শাড়ির মধ্যে আয়নার সুতি, তাঁত, খাঁদি বা মনিপুরী শাড়ি পছন্দ। ঘুরেফিরে এগুলো পড়তে পড়তে কম্ফোর্ট জোনে পরিনত হয়েছে। তার সংগ্রহে বেশিরভাগ তারাই রাজত্ব করছে। সেবার মাহির তাকে একটা জামদানী শাড়ি উপহার দিল। তার ভাষ্যমতে এই শাড়িটা কারিগর তার জন্যই বানিয়েছে!
আয়না হতাশ হতে হতে ক্লান্ত। মাহির তার পুরো কালারবোর্ড বদলে দিয়েছে। আগে তার আলমারি ভর্তি থাকতো কালো, নীল, সবুজ, খয়েরী মাঝে সাঝে লাল রংয়ে। এখন মাহির গোলাপির মধ্য যতরকম শেড আছে খুঁজে খুঁজে তার সামনে হাজির করছে। প্রত্যেকটার রং ও বিবরণী জনাব জানেন। যেমন আজকেরটা ডাস্টি রোজ।
আয়না এই শাড়ির সাথে মিলিয়ে আরেকটু গাঢ় মভ শেডের ঘটি হাতার ব্লাউজ পড়েছে। হাতে কয়েকটা সোনালি চুড়ি ও গলায় একটা লকেট পড়েছে। পছন্দসই মেক-আপ করেছে। চুলের মাঝখানে সিঁথি করে চুল ছেড়ে রেখেছে। আজকাল নিজেকে নিয়ে আর নির্বিকার থাকা যায় না, সেজে-গুঁজে মাহির আহমেদকে অভিভূত করতে ইচ্ছে হয়, ভালো লাগে।
মাহিরের বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন ক্যাম্পাসের পাশেই বিশাল কনভেনশন হল। আজ সেখানে পা রাখার জায়গা নেই। চারিদিকে ব্যাচভিত্তিক রঙিন ব্যানার টাঙানো, চারদিকে থাকা হলদে লাইটের আলো জ্বলছে-নিভছে।
এক পাশে জাঁকজমকপূর্ণ ফটোবুথ, সবাই বন্ধুদের নিয়ে সেখানে ছবি তুলছে। লাউডস্পিকারে খুব কম ভলিউমে পুরনো দিনের গান বাজছে। পুরো হল জুড়ে চেনা-অচেনা মানুষের ভিড়।
তারা পুরনো বন্ধুর কাঁধে চাপড় মেরে গলা ফাটানো হাসিতে মেতেছে, কেউ ফোনে সেলফি তুলতে ব্যস্ত। আবার অনেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে নিজের বউ বা বাচ্চার সাথে বন্ধুদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।
ওপর ওপর দেখলে মনে হবে সবাই খুব খুশি, অনেকদিন পর দেখা হওয়ায় তাদের আড্ডা জমজমাট। কিন্তু এই ধরণের রিইউনিয়নের ভেতরে যে একটা নীরব তুলনা ও প্রতিযোগিতা চলে, সেটা একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়। কে কত বড় চাকরি পেল, কে ভালো বর পেল, কার পজিশন এখন কেমন, কার লাইফস্টাইল কতটা বদলে গেল - এই সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশগুলো বাতাসে ওত পেতে থাকে।
মাহিরের হাত ধরে হলরুমে ঢোকার পরেই আয়নার ভেতরটা একটু খচখচ করে উঠল। এই হাজারটা সেজেগুজে আসা মানুষের মাঝে ওর নিজেকে একটু আলাদা লাগছিল। অন্যদিক দিয়ে, মাহিরকে আজ না চেয়েও সবার খেয়াল করতে হচ্ছে। ইউনিভার্সিটির সেই মুখচোরা, সবসময় লাইব্রেরির কোণায় বসে থাকা স্কলারশিপ পাওয়া ছেলেটার সাথে আজকের এই স্যুটেড-বুটেড, আত্মবিশ্বাসী পুরুষটার তফাৎ আছে। ও হলের ভেতর ঢোকার পর থেকেই একের পর এক পুরনো ব্যাচমেট এসে ওকে ঘিরে ধরছে, হ্যান্ডশেক করছে, ক্যারিয়ার আর পুরনো দিন নিয়ে গল্প জুড়ে দিচ্ছে।
মাহিরের স্কুল-কলেজের তুলনার ভার্সিটি লাইফ ভালো কেটেছে। মেধাবী স্টুডেন্টের সাথে বুদ্ধি থাকলে সবাই সখ্যতা রাখতে চায়। তাই রিইউনিয়ন নিয়ে সে নিজেও আশাবাদী ছিল। সব স্বামীদের মতোন সেও চায় আয়না তাকে নিয়ে আরো জানুক ও জেনে মুগ্ধ হোক। আয়না তার টাই ঠিক করে দিল। তারপর বলল, কি ভাবছো?
মাহির বলল, কতোদিন পর সবাইকে দেখছি! নস্টালজিক লাগছে।
আয়না বলল, কি সুন্দর করে সবার শুধু ভালো দিকগুলো মনে রাখো তুমি! ব্যাপারটা চমৎকার।
মাহির বলল, চলো তোমাকে পরিচয় করিয়ে দেই। তোমার টায়ার্ড লাগলে বলবে, আমার তখন ফিরে যাবো। এখানে কোনো রেস্ট্রিকশন নেই।
প্রাথমিক পরিচয় পর্বের একটু পর আড্ডা স্বাভাবিক নিয়মেই ভাগ হয়ে গেল। ছেলেরা একদিকে গোল হয়ে দাঁড়াল আর মেয়েরা গিয়ে বসল একপাশের সোফা সেটের টেবিল ঘিরে। মাহির বন্ধুদের জোরাজুরিতে ওদিকের আড্ডায় আটকে গেল, আয়না তখন এসে বসল মেয়েদের সার্কেলে। এদের মধ্যে অনেকেই আয়নাকে আজ প্রথম দেখছে।
তাকে নিয়ে কৌতুহল তাই বেশি।
-ভাবী, আপনার দেশের বাড়ি কোথায়? মাহির ভাইয়ের সাথে বিয়ে হলো কতদিন? আপনি কি ঢাকাতেই থাকছেন এখন?
মাহিরের সোশ্যাল মিডিয়া থেকেও তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কম ধারনা পাওয়া যায়। হিয়ার এককালে অনেক পছন্দ ছিল মাহির। সেরকম পাত্তা না পেয়ে বেশ অপমানিত হতে হয়েছিল তাকে। এখন অবশ্য সেসব অতো মনে নেই, ক্যারিয়ারে বেশ উন্নতি করেছে সে। কিন্তু আজ বুকে একটা পুরনো ক্ষোভ জেগে উঠল। এই মেয়ের মধ্যে এমন বিশেষ কি তা জানতে ইচ্ছে হলো।
আয়নাও মৃদু হেসে ছোট ছোট উত্তরে আলাপ চালাচ্ছিল। পরিবেশটা বেশ বন্ধুতাপূর্ণই ছিল, যতক্ষণ না হিয়া হুট করে কফির কাপে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা আয়না, আপনি কোন ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছেন?
প্রশ্নটা শুনে আয়না এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল।
সে নিজের লাইফের কোনো চয়েস নিয়ে কখনো হীনমন্যতায় ভোগেনি, সে খুব ভালো করেই জানতো এই টেবিলে বসা বাকি মেয়েদের সাথে তার পড়াশোনার ব্যাকগ্রাউন্ডের আকাশ-পাতাল তফাৎ। এখানে যারা বসে আছে, তাদের প্রায় সবারই বড় বড় নামী ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যাচেলরস বা মাস্টার্স করা, কেউ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ভালো পোস্টে আছে, কেউ বিজনেস মালিক কেউবা আবার বিদেশে সেটেলড হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আয়না একটু ইতস্তত করল। তারপর শান্ত স্বরে বলল, আমি কখনো ইউনিভার্সিটিতে পড়িনি।
-ওহ! তাহলে কি ন্যাশনাল-ট্যাশনাল নাকি?
-না।
কথাটা শোনার সাথে সাথে টেবিলের আড্ডায় নীরবতা নেমে এল। কেউ ওকে নিয়ে কোনো হাসাহাসি বা কোনো বাজে মন্তব্য করল না। কিন্তু ওই যে এক সেকেন্ডের জন্য সবাই একটু থমকে গেল, চোখের চাউনিটা একটু বদলে গেল আয়না সেটা খুব স্পষ্ট ধরল। টেবিলে বসা মানুষগুলো আয়নাকে নিয়ে মনে মনে একটা নতুন ক্যাটাগরি তৈরি করে ফেলল।
একজন আবারো শুধু বলল, ওহ, আচ্ছা! অনেক আনএক্সপেক্টেড। মাহির যা নার্ড ছিল রে বাবা। লাভ ম্যারেজ তাই না? হা হা!
আরেকজন আমতা আমতা করে বলল, মানে আপনি তাহলে হোমমেকার?
আয়নার বিস্তারিত বলতে ইচ্ছে হলো না। সে মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ।
-ভালো তো। আপনারাই লাকি ভাবী। কি যে আরাম! আমি এই চাকরি-বাকরি ছাড়তে পারলে বাঁচি।
গৃহিণীদের কাজকে তুচ্ছ করে দেখা মহিলার সাথে তার আর কথা বলতে রুচি হলো না। আয়না মাহিরকে খুঁজতে থাকে। সে তাদের আসরের মধ্যমণি। আজ তার জন্য একটা আনন্দের দিন। তাকে বেশ উৎফুল্ল দেখাচ্ছে। থাক, আরো কিছুক্ষণ থাকা যায় এখানে।
আয়না আর কেউ বিশেষ পাত্তা দিল না। তাকে নিয়ে কারো আর কৌতুহল নেই। তারা নিজেদের শাড়ি, হীরা আর ট্রিপ নিয়ে আলোচনা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আয়নার তাদের কথা শুনতে মন্দ লাগছে না। মাহিরের ভবিষ্যৎ কর্পোরেটে, এরকম পার্টিতে তার আরো আসতে হবে, সুতরাং মানিয়ে চলা শিখতে পারলে ভালো হয়।
ভাবী আপনার জামদানীটাও সুন্দর! চুড়িটা আড়ং নাকি? মাহির ভাইয়া তো মনে হয় খুবই স্পয়েল করে।
-শাড়িটা ও এনেছে। মোস্ট প্রোবাবলি আড়ং। কিন্তু চুড়ি জোড়া আমি কুমুদিনী থেকে নিয়েছি ভাবী।
এর পরেই আড্ডাটা খুব স্বাভাবিকভাবে আয়নাকে বাদ দিয়ে এগিয়ে গেল। আয়না চুপচাপ কফির কাপটা ধরে বসে রইল। অনেকদিন পর নিজের ভেতরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার এই অভাবটা ওকে একটু অস্বস্তিতে ফেলল। মুখের ভদ্র হাসিটা ও জোর করে ধরে রাখলেও, বুকের ভেতরের৷ সূক্ষ্ম খোঁচা ও টের পাচ্ছিল।
মাহির দুটো কোল্ড ড্রিংকসের গ্লাস হাতে নিয়ে ভিড় ঠেলে ওদের টেবিলটার দিকে এগিয়ে এল। ও আসতেই এক মেয়ে বেশ ক্যাজুয়াল টোনে টিপ্পনী কাটার মতো করে জিজ্ঞেস করল, কি মাহির, বৌকে ছাড়া থাকতেই পারো না দেখছি? অফিস-টফিস যাও তো? হাহা!
মাহির হাসল, অভিযোগ অস্বীকার করল না। সে সাথে করে একজন ক্লাসমেটকে নিয়ে এসেছে আয়নার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে। কণা মেয়েটি হেসে আয়নার সাথে কুশল বিনিময় করল।
-আয়না এই যে কণা, আমাদের ব্যাচের গোল্ড মেডেলিস্ট। কণা মিট মাই ওয়াইফ।
এর পরের প্রশ্ন কি হয় আয়না জানে, তাই ভেবেছিল মাহির হয়তো প্রসঙ্গ এড়াতে কথা ঘুরিয়ে দেবে। কিন্তু ও হাঁ করে দেখল, মাহিরের পুরো মুখ হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
আয়না ওকে চোখ দিয়ে ইশারা করে থামানোর আগেই মাহির খুব ইজি টোনে বলতে শুরু করল,
আয়না আসলে একজন ফ্রিল্যান্স ডিজিটাল মার্কেটিং অ্যান্ড কনটেন্ট স্পেশালিস্ট।
ও মেইনলি এসইও কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজি, ওয়েবসাইট কনটেন্ট অপটিমাইজেশন, কিওয়ার্ড রিসার্চ, ব্লগ কনটেন্ট আর কনটেন্ট অডিটের কাজগুলো হ্যান্ডেল করে।
প্রফেশনাল টার্মগুলো শোনার পর টেবিলের সবাই আচমকা একটু সোজা হয়ে বসল। তারা হয়তো এমনটা ভাবতেই পারেনি।
আয়না নিজের জায়গায় বসে স্তব্ধ হয়ে বলে, মাহির?
মাহির ওখানেও থামেনি। ও একের পর এক বলে যাচ্ছিল, সবচেয়ে বড় কথা কী জানো? ও কিন্তু কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ট্রেনিং ছাড়াই একদম নিজের চেষ্টায় ইন্টারনেট ঘেঁটে সব শিখেছে।
-হয়েছে থামো?
মাহির গর্বের সাথে বলল,
ও কয়েক বছর ধরেই ফাইভার আর আপওয়ার্কের মতো গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে সরাসরি বিদেশী ক্লায়েন্টদের সাথে কাজ করে।
মাহির যে আড়ালে থেকে ওর কাজের প্রতিটা খুঁটিনাটি এত নিখুঁতভাবে খেয়াল করত, তা আয়না আজ এই প্রথম জানল। ও তো ভাবত মাহির বড়জোর এটুকু জানে যে ও ল্যাপটপ নিয়ে অনলাইনে কিছু কাজ করে। কিন্তু মাহির যে ওর কাজের প্রজেক্টের ধরন চেনে, ওর ক্লায়েন্টরা কোন কোন দেশের তা জানে, এমনকি ও যে ডেডলাইন মেলাতে গিয়ে রাত জাগত, ক্লায়েন্টরা ওকে কী ফাইভ-স্টার রিভিউ আর রেটিং দিত - তার প্রতিটা ডিটেইলস এই লোকটার নখদর্পণে!
তার গাল লজ্জায় লাল হয়। অভিভাবকরা সন্তানদের ছোট ছোট এচিভমেন্ট যেভাবে বাড়িয়ে চারিয়ে বলে, মাহির ঠিক তেমনটাই করছে।
একজন অবাক হয়ে বলেই ফেলল,
তুমি এত ডিটেইলস মনে রেখেছ কীভাবে মাহির? তোমার বন্ধু তো আমি কোন কোম্পানিতে চাকরি করি সেটাই ঠিকমতো বলতে পারে না! হাহা!
মাহির প্রশ্ন শুনে স্বাভাবিকভাবে কাঁধ ঝাঁকাল, এই জিনিসগুলো মনে রাখাটা দুনিয়ার সবচেয়ে ক্যাজুয়াল একটা ব্যাপার।
সে আয়নার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল, তারপর সবার উদ্দেশ্যে বলল,
মনে রাখব না কেন? আই অ্যাম রিয়ালি প্রাউড অফ হার।
হিয়া কফির কাপে একটা মৃদু নাড়া দিয়ে নিজের ভেতরের অস্বস্তিটা ঢাকার চেষ্টা করে বলল,
তাই নাকি? বাহ্! আজকাল অবশ্য ফ্রিল্যান্সিংয়ের খুব হাইপ। ঘরে বসে বেশ ভালোই পকেট মানি চলে আসে, তাই না ভাবী?
হিয়ার কথার ভেতরের সূক্ষ্ম খোঁচা টেবিলের বাকিরা ধরতে না পারলেও মাহির ঠিকই ধরল। তবে সে উত্তেজিত হলো না। বরং তার প্রশান্ত মুখে একটা স্মিত হাসি ফুটে উঠল। সে আয়নার কাঁধে হাত রেখে বলল,
পকেট মানি তো বটে! এই পকেট মানি দিয়েই আমি লাক্সারি করি। আজকে তোমরা পারলে ম্যাডামকে একটু কনভিন্স কোরো তো যাতে আমার এলায়োন্সটা যাতে একটু বাড়িয়ে দেয়।
এরপর আর কারো কিছু বলার থাকে না।
কণা মুগ্ধ চোখে আয়নার দিকে তাকিয়ে বলল,
দ্যাটস রিয়ালি ইম্প্রেসিভ, আয়না! নিজের চেষ্টায় গ্লোবাল মার্কেটে এসইও স্ট্র্যাটেজি হ্যান্ডেল করা মোটেও চাট্টিখানি কথা না। কোনো একদিন তোমার কাজের প্রসেসটা আমাকে একটু বুঝিয়ে বলো তো, আমার অফিসের একটা প্রজেক্টে হেল্প হতো।
ছেলেরাও তাদের সাথে যোগ দেয়। শাকিল বলে,
আজ মাহিরকে পালাতে দেওয়া যাবে না, তাহলে আবার বছরখানেকের জন্য ডুব দিবে। ট্রিট দিতেই হবে। এইরকম একটা ভালো নিউজ শুনলাম, একদম ছাড়বো না তোকে।
মাহির স্মিত হাসল। আয়নার এবার গর্বিত দ্যুতিমান চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
রাসেল বলল,
না ব্রো। তুই ট্রিটের জন্য কাড়াকাড়ি কর, মাহির দোস্ত আমার নাম মাথায় রাখিস আর শতাব্দীতে কোনো ভ্যাকেন্সি হওয়া মাত্রই আমাকে জানাবি। তাইলে চলবে।
ইরা বিড়বিড় করে বলল, শতাব্দী! ওয়াও মাহির দ্যাটস গ্রেট!
সোহেল বলল, দাঁড়া দাঁড়া, পজিশন কী রে ?
মাহির মুখ খোলার আগেই শাকিল হাত তুলে থামিয়ে দিল, পজিশন দিয়ে কী হবে? শতাব্দীর ব্র্যান্ডটাই যথেষ্ট।
কণা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
এক্স্যাক্টলি। ওদের এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডিংই আলাদা।
আর ওদের কালচার! আমার এক সিনিয়র আছে ওখানে। লোকটা বলে, প্রথমবারের মতো সে এমন একটা কোম্পানিতে কাজ করছে যেখানে পারফরম্যান্স আর পলিটিক্স এক জিনিস না। সেটা তো কিন্তু বিরাট কথা। বিশেষ করে আমাদের দেশে।
চারপাশে কয়েকজন একসাথে হেসে উঠল। আরেকজন বলল, আমি যা শুনেছি, ওদের ট্যালেন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামগুলো অসাধারণ। কোম্পানি নিজেই মানুষকে ভবিষ্যতের লিডার বানানোর জন্য ইনভেস্ট করে।
-হ্যাঁ। ওদের লিডারশিপ ট্র্যাকটা খুব স্ট্রাকচার্ড। ভালো পারফর্ম করলে পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে কোথায় যেতে পারবে, সেটা প্রায় পরিষ্কার। আর এক্সপোজারটা দেখো! দেশের সবচেয়ে বড় বড় ক্লায়েন্ট, সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট, সবচেয়ে বড় বাজেট।
রাসেল হেসে বলল, সিভিতে একবার শতাব্দীর নাম বসাতে পারলে পরে রিক্রুটাররাই লিংকডইনে এসে নক করবে। আমার পরিচিতদের মধ্যে যারা ওখানে আছে, তাদের কাউকে নিজের ইচ্ছায় চাকরি ছাড়তে দেখিনি।
শাকিল বলল, রিটেনশন রেটই সেটা বলে দেয়। মাহিরের লাক কি বিয়ের পরেই খুলল নাকি? বিসমিল্লাহ বলে আম্মাকে শুভ কাজে হাত দিতে বলে দেই?
-আরে রিটেনশন বাদ দে। মানুষজন ওখানে দশ-বারো বছর থেকে যাচ্ছে। কর্পোরেট দুনিয়ায় এটা বিরল ঘটনা। কাজ করে আরাম পাবি। তার উপর শাহেদ শাহরিয়ার না? এই লোকটার ভিশন আছে।
-অ্যাবসোলিউটলি!
-গত কয়েক বছরে কোম্পানির ম্যাসিভ ট্রান্সফরমেশন দেখেছ? আমি সিরিয়াসলি বলছি, আগামী বছরই শতাব্দী পুরো মার্কেট লিড করবে।
মাহির স্মিত হাসল। এই রিস্ক নেওয়ার সাহস ও তাকে আয়না জুগিয়েছে। মাহিরের পাঁচ লেভেলের ইন্টারভিউয়ের প্রথমটাতে যাওয়ার ও কনফিডেন্স ছিল না। নতুন জায়গার যাওয়ার কথা ভেবে রিস্ক নিয়ে লাভ কি? তার বংশ এমনিও রিস্ক নিয়ে বিপদে পড়ে যায়।
আয়না ভাত মাখতে মাখতে বলেছিল, তোমার তো আগ্রহ আছে তাহলে ট্রাই করতে সমস্যা কি?
মাহির জানে তা সত্যি! তাইতো ইন্টারভিউতে দেখানোর মতো চমৎকার একটা প্রেজেন্টেশনের স্লাইড তৈরি করছে রাত জেগে। বর্তমান অফিসের অবস্থা বেস্ট টক্সিক হয়ে গেছে। পলিটিক্স একদম তুঙ্গে। আয়না হাজার বার তাকে রিজাইন এর কথা ভাবতে বলেছে। কিন্তু নতুন জব পাওয়া এতোই সোজা! ব্যাকআপ ছাড়া কি কোন বড় রিস্ক নেওয়া যায়?
আয়না বিরক্ত হয়ে তার মুখে ভাত ঠুসে দিয়ে বলল, অতিরিক্ত চিন্তা তোমার? আমি আছি না?
মুখ ভর্তি ভাত নিয়ে মাহির হাসল। এই কথাটার দামই তো কোটি টাকা!
আয়না বলল, টেইক দ্যা রিস্ক। আই’ম ইউর ব্যাকআপ। তাও কোনো রিগ্রেটস রেখো না মনে। কেমন লক্ষী ছেলে?
তারপর কিভাবে কিভাবে যে সে পাঁচ লেভেলের ইন্টারভিউ ক্র্যাক করে ফেললো সে নিজেও জানেনা! যখন কনফার্মেশন কল আসল, সে একদম বিশ্বাস করতে পারছিল না।
বেশ সময় পার হয়ে যায়। আয়না মাহির সবার কাছ থেকে বিদায় নেয়। পিছন থেকে রাসেল বলতে থাকে,
কি কপাল দেখলি? মাহির ভালো জায়গায় যাবে জানতাম, কিন্তু শালার পুরো পার্সোনালিটি বদলে গেছে। জোস একটা ক্যারিয়ার হবে এখন তার।
—————
মাহিরে পুরনো অফিসে আর এক সপ্তাহ আছে। রিজাইনের প্রক্রিয়া চলছে।
রিইউনিয়ন শেষ হতে হতে বেশ দেড়ি গিয়েছিল। পার্কিং লটের একপাশে দাঁড়িয়ে আয়নার জন্য অপেক্ষা করছিল মাহির। ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে নামটা দেখেই ওর চোখে ক্ষণিকের জন্য একটা নিরাবেগ ছায়া নেমে এল।
শফিক সাহেব। মাহির কলটা রিসিভ করল। ওপাশ থেকে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গলা ভেসে এল।
-আপনি কি সত্যিই এটা করতে যাচ্ছেন মাহির সাহেব?
মাহির শান্ত স্বরে বলল, কোনটা?
-ভালো করেই জানেন কোনটা! তআমার বিরুদ্ধে কমপ্লেইন জমা দেবেন?
-সেটা নির্ভর করছে আপনার উপর।
-এতদিন পর এসব টেনে বের করার মানে কী? আপনি তো কোম্পানি ছেড়েই চলে যাচ্ছেন।আমার পেটে লাথি মেরে কি লাভ!
মাহির কয়েক সেকেন্ড চুপ রইল। তারপর বলল,
আপনি জানেন, আমি প্রথমে বিশ্বাসই করিনি।অনেক মানুষের নাম মাথায় এসেছিল। আপনারটা আসেনি।
-মাহির...
-আপনার কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। অফিসের প্রথম দিকের ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়েছেন। আমি হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালেও আপনি দেখতে গিয়েছিলেন। সেজন্যই আমি আপনাকে আগে ফোন করেছি। সবার আগে।
শফিক সাহেবের গলা একটু নরম হলো, তাহলে বাদ দেন ব্যাপারটা।
-পারব না।
মাহিরের কণ্ঠে রাগ ছিল না। সেটাই ব্যাপারটাকে আরও কঠিন করে তুলছিল, আমি শুধু একটা জিনিস বুঝতে পারছি না। আপনি কীভাবে বসকে বললেন যে আমি নিজের এক্সিডেন্ট নিজে সাজাতে পারি! দশ-বারো লাখ টাকার জন্য?
মাহির মৃদু হেসে মাথা নাড়ল,
আপনি তো জানতেন আমি কোন কোন ফাইল হ্যান্ডেল করি। এমন অনেক সিদ্ধান্ত আমার টেবিল দিয়ে গেছে যেখানে একটা সিগনেচার করলেই তার দ্বিগুণ টাকা পাওয়া যেত। তবুও করিনি। আপনি আমার সাথে প্রতিদিন কাজ করেছেন। আমার সম্পর্কে পৃথিবীর অনেক মানুষের চেয়ে বেশি জানতেন। তারপরও আপনি সবার কাছে গিয়ে বললেন আমি নিজের ছিনতাই ও এক্সিডেন্ট নিজে সাজিয়েছি।
-আমি ভুল করেছি মাহির।
-না। ভুল আর চরিত্রের অপরাধ এক জিনিস না। আপনাকে একটা সুযোগ দিয়েছি। আপনি যদি নিজে গিয়ে ম্যানেজমেন্টের সামনে ব্যাপারটা স্বীকার করেন, তাহলে বিষয়টা সেখানেই শেষ।
—আর যদি না করি?
—তাহলে আমার কাছে যা প্রমাণ আছে, সব মিস্টার হকের কাছে যাবে।
ওপাশ থেকে ভারী শ্বাসের শব্দ এল। আপনি জানেন উনি আমাকে কতটা অপছন্দ করেন।
-জানি।
-তাহলে আপনি আমাকে শেষ করে দিচ্ছেনই!
মাহির বাইরে তাকাল,
না শফিক সাহেব। আমি আপনাকে শেষ করছি না। আপনি অনেক আগেই নিজের ক্ষতি শুরু করেছিলেন। আমি শুধু আর সেটাকে ঢেকে রাখছি না।
ওপাশ থেকে প্রায় ভেঙে পড়া গলায় প্রশ্ন এল,
কিন্তু এখন কেন? আপনি তো যাচ্ছেনই। এতো প্রমোশন অফার করা হয়েছে। স্যালারি ডাবল করার কথাও বলা হয়েছে। তারপরও কেন?
মাহির কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব শান্তভাবে বলল,
কারণ আমি চলে যাচ্ছি বলেই করতে পারছি। এই কোম্পানির জন্য আমি অনেক কিছু দিয়েছি। সময় দিয়েছি, পরিশ্রম দিয়েছি, নিজের স্বস্তিটাও দিয়েছি। কিন্তু যখন আমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, তখন খুব কম মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছিল।
সে থামল,
তবু আমি এসবের জন্য কিছু করছি না। আমি অন্য জায়গায় যাচ্ছি। নতুন জীবন শুরু করব। আমার স্ত্রী আছে, পরিবার আছে, ভবিষ্যৎ আছে। আমি এগুলো নিয়েই ব্যস্ত থাকব।
-তাহলে?
-তাহলে আপনার এই শিক্ষা পাওয়াটা দরকার। কারণ মানুষ যখন ভাবে তার কাজের কোনো পরিণতি হবে না, তখন সে আরও বিপজ্জনক হয়ে যায়। আজ যদি আমি চুপ করে যাই, কাল আপনি আরেকজনের জীবন নষ্ট করবেন। তার পরের দিন আরেকজনের। আমি প্রতিশোধ নিচ্ছি না শওকত সাহেব। আমি শুধু নিশ্চিত করছি যে পরের মানুষটা আমার মতো মূল্য না দেয়। বাকিটা এখন আপনার সিদ্ধান্ত।
কলটা কেটে গেল।
—————
তাদের রিকশাটা মেইন রোডে উঠতেই চালক হুডটা টেনে দিতে চাইল। আয়না তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলল, না না, খোলা থাক।
চালক আর কিছু না বলে প্যাডেলে চাপ দিল। বিকালের পর শহরের আলাদা একটা রূপ আছে। দিনের গরম অনেকটাই কমে এসেছে। বাতাসে হালকা শীতলতা। রাস্তার দুই পাশে দোকানের সাইনবোর্ডগুলো জ্বলে উঠেছে।
মাহির কিছুক্ষণ চুপচাপ চারপাশ দেখল। তারপর বলল,
-সূর্যের আলোতে সমস্যা হচ্ছে? গরম লাগছে না?
আয়না ভুরু কুঁচকাল, কই? কি সুন্দর বাতাস!
কথা শেষ না করেই সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, আরেকটু সময় দাও। ইনশাআল্লাহ এক-দুই বছরের মধ্যে কার লোনের জন্য এলিজিবল হয়ে যাব। তখন একটা কিছু দেখব।
আয়না সঙ্গে সঙ্গে কপালে ভাঁজ ফেলল, আবার শুরু করলে?
-কি?
-সবকিছুর সমাধান গাড়ি না।
মাহির চুপ করে গেল।
আয়না সামনের দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বলল, এখান থেকে দেখতে কত সুন্দর লাগে।
সে রাস্তার দিকে আঙুল দেখাল, দোকানগুলো, মানুষগুলো, যানজট... সব। আমি সবসময় তোমার সাথে এভাবে ঘুরতে চেয়েছি।
কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে যেতেই সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। মাহিরের বুকের ভেতর আনন্দের দোলাচল অনুভূতি হলো।
এই মেয়েটা আগে নিজের ইচ্ছেগুলো মুখে আনত না। কিছু চাইত না। কিছু দাবি করত না। কিন্তু এখন করে। আর আশ্চর্যজনকভাবে, সে প্রতিবারই শুনতে ভালোবাসে। ভীষণ ভালোবাসে।
মাহির ঠোঁটের হাসি চেপে বলল, তাহলে বুঝি আমার রোমান্টিক স্কোর একটু বেড়েছে?
-নিজেই নিজেকে নম্বর দিও না তো!
-তাহলে কে দেবে?
-আমি! আবার কে?
-আরে! আয়না তুমিতো কৃপণ পরীক্ষক। হবে না। হবে না।
আয়না হেসে ফেলল। মাহিরও হাসল। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
আজ কেউ কিছু বলেছে? ডিড এনিওয়ান মেড ইউ আনকমফোর্টেবল?
-হুম?
-রিইউনিয়নের কথা বলছি।
আয়না বুঝতে পারল প্রশ্নটা কোথা থেকে আসছে। সে মাথা নাড়ল, একদম না।
-শিওর?
-হ্যাঁ।
-আনকমফোর্টেবল লাগেনি?
-না তো বাপ। এতোকিছু কেন ভাবো তুমি?এগুলো খুব নরমাল ব্যাপার।
মাহির পুরোপুরি আশ্বস্ত হলো না। কিন্তু আর চাপ দিল না।
আয়না হঠাৎ বলল, তবে তোমার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ আছে।
আমার বিরুদ্ধে?
-জি হ্যাঁ। তুমি আজ খুব বাড়াবাড়ি করেছ।
-কোথায়!
-আমাকে নিয়ে।
মাহির অবাক হওয়ার ভান করলো, আমি! আমি তো সত্যি কথাই বলেছি।
-সত্যি কথা বলতে গিয়ে মানুষের পুরো সিভি পড়ে শোনাতে হয়?
মাহির হেসে ফেলল, আরে!
-এসইও কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজি...কিওয়ার্ড রিসার্চ..আরেকটু হলে আমার ক্লায়েন্টদের নাম-ঠিকানাও বলে দিতে।
মাহির গম্ভীর মুখে বলল, সেগুলো বলা যায় না। এনডিএ ভায়োলেশন হয়ে যাবে।
আয়না মুখ ফুলিয়ে মাথা নাড়ল, মাহির! তুমি একদম অসম্ভব।
-ধন্যবাদ ম্যাম!
-এটা মোটেও কমপ্লিমেন্ট না।
-তাও ধন্যবাদটা একদম আসল, কোনো ভেজাল নেই।
কিছুক্ষণ দুজনেই হাসল। তারপর আয়না একটু নরম গলায় বলল, এগুলো বড়াই করে বলার মতো কোনো বড় ব্যাপার না মাহির।
মাহির এবার সত্যিই অবাক হলো, কার কাছে?
-আমার। আমার কাছে।
-তোমার সমস্যাটা জানো কি? তুমি নিজের কাজের গুরুত্ব বুঝো না।
আয়না চোখ ঘুরাল, আবার শুরু হলো!
-না, সিরিয়াসলি।
সে একটু সামনে ঝুঁকল,
নিজের চেষ্টায় একটা স্কিল শিখেছ। নিজের চেষ্টায় আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্ট হ্যান্ডেল করো। নিজের চেষ্টায় একটা ক্যারিয়ার বানিয়েছ।
-হুম। হুম হুম!
-আর মাসের শেষে আমাকে পকেট মানি দাও।
আয়না এবার হেসে ফেলল, চুপ।
-সত্যি তো।
-চুপ করো পাগল।
-আমার ফোনের ওয়ালেটে তোমার পাঠানো টাকা না থাকলে আমার অনেক বিলাসিতা বন্ধ হয়ে যেত।
-মাহির!
-আর আমি ঠিক করেছি ফেসবুক বায়ো আপডেট করব।
-কি লিখবে?
-ওয়েট ভাবতে হবে, হয়তো স্পন্সরড বাই মাই ওয়াইফ।
-না! হায় খোদা! এই পাগল কে নিয়ে আমি কি করি!
-অথবা ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাকিং: আয়না আহমেদ।
-না। একদম না!
-সিইও অব মাই লাইফ!
-আমি আর কোনোকথাই বলব না ধ্যাত!
-অল অ্যাপ্রুভাল সাবজেক্ট টু ম্যাডামস কনসেন্ট!
আয়না এবার হেসে কুঁকড়ে গেল। মাহির মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকে দেখতে থাকল।
ঠিক তখনই পাশ দিয়ে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস হর্ন বাজিয়ে চলে গেল। বাসের জানালাগুলো খোলা। ভেতরে ছাত্রছাত্রীদের চিৎকার। কেউ গান ধরেছে। কেউ হাত নেড়ে রাস্তার মানুষের দিকে তাকিয়ে হাসছে। মনে হচ্ছে কোনো পিকনিক বা ট্যুর থেকে ফিরছে। এর মধ্যে এক কালো ঝাঁকড়া চুলের ছেলে বাসের পিছনের দিকে পাগলের মতো নাচছে। তাকে ঘিরেই সবাই আনন্দ করছে।
আয়না অজান্তেই তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁটে একটা মৃদু হাসি ফুটল।
-মজার না?
মাহির বাসটার দিকে তাকাল, কি?
-ওদের দেখো! বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়টা আসলে দ্বিতীয় শৈশবের মতো।
মাহির তার দিকে তাকাল, তুমি তো বলছ যেন অনেকদিন ছিলে।
আয়না মৃদু হেসে বলল, ছিলাম না বলেই হয়তো এমন মনে হয়।
কথাটা বলেই সে চুপ হয়ে গেল।
মাহির কয়েক মুহূর্ত পর বলল, আয়না?
-বলো?
-কখনো ভেবেছ আবার পড়াশোনা শুরু করার কথা?
আয়না যেন ঠিকমতো শুনতেই পারেনি। বিস্মিত হয়ে বলল, কি?
-ইউনিভার্সিটি?
-মাহির! তুমি কি বলছ?
-যা বলছি তাই।
-এখন? যাও!
-হ্যাঁ, এখন।
আয়না কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হেসে মাথা নাড়ল, আমার কত বছরের গ্যাপ জানো? মানুষ হাসবে।
-মানুষের ফুল-টাইম চাকরি হলো অন্যকে নিয়ে হাসাহাসি করা।
-মাহির...
-সিরিয়াসলি বলছি ওয়াইফ।
আয়না এবার চুপ হয়ে গেল। মাহির নরম গলায় বলল, সবাই আমাকে নার্ড বলে, জানো তো?
-কারণ তুমি নার্ড, খুবই নার্ড। ভয়ংকর নার্ড।
ঠিক আছে, বুঝেছি। - সে হেসে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, কিন্তু আমি আরেকজন নার্ডকেও চিনি। তুমিই সেটা। যে মানুষ রাত জেগে নতুন স্কিল শেখে, সে নার্ড।
-ওটা তো কাজের জন্য।
-যে মানুষ প্রয়োজন না থাকলেও নতুন কিছু জানতে চায়, সে নার্ড।
-সবাই তো চায়।
মোটেও না। যে মানুষ একটা টপিক পছন্দ হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেটা নিয়ে পড়ে থাকে, সে নার্ড।
আয়না প্রতিবাদ করতে গিয়ে থেমে গেল। কারণ কথাগুলো পুরোপুরি মিথ্যা না।
মাহির বলল, অনেক মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় চাকরির জন্য। অনেক মানুষ যায় শেখার জন্যও। আমি মনে করি তুমি দ্বিতীয় দলে পড়ো।
আয়নার বুকের ভেতরটা কেমন যেন হয়ে গেল। কেউ কোনোদিন তাকে এভাবে দেখেনি। কেউ কোনোদিন ভাবেনি।
সে আস্তে বলল, এখন আর সম্ভব না।
-কেন?
-অনেক গ্যাপ।
-ওটা সমস্যা না।
-ডিগ্রি নিয়েও কি হবে?
-সবকিছুর লাভ-ক্ষতি হিসাব করতে হবে নাকি?
আয়না উত্তর দিল না। মাহিরও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
-যদি বয়স, টাকা, স্টাডি গ্যাপ, মানুষ কি বলবে এসব কোনো বাধা না হতো...তাহলে কি তুমি আবার পড়তে চাইতে?
রিকশার চাকার শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা গেল না। আয়না উত্তর দিতে পারল না। কারণ উত্তরটা সে জানে। বহু বছর ধরে জানে।
মাহির তার নীরবতা দেখেই মৃদু হাসল। আয়না মুখ ঘুরিয়ে বাইরে তাকাল।
রাস্তার আলো ঝাপসা লাগছে কেন যেন। মাহির ধীরে ধীরে বলল, তাহলে আমি একটু খোঁজখবর নেব।
-মাহির ন্যাশনালে হবে না তো আমার আর। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি খুব খরচ।
-জানি।
-অপ্রয়োজনীয় খরচা।
-আমার কাছে না।
আয়না আর কিছু বলতে পারল না। মাহির তার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল, দেখি না কি করা যায়।
আয়না অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ ভিজে উঠছে। কি বিরক্তিকর! কি লজ্জা!
রিউনিয়ন থেকে ওঠার আগে এক ভাবি তাকে পাশে ডেকে নিয়ে বলেছিল,
আয়না ভাবি মাশাল্লাহ আপনার সেলফ কনফিডেন্স আছে। যদি না থাকতো তাহলে আমি আপনাকে বলতাম,
এদের এইসব কথার একদম মন ছোট করবেন না। মাহির ভাই আপনার দিকে এমন ভাবে তাকায় যেন আকাশের একটা নক্ষত্র ভুল করে তার কাছে এসে পড়েছে।
এখন এই নক্ষত্রকে হাতে রাখবেন, না মাথায় রাখবেন না বুকে রাখবেন! কি করবেন তিনি ভেবে পান না। আমি যদি এই চাকরির পাশাপাশি, ফুল টাইম হাউস ওয়াইফ হয়ে দুইটা বিজনেসও সামলাতাম তাও আমার হাজবেন্ড আমার দিকে এভাবে তাকাতো না, যেভাবে তিনি আপনার দিকে তাকায়।
মাহির তাকে কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বলল, ইউ লুকড সো প্রিটি টুডে!
আয়না মিছামিছি ভাব দেখিয়ে বলল, হয়েছে তো! আর কতোবার বলবে?
মাহির টুপ করে তার কলারবোনে একটা চুমু খায়। আয়না ধমকে ধমকে তাকে শেষ করে দেয়। মাহির অসহায়ের মতো বলে, কাছাকাছি এসে পড়েছি। গরম না অনেক? আমি আইসক্রিম নিয়ে আসি?
আয়নার গাল টুকটুকে লাল হলো। বুক ধকধক করতে লাগল। এই লোকটা এতো বেড়েছে! কি নির্লজ্জ!
আয়না দাঁতে দাঁত চেপে বলল, নো আইসক্রিম!
মাহির আদুরে স্বরে বলল, কালকেও তো আনিনি। টেস্ট ও ভুলে গেছি। এন্ড ইউ লুক ব্রেথটেকিং টুডে! আনি না?
-তোমার জন্য আইসক্রিম নিষেধ মাহির আহমেদ! তোমাকে দেখতে নাদান লাগে! আসলে তুমি তো…তুমি একটা অসহ্য!
মাহির দুঃখী মুখ করে রাখল। আয়না তার আগেই গটগট করে বাড়িতে ঢুকে গেল। মাহিরের দোকানে কিছু কাজ ছিল। কিছু বকেয়া শোধ করে আসতে নিলে দোকানী বলল, ভাইজান আজকে আইসক্রিম নিবেন না? ভ্যানিলা আছে।
মাহির বিরস মুখে বলল, না! এসব ভালো না।
বাড়িতে ঢুকেই দেখল মিনি টিভি দেখছে। আর কাউকে চোখে পড়ল না। মিনির দিকে দুটো চকোলেট ছুড়ে দিয়ে বলল, একা খাবি না। দিনাকেও দিবি।
মিনি হাসি মুখে বলল, ইউ দ্যা বেস্ট ভাইয়া।
মাহির সিড়ির দিকে যেতে নিলেই সে বলে, আ্যই ভাইয়া? ভাবী বলেছে উপরে যাওয়ার আগে ফ্রিজ থেকে আইসক্রিম নিয়ে যেতে তার জন্য।
শব্দ শুনে রামিম বের হয়ে বলল, কিরে! কি ব্যাপার মাহির ভাই এমন পাগলের মতো উপরে দৌড় দিল কেন?
মিনি কাঁধ উচিয়ে বলল, আরেহ! আমি কি জানি।
·
·
·
চলবে……………………………………………………