স্কুল ব্যাগ কাঁধে ফেলে অরুণিতা পায়ের গতি বাড়িয়ে দেয়। পাশে হাঁটা সায়ান কি যেন বলছে! কথাগুলো বোধগম্য হচ্ছে না। অরুণিতার ধ্যান ডালিম গাছের ছায়ায় দন্ডায়মান মানবদ্বয়ের উপর। তন্মধ্যে একজন তাঁর পাপা। অরুণিতা ত্রস্ত পায়ে হেঁটে বাবার পাশে এসে দাঁড়ায়। আর সায়ান তাঁর মামুর পাশে দাড়ালো।
অরুণ সরকার কথা বলার ফাঁকেই মেয়েকে দেখে মুচকি হাসলো। কাঁধের ভারী ব্যাগটা হাতে নিয়ে মেয়ের কাঁধ জড়িয়ে কাছে টেনে নিলো। সামনের মানুষটির সাথে পরিচয় করালো,
“আমার মেয়ে অরুণিতা। আর অরুণিতা, উনি রুস্তম আঙ্কেলের ছেলে সোহরাব। তোমার আঙ্কেল হয়।”
অরুণিতার গম্ভীর মুখে ক্রুর হাসি ফুটলো। সামনের ব্যক্তির উদ্দেশ্যে বলল, “হ্যালো, আঙ্কেল!”
অরুণিতার হাসি সহ্য হলো না সোহরাবের। সে গম্ভীর মুখে বলল, “সালাম কালাম দিতে জানো না?”
অরুণিতার চাহনি পরিবর্তন হয়। সে বাবার দিকে তাকায়। অরুণ সালাম দিতে ইশারা করলো। অরুণিতা ভোঁতা নাক ফুলিয়ে সালাম দিলো,
“আসসালামুয়ালাইকুম আঙ্কেল।”
সোহরাব শেখ অনেক কষ্টে আঙ্কেল ডাক গলাধঃকরণ করে বলল, “ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওবারকাহ্ তুহ্! আমি আর আব্বা ওকেই দেখতে গিয়েছিলাম না? আব্বা ওঁর হাতে স্বর্ণের চুড়িও পড়িয়েছিল!”
অরুণিতা অবাক চোখে বাবার দিকে তাকায়। অরুণ সরকার হেসে বলল, “হ্যাঁ, সময় কত দ্রুত পেরিয়ে যায় না? এই তো সেদিনের কথা সাদা তোয়ালে মোড়ানো এক ছোট্ট চড়ুই সোনা!”
“তাই তো দেখছি। সেদিন কোলে নিয়েছিলাম তো আমি। প্রথমে শান্ত থাকলেও চুমু দিতেই উঙ্গা উঙ্গা করে কাঁদছিল। সে কি থামে!”
অরুণিতা বিব্রত বোধ করে। বাবার দিকে চেয়ে বলে, “পাপা, উই আর গেটিং লেট।”
অরুণ সোহরাবের দিকে তাকায়, “তাহলে আসছি সোহরাব। আঙ্কেলকে সালাম জানিও। আর শহরেই যেহেতু আছো বাড়িতে ঘুরে এসো একবার!”
সোহরাব ভদ্রসুলভ হাসলো, “ইনশাআল্লাহ যাবো একদিন। ভালো থাকবেন ভাই।”
অরুণ সরকার মেয়ের ব্যাগ কাঁধে ফেলে হাঁটা শুরু করে। অরুণিতা বাবার বাহু ধরে পায়ে পায়ে হাঁটে। স্কুল গেইট অবদি গিয়ে পিছু ফিরে চায়। ডালিম গাছের নিচে সায়ান আর তাঁর মামুজান এখনও দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে।
“মামু, বলেছিলাম না অরু ফিরে তাকাবে! দ্যাট মিনস সি লাভস মি!”
সোহরাব শেখ ভাগ্নের দিকে তাকায়। ঠাস করে চড় মেরে দেয় আরক্ত গালে। সায়ান গালে হাত চেপে অবাক সুরে জানতে চায়, “মামু, মারলে কেন?”
“আজ পর্যন্ত যত পরীক্ষা দিছোস সব গুলায় ফাস্ট কেলাস ফাস্ট হইছোস না? এইবার সেকেন্ড হলি ক্যান?”
সায়ান আমতা আমতা করে বলে, “আমিও বুঝতে পারছি না।”
সোহরাব পিঠে ধরাস করা কিল বসায়। সায়ান ব্যাথায় পিঠ বাঁকিয়ে গড়গড় করে বলে, “আসলে মামু, অরুকে ফার্স্ট বানানোর জন্য আমি ইচ্ছে করেই একটা প্রশ্নের ভুল অ্যানসার দিয়েছিলাম। মমকে বলিও না প্লিজ?”
“বলবো না মানে? আপারে বলে তোর পা*ছার ছা*ল তুলে নেওয়ার ব্যবস্থা করছি, দাঁড়া তুই। ব*গলে বা*ল গজায় নাই উনি মানষের বেটিরে ফাস্ট বানানোর জন্য ভুল আনসার দিছে! তোর গরীবের মজনুগিরি না ছুটাইছি তো আমার নাম সোহরাব শেখ না, পাল্টে কুট্টু মুনষি রাখিস।”
সোহরাব রাগে গজগজ করতে করতে চলে যায় অফিস রুমের দিকে। সায়ান ভয়ে কাঁচুমাচু মুখে নখ খুঁটতে থাকে। তাঁর মামু তো এতোটা নিষ্ঠুর না! হঠাৎই বুকটা পাথরের কি করে হয়ে গেলো? এখন তাঁকে কে বাঁচাবে?
—————
“সাইকেল কার জন্য!”
অরুণ সরকার সাইকেল পেছন সিটে রেখে কাপড়ে ঢেকে দেয়। মেয়ের প্রশ্নের জবাবে বলে,
“তোমার ভাইয়ের জন্য। তোমার মাম্মাম ফোন করেছিল। ওলাফ নাকি ক্লাসে ফার্স্ট এসেছে।”
অরুণিতা স্বভাব সুলভ গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল, “ওহ্ আচ্ছা!”
“আমি বলেছিলাম ফার্স্ট হলে সাইকেল কিনে দিবো। তো রেজাল্ট পাওয়ার পর ফোন দিয়ে বলল, পাপা আমার লাল কালারের সাইকেল চাই।”
অরুণ সরকার ড্রাইভিং সিটে বসে সিটবেল্ট লাগাতে লাগাতে বলল। আড়চোখে মেয়ের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার রেজাল্ট বললে না?”
অরুণিতা জানালার ধারে থুতনি ঠেকিয়ে বাইরে তাকালো। কিছু বললো না। অরুণ মেয়ের কাঁধে সান্ত্বনার হাত রেখে বলল, “ডোন্ট বি স্যাড সোনা! ফার্স্ট হতেই হবে এমন কিছু না। সবাই জানে অরুণিতা জিনিয়াস। তাঁর মতো শার্প ব্রেন পুরো স্কুলে দুটো নেই।”
অরুণিতা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো একটু। বলল না যে সে এবার ফার্স্ট হয়েছে। সে অনেক এক্সাইটেড ছিলো পাপাকে বলার জন্য। কিন্তু এখন এক্সাইটনেস ফিকে পড়ে গেছে।
গাড়ি থামে সানশাইন স্কুলের পাশে পার্কিং জোনে। অরুণ সরকার নেমে যায়। অরুণিতা গাড়িতে বসে অপেক্ষা করে। দশ মিনিট যখন আধাঘণ্টায় পেরিয়ে গেল বিরক্তিতে মুখটা তেতো হয়ে আসে। সে অনেক কষ্টে আরও দশ মিনিট বসলো। কিন্তু কারো দেখা নেই। আগে বললে সেও সাথে যেতো। এভাবে এতোটা সময় অপেক্ষা রাগে অরুণিতার মেঘ জমা চোখ দুটো জ্বালাপোড়া করে। যে কোনো সময় বিনা গর্জনে ভূপতিত হতে পারে। তখনই জানালার গ্লাস খটখটায় কেউ। অরুণিতা গ্লাস নামিয়ে দেয়।
অরুণ সরকার ঝুঁকে আসে। হাসি উপহার দিয়ে বলে, “স্যরি সোনা, একটু লেট হয়ে গেল!”
“একটু? আ’ভ বিন ওয়েটিং হেয়ার ফর ওলমোস্ট এন আওয়ার!”
অরুণিতা তেতে উঠলো বাবার উপর। অরুণ সরকার তর্জনী আঙ্গুলে কপাল চুলকে ইতস্তত ভঙ্গিতে বলে, “মাফ করা যায় না? তোমার মাম্মাম ফুচকা খাওয়ার বায়না ধরেছে। তুমিও কি খাবে?”
অরুণিতা সামনে তাকায়। ফুচকা স্টলের পাশেই চেয়ারে বসে মা জননী আয়েশে ফুচকা গিলছে। পাশেই প্রহর চারটা হাওয়াই মিঠাই হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অরুণিতার রাগ তরতরিয়ে বাড়ে। সে ঠেস মেরে বলে,
“আ’ম সিটিং হেয়ার অ্যালোন, হোয়াইল ইয়্যু’আর বিজি হ্যাভিং ফুচকা উইথ ইয়্যুর বিউটিফুল ওয়াইফ। হাউ ওয়ান্ডারফুল!”
অরুণ সরকার পরে বিপাকে। সে মেয়েকে মানানোর সুরে বলে, “সোনা, তোমার জন্যেও তোমার পছন্দের দই ফুচকা বানাতে বলেছি। বেরিয়ে আসো?”
“নো নীড। আপনাদের মিয়া বিবিকে ডিস্টার্ব না করি। যান তাঁর সাথে ফুচকা ডেট এনজয় করুন।”
অরুণিতা গ্লাস তুলে নেয়। অরুণ সরকার জানালার গ্লাসে টোকা দেয়, গাড়ির দরজা ধরে টানে। কিন্তু না জানালা খুললো, না দরজা। অরুণ সরকার মেয়ের জেদ সম্পর্কে অবগত থাকলেও আরও কতক্ষণ ডাকলো। তারপর হতাশ বদনে ফিরে এলো ফুচকার দোকানে। পাতা মেয়েকে না দেখতে পেয়ে বলল,
“আসবে না?”
“উঁহু, রেগে বোম হয়ে আছে।”
অরুণ আবারও গাড়ির দিকে তাকায়। এক হাতে কান ধরে স্যরি বোঝায়। অরুণিতা ঝামটা মেরে মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
বাপ মেয়ের কান্ডে পাতার কপালে ভাঁজ পড়ে। এই নাক উঁচু ম্যানারলেস লোক, যাকে জীবনে কারো সামনে নত হতে দেখে নি। ভোরকে যতই চোখে হারাক, ভোর উঁচু গলায় কথা বললে ‘বেয়াদব ছেলে’ বলে এক ধমকে বসিয়ে রাখতো। পাতা নিজেও কখনো রাগে দুই একটা কিল বসালে, খেয়ে ফেলা লুক দিতো। সেই লোক মেয়ের ভয়ে মিউমিউ করে।
“জলদি খাও, পাতাবাহার।”
অরুণের তাড়া দেওয়া শুরু। পাতার কেন জানি রাগ হলো। প্রচুর রাগ। সে জেদ ধরে আরও ধীরে ধীরে খাওয়া শুরু করে দিলো। দোকানি অরুণিতার জন্য অর্ডার করা দই ফুচকা দিলে পাতা বলে,
“আপনার মেয়ে তো খাবে না। আমিই খেলাম! আর মামা মিষ্টি টক দিয়ে ঝাল ঝাল চটপটি বানান তো।”
শেষে ফুচকা দোকানিকে ইশারা করে বলল পাতা। অরুণ অবাক হয়ে বলে, “দু্ই প্লেট ফুচকা অলরডি শেষ করেছো। আবার এটা… পাগল তুমি পাতাবাহার?”
পাতাকে সাবধান করে দোকানিকে চটপটি বানাতে নিষেধ করে অরুণ। পাতা শোনে না। দোকানিকে বলে, “আপনি বানান তো। কারো কথা শুনবেন না। বিল আমি দেব, আমার কাছে টাকা আছে। ওই বুড়ো লোককে আমি চিনি না।”
দোকানি মিটিমিটি হাসলো ক্ষণ। অরুণ সরকার কিছু বলতে নিয়েও থেমে গেলো। প্রহরের হাত ধরে একটু সাইডে এসে দাঁড়িয়ে পাতার খাওয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকলো। পাতা রয়ে সয়ে দই ফুচকা শেষ করে চটপটি খায় গলা গলা করে। বিল দেওয়ার সময় হলে পার্স খুঁজে। মনে পড়ে পার্স লোকটার হাতে। পাতা এগিয়ে এসে পার্স চায়। অরুণ পার্স দেয় না। বাঁকা চোখে চেয়ে অচেনা মানুষের মতো করে বলল,
“ইয়্যু নো মি?”
“ঢং বাদ দিন। বুড়ো বয়সে মানায় না।”
“কথায় কথায় বুড়ো বলা বন্ধ করো।”
“বাহ্ রে! বুড়ো হয়ে গেছেন আর বুড়ো বলা যাবে না?”
অরুণ শান্ত চোখে চায়। পাতার চেহারায় বয়সের ছাপ নেই বললেই চলে। মানুষ ওত সহজে ধরতে পারবে না মহিলার বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। হালকা পাতলা গড়নের হওয়ার দরুন মনে হবে খুব করি ত্রিশ… বত্রিশ। সে পাতাকে পার্স ফিরিয়ে দেয়। পাতা কিশোরীদের মতো মুখ বাঁকিয়ে দোকানিকে বিল দিতে ফিরে আসে। বৃদ্ধা দোকানি খুচরা টাকা ফেরত দেওয়ার সময় ছোট্ট করে বলল,
“মা, স্বোয়ামীরে ওমন কইরা বুড়া কইতে নাই। হেয় গোস্বা করবো।”
“মামা কোনো গোস্বা টোসা না। ওনার মুখটাই ওমন।” পাতা হেসে বলল।
“তুমি তো মেলা জুয়ান আছাও, তোমার বরটা হেই আন্দাজে একটু বয়স্কই হইছে। ওহন তুমি বুড়া বুড়া করলে হের মন খারাপ হইতে পারে।”
পাতা ছোট ছোট চোখে অরুণ সরকারের দিকে তাকায়। একটু দূরে থাকায় তার আর ফুচকাওয়ালা মামার কথাগুলো শুনে নি। ওনার কি সত্যিই মন খারাপ হয়েছে?
অরুণিতা রাগ, বিরক্তি ও কান্নাকে দমিয়ে রাখতে ঘুমকে বেছে নেওয়ার পরিকল্পনা করে। গাড়ির লক খুলে সে চোখটা বুজে নেয়। পাতা, প্রহর দরজা খুলে ভেতরে এসে বসে। অরুণ ড্রাইভিং সিটে এসে বসে। মেয়েকে ঘুমোতে দেখে স্বস্তি পায়। ঘুমের দরুন রাগটা যদি কমে! সে ব্লেজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা রেবন বের করে। তাঁর ব্লেজার, কিংবা ওয়ালেটে হরহামেশা রেবন, ক্লিপ থাকবেই। সে রেবন দিয়ে মেয়ের খোলা চুল ঝুটি বেঁধে দেয়।
“আমার অবেলার প্রহর, ওই কাপড়ের নিচে কি যেন লুকিয়ে আছে। একটু দেখ তো?”
“ওকে পাপা!” বাধ্য ছেলের মতো মাথা নেড়ে কাপড়টা সরিয়ে দেয় প্রহর। নিমিষেই লাল রঙের বাই সাইকেল দৃশ্যমান হয়। প্রহর আনন্দে লাফিয়ে ওঠে। চেঁচিয়ে বলে,
“ওয়াও লাল কালার সাইকেল! এটা অনেক প্রিটি! আমার খুউব পছন্দ হয়েছে। থ্যাংক ইয়ু পাপা। আই লাভ ইয়্যু পাপা!”
তার লাফালাফি আর চেঁচামেচিতে অরুণিতা ধরফরিয়ে ওঠে। বড়বড় চোখে পাশে এবং পিছনে তাকায়। তারপর হুট করেই শান্ত হয়ে গেলো।
“ক্যান্ট ইভেন স্লিপ ইন পিস। সো মাচ অ্যানয়িং।”
ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বিড়বিড় করে অরুণিতা আবারও চোখ বুজে নিলো। অরুণ একটু সাহস সঞ্চয় করে বলল, “চড়ুই সোনা, তোমার জন্যে চিকেন রোল এনেছিলাম। খাবে এখন?”
“উঁহু!”
“সসও আছে সাথে।”
“বললাম তো খাবো না। বিরক্ত কেন করছো?”
অরুণ সরকার মিনমিন করে ‘স্যরি’ বলে। পাতা পেছন থেকে মেয়ের উদ্দেশ্যে বলে, “তোর সমস্যা কি?”
“আমার আবার কিসের সমস্যা!”
অরুণিতা রসকষহীন গলায় বলল। পাতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “মেয়ে মানুষ হয়েছিস কথায় কথায় ছ্যাত করে ওঠা একটু কমা আম্মু! মানুষ খারাপ বলে। সেদিনই তো কলোনির এক মহিলা বলল, ‘পাতা, তোমার মেয়েটা এমন কেন? মুখে রসকষ তো কিছুই নেই। কথাও বলে মুখের উপর। বেয়াদব হচ্ছে, একটু শাসন কোরো।’ এসব শুনলে কেমনটা লাগে?”
“তোমাকে শুনতে কে বলেছে? কান বন্ধ করে রাখতে পারতে!”
“আম্মু!” পাতা ধমকায়।
অরুণিতা চোখ মেলে তাকাল, “ওনার হাসবেন্ড আমাকে দেখলেই মামুনি বলে গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করে। একদিন হাতে আলপিন ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম। ওই আন্টিকেও বলেছিলাম আপনার হাসবেন্ডের স্বভাব ভালো না। স্বামীব্রতী মহিলা উল্টো আমার উপর রাগ দেখায়।”
রাগের চোটে পাতার চোখ ভাপ জমতে শুরু করে। রেগে বলে, “আমাকে আগে বলিস নি কেন তুই?”
অরুণিতা বাবার দিকে চেয়ে বলে, “আপনার হাসবেন্ড সব জানেন। বেচারা বুড়ো বয়সে এসে হাত দুটো হারালো… না থাকার মতোই তো।”
পাতা অস্থির হয়ে ওঠে মেয়ের চিন্তায়। বয়সের তুলনায় মেয়েটার গ্রোথ বেশি। আহামরি সুন্দর দেখতে না হলেও কয়েকবার চোখের দেখা দেখলেই মায়ায় পড়ে যাবার মতো রূপ। কত মানুষ কত নজরে দেখবে! সে অরুণ সরকারকে বলে, “প্রহরকে অরুর স্কুলে ভর্তি করানোর ব্যবস্থা করুন। আমি নিয়ে যাবো আমিই নিয়ে আসবো দুজনকে।”
অরুণ কিছু বলবে অরুণিতা তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, “এমনটা কখনোই করবে না পাপা! আমি ছোট বাচ্চা না, যে আমাকে হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যেতে হবে আবার নিয়ে আসতে হবে। তাছাড়াও আমার সকাল-সন্ধ্যা টিউশনি থাকে। বড়কথা আমি আমাদের গাড়িতেই যাওয়া আসা করি। নতুন করে সিসিটিভি ক্যামেরা নেওয়ার আমার কোনো প্রয়োজন নেই।”
মা মেয়ের তর্কাতর্কি লেগে গেলো। অরুণ ইশারায় পাতাকে শান্ত হতে বলে। মেয়েকে সে যথাসম্ভব চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করে। তাছাড়াও রূপ, নয়ন একই স্কুলে। নয়ন তো ওরই ক্লাসে।
“মেয়ে মেয়ের মতো হয়ে থাকবি।”
“হরহামেশা আম্মু ডাকো, আবার মেয়ে হয়ে থাকতে বলো! সো লজিকলেস!”
অরুণিতার জবাব আসতে দেরি হয় না। পাতা অত্যন্ত নাখোশ চিত্তে বলল, “বাপের থেকেও এককাঠি উপরে উঠেছিস। দুটোর একটারও মুখে রসকষ নেই। গুড ম্যানার্স বলতেও একটা ওয়ার্ড আছে যা তোদের গুলিয়ে খাওয়ালেও কাজ হবে না। আমার মতো ধৈর্যশীল মেয়ে পেয়েছে বলে তোর বাপে সংসার করতে পেরেছে, কিন্তু তোর কি হবে? হে করুণাময়, আমার মেয়ে জামাইকে তুমি ধৈর্যশীলতা ঠুসে ঠুসে ভরে দিও।”
অরুণ সরকার হাসলো ক্ষণ। অরুণিতা এতক্ষণ ঠান্ডা থাকলেও আকস্মিক জ্বলে পুড়ে উঠলো,
“মাম্মাম তুমি কিন্তু বেশি বেশি করছো! পাপা তাঁকে বলে দাও, আরেকটা উল্টোপাল্টা কথা বললে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।”
পাতা উঠে এসে মেয়ের পিঠে দুম করে কিল বসিয়ে দেয়, “গলার আওয়াজ নিচে। মেয়ে মানুষের গলা এতো চড়া কেন হবে?”
অরুণিতা ফোঁস ফোঁস করে বাবার দিকে তাকায়। অরুণ সরকার মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে পাতাকে শাসায়, “এবার বাড়াবাড়ি হচ্ছে কিন্তু! হাউ ডেয়ার ইয়্যু রেইজ ইয়োর হ্যান্ড অন মাই ডটার?
“হ্যাঁ আপনার মেয়ে! পেটেও তো আপনিই ধরেছিলেন।”
“আমিই ধরেছিলাম। আমার মেয়ের গায়ে হাত তুলবে না। কতবার বলবো, ও আমার মেয়ে কম, মা বেশি। কাল আমার মা তোমার জন্য ওর ফুপ্পি, চাচ্চুর সাথে তর্ক করেছে। তোমার হয়ে স্ট্যান্ড নিয়েছে। আর তুমি তাঁর এই প্রতিদান দিচ্ছো?”
পাতা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, “ছোট হয়ে বড়দের মুখে মুখে তর্ক করেছে। আপনাকে পাঠিয়েছিলাম দুটো ধমক দিয়ে টেনে আনতে!”
অরুণিতা বিড়বিড় করে বলল, “যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর। ভেরি নাইস!”
অরুণ সরকার হেসে উঠলো। তবে পাতার মুখটা ম্লান হয়ে আসে, “আমি বলেছিলাম আমার জন্য এরকম কর?”
“আপনি তো ভালোমানুষ প্রো ম্যাক্স। কিন্তু মিসেস অরুণ সরকার, আপনি ভুল টাইম জোনে ল্যান্ড করেছেন। এখানে ভালোমানুষের ভাত, রুটি, বিরিয়ানি কিছুই নেই। সে আপনার কপাল ভালো আমার বাপ জুটেছে কপালে। নইলে যে আপনার কি হতো!”
পাতা রাগে গজগজ করে অরুণের উদ্দেশ্যে বলল, “আপনার বেয়াদব মেয়েকে চুপ করতে বলুন, নয়তো একটা মারও পিঠের বাইরে যাবে না।”
অরুণিতা হঠাৎ হেসে ফেললো। হাসতে হাসতেই বলল, “আপনার হাসবেন্ডকে ভয় পাই না আমি।”
“বেয়াদব।”
“থ্যাঙ্ক ইয়্যু!”
“আমি কিন্তু রেগে যাচ্ছি!”
পাতা বলার মতো কিছু খুঁজে পেল না। রাগে ফোঁস ফোঁস করছে শুধু। অরুণিতা সোজা হয়ে বসে। ঘুম উড়ে গেছে। ক্ষুধায় মেজাজটাও খারাপ হচ্ছে। অরুণ চিকেন রোলের প্যাকেটটা এগিয়ে দিল। অরুণিতার পেটের ভেতর গুড়গুড় শুরু। সে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে প্যাকেটটা হাতে নিয়ে খাওয়া শুরু করলো।
পাতা মুখ বাঁকিয়ে বলল, “সেই খাবিই যখন হুদাই নাটক কেন দেখালি?”
অরুণিতা রোলে কামড় দিতে নিয়েও থেমে যায়। অরুণ সরকার বিপদ সংকেত পেয়ে যায়। সে ঘার ঘুরিয়ে পাতাকে বলে, “চুপ করো পাতাবাহার।”
“আগে আপনার মেয়েকে চুপ করান। ও বেশি বেশি বলে।”
পাতা অপ্রতিরোধ্য কণ্ঠে বলে। অরুণ সরকার মেয়ের দিকে আড়চোখে চেয়ে বলে, “আমার মেয়ে চুপ করেই আছে। তুমিই বেশি বেশি বলছো।
পাতা শাণিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, “আমি বেশি বেশি বলছি? একটু লেট হয়েছে বলে এরকম মেজাজ দেখাবে? ঢং যাবে না!”
অরুণ অদ্ভুত চোখে তাকায় পাতার দিকে। এই মহিলার হয়েছে কি? হঠাৎ হঠাৎ রেগে কেন যাচ্ছে? অল্পতেই মেজাজ দেখাচ্ছে!
—————
নানান রঙের বেলুন আর ফেইরি লাইটস দিয়ে ড্রয়িং সাজানো হয়েছে। মাঝখানে টেবিলে মাঝারি আকারের একটি চকলেট কেক যার উপরে 'Happy Birthday Chorui' লেখা আছে। পনেরোটা ছোট মোমবাতি যা এখনও জ্বালানো হয় নি। ড্রয়িং রুম আপাদত ফাঁকাই শুধু মিনু একা বসে পান বানাচ্ছিলো। হঠাৎ অরুণাভ সরকারকে ফোনে কথা বলতে বলতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে দেখে সে। খানিকটা বিব্রত বোধ করলো বৈ কি। ভুল বুঝে ছেলেটার উপর অনেক রাগ করেছিল সে। কিন্তু আভারি লোকটা যখন এসে সব খোলাসা করলো, 'ভোর বলেছিল ছোট ছোটদের মতো থাকবি।' বড় ভাইয়ের মতো শাসন করে বললেও নয়ন ভুল বুঝে মুখ কালো করে নিয়েছিল। মন খারাপ করে মায়ের কাছে বলেছিল, ‘তোমার অতি আদরের ভোরবাবা আমাকে ছোটলোক বলেছে।’ প্রথমে বিশ্বাস না করলেও ছেলের চোখের পানিতে সে অবিশ্বাস করতে পারে নি। অভিমান পুষে নেয় মাতৃমন। মা ছেড়ে যাওয়া ছেলেকে বুকে জড়িয়ে মমতার সাথে মানুষ করলো, চোখের তারায় রাখলো, সেই ছেলে বড় হয়ে তারই বুকের ধনকে ছোটলোক বলে অপমান করতে পারলো? তাই তো ভোরকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিলো সে। কিন্তু সত্যিটা জানার পর বুকটা কেমন মুচড়ে উঠেছিল। ভাবতে ভাবতে খেয়াল করে তাঁর গাল বেয়ে অশ্রুরা গড়িয়ে পড়ছে। সে আঁচলে মুছে নেয়। সরাসরি তাকায় তাঁর ভোর বাবার দিকে।
নিত্যদিনের ভ্যেস ছেড়ে বাপের কালো স্যুট ব্যুট পড়েছে আজ। বাবড়ি চুল গুলো জেল দিয়ে সেট করা। শেভ করা চিকনা চোয়াল কিঞ্চিত শক্ত হয়ে আছে। ঘন পাপড়িতে লুকিয়ে থাকা বিড়াল চোখ দুটো বেশ তীক্ষ্ণ। বাম চোখের নিচের কালো তিলটা এখন চেয়ে থাকে, দূর থেকে সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে।
"তা-ও আনুমানিক কতক্ষণ লাগতে পারে? ওহ্ আচ্ছা। আমাদের সব অ্যারেঞ্জমেন্ট শেষ। সবাই রেডি হচ্ছে। তুমি কাছাকাছি এসে ফোন দিও শুধু। আচ্ছা রাখছি!"
অরুণাভ ফোন রেখে মিনুর দিকে তাকালো একবার। কিছু বললো না। তবে গলা চড়িয়ে বন্ধু মোহনকে ডাকলো একবার। মিনু এগিয়ে আসে। মাথায় হাত রাখার প্রয়াসে হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু নাগাল পায় না। তাঁর কোমড় জড়িয়ে থাকা ছেলেটার এখন নাগাল পাওয়া যায় না, ভাবা যায়?
অরুণাভ মাথাটা ঝুঁকে নিলো। মিনু পান খাওয়া টকটকে মুখে ঝলমলে হাসলো। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, "তোমারে মেলা সুন্দর লাগতেছে ভোর বাবা। পুরাই তোমার বাপের মতোন। আল্লাহ পাক তোমারে স্যারের মতোন অনেক বড় মানুষ বানাইক। একশ বছর বাঁচাই রাখুক, অনেক নাম কামানের তৌফিক দিক।"
"ধন্যবাদ মিনু খালা।"
মিনু খেয়াল করে ভোর আগের মতো সেই হাসিটা তাঁকে দিচ্ছে না। না তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলেছে, 'তুমিও আমার সাথে আরো একশ বছর বাঁচো, তোমার সব রোগবালাই দূর হোক!' মিনু ইতস্তত বোধ করে বলে, "ভোর বাবা, তুমি কি আমার উপর গোস্বা করছো?"
"না।"
"আমি জানি তুমি গোস্বা করছো। আসলে হইছে কি বাবা নয়ন কইছিলো..."
"নয়ন বললো আর তুমি বিশ্বাস করলে? তুমি কি আমাকে চেনো না মিনু খালা? একটাবার আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারতে যে, কথাটা আমি আদৌ বলেছি, কি-না! বললে কিভাবে বলেছি। তোমার পেটের ছেলে বলেছে যখন ঠিকই বলেছে। আমি তো দূরের মানুষ তোমার।”
"ভোরবাবা এইল্ল্যা কি কও তুমি? দূরের ক্যান হইবা..."
মোহনলালের আগমনে মিনু থেমে গেল। অরুণাভ শান্ত সুরে বলল, "থাক বাদ দাও ওসব কথা। তুমি একটু কষ্ট করে ড্রয়িংরুমের লাইট নিভিয়ে দাও। আমি জানালা গুলো বন্ধ করছি।"
মিনু কাতর, স্নেহভরা চোখে চেয়ে। অরুণাভ সন্তর্পণে চলে যায়। জানালা গুলো বন্ধ করে দরজা চাপিয়ে দেয়। পুরো ড্রয়িংরুম এখন আবছা অন্ধকার। সে পা টিপে টিপে সোভায় এসে বসলো।
মোহনও এসে বন্ধুর পাশে বসে।
"বাডি কি হয়েছে তোর?"
"কি হবে?"
"হেঁয়ালি না করে বল কি হয়েছে?"
"কিছু না বাডি।" অরুণাভ আবারও অস্বীকার করে।
মোহনলাল কতক্ষণ বন্ধুর শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। চোয়াল ধরে মুখ তার দিকে ঘুরিয়ে বলে, "কিছু হয় নি যখন, কাল রাতে ওমন বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদছিলি কেন?"
"কাঁদছিলাম? কখন?"
অরুণাভ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মোহন চোখ বড়বড় করে বলল, "কি ধাপ্পাবাজ তুই অরুণাভ! অদ্ভুত চাঁপা কান্নার আওয়াজে আমার ঘুম ছুটে যায়। আওয়াজের পিছু পিছু গিয়ে আমি ওয়াশরুমের দরজা খুলে উঁকি দিয়ে দেখেছি, তুই কমোডের উপর বসে কাঁদছিলি।"
"ইন ইয়্যুর ড্রিম বাডি।" অরুণাভ ধরা ছোঁয়াই দিলো না। মোহন এবার ভাবনায় বুঁদ হলো। সত্যিই স্বপ্ন দেখছিলো নাকি!
"হেয় ইয়াং ম্যান!" আরিয়ান সরকার এসে সিঙ্গেল সোফায় বসলো। মোহন তাঁর ভুবন ভোলানো হাসি দিয়ে বলল, "হেয় ওল্ড ম্যান। হোয়াটসঅ্যাপ?"
আরিয়ান চুলের ভাঁজে আঙুল চালিয়ে পাকা চুল গুলো ঢাকার চেষ্টা করে বলে, "এভাবে বোলো না। বুকে কষ্ট লাগে।"
"কষ্ট পাবেন না আঙ্কেল। আপনাকে এখনও ইয়াং-ই লাগে। কিন্তু আপনার ভাইটা পুরোই বুড়িয়ে গেছে। শুধু চামড়া কুঁচকে যাওয়া বাকি। আশা করছি খুব শিঘ্রই চামড়াও কুঁচকে যাবে।"
আরিয়ান তাঁর বলার ভঙ্গিতে হেসে বলল, "কি যে বলো! ভাইয়ের কানের পিঠের চুল ছাড়া পুরো মাথায় কালো মিচমিচে চুল। দাড়িতেই যা একটু আকটু পাকা চুল দেখা যায় সাদা। আর আমার মাথায় সাদা চুলের ফাঁকফোকরে দুই একটা কালো চুল! ছোট হয়েও আমিই দ্রুত বুড়ো হয়ে গেলাম। সব ভাইয়ের হারামখোর বন্ধুদের বদ দোয়ার ফল। হুমুন্দিগুলো আমাকে দেখতেই পারে না।"
"আমার কাছে তো ওনাকেই বেশি বুড়ো লাগে। আর কষ্ট হয় পাতা ম্যামকে দেখলে। কষ্ট বুকটা ধিকিধিকি করে বুঝলেন আঙ্কেল?"
মোহনের চোখে মুখে দুঃখ উপচেপড়া। আরিয়ান বাঁকা চোখে চাইলো। অরুণাভকে উদ্দেশ্য করে বলে, "তোমার বন্ধুর হাবভাব সুবিধার না।"
"সত্যিই সুবিধার না আঙ্কেল। সুযোগ পেলে আপনার বুড়ো ভাইকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমি আমার ক্রাশ পাতাবাহারকে নিয়ে পালিয়ে যাবো।
অরুণাভ কে বলতে না দিয়ে নিজেই নিজের মনোভাব প্রকাশ করে দিলো মোহন লাল। আরিয়ান হো হো করে হেসে উঠলো। বলল, "এসব মজা ভুলেও ভাইয়ের সামনে কোরো না। ভাই তোমাকে কাঁচা গিলে খাবে।"
"তাঁকে কে ডরায়! যাইহোক আঙ্কেল, রবি ম্যামও কিন্তু কম না। আমি তো ভেবে কুল, কিনারা, দিশা কিছুই খুঁজে পাই না। আপনারা এতো সুন্দর সুন্দর মেয়ে কিভাবে পটালেন? কালাজাদু ছাড়া এটা বেসম্ভব ব্যাপার!"
হেসে উঠলো আরিয়ান। তবে তাঁর হাসি থেমে যায় অরুণাভের মেঘে ছাওয়া মুখ দেখে। কেমন গম্ভীর হয়ে আছে।
"ভোর, কোনো সমস্যা? মুখটা ওরকম করে রেখেছিস কেন?"
"আ'ম ফাইন চাচ্চু।"
অরুণাভ যথাসম্ভব গম্ভীর গলায় জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলো। আরিয়ান বাঁকা চোখে চাইলো, "আমি আসায় মুখ ওমন বানালি নাকি!"
"যেমনটা মনে করো।"
আরিয়ান কিছু বলতে উদ্যত হয়, কিন্তু আনিকার আগমনে আর বলা হয় না। আনিকা তাদের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে নিজ গাউন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখায়। হাস্যোজ্জ্বল মুখে জিজ্ঞেস করে,
"কেমন লাগছে আমাকে? সুন্দর না লাগলেও কিন্তু সুন্দর বলতে হবে!"
আরিয়ান মেয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মোহনও দুই একটা প্রশংসা উগড়ে দিলো। তবে অরুণাভ অনুভূতিহীন চোখে হাস্যোজ্জ্বল মুখের দর্শন করে। তাঁর চোখে চোখ পড়তেই আনিকা মুচকি হাসলো। একটুও বিব্রত বোধ করে না। সহজ গলায় বলল, “ভোর, কেমন লাগছে আমাকে?”
“পেতনির মতো।” অরুণাভও সহজ ভঙ্গিতেই চিরচেনা জবাব দেয়।
আনিকা মুখ বাঁকিয়ে বলে, “আগে নিজেকে আয়নায় দেখে আয়। হুতুম পেঁচা চেয়ে কম কিছু লাগছে না।”
এরইমধ্যে রুবি, আদুরি, আরাভ, নয়ন, রূপ, আভারি, মিনু এসে উপস্থিত হয়। টুকটাক কথায় কথা বাড়ে। সবের ভিড়ে অরুণাভ চুপচাপ মোবাইল ঘাটে।
দুই হাতে ঠেলে কারুকাজে খচিত কাঠের বিশাল দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে অরুণিতা। ভেতরের পরিবেশ অন্ধকার দেখে গম্ভীর কপালে ভাঁজ সৃষ্টি হয়।
“অন্ধকার করে রেখেছে কেন? পাপা তোমার ফোনটা দাও তো?”
অরুণ সরকার পকেটের হাত রেখে বলে, “ফোনে চার্জ নেই অফ হয়ে আছে!”
অরুণিতা মায়ের দিকে তাকায়। পাতাও আমতা আমতা সুরে একই জবাব দিলো। প্রহর মিটিমিটি হাসে। অরুণিতার চাহনি সুক্ষ্ম হয়। সে পা টিপে টিপে হাঁটে। হঠাৎ একঝাঁক আলো তাঁর উপর হামলা করে। অরুণিতা চোখের উপর হাত রেখে বাঁধা দেয়। একটু ভীত হয় বৈ কি। আতংকিত হয়ে ডাকে, “পাপা… মাম্মাম?”
ড্রয়িং রুম হঠাৎ আলোকিত হয়ে ওঠে। ফেইরি লাইটসের আলোয় ঝলমল করছে। মনে হচ্ছে রূপকথা এসেছে তাদের বাড়ি। অরুণিতা সামনে তাকায়।
সকলে সমস্বরে ‘সারপ্রাইজ’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে।
তারপর হাততালির সাথে জন্মদিনের শুভেচ্ছা বানী। অরুণিতা পেছনে তাকায়। পাতা এগিয়ে এসে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নেয়। কপালে চুমু দিয়ে আদর করে ডাকে, ‘আমার আম্মু!”
অরুণিতা মুচকি হাসলো। হঠাৎ লাইট নিভে গেলো। স্পটলাইট চলে গেলো ড্রয়িংরুমের সিঁড়িতে। নয়ন, রূপ, মোহনলাল আর তাদের মধ্যে আনিকা দাঁড়িয়ে। সবাই পিঠ ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। মোহনলাল মিউজিক বলে চেঁচাতেই গানের সুর ভেসে আসে। আনিকা ঘুরে দাঁড়িয়ে গানের তালে তালে মুখাভঙ্গি করে আর হালকা পাতলা নাচে।
'ম্যায়নে জিসে আভি আভি দেখা হেয়,
কন হেয় ওহ্ আনজানি?'
আনিকা অরুণিতার দিকে আঙুল তুলে ইশারা করে। এবার ঘুরে গেলে নয়ন, রূপক ও মোহনলাল। অরুণিতার দিকে ইশারা করে তাঁরাও নেচে নেচে মুখাভঙ্গি করে দেখায়,
"ওহ্ হেয় কই কলি
ইয়া কই কিরন,
ইয়া হেয় কই কাহানি?
উসে জিতনা দেখু,
উতনা সোচু!
কেয়া মেয় উসকো পুকারু?
প্রিটি ওম্যান, দেখো দেখো না!
প্রিটি ওম্যান! প্রিটি ওম্যান…”
সবাই দৌড়ে আসে অরুণিতার কাছে। তাঁর সামনে গোল গোল ঘুরে তাঁকে ধাক্কা মেরে, গাল টিপে, থুতনি ধরে আবারও সবাই তালে বেতালে কোমর দোলায় গানের সুরে।
‘ওহ তো পাল মেয় খুশ হেয়,
পাল মেয় খফা!
বাদলে ও রাং হার ঘাড়ি!
পার যোভি দেখু রূপ উসকা,
লাগতি হেয় পেয়ারি বাড়ি!
উসকো যিতনা দেখু
উতনা সোচু!
কেয়া ম্যায় উসকো পুকারুউ…’
আনিকা অরুণিতাকে টেনে নেয় দলে। সবার সাথে অরুণিতাও দুই হাত তুলে তালে তাল মেলায়!
‘প্রিটি ওম্যান, দেখো দেখো না প্রিটি ওম্যান…’
অরুণিতার মুখ জুড়ে ঝলমলে হাসি। তাঁর এই হাসি সচরাচর দেখা যায় না। সে ক্যামেরা হাতে ঘোরা বড় ভাইকে ইশারা করে, নাচে যোগদান করতে। অরুণাভ মানা করে ইশারায় বোঝায় সে ক্যামেরা হাতেই ঠিক আছে। মোহন লাল নাচের ফাঁকে ফাঁকে পাতার দিকে তাকায়। তাঁর মনে দুষ্টু বুদ্ধি কিলবিল করছে! কিন্তু ক্রাশের পাশে সিনা টান টান করে দাঁড়িয়ে থাকা ষাঁড় মুখো মানবকে দেখে সাহস হচ্ছে না। তবে সে হাল ছাড়ে নি। প্রথমে প্রহর আর আরাফকে টেনে আনে। রূপকে ইশারা করে রুবিকেও নাচতে বাধ্য করায়। আরিয়ান সরকারও সুরসুর করে চলে আসে। তারপর অনেকটা সাহস নিয়ে সে পাতার সামনে হাজির হয়। হাতটা ধরে বলে,
“ম্যাম, আপনি কেন বাদ যাবেন? লেটস জয়েন আস!”
মোহনলাল পাতার হাত ধরে টানে, পাতা বাঁধা দেয় না। তাঁর মনটাও আঁকুপাঁকু করে। কিন্তু সে আগাতে পারে না। সে দুঃখী মুখ বানালো। মোহন ইশারায় বলল,
“কি হলো?”
পাতাও ইশারায় অপর হাত দেখায়। মোহন তাকায়, নরম পেলব হাতের কব্জি শক্ত হাতের মুঠোয় ধরে রেখেছে। সে হাতের মালিকের দিকে তাকায়। বত্রিশ পাটি দেখিয়ে বলে,
“আঙ্কেল, আপনিও জয়েন করতে পারেন। বাট আই থিংক আপনার কোমড়ে ব্যথা আছে। বুড়ো বয়সে এটা কমন! থাক আপনাকে নাচতে হবে না। আপনি বরং ম্যামের হাতটা ছাড়ুন, ম্যামের চোখমুখ বলে দিচ্ছে সে কতটা আগ্রহী! তাই না?”
পাতা লজ্জা পেয়ে মাথা নাড়লো। অরুণ সরকার সেদিকে না তাকিয়েই গম্ভীর গলায় বলল, “তোমরা বাচ্চারা এনজয় করো। সে যাবে না।”
মোহন আর বাড়াবাড়ি করলো না। আবারও ড্যান্স ফ্লোরে হারিয়ে গেলো। একটার পর একটা জমজমাট বলিউড, বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় গান। পাতার হাসিমাখা মুখে মেঘ জমতে শুরু করে দিয়েছে ততক্ষণে।
“পাতাবাহার, ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড ইয়্যু আর নট এলোন।”
অরুণের কথায় পাতার পুরনো ঘা তরতাজা হয়। ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে দূরত্ব মেপে নেয়। ক্যামেরা হাতে অরুণাভ খেয়াল করে সবই। সে ক্যামেরা মোহনের হাতে ধরিয়ে এগিয়ে আসে। মায়ের হাত ধরে নিয়ে যায় ফ্লোরে। গোল গোল ঘুরিয়ে মায়ের সাথে সেও তাল মেলায়। মোহন হৈ হৈ করে উঠে। ক্যামেরা আভারির হাতে ধরিয়ে পাতার কাছে চলে যায়। মধ্যে পাতা আর মোহন, অরুণাভ দুই পাশে। যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখেই নাচছে তিনজন। তবে অরুণ সরকারের সইলো না। সে মেয়ের ব্যাগটা নিয়ে চলে গেলো দোতলায়।
মোহন পাতার কানে কানে ফিসফিস করে বলে, “ম্যাম, আঙ্কেল জ্বলে পুড়ে ছারখার!”
পাতা মোহনের দুষ্টু হাসিতে কান টেনে ধরে হেসে বলে, “বদ ছেলে!”
নাচানাচির এক পর্যায়ে সবাই একে একে ক্লান্ত হয়ে সোফায় বসে পড়ে। গানবাজনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। অরুণিতা কপালে হাত দিয়ে বসে পড়লো। হতাশ সুরে বলল,
“আনিপু, দেখো আমি স্কুল ড্রেস পরে! তোমরা অ্যাটলিস্ট ড্রেস চেঞ্জ করার সময় দিতে! সো মাচ সিট!”
আনিকা তাঁর এলোমেলো করে বাঁধা ঝুটি খুলে দিয়ে বলল, “আভি তো পার্টি শুরু হুয়ি মেরি জান। ঝটপট চেঞ্জ করে আয় ভাই। কেক কাটার পর আবারও শুরু হবে পার্টি!”
অরুণিতা চলে যায় ড্রেস চেঞ্জ করতে। মিনিট বিশেকের মধ্যেই রেডি হয়ে ফিরে আসে। সবাই কেক কাটতে জোরাজুরি করে। অরুণিতা এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে, “পাপা কোথায়?”
“আমি ডেকে আনছি। রূপ ক্যান্ডেল গুলো জ্বালা, সাবধান কেক নষ্ট হলে তোকে উল্টো লটকে দিবো।”
বলতে বলতেই অরুণ সরকারকে দোতলা থেকে নামতে দেখা যায়। অরুণিতা ‘পাপা’ বলে ডাক দিলো। অরুণ সরকার মেয়ের পাশে এসে দাঁড়াল। অরুণিতা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
“ব্রো, তোমাকে নতুন করে ইনভাইট করতে হবে?”
অরুণাভ এগিয়ে এসে বোনের অপর পাশে দাঁড়ায়। অরুণিতা মায়ের দিকে তাকায়, “মাম্মাম ইয়্যু ওলসো!”
পাতা আসতে চায় না, অরুণাভ জোর করে নিয়ে আসে। প্রহর আগ্রহ ভরা চোখে নিজ ডাকের অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু সবাই যেন তাঁকে ভুলে গেলো। অরুণিতা মোমবাতি গুলো নিভিয়ে দিতেই রূপক, নয়ন আর মোহনলাল পার্টি প্রে, পার্টি পপার উড়িয়ে দেয় শূন্যে। সবাই সমস্বরে শুভেচ্ছা জানায়। অরুণিতা কেক কেটে বাবাকে খাওয়ায়, তারপর মা'কে তারপর ভাইকে, আনিপু, রূপ, নয়ন, মোহন ভাইয়া, আরাফ, আদুরি ফুপ্পি, চাচ্চু, চাচিমনি, মিনু খালা, সুফিয়া খালা, আভারি কাক্কু! তবে সবের ভিড়ে মন খারাপ করে চলে যাওয়া ছোট্ট প্রহরটাকে খেয়ালই করলো না।
টলমলে দিঘীর পানিতে ঢেউ উঠেছে। যেকেনো সময় কিনারা ডিঙিয়ে উপচে পড়বে। প্রহর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে শ্বাস নেয়। ঘরে এসে আলমারি খুলে ভেতরে বসে লাগিয়ে দিলো পাল্লা। সব কেক খেয়ে নিলো? তাঁকে একটুও দিলো না?
প্রহরের কথা সর্বপ্রথম মাথায় আসে অরুণ সরকারের। সে এদিক ওদিক খুঁজে বেড়ায়। প্রহরের খোঁজ পায় না। পাতা বলল, “রান্নাঘরে আছে কি-না দেখুন তো!”
অরুণ সরকার রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। সেথায় সুফিয়া বানু আর মিনু বসে নিজেদের মধ্যে গল্প গুজব করছিলো। সুফিয়া বলেছিলো,
“ভোর ছলডারে মন মরা দেখলাম। সবাই হাইসলো গাইলো, নাচলো, হেয় খালি চাইয়া দেখলো! চঞ্চল ছলডা হেদিনের পর থাইক্যা কেমন হইয়া গেছে! খারাপই লাগে।”
মিনু চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করলো, “কি কও? কোনদিনের পর থাইক্যা? কি হইছে ভোর বাবার?”
“তুমি জানো না মিনু আপা?”
“না তো! কি জানমু?”
“আরে ভোর বাবা আনিবুড়িরে ভালোটালো বাসে…”
সুফিয়া খালা সংক্ষেপে সবটা খুলে বলল। মিনুর চোখের আকার বড় হয়। সুফিয়া খালা হায়হুতাশের সুরে বলে, “হেয়দিন পোলাডা আনিবুড়ির ঘরে গেছিল। বেশি রাইত না, দশটা কি এগারোটা বাজে। ভেতরে কি কি বানি করতেছিল..কতা কইতেছিল মনে হয়। যাইহোক আমি আর রুবি ম্যাডাম আনিবুড়ির ঘরেই কিসের জন্যে জানি যাইতেছিলাম। দরজা অর্ধেক খোলা থাকায় ম্যাডাম আর কড়া নাইড়লো না। সরাসরি ভেতরে ঢুকলো। পোলা মাইয়া একজন আরেকজনরে জড়ায় ধরছিলো। ম্যাডাম তো সেই রাগ। ভোররে টাইন্যা মাইরছে চড়। সে কি চড়ের শব্দ! ফর্সা গাল নিমেষেই লাল হই গেলো। ম্যাডাম কতকিছুই না কইলো। পোলাডা মাথা হেট কইরা সব হুনতেছিল। একটা জবাবও দিলো না। কি ভদ্র পোলা! অন্য কেউ হইলে সইতো? আর ম্যাডামরেও বলিহারি! ভোর কি খারাপ? তুই কি চিনোস না ভোররে? ও ওমন স্বভাবের পোলা? লজ্জা অপমানে চোখ দুইডা টলমল করতেছিল পোলাডার। আমার কি যে খারাপ লাগতেছিল মিনু আপা!
সুফিয়ার হায়হুতাশ। ভোরের মিশুক প্রকৃতি তাঁর খুব ভালোলাগে। সে এবাড়ির কাজের মহিলা তাও কত সুন্দর করে খালা বলে ডাকে। তাঁর খেয়াল রাখে। ভালোমন্দের খোঁজ নেয়। ছেলেটার প্রতি আলাদাই মায়া কাজ করে। আর সেই ছেলের গায়ে ওই মহিলা কিভাবে হাত তুললো? ওরই ভাতিজা, আপন মানুষ। মিনু ব্যথিত হওয়ার আগে চমকিত হয়। রান্নাঘরের দরজায় অরুণ সরকার দাঁড়িয়ে।
—————
ভরপেটে ক্রিমযুক্ত কেক! পাতার কেমন গা গুলিয়ে আসছে। গা ঘেমে উঠছে। অস্থির অস্থির লাগছে। বমি হবে নিশ্চিত! সে একদন্ড না দাঁড়িয়ে ড্রয়িংরুমের আড্ডা থেকে বেরিয়ে গেলো। অনেকে কষ্টে সিঁড়ি বেয়ে দোতলা অবদি উঠে বসে পড়লো। আর পা চলছে না। গায়ে বল নেই এক চিমটিও। সে ওয়াক ওয়াক করে বমি করার চেষ্টা করে, বমি হয় না। পাতা ছটফট করে। গলা দিয়ে শব্দ বেরোয় না। অনেক কষ্টে ‘ভোরের বাবা’ বলে ডাকলো একবার।
কোলাহলের ভেতরেও অরুণাভের মনে হলো কেউ গোঙাচ্ছে! সে কৌতুহল বশত দোতলার বারান্দায় তাকায়। কমলা রঙের শাড়ির আঁচলটার একাংশ রেলিং ভেদ করে ঝুলছে। অরুণাভ তড়িৎ গতিতে দোতলায় উঠে আসে।
“আম্মু… কি হয়েছে তোমার? এখানে এভাবে…দেখি তাকাও আমার দিকে?”
পাতা আবারও ওয়াক করে উঠলো। কিন্তু বমি হলো না। শরীর ঘেমে নেয়ে অস্থির। অরুণাভ কাঁধ ধরে নিজের সাথে হেলান দিয়ে বসায়। এরমধ্যেই আনিকার আগমন। অরুণাভের পিছুই এসেছিল সে। চাচির এহেন দশায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে,
“কি হয়েছে চাচি মনির?”
“বুঝতে পারছি না। আম্মু…? কি হয়েছে? দেখি কথা বলো আমার সাথে? কোথায় খারাপ লাগছে?”
পাতার চোখ ঘুলি দিয়ে আসে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। পেটের ভেতল জ্বালাপোড়া করছে। সে কিছু বলতে পারে না। আনিকা বলে,
“ঘরে নিয়ে চল! দাঁড়া আমি সাহায্য করছি।”
আনিকা সাহায্য করার আগেই অরুণাভ মা'কে পাঁজাকোলা করে তুলে ঘরের দিকে রওনা হয়। ঘরে আসতেই পাতা কোনোরকম উচ্চারণ করলো,
“ওয়াশ রুমে..পেট গুলাচ্ছে !”
অরুণাভ ওয়াশ রুমে নিয়ে যায়। পাতা বেসিনে ঝুঁকে গলগলিয়ে বমি করে। অরুণাভ পাশে দাঁড়িয়ে ধরে রাখে তাকে। বেসিনের কল চালু করে দেয়। লাগাতার বমি করার পর দূর্বল লাগলেও পেট খালি হওয়ায় পাতা স্বস্তি বোধ করে। কুলকুচি করে মুখে পানির ছিটা দেয়। দাড়িয়ে থাকার শক্তি টুকুনও নেই। সে ছেলের বুকে মাথা রেখে চোখ বুজে নেয়।
“আম্মু… আর বমি করবে? নাকি ঘরে নিয়ে যাবো।”
“ঘরে!”
অরুণাভ তাঁকে ঘরে নিয়ে যায়। বিছানায় শুইয়ে ফ্যান ছেড়ে দিলো। আনিকা শিয়রে এসে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ভেজা মুখটা মুছে দেয়।
“একটু আগেও তো ঠিক ছিলো। হঠাৎ কি হলো!”
“বুঝতে পারছি না।”
আনিকা অরুণাভের দিকে তাকায়। চোখ পিটপিট করে বলল, “আম্মু বলছিল, চাচিমনি লাস্ট কিছুদিন হলো অনেকবার বমি করেছে।”
“কি বলছিস!”
“হ্যাঁ, আম্মু তো তাই বলছিল। আমি ওনাদের মজা করতেও দেখেছিলাম। আম্মু বলছিল, আবার টেওটেও এলো নাকি!”
“টেওটেও বলতে?”
আনিকা কপাল চাপড়ায়। হেসে বলে, “বুদ্ধু, প্রেগন্যান্ট হয়তোবা সেকথাই বলছে।”
অরুণাভ বাঁকা চোখে চায়। আনিকা ঠোঁট চেপে হেসে বলে, “মনে হচ্ছে আবারও ভাই হতে চলেছিস!”
“আম্মু অসুস্থ আর তোর মজা মনে হচ্ছে! যা তো এখান থেকে! বিরক্তিকর!”
আনিকা মুখ ঝামটা মেরে বলল, “যেটা শুনেছি সেটাই বলছি!"
অরুণাভের মুখটা গম্ভীর হয়ে আসে। বিরক্ত স্বরে বলে, “ফালতু কথা বলিস না তো। আমি আব্বুকে ডেকে আনছি। ততক্ষণ এখানেই থাকিস!”
অরুণাভ চলে গেলে আনিকা চাচির মাথায় হাত বুলিয়ে ধীরে ধীরে ডাকতে থাকে।
—————
“ও যদি কোন ভুল করেও থাকে তুমি আমাকে এসে জানাতে, আমি করতাম শাসন। ছোটবেলা থেকেই করে আসছি। পান থেকে চুন খসলেই তো তোমরা নালিশ করতে ওর নামে…”
“ভাইয়া আস্তে কথা বলুন। আমার কাছে ভুল মনে হয়েছে আমি শাসন করেছি। ছোট নেই আর ওঁরা। যথেষ্ট প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে। এর আগেও ছাদে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখেছি, তখন আমি ছেড়ে দিয়েছি। এটাই ভুল ছিলো। তখন যদি দু ঘা দিতাম আর সাহস করতো না। আর আপনি কোন মুখে আমার কাছে কৈফিয়ত চাইছেন? আপনি যদি ছেলেকে শাসন করাই জানতেন আপনার ছেলের এতোটা অধঃপতন হতো না নিশ্চয়ই!”
অরুণ সরকারের চোখ দুটো অগ্নি ঝরা। রাগে হাত দুটো মুষ্টিমেয় হয়ে আছে। সে কাটকাট গলায় বলল, “আমার কলিজা কেমন তা পুরো শহর জানে। তুমিও খুব ভালোভাবেই জানো। তারপরও তাঁর গায়ে দাগ লাগাতে তোমার বুক কাঁপে নি? এতো কিসের ক্ষোভ ওর প্রতি তোমার? আনিকাকে ভালোবাসে বলে, নাকি অফিসের সব শেয়ার ওঁর নামে বলে সহ্য করতে পারো না।”
“মুখ সামলে কথা বলবেন ভাইয়া। আপনার সো কল্ড অফিসের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নাই। আর সহ্য তো আপনি করতে পারেন না। এই সরকার বাড়ি শ্বশুর মশাই আরিয়ান, আদুরি আর আম্মার নামে করে দিয়েছে বলে আপনি রাগ পুষে ওদের ভাই বোনকে অফিসের শেয়ার থেকে বঞ্চিত করেছেন।”
রুবি চুপ থাকলো না মোটেই। অরুণ সরকার কম যায় নাকি। তাচ্ছিল্যের সাথে বলে, “আমাদের সহ্য হয় না বললেই হতো, চলে যেতাম তোমার রাজমহল থেকে। অরুণ সরকারের থাকার জায়গার অভাব পড়বে না। তাছাড়াও আমরা আসতেও চাই নি এই বাড়িতে। আরিয়ান পায়ে ধরে এনেছিল। আর অফিস নিলাম উঠেছিল। নিজে ধারদেনা করে দাঁড় করিয়েছি। কেউ ফিরে ফুচ্চি দেয় নি তখন। অথচ ভাগের বেলায় সব হাজির। অরুণ সরকার কারো হক মেরে খায় না। আরিয়ান, আদুরি দুজনের শেয়ার আছে। তাদের বোলো অফিসে আসতে। বুঝিয়ে দিবো, কাগজে কলমেই।”
রুবি হাসলো, “আরিয়ান যদি দেখতো তাঁর শ্রদ্ধেয় ভাইয়ের এই রূপ!”
“আমি মানুষটা তো ভালো না। যে রাগ গোস্বা করে পুরো অফিসটাই তোমার হাতে দিয়ে দেবো।”
“আপনার অফিস আপনি গুলে গুলে খান। আমরা রাস্তায় বসি নি যে আপনার দান ভিক্ষা নিতে হবে। বসলেও নিতাম না। আম্মা বলেছিল একবার, আব্বার অফিস নাকি আপনি একাই দখল করেছিলেন। তাই আমি অফিস জয়েন করার কথা ভেবেছিলাম। আম্মার অনুরোধে। আপনি সেকথার জেরে আমাকে লোভী প্রমাণিত করতেই পারেন। কিন্তু এই রুবি না খেয়ে মরবে আপনার অঢেল সম্পদের দিকে ফিরেও তাকাবে না। যদি তাকাতামই বিয়ের প্রস্তাবে আগেই রাজি হতাম। কিন্তু আমি আমার মেয়েকে অসুস্থ পরিবেশে পাঠাতে চাই না। আর হ্যাঁ, কথা বলার সময় একটু ভেবেচিন্তে বলবেন। সবাই পাতা না যে শুধু শুনবে, জবাব দিবে না।”
“হাউ ডেয়ার ইয়্যু!”
অরুণের সমস্ত বাঁধ ভেঙে চুরমার। সে আরও কিছু বলতে নিয়েছিল কেউ এসে বাহু ধরে টেনে ধরে।
“আব্বু, আম্মু কেমন যেন হয়ে গেছে। ইটস্ ইমার্জেন্সি। তুমি আসো প্লিজ!”
আকাশচুম্বী রাগ হঠাৎ ঝড়ে পড়ে। রাগ গোস্বা ফেলে ছুটে যায় অরুণ। অরুণাভও চলে যাচ্ছিলো। রুবি পিছু ডাকে। অরুণাভ দাঁড়ায় তবে ফিরে তাকায় না।
রুবি দৃঢ়ভাবে বলে, “আশাকরি আনিকার প্রতি আর উল্টোপাল্টা ভাবনা মাথায় আনবে না। আমি তোমাকে খারাপ বলছি না। তুমি অনেক ভালো ছেলে, কিন্তু আমার মেয়ের জন্য সঠিক নও। তুমি তোমার মায়ের মতো নরম শোভা কাউকে বেছে নিও। কারণ সম্পর্কে একজন আগুন হলে অপরজনকে পানি হতেই হয়। নইলে সংসার টিকে না।”
অরুণাভ পিছু ফিরলো না। ছোট্ট করে 'ধন্যবাদ' দিয়ে কদম আগে বাড়ালো। তাঁর ব্যুটের আওয়াজ অদ্ভুত সুর তুলে প্রতিধ্বনিত হয়, ঠক ঠক ঠক!
—————
রাত তখন বেশ গভীর। নিস্তব্ধতার চাদরে ঢেকে রজনী। ঝিঁঝিঁ পোকার দল পাল্লা দিয়ে ডেকে চলেছে। শিশির জমা মাঠে ব্যাট হাতে অরুণাভ শরীরের ঘাম ঝরায়। দ্রুত গতিসম্পন্ন ধেয়ে আসা বল ব্যাটের আঘাতে ঠক ঠক ধ্বনি সৃষ্টি করে। নেটের গায়ে বল গুলো নির্দিষ্ট বাউন্ডারিতেই আবদ্ধ থাকে। বল করতে করতে হয়রান চৈতন্য ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে মাঠে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
“এত্তো এনার্জি... বাপরে!”
অরুণাভ সরকার হেলমেট খুলে গম্ভীর মুখে এগিয়ে আসে। পানির বোতলের ছিপি খুলে স্বীয় মুখে ও মাথায় ঢেলে দেয়। ফেলে রাখা ব্যাটটা বগলে তুলে নিয়ে হাঁটা দেয়। যেতে যেতে বলে,
“কাল মাঠে দেখা হচ্ছে!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………