নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া - পর্ব ১১ - লাবিবা ওয়াহিদ - ধারাবাহিক গল্প

নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া
          সাহিদের জন্মদিন উপলক্ষ্যে কয়েকদিন আগেই সাহিদ এবং ইসমাতকে শাহ মঞ্জিলে আসতে হলো। ইসমাত সহজে এই বাড়িতে আসতে চায় না। কারণ এখানে আসলে তাদের একই রুমে থাকতে হয়। যদিও ইসমাত সাহিদের বিছানার থেকে দূরেই থাকে। হয় সারা রাত কাজ করে কাটাবে আর নয়তো রুমের একপাশে আরামদায়ক বিছানা করে শুবে। সে এক মেইডকে ঘুষ দিয়ে আগেই এক্সট্রা তোষক, বালিশসহ বেশকিছু কম্বল আনিয়ে রেখেছে। এই গোপন কথা এখনো শ্বশুর-শাশুড়ি জানে না। এগুলো এখনো সাহিদের রুমে খুবই গোপন করে রাখা। 

সাহিদেরও পছন্দ হয় না সে ইসমাতের সাথে এক বিছানা শেয়ার করবে। আজও হলো না। সে বাড়িতে ফিরেই সবার আগে নিজের গেমিং পিসিতে বসেছে। এই বাড়িতেও তার বিরাট গেমিং সেটআপ আছে। এই ঘরটা একটা ফ্ল্যাটেরই সমান। একখানেই সব আছে। এই বাড়িতে আলাদা করে জিমঘরও আছে। এখানে থাকলে সাহিদের আর ওয়ার্কআউট করতে বাইরে ছুটতে হয় না। ওই ফ্ল্যাট থেকে অবশ্য তার জিম প্লেস কাছেই, পান্থপথ। ওখানে বেশ সেলিব্রিটিরা মোটা অংকের টাকা ঝরায় প্রতি মাসে। ট্রেইনাররাও বেশ ভালো। এমনি এমনি তো আর সেলেব্রিটিরা আসে না। 

ইসমাত কানে ব্লুটুথ লাগিয়ে অফিসিয়াল আলাপ করছে আর একই সাথে লাগেজ থেকে নিজের জামা-কাপড় বের করছে। সাহিদের এ বাড়ি ও বাড়ি সবখানেই পোশাক আছে। তাই তার আর আলাদা করে লাগেজ নিয়ে খাটুনির দরকার হয় না। কিন্তু ইসমাতের ধ্যান-জ্ঞান সব সেই ফ্ল্যাটেই। ইসমাতের গলার স্বর বরাবরই তীক্ষ্ণ তবে এত জোরালো না। খুবই চাপা তার গলার সুর, তাই তার গলা সাহিদের গেমিং পিসি অবধি পৌঁছাল না।

 সাহিদেরও আগ্রহ নেই এসব অফিস, কাজ-বাজের আলাপ নিয়ে। সে এমনিতেই প্রচণ্ড বিরক্ত তার জন্মদিনের এত আয়োজন শুনে। সে এসবে সোজা বারণ করেছিল। কিন্তু তার বাবা শুনলে তো! এত বড়ো সুযোগ তিনি কিছুতেই হাতছাড়া করবেন না। সাহিদ যেমন বাবার বিপক্ষে গিয়ে যা-তা করতে ভালোবাসে, মাহফুজ সাহেবও তাই। তিনি কোনো কিছু করতে ছেলের পারমিশন নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেন না। বাবা হন তিনি, ছেলের ভালো-মন্দ বুঝেন। বাইরের জগতে পাক্কা বিজনেসম্যান কিংবা শিল্পপতি হলেও ঘরে তিনি কম যান না। 

 ইসমাতের অফিসিয়াল কাজের ইতি টানতে হলো মেইডের ডাকে। শাশুড়ি ডাকছেন, যাওয়া বাধ্যতামূলক। ইসমাত লাগেজ ফেলে মেইডের পিছু নিল। নিচে গিয়ে দেখল বিরাট আয়োজন। একজন সেলার এসেছে। তার সামনে বিভিন্ন মেয়েলি পোশাক। সেলারের পাশেই বসা এক প্রফেশনাল ড্রেস ডিজাইনার। শাহেলা বউমাকে দেখে মুচকি হাসলেন। কাছে ডেকে পাশে বসতে ইশারা করলেন। ইসমাত বাধ্য মেয়ের মতো বসতেই ডিজাইনার তার আইপ্যাড এগিয়ে দিল। পার্টির ড্রেসকোড গাউন বা জর্জেট শাড়ি। যেহেতু ইসমাত শাড়িতে অভ্যস্ত না, সেহেতু সে গাউনই দেখতে শুরু করল। অন্য সেলার তখনো তার সামনে সাজানো শাড়ি দেখাচ্ছে। বাকিরা সবাই শাড়ির প্রতিই আগ্রহী। শাহেলাও নিজের জন্য শাড়ি বাছছেন। তিনি আবার জর্জেট শাড়ি পছন্দ করেন না। তার পরিহিত সাধারণের মধ্যে অসাধারণ শাড়িই সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয়ে থাকে। ভদ্রমহিলার রুচির প্রশংসা যেকেউ করতে বাধ্য। 

 তর্ষা সবেই মেডিক্যাল থেকে এসেছে। এসেই দেখল এলাহি কাণ্ড। সঙ্গে তার চক্ষুশূল ইসমাতকেও দেখল। সে দ্রুত ছুটে আছে। পেছন থেকে দেখতে পায় ইসমাত একটা গাউন পছন্দ করেছে, সাদার মধ্যে। কিন্তু তর্ষা হুট করে পেছন থেকে এসে ছোঁ মে রে আইপ্যাডটা কেড়ে নিয়ে ডিজাইনারের হাতে দিয়ে ব্যস্ত গলায় বলল,
--"আমার এটা পছন্দ হয়েছে। আমি এটাই নিব!"

তর্ষার বড়ো ভাবী তর্ষার এই বেয়াদবী লক্ষ্য করল। সে মুখ ফসকে বলে বসল,
--"এটা তো ইসমাত পছন্দ করল দেখলাম।"

তর্ষা প্রচন্ড জেদি এবং একরোখা। মায়ের ধমকেও কাজ হলো না। তার এই গাউন চাই মানে চাই! শাহেলা বরাবরের মতোই নীরব রইলেন, বিরক্ত হলেও প্রকাশ করলেন না। ইসমাতও অনুভূতিহীন বলল,
--"থাক, ও নিক এটা। আমার এমনিতেও পছন্দ হচ্ছে না।"

তর্ষা আড়ালে পৈশাচিক আনন্দ পেল। জয়ের হাসি হেসে সে উপরে চলে গেল ফ্রেশ হতে। শাহেলার ডাকে তখনই সাহিদ নেমে এলো। তার চোখে-মুখে বিরক্তি। গেমের মাঝখান থেকে উঠে আসতে হয়েছে যে! মায়ের নির্দেশ, না আসলে কান ধরে টেনে আনবেন। এমনিতেই জন্মদিন নিয়ে যা তামাশা লাগিয়ে রেখেছে। প্রতি জন্মদিনেই এমন হয়, শুধু সাহিদের মেজাজের কারণে গতবার তাকে কিছু বলার সাহস পায়নি৷ সাহিদের এখনো মনে আছে, তাকে সুন্নতে খাতনার জন্যও বাবা এলাহি কাণ্ড জুড়ে দিয়েছিলেন! ওসব কি আয়োজন করার মতো? তার বুঝি মান-সম্মান নেই? সাহিদ তো কত ফন্দি করে ওই অবস্থা নিয়েই বিদেশে পালিয়েছিল রমযান সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে। রমযান সাহেবকে এত সহজে ভুলানো যায়নি, কত কান্নাকাটি, এটা সেটা বলে নিতে হয়েছে। প্রোগ্রামের দিন দেখা যায় সাহিদই ছিল না। মাহফুজ সাহেব যা বকাবকি করেছিলেন। সাহিদ তো কলে বলেছিল,
--"এত শখ থাকলে তুমিই লুঙ্গি পরে বসে যাও।"

মাহফুজ সেদিন প্রথমবারের মতো, "হারামজাদা" গা লিটা উচ্চারণ করেছিলেন। এরপর থেকে এই গা লা গা লি আর থামেনি। ছেলে করেই সবসময় গা লি খাওয়ার মতো কর্মকাণ্ড।

 নিচে এসে সাহিদ মেয়েলি পোশাক দেখে আরও বিরক্ত হলো। সে গিয়ে বসল ইসমাতের পাশে, পায়ের উপর পা তুলে। সে জানে অন্য সোফায় বসলে তার মা ইসমাতকে পাঠাবে তার পাশে বসতে, খুবই বিরক্তিকর কাণ্ড-কারখানা, এজন্য আজ নিজেই বসেছে। উঁকি দিয়ে দেখল ইসমাত আইপ্যাডে ড্রেস দেখছে। সেও কয়েকটা দেখে নিল। দেখতে দেখতেই মায়ের উদ্দেশে বলল,
--"আমাকে ডেকেছ কেন? আমার এখানে কাজ কি? ডোন্ট টেলমি আমাকে শাড়ি পরে বার্থডে পার্টিতে যেতে হবে।"

শাহেলা পিঠে চাপড় দিলেন ছেলের। এই ছেলের এত পটরপটর তার সহ্য হয় না। গা জ্বালিয়ে দেয় একদম? তারা কী গরু যে সাহিদকে শাড়ি/লেহেঙ্গা পরাবেন? শাহেলা কিড়মিড় করে বললেন,
--"ইসমাতের জন্য এপয়েন্টমেন্ট দিয়েছি সেলুনের। তুই ওকে দিয়ে আসবি।"

আরেক দফা বিরক্ত হলো সাহিদ। আবারও ড্রাইভারের কাজ! তাকে কি বিনা বেতনের ড্রাইভার পেয়েছে? ইসমাতের হাত নেই? সে ড্রাইভিং করতে পারে না? বাড়িতে কি গাড়ির অভাব? ইসমাতের তো ড্রাইভিং লাইসেন্সও আছে। সাহিদ বিরক্ত হয়ে কিছু বলতে নিলে ইসমাত তাকে আড়ালে চিমটি কাটল। তাকে থামিয়ে শাশুড়ির উদ্দেশে বলল,
--"ড্রাইভাররা আছে আম্মা। একাই তো যেতে পারি।"

শাহেলা এতে গরম হয়ে গেলেন। ব্যস্ত গলায় বললেন,
--"হাসবেন্ড থাকতে ড্রাইভার লাগবে কেন? লাগলে এই ছেলেকে পি টিয়ে তোমার সাথে পাঠাব। ওর বাবা বিয়ের পরের ত্রিশ বছর নিজে ড্রাইভ করে আমাকে এখানে সেখানে নিয়ে গেছে। ও কোন লাটসাহেব যে বউকে পিক এন্ড ড্রপ করতে পারবে না? নিব ওর বাইকের চাবি?"

সাহিদ দমে গেল। মুখে আঁধার নামিয়ে থম মেরে বসে রইলো। কপালে রাগের ভাঁজ! ইসমাত ঠোঁট চেপে হাসল। একদম ঠিকঠাক জব্দ হয়েছে। তবে বলা যায় না রাস্তায় আবার কোন চোটপাট করে। এই ছেলের যা রাগ! শাশুড়ি আচমকা ইসমাতের চিবুক ছুঁয়ে বলল,
--"আমার ছেলের জন্মদিনে আমার বউমাকে সবচেয়ে সুন্দর দেখানো চাই। খেটে খেটে নিজের কি হাল করেছ! এই কয়দিন নিজের প্রোপার যত্ন নিবে বুঝলে?"

ইসমাত শুধু জোরপূর্বক হাসল। সাহিদ ইসমাতের কোলে থাকা আইপ্যাড দেখল, একটা গাউন সিলেক্ট করা। সাহিদের ঠোঁটে আচমকাই হাসি খেলে গেল। ইসমাত ডিজাইনারকে ড্রেস দেখিয়ে দিয়ে চলে গেল বাইরে। সাহিদ থেকে গেল। মায়ের থেকে আরও কিছুটা বকুনি খেয়ে ইসমাতের পছন্দ করা ড্রেসটা আইপ্যাডে আবারও দেখে নিল। এরপর চলে যেতে নিতেই তর্ষা দ্রুত ছুটে এসে দাঁড়াল সাহিদের মুখোমুখি। বেশ খুশি হয়ে বলল,
--"কোথায় যাচ্ছ? আমিও যাব!"

শাহেলা বললেন,
--"বউমার সেলুনে এপয়েনমেন্ট আছে, সেখানেই যাচ্ছে।"

তর্ষার মুখটা এবার দেখার মতো হলো। সাহিদ তখনো দুই হাত পকেটে গুজে অন্যদিকে ফিরে আছে। এমনিতেই মন-মেজাজ খারাপ তার উপর আবার তর্ষার আবলামো! আবার সে কিছু বললেই খারাপ হয়ে যায়। সাহিদের কথা-বার্তাই এমন, মানুষ নিতে না পারলে তার কি দোষ?

তর্ষা ফ্যাকাশে মুখ নিয়ে বলল,
--"আমিও যাব।"

তর্ষার মা ঝর্ণা বললেন,
--"তোরটা আগামীকাল। আজ বউমা যাক।"

তর্ষা আবার চেঁচামেচি লাগিয়ে দিল, সে তাও যাবেই যাবে। আজই যাবে। কিন্তু কে শোনে তার কথা। কেউই তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিল না, শুধু মা তাকে ধমকালেন। সাহিদ বিরক্ত হয়ে তর্ষার হয়ে বলল,
--"গেলে যা, হাত-পা নেই?"

--"তোমার সাথে যাব।"

--"আমি কারো ড্রাইভার না।"

বলেই সাহিদ পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। সে ইসমাতকে পৌঁছে দিয়ে আবারও বাসায় ফিরে এলো। পথেই তার এক অনলাইন বন্ধুর মেসেজ এসেছে, তার সাথে পার্টনারশিপে খেলতে সাহিদ খুবই উপভোগ করে। তাই ফেরার পথেই ইসমাতকে টেক্সট দিয়ে দিয়েছে,
--"নিজের পা চালিয়ে বাড়ি চলে আসবেন, আ'ম বিজি।"

ইসমাত অনেকদিন পর সেল্ফ কেয়ারের সুযোগ পেয়েছে। সে প্রতি মাসেই একবার করে আসে। আজ এই মাসে প্রথম। এই সময়টায় সে খুব শান্তি অনুভব করে। তার কাজের চাপ থাকে না, বাড়ি ফেরার তাড়া থাকে না, কাউকে নিয়ে ভাবতে হয় না.. খুবই মধুময় সময়। সে একে একে স্পা, ফেসিয়াল, হেয়ার স্পা, পেডিকিওর-ম্যানিকিওর সবই নিল। এই করতে করতে তার রাত প্রায় দশটা বেজে গেল। তবুও ইসমাতের রিফ্রেশমেন্টের কমতি নেই। পুরোদিনে তার যেন এক মাসের ক্লান্তি, চাপ নেমে গেছে। আজ সে চুলে একটু কালার করেছে। খুব একটা বোঝা যায় না। তবে সে আয়নায় নিজেকে দেখে উপলব্ধি করল.. রং-টা একদম তার চেহারার নকশার সাথে খাপ খাইয়ে গেছে। সেলুনের দুজন মেয়ে তো প্রশংসাও করল। ইসমাত জবাবে শুধু মুচকি হাসি উপহার দিয়েছে। কি ভেবে সে নিজের একটা মিরর ছবি তুলল। পরপর সেটা ইন্সটায় ডে দিতেও ভুলল না। সে মাঝেমধ্যে ছবি তুলতে ভালোবাসে। তবে ইফরার তুলনায় পছন্দটা একটু কম। ইফরা তো সামান্য ঝাপসা ছবিও আপলোড করতে পছন্দ করে। তার ভাষ্যমতে তার ভক্তরা নাকি ইফরার এক্টিভিটি পছন্দ করে। কিন্তু ইসমাতের আইডিতে পরিচিত বাদে তেমন কোনো মানুষ নেই। 

সে বের হওয়ার আগে ড্রাইভারকে কল দিয়ে আনিয়েছে। ফিরতে ফিরতে তার রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেল। আজ যা জ্যামের কবলে পড়েছে সে।

ফিরে এসে দেখল মেইড অপেক্ষা করছে তার জন্য। খাবার বেড়ে দিতে হবে। ইসমাত সেই মেইডকে ছুটি দিয়ে দিল, বলল সে নিজেই পারবে। উপরে গিয়ে সে চমকে গেল, উটকো এক গন্ধ রুমজুড়ে। সে জানে এই দুর্গন্ধ কিসের। একপাশে দেখল সাহিদ হুইস্কির বোতল নিয়ে বসা। ইসমাত রুমে রুমস্প্রে মে রে সাহিদকে ধমকাল,
--"আর ইউ ইনসেন? ঘরে কেন বসেছ?"

সাহিদের কোনো জবাব নেই। ইসমাত বুঝল সাহিদ দুই বোতল গিলেছে। এখন আরেক বোতলের সাথে একটা গ্লাস নিয়ে বসা। গ্লাসে লম্বা লম্বা আঙুলের বিচরণ তার। অর্ধেক সেই হুইস্কির দিকে খুবই মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে।

 সাহিদের এই ছাইপাশ গেলার নির্দিষ্ট কারণের দরকার হয় না। সে বরাবরই নিজ ইচ্ছেতে স্বাধীন। তবে ইসমাতের সামনে এই প্রথম। ইসমাত দেখলেই বা কি, সাহিদের কি আসে যায়? কিন্তু ইসমাতের সেটা সহ্য হলো না। সে এগিয়ে এলো। গলায় আরও কাঠিন্য ঢেলে বলল,
--"তোমার সাহস তো কম না আমার সামনে বসে ম দ গিলছ? লজ্জা-শরম নেই?"

--"লজ্জা? হুইস্কির সাথে লজ্জার সম্পর্ক কী?"

--"আবার তর্ক করছ?"

সাহিদ কিছুটা ভাবনায় পড়ার ভঙ্গি করল। পরপর আবারও কিছুটা মা তাল সুরে বলল,
--"তাই তো! আসেন, তর্ক না করে আপনিও দুই গ্লাস গিলেন। এটা একদম ফ্রেশ। ইম্পোর্টেট! দেশি মা ল খাই না।"

--"ছিহ! আমি এখনই বাবাকে ডাকছি।"

--"ডাকেন! একা খেতে ভালো লাগছে না। পার্টনার দরকার।"

ইসমাত কপালে আঙুলের বিচরণ চালাল, রাগ নিয়ন্ত্রণ করল দাঁতে দাঁত পিষে। নিজের জন্য প্রায়ই তার করুণা হয়। এবারও হলো। আল্লাহ কোন পা পের জন্য এমন এক নমুনা তার ঘাড়ে ঝুলিয়েছে কে জানে। তার মনে পড়ে গেল একটা গান। মুন্নি বদনামের একটা লাইন,
"ক্যেসা আনারি সে পালা পারা..
জি পালা পারা!"

ইসমাত সাহিদের মুখের থেকে গ্লাসটা কেড়ে নিল। সাহিদ প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে চেঁচাল, 
--"ফা*। গিভ মি ব্যাক! আই হেট বেইং ইন্টারাপ্টেড, ইসমাত।"

ইসমাতের ইচ্ছে করল কষে এক চড় বসিয়ে দিতে। কত বড় সাহস তার সামনে খারাপ ব্যবহার করে। কিন্তু সে দিল না। উলটো মা তালটার মুখে সে কাপড় বেঁধে দিয়ে হুইস্কির বোতল নিয়ে বাথরুমে চলে গেল। বেসিনে দাঁড়িয়ে সে সবগুলো ফেলে দিল। সাহিদের সহজে নেশা চড়ে না, যদি না সে অতিরক্ত খায়। আজকে যা হাল, বোঝাই যাচ্ছে এটা দুই বোতলে নেশা ধরিয়ে দিয়েছে। কোন ব্র‍্যান্ডের কে জানে? ইসমাত বিড়বিড় করে সাহিদকে বকতে বকতে সব ফেলে দিল। 
--"মা তালটার মাথাটা ফাটিয়ে দেওয়া যেত, জীবনটা সহজ হয়ে যেত।"

এসে দেখল সাহিদ টেবিলে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে গেছে। সাহিদের মুখের স্কার্ফটা তখন তার গলাতে ঝুলছে, বেচারা পুরোপুরি খুলে সরানোর আগেই বোধ হয় মাথা এলিয়ে দিয়েছে। ইসমাত তাকে ডেকে তোলার প্রয়োজনবোধ করল না। সে ফ্রেশ হয়ে, পিজে সেট পরে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। আজ খেতেও ইচ্ছে করছে না তার। সেলুনে টুকটাক খেয়েছিল, এই যা।

 যাক, আজ আর তাকে বিছানা করতে হয়নি। সাহিদ টেবিলেই পড়ে থাকুক, সে আরাম করে ঘুমিয়ে নিক। যার যার ভালো সেই বুঝুক।

—————

পরেরদিন সাহিদ চোখ লাল করে তার ক্লোজেট রুমে দাঁড়ানো। তাকে সকাল সকাল ঘুম থেকে তুলেছে ইসমাত, একদম মুখে পানি মে রে। পরপর আবার তাকে কতগুলা লেবুর রসও খাইয়ে দিয়েছে। সেসব খেয়ে তার চরম বদহজম হয়। গতকাল রাতে যা গিলেছিল সব বেরিয়ে গিয়েছে তার। সারা রাত একভাবে ঘুমানোর জন্যে ঘাড়েও মৃদু ব্যথা। আজ সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে এতকিছু হয়েছে যে মস্তিষ্ক সচল করতে সময় লেগেছিল। যখন ঘোর কাটে তখন দেখে বাবা স্যুট ট্রায়ালের জন্য লোক পাঠিয়েছে। এখন একে একে তাই করছে সে। আর ইসমাত গিয়েছে আরামের সাথে ইয়োগা করতে। গা কেমন জ্বলে উঠছে তার। এর শোধ সে নিবেই। 

ইসমাত ইয়োগা সেরে কাপড় বদলে নেয়। এখানে তার সেলোয়ার কামিজের ওপরই চলতে হয়। তার উপর আবার কিসব নাকের নথ, চুরি, গলার চিকন স্বর্ণের চেইন তো আছেই। ইসমাত যখন বাথরুম থেকে বের হলো তখন দেখল তর্ষা চোরের মতো তাদের ঘরে ঢুকছে। এ দেখে ইসমাত ডান ভ্রু নাচাল। তর্ষাকে ক্লোজেট রুমের দিকে আগাতে দেখে ইসমাত পিছু ডাকল। চোর ধরা পড়ার মতো পিছে তাকাল তর্ষা, কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। ইসমাত কিছু একটা আঁচ করতে পেরে জিজ্ঞেস করল,
--"এখানে কি করছ?"

তর্ষা আমতা আমতা করে বলল,
--"চাচী.. ব্রেকফাস্টের জন্য ডেকেছে সাহিদ ভাইয়াকে।"

--"কিন্তু সাহিদ তো আগেই ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়েছে।"

তর্ষার মুখ কালো হয়ে গেল। তবুও আমতা আমতা করে ক্লোজেট রুমের দরজা অবধি যাওয়ার বাহানা খুঁজতে লাগল সে। ইসমাত তাকে সেই সুযোগ না দিয়ে বলল,
--"ঘরে যাও। সাহিদ বিজি। ট্রায়াল শেষ হয়নি।"

তর্ষা মুখের ওপর জবাব দিতে পারল না। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে বেরিয়ে গেল। তর্ষা যেতেই ইসমাত গেল ক্লোজেট রুমে। দাঁড়াল দরজায়। পরপর চোখে পড়ল সাহিদের শক্ত, পেটানো বড় পিঠটায়। মুহূর্তেই সেই পিঠ শার্টে আবৃত হয়ে গেল। সাহিদ চোখ-মুখ লাল করে বোতাম লাগাচ্ছে। বাকিদের একজন জুতা আর আরেকজন তার নির্ধারিত ব্লেজার নিয়ে দাঁড়ানো। গতকাল রাতের জন্য এখনো তার চোখ ফোলা। চোখে এখনো নেশা বোঝা গেলেও সে ভালো করেই জানে বমির সাথে সাথে তার নেশা উড়ে গেছে। মুখের চোয়ালটা বরাবরের মতোই ধারালো, তেজী।

 ইসমাত বুকের ওপর আড়াআড়ি হাতজোড়া বেঁধে সাহিদকে দেখল। ছেলেটা আসলেই সুদর্শন, শুধু আচরণ করলার চেয়েও নিকৃষ্ট। ছেলেটা যে সুদর্শন, সেটা থোরাই স্বীকার করবে সে? প্রশ্নই ওঠে না। 

একজন যখন সাহিদকে ব্লেজার পরিয়ে দিল, তখনই সাহিদ ইসমাতকে লক্ষ্য করল। তার মাথায় আবারও শোধের কথা নড়াচড়া দিল। চোখ-জোড়ায় রাগ ফুটিয়ে বলল,
--"স্টারিং এট মি? রূপ বেয়ে পড়ছে আমার?"

আবারও দিল ইসমাতের গা জ্বালিয়ে। তবে ইসমাতও কি কম যায়? সে দায় সারা গলায় বলল,
--"মেয়েদের রূপ বেয়ে পড়ে, তুমি কি মেয়ে নাকি?"

এই সূক্ষ্ম অপ মানে সাহিদও হাল ছাড়ল না। বাম ভ্রু নাচিয়ে অন্য ইঙ্গিতে বলল,
--"আপনার বুঝি মেয়ে পছন্দ?"
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp