নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া - পর্ব ০৯ - লাবিবা ওয়াহিদ - ধারাবাহিক গল্প

নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া
          সাহিদের জ্বরটা দুই ঘণ্টার মধ্যেই আর হেলাফেলা করা গেল না। সময়ের সাথে সাথে তার গায়ে জ্বর বসত গড়তে শুরু করল। সাব্বিরের পক্ষে আর সম্ভব হলো না সাহিদকে একা ছাড়ার। সে তখনই সাহিদকে নিজ কাঁধে ভর করিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে দিল। ভাগ্যিস আজ সাহিদ বাইক আনেনি। 

ইসমাত তখনই বাড়ি ফিরে গেছে। তাই সাব্বির রমজান সাহেবকে কল করে জানাল অতি দ্রুত যেন তাদের পারিবারিক ডাক্তার পাঠায় সাহিদদের ফ্ল্যাটে। আধঘণ্টার রাস্তায় জ্যাম ঠেলে পয়তাল্লিশ মিনিটেই ওরা পৌঁছে যায়। সাহিদ মাথা চেপে পেসেঞ্জার সিটে বসা। তাকে দূর্বলতা পুরোপুরি গ্রাস করতে পারেনি। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তার বরাবরই বেশি। কিন্তু এই জ্বর যেন তাকে কাবু করতে উঠে পড়ে লেগেছে। 

সাব্বির আবারও সাহিদকে ধরতে চাইলে সাহিদ বাঁধা দিল।
--"আই ক্যান হ্যান্ডেল মাইসেল্ফ।"

বলেই সাহিদ টলতে টলতে লিফটের সামনে চলে গেল। সাব্বির তাকে একা ছাড়ল না। এপার্টমেন্টের সামনে এসে সাব্বিরই কলিংবেল চাপল। কিছুক্ষণের মধ্যে ইসমাত এসে দরজা খুলল। সাহিদ তখন চোখে সব ঘোলা দেখছে। সে কোনো মতে ইসমাতের পাশ কাটিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। পরপর বিছানায় ধপ করে কিছু পড়ার শব্দ হলো। নিশ্চয়ই সাহিদ শুয়ে পড়েছে। 

ইসমাত সাহিদকে টলতে দেখে ভেবেছিল মদ-টদ খেয়েছে। কিন্তু সাহিদ যখন পাশ কাটিয়ে গেল, তখন সাহিদের পারফিউমের ঘ্রাণ ছাড়া ওসব আপদের কোনো গন্ধ পায়নি। প্রশ্নসূচক নজরে সাব্বিরের দিকে চাইতেই সে নিজ থেকে বলল,
--"সাহিদের অনেক জ্বর, ভাবি। সম্ভবত আজকে বিড়ালের কারণে কোনো কিছু হয়েছে। রমজান আঙ্কেলকে বলেছি ডক্টর পাঠাতে। একটু খেয়াল রাখবেন ওর। জ্বর হলে কেমন নাজুক হয়ে যায়।"

ইসমাত শুধু মাথা নাড়ায়, সাব্বির আবার বলল, 
--"আগামী মাসে আমার বড়ো ভাইয়ার বিয়ে। সেজন্যই আম্মুরা ইদানীং শপিং শুরু করেছে। আপনাকে জানিয়ে দিলাম ভাবী, অবশ্যই সাহিদের সাথে আসবেন। আমি জানি এই ছেলে আপনাকে জানাবে না, তাই আমিই আপনাকে বলে দিলাম। এটা আপনার ছোটো ভাইয়ের আবদার, প্লিজ না করবেন না ভাবী।"

ইসমাত এবারও কোনোপ্রকার প্রতিক্রিয়া জানাল না। তার কেন যেন সাহিদের বন্ধুদের প্রতি কোনোপ্রকার আগ্রহ নেই। তবুও সাব্বিরকে তার ভালো লেগেছে। এই ছেলে পুরোপুরি সাহিদের মতো না। সে কথাবার্তায়, সৌজন্যতায় চালু আছে। এজন্য ছোটো করে বলল,
--"চেষ্টা করব।"

সাব্বির ইসমাতের কথা শুনে খুশিমনেই দরজা থেকেই চলে যায়। ইসমাত ভেতরে আসতেও বলতে পারল না। তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে সকালের ঘটনা। সে তো তাড়াহুড়োর চক্করে রিকুকে খাঁচার বাইরেই রেখে গিয়েছিল। এর মানে এই রিকু সাহিদের সাথে কিছু করেছে? এই দুইজনের তো আবার সাপে নেউলে সম্পর্ক! ইসমাত কপালে হাত দিল। তার শাশুড়ি যদি কোনোভাবে জানতে পারে তার ছেলের এই দশার কারণ ইসমাত, তবে তাকে তিনি ভষ্ম করে দিবেন। ইসমাতের মনে হলো তার গলায় কাঁটা বিঁধেছে। বারবার নিজেরই কেমন লাগছে।

 সে রুমে গিয়ে দেখল সাহিদ বিছানায় পড়ে আছে, হুডি পরা সত্ত্বেও মৃদু কাঁপছে। পায়ের জুতোটাও খুলতে পারেনি বেচারা। ইসমাত একবার ভাবল ঠিকই হয়েছে। সব তার সাথে বেয়াদবি করার ফল। কিন্তু পরমুহূর্তেই আবার রিকুকে ছেড়ে যাওয়ার আত্মগ্লানি এবং দায়িত্ব তাকে মুখ ফিরিয়ে দিতে পারল না। না চাইতেও সে এগিয়ে আসল৷ সাহিদের পায়ের জুতো জোড়া খুলে দল। পরপর সাহিদকে কিছুটা টেনে-হিঁচড়ে বালিশে শুইয়ে দিল। তার সাহিদকে ধরতে কেমন যেন বাঁধছে। কিন্তু কিছু করার নেই। এই ফ্ল্যাটে ইসমাত ছাড়া আর কেউ নেই এই মহারাজের দেখভাল করতে।

 সাহিদ আগেও দু'বার জ্বর-ঠান্ডায় পড়েছিল। কিন্তু এবারের মতো বেহুঁশ হওয়ার মতো অবস্থা হয়নি। সাহিদ কখনোই তার অসুস্থতার ব্যাপারে বলাবলি পছন্দ করত না, এজন্য ইসমাতও কখনো জানতে পারেনি। এবার জেনেছে, কিন্তু সাহিদ সেই অবস্থায় নেই যে ইসমাতকে তাড়িয়ে দিবে। এই প্রথমবারের মতো ইসমাতের কপালে ভাঁজ পড়ল সাহিদের চিন্তায়।

 কম্ফোর্টার গায়ে জড়িয়ে দিয়ে সে তাপমাত্রা মাপল। থার্মোমিটারে ১০২°। ইসমাত আঁতকে উঠল। সাহিদের তখনো হুঁশ নেই, মৃদু করে কাঁপছে। কিছু সময়ের ব্যবধানে শক্ত-পোক্ত চেহারা বড্ড করুণ দেখাচ্ছে। এত অসহায় সাহিদকে ইসমাত কখনো কি দেখেছিল?

কলিংবেল বাজল। নিশ্চয়ই ডাক্তার এসেছে। ইসমাত নিজের পরিহিত ড্রেস ঠিক করতে করতে চলে গেল দরজা খুলতে। দরজা খুলতেই দেখল রমজান সাহেব ডাক্তারকে নিয়ে দাঁড়ানো। উনিই ডাক্তারকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। ডাক্তার ইসমাতের থেকে জেনে নিল জ্বরের তাপমাত্রা। জ্বরের ঘোরে সাহিদ দু'বার হাঁচিও দিল। বোঝা গেল সর্দিও লেগেছে। ডাক্তার পরিক্ষা-নীরিক্ষা করে বলল,
--"খুব সম্ভবত ভাইরাস জ্বর। দুইদিন রেস্টে থাকুক। ওষুধ, বিশ্রাম আর সেবা-যত্নের মধ্যে থেকে দেখেন জ্বর নামে কিনা। যদি দুইদিনেও না কমে তাহলে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন।"

ডাক্তার ওষুধ প্রেসক্রিপশন করে রমজান সাহেবের হাতে দিলেন। সে রাতেই রমজান সাহেব ওষুধপত্রের পাশাপাশি ফলমূল আর খাবারের বিভিন্ন উপকরণ কিনে দিয়ে গেলেন। ইসমাত রমজান সাহেবকে দিয়ে সাহিদের কাপড় চেঞ্জ করাল। এখন সাহিদের গলা, গাল মুছে দিচ্ছে সে। গায়ে সাধারণ টি-শার্ট জড়ানো তার। ভাগ্যিস আগে থেকেই সে স্যুপ রেঁধেছিল, এজন্য আর রান্নাঘরে ছোটাছুটি করতে হয়নি।

 রমজান সাহেব যাওয়ার আধঘণ্টা পরই মাহফুজ সাহেব কল দিলেন। শ্বশুরের কল পেয়ে ইসমাত সালাম দিল। ওপাশ থেকে বিচলিত গলা শোনাল,
--"সাহিদের এখন কী অবস্থা?"

--"খাইয়ে ওষুধ দিব বাবা।"

--"আমার ছেলেটার পাশেই থেকো, মা। তোমার আম্মা তো অসুস্থ, নয়তো নিয়ে যেতাম। অসুস্থতার কথা শোনার পর থেকেই কেমন অস্থির হয়ে আছে।"

--"আম্মাকে চিন্তামুক্ত থাকতে বলুন বাবা। আমি সব সামলে নিব।"

--"তুমি আগামী কয়েকদিন অফিসে এসো না। বাসায় থেকে সাহিদের খেয়াল রাখো। অফিসের থেকেও আমার ছেলের জীবনের মূল্য বেশি। আমি আগামীকাল আসব।"

--"জি, আচ্ছা।"

ডাক্তার কি কি ওষুধ দিয়েছে সে সব শুনে মাহফুজ সাহেব মোবাইল স্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করলেন। জ্বর হলে কীভাবে সাহিদের সেবা করবে সে সম্পর্কে শাহেলা বেশ কিছু টিপস দিলেন। অথচ তা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। ইফরা প্রায়ই অসুস্থ হতো, তখন সে-ই বোনের খেয়াল রাখত। ইসমাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাহিদকে ধীরে ধীরে স্যুপ খাইয়ে দিল। পরপর ওষুধটাও। যখন আবারও সাহিদকে শুইয়ে দিল তখন সাহিদ তার হাত চেপে ধরল। বিড়বিড় করে জ্বরের ঘোরে বলছে, 
--"আই নিড স্পেস।"

ইসমাত তাকাল সাহিদের দিকে। তার চোখ বন্ধ। স্পেস চাচ্ছে আবার হাতও শক্ত করে ধরে আছে। পাগল নাকি ছেলেটা? আবারও তাকাল তাদের মুঠিবদ্ধ হাতের দিকে। এই প্রথম হয়তো সাহিদ তার হাতটা এভাবে ধরেছে। অস্বাভাবিক হলেও এটাই সত্যি। সাহিদ বা ইসমাত কখনোই কেউ কারো হাত ধরেনি। বাইরের কারো কাছে হয়তো এটা অবিশ্বাস্য লাগতে পারে শুনতে। 

সাহিদ "আই নিড স্পেস" করতে করতে ঘুমিয়ে গেল। ইসমাত হেসে বলল, "স্পেসও চাইছ আবার আমাকেও ছাড়ছ না। এত অদ্ভুত কেন তুমি?"

ইসমাতেরও যে কখন চোখ লেগে গেল কে জানে। কয়েক ঘণ্টা বাদে সাহিদ তাকাল। পাশ ফিরে দেখল ইসমাত তার বিছানার ওপর মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। সাহিদ তার কপালে শুকনো কাপড়ের মতো কিছু অনুভব করে কপালে হাত দিল। জলপট্টিটা প্রায় শুকিয়েই গেছে। আবারও তাকাল ইসমাতের দিকে। সাহিদ অস্ফুট স্বরে বলল, 
--"ডোণ্ট টেল মি আপনি আমার টেক কেয়ার করেছেন। আনবিলিভেবল।"

ইসমাত তখনো ঘুম। যেন সেও বেশ ক্লান্ত। সাহিদ কয়েক পলক তাকিয়ে গায়ের টি-শার্টটা খুলে ফেলল৷ ঘামে এখনো তার টি-শার্টটা ভেজা। দূরে তা ছুঁড়ে মে রে আবারও ইসমাতের দিকে তাকাল। মেয়েটা এখনো ঘুমাচ্ছে। সাহিদের জানা নেই সে কতক্ষণ জেগে ছিল। আর সে এটাও জানে না ইসমাত কেন তাকে করুণা করছে। সে ইসমাতকে ডাকল না। আবারও শুয়ে পড়ে ইসমাতের দিকে পিঠ দিয়ে।

অতিরিক্ত নড়াচড়ায় ইসমাতের ঘুম ছুটে যায়, পিটপিট করে তাকাতেই সাহিদের চওড়া কাঁধ আর বড়ো সড়ো পিঠটা মুখের সামনে পড়ল। দেখে সে ধড়ফড়িয়ে উঠল। পরিস্থিতি বুঝতে মিনিটখানেক সময় লাগে তার। উঠে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখল সাহিদকে। তার চোখ বন্ধ। ইসমাত এক হাতে বিছানায় ভার দিয়ে অন্য হাতে সাহিদের কপালে হাত ছুঁলো। সে জাগ্রত থাকলেও কোনোপ্রকার নড়চড় করল না। যেন বুঝতে দিতে চায় না সে জেগে আছে। তার এখন ইসমাতের সাথে লাগতেও ইচ্ছা করছে না। অদ্ভুত লাগছে তার সবকিছু। 
 
ইসমাত দেখল সাহিদের জ্বর নেমে এসেছে। ঘাম ছেড়েছে। নিশ্চয়ই ঘামে অস্বস্তি হচ্ছে ছেলেটার। ইসমাত এজন্য আরেকটা টি-শার্ট দিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। ফ্রেশ হলো। এরপর আবার রুমে এসে দেখল সাহিদ টি-শার্ট পরে নিয়েছে। খাবারের কথা ইসমাত জিজ্ঞেস করতেই নিবে ওমনি শুনল কলিংবেল বাজছে। ইসমাত দরজা খুলতেই চমকে যায়। শাহেলা এসেছেন কয়েকজন মেইডকে নিয়ে। দূর্বল পায়ে হেঁটে হেঁটে তিনি ভেতরে আসলেন। ইসমাত সালাম দিল।

শাহেলা ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
--"আমার ছেলে কোথায়? আমাকে নিশ্চয়ই খুঁজছে?"

শাহেলা চলে গেল সাহিদের রুমে, ইসমাত বিব্রত হলো। আবার আরেক ঝামেলা লাগবে। শাহেলা তো জানেনই না ছেলে আর ছেলের বউ আলাদা রুমে থাকে। যদি কিছু টের পেয়ে যান আবারও আরেক ঝামেলা লাগবে। সৌভাগ্যক্রমে শাহেলা এটা খেয়াল করলেন না। ছেলের পাশে গিয়ে বসলেন। সাহিদ চমকে গেল মাকে দেখে।
--"মম.. তুমি?"

শাহেলার চোখে জল ছলছল করছে। সে কম্পিত হাতে ছেলের কপাল ছুঁয়ে দেখল। এখন জ্বর নেই, তবে সর্দি কিছুটা আছে। ছেলেটাকে না দেখতে পেয়ে বুকের ভিতর যে কী ঝড় বইছিল। সেই ঝড় ছেলের মুখটা দেখতেই শান্ত হলো। ছেলেকে এক হাতে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
--"তোকে না দেখে কী করে ভালো থাকি রে বাবা? এইতো, এখন তোকে দেখে শান্তি পাচ্ছি।"

--"আসার দরকার ছিল না। আমি ঠিক ছিলাম।"

শাহেলা ধমক দিলেন ছেলেকে। 
--"কত যে ঠিক আছ দেখাই যাচ্ছে। নিজের খেয়াল রাখতে পারো না? এখনো কী ছোটো?"

মায়ের ধমকে চুপসে যায় সাহিদ। প্রতিবার অসুস্থতায় মায়ের বকুনি যেমন খায়, তেমনই মায়ের আদরও পরিপূর্ণ অয়ায় সে। সে স্বীকার না করলেও এসব তার জন্য স্বস্তির। শাহেলা ডাকলেন ইসমাতকে। 
--"সাহিদের গা মুছিয়ে দাও। ঘেমে গেছে না।"

সাহিদ আটকাতে চাইল। কিন্তু মায়ের চোখ রাঙানিতে সে বিরক্তই হলো। ইসমাত কাপড় আর পানির বোল নিয়ে বসতেই সাহিদ টি-শার্ট খুলে ফেলল। ইসমাত অন্যদিকে ফিরেই নীরবে পাকা হাতে গা মুছিয়ে দিল। কারো মধ্যে কোনো কথা হলো না।

দুপুরের রান্নার এক পদ শাহেলা করলেও বাকিটা ইসমাত মেইডদের সাহায্য নিয়ে করে ফেলল দ্রুত। একা একা করলে সময় অনেকটাই বেশি লাগত। শাশুড়িকে রান্নাঘরে আসতে সে নিষেধ করে দিয়েছে। তার চেয়ে ভালো ছেলের সাথে থাকুক। সাহিদেরও সঙ্গী মিলবে। মানুষ যতই শক্ত মানসিকতার হোক না কেন, অসুস্থ হলে তারা প্রিয় মানুষদের শূন্যতা অনুভব করে। সাহিদও যে করবে, এটা অসম্ভব নয়। কিন্তু তার তো আবার মনের কথা বলতে ইগো হার্ট হয়। ভাঙবে তবু মচকাবে না স্বভাবের ছেলেটা। জীবনে অন্ধভাবে প্রাধান্য দেয় নিজের ইগোকে। 

—————

সাহিদের জ্বর দুইদিনের বেশি টিকল না। তবে সর্দিটা থেকে গিয়েছে। যা যত্নের ওপরে ছিল সে, জ্বর ভেগে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখনো ইসমাত অফিস যাওয়ার অনুমতি পায়নি। দাদী তাকে বারবার ফোনকল করে এটা সেটা বলতে বলতে কান ঝালাপালা করে দিয়েছে। সাহিদের পায়ের কাছে বসে থাকতে হবে, স্বামীর সবকিছুর খেয়াল রাখতে হবে, কি চায় দেখে যেন রাখে, তার মন জুগিয়ে চলা চাই, তার থেকে যেন দূরে না থাকে ইত্যাদি ইত্যাদি। ইসমাত শুনতে না চাইলে তাকে ধমকও দিয়েছে। এসবে তার আবারও বিতৃষ্ণা এসেছে। স্বামীর যত্ন নেওয়া খারাপ না, কিন্তু দাদী তাকে এমন ভাবে সব জ্ঞান দিচ্ছে যেন সে সাহিদের দাসী। সে মোটেও ছোটো বাচ্চা নয় যে দাসী আর স্ত্রীর পার্থক্য বুঝবে না। কিন্তু তার দাদী এত বিচক্ষণ, শক্ত মানসিকতার বৃদ্ধা হয়েও এখনো কতশত কুসংস্কার, আগের যুগের নিয়ম-নীতি নিয়ে পড়ে আছে। এই মানসিক টর্চা র ইসমাত আর নিতে পারছে না। সে জানে দাদীর মাহফুজ সাহেবের পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই, দাদীর ধারণা লাখ কপাল গুণে এমন শ্বশুরবাড়ি পেয়েছে সে। তাদের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। এছাড়া ইসমাতের জীবনের, প্রতিটি শ্বাস-নিঃশ্বাসের কোনো দাম নেই, সবই মূল্যহীন। 

ইসমাত একাকী নিজের রুমে বসে আছে। আগামীকাল অফিসে পার্টি। সে দু'হাতে চোখ-মুখ চেপে বসা, বড্ড দমবন্ধ লাগছে তার। 

চারপাশের সবাই শুধু তাকেই ঠেলে দেয়, তাকেই কথা শোনায়, তাকেই বলে পার্ফেক্ট হতে। এদিকে কেউ একবারও এটা জিজ্ঞেস করে না, সে কেমন আছে, ঠিক আছে কিনা। সে কি চায়, সে খুশি তো? নাহ, এই কথাগুলো কেউ জিজ্ঞেস করে না। সবাই শুধু তাদের দায়িত্ব তার ঘাড়ে চেপে দিতেই পারদর্শী। কেন নয়, ইসমাত তো খুব স্ট্রং, তার কেন মন খারাপ হবে? মন খারাপ হলে সে ম্যাচিওর হলো নাকি? মেনে নিতে হবে নয়তো সে জীবনে কিছুই করতে পারবে না। সবচেয়ে গুণী, ধৈর্যশীল, পরিস্থিতি সামলানো মেয়েটা তখন হয়ে যাবে ইউজলেস। মুহূর্তেই অতিরিক্ত প্রেশারে ইসমাতের নিঃশ্বাস বেড়ে গেল। বুকের বা পাশটা খামচে ধরে সে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগল। যেন কেউ শক্ত করে তার বুক, গলা চেপে ধরেছে। ইসমাতের চোখ লাল হয়ে চোখের কোণ দিয়ে অশ্রু ঝড়ছে। হা করে, বিছানার চাদর শক্ত করে চেপে ইসমাত নিঃশ্বাস স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা করল। দুই মিনিট তার এই যুদ্ধ চলল। মুহূর্তে আবারও সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। নিঃশ্বাস আবারও স্বাভাবিক হয়ে গেল তার। এরকম প্যানিক এট্যাক তার জন্য নতুন নয়। কিন্তু এই গল্প চার দেয়ালের আঁধারেই সীমাবদ্ধ। বাহিরের মানুষদের এই গল্প জানা নেই। 

মিনিট দশেকের পর চোখে-মুখে পানি দিয়ে ইসমাত রান্নাঘরে গেল, খুব তৃষ্ণা পেয়েছে তার। পানি শেষ করে সে একবার সাহিদের রুমের দিকে তাকাল। সেদিনই শাহেলা বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। সৌভাগ্যবশত তিনি ছেলের চিন্তায় সেভাবে খেয়াল করেননি ওরা দুজন আলাদা ঘরে থাকছে। তিনি যাতে সন্দেহ না করেন এজন্য ইসমাত নিজের ঘর আটকে রেখে সবসময় সাহিদের আশেপাশেই ছিল। এজন্য তিনি আলাদা করে নজর দেওয়ার সুযোগ পাননি।

ইসমাত কি ভেবে একবার সাহিদকে দেখতে গেল। সাহিদকে এখন পুরোদমে বিশ্রামে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। তেমন জ্বর নেই অবশ্য এখন। ইসমাত উঁকি দিতেই দেখল ছেলে গেমিং চেয়ারে বসে পিসিতে গেম খেলতে ব্যস্ত। মেজাজ চড়ে গেল তার। সে এগিয়ে গিয়ে সাহিদের কান থেকে হেডফোন খুলে নিল। সাহিদ বিরক্ত আর রাগের সংমিশ্রণে বলে উঠল,
--"হোয়াট দ্য হেল!"

বলেই সে মাথা তুলে তাকাল। কিন্তু ইসমাতের লাল চোখ দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। ইসমাত তা খেয়াল না করে ধমক দিয়ে বলল,
--"তোমাকে না ডাক্তার বলেছে রেস্ট করতে। তুমি এই মাঝরাতে গেম নিয়ে বসেছ কেন? মা র খেতে চাও?"

ইসমাতের গলা দিয়ে যেন আগুন ঝড়ছে। রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য সে। সাহিদ চমকে গিয়ে দেখল ইসমাতের এই রূপটা। সাহিদ উত্তর দিচ্ছে না বলে ইসমাত তার কলার চেপে টেনে নিয়ে গেল। এটা সাহিদের ভালো লাগল না৷ সাহিদ চেঁচাল,
--"এই, এই! কলার ধরবেন না। হাউ ডেয়ার ইউ!"

ইসমাতের আপাতত ডেয়ার ফেয়ারে মনোযোগ নেই। সাহিদকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বলল,
--"চুপ! সাহস দেখানোর মতো অনেক কিছুই আছে। তোমার থেকেও হাত ভালো চলে আমার। ইফরাকে কম পিটাইনি আমি।"

ইসমাতের এহেম বক্তব্যে সাহিদ হতবাক। শেষমেষ ইসমাত জামাই পেটানোর পায়তারা করছে? সাহিদ শক্ত কিছু বলার প্রস্তুতি নিতেই আবারও ইসমাতের লাল চোখ জোড়া তাকে থমকে দিল। এমন লাল হয়ে আছে কেন চোখ? ইসমাতও বেশ ফ্রাস্ট্রেটেড, যেন কিছু নিয়ে গভীর ভাবে লড়ছে। সাহিদের মুখের ওপর লাইটস বন্ধ করে সে চলে গেল। সাহিদ তখনো বিমূঢ়। পরপর সে হাতের কাছের বালিশটা ফ্লোরে ছুঁড়ে দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। মিনমিন করে আওড়ায়,
--"দিনদিন আপনার সাহস বাড়ছে, ইসমাত।"

পরের দিন মেইডের সাথে সাথে বেশ জামা-কাপড় আর বাকি শপিং ব্যাগ এসেছে মাহফুজ সাহেবের পক্ষ থেকে। তিনি বিশ্বাস করেন তার ছেলে সুস্থতায় ইসমাতেরও বেশ বড়ো হাত আছে। যেহেতু আজ পার্টি, ইসমাত ব্যক্তিগতভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পায়নি। এজন্যই সব ভেবে-চিন্তেই শ্বশুরের সব পাঠানো। ইসমাত অনাগ্রহী অবস্থায় জামা সিলেক্ট করল। সে গাউন নেয়নি, পার্টি কোড অনুযায়ী একটা ড্রেস নিয়েছে পিচ রঙের। 

ইসমাত জুতো দেখছে, শ্বশুরের নির্দেশ অনুযায়ী পার্টির জন্য জামা সিলেক্ট করলেও জুতোটা এখনো বাকি। মেইড কয়েক ধরণের জুতো তার সামনে রেখেছে। হিলে ইসমাত স্বস্তি পায় না, তবুও পরে। অপছন্দ থাকা সত্ত্বেও। তবে আজ এক জোড়া হিল তার খুব পছন্দ হলো। সম্ভবত জীবনে প্রথমবারের মতোই। সে হিলটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়াল। মেইডটা তার কাছাকাছি নেই। তাই সে নিজে একটু ঘুরে ফিরে দেখল। ইসমাত জানেই না তার পেছনে সাহিদ দাঁড়ানো। 

সাহিদের হাতে হেলমেট, যেন এই কোথাও থেকে বাইক নিয়ে রাইড করে এসেছে। ইসমাত যখন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত তখন সাহিদ পেছন থেকে বলল,
--"একদম বিশ্রী লাগছে।"

ইসমাত রেগে পিছে তাকাল। সাহিদের ঠোঁটে বাঁকা হাসি। যেন ইসমাতের মেজাজ নষ্ট করে সে ভীষণ শান্তি পাচ্ছে। ইসমাতের ইচ্ছে করল পায়ের জুতোটা সাহিদের দিকে ছুঁড়ে মা র তে। কিন্তু সে মা রল না। মুখে হাসি টেনে বলল,
--"এটাই তবে ফাইনাল। তোমার কাছে যা বিশ্রী লাগে তা আমার জন্য সুইটেস্ট। জানো তো?"

সাহিদ কপাল কুঁচকে বলল,
--"আমার পছন্দকে কবে থেকে গুরুত্ব দিচ্ছেন?"

--"পছন্দ নয়, তোমার অপছন্দকে গুরুত্ব দেই।"

--"ইউ শ্যুড লিভ ইন মাই চয়েজ, ইসমাত। অর আই উইল ফোর্স ইউ।"

ইসমাত হেসে বলল,
--"জোর করবে? করেই দেখো না।"

সাহিদ বাঁকা হাসল। খুবই ইগোতে ভরপুর সেই হাসি,
--"চ্যালেঞ্জ এক্সেপ্টেড।"

—————

বিভিন্ন গেস্ট, অফিস কর্মচারীতে ভরপুর হেড অফিসের গ্র‍্যান্ড হল। এই বিরাট বড়ো হলটা বিভিন্ন অফিসিয়াল পার্টির জন্যই রাখা হয়েছে। একেকজন একেক ড্রেস কোডে গোল হয়ে বা একা দাঁড়ানো। সকলে কুশল বিনিময়ে ব্যস্ত। ওয়েটার পোশাকে পরিহিত ছেলেরা ড্রিংক সার্ভে ব্যস্ত। তাদের প্রত্যেকের হাতেই ফ্রেশ জুস আর কোল্ড ড্রিংকসের ট্রে। যার যেটা ইচ্ছে হচ্ছে সে সেটাই নিচ্ছে। 

 ইসমাতও এখানে একজন এমপ্লয়ি হিসেবে এসেছে। সেও একপাশে সারাহ'র সাথে দাঁড়িয়ে। সারাহ এখনো ভ্রমে আছে। তার বিশ্বাসই হচ্ছে না তার বসের বউমার সাথে তার নিয়মিত ওঠাবসা। ইসমাতকে যে কোনো প্রশ্ন করবে সেই সাহসও সে করতে পারেনি। এতে বেশ লজ্জিত ইসমাত। এত ভালো বন্ধু পেয়েছিল সে, এখন তার এমন অচেনা আচরণে বেশ অস্বস্তি হচ্ছে তার। সে মিনমিন করে বলল,
--"সারাহ, প্লিজ। এমন অদ্ভুত আচরণ কোনো না। আমার অস্বস্তি হয়।"

সারাহ তাকাল ইসমাতের দিকে। ইসমাতের চোখে চশমা নেই। আজ সে বেশ সুন্দর এক থ্রি-পিছ পরে এসেছে। পাকিস্তানি হবে হয়তো। দেখতেই লাগছে দামী ব্র‍্যান্ডেড। সারাহ কেন আগে টের পেল না? ইসমাতকে দেখতেই তার খুব এলিট ফিল হতো। মেয়েটার চলন-ধরণই এমন সৌখিন। তার মুখে দুশ্চিন্তা লেপ্টে থাকলেও কখনো দারিদ্রতার ছাপ দেখেনি সে। এখন এতদিনের সবকিছুই তার চোখে ভাসছে। 

ইসমাত এক গ্লাস কোল্ড ড্রিংক্স এগিয়ে দিল সারাহর দিকে। সারাহ তা গ্রহণ করে চাপা স্বরে বলল,
--"অফিসে আর কে কে জানে?"

--"তুমি।"

সারাহ থেমে গেল। কিছুটা সময় নিয়ে বলল,
--"আমি তোমার ওপর রাগ করিনি ইসমাত। তবে অবাক হয়েছি খবরটা শুনে।"

--"আ'ম সো সরি। আসলে বিয়েটাই এমন পরিস্থিতিতে হয়েছিল.." ইসমাত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। 

--"কতদিন যাবৎ বিয়ে হয়েছে?"

--"এক বছর দু'মাস হবে হয়তো।"

--"সে আসবে না?"

--"আসার তো কথা।"

ওদের কথার মাঝেই মাহফুজ সাহেব এলেন, কিছুক্ষণ পরপর ইনভেস্টরদেরও দেখা পাওয়া গেল। মাহফুজ সাহেব ওনার সাথে তার লয়্যাল এমপ্লয়িদের পরিচয় করিয়ে দিল। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, সাহিদ আসেনি। আসবেও না। একটু আগেই বাপকে টেক্সট করে জানিয়েছে, "এঞ্জয় ইওরসেল্ফ ড্যাড, আ'ম বিজি।"
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp