ভাব তরঙ্গ - পর্ব ২০ - বেলা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

ভাব তরঙ্গ - বেলা শেখ
          রাত দশটা বেজে ছয় মিনিট। সরকার বাড়ির পরিবেশ গরম। বাড়ির সবচেয়ে ছোট সদস্য নিখোঁজ। নিস্তব্ধ ড্রয়িংরুমে মাম্মামের হাউমাউ কান্নার রোল। ভাই মা’কে বাহুডোরে আবদ্ধ করে সান্ত্বনা দিচ্ছে। পাপা আর চাচ্চু একই বাড়ির আঙিনায় লাগানো প্রতিটি সিসিটিভি ফুটেজ বারবার দেখে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ফোনে কারো সাথে কথা বলছে। চাচি, আনিপু আর রূপ চুপচাপ বসে। সবার মুখেই চিন্তার প্রতিফলন। কোথায় গেলো ফরফর করা তোতা পাখি! সিসিটিভি ফুটেজ অনুসারে বাড়ির বাইরে তো যায় নি, দারোয়ানের নজরেও পরে নি। বার্থডে কেক কাটার সময়ও তো এখানেই ছিলো। হুট করে কোথায় চলে গেলো? বাড়ির প্রতিটি আনাচে কানাচে চিরুনি অভিযান চালিয়েও দেখা মেলেনি প্রহরের। তাহলে গেলো কোথায়! প্রায় দশ ঘণ্টার মতো নিখোঁজ রয়েছে। পুলিশকেও ইনফর্ম করা হয়ে গেছে। পুলিশ খুঁজে চলেছে শহরের অলিগলিতে। ভাবতে ভাবতেই অরুণিতার কিছু খেয়াল আসে। সে কেক কাটছিল তখন। মাম্মাম, পাপা, ব্রো তাঁর পাশেই ছিলো। প্রহরকে সে ইচ্ছে করেই ডাকে নি, হিংসার বশবর্তী হয়ে। গত বার্থডেতে কেক কাটার সময় প্রহর বলেছিল, ও কেক কাটতে চায়। পাপা ছুরি ওর হাতে দিয়ে দুজনে মিলে কাটতে বলেছিল। সে অভিমান করে বলেছিল, তুমিই কাটো। প্রহর খুশিতে গদগদ হয়ে একাই কেক কেটেছিল আর সবাইকে খাওয়াচ্ছিলো। যেন বার্থডে ওরই।

“আজ থেকে বাড়িতে কোনো বার্থডে পালন হবে না। প্রতিটি বার্থডেতে ছোট বড় কোনো না কোনো ধেয়ে বিপদ আসবেই। কুফা দিন।”

পাপার কথায় অরুণিতার হৃদয় ব্যথিত হয়। ইনডিরেক্টলি পাপা প্রহরের নিখোঁজ হওয়ার জন্য তাকে দোষী ঠাহর করছে কি? জন্মদিন নাকি স্পেশাল হয় আর পাপা ‘কুফা দিন’ বলে ঘোষণা করে দিলো। অরুণিতার মুখটা থমথমে হয়ে আসে। বুকে হাত ভাঁজ করে এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকে সে।

ঘড়ির কাটা এগারোটা ছুঁই ছুঁই। সবাই চিন্তায় মূর্ছা যাওয়ার পথে। মাম্মামের তো কয়েকবার দাঁতে দাঁত লেগে গিয়েছিল। এখন চাচিমণির কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে গুনগুন করে কেঁদে প্রহরকে ডাকছে। চাচিমণি মাথায় হাত বুলিয়ে অভয় দিচ্ছে।

এমনই সময় পায়ের শব্দে অরুণিতা সিঁড়ির দিকে তাকালো। চোখের আকার বড় হয়ে আসে নিমিষেই। বিস্ফোরিত স্বরে ডাকে, “ওলাফ!”

তাঁর ডাকে ড্রয়িংরুমের সবাই প্রহরের দিকে তাকায়। দুই হাতে চোখ ডলতে ডলতে নিচে নামে প্রহর। হামি তুলতে তুলতে ড্রয়িংরুমের দিকে আগায়। পাতা ছুটে যায় তাঁর কাছে। দুই হাতে জড়িয়ে অজস্রবার ঠোঁট ছুঁয়ে দেয় সারা মুখটায়, সারা বুকে। কাঁন্না বিজড়িত কণ্ঠে বলে,

“ও বাবা, কোথায় ছিলে তুমি?”

মায়ের কান্নায় প্রহর ঠোঁট উল্টায়। বলে, “আমি রাগ করেছি তোমাদের সাথে!”

পাতা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে।, “এমনটা কেউ করে? তুমি জানো আমি কতটা ভয় পেয়ে ছিলাম, মরেই যেতাম আরেকটু হলে। কোথায় ছিলে হুঁ?”

প্রহর মায়ের ভেজা গাল মুছে দেয় নিজ ছোট হাত দিয়ে। কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, “আলমারিতে লুকিয়ে ছিলাম। কখন ঘুমিয়ে গেছি মনে পড়ছে না। ওখানে অনেক গরম। তোমরা আমাকে বের করে বিছানায় কেন নিয়ে যাও নি?”

পাতার কান্না বাড়ে। হুঁ হুঁ করে কেঁদে বলে, “পঁচা ছেলে, আমরা কি জানতাম তুমি আলমারিতে লুকিয়ে আছো। এদিকে তোমাকে হন্ন হয়ে খুঁজছে সবাই। পুলিশ ফোর্স লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর উনি আলমারিতে লুকিয়ে ছিলো। ও আল্লাহ, আমি আমার পাগল ছেলেটাকে নিয়ে কোথায় যাই।”

—————

ছেলেকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিজ ঘরে বসে আছে পাতা। কারো কাছেই দিচ্ছে না। ছেলের বাপের কাছেও না। অনেক ভয় পেয়েছিল সে। হুট করে কোথায় যাবে কলিজার টুকরোটা!

