অন্তর্নিহিত কালকূট - পর্ব ১২২ - অনিমা কোতয়াল - ধারাবাহিক গল্প

অন্তর্নিহিত কালকূট
~বর্তমান~

রাণী মির্জা। এই চরিত্রটির সঙ্গে যবে থেকে পরিচিত হয়েছে, অদ্ভুত এক শিহরণ অনুভব করে তুহিন। ওর ক্যারিয়ারে এর আগে কখনও এমন কিছু ঘটেনি। অদ্ভুত, রহস্যময় কিন্তু বিষাক্ত এক ব্যক্তিত্ব রাণীর। যাকে কখনও ভালোবাসা যায়, কখনও ঘৃণা করা যায়। কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার সাধ্য নেই কারো। তুহিনও পারছেনা এড়াতে। রুদ্রর মুখ থেকে এই মেয়েটার সম্পর্কে শুনতে শুনতে সে বিষয়ে আরও নিশ্চিত হল ও। তুহিনের মতো দৃঢ়, নিয়ন্ত্রিত একজন মানুষও কোন অবস্থাতেই কৌতূহল নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা। চুম্বকের মতো আকর্ষণ করছে এই মেয়ের ব্যক্তিত্ব ওকে। যেমনটা ঘটেছিল রুদ্রর বেলায়। 
তুহিন তাকাল রুদ্রর দিকে। কেমন অন্যমনস্ক হয়ে আছে ও। যেন গভীরভাবে ডুবে আছে কারো স্মৃতিতে। তুহিন নিজেকে সামলে জিজ্ঞেস করল, 'সেদিন তুমি কীকরে জানলে, প্রিয়তা তোমাকে কেন ডাকছে?'

রুদ্র মৃদু ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, ' অনুমান করেছিলাম। ওকে জানার পর খুব ভালোভাবেই চিনেছিলাম আমি।'

' সেদিন রাতেও তোমার হাতে সুযোগ ছিল ওকে মেরে ফেলার। কিন্তু মারোনি তুমি। কেন?'

' ওর হাতেও যথেষ্ট সুযোগ ছিল আমাকে মেরে ফেলার। কিন্তু তাও, ও সেই চেষ্টাও করেনি। তার কারণ কী থাকতে পারে বলে মনে হয় আপনার?'

হেসে ফেলল তুহিন, 'এটাইতো তোমাদের গল্পের সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্ট রুদ্র। তোমরা একে অপরের চরম শত্রু। তা সত্ত্বেও, একে অপরকে মারার প্রসঙ্গ উঠলেই তোমরা ছিলে চরম অনাগ্রহী। তোমার ব্যপারটা তাও মানা যায়। দুটো বছর না জেনে হলেও ভালোবেসেছো। দুর্বলতা থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেতো এসেছিলই তোমাকে ধ্বংস করতে। তার বাধ্যবাধকতাটা কোথায় ছিল?'

রুদ্র জবাব দিলোনা। ঠোঁটে কেবল ফুটে উঠল এক তাচ্ছিল্যের হাসি। তুহিন ঘড়ি দেখল একবার। গলা ঝেড়ে নিজেকে সামলে বলল, 'ঘটনাটা ছিল আট তারিখের। মানে _' হঠাৎই যেন কিছু মনে পড়ে গেল তুহিনের। বিস্ময় নিয়ে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, ' মাই গড! কী হয়েছিল এরপর?'

~ অতীত~

রাতের অন্তিম প্রহর। জানুয়ারির প্রবল শীতের কোপে স্তব্ধ হয়ে আছে গোটা শহর। বনানী কবরস্থান যেন ঢাকা পড়ে আছে অচেনা কুয়াশার চাদরে। চারপাশের বড় বড় গাছগুলো মায়াভরা কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। গাছ থেকে টপটপ শব্দে শিশির পড়ছে ঘাসের ওপর। জমে থাকা সেই শিশিরবিন্দুগুলো কবরে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর মতোই একদম শান্ত। হিমেল বাতাসের দীর্ঘশ্বাসগুলো ছুঁয়ে দিচ্ছে এখানকার মাটিকে। যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, জীবনের সব কোলাহল শেষে সব কোলাহল শেষে এই মাটির নিচেই হবে সকলের স্থায়ী ঠিকানা।

কবরস্থানে প্রবেশ করা মাত্রই সেই সত্যিটা আরও গভীরভাবে অনুভব করতে পারল প্রিয়তা। শীতল বাতাসে কেঁপে উঠল গোটা শরীর। নিস্তব্ধতায় মস্তিষ্ক শূণ্য লাগতে শুরু করল। গেইট সাধারণ রাত নটার মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সিকিউরিটিকে কিছু টাকা আর খানিকটা জরুরি বুঝিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে ও। এর আগেও করেছে একবার। আজও রুদ্র যাওয়ার পর শহরজুড়ে দিকশূণ্য বাইক চালিয়ে, শেষমেশ এসে থেমেছে এখানে। বনানী কবরস্থান।

চারপাশে স্তব্ধতায় আরও একবার শরীরে ঝিম ধরল প্রিয়তার। লম্বা এক শ্বাস ফেলে ভেতরে এগোলো। ধীরে, অনমনা চলনে। একের পর এক সাড়ি সাড়ি কবর পেরিয়ে, হাঁটতে হাঁটতে ওর পা গিয়ে থামল একটা কবরের সামনে। প্রায় তিনমাস পুরোনো একটা কবর। পাকা করে টাইলস বাঁধিয়ে ফেলা হয়েছে ইতিমধ্যে। মাথার দিকে উঁচু করে নামফলক তোলা। সেখানে লেখা আছে মৃতের পরিচয়:
                            মৃত: রাশেদ আমের
                           পিতা: রফিক আমের
                          জন্ম ও মৃত্যু: ১৯৬৬-২০২১

তটিনীর কবরের পাশেই রাশেদ আমেরের সেই কবর। নামফলটার দিকে দীর্ঘক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল প্রিয়তা। অন্যমনস্ক অবস্থাতেই বসল পাকা করা কবরটার দেয়ালের কোণে। গুণে গুনে পাঁচটা মিনিট কেটে গেল। অথচ প্রিয়তা একবারের জন্যেও চোখ সরালোনা নামফলকটা থেকে। এখনো ঝিমে আছে মাথাটা। কেমন ঘোর ঘোর লাগছে। হঠাৎই প্রিয়তার মনে হল, ওর ঠিক পাশেই এসে বসল কেউ একজন। শরীর শিউরে উঠে ঠান্ডা হয়ে গেল ওর। দাঁড়িয়ে গেল শরীরের প্রতিটা লোম। 
প্রথমবারও একই ঘটনা ঘটেছিল। সেদিন প্রিয়তা ঘাড় ফিরিয়ে দেখেছিল ওর পাশে বসে আছেন রাশেদ আমের! বরাবরের মতোই সাদা পাঞ্জাবি তার গায়ে। কিন্তু জৌলুসময় সেই শরীরের জৌলুস ছিল আরও অস্বাভাবিক। যেন সাক্ষাৎ কোন দৈব মানব।
শিড়দাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গিয়েছিল প্রিয়তার। চারপাশটা অদ্ভুত ভুতুড়ে মনে হচ্ছিলো। নিঃশব্দ, শূণ্য। যেন ভিন্ন কোন স্তব্ধ জগত। মৃত একটা মানুষকে এভাবে সামনে বসে থাকতে দেখলে যে কেউ অতি ভয়ে জ্ঞান হারাতো, নয়তো চিৎকার করে উঠতো। অথচ ভীষণ শক্ত নার্ভ এই মেয়ের। শিউরে ওঠা সেই ভয়াবহ অনুভূতিকে দমিয়ে কন্ঠে অবিশ্বাস ঢেলে বলেছিল, 'আপনি?'
                   
উত্তরে মৃদু হেসেছিলেন রাশেদ। বড় রহস্যময় সে হাসি। সেই চিরপরিচিত বজ্র আওয়াজে বলেছিলেন, 'এটাইতো এখন আমার ঘর।'

অন্তরাত্মা ঝংকার দিয়ে উঠেছিল প্রিয়তার। চোখ বুঝে ধাতস্থ করতে চেয়েছে নিজেকে। কিন্তু চোখ খুলে যখন পাশে তাকাল, তখন আর দেখতে দেখতে পায়নি রাশেদকে। একাই বসেছিল ও সেই স্তব্ধ কবরস্থানে।

আজও! চোখ বুজে লম্বা শ্বাস নিল প্রিয়তা। এরপর ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাল। আজও সেই একই দৃশ্য। সেই একই পোশাক, একই জৌলুস। আজও ওর পাশেই দেয়ালটার ওপর বসে আছে সে। প্রিয়তা তাকানো মাত্রই অদ্ভুত, আলতো রহস্যময় হাসি দিল সে। শরীর হীম হয়ে এলেও এবারও নিজের নার্ভকে শক্ত রাখল প্রিয়তা। কাঠকাঠ গলায় প্রশ্ন করল, 'আমি কী সত্যিই আপনাকে দেখছি? নাকি এটা আমার ভ্রম?'

রাশেদ আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ' ভ্রম? বহু তত্ত্ব মতে এ জগতের সবকিছুইতো একটা ভ্রম। তুমি, আমি, এই গাছ, মাটি, আকাশ সবই ভ্রম। অনন্ত এই জগতের বাস্তবতা দেখার সামর্থ্য পৃথিবী নামক ছোট্ট বিন্দুর জীবেদের নেই। আমরা সবাই ভ্রমেই বেঁচে থাকি।'

শুনে খানিকটা ভাবুক হয়ে উঠল প্রিয়তা। অনমনে বলল, 'জীবনটাই তাহলে ভ্রম?'

' বলা যায়।'

' আর মৃত্যু?'

কিছুক্ষণ কোন উত্তর এলোনা। অতঃপর ভেসে এলো, 'সেতো দুটো মানুষের মধ্যে আসা দূরত্বের নাম মাত্র।'

প্রিয়তা বলল না কিছু। ও নিজেও চেয়ে রইল আকাশের দিকে। ঘাড় ফিরিয়ে প্রিয়তার দিকে তাকালেন রাশেদ। গম্ভীর স্বরে বললেন, ' আর সেই মৃত্যু নিয়েই খেলছো তুমি। সময় আছে এখনো। থেমে যাও। জানি, এখন থামলেও আগের মতো হবেনা কিছু আর। সে সময় ফুরিয়েছে। কিন্তু আরও খারাপ হওয়া থেকে আটকাতে পারবে। এও জানি, ভেতরে অগ্নিকুন্ড নিয়ে ঘুরছো তুমি। বছরের পর বছর ভয়ংকর জ্বালাময়ি আগুনে নিজে পুড়েছো, আর এখন সেই আগুনেই পোড়াচ্ছো বাকি সবাইকে। জীবিত অবস্থায় আমিও তাই করেছিলাম। নিজে যে আগুনে পুড়েছি, বাকিদেরও সেই আগুনে পোড়াতে মরিয়া হয়েছি। নিজের সন্তানের জীবনেও বিষ গুলে দিয়েছি খুব সযত্নে। কিন্তু লাভ হয়েছে কী কিছু? হয়নি। যার জন্যে সব করেছি, না সেই তটিনী শান্তি পেয়েছে, না আমি, না আমার সন্তান। কিছুই রইল না, ঐ বিষটুকু ছাড়া। তাই আবার বলছি, থেমে যাও। নয়তো এই গল্পের শেষে গিয়ে বিষ ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না।'

এতক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলেও এপর্যায়ে হাসল রাণী মির্জা, ' থেমে যাব? খেলোয়ার ভালো আপনি। আপনি জানেন, পোড়ানোর এই খেলা একবার শুরু করলে আর থামার উপায় থাকেনা। শুরু করার আগে কেউ বোঝাতে আসেনি সে কথা। বলেনি, থেমে যাও। কিছু নেই এই খেলায়, ধ্বংস ছাড়া। আর যখন বুঝলাম, তখন মনে হল অবুঝই ভালো ছিলাম বোধহয়। থেমে যাওয়া যদি সম্ভব হতো, তিনমাস আগের সেই রাতেই থেমে যেতাম আমি। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। এই বিষই এখন আমাদের সবার নিয়তি। যা মেনে নিতে হবে আমাদের। মনেতো হয় আপনি সব জানেন। আমার এরূপ দেখেও অবাক হননি আপনি।'

রাশেদের হাসি বৃদ্ধি পেল, ' অবাক হওয়ার মতো স্থিতি এখন আমার আর নেই। এখন আমি সবই জানি। সব। আর এটাও জানি, কী কী পাগলামি করেছো তুমি। কেনই বা আমাকে_'

আর কিছু শুনতে পেলোনা প্রিয়তা। মাথার ঝিমঝিমে ভাবটা তীব্রভাবে শুরু হল। অদ্ভুত যান্ত্রিক আওয়াজ যেন কান ফাটিয়ে দিল ওর। চোখ বুজে, কানে হাত দিল প্রিয়তা। মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলো। একটু স্বাভাবিক হতেই পুনরায় তাকাতে চাইল রাশেদ আমেরের দিকে। কিন্তু ঘাড় ফিরিয়ে দেখল, নেই রাশেদ কোথাও। আজও কবর কবরস্থানটা আগের মতোই ফাঁকা। চারপাশটা থমথমে, স্তব্ধ, জনমানবহীন। আছে শুধু সাড়ি সাড়ি কবর। এ কেমন হ্যালুসিপেশন! কুয়াশা ঘেরা অন্ধকারে বিভৎস স্বরে একটা প্যাঁচা ডেকে উঠল কোথা থেকে যেন। জোরে শাস টানল প্রিয়তা। এলোমেলো দৃষ্টিতে তাকাল চারপাশে। ঠোঁট মৃদু বেঁকে উঠল, যেন কান্না গিলে নিচ্ছে ওর ভেতরে কোন এক সত্তা।

হঠাৎ কাছের কোন মসজিদ থেকে ভেসে এলো আজানের শব্দ। প্রিয়তা ভীষণ অস্থির হয়ে টেনে নেওয়া নিঃশ্বাসটা মুখ দিয়ে ছাড়ল। শীতের তোপে ভেতর থেকে বের হওয়া সাদা ধোঁয়া মিলিয়ে গেল কুয়াশায়। ঝট করে উঠে দাঁড়াল প্রিয়তা। দ্রুত পদে পা বাড়াল বাহিরের দিকে। আর এক মিনিটও এই কবরস্থানে থাকলে দম বন্ধ হয়ে মরে যাবে ও। 

—————

সকাল ন'টা বাজে। মৃদু কুয়াশার সঙ্গে শীতের নরম রোদে চমৎকার দেখতে লাগছে আজ আমের ভিলা। কিন্তু সেই আকর্ষণীয় চাকচিক্যের ভেতরেই যেন গুমরে আছে কোন এক বিশাল বিষাদকথন। যেমন রত্নেভরা ক্ষীরসাগরের তলেই লুকিয়ে ছিল মহা কালকূট বিষ।

বহুদিন পর আজ উচ্ছ্বাস, নাজিফা, কুহু, নীরব, জ্যোতি, জাফর আমের সবাই সকালে একসঙ্গে আছে বাড়িতে। কারোরই আজ সকাল সকাল বের হওয়ার নেই। কোন তাড়া নেই। রুদ্রও বাড়িতেই। তবে, অনেক রাত করে ফিরেছে সে। তারওপর ফিরে এসে ঐ রাতেই কফি খেয়েছে। জ্যোতি নিজে গিয়ে দিয়ে এসেছিল রুমে। সকালে গিয়ে দেখেছে ঘুমোচ্ছে ও। তাই ডাকেনি আর। কম্ফোর্টারটা ভালোভাবে গায়ে চাপিয়ে দিয়ে চলে এসেছে শুধু। 

অনেকদিন পর সকালে একসঙ্গে বসে ব্রেকফাস্ট করেছে ওরা সবাই। এ মুহূর্তে হলরুমে বসে যে যার মতো চা-কফি খাচ্ছে। শান্ত, চুপচাপ। কারো মুখে তেমন কোন কথা নেই। অথচ একটা সময় ছিল যখন ছুটির সকালে আমের ভিলার হলরুমটা হৈ হৈ করে উঠতো। আর তাতে নেতৃত্ব দিতো উচ্ছ্বাস আর প্রিয়তা। এই দেবর-ভাবির যুগলবন্দী আর চঞ্চল কার্যক্রম মাতিয়ে রাখতো গোটা আমের ভিলাকে। ঝলমল করে উঠতো চারপাশ। অথচ এখন? পরপর কয়েকটা ধাক্কায় সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেছে। প্রাণে পরিপূর্ণ এই ভিলাটা কেমন ধীরে ধীরে একেবারে নিষ্প্রাণ হয়ে গেছে। চিন্তা করতেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু এতোদিনে ব্যপারটা সয়ে গেছে ওদের। দীর্ঘশ্বাস আসার আগেই এখন গিলে ফেলে ওরা সবাই। 

এরমধ্যেই ওপর থেকে অলস পায়ে নিচে নেমে এলো রুদ্র। রেডি হয়ে নামেনি। পরনে শুধুমাত্র কালো স্যান্ডো গেঞ্জি আর জিন্স। চুলগুলোও এলোমেলো। ওকে দেখামাত্র চায়ের কাপ রেখে উঠে দাঁড়াল জ্যোতি। এগিয়ে গিয়ে বলল, 'ফ্রেশ হয়েছো? খাবার এখানে দেব নাকি ডাইনিংয়ে?'

' এখানেই দে।' ঘাড়ে ম্যাসাজ করতে করতে বলল রুদ্র।

জ্যোতি প্রায় ছুট লাগালো ডাইনিংয়ে। রুদ্র ধীরেসুস্থে গিয়ে সোফায় বসল। কুহু নীরবের পাশে বসে ছিল। রুদ্রকে বসতে দেখেই ও উঠে গিয়ে বসল রুদ্রর পাশে। একপাশ দিয়ে দুহাতে জড়িয়ে মাথা রাখল বুকের একপাশে। সুন্দর মুখটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আছে ওর। রুদ্র আলতো করে হাত রাখল বোনের মাথায়। কিছু বলল না। উচ্ছ্বাস কফির মগে চুমুক দিয়ে বলল, 'এতো রাতে ঘুমিয়েও সকাল সকাল উঠলাযে চাঁদ? বউ ছাড়া ঘুম হয়না?' এরপর বেসুরা গলায় সুর তুলল, ' ঘুম আসেনা চোখেরই পাতায়। ভাসতে থাকি...'

কিন্তু রুদ্রর অগ্নিদৃষ্টি দেখে থেমে গেল ও। মেকি হেসে বলল, 'জাস্ট কিডিং গুরু। সকাল সকাল সিরিয়াস হয়ে যাস কোন দুঃখে।'

' মুখ বন্ধ রাখ, নয়তো গরম কফি মাথায় ডালব।'

হেসে ফেলল উচ্ছ্বাস। অতঃপর মুখভঙ্গি সিরিয়াস করে বলল, ' বের হবিনা আজ?'

' এখন না।' দুই শব্দের গম্ভীর উত্তর।

জাফর চায়ের কাপটা টি-টেবিলে রেখে বলল, 'কী ব্যপার বলতো? আজ সকাল থেকে সব কাজ একেবারে অফ রাখলি। নিজেও বের হবিনা। এনিথিং সিরিয়াস?'

রুদ্র মৃদু হাসল, ' এতোবড় ঋণের বোঝা অবশেষে নামল ঘাড় থেকে। একবেলা না হয় একটু রিল্যাক্স করো, রেস্ট করো। এতোদিনতো খাটলে অনেক।'

জাফরও হাসল এবার, 'খাটলাম? আমরা আর খটলাম কই? সবতো তুই-ই করলি। কিছুতো ঠিকভাবে জানালিওনা কীভাবে কী হল। তোর দুবাই আর ইন্ডিয়ার মিটিং সম্পর্কেতো আমাদের সঙ্গে কিছুই শেয়ারও করলি না।'

'করব। ঝামেলাটা মিটতে দাও।'

এরমধ্যেই খাবারের ট্রে নিয়ে চলে এলো জ্যোতি। রুদ্রর সামনের টি-টেবিলে রেখে বলল, 'খাওয়াটা শেষ করো। এরপর কফি দিচ্ছি।'

' আজ অফিস আছে তোর?'

রুদ্রর আচমকা প্রশ্নে মৃদু চমকে জ্যোতি। বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে বলল, 'অফিস নেই। শনিবারতো। কিন্তু ব্যাংকে যেতাম একটু।'

রুদ্র পরোটার প্লেট হাতে নিয়ে বলল, ' আজ যেতে হবেনা। ইনফ্যাক্ট আগামী দুদিনের জন্যে ছুটি নিয়ে নে। তিনদিন বাড়ি থেকে কেউ বের হবেনা।'

সকলেই থমকাল রুদ্রর আচমকা ঘোষণায়। যে যার যার কাজ থামিয়ে অবাক চোখে তাকাল রুদ্রর দিকে। আচমকা এমন নির্দেশ! রুদ্র সবার দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে বলল, 'নীরব!'

নীরব নড়ে উঠল, ' জি ভাই?'

' ইন্টারভিউ আছে এ সপ্তাহে কোন?'

' জি ভাই, কাল ছিল একটা।'

' ক্যান্সেল করে দাও। এই তিনদিন তুমিও ভিলার বাইরে যাচ্ছোনা।'

রুদ্র অকারণে কোনকিছুতে বারণ করবে না। বলেছে যখন, কারণ গুরুতর। তাই নীরব বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ল, 'জি ভাই।'

উচ্ছ্বাস বেশ অবাক হল। ব্যস্ত হাতে কফির কাপটা সাইডে রেখে বলল, 'কিন্তু নাজিফাকেতো এডমিট করতে হবে হসপিটালে।'

' এখন দরকার নেই। যদি লেবার উঠেই যায় এ'কদিনে, তখন দেখা যাবে।' দৃষ্টি নাজিফার দিকে নিয়ে বলল, 'এখনো অবধি তেমন কিছু মনে হচ্ছে নাজিফা?'

নাজিফা খানিক অপ্রস্তুত হয়ে তাকাল রুদ্রর দিকে। একটু ইতস্তত করে বলল, ' না ভাইয়া। হলে বলব আমি। হসপিটালতো কাছেই। আর আমি নিজেওতো একজন নার্স। সমস্যা হবেনা।'

ভ্রুকুটি করল উচ্ছ্বাস, ' কিন্তু তুইতো কালকেই বললি দেরী না করতে। এসব বিষয়ে রিস্ক নেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই? আগে ভর্তি করিয়ে রাখাটাই সেইফ। তাহলে?'

রুদ্র নির্বিকারভাবে পরোটা ছিড়ে মুখে পুড়ল। 'কাল যখন বলেছিলাম তখন সিচুয়েশন আলাদা ছিল, এখন আলাদা। আমি, উচ্ছ্বাস আর জাফর কাকা ছাড়া আজ থেকে তিনদিন কেউ আমের ভিলার বাইরে বের হবেনা।'

কথাটা শোনামাত্র কেমন স্তব্ধ হয়ে উঠল গোটা ঘর। প্রত্যেকের শরীর ঠান্ডা হয়ে এলো, গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল অজানা আতঙ্কে। বিশেষ করে কুহুর। রুদ্রর আকড়ে ধরা অবস্থাতেই শিওরে উঠল ও। বোনের অস্থিরতা টের পেয়ে কুহুর মাথায় রাখা নিজের হাতটা আরও মুজবুত করে রাখল রুদ্র।
আজ থেকে প্রায় তিনমাস আগে রুদ্রর মতো একই আদেশ জারি করেছিলেন রাশেদ আমের। কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়ে দিয়েছিলেন, সবাইকে বাড়িতে থাকার জন্যে। আর তারপর কী ঘটেছিল, তা এই আমের পরিবার কোনদিন ভুলতে পারবেনা। সেই দিনগুলো মনে পড়লে আজও ওদের গায়ে কাটা দেয়, বুকে ব্যথা হয়, ভয়ে অস্থির হয়ে ওঠে।

জাফর এবার কিছুটা তেঁতে উঠে বলল, ' কী সমস্যাটা কী বলতো। এতোদিন যা ইচ্ছা করেছিস কিছু বলিনি। কিচ্ছু শেয়ার করিসনি। নিজেই নিজের মতো সব করে গেছিস। আমাদের দিয়ে করিয়ে গেছিস। আমরা করেছিও। কোন প্রশ্ন না করেই করছি। কিন্তু এখনতো মনে হচ্ছে আমাদের গোটা পরিবারের সিকিউরিটির প্রশ্ন। এখনো যদি ক্লিয়ার করে না বলিস যে ঠিক কী ঘটছে, আমাদের ধোঁয়াশায় রেখে দিস তাহলে কীকরে হয়?'

এবার উচ্ছ্বাসও বলল, ' আই এগ্রি উইথ কাকা। এখন তোর সবটা ক্লিয়ার করা উচিত। এটলিস্ট আমাদের কাছে।'

' বললামতো সময় হলো বলব।'

রুদ্রর জবাবে আরও রেগে গেল জাফর। উঠে দাঁড়িয়ে প্রায় ধমকে বলে উঠল, ' সব কিছু তোমার সময়মতো হবে কেন? আমরা সবাই মেম্বার এবং সবার জানার অধিকার আছে যে কী ঘটছে। নয়তো এটা আমাদেরও সুরক্ষার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। ভুলে যেওনা সোলার সিস্টেমে বর্তমানে সবচেয়ে সিনিয়র আমিই। যখন তুমি জন্মাওনি তখন থেকে থেকে যুক্ত আছি এর সঙ্গে। সোলার সিস্টেম যদি একশটা ইটে তৈরী হয়ে থাকে। সেখানে অন্তত বিশটা ইট আমার অবদান। সে হিসেবে লীডার আমারই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, তোমাকে স্নেহ করি আমি, আমরা সকলেই। সোলার সিস্টেমের প্রত্যেকটা মানুষ তোমাকে অন্ধের মতো ভরসা করে। সে কারণে ভাইজান যাওয়ার পর তোমাকেই অলিখিত লীডার মানা হয়। তারমানে এই নয়যে তোমার যা ইচ্ছা তা করবে। সবকিছুতে নিজের ইচ্ছা খাটাবে।'

রুদ্র চিবুনো বন্ধ করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল জাফরের দিকে। চোখে শীতল দৃষ্টি। বাকি সবাইও হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আজ অবধি জাফর কিংবা উচ্ছ্বাস কখনও রুদ্রর সঙ্গে এধরণের আচরণ করেনি। এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর রাশেদ অবধি কখনও এভাবে কথা বলেননি ওর সাথে। কেউ কোনদিন বলবে তা কল্পনাও করেনি কেউ।

নাজিফা এবং জ্যোতি দুজনেই তাকাল উচ্ছ্বাসের দিকে। দৃষ্টিতে অনুনয় যাতে থামানো হয় জাফরকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে। কিন্তু অবাক করা বিষয়, আজ উচ্ছ্বাসও থামাতে এলোনা কিছু। ওর চোখমুখ দেখে মনে হল, জাফরের সঙ্গে অনেকাংশেই একমত ও। উচ্ছ্বাসের এহেন প্রতিক্রিয়া দেখে ওরা দুজনেই কিঞ্চিৎ অবাক হল।

এরমধ্যেই মাথা তুলল কুহু। অস্থির হয়ে হাতের ইশারায় কিছু বোঝাতে চাইল। তা দেখে হুট করে জ্যোতির মাথাতে এলো ব্যপারটা। ও চিন্তিত চোখে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, 'তুমি সবাইকে বাড়িতে থাকত বললে, কিন্তু প্রিয়তা? ও বেচারীকে তুমি একা বনানী ফেলে রেখে এসেছো। নাও ডোন্ট সে কী ওখানে ও বেশি সেইফ। তোমার এসব পাগলামো অনেক শুনেছি। আর না। মাস দুয়েক আগে মেয়েটা নিজের বাচ্চা হারিয়েছে। এরপরও এতোকিছু হয়ে গেল। কদিন আগে গু*লি লাগল শোলডারে। আর তুমি ওকে এভাবে ওখানে একা ফেলে রেখেছো। নিজেদের ব্যক্তিগত রেষারেষি এই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার মানে আছে রুদ্র? এমন ছেলেমানুষীর কোন কনভেন্সিং রিজন আমি খুঁজে পাচ্ছিনা। তুমি কিংবা উচ্ছ্বাস এইমুহুর্তে গিয়ে নিয়ে আসবে ওকে। '

নীরব শায় দিয়ে বলল, ' আর আপনারা যদি ব্যস্ত থাকেনতো আমি যাই?'

রুদ্র সরু চোখে নীরবের দিকে তাকিয়ে বলল, 'তোমাকে বের হতে বারণ করেছিনা আমি?'

নীরব মাথা নুইয়ে ফেলল। কুহু রুদ্রকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ইশারায় বলল প্রিয়তাকে নিয়ে আসার জন্যে। এ ব্যপারে সম্পূর্ণ চুপ রইল জাফর আর উচ্ছ্বাস। কারণ তারা জানে, সত্যিটা কী। নাজিফাও একান্ত ব্যক্তিগত ব্যপারগুলোতে ঢুকল না। জ্যোতি বিরক্ত হয়ে বলল, 'তোমরা সবাই চুপ করে আছো কেন আমি বুঝছিনা। এসবের মানে হয়? এমন এক বিপদের মধ্যে ঐ মেয়েটা ওখানে একা থাকবে। ইজ দিস লজিক্যাল? কেউ যদি না যাও, তাহলে আমি গিয়ে নিয়ে আসব ওকে। দেখি আমাকে কে আটকায়।'

' তোমরা কী আমাকে নিয়ে ঝগড়া করছো?'

হঠাৎ অতি পরিচিত কন্ঠস্বর শুনে উপস্থিত সকলেই তাকাল সে শব্দ অনুসরণ করে। দেখল সদর দরজা পেরিয়ে প্রিয়তা প্রবেশ করেছে ভেতরে। এতক্ষণে বিস্ময় ফুটে উঠল রুদ্রর তীক্ষ্ম চোখে। নিজের গুনধর স্ত্রীর ওপর থেকে নিচ অবধি চোখ বুলিয়ে দেখল, সম্পূর্ণ কালো রঙের একটা স্যালোয়ার কামিজ পরে আছে। চুলগুলো মাঝে সিঁথি করে সুন্দরভাবে ছাড়া, মুখটা ফ্যাকাসে। কিন্তু মৃদু মিষ্টি এক হাসি ঝুলে আছে সেখানে। উচ্ছ্বাস আর জাফরও বেশ অবাক হল হঠাৎ ওকে এখানে দেখে। ওরা আশা করেনি প্রিয়তা আর কোনদিন এ বাড়িতে ফিরবে। তাও সেচ্ছায়!

কিন্তু স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল বাকি সবার চোখেমুখে। কুহু রুদ্রর পাশ থেকে উঠে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল প্রিয়তাকে। প্রিয়তাও স্বআবেগে দুহাতে জড়িয়ে ধরল ওকে। কুহু ফুঁপিয়ে উঠল। ভ্রুকুটি করে নিজেকে ছাড়াল প্রিয়তা। দুহাতে কুহুর গালে হাত রেখে বলল, ' কাঁদছো কেন? আমি ফিরে আসায় এতো মন খারাপ হয়ে গেছে?'

চোখ মুছে এদিক ওদিক মাথা নাড়াল কুহু। ইশারায় বলল, 'তোমাকে অনেক মিস করেছি ভাবি। আর যেওনা কোথাও। একদম মন টেকে না।'

নীরবও সানন্দে এগিয়ে এসে বলল, 'ওয়েলকাম ব্যাক, ভাবি।'

জ্যোতি এগিয়ে এসে দুহাতে জড়িয়ে ধরল প্রিয়তাকে। স্বস্তি নিয়ে বলল, ' অবশেষে এলে তুমি। এমন বাচ্চামো করে কেউ? মানছি ঝগড়াঝাটি হলে হাজবেন্ড-ওয়াইফ একটু দূরে দূরে থাকে। কিন্তু পরিস্থিতিওতো বুঝতে হবে তোমাকে। সেইফটি আগে না ঝগড়া?'

এরপর রুদ্রর দিকে ঘুরে ভ্রু কুঁচকে বলল, ' আর তুমি! বললেই হতো বউকে আনতে লোক পাঠিয়ে দিয়েছো। শুধু শুধুই এতক্ষণ এতো কথা বললাম। আমারই বোঝা উচিত ছিল, এমন সময় তুমি ভুলেও ওকে বাইরে কোথাও রাখবেনা।'

কুহুর ইশারায় পুনরায় জিজ্ঞেস করল। প্রিয়তার ক্ষতের কী অবস্থা। সুস্থ হয়েছে কি-না। তা দেখে জ্যোতিও বলল, 'ইশ! আমিতো ভুলেই গেছি জিজ্ঞেস করতে। ঠিক আছো এখন? ব্যথা আছে?'

প্রিয়তা মিষ্টি হেসে বলল, ' সামান্য আছে। কিন্তু এখন অনেকটা বেটার। মুভ করতে সমস্যা হচ্ছেনা কোন।'

বলতে বলতেই নাজিফার দিকে চোখ গেল প্রিয়তার। উঠে দাঁড়িয়েছে সে প্রিয়তাকে দেখামাত্র। প্রিয়তা এগিয়ে গিয়ে আলতো করে ওকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'কেমন আছো?' অতঃপর ভরাট পেটের দিকে তাকিয়ে বলল, 'কী অবস্থা এখন?'

নাজিফা মৃদু হেসে বলল, ' ঠিকঠাক। এখনো কিছু বুঝছিনা আসলে।'

' আমি কিন্তু বেশি দ্রুত এসেছি তোমার কথা শুনেই। কোথায় যেন শুনেছিলাম, উড বি মাদারদের কোন কথা ফেলতে নেই।'

নাজিফা প্রিয়তার দুহাত ধরে বলল, 'বাড়িটাতো আপনার। আপনি না থাকলে হয়?'

' এখন থেকে তোমারও।'

রুদ্র এখনো তাকিয়ে আছে প্রিয়তার দিকে। দেখছে এর বেশভূষা, মুখভঙ্গি। সকলের সঙ্গে আচরণ। অথচ কিছু ঘন্টা আগেই এই মেয়ে কালো জ্যাকেট আর জিন্স পরে, ইয়ামাহাতে চড়ে তিনশ ফিটে ১৫০ স্পিডে বাইক চালিয়েছে। ভারী ট্রাকের নিচে পরতে পরতে নিজেকে বাঁচিয়ে নিয়েছে। কয়েকঘন্টার মধ্যেই কী অদ্ভুত ট্রান্সফরমেশন! এভাবেই দুটো বছর ওকেও টুপি পড়িয়েছে মেয়েটা। আর প্রেমে অন্ধ হয়ে ওও সানন্দে সে টুপি পড়েছেও! 

মেজাজ ভয়ানক খারাপ হল রুদ্রর। খাওয়া ছেড়ে ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেল প্রিয়তার দিকে। শক্ত করে ওর বাহু ধরে টেনে নিয়ে এলো নাজিফার সামনে থেকে। তীক্ষ্ণ চোখে প্রিয়তার দিকে তাকিয়ে হিশহিশিয়ে বলল, ' বলেছিলাম না এখানে না আসতে?'

এবার বাকিরাও চমকাল। ওরা ভেবেছিল রুদ্রই লোক পাঠিয়েছে প্রিয়তাকে আনতে। কিন্তু কাহিনীতো অন্য। প্রিয়তা খুবই অবুঝ চোখে তাকাল রুদ্রর দিকে। সরল স্বরে বলল, 'সবাইকে ভীষণ মিস করছিলাম।'

রুদ্র কিছু বলবে, তার আগেই জ্যোতি অবাক স্বরে বলল, 'সমস্যা কী রুদ্র, ও এসেছে তুমি খুশি হওনি? এমন আচরণ করছো কেন?'

নাজিফা ভীত চোখে তাকিয়ে বলল, ' ভাইয়া আমরা সবাই মিলেই বলেছিলাম ভাবিকে আসতে। স্পেশিয়ালি আমি। আমিই চেয়েছিলাম আমার ডেলিভারির সময় অন্তত ভাবি থাকুক। আপনি, আপনি রাগ করবেন না।'

কুহু এগিয়ে রুদ্রকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল, 'আমি অনেক কান্নাকাটিও করেছি ভাবিকে নিয়ে আসতে। অনেকবার কল করেছি। তুমি বকছো কেনো?'

নীরব আর সাহস পেলোনা কথা এগোনোর। ভীতি আর বিভ্রান্তি নিয়ে তাকিয়ে রইল শুধু। প্রিয়তাই কথা ঘুরিয়ে বলল, 'সকালে কিছু খাইনি। ক্ষিদে পেয়েছে খুব। খেয়ে নেই আগে?'

রুদ্র ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলল। দাঁতে দাঁত চেপে প্রিয়তার দিকে তাকিয়ে ওকে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করল ওপরে। জ্যোতি ঝট করে সামনে এসে বাঁধা দিল, 'রুদ্র প্লিজ, এখন না। এটা ঝগড়া করার সময় বা সিচুয়েশন না। ও যদি না বলে এসেও থাকে, এখন এসব নিয়ে রাগারাগি করোনা।'

কিন্তু রুদ্র তোয়াক্কা করল না। প্রিয়তাকে নিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে নিলে জ্যোতি বলে উঠল, ' ওকে খাবারটা অন্তত খেতে দাও। তুমিওতো খেলেনা।'

রুদ্র থেমে গেল। গম্ভীর আওয়াজে বলল, ' আমার খাওয়া হয়ে গেছে। ওর খাবার আর আমার কফি একটু পরে রুমে পাঠিয়ে দিস।'

উচ্ছ্বাস বাঁধা দিয়ে কিছু বলতেই যাচ্ছিল। কিন্তু রুদ্রর চাহনি দেখে থেমে গেল ও। রুদ্র রক্তিম সেই দৃষ্টি রেখেই বলল, 'স্টে আউট অফ ইট।'

কারো আর কোন বয়ানের জন্যে অপেক্ষা করল না রুদ্র। প্রিয়তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ওপরে। 

বিভ্রান্তি, ভয়, হতাশা নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল সকলে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জাফর হনহনে পায়ে বেরিয়ে চলে গেল নিজ কক্ষের দিকে। উচ্ছ্বাসও দুহাতে ধরে নাজিফাকে ওর বরাদ্দ ঘরে নিয়ে গেল। বিশ্রাম দরকার মেয়েটার এখন। চারদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল জ্যোতি। প্রিয়তার ফিরে আসাটা আনন্দদায়ক হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ইদানিং আমের ভিলায় উচিত কিছুই হচ্ছেনা। তারওপর হঠাৎ রুদ্রর এমন আচরণ। উচ্ছ্বাস আর জাফরের সঙ্গে মতবিরোধ। হঠাৎ ওদের বের না হওয়ার ঘোষণা। কেমন এক থমথমে, অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে সবার মধ্যে।

—————

ঘরে ঢোকামাত্র প্রিয়তাকে প্রায় সামনের দিকে ছুড়ে মারল রুদ্র। সশব্দে দরজাটা বন্ধ করে বলল, ' হোয়াই দ্য ফা* আর ইউ হিয়ার?'

রুদ্রর ধরে রাখা হাতের অংশটুকু অপর হাত দিয়ে ঘষল প্রিয়তা। ব্যথা লেগেছে ভীষণ। তারওপর ঐ শোল্ডারেই গু*লির আঘাত ছিল। হাত ঘষতে ঘষতেই বলল, ' আমি না এলে আপনার বাড়ির লোক চলে যেতো বনানীর ফ্ল্যাটে। আমাকে নিয়ে আসতে। আর ওখানে গিয়ে পেতোনা আমাকে। তখন কী বলতেন ওদের? এমনিতেই সবাই ভয়ের মধ্যে আছে। কুহুর ডিপ্রেশন এখনো কাটেনি। এইসব কথা শুনিয়ে সেসব আরও বাড়াতেন।'

রুদ্র তেড়ে এসে বলল, ' সেটা আমার সমস্যা।' এরপর হঠাৎ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, 'আর তুমি আমার পরিবারের লোকেদের কথা চিন্তা করে এখানে এসেছো? কুহুর ডিপ্রেশন, বাকি সবার ভয়। এসব কমাতে এসেছো? তুমি? যে নিজেই কুহুর ডিপ্রেশন, ট্রমার সবচেয়ে বড় কারণ। যে নিজেই এই পরিবারের জন্যে সবচেয়ে বড় ডেঞ্জার। বাট আনফরচুনেটলি ওরা সেটা জানেনা। ওরা জানেনা যে দড়িকে ওরা আকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছে, সেটা শুধু একটা সাপ না, কালসাপ।'

প্রিয়তা হাত ভাঁজ করে বলল, ' যেদিন থেকে আপনার নামে কবুল বলেছি, সেদিন থেকে এটা আমারও বাড়ি রুদ্র আমের। আর এইবাড়ি থেকে চিরকালের মতো আমি সেদিনই বের হব, যেদিন মৃত্যুর উদ্দেশ্যে যাত্রা করব। এর আগে নয়।'

হেসে ফেলল রুদ্র, ' কবুল! ইউ মিন যে বিয়েটা হয়েছিল আমাদের। তোমার কাছে সত্যিই ওটা কোন বিয়ে ছিল? নিজের স্বামী আর তার পরিবারকে ধ্বংস করার জন্যে বিয়ে! ওয়াও!' এরপরএকটু চিন্তা করার ভান করে বলল, 'আই ওয়ান্ডার এবাউট ওয়ান থিং। সিরিয়াসলি। তোমার বয়ফ্রেন্ড। আই মিন সম্রাট তাজওয়ার। রাজি হলো কীকরে, নিজের গার্লফ্রেন্ডকে অন্যকারো ঘরে পাঠাতে? তাও আমার ঘরে? নাকি ইউ হ্যাভ অলরেডি স্যাটিসফাইড হিম সো মাচ, দ্যাট হি ডাজেন্ট ইভেন কেয়ার এখন তুমি কারকার সাথে_'

' রুদ্র!' রুদ্র বাক্যটা শেষ করার আগেই গর্জন করে উঠল প্রিয়তা। ভয়ংকর কোন হুংকারের মতো শোনালো ওর গলায় এই শব্দটা। চোখদুটো দিয়ে যেন আগুনের ফুলকি বের হবে।

রুদ্র ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল প্রিয়তার চোখে। সত্যিটা সামনে আসার পরেও প্রিয়তা কখনও রুদ্রর সঙ্গে এইভাবে কথা বলেনি, এভাবে তাকায়নি। একমুহূর্তের জন্যে যেন প্রকৃত রাণী মির্জাকে দেখল ও। প্রিয়তা ক্রোধ চেপে হিশহিশিয়ে বলল, 'ডোন্ট গো দেয়ার।'

রুদ্র তাকিয়েই রইল প্রিয়তার দিকে। প্রিয়তা চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল নিজেকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর আরও কুঁচকে উঠল রুদ্রর ভ্রুজোড়া। যেন হঠাৎ কিছু মনে পড়ে গেল। ও প্রিয়তার দিকে তাকিয়ে বলল, 'গতরাতে তোমাকে দেখে মনে পড়ল একটা জিনিস। পারভেজকে যখন আমি খু*ন করতে নিয়ে গিয়েছিলাম। তখন আমি মারার আগেই কেউ শ্যু*ট করে ওর মাথায়। বাইকে ছিল সে। ফুল ব্লাকে, মাথায় হেলমেট ছিল। দ্যাট ওয়াজ ইউ, রাইট?'

মাথা ঝাঁকাল প্রিয়তা, 'রাইট। আপনার হুট করে যাওয়ার ধরণ দেখেই বুঝেছিলাম ওকে সরাতেই যাচ্ছেন। ও জানতো আমার আসল পরিচয়। আপনার টর্চারের মুখে বলে দিতো সত্যিটা। তাই করতে হয়েছে আমায়। আপনি বাড়ি ফেরার আগে ফিরেও এসেছি।'

হাত মুষ্টিবদ্ধ হল রুদ্রর। কিন্তু তাও নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে বলল, ' আর মিট করতে কীকরে নিজের দলের লোকেদের সঙ্গে? আইমিন আমের ভিলা থেকে বের হলে তোমার সঙ্গে গার্ড দেওয়া হতো। ভার্সিটিতেও তোমার সঙ্গে গার্ড যেতো। সুযোগটা পেতে কোথায়?'

'বোরকা।'

' বোরকা?'

মৃদু হাসল প্রিয়তা। অকপটে বলল, ' ক্যাম্পাসে ঢোকার পর ওয়াশরুমে গিয়ে বোরকা পড়ে নিতাম। তারপর পেছনের গেইট দিয়ে বেরিয়ে যেতাম। গার্ডরা আর চিনতে পারতো না। নির্দিষ্ট ক্লাসটাইম শেষ হওয়ার আগেই ফিরে আসতাম। ওয়াশরুমে গিয়ে আবার বোরকা খুলে নিতাম। ধরা পরার ভয়ও ছিলোনা কারণ, সাধারণত অকারণে আমাদের দেশের মেয়েদের যত্রতত্র নেকাব তুলে মুখ দেখা যায়না। ধর্ম অবমাননার দায়ে চরমভাবে ফেঁসে যাবে।'

রুদ্র বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল। এই জিনিসটাকে নিয়ে ও সংসার করেছে দুবছর! মেজাজ এবার নিয়ন্ত্রণহীন খারাপ হল ওর। তেড়ে গিয়ে চেপে প্রিয়তাকে ঠেসে ধরল দেয়ালের সঙ্গে। শক্ত করে চোয়াল চেপে ধরে প্রচণ্ড রাগে গজগজ করতে করতে বলল, 'তুমি কোন উদ্দেশ্য ছাড়াযে এখানে আসোনি, তা আমি জানি। কিন্তু বাড়ির সবার মেন্টাল কন্ডিশনের কথা চিন্তা করে এমুহূর্তে কিছু বলছি না ওদের। তবে তার কোন সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করলে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করবে তুমি। লেট মি মেইক ইট ভেরী ক্লিয়ার রাণী মির্জা, এরপর আমের পরিবারের আর একটা সদস্যের যদি বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয়, আর তাতে যদি তোমার ওয়ান পার্সেন্টও হাত থাকে। আই রিপিড, ওয়ান পার্সেন্টও হাত থাকে। তাহলে তোমাকে নিজের হাতে খুন করব আমি। দ্যাটস আ প্রমিস। এন্ড আই ডোন্ট ব্রেইক প্রমিসেস।'

রুদ্র এতো শক্ত করে ধরেছে যে প্রিয়তা কাঁধের আঘাতে টান লাগছে। তাও কোন শব্দ করল না প্রিয়তা। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে নিল। তাকিয়ে রইল রুদ্রর তীক্ষ্ম চোখজোড়ার দিকে। 

দরজায় নকের আওয়াজে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হল দুজন। খাবার আর কফি এসেছে বোধহয়। প্রিয়তা নিজের ওড়না ঠিক করে চলে গেল দরজা খুলতে।
রুদ্র একহাত কোমরে রেখে অন্যহাত দিয়ে মাথার চুল উল্টে ধরল। ঠোঁট কামড়ে ধরল তীব্র হতাশায়। ও কোনভাবেই চায়নি প্রিয়তা আর কোনদিন ওর সামনে আসুক। এতোদিন নিজের স্বার্থেই প্রিয়তাকে ওর দরকার ছিল। তাই নিজের মনকে ও এই বলে সান্ত্বনা দিতোযে নিজের প্রয়োজনেই ও বাঁচিয়ে রাখছে এই মেয়েকে। নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি বা দুর্বলতার জন্যে নয়। কিন্তু এখন? এখন কী বলে ঠকাবে নিজেকে? 
সেদিন যখন জঙ্গলে ওর গু*লিতে প্রিয়তা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল। বাইরে দিয়ে নিজেকে শক্ত রাখলেও, রুদ্রর বুক ঠিক কতটা জোরে কেঁপেছিল তা কেবল রুদ্রই জানে। রাতে যখন প্রিয়তা ট্রাকের নিচে পড়ছিল তখন একমুহূর্তের জন্যে ওর মনে হচ্ছিলো ওর গোটা পৃথিবী থেমে গেছে। পৃথিবীকে নিজের বাহ্যিক আচরণে ও অনায়াসে বুঝিয়ে দেবে এই বিষাক্ত মেয়েটিকে ও ঘৃণা করে। কিন্তু নিজেকে কী দিয়ে বোঝাবে? এতোকিছুর পরেও যে মেয়েটার সামান্য ক্ষতি হলে ওর সমগ্র কায়া কেঁপে ওঠে, সে মেয়েটাকে নিজের হাতে হ*ত্যা করার মতো মনোবল আর কীকরে যোগাড় করবে ও। আর কী ঘটলে? আর কতবড় ক্ষতি হলে এই মেয়েকে শাস্তি দিতে ওর হাত কাঁপবে না? আর কোন বিভৎস ঘটনার প্রয়োজন সেই অসাধ্য সাধনের জন্যে?

—————

নাজিফার শরীর ভারী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পা জোড়া বেশ ভালোই ফুলেছে। ইদানিং বেশ শিরশির করে ব্যথা হয়। উচ্ছ্বাস সযত্নে ওর ফোলা পা দুটো কোলের ওপর নিয়ে আলতো হাতে টিপে টিপে দিচ্ছে। একটু আগেই গরম তেলও মালিস করে দিয়েছে। এমনটা মাঝেমাঝেই করে ও। নাজিফা একপর্যায়ে বাঁধা দিয়ে বলল, 'হয়েছে। এখন আরাম লাগছে। আর করতে হবেনা।'

উচ্ছ্বাস হেসে বলল, ' আমারতো ভালোই লাগছে করতে।'

' তাও।'

' আমি থাকিই কতক্ষণ তোমার কাছে, বলোতো নাজিফা? এইটুকু করতে দাও।'

বলে আরও যত্ন করে টিপতে লাগল নাজিফার ফোলা পাজোড়া। নাজিফা ঘাড় কাঁত করে তাকিয়ে রইল উচ্ছ্বাসের দিকে। ঠোঁটে মৃদু, মুগ্ধ হাসি।

' আজ কী বের হবে আর?'

' বিকেলে একটু বসব সবাই মিলে আমের ফাউন্ডেশনে।'

' ফিরবে কখন?'

' সন্ধ্যায়।' হঠাৎ ব্যস্ত হল উচ্ছ্বাস, 'কেন? তোমার কী কিছু ফিল হচ্ছে? কিংবা কোন অসুবিধা হচ্ছে? কিছু বুঝছো? হলে বলে ফেলো নাজিফা। আমি এক্ষুনি নিয়ে যাব হসপিটালে। কারো কথা শুনবোনা আমি।'

' আরে নারে বাবা। সব নরমাল। তাছাড়াও এসব সবসময় আগে টেরও পাওয়া যায়না। এখনো অবধি কোন কম্প্লিকেশন নেই। হলে বলব। আর বললে রুদ্র ভাইও আপত্তি করবেনা।'

উচ্ছ্বাস চুপ হয়ে গেল। নাজিফা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'রুদ্র ভাই নানা বিষয়ে একটু স্ট্রেসে আছেন এখন। তারওপর প্রিয়তা ভাবির সঙ্গেও ঝগড়া চলছে। তাই হয়তো মাঝেমাঝে একটু রুড হয়ে যান। কিন্তু উনি যাই করেন, আমাদের সবার ভালোর জন্যেই করেন। এটাতো মানো?'

আলতো করে মাথা দোলালো উচ্ছ্বাস। বলল, ' ওসব আমরা বুঝে নেব। তুমি এসব নিয়ে চিন্তা করে নিজের স্ট্রেস বাড়াবেনা এইমুহূর্তে। আমি একটা হেলদি বাচ্চা আর সুস্থ বউ চাই। গট ইট?'

নাজিফা ভ্রু তুলে বলল, ' বউ?'

উচ্ছ্বাস ভ্রু কুঁচকে বলল, ' এতো অবাক হওয়ার কী আছে? আমিতো বলেছিই নরমাল ডেলিভারী হলে, ঐদিনই তোমার আর আমার কাবিন হয়ে যাবে। আর তা না হলে তুমি সুস্থ হওয়ার পর। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যদি কখনও সুযোগ হয় তখন আনন্দ অনুষ্ঠান করা যাবে।'

হঠাৎ কিছু মনে পড়ল উচ্ছ্বাসের। নাজিফার পা জোড়া আলতো হাতে সরিয়ে উটে দাঁড়িয়ে বলল, ' ওয়েট। একটা জিনিস দেওয়া হয়নি তোমাকে।'

বলতে বলতে বেরিয়ে গেল উচ্ছ্বাস। নাফিজা কিছু বলতে গিয়েও বলার সুযোগ পেলোনা। উচ্ছ্বাস ফিরে এলো পাঁচ মিনিট পর। হাতে একটা শপিং ব্যাগ। নাজিফার পাশে আবার বসল উচ্ছ্বাস। বেশ উৎসাহ নিয়ে ব্যাগটা থেকে বের করল মেরুন রঙের একটা শাড়ি। সিম্পল, কিন্তু ভীষণ সুন্দর। নিজে একবার দেখে, নাজিফার দিকে শাড়িটা এগিয়ে দিল উচ্ছ্বাস। নাজিফা খানিকটা অবাক হয়েই হাতে নিল শাড়িটা। উচ্ছ্বাস তাকাল নাজিফার দিকে। চোখদুটো মিশ্র অনুভূতিতে জ্বলজ্বল করছে ওর। ও বলল, 'জানো, যেদিন থেকে তোমার প্রেমে পড়েছিলাম, তোমাকে বউয়ের সাজে দেখার ভীষণ ইচ্ছা ছিল আমার। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল খুব যন্ত্রণাদায়কভাবে। অন্যকারো জন্যে বউ সেজেছিলে তুমি। তুমি জানো, আমি দূর থেকে দেখেছিলাম সেদিন তোমাকে। ভয়ংকর সুন্দর লাগছিল তোমায়। কিন্তু মুখে হাসি ছিলোনা। এবার আমি সেই দুটো ঘারতিই পুরন করতে চাই। তোমাকে আমার বউ করতে চাই, উচ্ছ্বাসের বউ। তুমি এই শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে আমার বউ সাজবে। আর তোমার মুখে থাকবে পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি সেই হাসিটা। সেদিন আমিও খুব হাসব। আমি সেদিন হব পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ। সেদিন রাস্তায় পড়ে থাকা অবৈধ এই ছেলেটার ও একটা বৈধ সম্পর্ক হবে। বন্ধন হবে। আর কোন কলঙ্ক থাকবেনা।'

টপটপ করে দু ফোঁটা জল পড়ল নাজিফার চোখ বেয়ে। শাড়িটাতে গভীর আবেগে হাত বুলালো ও। কী বিভৎস ছিল বিচ্ছেদের সেই দিনগুলো। একে অপরের থেকে চিরকালের মতো আলাদা হয়ে যাওয়ার সে অনুভূতি। নির্ঘুম রাত, বালিশে মুখ চেপে কান্না, প্রতিনিয়ত ছটফট করা, এরপর ধীরে ধীরে সবটা সয়ে নেওয়া। কোনদিনওতো ওরা কল্পণাও করেনি যে আবার এক হওয়ার সুযোগ আসবে ওদের সামনে। ওদের ভালোবাসার কোনদিন কোন বৈধ নাম হবে।
নাজিফা মাথা তুলে তাকাল উচ্ছ্বাসের জ্বলজ্বলে চোখের দিকে। দুহাতে উচ্ছ্বাসের গালে রেখে বলল, 'তুমি কিন্তু কথা দিয়েছিলেন এ জগত থেকে বেরিয়ে আসার। সে শর্তেই কিন্তু এসব হচ্ছে। তাইনা?'

মাথা নাড়ল উচ্ছ্বাস। নাজিফার হাতের ওপর হাত রেখে বলল, 'রুদ্র বলেছে এই ঝামেলাটুকু মিটলেই সব ছেড়ে দেবে। আমিও থাকবনা এরপর। সব ছেড়ে আমি চলে আসব তোমার কাছে। শুধু তোমার কাছে। শুধু তোমার উচ্ছ্বাস হয়ে।'

' প্রমিস?'

' বিশ্বাস করো, আই প্রমিস।'

—————

দুপুরে আজ বেশ ভালো কয়েক পদ রান্নার আয়োজন করেছে জ্যোতি। সকালে এমনিতেই বাড়িটা পূর্ণ ছিল। প্রিয়তা আসার পর একদম ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে। অনেকদিন পর আজ আবার সবাই একসঙ্গে। মনের সব বিষাদ, যন্ত্রণা ভুলে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করবে সবাই। একটু হলেও আনন্দ করবে। আমের ভিলা আগের মতো না হোক, একটু হলেও জমজমাট হবে।

রান্না শেষে সব গোছগাছের সময়ই নিচে নেমে এলো প্রিয়তা। এতক্ষণ ঘুমিয়েছে ও। সারারাত না ঘুমোনোর ফলে, নাস্তা করে শোয়ার পরপরই ঘুমিয়ে পড়েছিল। উঠে দেখেছে রুদ্রও ওর পাশে বিছানাতেই ঘুমিয়েছে, খানিক দূরত্বে উল্টো দিকে ঘুরে। সেটাই স্বাভাবিক। দুইবছর একসঙ্গে থেকে, উঠবি প্যারেন্টস্ হয়ে যাওয়ার পর; তুমি সোফায়, আমি বিছানায় নামক ড্রামা খুবই হাস্যকর। যা ও নিজেও একসময় করেছিল নাটক করে। কিন্তু রুদ্র আমের তা করবেনা। তার নাটক পোষায় না। আরেকটা বিষয় নিয়ে মন খারাপও আছে ওর। রুদ্র এবার যা ভাবছে তা ঠিক নয়। আজ ও কোন উদ্দেশ্য নিয়ে আসেনি এ বাড়িতে।  

প্রিয়তা দেখামাত্র হাসল জ্যোতি। বলল, ' ভালো হয়েছে নেমেছো। নয়তো এখনই ডেকে পাঠাতাম। রুদ্র কই?'

' ঘুমোচ্ছে। খাবার সব ডাইনিংয়ে রেডি করে তারপর ডাকছি।'

' আচ্ছা।'

ডাইনিংটা খুবই জমজমাট না হলেও, একেবারে নিষ্প্রাণও হলোনা। টুকটাক ভালোই কথাবার্তা হচ্ছে। প্রিয়তা দেখল রুদ্রর পাতে চিকেন লেগপিস নেই। ওটা রুদ্রর পছন্দ। অন্যকোন পিস খায়ও না। প্রিয়তা নিজেই সেটা তুলে দিল রুদ্রর পাতে। রুদ্র সেকেন্ডের জন্যে থমকে গেলেও কোন প্রতিক্রিয়া করল না। কিন্তু স্বভাবসুলভভাবে উচ্ছ্বাস বলে উঠল, ' এটা ঠিক বউমণি? ঠিক বেছে বেছে বরের পাতে বড় লেগপিস তুলে দিলে। বেচারা দেবরটাকে চোখে পড়েনা? আর এতো লেগপিস খাইয়েই বা কী হবে বলো? সেইতো ওর লেগস্, আই মিন ঠ্যাঙের কাজটা আমাকেই করতে হয়।'

প্রিয়তাও বলে উঠল, ' ওর লেগের কাজ করতে হলেতো তোমাকে হাত কাজে লাগতে হয়। তাই তুমি বেশি বেশি পাখনা খাও। ডিউটি পালনে সুবিধা হবে।'

বলতে বলতেই উচ্ছ্বাসের পাতে শুকনো একটা পাখনা তুলে দিল প্রিয়তা। তা দেখে মুখ কালো করে ফেলল উচ্ছ্বাস। ওদের কান্ডে নাজিফা, জ্যোতি, কুহু আর নীরব হেসে ফেলল। প্রিয়তা আর উচ্ছ্বাসও একসঙ্গে হেসে ফেলল তা দেখে। হাসতে হাসতেই তাকাল একেঅপরের দিকে। কিন্তু দুজনের চোখে চোখ পড়তেই যেন মনে পড়ে গেল বিষাক্ত বাস্তবতা। মুখের হাসিটুকু আপনাআপনিই মিলিয়ে গেল।

এমন মুহূর্তেই বেজে উঠল রুদ্রর ফোনটা। রুদ্র মুখে লোকমা তুলতে গিয়েও থেমে গেল। ভ্রু কুঁচকে তাকাল স্ক্রিনে। কলটা রিসিভ হওয়ার পর ওপাশ থেকে বোধহয় একটাই বাক্য বলা হল। উত্তরে রুদ্র কেবল বলল, আসছি। এরপর উঠে সোজা হাত ধুতে চলে গেল ও। হাত ধুয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় জ্যোতি পেছন থেকে চেঁচিয়ে উঠল, ' খাবারটা শেষ করে তারপর যাও অন্তত।'

কিন্তু দাঁড়াল না রুদ্র। তাকালোওন পেছন ফিরে। বেরিয়ে গেল নিজের মতো। কিছুক্ষণ সবাই খাওয়া ছেড়ে স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল। অতঃপর জাফর গলা ঝেড়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলল, ' খাওয়া শেষ করো সবাই। ওর জরুরি কাজ পড়েছে হয়তো।'

সবাই তাই করল। প্রিয়তা আরও একবার ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল রুদ্রর যাওয়ার দিকে। অতঃপর অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে খাওয়া শুরু করল বাকি সবার সঙ্গে।

কিন্তু বিষন্নতায় ছেয়ে গেল সবার মন। কীসব হচ্ছে! দিনটা কেমন অদ্ভুত থমথমে। খানিক বাদে বাদে গা শিরশির করে কাঁটা দিয়ে উঠছে। সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিমে। কিছু ঘন্টা পরেই সন্ধ্যা নামবে। তিনমাস আগে এমনই এক থমথমে দিনে সন্ধ্যা নেমেছিল আমের ভিলায়। এরপর আর কোনদিন সূর্যদয় হয়নি। আর কোনদিন হবে কিনা, জানা নেই কারো। 

—————

রুদ্রর দেখা পাওয়া গেল একেবারে বিকেলে, আমের ফাউন্ডেশনে। জাফর আমের, উচ্ছ্বাস, রঞ্জু আর জয়সহ আরও কিছু লোক অপেক্ষা করছিল ওর জন্যে। রুদ্র এসে সোজা নিজের বরাদ্দকৃত চেয়ারটাতে বসল। প্রথমেই কিছু বলল না। সামনে রাখা ফাইল দেখতে দেখতে আস্তেধীরে একটা সিগারেট জ্বালাল। দুটো টান দিয়েই সকলের দিকে তাকিয়ে বলল, 'এখনো পর্যন্ত হিসেব খুবই ক্লিয়ার আছে। নিট এন্ড ক্লিন। এখনো কোথাও ডেলিভারী দেওয়া বাকি আছে?'

' আছে আরও তিনটা জায়গায়।' লিস্ট দেখে বলল রঞ্জু।

' তাহলে আর টাইম ওয়েস্ট না করে দ্রুত কাজ সেড়ে ফেল।'

জাফর প্রশ্ন করল, ' আর ইন্ড্রিরা আর বার্মার ডিলের কাজ কবে থেকে শুরু হবে।'

' সেটা নিয়ে এখন ভাবতে হবেনা। ভাবার সময় এলে বলব।'

রুদ্রর একরোখা জবাবে পুনরায় ভ্রু কুঁচকে উঠল জাফরের। নিজের অসন্তোষ চেপে রাখতে না পেরে বলল, ' অথচ মাসতিনেক আগেও এসব বিষয় একসঙ্গে বসে, দলের সবার মতামত নিয়ে শুরু করা হতো। সবার পরামর্শ নিয়ে তবেই যেকোন ডিলে হাত দেওয়ার সময়, প্রসেস, রুট নির্ধারণ হতো।'

রুদ্র সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলল, 'সেই তিনমাস আমরা পেরিয়ে এসেছি কাকা। সময় বদলায়, সেইসঙ্গে সিস্টেমও।'

জাফর আর কিছু বলল না। তবে চেহারায় অসন্তোষ স্পষ্ট। উচ্ছ্বাস বলল, 'তাহলে নেক্সট তিনটে জায়গায় মাল পাস করার জন্যে কে কোথায় যাবে তা ফিক্সড করে ফেলি। যেহেতু সময় নেই। '

' হুম। কিন্তু রঞ্জুকে বাদ দিয়ে। আজ আর কাল ওকে দরকার হবে আমার।'

এবারও জাফরই প্রশ্ন করল, ' কী কাজে? নাকি সেটাও সিকরেট। সেরকম হলে বল, আমরা সবাই বাড়ি গিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকি।'

এবার খানিকটা বিরক্তই দেখাল রুদ্রকে। সিগারেটের ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, ' একবারতো বললাম, কাজটা মিটে গেলেই বলব সব।'

হঠাৎই টেবিলে সশব্দে চাপড় দিয়ে বসল উচ্ছ্বাস। সবাই চমকাল। উচ্ছ্বাস রেগে বলল, ' কী সমস্যা কী তোর? কয়েকদিন যাবত চলছে এসব। আমি বলব, আমি করব, আমি শুনবো, আমি ডিসাইড করব। আমি! আমি! আমি! একমাত্র তুই-ই আছিস এই সোলার সিস্টেমে। আমরা সবাই, এতোগুলো মানুষ এখানে বসে কী করছি? ঘাস কাটছি?'

রুদ্র চোখ তুলে তাকাল। সকলে স্তম্ভিত হয়ে গেল উচ্ছ্বাসের আচমকা ক্ষেপে ওঠায়। সদা হাস্যজ্বল ছেলেটাকে ফিল্ডে হাতে গোণা এক দুবার ছাড়া ওরা কখনই সিরিয়াস দেখেনি। এভাবে ক্ষেপাতো অনেক দূরের কথা। রঞ্জুত থতমত খেয়ে গিয়ে বলল, ' ভাই একটু _'

উচ্ছ্বাস সঙ্গে সঙ্গে থামিয়ে দিল রঞ্জুকে, ' না দাঁড়া। পেয়েছেটা কী ও? এইযে আমরা এতোগুলো মানুষ দিনরাত এক করে খাটছি। প্রতি মুহূর্তে নিজেদের প্রাণ বাজি রেখে কাজ করছি। কার জন্যে? কীসের জন্যে? ওর জন্যে, এই সোলার সিস্টেমের জন্যে। এই মুহূর্তেও জান হাতে নিয়ে ঘুরছি আমরা সবাই। আর ও_?'

এ ধাক্কায় টেবিল থেকে নিজের সামনের সবকিছু ফেলে দিল উচ্ছ্বাস। সশব্দে চেয়ারটা ফেলে উঠে দাঁড়াল। চমকে উঠল কক্ষের সকলে, এমনকি জাফরও। রঞ্জু আর জয় চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল দ্রুত। উচ্ছ্বাস চেঁচিয়ে বলল, 'ও ইদানিং এমনভাবে বিহেইভ করছে যেন সোলার সিস্টেম ইজ হিজ ব্লাডি প্রপার্টি। আর আমরা? আমরা একেকটা পেয়াদা যারা সবাই ওর কথামতো নাচব।'

মিটিংরুমে সকলেই স্তম্ভিত হয়ে গেল। জয় আর রঞ্জু একবার উচ্ছ্বাসকে দেখছে, একবার রুদ্রকে। সোলার সিস্টেমের ইতিহাসে এমনটা কখনই হয়নি। রুদ্র আর উচ্ছ্বাসের মধ্যে তর্ক! সোলার সিস্টেমের কাছে ব্যপারটা অনেকটাই দুঃস্বপ্নের মতো। আজকের দিনটাই যেন ভীষণ অদ্ভুত, গোলমেলে। সকাল থেকেই সব আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে চলেছে।

এপর্যায়ে উঠে দাঁড়াল জাফর। উচ্ছ্বাসের কাঁধে একহাত রেখে ওকে শান্ত করার চেষ্টা করল। রুদ্র এতক্ষণ ওভাবেই তাকিয়ে দেখছিল উচ্ছ্বাসের দিকে। চোখের পলক অবধি ফেলেনি। এবার ধীরেসুস্থে হেলান দিল নিজের চেয়ারে। জ্বলন্ত সিগারেটটা সিলিংয়ের দিকে তাক করে বলল, 'আপাতত এখানকার সকল কাজ সেভাবেই চলবে, যেভাবে আমি বলব। যার ব্যপারটা পছন্দ হবেনা, তারজন্যে দরজাটা ডান দিকে।'

উচ্ছ্বাস হতবাক হয়ে তাকাল রুদ্রর দিকে। কিন্তু রুদ্র নির্বিকার। এইমাত্র বলা কথাটা নিয়ে ওর বিন্দুমাত্র রিগ্রেট নেই। রুদ্রর এমন নির্বিকারত্বে মেজাজ আরও বেশি খারাপ হল উচ্ছ্বাসের। জাফরের হাত সরিয়ে হনহনে পায়ে চলে গেল অন্যরুমে। জাফর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। অতঃপর বাকিদের উদ্দেশ্যে বলল, 'মিটিং আপাতত শেষ। কে কোনদিন ডেলিভারি দিতে যাবে, সেটা জানিয়ে দেওয়া হবে। এখন যে যার যার কাজে ফেরো।'

সকলে বেরিয়ে গেল। রঞ্জু আর জয়ও একে অপরের দিকে তাকিয়ে ফিরে গেল নিজ কাজে। বের হওয়ার আগে আরেকবার রুদ্র ভাবলেশহীন মুখটার দিকে তাকাল জাফর। ভ্রুদয় কুঁচকে এলো তার। কিন্তু কিছু না বলে কেবল এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে এলো সেখান থেকে।

—————

বিকেল সাড়ে চারটা। জানুয়ারির সময়, ঘন্টাখানেকের মধ্যেই অস্ত যাবে সূর্য। তাপামাত্রা কমে এসেছে অনেক নিচে। গুলশানের এই দিকটায় বহুতল ভবনের ফাঁকে একটা পরিত্যক্ত প্লট আর আধো ভেঙে রাখা পুরনো দেয়াল। তার পাশে স্তূপ করে রাখা পাইলিংয়ের রড আর সুরকির বস্তা। বাতাসে ধুলো আর সস্তা পোড়া মবিলের গন্ধ। এখানেই আছে সোলার সিস্টেমের সবচেয়ে বড় অস্ত্রের গোডাউন। ওপরে লোহা, আরও কিছু ইকুয়েপমেন্টস্ আর পার্টস্ থাকলেও, বেসমেন্টেই সাজিয়ে রাখা আছে প্রচুর পরিমাণের আ*গ্নে*য়াস্ত্র। আপাতত মাল কম, কিন্তু রাতে আবার জমা হবে গোডাউন ভর্তি করে।

অবশিষ্ট সেই মালগুলো ভিজিটেই এসেছে রুদ্র, উচ্ছ্বাস আর রঞ্জুসহ দলের আরও তিনজন। জয়কে গেছে অন্য এক ডিলারের কাছে। এখানে আসার সিদ্ধান্তটা একদম হুট করেই নিয়েছে রুদ্র। কেউ কিচ্ছু জানতোনা এ ব্যপারে। ঘন্টাখানেক আগের সেই বাকতর্কের পর, এখনো অবধি একে অপরের সঙ্গে কথা বলেনি রুদ্র আর উচ্ছ্বাস। গোটা রাস্তা দুজন একদম চুপচাপই এসেছে। অথচ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে চুপচাপ থাকার বিষয়টা খুবই সাংঘর্ষিক। গোটা রাস্তা জীপের পেছনে বসে শুধু এই দুজনের দিকেই পালা করে তাকিয়ে ছিলো বেচারা রঞ্জু। অথচ রুদ্র বা উচ্ছ্বাস তাকায় পর্যন্ত নি একে অপরের দিকে। এমন থমথমে নীরবতায় অভ্যস্ত নয় ওরা কেউ। 

বেসমেন্টে সব মাল দেখা শেষে যখন ওরা বের হওয়ার জন্যে উদ্ধত হল, তখনই হঠাৎ কান খাড়া হয়ে উঠল রুদ্রর। থেমে গেল ও। চোখ ডানে সরিয়ে দু সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল স্থিরভাবে। হঠাৎই উচ্ছ্বাস আর রঞ্জু বাদে দলের বাকি তিনজনের উদ্দেশ্যে নির্দেশ দিল, 'পেছনের গেইট দিয়ে বের হ। উইথ আর্মস্। নাও!'

নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গেসঙ্গে ওরা চলে গেল। নিজের পিস্তলটা বের করল রুদ্র। সেফটি ক্যাচ অফ করতে করতে উচ্ছ্বাস আর রঞ্জুকে উদ্দেশ্য করে বলল, 'প্রিপার্ড হয়ে সামনে দিয়ে চল, ফাস্ট!'

রঞ্জু সঙ্গে সঙ্গে নিজের পিস্তল বের করল। উচ্ছ্বাসও কোন তর্ক ছাড়াই পালন করল রুদ্রর নির্দেশ। কারণ পূর্ব অভিজ্ঞতা বলে, গুরুতর কিছু নিশ্চিত না হয়ে এমন নির্দেশ রুদ্র দেয়না। হলোও ঠিক তাই। বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে ডানে যেতেই ওরা দেখতে পেলো, পাশের বিশাল মাঠ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে একটা বাইক। দেখামাত্র একসেকেন্ডও দেরী করল না রুদ্র। চলমান বাইটাকে লক্ষ করে লীড শট করল। সাইলেন্সারের 'থপ' টাইপের আওয়াজ হল। লক্ষ্যভ্রষ্ট হলোনা। সোজা গিয়ে লাগল বাইকারের থাইতে। বাইক ব্যালেন্স হারিয়ে কাত হয়ে পড়ে স্ট্রেচ করে চলে গেল কয়েকহাত দূরে। রঞ্জুসহ বাকিরা দৌড়ে গিয়ে ঘিরে ধরল বাইকারকে চারপাশ দিয়ে।

একে দেখামাত্রই চিনে ফেলতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলোনা উপস্থিত কারো। রাসেল! গুলশানেই থাকে। তবে কাজ করে ব্লাক হোলের হয়ে। এর আগে দুবার পুলিশের হাতে পড়েছিল। ছাড়া পেয়ে গেছে। থাইয়ের গভীরে বিঁধে থাকা বুলেটের যন্ত্রণায় কাতরে উঠল রাসেল। কিন্তু সময় গুরতর। এখন নিজেকে না বাঁচাতে পারলে মৃত্যু নিশ্চিত। তাই যন্ত্রণায় কাতরেও দ্রুতহাতে নিজের পি*স্ত*ল বের করল। কিন্তু কিছু করার আগেই উচ্ছ্বাসের পি*স্ত*ল থেকে ছুটে গেল আরেকটা বু*লে*ট। যা সোজা ওর কবজিতে গিয়ে লাগল। হাত ফসকে বেরিয়ে গেল পি*স্ত*লটা। আরও একবার চারপাশ কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল রাসেল। ঘাড় ফিরিয়ে রুদ্রর দিকে তাকাল উচ্ছ্বাস। প্রতিক্রিয়াহীন দাঁড়িয়ে আছে কেবল। যন্ত্রণায় মোচড়াতে মোচড়াতে লক্ষ্য করল ওকে ঘিরে ফেলেছে রুদ্রর লোকজন। বাঁচার আর কোন উপায় নেই।

রাসেলকে তুলে নিয়ে এসে আছড়ে ফেলা হয়েছে বেসমেন্টে। হাত আর পা দিয়ে এখনো গলগল করে র*ক্ত বের হচ্ছে। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, আর প্রাণভিক্ষা দেওয়ার জন্যে আকুতিমিনতি করছে। 
বাকি সবাই ঘিরে দাঁড়ালেও, রুদ্রর জন্যে জায়গা ছেড়ে দেওয়া হল। রুদ্র এতক্ষণ ঘাড় সামান্য কাত করে নির্বিকারভাবে তাকিয়ে ছিল রাসেলের দিকে। হাতে একটা প্লাস ছিল, সেটা ঘোরাচ্ছিল নির্দিষ্ট ছন্দে। এবার ধীরেসুস্থে এগিয়ে গেলো রাসেলের দিকে। এক হাঁটু গুটিয়ে বসল ঠিক সামনে। রুদ্রকে এত কাছে দেখে আতঙ্কে চোখ বড়বড় হয়ে গেল রাসেলের। ছটফট করতে করতে বলল, ' আমি কিছু করিনাই ভাই! বিশ্বাস করেন! আমি সত্যিই কিছু করিনাই। এমনেই আসছিলাম এদিকে বাইক নিয়া ঘুরতে। আমি জানতাম না এইটা আপনেগো জায়গা। ভুল হইয়া গেছে।'

যন্ত্রণায় কাতরানো অবস্থায় বেশ অদ্ভুত শোনালো রাসেলের বাক্যগুলো। রুদ্র হাতের প্লাসটা নাড়াতে নাড়াতে খুবই ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করল, 'এটাকেতো কোন টুরিস্ট স্পট বলে মনে হচ্ছেনা। কেন এসেছিলি এখানে? আর গু*লিই চালাচ্ছিলি কেন?'

' আপনেগো দেইখা ডরাইয়া গেছিলাম। আমি জানতাম না। কসম! কসম!'

রুদ্র শীতল হাসল। রাসেলের রক্তাক্ত হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলল, ' কসম! কার কসম?'

' মায়ের! আমার মায়ের কসম।'

' বেঁচে আছে, মা?'

জবাব এলোনা কোন। আচমকাই রাসেলের একটা আঙ্গুল প্লাসের মাঝে পুরে সজোরে চাপ দিল রুদ্র। হাড় ভাঙার মড়মড় শব্দ এলো। বিকট আর্তনাদ করে উঠল রাসেল। রুদ্র বলল, ' শশশ্। চিৎকার পছন্দ না আমার। ঠিকঠাক উত্তর পছন্দ।'

পাশ থেকে উচ্ছ্বাস বলল, 'তুইযে ব্লাক হোলের হয়ে কাজ করিস তা আমরা জানি। কেন এসেছিস চুপচাপ সেটা বল।'

আরও একবার আঙ্গুল ভাঙার শব্দ হল। বাবাগো, মাগো বলে চিৎকার করে উঠল রাসেল। হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। টপটপ করে রক্ত পড়ছে। আঙুল থেকে, তারওপর গু*লিবিদ্ধ হাত আর পা। যন্ত্রণায় চারপাশে অন্ধকার দেখে বলেই ফেলল, 'আপনেগোহ্ আপনেগো এইখানের গোডাউনের ইনফরমেশন ডিটেইলসে জানাইতে কইছে আমারে। সব খুটিনাটি জানতে কইছে। আর কিছু না। বিশ্বাস করেন আর কিছু না। ছাইড়া দেন আমারে, বাসায়... বাসায় বউ-বাচ্চা আছে। ছাইড়া দেন ভাই। মাফ কইরা দেন।'

মৃদু হেসে পাশে একটা বস্তার ওপর বসল উচ্ছ্বাস। মৃদু ঝুঁকে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, ' ইশশ। রাসেল বাবু সেন্টিমেন্টাল হয়ে যাচ্ছে।'

আবারও আওয়াজ হল হাড় ভাঙার, সঙ্গে সেই বিকট চিৎকার। ঠোঁট গোল করে সহানুভূতির ভঙ্গি করল উচ্ছ্বাস। রুদ্র চাপা ক্রোধে প্লাস দিয়ে চেপে চেপে কয়েক জায়গার মাংস ছিড়ে ফেলল। কিন্তু ঐটুকু ছাড়া আর কিছুই বের হলোনা রাসেলের পেট থেকে। রুদ্র এবার শেষমেশ জিজ্ঞেস করল, 'কে কে আছে পেছনে?'

অতিরিক্ত র*ক্তপাতে ঝিমিয়ে গেছে রাসেলের মাথা। শরীর বিভিন্ন জায়গা থেকে গলগল করে বের হচ্ছে তাজা রক্ত। যন্ত্রণায় কথা বলার মতো অবস্থাও নেই। তবুও চেষ্টা করছে কথা বলার। রুদ্র উঠে দাঁড়াল। একটা সিগারেট জ্বালিয়ে এদিক ওদিক হাঁটতে শুরু করল। সিগারেট শেষ করে আবার ধরবে একে। কিন্তু হঠাৎই সাইলেন্সড শ্যুটের 'থপ' শব্দ, সঙ্গে ফ্লোরে পাথর পড়ার শব্দে থমকে গেল ও। বিস্ময় নিয়ে পেছনে ঘুরে দেখল, চোখ খোলা অবস্থায় ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ে আছে রাসেল। চোখ তুলে দেখল হাতে পি*স্ত*ল নিয়ে শান্ত ভাবেই বসে আছে উচ্ছ্বাস। রুদ্র জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই পাশ থেকে রঞ্জু বলল, 'ভালো হাতে ঐ পাথর উঠাইয়া আপনের মাথায় মারতে নিছিল ভাই। উচ্ছ্বাস ভাই গু*লি না করলে এতক্ষণে আপনের মাথা ছেইচ্চা যাইতো।'

রুদ্র আবার তাকাল উচ্ছ্বাসের দিকে। দৃষ্টি মৃদু নরম হয়ে এলো ওর। উচ্ছ্বাস উঠে দাঁড়াল নির্বিকারভাবে। যেন কিছুই হয়নি। রুদ্র রঞ্জুর দিকে তাকিয়ে বলল, 'জায়গাটা পরিষ্কার করার ব্যবস্থা কর। আর লাশটা ফেলে দিয়ে আয় লেকের পাড়ে।'

'লেকের পাড়ে!' ভ্রুকুটি করল উচ্ছ্বাস। 'গুম করবি না?'

' এটা গুম করার কোন প্রয়োজন নেই। এছাড়াও কোন লাইসেন্সড পি*স্ত*ল ব্যবহার করিনি আমরা। অযথা সময় নষ্ট করে লাভ নেই।'

—————

গতরাতে রাণীকে একঘন্টার জন্যে আটকে রেখে আইটি সেক্টরে যে কারসাজি রুদ্র করেছে, তার রিকভারি করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে গোটা টিমকে। অন্যদিকে কাল ভোরবেলা চট্টগ্রাম বন্দরে মাল ডেলিভারির প্রেশার। সব মিলিয়ে অস্থির হয়ে আছে ডার্ক নাইট আর ব্লাক হোল দুটো দলই। কালকের ডিলটা ওদের কাছে ডু ওর ডাইয়ের মতো। কাল যদি রুদ্র কোন গন্ডগোল করতে সক্ষম হয়। তাহলে ওদের একেকটার কপালে ভয়ংকর থেকে ভয়ংকরতম মৃত্যু লেখা আছে। অদ্ভুত চাপা আতঙ্ক আর চাপের মধ্যেই কেটেছে ওদের গোটা দিন। তাই সন্ধ্যার পরপরই একটা ফাইনাল মিটিংয়ে বসেছে ওরা সবাই। মিটিংয়ে কথা পাড়ল করিমই, 'রাসেলকে ধরে ফেলেছে। শেষ করে দিয়েছে ওখানেই।'

সামান্য মাথা নাড়াল শওকত মির্জা। অর্থাৎ হ্যাঁ, সে শুনেছে। মুখে বলল, 'নাম বলতে পেরেছে ওর?'

' নাহ্। তার আগেই টপকে গেছে।' 

পলাশ বলল, 'কিন্তু তোমরা কীকরে জানলে তা। ফোন করেছিল?'

করিম বিরক্তিসূচক শব্দ করে বলল, 'ও কীভাবে ফোন করবে? ও জানেনা ওর কাছে রুদ্রর মাইক্রোফোন আছে? ঝট করে ধরে ফেলবে ও।' এরপর হঠাৎ তেঁতে উঠে বলল, 'একটা কাজ দেওয়া হয়েছিল আপনার মেয়েকে। সেটাও ঠিকমতো করতে পারলনা। রুদ্রকে আটকাচ্ছিল না ওর সঙ্গে প্রেম করছিল কে জানে!'

শান তেঁতে উঠে কিছু বলতে নিচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই শওকত বলে উঠল, 'করিম! ও ওর সাধ্যমতো যা পেরেছে করেছে। রুদ্র আমেরকে খাটো করে দেখছো কেন হঠাৎ? আমরাই বা কী ছিড়েছি এতোদিন?'

করিমও আজ দমে গেলোনা। প্রতিবাদ করে বলল, 'মানলাম সাধ্য মতো করেছে আপনার মেয়ে। কিন্তু এখনো ঐখানে আছে কোন স্বার্থে। আমের ভিলার কোন সাধ্য দেখাতে ফিরে গেছে সে। এদিকে রুদ্র এতোকিছুর পরেও ওর কোন ক্ষতি করছেনা। কেন? আমরাকী সত্যিই ঘাসে মুখ দিয়ে চলছি বলে মনে হয়?'

চুপ করে গেল সবাই। এর উত্তর সত্যিই নেই কারো কাছে। সবাই আশা করেছিল এখন সম্রাটের হুংকারসহ কোন আওয়াজ শোনা যাবে। কিন্তু আজ তাও শোনা গেলোনা। গম্ভীর মুখে থম মেরে বসে আছে ও। চোখদুটো লালচে হয়ে আছে। সেখানে চাপা ক্রোধের আভাস। কিন্তু একটা শব্দও উচ্চারণ করছেনা। 
হঠাৎই নারী কন্ঠে ভেসে এলো, ' ঘাসে মুখ দিয়ে চলেন না। কিন্তু গোবরে দেন কি-না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে আমার।'

সকলে চমকে উঠল। করিম থতমত খেয়ে তাকাল চারপাশে। শান হাত উঁচিয়ে নিজেকের ফোনটা দেখিয়ে বলল, 'আমিই কল করেছিলাম। মিটিংয়ে ওর প্রেজেন্সটা জরুরি।'

' ফিরে এলেনা কেন?' এতক্ষণে ঠান্ডা স্বরে প্রশ্নটা করল সম্রাট।

' দরকার ছিল।' প্রিয়তার একরোখা জবাব।

' কী দরকার?'

' সেটা জানা এখন গুরুত্বপূর্ণ না। গুরুত্বপূর্ণ হল, কালকের ডেলিভারিটা। এটা নিয়ে কোন সন্দেহই রেখোনা, কাল রুদ্র যাবে সেখানে। আর ওর মুখোমুখি তোমাদের হতেই হবে।'

পলাশ চিন্তিত স্বরে বলল, ' ওকে আটকানোর আর কোন পথ নেই?'

শান বলল, ' উপায়তো সব ফ্লপ হল। এখন শুধু একটা উপায়ই বাকি আছে। কাল ভোরে ওর মুখোমুখি হয়ে সর্বোশক্তি দিয়ে ওকে প্রতিহত করা। যাতে কোনভাবেই একটা মালও ওর হাতে না যায়।'

ফোনের ওপাশ থেকে প্রিয়তা বলে উঠল, 'আর তোমার মনে হয় তোমরা সেটা পারবে? অতীতের অভিজ্ঞতা তোমাদের কী বলে? রুদ্র আমেরকে আটানোর সাধ্য আছে তোমাদের?'

হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল সম্রাটের। করিম বলল, 'স্বামীর প্রশংসা শেষ হলে, তোমার কাছে এরচেয়ে ভালো কোন উপায় থাকলে বলে দাও মা।'

শওকত গম্ভীর স্বরে বলল, 'কিছু ভেবেছো তুমি?'

' হুমম। সারা বিকেল এই ব্যপারেই ভেবেছি আমি। এন্ড আল্টিমেটলি একটা উপায়ই মাথায় এসেছে আমার।'

'সেটা কী?' এতক্ষণে আগ্রহ দেখা গেল সম্রাটের মধ্যে। রাণী রুদ্রর বিপক্ষে কিছু ভেবেছে! রাণী! এইটুকুই ওর জন্যে অনেক। 

প্রিয়তা কয়েকসেকেন্ড চুপ থেকে বলল, 'কাল ভোরে ডেলিভারির টাইমে এমন কিছু করতে হবে যাতে রুদ্র চট্টগ্রাম থেকে গুলশান ফিরে আসতে বাধ্য হয়।'

শান বলল, ' সেই কক্সবাজার ট্রিপের মতো কিছু করতে চাইছিস? ওদের বাড়ির কাউকে_'

'না!' সঙ্গে সঙ্গে নাকোচ করল প্রিয়তা। 'এইসব কিছু না। ওর বাড়ির কারো গায়ে এবার কোন হাত দেওয়া হবেনা। দ্যাটস্ ফাইনাল।'

করিম টিটকারী মেরে বলল, 'কেন? শ্বশুরবাড়ির লোকের জন্যে মায়া হচ্ছে আবার।'

' আবা*লের মতো কথা বলবেন না।' থমকে উঠল প্রিয়তা। 'একই চাল বারবার মাথামোটারা দেয়। সেটা আপনি, আমি নই।'

' তাহলে তুমি কী ভাবছো?' প্রায় একসঙ্গে প্রশ্ন করল শওকত আর সম্রাট।

প্রিয়তা বলল, 'দুটো টিম রেডি করো তোমরা তোমাদের মধ্যে। যারমধ্যে একদল চট্টগ্রাম পোর্টে থাকবে আর আরেকদল আজ রাতেই চলে আসবে গুলশান।'

'গুলশান? কেন?'

' আপাতত যেটা বলছি সেটা করো। বাকি প্লানটা আমি টেক্সটে সুন্দরভাবে জানিয়ে দিচ্ছি।'

কল কেটে দীর্ঘশ্বাস ফেলল প্রিয়তা। জানালার পাশেই বসে আছে ও। কিন্তু স্বস্তি পাচ্ছেনা। অস্থির হয়ে তাকাল থমথমে আকাশটার দিকে। সারাদিনের মতো এখনো আকাশটা কেমন থমকে আছে। যতবার তাকাচ্ছে ততবার কেমন শিরশির করে উঠছে গোটা শরীর। যেন চরম অশুভ কিছুর বার্তা দিতে চাইছে আজকের এই আকাশ।

—————

আমের ভিলার ছাদের রেলিংয়ে পা ঝুলিয়ে বসে আছে রুদ্র। হিমেল বাতাসে এদিক ওদিক দুলছে মাথার অগোছালো চুল। পাতলা একটা ফুল হাতা গেঞ্জি গায়ে। কিন্তু শীত লাগছেনা ওর তেমন। দৃষ্টি আকাশের দিকে। যেন নক্ষত্র খুঁজে চলেছে, কিন্তু পাচ্ছেনা। পাওয়ার কথাও না এমন থমকানো আকাশে। পরপর দুটো সিগারেট শেষ ফেলেছে এরমধ্যে। তিন নম্বরটা জ্বালানোর পরিকল্পনাই করছিল, হঠাৎই টের পের কেউ এসে বসেছে ওর পাশে। রুদ্র ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, উচ্ছ্বাস। হাতে ভাতের থালা আর পানির গ্লাস। দু সেকেন্ড নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল রুদ্র। অতঃপর আবার মুখ ঘুরিয়ে তাকাল আকাশের দিকে। গম্ভীর আওয়াজে বলল, 'কী চাই?'

' নিজেকে কী আলাদিনের জিনি মনে করিস নাকি? যা চাইব তা দিয়ে দিবি? "কী চাই?" ' শেষ শব্দদুটু ভেঙচি কাটার মতো করে বলল উচ্ছ্বাস। তারপর আবার বলল, 'আচ্ছা দিবিই যখন, দে দেখি হাজার কোটি টাকা, দুবাইতে বিশাল এক বাংলো, বিশাল কটা গাড়ি আর সুন্দরী সুন্দরী রমনী।'

কিছুক্ষণ থমকে রইল সবকিছু। রুদ্রর কোন প্রতিক্রিয়া না পেয়ে প্লেট আর গ্লাসটা সাইডে রাখল উচ্ছ্বাস। আড়চোখে তাকিয়ে বলল, 'ভাবিস না স্যরি-ট্যরি বলতে এসেছি। ওসব আমি বলিনা।'

রুদ্রও থমথমে গলায় বলল, 'তোর স্যরি তোর পকেটে রাখ। তোর স্যরিকে আমি _'

মুখ কুঁচকে ফেলল উচ্ছ্বাস। মাথা নেড়ে বলল, ' ছিঃ ছিঃ। এতো খারাপ দিন চলে এসছে তোর? বউ দেয়না বলে এখন শেষে স্যরির সাথে_! ওয়াক থু!'

রুদ্র কটমটে চোখে তাকাল উচ্ছ্বাসের দিকে, 'ধাক্কা দিয়ে সোজা নিচে ফেলে দেব, জানোয়ার!'

' তাতে তোর কী লাভ হবে? তিনদিনে বিরিয়ানি পাবি, এই যা।'

' শাট আপ।'

উচ্ছ্বাস দাঁত কেলিয়ে বলল, ' এইটা অটো ক্যাসেট গুরু। সেইযে জন্মের পর খুলছেতো খুলেছেই। শাট আর আপ হবেনা এ জীবনে। মরার আগ অবধি ক্যাসেট চলতেই থাকবে। প্যাও প্যাও প্যাও।'

না পেরে হেসে ফেলল রুদ্র। হাত উঁচিয়ে চাপড় মারল উচ্ছ্বাসের মাথায়, 'ইডিয়েট।'

উচ্ছ্বাস চমৎকার করে হাসল। পাশ থেকে খাবারের প্লেটটা হাতে নিয়ে বলল, ' গুরুদেব, এবার একটু খেলে কলিজা ঠান্ডা হতো। আপনার না খাওয়ার সমাচারে বাড়ি খুবই উত্তপ্ত। আমার আবার গরম হজম হয়না। তাও এই শীতের মধ্যে।'

' ইচ্ছা নেই।' না তাকিয়েই বলল রুদ্র।

উচ্ছ্বাস বলল, ' এতো ভাও খাওয়ার কিছু নাই বস! নেহাতই দুবেলাই ঠিকমতো খাওনাই তাই আসছি। নয়তো পাত্তাও পাইতা না।'

বলতে বলতে এক লোকমা মেখে তুলে দিন রুদ্রর মুখের দিকে। রুদ্র মুখ কুঁচকে প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল, 'এতগুলো কার জন্যে গাধা? জীবনের শেষ খাওয়া খাওয়াবি নাকি?'

উচ্ছ্বাস রুদ্রর মুখে ভাতের লোকমা তুলে দিতে দিতে বলল, 'ইউ নেভার নো ব্রো।'

এরপর আর কোন কথা হলোনা তেমন। চুপচাপ খাওয়াতে শুরু করল উচ্ছ্বাস রুদ্রকে। রুদ্রর মনে পড়ল ছোটবেলার সেই কথা। যেদিন প্রথম উচ্ছ্বাস খাইয়ে দিয়েছিল ওকে। সেদিন থেকেইতো শুরু হয়েছিল ওদের ঘনিষ্ঠতার প্রথম ধাপ। 
এভাবেই বেশ কয়েক লোকমা খাইয়ে দিল উচ্ছ্বাস। এরপর আর খেলোনা রুদ্র। ইচ্ছা নেই। উচ্ছ্বাসও ওখানেই হাত ধুয়ে ফেলল।

এরপর দুজনেই দুটো সিগারেট জ্বালাল। চারপাশটা নীরব, স্থির। বেশ কিছুক্ষণ কোন কথা হলোনা। সিগারেটে টান দিয়ে রুদ্র বলল, 'নাজিফার জন্যে নার্স এনেছি একজন। ইমাজেন্সি কিছু হল ট্যাকেল করার জন্যে। সন্ধ্যায় এসেছে বোধহয়।'

উচ্ছ্বাস মাথা দুলিয়ে বলল, 'হুমম দেখেছি। ভালোই হয়েছে। হসপিটালে ভর্তি থাকাটা যেহুতু এখন রিস্কি। সে হিসেবে এটা ভালো আইডিয়া। আমার মাথায় কেন এলোনা এটা, বুঝলাম না।'

' আমার মাথায়ও আসেনি। প্রিয়তা বলেছে।'

থমকে গেল উচ্ছ্বাস। ঘাড় ফিরিয়ে বলল, 'নার্স বউমণি ঠিক করেছে?'

' আমি পাগল?' রুদ্রর কন্ঠে স্পষ্ট ব্যঙ্গ।

আবারও বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকল দুজন। থমকে রইল সবকিছু। নিকোটিনের বিষাক্ত ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতে আকাশের ভয়ংকর স্তব্ধতা গায়ে মাখল যেন। হঠাৎ সেই স্তব্ধতা ভেঙে এক অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্ন করে বসল উচ্ছ্বাস। বলে উঠল, ' ভালোবাসিস আমায়?'

রুদ্র থমকাল এমন প্রশ্নে। কিন্তু তা সেকেন্ডের জন্যে। পরমুহূর্তেই হেসে ফেলল। থমথমে সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, 'ভালোবাসব? তাও তোকে? আগে কী বলেছিলাম মনে নেই? তোকে ভালোবাসা যায়না। নাজিফা বোকা একটা মেয়ে। তাই তোর মতো গাধাকে ভালোবাসে। আমি বোকা নই।'
একটু থামল রুদ্র। তারপর বলল, 'তবে হ্যাঁ, অভ্যেস বলতে পারিস। বদঅভ্যেস। তুই আমার ভয়ংকর এক বদঅভ্যেস। এইযে, এই সিগারেটের মতো। ক্ষতিকর, কিন্তু ছেড়ে থাকার ইচ্ছা বা উপায় কোনটাই নেই।'

মুচকি হাসল উচ্ছ্বাস। ও সাধারণত মুচকি হাসেনা। কখন হাসে, সঠিক জানা নেই। তবে খুব কম এভাবে হাসে। রুদ্রর দৃষ্টি অনুসরণ করে ও নিজেও তাকাল খোলা আকাশের দিকে। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর বেসুরা গলায় গেয়ে উঠল অনুপমের সেই চমৎকার গানের চারটা লাইন,

         শোন, অভ্যেস বলে কিছু হয়না এ পৃথিবীতে,
         পাল্টে ফেলাই বেঁচে থাকা।
         আর একশ বছর আমি বাঁচবই,
        জেনে রাখ, হোক না এ পথঘাট ফাঁকা।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp