খুব ভালো ড্রাইভ করতে পারি। প্লিজ?”
“নো”
“ইয়েস!”
“নো।”
“ইয়েস!”
“ভাবনা?”
“মায় সুইট ভাইয়্যু?”
অরুণাভ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হার মেনে বলল, “তোমার কপালে দুঃখ আছে। পরে বলিও না সতর্ক করি নি।”
অরুণিতা কপালে পড়া ছোট ছোট চুলে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে ভাবের সাথে প্রত্যুত্তর করল, “ইফ ইউ ওয়ান্ট, আই ক্যান গিভ ইউ আ লিফট।”
ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে আসতেই অরুণিতা মুখটা কালো হয়ে আসে। পোষা বিড়াল ছানার মতো ভাইয়ের দিকে আরেকটু সেঁটে যায়। আসল কাহিনী তবে এটা। সে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে গাল ফুলায়। অরুণাভ ভ্রু নাচায়, যার অর্থ সে আগেই সাবধান করেছিল।
কালো মার্সিডিজে গা ঠেকিয়ে অরুণ সরকার। কালো ফর্মাল প্যান্ট আর কোটি, সাথে সাদা শার্ট। বুকে হাত ভাঁজ করে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে। ভোঁতা নাক বরাবরের মতোই সিঁকায়। কালো ফ্রেমের চশমা আঙুলের ডগায় ঠিক করে এগিয়ে আসে।
“ডাক্তার বললো সামান্য চোট, দুই তিনদিনের ভেতর ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তার কিছুই নেই আব্বু।”
অরুণাভ সরকার আগেই বাবাকে হালচাল জানিয়ে দেয়। অরুণ সরকার স্বস্তি পায় না। ছেলে মেয়ের নাক পিটপিট করলেও তার চিন্তায় ঘুম হারাম হয়। আর এতো! সে প্রহরকে কোলে নেয়। হাতের ব্যান্ডেজ দেখিয়ে বলল, “ব্যান্ডেজ করা, আর বলছো সামান্য চোট! বাচ্চামো ভেবে কখনো কিছু বলি নি। এতেই আশকারা পেয়ে যা খুশি করে বেড়ায়। প্রিন্সিপাল ফোন দিয়ে নালিশ করলো। কতটা অপমানিত হলাম আমি? ওঁর জানে ভয় না থাকুক আমাদের আছে নাকি? আমার ছেলেটার এর চেয়ে বড় ক্ষতি হতে পারতো! তুমি ওকে ওয়ার্ণ করে দিও। এই শেষবার।”
অরুণাভ প্রহেলিকা গুলো জোড়ার চেষ্টা করছিলো কিন্তু হাল মিলছিলো না। শেষ কথাগুলোর ছুতো ধরে বুঝতে পারে আব্বু কার কথা বলছে। কিন্তু কেন বলছে? সে কি ভাবছে প্রহরের চোটের কারণ ভাবনা। সে কিছু বলার জন্য মুখ খুলে। অরুণ সরকার তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলে, “নো এক্সকিউজেস! দ্রুত বাড়ি ফেরো।”
অরুণাভ শা শা গতিতে চলে যাওয়া গাড়িটির দিকে তাকিয়ে কপাল চাপড়ায়। ঘার ঘুরিয়ে বোনের দিকে তাকালো। অরুণিতা গম্ভীর তবে স্বাভাবিক। সে স্কুটির চাবি ভাইয়ের হাতে গুঁজে দিয়ে বলে, “আমি ডিরেক্টলি শুনেছি তোমাকে ইনডিরেক্টলি এক্সপ্লেইন করতে হবে না। লেটস গো হোম।”
—————
সায়াহ্নের ছোঁয়া লেগেছে প্রকৃতির গায়ে। পশ্চিমা আকাশে কেউ সিঁদুর ঢেলে দিয়েছে। তাঁর লালাভ ছোঁয়ায় ধরনী উত্তাল। ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে অরুণাভ সরকার। দুই আঙুলের ফাঁকে একটা পুরনো ফটো। ফটোতে চেনা পরিজন, আছে অচেনা মুখও।
কাবলি পড়া, চোখে সুরমা লাগানো লোকটা নিশ্চয়ই পত্রলেখার বাবা। চেহারা সুরত দেখেই আফগান আফগান অনুভূতি পাওয়া যায়। ভদ্রলোকের পাশেই দাঁড়িয়ে পাঁচ বছরের গোলগাল ছেলেটা সে নিজেই। তাঁর কোলে থাকা পুতুলের মতো সুন্দর মেয়েটা পত্রলেখা। যে কিনা ক্যামেরার দিকে না তাকিয়ে তাঁর মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।পাশে আরও দুই রমনী উপস্থিত। একজন তাঁর জন্মদাত্রী এক শিশুকে কোলে নিয়ে, অপরজন পত্রলেখার মা। ছবির উল্টো পিঠে স্মৃতি চারণের জন্য তারিখ আর সাক্ষর করে রাখা হয়েছে। হস্তলিপি পেঁচানো হলেও ‘মুবিন পাঠান’ নামটা পড়তে অসুবিধা হলো না অরুণাভের।
“কি রে গজনীর চাচাতো ভাই! কিছু মনে পড়লো?”
অরুণাভ ছবি থেকে দৃষ্টি তুলে বন্ধুর দিকে তাকালো। মনে পড়লো বলতে, সে চিনতে পেরেছে। তবে স্মৃতি গুলো অগোছালো। আর সে গোছাতেও চাইছে না। চুলোয় যাক পত্রলেখা, চুলোয় যাক তাঁর অনুভূতি! তাঁর কি! সে বিরক্ত মুখে বলল,
“মেয়েটাকে আলাভোলা ভেবেছিলাম। কিন্তু এ তো ধুরন্ধর! ডাঈনী ছাড়া আপদত আমার মাথায় কোনো উপমা আসছে না।”
টুটুল প্রতিবাদের সুরে বলল, “তুই অন্যের অনুভূতি নিয়ে এরকম কিভাবে বলতে পারিস অরু? এখন একজনের মনে তোর জন্য ফিলিং জাগতেই পারে, ভালো লাগতেই পারে। সে তোকে ভালোবাসতেই পারে। মনের উপর কারো জোর চলে না। ভালোবাসা ভালোলাগা এমন একটা একটা অনুভুতি, যা যখন তখন যে কাউকে দেখেই হতে পারে। তুই এভাবে তাঁর ফিলিংসকে অপমান করতে পারিস না! সে তো তোর কাছে এসে ভালোবাসার জন্য পায়ে পড়ছে না, আকুতি মিনতি করছে না। ভালো না বাসলি কিন্তু ইয়্যু সুড রেসপেক্ট হার ইমোশন ইয়ার।”
অরুণাভ বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি বুঝতে পারছি ও তোকে ব্যবহার করে আমি অবদি পৌঁছাতে চাইছে। আবে ইয়ার বোঝার চেষ্টা করছিস না কেন? ওঁর কিসের ঠ্যাকা ছিলো তোর সাথে বন্ধুত্ব করার? তোর সাথেই কেন? আমার বেস্ট ফ্রেন্ড বলে নয় কি? আচ্ছা সে কথা বাদ, তুই ভাব ও তোকে কিভাবে বলতে পারে ও আমাকে লাইক করে। সেখান ও জানে আই লাভ আনিকা। এই মেয়েটার মাঝে গন্ডগোল আছে ইয়ার। দেখেনিস ওঁর জন্য হয় তুই, না হয় আমি খুব বাজে ভাবে ফেঁসে যাবো।”
টুটুল রেলিংয়ে কপাল ঠুকে বলে, “বোঝা চেষ্টা কর ভাই। পত্র আমাকে কিছুই জানায় নি। আমিই ওঁর ঘরে একটা ফটো অ্যালবাম খুঁজে পেয়েছিলাম। এ যুগেও অ্যালবাম! কৌতুহল নিয়ে খুলে দেখি। পুরো অ্যালবাম জুড়ে শুধু তুই আর তুই। তোর ইনস্ট্রাতেও এতো ছবির কালেকশন নেই, যতটা পত্রর অ্যালবামে আছে। আর অ্যালবামের নাম ‘জানান’ । তুই জানিস ‘জানান’ শব্দের অর্থ?”
“নাহ্, আর জানার শখ নাই ইয়ার। তুই থাম তো। তোর কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে তুই চাইছিস আমার আর ওই ডাঈনীটার কিছু হোক।”
“ডাঈনী বলবি না অরুণাভ? ওঁর সুন্দর একটা নাম আছে।”
“তোর কেন জ্বলছে?” অরুণাভ তীক্ষ্ম ভাঁজ ফেলে শুধায়। টুটুল স্পষ্ট সুরে বলে, “আমার বন্ধু সে।”
“তাহলে আমি কে?”
“আশ্চর্য অরুণাভ ‘তুই আমার কি’ একথা বলতে হবে?”
“অবশ্যই বলতে হবে। দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা যায় না। আমি চাইছি না তুই ওঁর সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ রাখ, বন্ধুত্ব তো দূরের কথা। ওই মেয়ে সুবিধার না। আর আমি আশাবাদী যে তুই আমার রিকুয়েস্ট রাখবি।”
অরুণাভ বন্ধুকে বোঝানোর চেষ্টা করে। পত্রলেখা নামক প্রাণীটিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। টুটুলের চোখে মুখে বিরক্ত। পত্রলেখাকে দেখলেই তাঁর মায়া মায়া কাজ করে, সহানুভূতি জাগে। কথা বলতে পারে না। তার উপর বাবা মারা গেছে, মায়ের নতুন সংসার গড়ে উঠেছে। কিন্তু মেয়েটার কিছুই হয় নি। অবহেলায় অযত্নে নানীর কাছে বড় হয়েছে। একসময় মামাও বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। মায়ের নতুন সংসারে মাতৃকুলে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছিল বলে মেয়েটা কতটা খুশি ছিলো। কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস, জারিফ নামক আতংক এসে হাজির। এখান থেকেও বিতারিত করা হলো, ঠাঁই হলো গার্লস হোস্টেলে। মেয়েটা যাওয়ার দিন অসহায়দের মতো গোঙানি দিয়ে কাঁদলো। ভাসা ভাসা চোখে কেমন করে তাকিয়ে থাকে মনে হয় আঁখি যুগ্ম বিষাদসিন্ধু। টুটুল হতাশ হয়ে বলে,
“তুই বড্ড সেলফিস অরু। মেয়েটা বর্ষা আন্টির রিলেটেড বলেই এতো অপছন্দ তোর? অথচ তুই আন্টিকে এখনও ভালোবসিস…”
“ভালোবাসি না আমি। বাট আই রেসপেক্ট হার। শত হোক দশটা মাস পেটে ধরেছে। তাই ঘৃণাটা আসে না। তবে আমি মনেপ্রাণে চাই আমার মনে তাঁর জন্য ঘৃণা জন্মাক।”
অরুণাভ শান্ত গলায় প্রত্যুত্তর করে বাড়ি ফেরার তাড়া দিলো। টুটুল খেয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে, অরুণাভ নাকচ করে। কোচ তাঁর সারাদিনের খাওয়ার রুটিন করে দিয়েছে। এর বাইরে একগ্লাস পানিও পান করা যাবে না। টুটুল আর কিছু বললো না। সে জানে ছেলেটা ন্যাশনাল টিমে সিলেক্ট হওয়ার জন্য কতটা স্ট্রাগল করছে। তবে সে বন্ধুকে এগিয়ে দিতে মোড় অবদি আসে।
“ইফ ইয়্যু ওয়ান্না হাগ… ওর কিস… সামথিং বাগেরা…! আই ওয়ার্ন ইয়্যু, আ’ল কিক ইয়্যুর অ্যাজ।’
অরুণাভ স্কুটি ঠেলে নিয়ে যেতে যেতে বলল। বন্ধু তার বেখেয়ালী। সে আসলে বুঝতে পারছে না, বন্ধুর এগিয়ে দেওয়ার কারণ। আগে তো কখনো দেয় নি। মুখের হাবভাবও সুবিধার না। ছেলেটার সাথে চিঠিপত্রের পরিচয় হওয়ার পর থেকেই কেমন একটা বদলে গেছে। মান অভিমান গুড়মুড়িয়ে এতো দিন পরে কথা হলো দুজনের। ভেবেছিল আড্ডা দেবে, মুভি দেখবে, ভিডিও গেম খেলবে। কিন্তু ছেলেটা! ‘প্যাত্রলেকা প্যাত্রলেকা’— বিড়বিড় করে বিরক্ত প্রকাশ করে অরুণাভ। বেস্ট ফ্রেন্ডদের ফ্রেন্ড কেন হবে? একজনে হয় না? চৌদ্দজন লাগে? সে কোন দিকে অভাব রেখেছিল শুনি?
“আমি তোকে বলতে চাইছিলাম না ব্যাপারটা। তুই হয়তো মন খারাপ করে থাকবি। বাট আই থিংক তোকে জানানো উচিত।”
অরুণাভের বুকটা ধ্বক করে উঠলো। হারামজাদা চিঠিপত্রের জন্য তাঁর সাথে বন্ধুত্ব শেষ করে দেওয়ার কথা বলবে না তো? বলুক একবার! তারপর তাঁর মতো ভদ্রছেলের হাতে দুটো খুন হবে। প্রথমজন প্রাণপ্রিয় বন্ধু, অপরজন অপ্রিয় চিঠিপত্র। তবে টুটুল সেরকম কিছুই বললো না। অরুণাভের পিঠে মৃদু চাপড় মেরে বলল,
“বর্ষা আন্টি কিছুদিন যাবত আমার সাথে কন্টাক্ট করার চেষ্টা করছিলো। তারপর একদিন সরাসরি বাড়িতে হাজির।”
অরুণাভের মেজাজ গরম হয়ে আসে। তাঁকে নাগালে না পেয়ে তাঁর বন্ধুর লেজ ধরে তাঁর কাছে পৌঁছাতে চাইছে! সে স্কুটি স্টার্ট দিতে দিতে বলল, “এখানেই দাঁড়ি বসা। আমি আর শুনতে আগ্রহী নই। বায়, সি ইয়্যু সু…ন!”
স্কুটির সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত মেলে বাঁধা দেয় টুটুল, “ইয়ার, আই থিংক তোর শোনা উচিত।”
“বিরক্ত করিস না তো। সামনে থেকে সর।”
“অরুণাভ!”
বন্ধুর জোরাজুরিতে অরুণাভের মুখটা ম্লান হয়ে আসে, “সিরিয়াস কিছু?”
“নাহলে আমি তোকে জোর করি?” টুটুলের শান্ত গলায় অরুণাভ আগ্রহ ভরা চোখে তাকালো। টুটুল অরুণাভের হাতের উপর হাত রাখলো। যেন নীরবে আগাম সান্ত্বনা দিয়ে গেলো।
“বর্ষা আন্টি সত্যিই অনেক অনুতপ্ত। তাঁর নির্মল চোখের পানি সাক্ষী। বারবার তোর কথা বলছিল। সামনের ফ্লাইটে আবারও দেশ ছাড়বেন। ছুটি নাকি শেষ। আর হয়তোবা কোনোদিন ফিরবে না। তোর সাথে শেষবারের মতো দেখা করার ইচ্ছে প্রকাশ করছিল। একটা দিন ভিক্ষা চাইছিলো। আমি তোকে জিজ্ঞেস না করেই না বলে দিয়েছি।”
রজনীর শেষ ভাগ, যখন নিস্তব্ধতা কুট কুট করে। তেমনি নিস্তব্ধ সুর অরুণাভের কর্ণকুহরে গুনগুন করে। ঘন কালো আঁখি পল্লব পলক ঝাপটায়। বিড়াল চোখে শিশির চমকায়। অতি সুক্ষ্মভাবে নিজ মোলায়েম মনপদ্মকে দৃঢ় বৃন্তে মুড়ে নিয়ে গমগমে সুরে বলল, “আমি ভিক্ষা দেই না। দোয়া দিই, উনি ওনার সন্তানদের নিয়ে খুশি থাকুক ব্যস।”
টুটুল হাসলো। হাসিটা কেমন বিষাদের ছায়া দিচ্ছে। বলে, “ওনার ছোট মেয়ে বৃষ্টির ব্রেন টিউমার। দুই বছর বয়সে ধরা পড়েছে। অপারেশন করার ওয়ে ছিলো না। ওত ছোট শিশু… কেউ রিস্ক নিতে চায় নি। বৃষ্টির সাথে সাথে টিউমারও বড় হয়েছে, নতুন আরও দুটো কুড়ি গজিয়েছে। অপারেশনে রিস্ক আছে তাই কেউ সাহস পাচ্ছে না। আল্লাহর ত্রিশ দিনই অসুস্থ থাকে। রোগা প্যাকাটির মতো শরীর। আমি দুই তিনবার দেখাও করেছি বাচ্চা মেয়েটার সাথে। কি মিষ্টি মেয়েটা বললে বিশ্বাস করবি না। সবসময় তোর কথা বলে। তোর সাথে দেখা করতে চায়। আর মেয়েটা তোর মতোই ক্রিকেট পাগলা। বড় হয়ে নাকি ক্রিকেটার হবে। অথচ খুব বেশি হলে তিনমাস।”
অরুণাভ বৃষ্টির চেহারা মনে করার চেষ্টা করে। কিন্তু সব আবছা আবছা। সেদিন ভাইয়া ভাইয়া বলে কত কিছু বলছিলো। সে হুঁ হা টুকুও করে নি। চকলেট দিলে খুশি হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছিল। সে বন্ধুকে বলল, “এসব বলে আমাকে দূর্বল করার চেষ্টা তাঁর। কতটা জঘন্য মহিলা সে। নিজ অসুস্থ মেয়ের দোহাই দিয়ে..”
“ব্যাপারটা মোটেই তেমন না। রিভেঞ্জ অফ নেচার—বলে একটা কথা আছে না? উনি বিশ্বাস করেন ডিভোর্সের বেলায় তিনি তাঁর দুধের শিশুটার কথা ভাবেন নি বলেই আল্লাহ পাক তাঁকে এই শাস্তি দিয়েছেন। হয়তো তোর অবুঝ মনের হায় লেগেছে। বৃষ্টির মুখটা দেখলে ওনার তোর কথা মনে পড়ে। আর আমিও খেয়াল করে দেখেছি তোদের চেহারার মিল বেশ।”
অরুণাভ ম্লান হেসে বলে, “আমার অবুঝ মনের হায়? সিরিয়াসলি! উনি আমার উপর ইলজাম দিচ্ছেন যে আমার জন্য ওনার মেয়ের এই দশা। এখন তিনি কি চাইছেন?”
“তুই ভুল ভাবছিস। যাইহোক আন্টি চাইছে তুই একটা দিন সময় দে ওনাদের। বৃষ্টির সাথে দেখা কর। স্নেহের হাতটা মাথায় রাখ আর ভালোবাসা দে ব্যস। শুধু একটু সময় কাটানোর ইচ্ছে তাদের। স্মৃতি কুড়াবে। বৃষ্টির শেষ ইচ্ছা বলতে পারিস। তবে আমি মানা করে দিয়েছি।”
আবারও আবেগের দোহাই দেওয়া হচ্ছে। অরুণাভের কোমলতার সুযোগ নিতে চাইছে। সে কেন কঠোর হতে পারে না? মানসপটে বৃষ্টির মুখটা পরিষ্কার হয়। ওঁর হাসিমুখের আড়ালে বেদনার গল্প লেখা ছিলো কে জানতো! সে হার মেনে বলে,
“তুই হ্যাঁ করে দে। আমি দেখা করবো, তবে শুধু ওনার মেয়ের সাথে। ওনার ছায়াও যেন আমার উপর না পড়ে। আর হ্যাঁ, একদিন সময় দেওয়া সম্ভব না আমার। ঘণ্টা খানেকের ব্যাপার শুধু। মেয়েটার কাছে ক্ষমা চাইবো নিজ দোষের জন্য, হ্যাপি?”
অরুণাভ শীতল ভঙ্গিতে মনোভাব ব্যক্ত করে স্কুটি নিয়ে চলে যায়। টুটুলের মুখে ঝলমলে হাসি খেলে গেলো। সে উঁচু গলায় বন্ধুর উদ্দেশ্যে বলল, “থ্যাংকস ইয়ার। আচ্ছা শোন, পত্রলেখাকে সঙ্গে আনবো। বেচারিকে নাকি তুই সেদিন হেল্প করেছিলি। তোকে ধন্যবাদ দিতে চায়।”
“আর আমি ওঁর ঠ্যাং ভাঙতে। খবরদার টো টো গাড়ি। ওটাকে আনলে আমি আসবোই না।”
“আসবি আসবি। শোন… আই লাভ ইয়্যু ইয়ার। ইয়্যু আর সো মাচ সুইঠ। আমার বোন থাকলে কালাজাদু করে হলেও তোর ঘারে চাপিয়ে দিতাম।”
অরুণাভ মোড় ঘোড়ানোর আগে বন্ধুর দিকে একনজর দেখে চেঁচিয়ে বলল, “সমস্যা কি? আন্টিকে বল আরেকটা বোন আনতে। আমি না হয় অপেক্ষা করলাম। ভাঙা হৃদয় খানা তোর বোনের জন্য আবারও জুড়ে নিবো না হয়।”
—————
অপরাহ্নে সোনা ছোঁয়া মিঠা রোদ শ্যামল ঘাসের গায়ে সুরসুরি দেয়। ঘাসেরা ঝলমলিয়ে হেসে ওঠে। সাদা স্পোর্টস শ্যুয়ের চাপে ঢেকে যায় তাদের হাসি। রোদের রাগী চাহনি থেকে মুক্তি পেতে সাদা ক্যাপ ঘুরিয়ে সামনে আনে। কুঁচকানো দৃষ্টি শিথিল। ঠোঁট চেপে হেসে উরুতে বল ঘঁষে।
“ভাইটুস, পাপাকে আউট করে উড়িয়ে দাও!”
ছোট ভাইয়ের আবদার মেনে নিয়ে অরুণাভ বলল, “ওকে জানটুস।”
অরুণাভ বল করলো, একটু পেস ঢালার চেষ্টা করে। বল কোথা দিয়ে কোথায় গেলো অরুণ সরকার দেখতে পায় না। প্রহর হাত তালি দিয়ে বল আনতে ছুটে যায়। অরুণাভ টিপ্পনী কেটে বলল, “আব্বু চশমা খুলে রাখা উচিত হয় নি তোমার। বয়স হয়েছে না?”
কারো প্রাণখোলা হাসির ঝংকার কানে কুতকুতি দেয়। চোখ উঁচিয়ে তাঁর দিকে তাকায় অরুণ। যেন অগ্নিঝরা চাহনিতেই ভস্ম করে দিবে। পাতা আওয়াজ দেয়, “ভোর সোনা, একটু সাবধানে বল করিও কেমন? এদিক সেদিক হয়ে গেলে তো সমস্যা। বুড়োকালে অসুখ বিসুখ সারতে চায় না।”
“আচ্ছা আম্মু!” অরুণাভ ঠোঁট চেপে জবাব দিলো।
অরুণ সরকারের ইগোর রফাদফা। পাতার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে ভরাট স্বরে বলল, “বুড়ো কাকে বলছে?”
অরুণাভ ব্যঙ্গাত্নক সুরে বলল, “তুমি ছাড়া আর কে?”
“বুড়ো লাগে আমাকে?"
পাতা হাসি জারি রেখে চেঁচিয়ে বলল, “এই নাক উঁচু ম্যানারলেস লোক, বুড়ো না লাগার মতো কিছুই নেই। বুড়ো হয়ে গেছেন—এটা মানতে শিখুন। তিন তিন জন ছেলে মেয়ের বাপ আপনি, চতুর্থ জন লোডিং। অথচ এখনো ভাব দেখান ত্রিশ বছরের কচি খোকা। দুদিন পর নাত নাতনি এসে গলায় ঝুলে পড়বে—সেকথা ভুলে যাবেন না কিন্তু?”
অরুণ সরকারের মুখটা থমথমে হয়ে আসে। প্রহর বল কুড়িয়ে নিয়ে ছুটে আসে। ভাইয়ের দিকে বল ছুঁড়ে হাঁটুতে ভর দিয়ে হাঁপায়। অরুণাভ আবারও বল করে। অরুণ সরকারের কি হলো আক্রমণাত্মক হয়ে ব্যাট করে। বল সোজা বাড়ির বাউন্ডারি পেরিয়ে পাশের জঙ্গলে পড়ে। হাত তালির আওয়াজে অরুণ সরকার ছাদের অপরপ্রান্তে তাকায়। কিন্তু কাউকে পাওয়া গেলো না। তবে অরুণের বুঝতে বাকি নেই কে ছিলো।
পাতা উপর থেকে গলাবাজি করে বলে, “আমার ছেলে আস্তে বল করেছিল বলে বল বাউন্ডারি পার হয়েছে। ফুটেজ খাওয়ার কোনো আবশ্যকতা নেই।”
অরুণ ধমক লাগায়, “শাট আপ পাতাবাহার। কার পারমিশনে ছাদে উঠেছো তুমি? ছাদ পিচ্ছিল না? পা ফসকে গেলে কি হতে পারে ভেবেছো একবার?”
ধমকে পাতার মুখটা কালো হয়ে আসে। লোকটা আর ভালো হলো না। সেই গোমড়া মুখো ক্ষ্যাপাটে ষাঁড়ই রয়ে গেলো। বুড়ো হয়েছে অথচ ভাব কমে নি। তারই ছেলেদের সামনে তাকে বকছে। সাহস কত বড়!
“মাম্মামকে বকছো কেন?” প্রহরকে সবার আগে প্রতিবাদ করতে দেখা গেলো। অরুণ সরকার ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, “আক্কেল গুড়ুম হলে ধমকেই ঠিক করতে হয়।”
“আব্বু শুধু শুধু চিল্লাচিল্লি করছো। যাও বল খুঁজে আনো।” অরুণাভ কান চুলকে ইশারা করে।
অরুণ সরকার ব্যাট দেখিয়ে বলে, “আশ্চর্য! ব্যাটিংয়ে আমি, বল কেন আনবো? তুমি আনবে।”
“তুমি ফেলেছো তুমি আনো। আমি বাউন্ডারি ওপার করলে আমিই আনতাম।”
“আমি তো তোমাকে আনতে বলি নি। তুমি স্বেচ্ছায় এনেছো।”
“তো? বল তুমি আনবে।”
“পারবো না।”
“দিস ইজ নট ফেয়ার, এতো জোরে কে মারতে বলেছিল তোমাকে?”
বাপ ব্যাটার লেগে গেলো কোন্দল। অতিষ্ঠ প্রহর দু'জনকেই থামিয়ে নিজে গিয়ে বল আনলো। অরুণ আবারও ব্যাটিং পজিশনে। অরুণাভ বাঁকা হেসে বল করতে উদ্যত হয়, অরুণ সরকার হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দেয় তাঁকে। ধনুকের মতো ভ্রু যুগল বাঁকিয়ে বলে,
“ওয়ে ফোর টোয়েন্টি, তোমার মতো টি টোয়েন্টি খেলা প্রফেশনাল ক্রিকেটার নই আমি। একটু হুঁশ আক্কেল রেখে বল করিও।”
“এক বল করেই হাওয়া ফুঁস হয়েছে আপনার? আহারে বেচারা, বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছে!”
অরুণ সরকার আবারও ছাদ পানে তাকিয়ে খিটখিটে মেজাজ দেখিয়ে বলল, “আপনি এখনো ছাদ থেকে নামেন নি? সাহসের বলিহারি!”
“আব্বু তুমি অহেতুক আম্মুর উপর চিল্লাচ্ছো।”
“ইয়্যু ফোর টোয়েন্টি যাস্ট শাট ইয়্যুর মাউথ। কি ভাবো নিজেকে হ্যাঁ? ভুলে যেও না বাবা আমি তোমার।”
অরুণ সরকার বড় ছেলের উপরও চেঁচিয়ে উঠলো। প্রহর কপাল কুঁচকে বলে, “পাপা তুমি কি হাল্ক?”
অরুণ স্ট্যাম্পের পেছনে দন্ডায়মান ছেলের দিকে তাকায়। প্রহর কাঁধ উঁচিয়ে বলে, “নওতো! তাহলে হাল্কের মতো রেগে কেন যাচ্ছো?”
“ইয়্যু ওলসো শাট আপ।”
প্রহর গাল ফুলিয়ে, বুকে হাত ভাঁজ করে মুখ বাঁকিয়ে নিলো, সে রাগ করেছে। অরুণাভ বিরক্ত হয়ে বলল, “আব্বু তোমার ঢং বাদ দিয়ে খেলতে চাইলে খেলো, নাহলে টাটা বায় বায় খতম!”
“ভোর বড্ড বেশি মুখ চালাচ্ছো কিন্তু?” অরুণ তেঁতে উঠলো।
প্রহর রাগের মাঝেও মুখ ফিরিয়ে এনে প্রশ্ন ছুড়লো, “মুখ কি গাড়ি? মুখের চাকা নেই তো! কিভাবে চলবে?”
“ছোট সরকার চুপ থাকো, বড়রা কথা বলছি না?”
“পাপা তোমরা তো ঝগড়া করছো। মাম্মাম বলে ঝগড়া করা পঁচা কাজ।”
“মাম্মা’স বয় কিপ ইয়্যুর মাউথ শাট। এন্ড ইয়্যু ফোর টোয়েন্টি? ঢং আমি না তুমি করছো। নিজেকে শোয়াইব আখতার ভাবা বাদ দাও, আর বল করো।”
অরুণ শেষ ঝাড়ি বড় ছেলেকে দিলো। অরুণাভ নাকের পাটা ফুলিয়ে বল করে। অরুণ সরকার কোনোমতে পা দিয়ে ঠেকিয়ে নিজেকে আউট হওয়া থেকে রক্ষা করে। অরুণাভ চেঁচিয়ে উঠলো, “আব্বু চিটিং করছো! পা দিয়ে স্ট্যাম্প ঢেকেছো তুমি।”
“কখন, কবে? আই থিংক চশমা তোমার পড়া উচিত।”
অরুণ পাত্তা দেয় না। প্রহর ভাইকে চিয়ার্স করে বলে, “ভাইটুস জোর বল করে পাপাকে আউট করে দাও!”
অরুণ সরকার ঘার বাঁকিয়ে বলল, “ছোট সরকার সব শুনছি আমি। পাপাকে আউট করতে বলা, তাই না? পাপা আউট হবে তোমার কষ্ট হবে না বলো?”
“না।”
“কেন?”
“তুমি আউট হলে আমি ব্যাট করতে পারবো।।”
প্রহরের সহজ-সরল স্বীকারোক্তি। অরুণ সরকার ছেলের দিকে তাকায়। প্রহর খরগোশের দাঁত দু'টো দেখিয়ে হাসলো।
ছাদে দাঁড়িয়ে পাতা তাদের কান্ডে হাসে। ইশ্ কত সুন্দর মুহূর্ত! এমন মুহূর্ত বারবার আসুক। বাঁধ ভাঙা খুশিতে পাতার চোখে পানি এসে যায়। এতো সুখ তাঁর কপালে লেখা ছিলো? পাতা উপর ওয়ালার কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে ঘুরে দাঁড়ায়। কুঞ্চিত কপালে মেয়েকে খোঁজে। কোথায় হাওয়া হলো? পাতা কয়েকবার ডেকেও সাঁড়া পেল না। চিলকোঠার ঘর থেকে গানের সুর ভেসে আসে। পাতা উঁকি দেয় সে ঘরে।
হাতের রেশমী চুড়ি ঝংকার দেয়, পায়ে বাঁধা সোনার ঘুঙুর তালে তাল মেলায়। মিনি পান্ডা শেপের বক্সে গান বাজছে,
যাও বলো তারে, মেঘের ওপারে!
বৃষ্টি বন্দনা জুড়ে ধরনী তল!
যাও বলো তারে, শ্রাবণ আষাড়ে!
মেঘে শতদলে ছুঁয়েছে ভেজা জল!
পাতার চোখ দুটোয় মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে। মেয়েটা সুন্দর নাচে। নাচের প্রতি এতো আগ্রহ দেখে ছোটবেলায় ওঁর বাবা ‘অনুশ্রেয়া নৃত্যকলা একাডেমিতে’ ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল। অল্প সময়েই শিক্ষিকার নজর কেড়েছিল। টিভিতে জনপ্রিয় একটা রিয়্যালিটি শোয়ে অংশগ্রহণ করার জন্য ‘অনুশ্রেয়া নৃত্যকলা একাডেমি’ থেকে একটা টিম গঠন করা হয়। অরুণিতা সেখানে অনায়াসে টিকে যায়। তাদের টিম সেমিফাইনাল অবদি গিয়েছিল। সেমি ফাইনালে পারর্ফম করার সময় মেয়েটা কিভাবে যেন মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো। নাচের তাল কেটে যায়, টিমে প্রভাব পড়ে। টিম বাদ পড়ে যায় সেখান থেকে। ব্যস অরুণিতা সরকারকে নিয়ে ট্রল শুরু। পড়ে যাওয়ার অংশ টুকু নিয়ে সোসাল মিডিয়ায় বেশ চর্চা হলো। রুষ্ট পুষ্ট স্বাস্থ্যের জন্য ঠাট্টা, হেয় করা হলো। এসব দেখেও মেয়েটা শক্ত ছিলো, প্রতিক্রিয়া দেখায় নি। কিন্তু হঠাৎ নৃত্যকলা একাডেমি যাওয়া বন্ধ করে দিলো। নাচ শেখার যাত্রা সেখানেই শেষ। এরপর যা কিছু বাড়ির চার দেয়ালে আঁটকে। নিজে নিজেই ইউটিউব দেখে শেখে।
“কিছু বলবে মাম্মাম?”
মেয়ের প্রশ্নে পাতা ভাবনা জগত থেকে বেরিয়ে আসে। হাসিমুখে ভেতরে ঢুকে। অরুণিতা মেঝেতে বসে ঘুঙুর খুলছিল। পাতা টুল টেনে মেয়ের পাশে বসে। অরুণিতা হাসলো ক্ষণ।
“হোয়াটস দ্য ম্যাটার?”
“ বেবি বাম্প করছে। অসহ্য লাগছে। আবার ক্ষুধাও লেগেছে। কিন্তু খাবার দেখলে খেতে ইচ্ছে করে না।”
পাতা ঠোঁট উল্টিয়ে সব জানায় মেয়েকে। অরুণিতা কোণা চোখে চাইলো বাড়ন্ত পেটের দিকে, “কি খেতে ইচ্ছে করছে?”
পাতা কিছু সময় ভেবে নিয়ে বলল, “রসের হাঁড়িতে ডোবানো রসগোল্লা। হাঁড়ি কিন্তু মাটির হতে হবে।”
অরুণিতা উঠে দাঁড়ালো। কোমড়ে বাঁধা ওড়না খুলে গলায় পেঁচিয়ে নিয়ে বলল, “মাটির হাঁড়ি কোথায় পাবো আমি?”
পাতা কাঁধ উঁচিয়ে বলল, “আমি কি জানি। কিন্তু মাটির হাঁড়ি না হলে খাবো না।”
অরুণিতা মায়ের দিকে তাকায়। দ্যুতি ছড়ানো নুরানী চেহারা কেমন ভাঙতে শুরু করেছে। চোখের নিচে কালি, গলার হাড় চেয়ে আছে। দেখার মতো শুধু বাড়ন্ত পেটটাই।
অরুণিতা অ্যাপ্রোন পড়ে রসগোল্লা বানানোর পুরো প্রস্তুতি নেয়। পাতা চেয়ে চেয়ে দেখে মেয়েকে। স্যরি মেয়ে না, তাঁর আম্মুকে। বাপের মতোই সবেতে পারদর্শী। রান্নার হাত দারুণ, অরুণিতা’স কিচেনের সব খবরাখবর রাখে আবার বাপের কাছে অফিস সম্পর্কে জানার আগ্রহ দেখা যায়। পড়াশোনায় টপার, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় আজ পর্যন্ত হেরে বাড়ি ফিরেনি। একদিন ওর শ্রেণী শিক্ষক ফোন করে বলল, “আপনার মেয়ে অনেক ট্যালেন্টেড। আমরা তো ওকে ট্রেনিং দিচ্ছি। নাইনে উঠলে জাতীয় টেলিভিশনে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ও আমাদের স্কুলকে লীড করবে। আর আমরা আশাবাদী ট্রফি আমাদের স্কুলে আসবে।”
আহ্ পাতার কি যে শান্তি লাগে মেয়ের প্রশংসা শুনলে! মেয়ের স্টাডি রুম জুড়ে ট্রফি মেডেল আর বাঁধাই করা সার্টিফিকেট।
পাতা এগিয়ে এসে মেয়ের পাশে দাঁড়ায়। লম্বা চওড়ায় তাঁকেও ছাড়িয়ে গেছে। অরুণিতা মুচকি হেসে ছানা মুঠোয় ভরে রসগোল্লার জন্য বল বানায়। পাতা বলে, “নীড আ হ্যান্ড?”
“নোও!” অরুণিতার না করতে দেরি হয় না।
পাতা হাত গুটিয়ে নেয়। মুখ বাঁকিয়ে বলে, “তোদের মতো পার্ফেক্ট না পারলেও রান্না আমি জানি।”
তোদের— বলতে বাবা-মেয়েকে বুঝিয়েছে। রান্নাঘরে রান্নার জন্য এই মানবকেই দেখা যায়। ভোর রান্নাঘরের আগে পিছেও নেই। পাতা ভুলক্রমে রান্নাঘরে এলেও চেঁচামেচি শুরু করে দেয় বাপ বেটি।
“অস্বীকার কে করলো? তবে তুমি রান্না কম দূর্ঘটনা পাকাতে বেশি পারদর্শী।”
পাতা ঠোঁট চেপে হাসলো। শেষবার রান্নাঘরে এসেছিল ডিম সিদ্ধ দিতে। পানি শুকিয়ে ডিমের কালভুনা হয়ে গিয়েছিল। অল্পের জন্য দূর্ঘটনা ঘটে নি। এর আগে ডালে পাঁচ ফোড়ন দেওয়ার সময় তেল গর্দানে ছিটকে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল। এরকম টুকিটাকি ঘটনা পাতা রান্নাঘরে এলে ঘটতেই থাকে।
“পাপা বিগড়েছে তোমাকে। কত দরদ বউয়ের প্রতি! রান্না করে খাইয়ে দাইয়ে, লাঞ্চের ব্যবস্থা করে থালাবাসন ক্লিন করে অফিস যাবে। চা অবদি বানিয়ে ফ্লাক্সে রেখে যায়। সারাদিন অফিসে খেটে এসে রাতেও নিজেই ডিনার বানাবে। দ্যাটস কলড পিওওর কেয়ার। পাপা কেয়ার’স ইয়্যু লট।”
পাতা ছোট্ট করে ‘হুঁ’ বলে। অরুণিতা কোণা চোখে চেয়ে বলে, “কি হলো?”
“তোর পাপা সবার কেয়ার করে, কিন্তু তাঁকে কেউ কেয়ার করবে—এই সুযোগটা উনি কাউকেই দেয় না। সব চিন্তা ভাবনা নিজের ভেতর পুষে রেখে একা একা ধুঁকবে। শরীরে একশ একটা রোগ ব্যাধি! ঠিকমতো ওষুধ খাবে না, শরীরের যত্ন নেবে না। কিছু বললেও এক কান দিয়ে শুনবে অপর কান দিয়ে বের করে দিবে।”
অরুণিতা সিরা বানানোর প্রস্তুতি নিয়ে বলল, “যার কথা শুনে তাঁকে দিয়ে বলাও।”
পাতা মেয়ের দিকে তাকিয়ে। অরুণিতা চোখ উল্টিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করে বলে, “আমার দিকে তাকিয়ে লাভ নেই মাম্মাম। ব্রো’র কথা সে কখনোই অমান্য করে না।”
“ওই নাক উঁচু লোক যদি কারো কাছে মাথা নত করে তাহলে সে তুই।”
অরুণিতা কিছু বললো না। মাটির হাঁড়িতে সিরা ঢেলে রসগোল্লার বল ভিজিয়ে বানিয়ে ফেলল রসগোল্লা। ঠান্ডা হলে মায়ের হাতে হাঁড়ি ধরিয়ে দেয়। পাতার মুখে ঝলমলে হাসি, “দুষ্টুটার তর সইছে না! আগে তাঁকে শান্ত করি!”
পাতা আস্ত রসগোল্লা মুখের ভেতর চালান করে। অরুণিতা হঠাৎ আবদার করে বসে, “মাম্মাম ক্যান আই টাচ ইয়্যুর টাম্মি? আই ওলসো ওয়ান্ট টু ফিল দ্য বেবি!”
পাতার চোখ দুটোও রসগোল্লার আকার ধারণ করে। সে কি ঠিক শুনলো? সে ঘোরের মাঝেই সম্মতি দিলো
অরুণিতা অ্যাপ্রোন খুলে নিলো চটজলদি। মায়ের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পেটে কান পেতে বলল, “হ্যালো বেইবি!”
পাতা ঠোঁট কামড়ে ধরে ব্যথা সহ্য করে নেয়। বাচ্চা তাঁর বোনের ডাকে সাঁড়া দিয়েছে, কিক করছে। এতো আশ্চর্য কারবার! দুই ভাই কত ডাকে কখনো সাঁড়া দেয় নি। অথচ বোন ডাকতেই সাঁড়া দিলো।
—————
বিগত সাত দিন যাবত টেস্ট চলছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আগামী লঙ্কান সিরিজের জন্য দুজন নয়া মুখ খুজে চলেছে। তারই প্রেক্ষিতে কোয়ালিফাইড ক্রিকেটারদের ফিটনেস রেকর্ড করা হচ্ছে। দুটো মুখের ভিত্তিতে ত্রিশ জনের ফিটনেস রেকর্ডের কাজ চলছে। তন্মধ্যে অরুণাভ সরকার একজন। বাকি ঊণত্রিশ জনের মতো সেও তাঁর সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টায়। আজই লাস্ট ফিটনেস টেস্ট। আজ ব্যাটিং সেশনের লাস্ট টেস্ট। বাহুর জোর যার বেশি সেই হবে আগামীর রয়েল বেঙ্গল টাইগার!
অরুণাভ সাজঘরে নিজেকে তৈরি করতে ব্যস্ত। সোফায় বসে স্পোর্টস শুয়ের ফিতা বাঁধে। কনুইয়ে এলবো গার্ড জড়ায়। থাই গার্ড, অ্যাবডোমিনাল বক্স, লাগিয়ে প্যান্ট কোমড়ে গলিয়ে নেয়। লেগ গার্ড ভালোভাবে বেঁধে কয়েক কদম হাঁটে। গায়ে সাদা জার্সি গলিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে। দুই হাতের তালুতে সানস্ক্রিন লোশনের মতো ডলে মুখে ঘঁষে। তাঁর কান্ডে সহ খেলোয়াড়রা হাসে। অরুণাভ গম্ভীর মুখে বলল,
“হেসে নাও ভাই! আমি বুঝতে পারি না ওই আইনাল হকের সমস্যা কি! সানস্ক্রিন ছাড়া গিয়েছি বলে পাঁচ পয়েন্ট কেঁটে নিলো? এটা কোনো কথা? আমাকে দেখতেই পারে না। পদে পদে ভুল ধরবে। মাথা খেয়ে নিয়েছে। তোমরা আমার জন্য দোয়া করো— আমার ধৈর্য্যের বাঁধ যেন না ভাঙে। ভাঙলে ওঁর টাক মাথার ইন্না লিল্লাহ হবে!”
সবাই হেসে উঠল। অরুণাভ বিড়বিড় করে। কি যে হবে আজ! ইয়া আল্লাহ সব যেন ঠিকঠাক হয়। সৈয়দ আদনান নামক এক তরুণ তাড়া দিয়ে বলল,
“অরু নেক্সট ডাক তোর পড়বে। দেরিতে গেলে কথা তো শুনতে হবেই উপরন্তু পয়েন্ট কাটবে। জলদি হাত চালা ভাই!”
অরুণাভ বাবড়ি চুল ঝুটি করে নিলো। ফোনটা বের করে মায়ের নাম্বারে কল করে। রিসিভ হতে সময় নেয় না। অরুণাভ কাঁদো কাঁদো মুখে বলে, “ও আম্মু যত দোয়া আছে সব তোমার ছেলেটার জন্য ঢেলে দাও আজ। সিলেক্ট হলে প্রথম মাইনে তোমার হাতে তুলে দিবো।”
ওপাশ থেকে পাতার হাসির আওয়াজ শোনা গেলো। রুম জুড়েও চাঁপা হাসির গুঞ্জন। পাতা ছেলের জন্য দোয়া করে। ছেলেকে মাথা ঠান্ডা রাখার উপদেশ দেয়, আর বেশি বেশি দরুদ শরীফ পাঠ করার সালাহ্ দেয়। অরুণাভ ফোন কেটে রেখে দেয় ড্রয়ারে। গ্লাভস আর হেলমেট তুলে সতীর্থদের থেকে বিদায় নিয়ে মাঠে নামে। পেছন থেকে সবাই হাত তালি দিয়ে উৎসাহ দিতে থাকে।
ব্যাটে দুর্দান্ত কারিশমা দেখায় অরুণাভ। অফ-স্টাম্পের বাইরে সুইং করা বল শরীরের কাছে এলে ডিফেন্ড করে। আইনাল হকের নির্দেশনায় বোলার পরিবর্তন হয়। পরবর্তীতে ইনসুইং ইয়র্কার। বল ভেতরে ঢুকে পায়ের গোড়ায় পড়ে। এক্ষেত্রে এলবিডব্লিউ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অরুণাভ দক্ষতার সাথে দ্রুত ব্যাট নিচে নামিয়ে বল ব্লক করে নিলো। নিমিষেই হাত তালির জোয়ার ভেসে আসে। এবার শর্ট বাউন্সার অ্যাটাক। অরুণাভের ক্ষুর ধারালো চাহনি। বল সোজা মাথার দিকে ধেয়ে আসে। অরুণাভ নিচু হয়ে বল ছেড়ে দেয়। বলের গতি মারাত্মক। লাগলে খবর আছে! অরুণাভকে পিছু হটতে দেখে আইনাল হক বাঁকা হাসলেন।
এরপর আসে স্পিনারের টার্নিং বল। অরুণাভ নিজেও স্পিনার। তাই এটা তাঁর বাম হাতের খেলা। সে অত্যধিক আত্নবিশ্বাস নিয়ে বলের লাইনে গিয়ে পা ব্যবহার করে বল বাউন্ডারি পার করে। কতক্ষণ স্পিন বল খেলার পর বোলার চেঞ্জ করা হয়। গুড লেংথ সিম বল। পিচে পড়ে হঠাৎ দিক পরিবর্তন করে। অরুণাভ দুই একটা বল ছেড়ে দিলেও পরবর্তীতে মাথা স্থির রেখে, ব্যাট-প্যাড কাছাকাছি রেখে খেলে গেলো বলগুলো। তাঁকে বারবার বিভ্রান্ত করা হয়। কখনো স্পিন তো কখনো বাউন্সার আবার হুট করে ইনসুইং ইয়র্কার, আবার খেলতে খেলতেই সিম বল। অরুণাভ হিমশিম খেলেও আত্নবিশ্বাস হারালো না। নিজেকে পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে খেলে গেলো।
আইনাল হক সহ আরো বিচারক প্যানেল খেলা দেখে পয়েন্ট নোট করলেন। ফারুক আহমেদ গলা খাঁকারি দিয়ে আইনাল হকের উদ্দেশ্যে বললেন, “চলনসই?”
আইনাল হক মুচকি হাসলেন। কিছু বললেন না। অরুণাভের সময় শেষ হলে মাঠ ছাড়ে। সে তো তাঁর সর্বোচ্চ দেওয়ার চেষ্টা করেছে! এখন বাকিটা উপর ওয়ালার হাতে। তাঁর স্বপ্ন বাস্তবের ছোঁয়া পাবে তো?
—————
ইদানিং অফিসে ব্যস্ততা বেড়েছে। অরুণ সরকার হাঁফ ছাড়ার ফুরসত পায় না। মধ্যাহ্ন গড়িয়ে অপরাহ্ন উঁকি দেয় অথচ কাজের চাপে মধ্যাহ্ন ভোজ গ্রহণ করা হয় নি। অন্ততপক্ষে ওষুধ গুলো খাওয়া উচিত ছিলো। সকাল ও রাতের ওষুধ পেটে গেলেও দুপুর বেলার ওষুধ অরুণ সরকারের ঘরের বিনে জমায়েত হয়। কবে যে পাতাবাহারের কাছে হাতেনাতে ধরা খায় কে জানে! এমনিতেই দিন দিন শরীরে নানান অসুখ বসতি গড়তে মরিয়া। নাহ্ শরীর চলছে না। পেটকে শান্ত করতে হবে। সুজনকে কল লাগানোর জন্য ফোন হাতে নেয়। তবে ফোন করার প্রয়োজন পড়ে না। সে হাজির। অরুণ ল্যাপটপের সাটার বন্ধ করে সুজনকে বলে,
“আসো, তোমাকেই কল করতে যাচ্ছিলাম।”
“আপনি কল করার আগেই আমি হাজির বস। কিছু বলতেন বস?”
“হুম হু!”
“সে না হয় বললেন, তাঁর আগে এই খামটা দেখুন তো। রানার দিয়ে গেলো! ই-মেইলের যুগেও রানার! আমি তো অবাক হয়েছি।”
অরুণ সরকারের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে, “কিসের খাম? কি আছে ওতে?”
“আপনিই খুলুন বস। হয়তো কোনোকিছুর রিপোর্ট।”
অরুণ হাতে নেয় খামটা। প্রেরকের নাম দেখে খামটা ড্রয়ারে রেখে দিলো, “পরে দেখবো। আগে খাওয়ার মতো কিছু আনো তো! আ’ম হাঙরি!”
“জি বস! কি খাবেন?”
“যা কিছু, সাথে কড়া লিকারের চা।”
সুজন মাথা নেড়ে চলে যায়। অরুণ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। ড্রয়ার টেনে খুলে খামটা দেখে। বের করার সাহস হয় না। আবারও বন্ধ করে রেখে দেয়!
সুজন কাচ্চি বিরিয়ানি, কোক আর কিছু ডেজার্ট নিয়ে আসে। অরুণের মুখে রুচে না। অল্প খানিক ডেজার্ট মুখে দিয়ে সুজনকে বললো, “ধরো কোনো সুসংবাদ পেলাম আমি। সুসংবাদ দিতে এই ডেজার্ট নিয়ে আত্নীয় বাড়ি যাওয়া যাবে?”
সুজন চোখ পিটপিট করে। আমতা আমতা করে বলে, “বুঝলাম না স্যার?”
“মাথামোটা! বোঝার দরকার নেই। যাও অরুণিতা’স কিচেন থেকে এটা সহ আরও কিছু ডেজার্ট নিয়ে নাও। আমরা বেরুচ্ছি। আহাম্মক, হা করে তাকিয়ে আছো কেন আমার দিকে? যেতে বললাম না?”
ঝাড়িতে সুজন পালিয়ে বাঁচে। অরুণ সরকার ড্রয়ার খুলে খামটা তুলে ব্লেজারের ভেতরের পকেটে রেখে দেয়।
কালো মার্সিডিজ অনেক মাস পর সরকার বাড়ির আঙিনায় হাজির। গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে অরুণ সরকার। কোনদিন না তাকিয়ে সোজা বাড়ির ভেতরে উপস্থিত হয়। দরজা খোলাই ছিলো। কাউকে ডাকারও প্রয়োজন ছিলো না। সবাই ড্রয়িংরুমেই উপস্থিত। অরুণ সরকার ভাব বিনিময় ছাড়াই তাদের সামনে সোফায় বসে। খামটা বের করে সেন্টার টেবিলে রাখলো। খামে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের লোগো জ্বল জ্বল করছে।
আরিয়ান, রুবি, আনিকা এমনকি রূপ-নয়নও হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। কেউ কোনো কথা বলছে না। আনিকা খামটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলো। খুলে ভেতরের কাগজটা বের করতেই চোখ দুটো চকচক করে ওঠে। বিস্ফোরিত কণ্ঠে বলে,
“ভোরের ন্যাশনাল টিমে সিলেকশন হয়ে গেছে! ওয়াও! এটা আন এক্সপেক্টেড ছিলো। এতো দ্রুত হবে কেউ ভাবতেও পারে নি।”
আরিয়ানের মুখেও হাসির ঝিলিক। সে মেয়ের হাত থেকে খাম ছিনিয়ে নিয়ে পড়া শুরু করে। আবেগঘন কণ্ঠে বলে, “আমি জানতাম! আমাদের ভোর একদিন অনেক বড় ক্রিকেটার হবে। তাই তো ভাইয়ের বিরুদ্ধে গিয়ে আমি আর আম পাতা জোড়া জোড়া কোচিংয়ে ভর্তি করিয়ে দিলাম। ওর খেলার ধরণ দেখেই বোঝা যায় যে কোনো ওলি গলির খেলোয়াড় সে নয়। এজন্যই আমি বারবার ওকে এপ্রিসিয়েট করে গেছি যাইই হোক ক্রিকেট ছাড়িস না।”
রুবির চোখ মুখও উজ্জ্বল। আরিয়ানের হাত থেকে খাম নিয়ে পড়ে বলে, “এটা তো অনেক বড় সুখবর। ইয়া আল্লাহ! বড় ভাবী আমাকে বলেই নি।”
“আমার ফোর টোয়েন্টি ছেলেটা এখন দেশের সম্পদ। হি ডিড ইট। কালকের খবরের পাতায় তাঁর নামটাও ছাপানো হবে। যাইহোক আমি দেখাতে এসেছিলাম আমার কলিজা ফেলনা নয়। যে যখন খুশি, যেভাবে খুশি অপমান করে বেড়াবে। পড়াশোনায় অষ্টরম্ভা, ভবিষ্যত নেই, ওলি গলিতে খেলে বেড়ানো বখাটে ছেলে, কোনো ক্লাস নেই, বাপের টাকা ছাড়া উপায় নেই। কত জনের কত কথা!”
অরুণ সরকার কথা বলার সময় ছাড় দিলো না। সুজন ততক্ষণে ডেজার্ট আইটেম গুলো সেন্টার টেবিলে এনে রেখেছে। আনিকা উঠে এসে চাচার পাশে বসে বলল, “কে বলে এসব ফালতু কথা!”
অরুণ সরকার হাসলো। ভাতিজির মাথায় হাত রেখে বলল, “তুমিও তো ছেড়ে কথা বল নি আনিবুড়ি!”
আনিকা অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, “চাচ্চু আমি কবে…”
“থাক না এসব কথা! মিষ্টি মুখ করো! মিনু আপা কোথায়? তাঁকে জানিয়ে যাই তাঁর আঁচল ধরে ঘুরঘুর করা ছেলেটা এখন দেশে বিদেশে ঘুরবে।”
অরুণ সরকার একটা মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে মিনুর কাছে যায়। মিনু সব শুনে আনন্দে কান্না করে দেয়। তাঁর ভোর বাবাটা কত্তবড় হয়ে গেছে! অরুণ হেসে বলে,
“আমাদের ছোট্ট কুঁড়েঘর গিয়ে ছেলেটাকে দোয়া করে আসবেন কিন্তু মিনু আপা। সাথে ছোটবেলার মতোই নজর কাটিয়ে দিবেন।”
মিনু সায় জানালো। অরুণ সরকার সুফিয়াকেও সংবাদ দিলো। মিষ্টির প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে আমন্ত্রণ জানালো। তারপর ড্রয়িংরুমে ফিরে আসে। কিছু কথা বলে ফিরে যাবে নিজ নীড়ে। পাতাবাহারকে খবর দিতে হবে না? আচ্ছা কিভাবে সংবাদটা জানানো যায়? হুট করে সারপ্রাইজ পেয়ে মেয়েটা ফিট খেয়ে যাবে না তো? যেতেও পারে! উল্টোপাল্টা ভাবনার মাঝে ফোনটা বেজে ওঠে। অচেনা নাম্বার দেখে কেটে দেয়। কিন্তু পরপরই আবারও কল আসে। অরুণ সরকার হেলা করতে পারলো না। রিসিভ করে কানে ঠেকালো!
“হ্যালো…জি, অরুণ সরকার বলছি… কি হয়েছে?”
—————
জোৎস্নায় জ্বল জ্বল করা অম্বর জুড়ে আকস্মিক কালো মেঘমদুর আগমন। চাঁদের আলোয় মিটমিট পরিবেশ ছেয়ে যায় আঁধারে। হুট করে ভেসে আসা দমকা হাওয়ায় গাছের পাতা নড়ে। পেঁচার ডাক শোনা যায়। আজকের রাতে জন্য পাতা প্রহরকে নিয়ে অরুণিতার ঘরে শুয়েছে। বাড়িতে আজ তাঁরা তিনজন। চারদিকে কেমন অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় পাতার ঘুম আসে না। মনটা কু ডাকছে। পেটের ভেতরে চিনচিনে ব্যথা উঠছে। মনে হচ্ছে খুব খারাপ কিছু হতে চলেছে! তাঁর ভয় হয়! ভোর তো কখনোই এতো দেরি করে না। বাড়ি না ফিরলে ফোন করে জানিয়ে দেয়, টুটুলদের বাড়িতে থাকবে। কিন্তু এ যাত্রায় তাঁকে জানালো না।
ভোরের বাবা ‘কাজ আছে, রাতে ফিরতে দেরি হবে’—জানিয়ে কল কেটে দিলো। পরে ম্যাসেজ করে জানায় ভোর নাকি ওনার সঙ্গেই আছে চিন্তা না করতে। কিন্তু সে চিন্তা না করে থাকতে পারছে না। অদ্ভুত ভয়েরা জেঁকে ধরেছে।
পাতা ছেলে মেয়ের দিকে তাকায়। একে অপরের গলা জড়িয়ে নির্বিঘ্নে ঘুমে কাত। সে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। একসময় শান্ত ফোনটা বেজে উঠলো। ভোরের বাবা কল করেছে। রিসিভ করতে গমগমে ভারিক্কি আওয়াজ ভেসে আসে,
“দরজা খুলো।”
পাতা মোবাইল থেকে কান সরিয়ে কান খাঁড়া করে। কলিং বেল বাজালো কেউ। পাতার সমস্ত দুশ্চিন্তা গায়েব, “এক্ষুনি আসছি। দুই মিনিট দাঁড়ান!”
“সাবধানে।”
কল কেটে যায়। পাতা ওড়নায় গা ঢেকে নেয়। বাপ ব্যাটা দুটোরই কান মুলে দিবে আজ। কোন রাজ্য উদ্ধার করতে গিয়েছিল শুনি? সে আস্তেধীরে মূল ফটকে পৌঁছায়। দরজা খুলে দিতেই ফর্মাল পোষাকে পতি মহাশয়ের দেখা মিলে। পাতা রাগ দেখিয়ে বলে,
“কটা বাজে হুশ আছে নবাবের? রাত আড়াইটা বাজে। একটু পরে ফজরের আজান দিতো। ফেরার কি দরকার ছিল শুনি? সকাল সকাল আবার বের হতেন কি-না! আর নবাব পুত্তুর কই? ওনার কি কাজ ছিলো শুনি? কক…”
পাতা থেমে যায়। কোটরে থাকা চোখ দুটো বেরিয়ে আসার উপক্রম। এই মেয়ে কে? সে অরুণের দিকে তাকায়! লোকটার মুখের নকশা বলে দিচ্ছে ঘটনা একটা ঘটে গেছে। পাতা কৎ শব্দে ঢোঁক গিলে আবারও ছেলের দিকে তাকায়। একটা ক্ষতবিক্ষত মেয়েকে পাজা কোলা করে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়ের মুখটা দেখা যাচ্ছে না। পাতা দেখার চেষ্টাও করলো না। তার নজর তো ছেলের অসহায় মুখটার দিকে। বিড়াল চোখ দুটো টলমলে! পাতা ভাবতে পারে না। মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে তাঁর। আলগোছে শরীর ছেড়ে দেয়। এটা স্বপ্ন হোক!
·
·
·
চলবে……………………………………………………