অরুণাভ সোফায় পাশে বসে ছোট ভাইয়ের সাথে টুকাটাকি কথা বলছে। অরুণিতা ঘরের দরজায় বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে। পাপাকে ভেতরে আসতে দেখে পাশ কেটে যাবার জায়গা করে দিলো।

অরুণ সরকার ঘরে এসে প্রহরকে চায়। পাতা দেয় না বিধায় একপ্রকার জোরজবরদস্তি নিজের দখলে নিয়ে নেয় প্রহরকে। অশান্ত বুকটা একটু হলেও শান্ত হয়। ছেলের কপালে, গালে, ঠোঁটে থুতনিতে ছোট ছোট চুমু দেয়। আদর করে ডাকে,

“আমার অবেলার প্রহর, ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে আমাদের। আরেকটু হলে পাপা মরেই যেতো…!”

“আব্বু?” অরুণ সরকারের কথা শেষ হতে না হতেই অরুণাভ চাঁপা স্বরে রাগ প্রকাশ করে। অরুণ হেসে বড়ছেলের পাশে বসে। প্রহর বাবার গলা জড়িয়ে বলে, “পঁচা কথা কেন বলো?”

“আচ্ছা বাবা ভুল হয়েছে। আমার ছেলেদের একা ফেলে মরে যাবো নাকি? আল্লাহ পাক আমাকে সবসময় তাদের পাশে থাকার তৌফিক দিক।”

প্রহর মিষ্টি করে হাসলো। অরুণ সরকার টুপ করে ছেলের ঠোঁটে চুমু এঁকে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “আলমারিতে লুকিয়ে ছিলে কেন?”

দরজায় দন্ডায়মান অরুণিতার বুকটা ধড়াস করে উঠলো। একটু ভয় লাগলো বৈ কি! প্রহরের হাসিমাখা মুখে মুহূর্তেই নিকষ কালো মেঘের পসরা বসে। সে বোনের দিকে তাকিয়ে সহজ-সরল অভিমানী স্বরে বলে,

“আমরা হ্যাপি ফ্যামিলি না বলো পাপা?”

অরুণ সরকার ছোট ছেলের নজর পরখ করে মেয়ের দিকে তাকায়। কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারলো সে। 

“হ্যাঁ, উই আর আ হ্যাপি ফ্যামিলি।”

“আমাদের হ্যাপি ফ্যামিলিতে কয়জন মেম্বার বল না পাপা?”

এবার অরুণাভ ছোট ভাইয়ের কথায় হেসে পাঁচ আঙুল দেখিয়ে বলল, “ওনলি ফাইভ মেম্বারস। পাপা, মাম্মাম, ভাইটুস, আপুনি আর স্নো কিড ওলাফ।”

প্রহর ভাইয়ের দিকে টলমল চোখে চেয়ে জিজ্ঞাসা করে, “তাহলে কেক কাটার সময় ফোর মেম্বারস কেন ছিলো?”

অরুণাভ গালে জিভ ঠেকায়। বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে মা, বাবা ও বোনের দিকে তাকায়। ইশ্ এতোবড় ভুল কি করে হয়ে গেলো! প্রহর নাক টেনে টেনে বলল, 

“আপুনি পাপা মাম্মাম ভাইটুস সবাইকে ডাকলো, শুধু আমাকেই ডাকলো না। সবাইকে কেক খাওয়ালো; পাপা, মাম্মাম, ভাইটুস, চাচিমণি ,চাচ্চু, ফুপ্পি, আনিপু, রূপ ভাইয়া, নয়ন ভাইয়া, মিনু খালা, সুফিয়া খালা, আভারি কাক্কু, আরাফকেও খাইয়েছে! শুধু আমাকে দিলো না কেক। আপুনি আমাকে ভালোবাসে না।”

অরুণ, পাতা, অরুণাভ সবাই অরুণিতার দিকে তাকিয়ে। অরুণিতার মুখটার রং উড়ে যায়। সে থমথমে গলায় বলে, “আই ফরগট!”

“ইয়্যু ফরগট?” 

অরুণিতা বাবার দিকে তাকায়। কথার টোনটা কেমন যেন শোনালো। সে কিছু বললো না। অরুণ সরকার প্রথমবারের মতো মেয়ের উদ্দেশ্যে ঝাঁঝালো কণ্ঠে প্রশ্ন করলো, “তুমি তোমার ছোট ভাইকে ভুলে গিয়েছিলে? যেখানে তুমি সব্বাইকে কেক খাইয়েছো।”

অরুণিতা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। তাঁর বলতে ইচ্ছে করে, ভুলে তো তোমরাও গিয়েছিলে? এখন দোষ আমার দিকে কেন ঠেলছো? সে কপালে বিরক্তের ভাঁজ ফুটিয়ে নজর সরিয়ে নেয়। দৃষ্টি ফুলদানিতে শোভা ছড়ানো শুভ্র গোলাপ গুচ্ছে। 

“স্পিক আপ অরুণিতা?”

“ফাইন। আ’ল গেট দ্য কেক ফ্রম দ্য ফ্রিজ। গো ফিড ইয়্যুর বিলাভড সন বিফোর হি কজেস মোর কেওস।”

“অরুণিতা?”

অরুণ সরকার বাজখাঁই গলায় ধমকে ওঠে। অরুণিতা কেঁপে উঠল। বিড়বিড় করে বলল, “আদারওয়াইজ পানিশ মি!”

না কোনো অনুতাপ খুঁজে পাওয়া গেলো না মেয়ের মাঝে। অরুণ সরকার আহত চোখে চাইলো। এদিকে প্রহর ভয়ে ভীত হয় বাবার কোলে পড়ে আছে। পাপা আপুনিকে বকবে জানলে সে কক্ষনোই বলতো না। সে মিনমিনে সুরে বলে,

“পাপা আপুনিকে বকিও না। আপুনি অনেক ভালোবাসে আমাকে।”

অরুণিতা ফিরেও চাইলো না প্রহরের দিকে। নাটক রচিয়ে এখন ভালো মানুষ সাজা হচ্ছে। পাতা ছেলের কথায় ডুকরে কেঁদে উঠলো। কাঁদতে কাঁদতেই অরুণের উদ্দেশ্যে বলল, 

“কতটা পাষান হৃদয়ের দেখলেন? আমার ছেলেকে দুচোক্ষে সহ্য করতে পারে না। আর আপনি বলেন ভালোবাসে শুধু প্রকাশ করে না। এই তাঁর ভালোবাসা? পাঁচ বছর চলে, আজ পর্যন্ত কোলে নেয় নি। একটা চুমু পর্যন্ত খায় নি। আমার ছেলেটা আপুনি বলতে পাগল। ঘুরে ফিরে ওঁর কাছেই যাবে। কিন্তু ও দূর ছাই করে তাড়িয়ে দেয়। কখনো আদর করে নাম ধরে ডেকেছে কি-না সন্দেহ। প্রহরের প্রতি ওঁর বিরূপ আচরণের কথা, আমি বারবার বলেছি আপনাকে। আপনি ছোট মানুষ বলে এড়িয়ে গেছেন। কিছু না বলে নীরবে প্রশ্রয় দিয়ে গেছেন। ও প্রহরকেই মেনে নিতে পারে নি আরেকজনকে কিভাবে মানবে? আমি ভেবেছিলাম মনকে শক্ত করে নিবো, আনবো তাঁকে দুনিয়ায়। কিন্তু সব মনোবল ভেঙে গেছে। আমি বেবি ক্যারি করবো না ভোরের বাবা।”

পিনপতন নীরবতা ভেসে গেলো কামরায়। অরুণাভ চকিত ভঙ্গিতে মাথা তুলে মায়ের দিকে তাকায়, তারপর বাবার দিকে। কিছু পল নীরবে কেটে যায়। হঠাৎ অরুণিতা বিড়বিড় করে বলল, “ওয়াও! আবারও বেবি… ইন্টারেস্টিং… ভে…রি ইন্টারেস্টিং!”

তাঁর বিড়বিড় সুর পাতা অরুণের কানে ঠিকই পৌঁছায়। একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। পাতা বুঝতে পারে ঝোঁকের বশে সব বলে দিয়েছে সে। অবশ্য লুকানোর কি আছে। একদিন না একদিন তো জানাতেই হতো। অরুণ সরকার খানিকটা ধমকের সুরে বলে, 

“অরুণিতা, বিহেভ ইয়্যুর সেল্ফ।”

“আ’ম বিহেভিং ভেরি ওয়েল। কনগ্রেচুলেশন ফর ইয়্যুর আপকামিং বেবি। ইউ’আর সো রিচ! হোয়াই উড ইট ম্যাটার ইফ আ ডাজন মোর কিডস কেইম অ্যালং?” 

অরুণ সরকারের জীবনে সবচেয়ে বড় লজ্জা তাঁর মেয়েই তাকে দিলো। সে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলে। নত হয় মস্তক। পাতা মেয়ের বেয়াদবি সহ্য করতে পারলো না। উঠে আসে মেয়ের গাল লাল করতে। তবে নাগাল পায় না। বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে অরুণিতাকে সরিয়ে নেয় তাঁর বড় ভাই। দুই হাতে বুকে জড়িয়ে আগলে রাখে। পাতা শান্ত হয় না। মারমুখো হয়ে এগিয়ে আসে। অরুণাভ বোনকে আড়াল করে অনুনয়ের সুরে বলে,

“আম্মু, প্লিজ শান্ত হও। বাচ্চা মানুষ মুখে যা এসেছে বলে দিয়েছে। আ’ম সো মাচ হ্যাপি ফর ইয়্যু, ফর মায় আপকামিং ভাই ওর বোনু! ও আম্মু জাননন প্লিজ না?”

পাতা হুট করেই শান্ত চোখে চায়। চোখ দুটোই আবারও আঁধার ঘনিয়ে আসছে। মাথা চক্কর দিতে চায়। হালকা পাতলা শরীর টলমল করছে। এই তো শরীর ছেড়ে দিলো বলে। অরুণ সরকার ছেলেকে কোল থেকে নামিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসে। পাতা তাঁর বাহুতে এসে পড়ে। অরুণাভ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বাবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বলল,

“ভেবেছিলাম তোমাকে দাদা বানাবো, আমি বাবা হবো। কিন্তু পাশা উল্টে তুমি বাবা হয়ে আমাকেই দাদা বানিয়ে দিলে। দ্যাটস টোটালি আনফেয়ার আব্বু।”

"মজা হচ্ছে?"

অরুণাভ ডানে বামে মাথা নেড়ে বলে, "একচুয়ালি আব্বু গুড নিউজটা মিষ্টি মুখ ছাড়া হজম করতে কষ্ট হচ্ছে। আমি আর ভাবুক চড়ুই বরং মিষ্টি মুখ করে আসি।"

অরুণাভ বোনকে নিয়ে ঘর ছাড়ে। দরজার কাছে গিয়ে কি মনে করে থেমে যায়। পিছু মুড়ে বাবার উদ্দেশ্যে বলে, "আব্বু টেইক ইট ইজি। আ'ম হ্যাপি যে আমি আরেকটা চড়ুই ছানার ভাই হবো। আমাদের পরিবারে ওলাফের চেয়েও ছোট্ট আরেকটা সদস্য আসবে। সেই আদুরে ছানাটিকে আমি অনেক ভালোবাসবো।"

অরুণ সরকার শান্ত চোখে ছেলের প্রস্থান দেখে। তাঁর একরোখা, রাগী, জেদী, হিংসুটে ছেলেটা এতো দ্রুত বড় হয়ে গেলো কেন? অরুণিতার মতো সেও তো রিয়্যাক্ট করতে পারতো! তাহলে এতো ভালো কেন হলো? অরুণ সরকার বাহুডোরে থাকা পাতার দিকে তাকালো। কপালে পড়ে থাকা অবাধ্য চুল গুলো সরিয়ে ঠোঁট চেপে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে আছে অরুণিতা। অরুণাভ সামনে দাঁড়িয়ে বোনের মাথায় নবরত্ন তেল মালিশ করে। গরম মাথা যদি একটু জুরোয়! 

"ভাবুক চড়ুই?"

অরুণিতার সাঁড়া শব্দ নেই। অরুণাভ তেল মালিশ অব্যহত রেখে বলে, "একদিন আব্বু বললো, কলিজা তোমার আম্মুর টাম্মিতে তোমার একটা ভাই বা বোন আছে। খুব শিঘ্রই সে তোমার কোলেও থাকবে। তুমি কি তাঁকে আদর করবে? আমি অনেক হ্যাপি হয়েছিলাম। পরে আমার মনে হলো আম্মুর বেবি আসলে তো ভোরকে সবাই ভুলেই যাবে। সবাই বেবিটাকে আদর করবে, ওকে ভালোবাসবে। তখন আমার মন খারাপ হয়ে যায়। আব্বুকে বললে আব্বু আমাকে আদর করে বলেছিল, এখন তো তোমাকে আমি আর তোমার আম্মু ভালোবাসি। যখন তোমার বোন বা ভাই আসবে সেও তোমাকে ভালোবাসবে। তোমাকে ভাইয়ু বলে ডাকবে। তোমার সাথে খেলবে, তোমার হাত ধরে ঘুরবে, তোমাকে যখন আমি বকবো তখন সে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে বলবে, আমার ভাইকে বকু কেনু?"

অরুণিতা ভাইয়ের দিকে তাকালো। অরুণাভ তাঁর বোচা নাক চেপে ধরে বলল, "তারপর আব্বুর কথা সত্যি হলো। আমি সুন্দর কিউট একটা বোনু পেলাম। যে আমাকে ভালোবাসে। আর বোনু আসায় আমার প্রতি আব্বু আম্মুর ভালোবাসা একটুও কমে নি। আর কমবেও না..."

"কারণ তুমি স্পেশাল। তাদের বড় সন্তান। বড়রা সবসময় বেশিই আদর ভালোবাসা পায়। ছোটরা তো সকলের চোখের মণিতে থাকে। কিন্তু মিডলকে সবাই ভুলে যায়। ওই বেবি আসুক তখন তোমাদের আদরের ওলাফও বুঝবে। তাঁর হাল আমার মতোই হবে। কারণ তখন সে আমার মতোই মিডল চাইল্ড হবে।"

অরুণিতা দীর্ঘক্ষণের নীরাবতার ব্রত ভাঙলো। অরুণাভ বোনের চুলে চিরুনি করে দুই ভাগ করে নেয়। একপাশের চুল গুলো মুঠোয় ভরে বিনুনি করতে করতে বলে, "কি সব বাচ্চামো কথাবার্তা! বাবা মায়ের কাছে সব সন্তানই সমান। তাঁরা সবাইকেই সমান ভালোবাসা দিয়ে থাকে। না কম না বেশি!"

"এটা ভুল! নানু কেন লতা খালামুনি আর মামুকে বেশি ভালোবাসলো আর মাম্মামকে অবহেলা করলো? আমাদের মধ্যেও তো পাপা তোমাকে বেশি ভালোবাসে। তুমি সৎ ছেলে হলেও মাম্মাম আমাদের চেয়ে তোমাকেই বেশি ভালোবাসে।"

অরুণাভের হাত থমকায়। অবিশ্বাস্য চোখে বোনের মুখপানে তাকায়। চোখাচোখি হয় ভাই-বোনের। অরুণিতা চোখ মুখ খিঁচে নেয়। মিনমিন করে বলে, “আ'ম স্যরি ব্রো। আই ডিডন্ট মিন এনিথিং বাই ইট।”

অরুণাভের মুখটা ম্লান হয়ে আসে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে তপ্ত শ্বাস ফেললো, "ইটস্ ওকে। আই ডোন্ট মাইন্ড!" মুখে এটা বললেও ‘সৎ ছেলে’ কথাটা তাঁকে গভীরভাবে আহত করেছে। এমন করে তো বাইরের মানুষও কখনো বলেনি। আচ্ছা ভাবনাকে এসব কে বলেছে?

"রং টাইম রং টাইম!" 

 অরুণিতা দরজার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করছে। অরুণাভ বোনের থমথমে চাহনি অনুসরণ করে দরজায় তাকায়। বাবাকে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে। মুখ দেখে বোঝা যায় সবটাই শুনে নিয়েছে। সে শান্ত সুরে বলল,

"আব্বু, আমরা ভাই-বোন কথা বলছি। তুমি যাও এখান থেকে। একটা কথাও বলবে না, যাও?"

অরুণাভ যেন বাবাকে শাসন করলো। অরুণ সরকার শুনলো না। সে এগিয়ে এসে মেয়ের উদ্দেশ্যে বলে, 

"অরুণিতা ছোট তুমি, তাই ছোটদের মতোই বিহেব করবে। আমি যেমন বেহাদ ভালোবাসতে জানি শাসনও করতে জানি। অনুরোধ থাকবে এমন কিছু করবে না যাতে আমি রেগে যাই। আর একটু আগে যা বলেছো তা যেন দ্বিতীয়বার মুখ দিয়ে না বেরোয়।"

অরুণিতা বাবার দিকে তাকায়। রক্তিম চোখ দুটো টলমল করছে। পাপা তাঁর সাথে কখনোই এতো কঠিন গলায় কথা বলে নি। আজকেই প্রথম। সে সহ্য করতে পারে না। রাগে সব তছনছ করে দিতে ইচ্ছে করে। আজ তাঁর বার্থডে ছিলো। সবার ভালোবাসা পাওয়ার কথা ছিলো, এতো এতো গিফট পাওয়ার ছিলো। কিন্তু কি পাচ্ছে? সামান্য কেক নিয়ে এতো কিছু! সে কান্না জড়ানো কণ্ঠে আঁটকে আঁটকে বলে,

“আই ডিডেন্ট সে এনিথিং রং। ডোন্ট টক টু মি লাইক দ্যাট।"

অরুণাভ বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, "সত্যিই ভুল কিছু বলে নি। খারাপ লাগলেও এটাই সত্যি। তুমি প্লিজ কথা বাড়িও না। যাও তো এখান থেকে।"

"আমি না, তুমি যাও। ওর সাথে কথা আছে আমার।"

অরুণ সরকার ক্রোধিত সুরে বলল। অরুণাভ হাসলো, "দেখতে পাচ্ছো না আমি ভাবুক চড়ুইয়ের চুল বেঁধে দিচ্ছি? এখন না, পরে কথা বলিও। আমার বোনটার মাথা গরম আছে!"

শেষের কথাটা ফিসফিস করে কিছুটা হাস্যরসাত্মক সুরে বলল অরুণাভ। অরুণ সরকার মেয়ের দিকে তাকালো। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। বৃষ্টির পরমুহর্তে গোধূলী বেলায় পশ্চিম আকাশে লাল মেঘের দেখা মিলে। অরুণিতার রক্তিম টলমলে চোখ অরুণকে সে-ই দৃশ্যের সাথে পরিচয় করালো। সে গম্ভীর ভরাট গলায় অরুণিতার উদ্দেশ্যে বলল,

“ইয়্যু হার্ট ওলাফ, ইয়্যু হার্ট মায় কলিজা, ইয়্যু হার্ট ইয়্যুর মাম্মাম, ইয়্যু হার্ট মি। ইয়্যু’ল অ্যাপোলজাইজ টু দেম, আদারওয়াইজ ডোন্ট কল মি পাপা।”

—————

চোখ মেলে তাকালো অরুণিতা। রকিং চেয়ার ক্যাচর ক্যাচর শব্দ করে। গ্রিল বিহীন বারান্দায় অন্ধকারে বসে আছে সে। ঘড়ির কাঁটা দুটোর ঘর ছুঁই ছুঁই কিন্তু চোখ জোড়ার ঘুমের ছিটেফোঁটাও নেই। চোখের কার্নিশ বেয়ে কয়েক ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। দরজা খটখটানোর আওয়াজে চমকায়। এতো রাতে কে এলো তাঁর ঘরে? পাপা নাকি? অরুণিতা বাম হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে নেয়। ঠোঁট চোখা করে উষ্ণ শ্বাস ফেলে দরজা খুলে দিল। 

শর্টসের পকেটে হাত ঢুকিয়ে অরুণাভ সরকার দাঁড়িয়ে। টি শার্টে তাঁর আর ভাইয়ের ছোটবেলার ছবি। উপরে লেখা ‘ভোর & ভাবুক চড়ুই’। অরুণিতার হাসি পেল কিন্তু সে ভাইয়ের বুকে আছড়ে পড়ে হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠলো। অরুণাভ একহাতে বোনকে আগলে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বলে,

“কি হয়েছে তোমার? কাঁদছো কেন ভাবুক চড়ুই?”

অরুণিতা কিছু বলে না। অল্পক্ষণেই নিজেকে সামলে উঠে। অরুণাভ বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে। বোন তার সহজে কাঁদে না। খুব শক্ত মনের, আব্বুর মতোই । সেই মানুষ কাঁদলে ভালোলাগে?

“একটা স্যরি বললেই সব ঠিক হয়ে যাবে ভাবনা। কেন জেদ ধরে রেখেছো? তুমিও কষ্ট পাচ্ছো, আব্বুও পাচ্ছে।”

অরুণিতা বিছানায় বসে। টেডিটা বুকে জড়িয়ে বলে, “আমি কষ্ট পাই না। আ’ম ফাইন।”

“কিন্তু আব্বু তো পাচ্ছে।”

“কই? আমি তো দেখি নি কখনো। সে হাসিখুশিই আছে। এন্ড আই রিয়ালাইজ দ্যাট উইদাউট মি ইউ গাইজ আর ভেরি হ্যাপি। আ’ম দ্যা আউটসাইডার, প্রবলেম ক্রিয়েটর।”

“ভাবনা?”

অরুণিতা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রাখে। অরুণাভ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “কি সমস্যা তোমার?”

“আই হ্যাভ নো প্রবলেম, আ’ম দ্য প্রবলেম… দ্যা ব্যাড ওয়ান।”

“ভাবুক চড়ুই, মারবো কিন্তু?”

অরুণিতা কিছু বললো না। অরুণাভ এগিয়ে এসে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “ঘুমাও রাত জেগে থেকো না। ডার্ক সার্কেলে পেতনি লাগবে।”

অরুণাভ দরজা চাপিয়ে বোনের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। খোলা বারান্দায় এসে বেতের চেয়ারে গা এলিয়ে হতাশ সুরে বলল, “আম্মু ভুল কিছু বলে না। যেমন গাছ তাঁর তেমন ফল। বুক ফাটবে কিন্তু তাদের মুখ ফুটবে না।”

“কি বলে?”

“তোমার মেয়ে, তোমার জানার কথা কি বলেছে।”

অরুণ সরকার ল্যাপটপের সাটার বন্ধ করে ছেলের দিকে তাকায়, “তোমার বোন এবার বাড়াবাড়ি করছে ভোর।”

“ইয়্যু ওলসো আব্বু। তুমি একবার যাও ভাবনার কাছে। ও কেন ওর বাপ শুদ্ধ স্যরি বলবে।”

“আমি মাথা নোয়াবো? ভুল তোমার বোন করেছে। নত তাঁর হতে হবে।”

অরুণাভ চোখ উল্টিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করে। এই আব্বুও না। কথা যখন ইগো তাঁর সাথে কেউ পেরে উঠবে না। তবে এখানে ভুললে চলবে না প্রতিপক্ষ তাঁরই মেয়ে। এই ইগো ইগো খেলা কবে যে থামবে!

“মেয়েকে মাথা নোয়ানো শেখাওই নি তাহলে কি করে আশা করছো সে মাথা নোয়াবে? মাথায় তুলে বড় করেছো এখন এসব বললে চলবে?”

অরুণ সরকার ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে, “মাথায় তুলেছি, নিচেও নামাতে পারি!”

“ওহ্ আচ্ছা?”

ছেলের খোঁচায় অরুণ সরকারের মুখটা ভোঁতা হয়ে আসে। তা লুকাতে আবারও ল্যাপটপে মুখ ডোবায়। অরুণাভ বাবার দিকে তাকিয়ে ডাকলো,

“আব্বু?”

“হ্যাঁ আব্বু, বলো?”

সাঁড়া না পেয়ে অরুণ ছেলের মুখের দিকে তাকায়। কাঁধে হাত রেখে শুধায়, “কি হয়েছে কলিজা?”

অরুণাভ ঠোঁট বাঁকিয়ে ঈষৎ হাসলো। বলল, “কিছু না।”

পরদিন প্রত্যুষে অরুণাভ সরকার জগিংয়ের জন্য বের হয়। গেইটের দুই প্রান্তে দুই ইগোয়েস্টিক প্রাণী দাঁড়িয়ে আছে তাঁর অপেক্ষায়। কেউ কারোর দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। অরুণাভ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে এগিয়ে যায়।

“গুড মর্নিং গাইজ!”

“মর্নিং!” 

অরুণিতা সরকার আর অরুণ সরকার সমস্বরে বলে ওঠে। অরুণাভ দাঁত দেখিয়ে হাসলো।

“দেন…লেটস গোঁ ফর রান!”

এবার কেউই কিছু বললো না। অরুণাভ এগিয়ে এসে হাতে বোনের হাত পেঁচিয়ে টেনে নেয়, পাশ থেকে বাবাকে টেনে নিয়ে দৌড় শুরু করে করলো। মিনিট ক্ষণ দৌড়ানোর পর অরুণাভ বোন আর বাবাকে পিছন ফেলে দূরে চলে যায়। দুজন একসাথে থাকুক একটু সময়। সে জানে বাবা মেয়েকে এক মিনিটের জন্যও চোখের আড়াল করবে না। ছায়া হয়েই থাকবে পাশে।

গতরাতে গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে গলির কাঁচা রাস্তায় পানি জমে আছে। অরুণাভ সতর্কতার সাথেই দৌড়াচ্ছিল। হঠাৎ এক সাইকেল আরোহীর সাইকেলের চাকা কাঁদা পানিকে নির্মমভাবে আহত করে। কাঁদতে কাঁদতে সে-ই কাঁদা পানি অরুণাভের গায়ে আছড়ে পড়ে। সাদা টি শার্ট, সাদা টাওজার, সাদা কেডস কাঁদা পানিতে নোংরা হয়ে গেলো। সাইকেল আরোহী পেছন ফিরে দাঁত দেখিয়ে বলে, 

“হা বন্ধ কর বাছাধন। মুখে মশা মাছির চৌদ্দ গুষ্টি ঢুকে যাবে। বায় দা চৌরাস্তা দেখে শুনে হাঁটতে পারিস না? গরুর মতো চোখ দুইডা উপর ওয়ালা উক্কামে দিছে?”

অরুণাভ ঠোঁটে ঠোঁট চাপে। একে তো চোরি তাঁর উপর সিনা জোরি! দোষ করে সেই দোষ অন্যের কাঁধে ঠেলছে, তুই তোকারি করছে, আবার জ্ঞান দিচ্ছে। সে দাঁত কটমট করে নিজেকে সামলে বলে, “তুই তোকারি কেন করছেন? আর দোষটা আপনার। দেখছেন পথচারী হাঁটছে, সাইকেল আস্তে টানবেন না? ননসেন্স পিপল। ”

সাইকেল আরোহী চলেই যাচ্ছিলো অরুণাভের শেষোক্ত সম্বোধনে পথ বদলায়। চুনোপুঁটির সাইকেল থেকে নিজ বিশাল দেহখানা নামায়। মাথা নেড়েচেড়ে গুন্ডা গুন্ডা ভাইব ফুটিয়ে বলে,

“গালি নাহি দেনেগা রে বাবা! কান কা নিচে মারুঙ্গা, ম্যাঁ ম্যাঁ করে লেজ গুটিয়ে পালাবি।”

অরুণাভের গম্ভীর কপালে বিরক্তের ভাঁজ। লোকটার মাথায় নির্ঘাত সমস্যা আছে! সে অত্যন্ত বিরক্ত সুরে বলল, “ভদ্রভাবে কথা বলুন।”

“নাহি বোলেগা, কেয়া কারেগা রে তু?” 

লোকটা এগিয়ে এসে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। অরুণাভের মেজাজ গরম হয়ে গেল নিমিষেই। নিশপিশ করা হাত মুঠোয় ভরে বলে, “ডোন্ট মক মি। ইয়্যু'ল রিগ্রেট ইট।”

মানবের কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজ পড়ে। নিম্ন ওষ্ঠাধর কামড়ে ধরে বলে, “খগেন আলী ইংরেজি ঝাড়ছস মানে ভালোই বলছস! কথা হলো কানের নিচে পড়ার আগে সালাম দিয়া ভাগ।”

আর সহ্য করা গেলো না। ওতটাও ভদ্র অরুণাভ নয়। তাঁর নিশপিশ করা হাত সামনের মানবের কলার চেপে ধরে। রাগে হিসহিসিয়ে বলে, “দুই টাকার গুন্ডা, আমার সাথে লাগতে আসিস? তোর মতো গুন্ডা আমি পকেটে নিয়ে ঘুরি রে! ভদ্রতা দেখাচ্ছিলাম আকাশে উড়ছিলি না? তোকে তো আমি..”

মানব কলারে থাকা যুবকের হাতের দিকে একপল চাইলো। যুবকের আপাদমস্তকে চোখ বুলিয়ে নিলো। কম বয়সী ছোকরা, উনিশ কি বিশ বছরের হ্যাংলা পাতলা যুবক। কাঁধের নিচে পড়ে আছে। তাঁর এত্তো তেজ! কপাল চুলকায় মানব। ইশারায় কাউকে দেখিয়ে বলে,

“তোর কপাল ভালো বুঝলি? তোকে বাঁচাতে দেখ কারা আসছে? আসলে সালাম দিবি কিন্তু!” হাতের ইশারায় দেখিয়ে বলল, “ওই যে ডান পাশের রাস্তায় সুন্দর করে মোটাতাজা বাচ্চা হাতিটাকে দেখতে পাচ্ছিস? বোচা নাক, মুখটা পেঁচার মতো বানানো। ওইডা আমাদের শেখ বাড়ির বউ। একমাত্র বউ বুঝলি? সবাই মাথায় তুলে রাখবে। আর বাচ্চা হাতিডার পেছনে বডিগার্ডের দায়িত্বে নিয়োজিত আমার শ্বশুর ভাই। মানে দুঃসম্পর্কের ভাই আবার শ্বশুরও লাগে। হেব্বি বড়লোক বুঝলি? সরকার জুয়েলারি ফ্যাশন হাউজের মালিক। যৌতুকে ফ্যাশন হাউজ আমার নামে লিখে নিবো ভাবছি।”

অরুণাভ কথা বলার মতো কিছু খুঁজে পেল না। কি বলছে টাকি এই লোক? মাথা খারাপ নাকি।

“কি হচ্ছে এখানে? অরুণাভ, সোহরাব?” 

অরুণ সরকার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। অরুণাভ মানবের কলার ছেড়ে কিছু বলবে সোহরাব শেখ তাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে আসে। ব্যথিত সুরে বলে, “আরে বড় ভাই, দুঃখের কথা আর কি বলবো! আজকালকার ছেলেমেয়েদের মাঝে ভদ্রতাবোধের চিহ্নমাত্র নেই। দেখেছেন কিভাবে বেয়াদবি করলো? দেশটা রসাতলে যাচ্ছে দিনকে দিন।”

অরুণাভ বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে অজ্ঞাত মানবের দিকে। অরুণ সরকার ভ্রু কুঁচকে ছেলের দিকে তাকায়। জিজ্ঞাসা করে, “কি হয়েছে?”

“ভাগ্নের সাইকেলটা নিয়ে দুই রাউন্ড দিচ্ছিলাম। রাস্তায় কাঁদা ছিল খেয়াল করিনি। দূর্ঘটনা ক্রমে এই খগেন আলীর গায়ে কাঁদা লেগেছে। তারপর থেকে শুনিয়েই যাচ্ছে শুনিয়েই যাচ্ছে। আমি একটু জবাব দিলাম ওমনেই মারতে এসেছে। আপনি না আসলে হয়তো গায়েও হাত তুলতো। আমি আবার ভদ্রলোক তো। কারো উপর চড়া গলায় কথা বলতে পারি না।”

অরুণিতা হাঁফাতে হাঁফাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। একবার সোহরাব নামক অ-প্রাণীর দিকে তাকায়। সোহরাব সকলের চোখ বাঁচিয়ে চোখ টিপে দেয়। অরুণিতা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। অরুণ সরকার ছেলের উদ্দেশ্যে বলল, “ভোর, এসব কি শুনছি?”

“আব্বু, হি’জ লায়িং! হি মকড মি ফাস্ট।”

সোহরাব চোয়াল চুলকায়। বা*লছা*ল এতো ইংরেজি ক্যান ঝাড়ে! তাঁর বুঝতে অসুবিধা হয় তো। আর খগেন আলী আব্বু ডাকলো না ওনাকে? এই রেহ! কেলো করেছে! সোহরাব গোল গোল করে তাকায় অরুণিতার দিকে। তাঁর চাহনিতে অরুণাভ বোনকে আড়াল করে দাঁড়ায়। বাবার উদ্দেশ্যে বলতে নেয়, 

“আব্বু জানো, এই অসভ্য লোক কি বলেছে? ভাবনাকে মোটাহাতি বল…”

“আরে ভাই, আগে বলবেন না এটা আপনার ছেলে? আমি তো চিনতেই পারি নি। ছোটবেলায় যখন দেখেছিলাম তখন তো কুমড়ো পটাস ছিলো। এখন খগেন আলী হয়ে গেছে। খেতে দেন না নাকি?”

পাছে গোপন তথ্য ফাঁস না হয়ে যায় সোহরাব এগিয়ে এসে অরুণাভের সাথে জোরজবরদস্তি কোলাকুলি করে সংবর্ধনা জানায়। নিজ পরিচয় জানায়। অরুণাভ সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে। অরুণ খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে তাকিয়ে সব অবলোকন করে। যা দেখেছে তাঁতে মনে হলো ভোর সোহরাবের উপর চড়াও হয়েছিল। ছেলে তাঁর একটু বদরাগী তবে অভদ্র নয়। তাঁকে না রাগালে তাঁর মতো ভদ্রছেলে দুটো নেই। আবার সোহরাবও তো ভদ্রলোক। ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে হয়তো! সোহরাব শেখ ভুজুং ভাজুং পড়িয়ে মুহুর্তেই সব সামলে নেয়।

—————

সোহরাব অরুণ সরকারের দাওয়াত গ্রহণ করে অরুণ সরকারের সাথে তাঁর বাড়ি পথে হাঁটছে। পেছনে ফিরতেই দুই ভাই বোনকে দেখতে পায়। মুখ দেখার মতো হয়েছে দুজনের। এখন তৃতীয় জনের অভিব্যক্তি দেখার পালা। সে গা জ্বালানো হাসি হেসে সামনে তাকায়।

বাঙলোর সামনে দাঁড়িয়ে সোহরাব শেখ মুগ্ধ হয়ে গেলো। রুচি আছে বলতে হবে! সাথে বস্তা বস্তা টাকাও! মাছ জালে ফাঁসাতে পারলে মাছসহ কয়েক বস্তা টাকা সেও নিয়ে যেতে পারবে। 

“সোহরাব, দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে আসো?”

সোহরাব মাথা নাড়লো। বাঙলোর নামফলকে ‘হাউজ ওফ পাতাবাহার’ নাম দেখে সে জিজ্ঞেস করে, “এই পাতাবাহারটা আবার কে?”

“আমার ওয়াইফ।”

সোহরাব শেখ মুচকি হেসে বলল, “বাহ্ বিষয়টা দারুণ তো।”

“ভেতরে চলো?”

অরুণ সরকার দরজা খুলে দিল। সোহরাব শেখ ডান পা বাড়ির চৌকাঠে রাখে। ভাবী জামাইয়ের গৃহপ্রবেশ হচ্ছে কেউ বরণ করবে না? মিষ্টি মুখ করাবে না নাকি? শ্বাশুড়ি আম্মা কোথায় আছে? সে ঘার ডলে অরুণিতার দিকে তাকালো।

“পা…পা”

ছোট বাচ্চার ডাক শোনা গেলো। চোখ ডলতে ডলতে নিচে নামছে। অরুণ সরকার পরিচয় করায়, “আমার ছোট ছেলে প্রহর সরকার। ডাকনাম ওলাফ।”

প্রহরের ঘুমে জড়ানো চোখ দুটো নিমিষেই চমচম আকার ধারণ করে। অরুণিতার ভয় হয়, বেফাঁস কিছু না বলে ফেলে। ভয় সোহরাবেও টুকটাক হয়। সে হাত নাড়িয়ে হাই বোঝায়। প্রহরের বুলেটের গতিতে চলা মুখ অবশেষে স্টেশন ছাড়লো,

“কালো ভাল্লুক! তুমি এখানে কি করছো?”

সোহরাবের মুখটা থমথমে হয়ে আসে। গায়ের রং নিয়ে কথা বললে তাঁর মেজাজ বিগড়ে যায়। 

“ছোট সরকার চিনো ওনাকে?” অরুণ সরকার জিজ্ঞাসা করে ছেলেকে।

সোহরাব নিম্ন ওষ্ঠাধর কামড়ে ধরে। প্রহর চটপটে সুরে বলে, “চিনি তো। উনি দুলাভ…”

“আমি সোহরাব শেখ। খরগোশ আই মিন আপনার ছেলে, মেয়ের সাথে এর আগেও দেখা হয়েছিল আমার। আপাদের বাড়িতে গিয়েছিল তো।”

সোহরাব শেখ অত্যন্ত ধূর্তামির সাথে জবাব দিয়ে ওলাফের জবান বন্ধ করে দেয়। আবারও উল্টোপাল্টা কিছু না বলে তাই বগলদাবা করে কোলে তুলে নিয়ে চটাস চটাস আদর করতে শুরু করে। প্রহর নাক মুখ বাঁকিয়ে নেয়।

অরুণাভ ফিসফিসিয়ে বোনের কানে কানে বলে, “এই বাঁদর লোকটাকে আগে থেকে চিনো তুমি?”

“সায়রা মিসের ওখানে দেখেছিলাম। পাপাও একবার পরিচয় করিয়েছিলো। লোকটা ক্ষ্যাত টাইপ। গ্রাম থেকে এসেছে, গাইয়া তো হবেই।”

অরুণিতাও ফিসফিস করে জবাব দিলো। অরুণাভ বলল, “তুমি নিজের ঘরে যাও। এই লেজ কাটা বাঁদর বাড়ি থেকে না বেরোনো পর্যন্ত ঘর থেকে বেরুবে না। বুড়ো ব্যাটার নজর ভালো না।”

অরুণিতা চোরা চোখে সোহরাবের দিকে তাকায়। পাপার মতোই হাট্টাগোট্টা মানুষ। যেমন লম্বা চওড়া তেমনি সুঠামদেহী। শুধু একটু কালো। 

“বাড়ির মালকিনকেই দেখতে পাচ্ছি না কোথায় সে? রান্নাঘরে নাকি?”

সোহরাবের প্রশ্নে অরণ সরকার বলল, “ঘুমিয়ে বোধহয়। ওলাফ, যাও মাম্মামকে ডেকে আনো।”

কালো ভাল্লুকের হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার সম্ভাবনা হাতছাড়া করে না প্রহর। এক লাফে কোল ছাড়ে। তবে কষ্ট করে মাম্মামকে ডাকতে যেতে হয় না। পাতাকে আসতে দেখা যায়। সোহরাবের চোখ পড়ে পাতার বাড়ন্ত পেটে। সে অরুণ সরকারের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, 

“বাড়িতে নতুন মেহমান আসবে দেখছি।”

“আল্লাহ পাক চাইলে।”

অরুণ সরকারের সংক্ষিপ্ত জবাব। অরুণিতার কেন যেন লজ্জা লাগে। লোকটা কি-না কি ভাবছে! সে আর একদন্ড দাঁড়ালো না। হনহনিয়ে চলে গেলো নিজ ঘরের দিকে। পাতা মেয়ের চলে যাওয়ার কারণ বুঝতে পারে। নিজেরও লজ্জা লাগে। বাড়িতে কেউ এসেছে জানলে সে নিচেই নামতো না। কিন্তু এখন এসে গেছে, ফিরে যাওয়া কেমন দেখায়। সে এগিয়ে আসতেই সোহরাব তাঁর উদ্দেশ্যে লম্বা সালাম দিলো। পাতা কিছুটা বিস্মিত হয় বলল, “আপনি ওই.. ওই যে স্কুটি… গাড়ি..!

“জি আমিই সেই। তবে সেদিন আপনাকে চিনতে পারিনি, আজ পেরেছি। আজকে আমাদের তৃতীয় সাক্ষাত। নাইস টু মিট ইয়্যু প্রিটি লেডি!”

সোহরাব অত্যন্ত বিনয়ী সুরে বলল। পাতা অবাক চোখে অরুণ সরকারের দিকে তাকায়। কি বলছে কি এই লোক? তাদের এটা দ্বিতীয় সাক্ষাত তো। সেদিন স্কুটি গাড়ির সংঘর্ষ আর আজ। অরুণ পাতাকে বসতে ইশারা করে বলে,

“এখানে বসো, আর ও রুস্তম আঙ্কেলের ছেলে সোহরাব। অরুণিতার জন্মের দিন এসেছিল তো। মনে নেই?”

পাতার মনে পড়ে একে একে। হেসে বলল, “মনে থাকবে না। তুমিই সেদিনের সেই বাঁদর ছেলেটা? পাঁচ বোনের একটা মাত্র আদরের ভাই।”

সোহরাব জিভে কামড় দিলো। পাতা সোফায় আলগোছে বসে বলল, “কেমন আছো?”

“আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ পাক ভালো রেখেছেন। আপনাকে দেখে আরো ভালো লাগছে। আপনার ভবিষ্যৎ বাচ্চার জন্য শুভকামনা।”

পাতা হুট করেই লজ্জা পেয়ে যায়। এরকম শুভকামনা সে অনেক পেয়েছে। কিন্তু অধিকাংশই খোঁচা মূলক। সোহরাব একগাল হেসে বলল, “আপনি লজ্জা কেন পাচ্ছেন?”

কথাটা যেন পাতাকে আরও লজ্জা দিলো। মুখটা কেমন রংহীন মনে হলো। সোহরাব শেখ হাস্যোজ্জ্বল মুখে প্রত্যুত্তর করলো, “আমার তিনটে ভাগ্নি আমার থেকেও বড়। তাহলে ভাবেন? আপনি অহেতুক লজ্জা পাচ্ছেন আপা। ”

অরুণিতা দোতলা থেকেই শুনতে পায়। পা থেমে যায় তার। রেলিং ধরে অবাক চোখে চায় সোহরাব নামক মানবের পানে। মামার চেয়ে ভাগ্নি বড় কি করে হয়? তাহলে কি!
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp