মেঘবন - অন্তিম পর্ব ৩৪ - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা - ধারাবাহিক গল্প

মেঘবন - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
          নক্ষত্র তালুকদার জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সর্বপ্রথম বাড়ি ফিরে বসার ঘরে এসে বসলেন। শূন্য দৃষ্টি টিভির কালো পর্দায় ফেলে নির্বাক চেয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। ঘোরে চলে গেলেন। জেলের পনেরোটা দিন ভালো ছিল না। খাবার-দাবার, গোসলখানা, পানি, শোয়ার জায়গা— সবকিছু নোংরা, ভেজালযুক্ত। প্রথম প্রথম বড় অফিসার এসে প্রতিদিন সকাল বেলা টহল দিতেন। বিনাকারণে নক্ষত্র তালুকদারের ওপর লাঠিচার্জ করা হতো। জিজ্ঞাসাবাদের নামে কত শত অত্যাচার! অথচ ভাইয়ের ব্যবসার কাগজপত্র রাখা আর দেখাশোনা ছাড়া তিনি আর কিছুই জানেন না। বৃদ্ধ শরীরে মারের ক্ষত চিহ্ন যেন এখনো সতেজ। অস্পষ্ট ব্যথায় পিঠ, পায়ের পাতা চিনচিন করে উঠছে। মাথায় ভনভন কিসব শব্দের প্রখরতা। নক্ষত্র তালুকদার তপ্ত নিশ্বাস ফেললেন। জাবেদ পাটোয়ারী হন্তদন্ত পায়ে তক্ষুনি বাড়ির চৌকাঠ মাড়িয়ে এলো। মাথা নুইয়ে স্বাগতম জানিয়ে প্রশ্ন করলো, ‘স্যার, ডাক্তার ডাকবো? ঠিক আছেন?’
নক্ষত্র তালুকদার কোনো শব্দ করলেন না। কেবল মাথা উপর-নিচ নাড়ালেন। বোঝালেন, তিনি ঠিক আছেন। 

জাবেদ— ত্রিশ বছরের একটা ছেলে। মা-বোন নিয়ে পথে দিন কাটাতো। নক্ষত্র তালুকদার দয়া করে তাকে ফ্যাক্টরির কর্মচারীর চাকরি দিয়েছিলেন। কর্মচারী থেকে এখন হয়েছে তার এসিসট্যান্ট। একমাত্র এই কম বয়সী অ-রক্তের ছেলেটাই তাকে জেলে দেখতে গিয়েছিল। তার নিজের মেয়ে তাকে দেখতে যায়নি। খোঁজ নেয়নি। তিনি উদাস গলায় শুধালেন, ‘ভাইজানের কি অবস্থা? কে করেছে এসব জানা গেছে?’

জাবেদ গলায় অপরাধীর সুর এঁটে জবাব দিলো, ‘স্যারের সঙ্গে কাউকে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের আইনজীবী দেখা করতে চাইলেও একজন কন্সটেবল সবসময় সাথে থাকে।’ একটু থেমে ঢোক গিলে বললো, ‘আমরা চেষ্টা করছি, স্যার। আপনি নিরাশ হবেন না।’ 

‘আর স্বপন? শুনলাম ওকেও পুলিশ ধরে ফেলেছে।’

জাবেদ এবার দ্বিতীয় দফা ঢোক গিলে জানালো, ‘সব স্বীকার করে ফেলেছে নিমো/কহারামটা। পরিস্থিতি এখন একদম হাতের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ফাঁসিটা একমাত্র জোর করে আটকে রাখতে পেরেছি। কিন্তু স্যার, জনগণ পুরো ক্ষেপে আছে। বেশিদিন ইমন স্যারকে নিরাপদ রাখা সম্ভব হবে না। এমনিতেও জেলখানায় তাঁর ওপর পাশ বিক নির্যা তন হওয়ার খবর কানে আসছে। এখন আপনি যা বলবেন আমরা তাই করবো। পার্টি অফিসের লোক আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছে। ওদের কি আসতে বলবো?’

নক্ষত্র তালুকদার নিরুত্তর। উত্তর দেবার কোনোরূপ আগ্রহও তার মাঝে দেখা গেল না। কেবল শূন্য দৃষ্টিটুকু এবার খালি, ফাঁকা দু'হাতের তালুতে রাখলেন তিনি। ভাবলেন, তবে কি এটাই শেষ? ভাইকে তিনি দেখতে যাবেন না। যাওয়ার কথাও না। ছোট থেকে বড়ো ভাই ইমন তালুকদারকে তিনি হিংসে করে এসেছেন। সদা শুনেছেন, ‘তোর ভাই তোর থেকে এগিয়ে। ওর থেকে কিছু শিখ। তুই ইমনের গোলাম। বোকা। সহজ, সরল। ওকে ছাড়া তুই জীবনে কিচ্ছু করতে পারবি না।’ 
এমনকি সম্পত্তি ভাগের বেলাতেও মা-বাবা ভেদাভেদ করেছেন। দুটো পুত্রকে সমান সমান দেওয়ার বদলে ইমন ভাগে পেয়েছে পাঁচ অংশের তিন অংশ। ভালোটা, বেশিটা। নক্ষত্র তালুকদার ভেতরকার আক্রোশ কখনো দেখাননি। বুকের ভেতর দুর্বার হিংসে-বিদ্বেষ চেপে ভাইকে বুকে জড়িয়েছেন, ভাইয়ের অপরাধ ঢেকেছেন। ইমন তাঁকে পদে পদে অপমান-লাঞ্ছনা করলেও টু শব্দটি করেননি। কিন্তু আর কত? নিজের ভালোটা এবার বুঝে নেওয়ার পালা। 

গালে লম্বালম্বি মাঝারি লাঠির দাগ জ্বলজ্বল করছে। সেথায় আঙুল ছুঁইয়ে ব্যথা পরিমাপ করলেন তিনি। পেট ডাকছে, কতদিন ভালো মন্দ খাওয়া হয়নি! জাবেদের জিজ্ঞাসু চেহারার দিকে তাকিয়ে তিনি ক্ষীণ স্বরে আওড়ালেন, ‘মাছ ভাত খাবো জাবেদ। বুয়াকে মাছ ভাত রাঁধতে বলো।’

নাকের ডগায় চশমা চলে এসেছে। আঙুল দিয়ে একটু ঠেলে জাবেদ নিচু গলায় বললো, ‘বাড়ির সব কাজের লোক চাকরি ছেড়ে দিয়েছে স্যার। তুবা ম্যাডাম ছাড়া এখন কেউ নেই।’

তুবা! মেয়েটা ঘরে আছে তবে! নক্ষত্র তালুকদার সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ফ্রেশ হওয়া দরকার। হাঁটতে গিয়ে বুঝলেন, শরীর দুর্বল হয়ে আসছে। কাঁপছে। তবে কি এখন লাঠি নিয়ে হাঁটাচলার বয়সে চলে এসেছেন তিনি? হতে পারে। বয়স তো কম হলো না।
জাবেদকে বললেন, ‘খাবার বাহির থেকে আনাও। তুবাকেও খেতে আসতে বলো। ওর সাথে কথা আছে।’

কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ নড়বড়ে হলো জাবেদের। ভয় পাচ্ছে? কিন্তু কিসের? ভীতু গলায় বললো, ‘ম্যাডাম আবারও ড্রাগ নেওয়া শুরু করেছেন, স্যার। কাল রাতে ড্রাগ নিয়ে বাহিরে যাওয়ার কারণে মিডয়ার লোক দেখে ফেলেছিল। এসেছেন ভোর বেলা। এখন বোধহয় ঘুমাচ্ছেন।’

দৈবাৎ গম্ভীর হয়ে উঠলেন নক্ষত্র তালুকদার। হাঁসফাঁস গলায় দৃঢ়তা বজায় রাখতে চাইলেন, ‘এবার কি চাই ওর? ওকে ডেকে তোলো। ওর সাথে সামনাসামনি কথা বলবো আমি।’

অথচ তুবা এলো না। বিশাল বড়ো খাবার টেবিলে একা বসে রইলেন নক্ষত্র তালুকদার। পাতে ভাত মাখিয়ে দীর্ঘক্ষণ। সময় গড়াতে লাগলো— এক মিনিট, দু'মিনিট, পাঁচ মিনিট, পনেরো মিনিট! বৃদ্ধ গলা ঠিকঠাক চিল্লাতেও পারলো না, ‘তুবা? নিচে আসতে বলেছি তোমাকে!’

জবাব নেই। মিহি মিহি সুরে ভাঙচুরের শব্দ হলো। পরপরই প্রখট আকার ধারণ করলো তা। ডাইনিংহল থেকে সরাসরি উপরে, তুবার ঘর দেখা যায়। তুবা ঘর থেকে বেড়িয়ে করিডোরের রেলিংঘেঁষে দাঁড়ালো। দ্বিগুণ চেঁচিয়ে বললো, ‘তো…তোর, তোর জন্য সব হয়েছে! তুই আমার জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছিস। বাপ নামে অ্যাস** তুই! আমার প্রাণ, তামজিদ আমাকে রেখে বিয়ে করে ফেলেছে। তোর কুকর্মের জন্য ও আমাকেও খারাপ ভাবছে। আমার তামজিদ!’ 

গলা ভেঙ্গে গেল। ভাঙা গলায় চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো তুবা। মাতাল ভাব তখনো কাটেনি। শরীর দুলছে। ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে থাকা দায়। 

‘ওর জন্য কত কিছু করেছি আমি। কত ভালোবেসেছি! সব কাজগপত্রও দিয়েছি। কিন্তু ও! আমার সঙ্গে কেন এমন করলো? আমি… আমি তো সত্যি ভালোবেসেছি৷ ও কেন বাসলো না? কেন… কেন? আমি সবাইকে মে রে ফেলবো। তোকে, ওর বউকে, সব্বাইকে!’

নক্ষত্র তালুকদার আঁতকে উঠে দাঁড়ালেন। ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি কাগজ? কি কাগজ দিয়েছো তুমি?’

তুবা জবাব দিলো না। প্রচন্ড রাগ-ক্ষোভে পাশ থেকে মাটির শোপিস নিয়ে ছুঁড়ে মা রলো নিচে। নক্ষত্র তালুকদার বরাবর। আচমকা তীক্ষ্ণ শক্তি তিনি সামলাতে পারলেন না। চেয়ারে বসে পরলেন। কপালে হাত দিয়ে দেখলেন, লাল রক্ত। টনটন করছে। স্তব্ধ হয়ে গেলেন তিনি। এ কাকে পেলে বড়ো করেছেন?

—————

কনসালটেশন রুমে এসির তাপমাত্রা নামানো। হিমালয় ছোঁয়া ঠান্ডা-শীতল হাওয়া যেন অচিরে শরীরের লোমকূপ পর্যন্ত শিউরে তোলে। বা'দিকে এক দেওয়াল জায়গা নিয়ে বিরাট জানালা। একপাশে হালকা নীল রঙের পর্দা চেপে রাখা। সূর্যের আলো তেছড়াভাবে ঢুকে ঘর আলোকিত করছে। ইজি চেয়ারে সটান হয়ে বসে সূর্যের উদীপ্ত আলোতেই কিসব রিপোর্টস্ দেখতে ব্যস্ত ছিল তারফান। চোখে মৃদু ক্লান্তিভাব। কপালে দুটো বলিরেখা এইমাত্র আওয়াজ পেয়ে উদয় হয়েছে। রোগী এসেছেন, নিঃশব্দ কদমে চেয়ারে এসে বসেছেন। কিন্তু কথা বলছেন না। তারফান না তাকিয়ে ব্যস্ত সুরে প্রশ্ন করলো, ‘জি, আপনার নাম?’

জবাব নেই। সাড়া নেই। তারফান ঝুঁকে থেকেই চোখ তুলে তাকালো। চোখের কোণের মসৃণ মাংসপিণ্ড নড়লো সঙ্গে সঙ্গেই। নক্ষত্র তালুকদার রোগীর চেয়ারে বসে আছেন। দৃষ্টি তার ওপর নেই। অচেনা চোখে আশপাশ দেখছেন তিনি। দেখা শেষে অবশেষে তাকালেন। গম্ভীর চোখ-মুখ। একপাশটা অবশের মতোন। বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলেন, ‘তামজিদ স্পন্দন।’

যেন কালো পাথরের নেমপ্লেটটার দিকে তাকিয়ে ডাক্তারের খোদাই করা নাম উচ্চারণ করেছেন। তারফান সোজা হয়ে বসলো। লোকটা তাকে তামজিদ ভাবছে। ভাবারই কথা। টানা দশদিন ডিউটি করার পর তামজিদের শরীর অসুস্থ। বেচারা ঘুমে চোখ মেলে তাকাতে পারছিল না। তারফান আবার অফ ডিউটিতে আছে। দুটো রিপোর্টস্ কেবল দেখা বাকি। তামজিদকে নিজের চেম্বারে ঘুমুতে পাঠিয়ে সে তামজিদের হয়ে রোগী দেখছে। ভাগ্যক্রমে তারা দু’জনেই একই বিষয়ের ডাক্তার কি-না!
নক্ষত্র তালুকদার সামান্য কাশি দিয়ে কণ্ঠস্বর স্পষ্ট করে তুললেন। দুর্বল অথচ নিজেকে দীপ্ত গাম্ভীর্যে মুড়িয়ে শুধালেন, ‘তুমি না-কি বিয়ে করেছো?’

প্রশ্ন থেকে কথাটা যেন আরও একবার জানানোর মতোই শোনালো। তারফান হাসলো। দুর্বোধ্য হাসির টান ঠোঁটে এঁকে সায় জানালো, ‘জি, আলহামদুলিল্লাহ। জোনাকিপোকার মতো আদর আদর আলো জ্বালানো অপরূপা একজনকে বিয়ে করেছি।’

আধপাঁকা ভুরু কুঁচকে তাকালেন নক্ষত্র তালুকদার। কথাটা তার পছন্দ হয়নি। হাতে তার একটা এনভেলপ ছিল। টেবিলের ওপর রেখে বললেন, ‘তোমার জন্য।’

কফিরঙে মোড়ানো এনভেলপটার দিকে তাকালো মাত্র না তারফান। চোখে হাসলো, ‘জমিজমার কাগজ দিচ্ছেন? বংশের বাতি জ্বালাতে কিনতে এসেছেন?’

অপমানে মুখের অবশ পাশটা থরথর করলো। চোয়াল দৃঢ় হলো। তাঁর শরীর কাঁপছে। সম্ভবতো ঠান্ডায়। তারফানে একহাতে এসির রিমোট চেপে তাপমাত্রা আরও কমিয়ে দিলো। ঠান্ডা বাড়িয়ে দিলো।
নক্ষত্র তালুকদার মস্তিষ্ক ঠান্ডা রাখবার চেষ্টা করে বললেন, ‘দেখ… আমি জানি আমাদের ভাইদের সঙ্গে যা হয়েছে সেটার পেছনে তুমি আছো। কারণ জিজ্ঞেস করবো না। ভাইজান যৌবনকাল থেকে অনেক আকাম করে আসছেন। হুট করে বস্তির কোনো ছেলে প্রতিশোধ নিতে আসা অবাক করার মতো কিছু না। তোমার এত বড়ো সাহসের পরও আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিব। শহরের বাইরে আমার একটা জমি আছে। পাঁচ-দশ কোটি টাকার কাছাকাছি। আমি তোমাকে দিয়ে দিবো।’

থামলেন তিনি। বড়ো শ্বাস ফেললেন। পরবর্তী কথা বলার আগে তারফানের মুখপানে তাকালেন একবার। চৌকস দৃশ্য হারিয়ে ঘোলা ভাবে একটা মুহূর্ত ভাসলো, তাকে পুলিশ মার ছে। গরম পানি মুখে ঢেলে দিয়েছে। ভাগ্যিস তার বিরুদ্ধে শক্ত প্রমাণ পায়নি! ভাগ্যিস জেল থেকে তিনি মুক্তি পেয়েছেন! ভাগ্যিস! 
ঘোলা ভাব উবে গিয়ে তারফানের মুখ স্পষ্ট হয়ে উঠলো আবার। এই ছেলেটার কারণেই এতসব সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে। যদিও তিনি জানেন, তারফানের একার পক্ষে এসব সম্ভব নয়। ইমন গত বছরই একটা পানির ফ্যাক্টরি দিয়েছে। ওটা গড়তে গিয়ে, তৈরি করতে গিয়ে বিল্ডিং চাপায় প্রায় শ'খানেক শ্রমিক মা রা গিয়েছিল। কত প্রটেস্ট হলো! কত কি! ইমন সবকটাকে হাজতে ভরেছিল, কেউ কেউ-কে গুম করে ফেলেছিল একেবারে। আগুনে পু ড়িয়ে, গু লিবি দ্ধ করে। কম মৃ ত্যুর হুমকি পায়নি সে। ওদের পরিবারের একজন যদি তামজিদ (তারফান) হয়, ব্যাপারটা বিস্ময়ের কিছু নয়। এ বিষয়ে সন্দিহান বলেই নক্ষত্র তালুকদার তারফানকে অতো ঘাটাচ্ছেন না। কেননা সেখানে তাঁর পায়ের ধুলোও কম-বেশি পড়েছিল। ঘাটালেই ঘটনা বাড়ে। দরকার কি? কালবাদে ইমনের ফাঁ সি হয়ে যাবে। তারপর সব সম্পত্তি, রাজ্যত্বের মালিক তিনি, তিনি এবং তিনিই। 

দীর্ঘ ভাবনা শেষে ফেলে রাখা কথাটা পূণরায় বলতে লাগলেন, ‘আমার মেয়ে তুবা তোমাকে অনেক ভালোবাসে। পাগল হয়ে যাচ্ছে তোমার জন্য। যাকে বিয়ে করেছো আপাতত থাকুক। কিছুদিন মজা নাও। তারপর ডিভোর্স দিয়ে দিও। তুবার সঙ্গে ধুমধাম করে আমি তোমার বিয়ে দিবো। গুলসানে আমার একটা দু'তলা বাড়ি আছে। ওটা তোমার। কোনো কিছুর চিন্তা তোমাকে করতে হবে। সুইজারল্যান্ডে হানিমুনে চলে যেও একমাসের ট্রিপে।’ এরপর কিছু মনে পরার মতো করে বললেন, ‘তোমার বোধহয় আরও দুটো ভাই আছে? বৃদ্ধ মা আছেন। ওদের জন্য আমি চাকর রেখে দিবো। ওদেরও চিন্তা করতে হবে না। আমার কথাটা শুধু শুনে…’

কথা শেষ করতে দিলো না তারফান। সে ততক্ষণে আয়েশী ভঙ্গিমায় চেয়ারে পিঠ এলিয়ে দিয়েছে। দৃষ্টি হাতের পেপার ওয়েট-টায়। আঙুলের ধাক্কায় ঘোরাচ্ছে বারবার। নির্বাক ঘরটায় কানের কাঁটার মতোন শব্দটা পুন:পুন করছে। শব্দ চিড়ে তারফার এবার জানতে চাইলো, ‘আমার ভাইদের কখনো দেখেছেন? আপনার মেয়ে দেখেছে?’

‘না। তবে শুনেছি তুমি আর তোমার বড়ো ভাই… তারফান বোধহয়। তোমরা এক রকম দেখতে।’

তারফান মাথা দুলালো। মাথা মৃদু দুলাতে দুলাতে সহমত জানালো। এরপর ধীরে ধীরে একদম স্থির হয়ে গেল সে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, অস্বাভাবিক শান্ত লাগছে তাকে। গলা বেয়ে এমন ঠান্ডার মাঝেও সূক্ষ্ণ ঘাম গড়াচ্ছে। রগের দেখা অচিরেই পাওয়া গেল। কান লাল। মস্তিষ্কে কেবল ঘুরেফিরে একটা বাক্যই বাড়ি খাচ্ছে, ‘ডিভোর্স দিয়ে দিও।’

কপালের চুল গুলো একহাতে খুব রুঢ়তার সাথে পেছনে ঠেললো তারফান, ‘হাহ্!’ কেমন করে যেন হাসতে লাগলো সে। ঠোঁট বাঁকিয়ে, আক্রোশ মিশিয়ে। নিজের ওপর হাসছে কি? হাসি পাচ্ছে আসলে। এতকিছু করে বিয়ে করার পর, পৌরষ ইগো বিসর্জন দিয়ে মেরিনের অভিমান ভাঙ্গানোর পর মেয়েটাকে ছেড়ে দিবে? ডিভোর্স দিয়ে দিবে? এত সহজ? হৃদপিণ্ডে টান অনুভব করতেই হাসি গাঢ় করলো তারফান। হাসতে হাসতে চোখের কোণে অশ্রুজল এসে জমা হয়েছে। তারফান আঙুলের ডগায় সেটুকু মুছে নিলো। নক্ষত্র তালুকদার বিরক্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হাসছো কিজন্য? মজা করছি আমি তোমার সাথে?’

হাসি থামিয়ে থমথমে মুখে তাকালো তারফান, ‘যদি না শুনি?’

থমথমে মুখ করে ফেললেন নক্ষত্র তালুকদারও। জমকালো ধমক দিলেন, ‘অবাধ্য হওয়ার আগে দু'বার ভাববে। বস্তির ছেলে রাজকন্যা পাচ্ছো, সৌভাগ্য তোমার। আমাকে চেনো তুমি?’

‘একটা প্রবাদ বাক্য শুনেছেন নিশ্চয়ই? ফাঁকা কলসি বাজে বেশি। আপনি হচ্ছেন ফাঁকা কলসি। একটা বস্তির ছেলের সামান্য টোকাতেই যার ভিত্তি টলে উঠে। আপনি আগে আমাদের ভাইদের চিনে আসুন।’

অত্যাধিক রাগে মনে হলো, ভেতর থেকে একটা চাপ অনুভব করছেন নক্ষত্র তালুকদার। হাত কাঁপছে। হাতে হাত চেপে বড়ো বড়ো শ্বাস ফেললেন-নিলেন। ক্ষোধে ফেঁটে উঠলেন, ‘ত-তুই আমার ক্ষমতা জানিস? কি করতে পারি তার ধারণা আছে? এই দেশের মানুষ তোর লা শ-ও খুঁজে পাবে না।’

‘আর আমার লা শ গুম করার আগে যদি আমি আপনার লা শ গুম করে দেই?’ প্রশ্নটা ছুঁড়ে ভদ্র হাসলো তারফান। মুচকি, সভ্য হাসি। ফের বললো, ‘বুড়ো হচ্ছেন, ঠিকঠাক চলবেন। আপনার মাতাল রাজকন্যাকেও সাবধানে রাখবেন।’

শক্ত শরীরে নক্ষত্র তালুকদার উঠে দাঁড়ালেন। এনভেলপ নিয়ে চলে যাওয়ার আগে দ্বিতীয় দফা হুমকি ছুঁড়লেন, ‘তোকে… দেখে নিবো আমি।’

তারফান সঙ্গে সঙ্গে আমন্ত্রণ জানালো, ‘প্লিজ, আমাকে কেউ দেখলে আমার ভালো লাগে।’

অথচ দেখাদেখির পালা পর্যন্ত পৌঁছতে পারলেন না নক্ষত্র তালুকদার। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবেই তার মৃ ত্যু ঘটলো সেই একই রাতে, তার বাড়িতে, তার শোবার ঘরে, নিজ মেয়ের হাতে। 
মালিককে ডাকতে জাবেদ পাটোয়ারী বিশাল করিডোর পেড়িয়ে মাকিলের ঘরে গিয়েছিলেন সকাল ন'টায়। ভ্যাপসা, দমবন্ধ বিশ্রী বাতাসে সারা ঘর ম ম করছিল। হালকা রঙের বিছানার চাদর রক্তে চুপচুপ। নক্ষত্র তালুকদার নিথ র শরীরে পরে আছেন। গলা কা টা। পাশে একাগ্র অচেতনতায় এলোমেলো শুয়ে আছে তুবা। অথচ হাতে শক্ত করে ধরে রাখা লাল তরলে আবৃতি ধারালো ছুরি। জাবেদ দৌঁড়ে গিয়ে নাকে হাত রাখলো, শ্বাস চলছে। তক্ষুনি রক্তের পাশাপাশি কুৎসিত মদের গন্ধ নাকে ঠেকতেই ঘটনা যা বোঝার বুঝে গেল সে। থরথর কাঁপতে কাঁপতে পকেট থেকে ফোন বের করতে লাগলো।

সেই একই দিনে টিভিতে তিনটে খবর ক্রমাগত চলছিল। সকাল দশটা চব্বিশ মিনিটে নক্ষত্র তালুকদারের নিজ মেয়ের হাতে মৃ ত্যু। দেশের স্বল্প পরিচিত মডেল এবং ছোট পর্দার অভিনেত্রী তুবার মাতাল অবস্থায় বাবার মৃ ত্যুর দায়ে গ্রেফতার। পরিশেষে দশটা পঞ্চান্ন মিনিটে ইমন তালুকদারের মৃ ত্যুর খবরটাও দেশে অস্থিরতার আলোড়ন তৈরি করে ফেলেছিল। আদালত থেকে পুনরায় ফাঁ সির কার্য স্থগিতের রায় নিয়ে কারাগারে ফিরে যাচ্ছিলেন ইমন তালুকদার। পথিমথ্যে জনগনের উত্তাল স্রোতে তলিয়ে যান। ঘুষি, পাথর, লাঠি আর পায়ের পাড়ায় নির্ম ম মৃ ত্যু ঘটে তার। 

অদ্ভুত না? মানুষের মৃ ত্যু খুব খুব কাছে না? একদম অপ্রত্যাশিত, অবাক করে দেওয়া? 

তারফান, তামজিদ আর তালহা স্তব্ধ হয়ে হাসপাতালের ব্যস্ত করিডোরের এককোণে বসেছিল। ফোনে চলা খবর এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে ইখতিয়ারের ভিডিও কল আসতে লাগলো। কল বাজতে বাজতে একসময় বন্ধ হয়ে গেল। কেউ ধরলো না। আবারও সাংবাদিকের মধুর কণ্ঠ ভেসে উঠলো তখন।

—————

স্বপন হায়দার মাঝে মাঝে ভাবেন, সেদিন বিয়েতে তিনি কেন গিয়েছিলেন? যাওয়ার প্রয়োজনটা কি ছিল? প্রয়োজন আসলে কিছুই না। বিয়ের দাওয়াত একটাতে না গেলে তেমন কিছুই হতো না। কিন্তু কেন যে গিয়েছিলেন!
সম্ভবতো লুকোতে লুকোতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন, দুনিয়ার কেউ তাকে আর ধরতে পারবে না। খুঁজে পাবে না। বিয়েটা খেয়ে, দুটো দিন আনন্দ-ফুর্তিতে কাটিয়ে আবার নাহয় লুকিয়ে পড়বেন। অথচ বিধি তার সঙ্গ দেয়নি। কপাল পুড়িয়ে দিয়েছে। আজ কতগুলো দিন তিনি সম্পূর্ণ একা, বদ্ধ একটা ঘরে বন্দী। স্ত্রী-সন্তান কি দেখতে আসার চেষ্টা করেছে আদৌ? ভীষণ আস্তে কানের কাছে কে যেন নিশ্বাস ফেললো, ‘খারাপের আপনজন বলতে কেউ নেই। কেউ তার খোঁজ রাখে না।’

কন্সটেবল মতিন একবার লম্বা-চিকন লোহা পেড়িয়ে স্বপনের দিকে তাকালেন। হাঁক ছাড়লেন, ‘অ্যাঁই, খাবার খা। কয়দিন না খায়ে থাকবি?’

উত্তর পাওয়া গেল না। স্বপন একাধারে মেঝের মধ্যিখানে চক্ষুগর্ত খুঁড়ছে। এদিকে ধ্যান নেই তার। খাবারের প্রতি সুধা নেই। পায়ের ক্ষ ত স্থানে মাছি ভনভন করছে। কনস্টেবল সৈয়দ মুখ কুঁচকে বললেন, ‘সঙ্গী-সাথী তো সব মইরা গেছে। এরলাইগাই মনে অয় নিজেও না খাইয়া মরবার চায়। বেশি ডাক দিও না মতিন ভাই। নিজে মন চাইলে খাইবো নইলে মরু ক।’

কন্সটেবল মতিন মাথা দুলিয়ে সায় জানালেন, ‘ঠিক বলছেন। দেশের দুই একটা দুশমন মর লেও শান্তি।’

—————

উজ্জ্বল নীল আকাশের কোলে মেঘমাদুর হুটোপুটি খাচ্ছে। অদূরের মাঠ থেকে ছেলেপেলেদের কি হই হই রব রব! প্রচন্ড উল্লাসের জের ধরেই একঝাঁক কাক চমকে উঠে কারেন্টের তার থেকে উড়ে গেল। পাখনা ঝাপটে চলে গেল অক্ষি গোচরের বাইরে। 
কপালে হাত রেখে সূর্যের দিকে তাকালো মেরিন। চোখ-মুখ কুঁচকে, কপালে ভীষণ ভাঁজ ফেলে। গরমে শরীর ঘেমে যাচ্ছে। নিশ্বাস ধীর, তবুও চঞ্চল। চিলেকোঠা থেকে পরশু তারা চলে যাবে। টিউলিপ বেগম আর ননী সাহেব আজ বড়ো চাচাদের ওখানে গিয়েছেন। তারফান-তামজিদ-তালহা নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। মেরিন তাই একা একাই সবকিছু গুছিয়ে রাখছিল। গাছগুলো ঠিকঠাক করে পানি দেওয়ার মাঝেই হঠাৎ একজন ভদ্রমহিলা আর এফ এল -এর বালতি সমেত ছাদে এলেন। ওইযে? রবি আন্টি? যার ছেলে শৌনকের সঙ্গে বিয়ে দেবার জন্য অনেক তোড়জোড় করেছিলেন? মেরিন আর তারফানের বিয়েতে তাঁকে কার্ড পাঠানো হয়েছিল। ভদ্রমহিলা আসেননি। শুনেছে, গত পরশু শৌনকের বিয়ে করিয়েছেন দূরসম্পর্কের এক বোনের মেয়ের সঙ্গে। ঘরোয়া ভাবে। দু'মাস পর ধুমধাম অনুষ্ঠান করে উঠিয়ে আনবেন। 

ভেঁজা কাপড়ভর্তি বালতি রশি টাঙানো স্থানটাতে ধপ করে রাখলেন ভদ্রমহিলা। আড়চোখে একটু পর পর মেরিনের মুখপানে তাকাচ্ছেন। সূর্যের কিরণ সরাসরি মেয়েটাকে আলোকিত করে রেখেছে। ঘামকণা শুভ্র ত্বকে চিকমিক করছে সোনালীর বিন্দুর ন্যায়। ভেতরের ক্ষুদ্র হিংসে যেন আবারও দপদপ করে জ্বললো। মেয়েটাকে বড়ো পছন্দ হয়েছিল তাঁর। ছেলের বউ করার জন্যে বড়ো সাধ জেগেছিল। অথচ এই মেয়েটা তারফানের মাঝে কি পেল যা তার শৌনকের মাঝে ছিল না? লাখে এক তার ছেলে। লক্ষী, বুঝদার, ভালো চাকরি করে।
বিরশ নিশ্বাসটুকু অগোচর করে বললেন, ‘বিবাহিত জীবন কেমন কাটছে তোমার? চিলেকোঠায় থাকতে কষ্ট হচ্ছে না? বিয়ে তো করেছো তিন ছেলের সবচে’ ত্যাদড়টাকে। সুখে আছো তো?’

ইতিউতি নেই। ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করবার আগ্রহ মাত্র নেই। ভদ্রমহিলার দাম্ভিক মুখখানা একপলক দেখে নজর সরিয়ে ফেলল মেরিন। মনে মনে হাসলো। জবাবে তাঁর মতো করেই বললো, ‘আলহামদুলিল্লাহ, সুখের চেয়েও বেশি কিছু থাকলে ওটা আছি। আমার স্বামী আমাকে খুব ভালোবাসে। মাথায় তুলে রাখে। ডাক্তার যেহেতু একটু ব্যস্ত, কিন্তু আমার যত্নে খামতি রাখে না। চিলেকোঠা থেকে তো চলে যাবো, তার আগে একদিন আসুন আমাদের ছোট্ট ঘরটায়। মুখে হাসি ছাড়া ফিরতে পারবেন না।’

রবির বালতির ভেতরে তখনো ভেঁজা কাপড় ভর্তি। কিন্তু সেগুলো দড়িতে ঝোলাতে আর মন সায় দিচ্ছে না। হাঁটুর বয়সী মেয়েটির জবাব তাঁর ভালো লাগেনি। শরীরে অদৃশ্য রাগ চিনচিনিয়ে উঠছে। বালতি হাতে তিনি রুঢ় স্বরে বললেন, ‘আমার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। ভালো ইনকাম করে। ওই ছেলে থেকে কোন দিক দিয়ে কম? নিজের কপাল নিজে পুড়িয়েছো।’

মেরিন মিষ্টি করে হেসে বললো, ‘আমার ডাক্তার পছন্দ আন্টি। ইঞ্জিনিয়ার ভালো লাগে না।’

ভদ্রমহিলা চলে যেতেই মেরিন চিলেকোঠার দরজা হাট করে খুলে ফ্যানের নিচে বসলো। কেমন শীত শীত লাগছে। বিছানার একপাশে হেলা করে ফেলে রাখা মুঠোফোন। নোটিফিকেশন এইযে, এইমাত্র এলো। বন্ধ স্ক্রীনে নীল আলো জ্বললো একবার, দু’বার। মুঠোফোন হাতে তুলে স্ক্রীন জ্বালাতেই দেখলো, এস এম এস এসেছে। তারফান ওয়াহাজ থেকে। নামে কোনো রসিকতা নেই। আদুরেপনা নেই। কেবলই ‘TARFAN WAHAZ'। 
গাঢ় কালো কালির নামের নিচেই ছোট অক্ষরের ইংরেজি লিখা,

‘My love, my little firefly, Could you adorn yourself beautifully, just for me? Dress up exquisitely for my eyes alone? We shall gaze upon the moon together. Tell me, will you grant me this honor, hm?’

—————

পরিশিষ্টঃ—

রাতের ঘুটঘুটে আঁধার এইপাশটায়। মাথার ওপর মস্ত বিরাট চাঁদ। এটাকে ফুল মুন বলে না ইংরেজিতে? বলে হয়তো৷ ইখতিয়ারের মাথায় এখন আর পড়াশোনার ভুজুংভাজুং কিচ্ছু নেই। ক'দিন আগেও প্রেম নিয়ে গবেষণা করে সে কবি হতে চেয়েছিল। রাজনীতিতে ঢোকার পর থেকে সেসবও বাদ দিয়েছে। 
পায়ে সূক্ষ্ণ কি যেন কামড়াচ্ছে। মশা নিশ্চিত। এমন ক্ষেত-খামারের মতন জায়গায় মশা না থাকলেই বরং অবাক লাগতো। পায়ের নিম্নভাগে অযথাই কঠিন এক চড় মে রে পাশে দাঁড়ানো তারফানকে শরীর দিয়ে থাক্কা দিলো সে। মুখের ওপর সরাসরি লাইট ধরে খেঁকিয়ে উঠলো, ‘এই বালছাল জায়গায় জোনাকিপোকা ধরার শখ জাগছে ক্যান তোর?’

হঠাৎ, আচমকা এভাবে চোখের ওপর আলো ধরায় চোখের পাতা কুঁচকে ফেললো তারফান। ইখতিয়ারকে পালটা ধাক্কা মে রে রেগে উঠলো, ‘উষ্ঠা খাবি।’

তালহা ওদিকে গুনগুন করে বললো, ‘ও বউকে জোনাকিপোকা গিফট করবে। এরপর পেরেমের সাগরে ডুব দিবে।’

ইখতিয়ার দাঁত বের করে হেসে বললো, ‘তুই এত কিছু জানিস কেমনে? ভেতরের খবর সব তো জানার কথা না।’

একটা জোনাকপোকা উড়তে দেখা যাচ্ছে৷ তামজিদ ওটা ধরতে নিলেই কেমন কেমন সবুজ রঙের বাতিটা নিভে গেল। অন্ধকারের মাঝে জাদুকরীর মতন লুকিয়ে নিলো নিজেকে। তামজিদ এবার ইখতিয়ারের দিকে চেয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো, ‘তুই কি আজকেও ব্রাশ করিসনি?’

না, করেনি। জবাবটা ওর বিশ্রী হাসি দেখেই টের পেয়ে গেল তামজিদ। তালহা নাক-মুখ কুঁচকে বললো, ‘এত খবিশ একটা মানুষ কিভাবে হয়? এইজন্যই তোর প্রেম হয় না।’

‘তোর যেন হয়েছে? একমাত্র তারফান ছাড়া তোরা একটাও এখনো প্রেম করতে পারিসনি। তামজিদ তো তাও মেরিনকে পছন্দ করতো। আমার মতো।’

অকারণ, অপ্রয়োজনীয় কথা। তামজিদ, তালহা, তারফান তিনজনেই মুহূর্তের জন্য থমকে গেল যেন। তালহা ইখতিয়ারের পেটে চমৎকার একটা চিমটি কেটে ফিসফিসিয়ে বললো, ‘বলদ! তারফানের সামনে এসব কি বলিস?’

ঘাড়ের পেছনে মাথা চুলকে তারফানের দিকে তাকালো ইখতিয়ার। মুখ গম্ভীর করে রেখেছে। তামজিদের দিকে তাকালো, থমথম, নিশ্চুপ স্তব্ধতা। ইখতিয়ার হাসার চেষ্টা করে বললো, ‘ওরকম পছন্দ না। মানে… এই ধর আমার মতো ফ্লার্ট আরকি। আমি যেমন সবার সাথে করি... মানে… এই ওরকমই আরকি। এখন তো ভাবী হয়… ভাবীই লাগে। হে হে।’

পরিস্থিতি আগের মতোন আর হলো না। নিশ্চুপ আড়ম্বরপূর্ণ ব্যস্ততায় পাঁচটে জোনাকিপোকা ধরেই ক্লান্ত হয়ে পড়লো সকলে। মাঠের দুর্বাঘাস আবৃত কোলে মাথা এলিয়ে এবড়োখেবড়ো ভাবে শুয়ে পড়লো ওরা। ইখতিয়ার হঠাৎ প্রশ্ন করলো, ‘তোদের মনে কখনো প্রশ্ন জাগে না আমি তোদের এত হেল্প কেন করেছি?’

তালহা অনিশ্চিত কণ্ঠে আওড়ায়, ‘তুই আমাদের বন্ধু, এজন্য?’

ইখতিয়ার শব্দ করে হাসে, ‘ওটাও কারণ। কিন্তু আরেকটা কারণ আছে। ইমন আমার পরিবারের জাত শত্রু।’

‘মানে, কেমনে?’ তামজিদের বিস্ময় কন্ঠ চুইয়ে চুইয়ে পরে। তারফানের অবশ্য সেদিকে খেয়াল নেই। সে আগে থেকেই সব জানে। ফোনের স্ক্রীন জ্বালিয়ে বারবার সময় দেখছে সে। মেরিন নিশ্চয়ই তার অপেক্ষা করছে?

ইখতিয়ার কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। অতীত ভাবলো। এরপর ম্লান গলায় বললো, ‘একবছর আগে ইমনের একটা ফ্যাক্টরি বানানোর কন্ট্রাক পেয়েছিলেন আমার ছোট চাচা। ফ্যাক্টরি বানানোর ইট, সিমেন্ট ভালো ছিল না। মাঝখানে অনেক মানুষ মা রা যায়। চাচার তখন সবে বিয়ে হয়েছে। জোয়ান রক্ত। সবার সঙ্গে প্রটেস্ট করতে নেমেছিলেন। কুত্তার বাচ্চা ইমন চাচাকে গুম করে ফেলেছে। এখনো লাশ আমরা খুঁজে পাইনি৷ কোনোদিন পাবো কি-না সেটাও জানি না।’

গুমোট আঁধার চাঁদের প্রখরতায় বেশিক্ষণ টিকতে পারলো না। চোখের সামনে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে এলো হঠাৎ। ওইতো! বিরাট গাছের মাঝারি ডালে একটা ঘুঘু চুপটি করে বসে আছে। চোখ বন্ধ। ঘুমুচ্ছে কি? অসাড় শুয়ে থেকে থেকে তারফানেরও ঘুম চলে আসছিল। সে তড়িৎ উঠে বসলো। তামজিদ জিড়িয়ে জিড়িয়ে চাঁদ দেখছে। আলাদা একটা ঘোর তার চোখ মুখে। তারফান তামজিদের কাঁধ চাপড়ে শুধালো, ‘দৌড় প্রতিযোগিতা করবি?’

বিল্ডিং থেকে এই মাঠের দূরত্ব পাঁচ মিনিট। দৌড়ে গেলে হবে এক-দুই মিনিট। অনেকদিন দৌঁড়ানো অবশ্য হয় না। তামজিদ তালহা আর ইখতিয়ারকেও ডেকে তুললো। অলস দুটো প্রায় ঘুমিয়েই গিয়েছিল। তারফানের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দৌড়ানোর প্রস্তুতি নিতে নিতে বললো, ‘যে জিতবে আগামী এক সপ্তাহ তার সব কথা সবাইকে শুনতে হবে।’

সোজা বাংলায় গোলাম। ব্যাপারটা মন্দ না। ইখতিয়ার মনে মনে স্বপ্ন বুনলো। তালহাকে ঠেলে তুলে তারাও দাঁড়িয়ে পরলো দৌড়ানোর জন্য। তারফান উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করলো, ‘রেডি, সেট, গো…!’

চাঁদ বুঝি হাসলো তখন? তাদের উল্লাস মাখা আনন্দে, হাসির ঝংকার তোলা শব্দে প্রকৃতিও বুঝি আনন্দে ঠিকরে উঠলো? জানা গেল না। অপার্থিব খুশিটুকু ইন্দ্রিয়জালে স্মৃতির মতন ছেপে যেতে লাগলো।

—————

তারফান যখন চিলেকোঠায় পৌঁছুলো? ততক্ষণে ঘড়িতে ন'টা বেজে কুড়ি মিনিট। মেরিন সেজেগুজে বিছানার মধ্যিখানে বসে আছে। গাল ফুলো, রাগে ভ্রু কিঞ্চিৎ বেঁকে আছে৷ ধরাম করে দরজা ঠেলে এসেই তারফান প্রথমে একটু জিড়িয়ে নিলো। হাঁপালো, নিশ্বাস নিলো। ভাগ্যিস নিয়েছিল! কেননা পরমুহূর্তেই লাল শাড়ি পরনে সর্বনাশিনী রমণীটিকে দেখে দম আটকে গেল তার। ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুঁটে উঠলো, ‘লাল শাড়ি পরেছো কেন, মেরিন?’

হু? কেন পরেছে মানে? অবশ্যই লোকটার জন্যই পরেছে! অথচ মুখ ফুঁটে কিছু বললো না মেরিন। রাগের মাত্রা আরেকটুখানি বাড়ালো। 
তারফান মোলায়েম স্বরে বললো, ‘চলো, চাঁদ দেখবে না? আকাশে আজকে তোমার মতো চাঁদ উঠেছে।’

মেরিন বিছানা ছেড়ে উঠতে নিলেই তারফান হাত বাড়িয়ে দিলো। চোখের ইশারায় বললো, ‘ধরো, সাবধানে।’

মেরিন ধরলো, সাবধানে বিছানা ছেড়ে মেঝেতে পা রাখলো। অভিমান করে বললো, ‘একসাথে দেখার কথা বলে আপনি একা একা চাঁদ দেখে নিয়েছেন।’

অভিমানের বিপরীতে তারফান নিরব। কেমন ঘোলা চোখে চেয়ে আছে। মন্ত্রমুগ্ধ নজরে মেরিনের প্রত্যেকটা পদক্ষেপ এত সূক্ষ্ণ ভাবে দেখছে! মেরিন বেশিক্ষণ রেগে থাকতে পারলো না। ফুলো গাল এবার লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো। লোকটা নজর সরাচ্ছেই না! ছাদের মেঝেতে বসে মেরিন এবার অভিযোগ তুললো, ‘আপনি খুব বাজে ভাবে তাকাচ্ছেন তারফান!’

’ভালোভাবে তাকিয়েছি কখন?’ 

যেন খুব গর্বের একটা কথা। কথাটা বলে মুচকি মুচকি হাসছে। কোত্থেকে একটা জোনাকিপোকা ভর্তি জার হাতে ধরিয়ে বললো, ‘তোমার জন্য।’

মেরিনের মনে পরে, এমনই এক পরিশ্রান্ত সময়ে একটা স্বপ্নের কথা উল্লেখ করেছিল তারফান। জোনাকিপোকা নিয়ে। জোনাকিপোকাকে ভয় পাওয়া নিয়ে। সে পলক ফেলতে ফেলতে একাধারে দেখলো জোনাকিপোকার নিয়ন আলো। আলোয় আলোয় ঘোর লাগানো অবাক সুন্দর জাদু। জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি আর জোনাকিপোকা ভয় পান না?’

তারফান মেরিনের কাছাকাছি চেপে বসেছে। কাঁধে কাঁধ ছুঁচ্ছে ওদের। ধীরলয়ে বললো, ‘তুমি আছো এখন।’

ঝিলমিল সুরে হাসলো মেরিন। ফের জিজ্ঞেস করলো, ‘কোত্থেকে পেলেন? আপনার হাত না খালি ছিল?’

জবাবে ক্লান্ত পথিকের ন্যায় একবার মেরিনের দিকে তাকালো তারফান। দু'সেকেণ্ড তাকিয়ে মন খারাপ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ম্লান গলায় মেরিনের মতোন অভিমান করলো, ‘রেগে থাকলে আমার দিকে তুমি তাকাও না মেরিন। তোমার খুব বদঅভ্যাস।’

মেরিন প্রতিবাদ জানালো, ‘তাকাই তো! লুকিয়ে লুকিয়ে তাকাই।’

ঘাড় ঘুরিয়ে তারফানের দিকে মুখ করতেই চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল মেরিনের। তারফান তার দিকে ঝুঁকে ছিল। চুলের গভীরে নাক ডুবানোর অভিলাসে আনচান করছিল তার বেহায়া মন। কিন্তু অপ্রত্যাশিত ভাবে ঠোঁট গাল ছুঁয়ে ফেললো। পর পর মেরিনকে শিউরে তুলে ওই অপ্রত্যাশিত ছোঁয়াকেই প্রত্যাশিত করে তুললো তারফান। সেকেণ্ডের ব্যবধানে কেমন উন্মাদ হয়ে মেরিনের কোমড় চেপে ধরলো। নরম ত্বকে আঙুল দাবিয়ে দিলো। চুমু খেল গালে, কপালে, নাকে! গলায় মুখ ডুবিয়ে দীর্ঘশ্বাস নিতেই মেরিন অস্পষ্ট আওয়াজ তুললো, ‘আমরা… বাইরে তারফান!’

তারফান শুনেছে কি? বোধহয় সৎবিৎ ফিরেছে। ঠোঁটে প্রগাঢ় একটা চুমু খেয়ে সে সরে এসেছে। যতটুকু সরে এলে মেরিনের অবিন্যস্ত, এলোমেলো শাড়ি আর মুখের লাজুক হাঁসফাঁস দেখা যায়, ততটুকু। নির্লজ্জের মতোন হেসে সে তার পরপরই বললো, ‘গান শুনবে মেরিন? গিটার নিয়ে আসবো?’

মেরিন নজর ঝুঁকিয়ে রেখেছে। লজ্জায় তাকানো দায়। কোনোমতে উত্তপ্ত কণ্ঠে বললো, ‘আপনি খুব খারাপ।’

তারফান হাসলো, ‘শুনবে না? হু?’

তারফানের সঙ্গে মিশে গিয়ে চওড়া কাঁধের বা'দিকটায় মাথা পেতে দিলো মেরিন। মৃদু স্বরে আওড়ালো, ‘শুনবো।’

‘গিটার আনি, সরো।’

‘খালি গলায় শোনান। এখন সরতে পারবো না।’

তারফান আরেকদফা হাসলো। বুক আবারও আওয়াজ তুলছে তার। অসহ্য ভালো লাগায় কণ্ঠ নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। গান গাওয়ার সময়টাতেও ওই নড়বড়তা ঠিক রইলো। গান থামিয়ে তারফান তক্ষুনি অস্থির কণ্ঠে বললো, ‘আমার হাতটা একবার শক্ত করে ধরবে, মেরিন?’

মেরিন ধরলো। তারফানের কাঁপা কণ্ঠের অস্থিরতা থেকেও দ্বিগুণ শক্ত করে।
·
·
·
সমাপ্ত……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp