নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া - পর্ব ১৬ - লাবিবা ওয়াহিদ - ধারাবাহিক গল্প

নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া
          দুনিয়া ব্যস্ত অবস্থায় থাকলেও একটা জায়গা খুবই নিরিবিলি থাকে। যেখানে ব্যস্ততায় ছোটাছুটি নেই, কোলাহল নেই, ভালো-মন্দ কথাও নেই। সেই নিরিবিলি স্থানের নাম ক ব রস্থান। এখানে সবাই চিরনিদ্রায় শায়িত। তাদের জগত-দুনিয়ার ব্যস্ততা, চিন্তা, আক্ষেপ কিছুই নেই। তারা দুনিয়াদারি থেকে ছুটি পেয়েছে আজীবনের জন্য।

পাশাপাশি দুটো নতুন কব র দেখা যাচ্ছে। মা-ছেলের ক ব র। মা-ছেলে একসাথে আছে এখন। হয়তো সেখানে তারা মা-ছেলে মিলে আড্ডা দেয়, গল্প করে, আল্লাহকে ডাকেন। একজন পরিবারের দুজন মানুষ এখানে চিরজীবনের জন্য শায়িত, শান্তির ঘুম ঘুমোচ্ছে। শুধু পিছে ফেলে গেছে নিঃশ্বাস বন্ধ না হওয়া জী ব ন্ত লা শ গুলোকে। 

সাহিদ প্রায় পনেরোদিন পর হাসপাতাল থেকে সাময়িক ডিসচার্জ পেয়েছে। তাকে এখনো কেউ কাউন্সিলিং করাতে পারেনি। সে কয়েকবারের মতো পাগলামো, চেঁচামেচি, কান্নাকাটি করলেও ইদানীং খুব চুপসে গিয়েছে। খাওয়ানোও যায় না সহজে, খুব ধরে-বেঁধে খাওয়াতে হয়। এমতাবস্থায় একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জানালেন, সাহিদকে এখান থেকে কিছুদিনের জন্য অন্যকোথাও নিয়ে গিয়ে ভালো হয়। এর মাধ্যমে হয়তো সাব্বির বা তার মা ফিরে আসবে না, কিন্তু সাহিদ কিছুটা হলেও ঠিক হতে পারে। যে চলে গেছে, সে তো গেছেই, এখন সাহিদের যে জীবন পড়ে আছে। তাকে তো বাঁচতে হবে। কেউই সাব্বিরকে তাকে ভুলতে বলছে না, শুধু এই ঘটনা যে তার দোষ নয় সেটাই বোঝাতে চাচ্ছে। কিন্তু সাহিদ কারো কোনো কথা শুনেছে কিনা বোঝা যায়নি। বড্ড উদাসীন, অন্যমনস্ক হয়ে থাকে। যেই ছেলেটা মোবাইল, পিসি ছাড়া থাকতে পারত না সে দিব্যি পনেরো দিন কাটিয়ে ফেলেছে। শূন্য, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে শুধু জানালার বাইরেটাই দেখত। অনুভূতিশূন্য, পাথর হয়ে ছিল সে। 

ইসমাত তার দায়িত্ব-কর্তব্যে কোনোপ্রকার নড়চড় করেনি। সে রোজ নিজ হাতে সাহিদের যত্ন করেছে। তাকে খাওয়া থেকে শুরু করে গা মুছে দেয়া, ফ্রেশ করানো, ঘুমানোর সময়ে ছায়ার মতো তার বসে থাকা সবই চলেছে। শুধু ফাঁকে ফাঁকে এক দুইবার অফিস থেকে ঘুরে এসেছে, এই যা। সাহিদ যখন দুঃস্বপ্ন দেখে ভয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠত, তখন ইসমাতকেই সে সবার আগে পেত। মেয়েটা প্রতি রাত তার পাশে, তার সাথেই থাকে। সাহিদ ইসমাতকে পেয়ে শান্ত হয়, তাকে সাব্বিরের সাথের স্মৃতি শোনায়, চোখ-মুখ লাল হয়, তবুও কখনো সে ইসমাতকে বিরক্ত হতে দেখেনি। সাহিদ যদি খেতে না চায় তখন ইসমাতই তাকে ধমক দিয়ে বাড়ায়। আজকাল ইসমাতের যত্নও যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে ধমক। ইসমাত মোটেও আর সাহিদের ত্যাড়ামোকে কান দিচ্ছে না। বরঞ্চ তার শ্বশুর-শাশুড়িই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ইসমাতের দিকে। তাদের ঠিকঠাক হজম হয় না। ছেলেটা ওনাদের শোকে কাতর, তাও ইসমাত কেমন চোখ রাঙিয়ে, ধমকিয়ে ছেলেকে সোজা রাখছে, মেডিসিনেও কোনোপ্রকার কম্প্রোমাইজ নেই। শাহেলা বুঝি কিছুটা স্বস্তি পেল। জীবনে তিনি একমাত্র ছেলের জন্য বউমা ভালো বাছাই করেছেন ভেবে গর্বও হয়। এই ধমকানোর মাঝে তিনি সরল মায়া, আদর অনুভব করেন। কেন তা জানেন না। 

 সাহিদ প্রায়ই শূন্য চোখে ইসমাতের ব্যস্ততা দেখত, ইসমাতের রুমের এপাশ থেকে ওপাশ এটা সেটা নিয়ে ছোটাছুটিও দেখত। সাথে দেখত ইসমাতের ক্লান্ত চেহারা, কালসিটে চোখ জোড়া। নিজের যত্নের প্রতি কখনো দুই আনা ছাড় না দেওয়া ইসমাত আজকাল নিজের যত্ন নিতে ভুলেই গেছে। চোখে পড়েছে বেশ ডার্ক সার্কেল। ইসমাতের কি আর এত হুঁশ আছে? অফিস আর সাহিদকে সামলে তার আর সময় হচ্ছে কই? এ নিয়ে তার মোটেও অনুশোচনা হয় না। সাহিদ তার স্বামী, তার স্বামী আর পরিবারের জন্য করাটা দোষের কিছু না।

 ইসমাত সাহিদকে নিয়ে কবর স্থানে এসেছে। সাহিদ এখানেই আসার বায়না করেছিল। উৎসব আর আরেকজন বডিগার্ড তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে হুইল চেয়ারে বসিয়ে দিল। তার এক পায়ে প্লাস্টার, আরেক পা এখনো আহত। প্লাস্টার খুলতে সময়ই লাগবে বেশ। এখন ওদের দুজনের দেখভাল উৎসব আর রোহিত করে। মাহফুজ সাহেব এখন আর ওদের দুজনকে একা ছাড়েন না। তাদের মানুষ চেনে বেশি, শত্রুও বেশি। তাই তিনি পরিবারের আর কোনো লোকসান বরদাস্ত করবেন না।

সাহিদ হুইল চেয়ারে বসে দেখল সাব্বিরের ক বরটা। ইসমাত কব রস্থান থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়ানো। সাব্বিরের ক ব র অবধি উৎসবই সাহিদকে নিয়ে গিয়েছে। সাহিদের চোখে ভেসে উঠল তাদের স্মৃতিগুলো। কত রাগ দেখিয়েছে সাব্বিরকে, রেগে কতবার কথাও বন্ধ করেছে। কিন্তু এই ছেলেটা তাদের সম্পর্কের টানে ঠিকই তাকে খুঁজতে বাড়ি চলে আসত। তার রাগ ভাঙাত। এরপর আবারও দুই বন্ধু আগের সব ভুলে নতুন আড্ডায় মজে যেত। যেখানে দুনিয়া তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করত, ইগোইস্টিক ছেলে বলত তখন এই ছেলেটাই তার সাথে ছায়ার মতো লেগে থাকত, সাহিদ রাগলে উলটো আরও রাগিয়ে দিত। আবার এই সাব্বিরই সাহিদের মুখ দেখলেই সবটা টের পেত। এমনকি তার বিয়ের সম্পর্ক নিয়ে তার থেকেও বেশি মাথা ব্যথা ছিল আর এই বন্ধুর। আর দেখো, তার বন্ধুটাই এখন তিন হাত মাটির নিচে। যাকে সাহিদ শেষ দেখাটাও দেখেনি, একটু ছুঁতে পারেনি, বলতে পারেনি, "ডোন্ট লিভ মি এলোন।"

আর কখনো দেখতেও পারবে না সেই হাসিটাকে। যেই হাসিটা দেখলে সে হাসত। যেই হাতের ছোঁয়ায় সাহিদ তার সমস্ত সমস্যা, রাগ, মাথা ব্যথা এক নিমিষেই ভুলে যেত। যার সাথে ভিডিও গেম খেলা, বাইক রেইস করা তার সবচেয়ে পছন্দের ছিল, সে আজ তার পাশে নেই। শূন্যতা উপহার দিয়ে হারিয়ে গিয়েছে। আজ বাইক, গেম সবই আছে, কিন্তু সাব্বির নেই।

সাহিদের মনে হলো সাব্বির যেন ক ব রের উপর বসে তাকে দেখে হাসছে, কাছে ডাকছে। চিরচেনা সে হাসিটা সম্ভবত সাহিদের হ্যালুসিনেশন। কিন্তু সে হাসিতেই মজে রইলো। দেখল, সাব্বির কি সুন্দর করে হাসছে। তার চিরচেনা কণ্ঠে তাকে ডাকছে। সাহিদ ঘোরের মাঝেই কিছুটা ঝুঁকে ডান হাতে সাব্বিরের ক ব রের একটু মাটি তুলে নিল। এই মাটিটুকু যেন সাব্বিরের হাত। মুহূর্তেই আবারও সাহিদ বাচ্চাদের মতো কাঁদতে শুরু করল, তার চিঁবুক বুক ছুঁইছুঁই। মাথা নিচু করে কাঁদতে ছেলেটা। এই কান্নার সাথে গভীর আর্তনাদ বেরিয়ে আসছে। ইসমাত দূর থেকেই তা দেখে চোখ ভেজাল, কিন্তু সে এগিয়ে গেল না। সাহিদকে একটু একা ছেড়ে দিল। এই সময়টা একান্ত তার আর সাব্বিরের হোক। সাহিদ মিনমিন করে কথা জড়াচ্ছে,
--"আ'ম সরি সাব্বির। আমার জন্য এসব হয়েছে। কেন আমাকে বাঁচাতে গেলি তুই? কেন তুই নিজে ট্রাকের সামনে পড়ে আমাকে কয়েক সেকেন্ড সুযোগ দিলি ট্রাক থেকে বাঁচার?"

পরপর আবার বলল,
--"প্লিজ সাব্বির, আন্টিকে নিয়ে ফিরে আয়। আই প্রমিজ আমি আর কখনো রাগ করব না, চেঁচাব না। সবার কথা শুনব। তুই আমাকে সারাদিন বিরক্ত করলেও টু শব্দটি করব না। তাও তুই ফিরে আয়, আমি পারছি না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। তোর জায়গায় আমি কেন হলাম না? আমার জন্য.."

সাহিদ পাগলের মতো কাঁদছে। শুকনো মাটি সে গালে চেপে রেখেছে। আন্টির ক ব র দেখে সাহিদের রিগ্রেট আরও বাড়ছে। সে কখনো কারো হাতে ভাত খায়নি। কিন্তু সাব্বিরের মায়ের হাতে খেয়েছিল। তিনি অতি যত্নে দুই ছেলেকে খাইয়ে দিতেন। সাহিদ তার আরেক মাকেও হারিয়েছে। সে নিজেকে কীভাবে ঠিক করবে? কীভাবে স্বাভাবিক হবে? সে যে বেঁচে থেকেও ম রে গেছে সেদিনই। সে বাঁচার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

ঘণ্টাখানেক এভাবেই কেটে গেল। উৎসব সাহিদের শোকে কোনোপ্রকার হস্তক্ষেপ করল না। সেও অনুভব করল সাহিদকে সময় দেওয়া জরুরি। সাহিদের থেকে সে কম করে হলেও তিন বছরের বড়। তার খারাপই লাগছে অকালে দুটো প্রাণকে ঝরে যেতে দেখে। আর শুরু থেকে সাহিদের এসব আর্তনাদ, পাগলামো তো দেখছেই। কিন্তু সে বডিগার্ড, তার কাজ শুধু সুরক্ষা দেওয়া। বডিগার্ডদের সবসময় বজ্রপাতের মতো কঠোর হতে হয়, তাদের জন্য কোনোপ্রকার ইমোশন, খারাপ লাগা হারাম। সেই সে নিজের পেশাগত দিকটা ঠিক রাখল। মুখ স্বাভাবিক রাখল শত আর্তনাদ শুনেও। সে ভীষণ পাষাণ একজন পুরুষ, কিন্তু সাহিদ তার হৃদয় নাড়িয়ে দিচ্ছে। শুনেছে এই ছেলে ভীষণ নিয়ন্ত্রণহীন ছিল, তাকে কেউ কিছু বলার সাহস পেত না। সেই একই ছেলেটা দেখো, কেমন বাচ্চাদের মতো কাঁদছে? এটা দেখে কেউ কী আদৌ বিশ্বাস করবে সাহিদ খুবই অহংকারী এবং বেয়াদব? 

 সাহিদ যখন অপলক কব রের মাটিগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। কান্না থেমেছে কিছুক্ষণ আগেই। যেন নীরবে, কল্পনায় সাব্বিরের সাথে তার কথা হচ্ছে। সাহিদ হ্যালিসুনেশনের মাঝেই সাব্বিরকে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাইল। এতে করে সে মাটিতে পড়ে গেল হুইল চেয়ার থেকে। ঠিক কবরের পাশটায়। সাহিদের কী হলো কে জানে। সে উন্মাদের মতো মাটি খুড়তে লাগল। মুহূর্তেই উৎসব আর রোহিত গিয়ে সাহিদকে ধরল। কিন্তু সাহিদের শরীরে যেন অন্যকিছু ভর করেছে। তাকে কিছুতেই দমানো যাচ্ছে না। পরিস্থিতি অস্বাভাবিক দেখে ইসমাত আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েও সেও ছুটল সাহিদের কাছে। নারীদের ক ব রের কাছে আসা নিষেধ, তবুও বিপদে পড়ে ইসমাতের আসতেই হলো। সেই সাহিদকে ধমকে হুইলচেয়ারে ওঠানোর নির্দেশ দিল। সাহিদ বিড়বিড় করছে একই কথা,
--"সাব্বির, সাব্বির। ও এখানেই আছে ইসমাত। আরেকটু মাটি খুড়লেই আমি ওকে দেখতে পাব। ও, ওকে আমার সাথে করে নিয়ে যাব। ও আমার সাথেই থাকবে। দেখুন, এখনো কেমন আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। মাটিটা তুলতে দিন আমায়। আমি.."

ইসমাত ধমক দিল সাহিদকে। সাহিদ যেন তার কল্পনা থেকে বেরিয়ে এলো। আবারও অনেক চুপসে গেল, হুইলচেয়ারে গা এলিয়ে দিল। গা তখনো মাটিতে মাখোমাখো। ইসমাত ভেজা চোখ জোড়া নিয়েই সাহিদের দিকে তাকিয়ে রইলো। বহু কষ্টে বলল,
--"ওনারা কখনো ফিরবে না, সাহিদ। এটা তোমাকে মেনে নিতে হবে। এসব না করে হাত তুলে দোয়া করো তাদের জন্য। যেন তারা যেখানেই আছে, সবসময় যেন ভালো থাকে।"

সাহিদ নিশ্চুপ হয়ে শুনল। ইসমাত থেমে আবারও বলল, "জিয়ারত করোনি। দুই ক বর জিয়ারত করে আসো। ওরা পরকালে খুশি থাকবে। আমি গাড়িতে অপেক্ষা করছি।"

বলেই ইসমাত একপলক মাটিতে মাখোমাখো সাহিদের দিকে তাকিয়ে গাড়ির দিকে চলে গেল। আল্লাহ তাকে আরও ধৈর্য দিক সবকিছু সামলে নেওয়ার। সাহিদ বহু কষ্টে জিয়ারত সেরে চলে এলো। ওরা আবারও হাসপাতালে ফিরে এলো। সাহিদকে ইসমাত জোরপূর্বক ফ্রেশ করিয়ে দিল। সাহিদ হতে চায়নি, সে মাটিতে মাখোমাখো হয়েই থাকতে চায়। 

রাতে সাহিদ কিছুই খেতে চাইল না। কিন্তু ইসমাত চোখ রাঙাল। সাহিদও চোখ রাঙিয়ে বলল,
--"কেন বিরক্ত করছেন? বললাম তো খাব না!"

--"তুমি খাবে না তোমার ঘাড় খাবে। হা করো!"

সাহিদ হা করল না, জেদ ধরে বসেই রইলো। ইসমাত না পেরে সাহিদের মুখ চেপে ধরে ধরে খাইয়ে দিল। এতে সাহিদ হতভম্ভ। ইসমাত কবে থেকে এতটা অধিকার ফলাচ্ছে? যেখানে ইসমাত তাকে কখনো স্পর্শই করত না, সেখানে ইসমাতই তার সমস্ত বিষয় খেয়াল রাখছে। সাহিদ এত ভাবার সুযোগ পেল না। চেঁচাল খাবার মুখে নিয়েই,
--"ফর গড সেক ইসমাত! আমাকে আমার হালে ছেড়ে দিন। কেন করছেন আপনারা এসব? আমার এসব সহ্য হয় না। আমিও নাহয় সাব্বিরের সাথেই চলে যেতাম, কেন আমাকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করছেন? আমি এসবের যোগ্য নই। আপনি.."

সাহিদ থেমে গেল। দেখল ইসমাত চোখ লাল করে তার পানে তাকিয়ে, চোয়াল শক্ত, নাক লাল। চোখে অশ্রু বুঝি টলমল করছে? ইসমাত তার মাখো হাত নিয়েই ভাঙা গলায় বলল,
--"তোমাকে সুস্থ হতেই হবে। ওই দূর্ঘটনার জন্য দায়ী তুমিই। তোমার অসাবধানের জন্য আজ তোমার পরিবার ভালো নেই। তুমি যখন মৃ ত্যুর সাথে আইসিইউতে লড়ছিলে তখন তোমার মা হাসপাতালে ভর্তি ছিল। খাওয়া-দাওয়া করেননি, একচিত্তে শুধু তোমারই বেঁচে ফেরার দোয়া করে এসেছে। তোমার বাবা যেখানে সারাদিন বিজনেস, মিটিংস নিয়ে ব্যস্ত থাকত সেখানে উনি দু ফোটা জলে গলা ভেজাননি। দিন-রাত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে তোমার জ্ঞান ফেরার অপেক্ষা করেছে, ডাক্তারের পেছনে সময়ে-অসময়ে ছুটেছে। তুমি ম রে গেলে হয়তো তোমার যায় আসবে না, কিন্তু তোমার সাথে সাথে একটা পরিবারও ধ্বংস হয়ে যাবে। এখনো এই পরিবার সুস্থ নেই। যদি না তুমি সুস্থ-সবল ফিরে আসো। আন্টি এখনো তার গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ খেতে হেলাফেলা করেন, জায়নামাজে বসে থাকেন শুধু তোমার জন্য। ওনাদের খুবই সাধের সন্তান তুমি, ভুলে যেও না। অনেক দোয়ার পর ওনারা তোমাকে পেয়েছেন। 

 তাও যদি তুমি অকৃতজ্ঞের মতো মনে করো আমি, বাকিরা তোমাকে বিরক্ত করছি। তবে বেশ, ম রে যাও তুমি অকৃতজ্ঞের মতোই। ফেলে দাও এই ভাঙা পরিবারকে মাঝ সমুদ্রে। সেখানে আমরা সবাই নাহয় ধুকে ধুকে ম র ব। তাও যদি তোমার শান্তি হয়।"

বলেই ইসমাত এঁটো হাত নিয়েই কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। পিছে রেখে গেল নির্বাক সাহিদকে। তার নজর স্থির তখনো ভাতের প্লেটটায়। সাহিদের কি হলো কে জানে, সে ময়লা হাতেই চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বাকি ভাতটুকু খেল। সে কীভাবে বোঝাবে তার ভেতরটায় কত বড়ো ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষত-বিক্ষত ভেতরটাকে সে কী করে সারিয়ে তুলবে, তার ঠিক কতটা কষ্ট হয় প্রতিবার নিঃশ্বাস ফেলতে। কাউকে না পারবে দেখাতে, না পারবে বোঝাতে। তার মনে হচ্ছে এই ভয়াবহ যন্ত্রণার থেকে ম রে যাওয়া ভালো। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার চোখে ভেসে উঠল সাব্বিরের পরিবারের কথা, নিজের পরিবারের কথা। তাদের দুজনের গাফিলতির জন্যই আজ দুই পরিবারের এই অবস্থা।

ওষুধ খেয়ে সাহিদ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল ইসমাতের জন্য। কিন্তু ইসমাত ফিরছে না। উৎসবের থেকে শুনেছে সে খোলা হাওয়া নিতে বারান্দার দিকে গিয়েছে। সাহিদ শূন্য চোখে চেয়ে রয় সিলিঙের দিকে। ঘোরের মাঝে আবারও সাব্বিরকে হ্যালুসিনেশন করল। সাব্বির তাকে খুব বকছে ইসমাতের সাথে বাজে ব্যবহারের জন্য। প্রতিবারের মতো এবারও নিজের জন্য কোনোপ্রকার কৈফিয়ত দিল না সে। তার এই হ্যালুসিনেশনের কথা কেউ জানে না, এটা তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। 

ঘোর কাটল দরজা খোলার শব্দে। তড়িৎ দরজার দিকে তাকাতেই বিধ্বস্ত ইসমাতকে দেখল সে। ইসমাত সাহিদকে কিছুই বলল না, এড়িয়ে এলো। এই কেবিনে মাহফুজ সাহেব আরেকটা বেডের ব্যবস্থা করেছে। সেখানেই ইসমাত রাতে ঘুমায়। বেড না থাকলে তার আরও সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। 

সাহিদের দিকে না তাকিয়েই ইসমাত অপর বেডে গা এলিয়ে দিল, সাহিদের দিকে পিঠমুখী হয়ে। সাহিদ খুব খেয়াল করল ইসমাত তাকে এড়িয়ে গেছে। সে অপলক ইসমাতের দিকেই তাকিয়ে থাকল। ইসমাতেরও নড়চড় নেই। এভাবে কেটে গেল বুঝি কয়েক মিনিট? পিনপতন নীরবতায় সাহিদ গলা খাঁকারি দিল। আবছা আলোর রুমটিতে সে চাপা স্বরে ডাকল,
--"ইসমাত?"

ইসমাতের সাড়া নেই। বেশ কিছুক্ষণ পর ইসমাত সাহিদের দিকে ফিরল। আরও কিছুটা সময় নিয়ে সাহিদের ডাকে সাড়া দিল। খুবই মৃদু স্বরে,
--"হুঁ?"

সাহিদ কিছু বলল না, নীরবে দেখল ইসমাতের বিধ্বস্ত মুখটা। ইসমাতও তাকাল সাহিদের চোখের পানে। সাহিদের চোখ-জোড়া বড্ড অসহায়, সেই অসহায়ত্ব যেন ইসমাতকে কতকিছু বলে দিচ্ছে। দুজনেই এই পর্যায়ে নীরব রইল।

—————

আজ সাহিদ আর ইসমাতের ফ্রান্সের ফ্লাইট। সাহিদ জন্মদিনে যেই টিকিট উপহার পেয়েছিল সেটার ডেট ফুরিয়ে গেছে। এজন্য মাহফুজ সাহেবই নতুন করে সব ব্যবস্থা করে দিলেন। হাসপাতাল থেকে সাহিদ ডিসচার্জ পেয়েছে প্রায় মাসখানেকের মতো। সাব্বিরের মৃত্যুর প্রায় চল্লিশদিন অনেক আগেই ফুরিয়ে গেছে, তার মায়েরও। ও বাড়িতে সবাই নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে, নিজ নিজ জীবনে ফিরে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কি আর করবে, জীবন কি কারো জন্য থেমে যাবে? আমাদের যে সামনে আগাতেই হবে, বুকে পাথর চেপে। সাব্বিরের বড়ো ভাই অর্থাৎ মেহেদীর বিয়েটা খুবই ঘরোয়াভাবে হয়েছে। যেখানে কতশত আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল সেখানে এক বড়োসড়ো টর্নেডো এসে সব লণ্ডভণ্ড করে দিল। কেড়ে নিল পরপর দুটি প্রাণ।

ডাক্তারদের অনুমতিতে এবং তাদের পরামর্শেই মাহফুজ সাহেব এই ব্যবস্থা করেছেন। সাহিদের শারীরিক থেকে মানসিক ক্ষতিটা বেশি হয়েছে। সে কোনো মনোরোগ চিকিৎসা নিতেও রাজি নয়। এজন্য সবাই তাকে পরামর্শ দিলেন যেন হাওয়া বদল করে। এই ঘরকুনো জীবন থেকে নিজেকে মুক্ত করে নতুন কারিকুলামে চলে যায়। বাবা-মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তীব্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে মেনে নিল। ইতিমধ্যেই এই মানুষ দুজনকে অনেক দুঃখ দিয়ে ফেলেছে সে। শুধু তারা দুজনই নয়। সম্ভবত, ইসমাতকেও।

সাহিদ যখন তার বাবা-মায়ের থেকে বিদায় নিচ্ছিল তখন রিকু তার আর ইসমাতের পায়ের কাছে আহ্লাদ করে। সাহিদের পা ঘেষে মাথা নাড়ায়। যেন সে সাহিদকে থেকে যেতে বলছে। এই মাসটায় সাহিদকে রিকু অনেক জ্বালাতন করলেও সাহিদ কিছু বলেনি। অথচ তার রাগের জন্য শাহেলা রিকুকে জন্মদিনের অনুষ্ঠানগুলোতে রিকুকে বাড়িতেই রাখেননি। সত্যি, সময় মানুষকে কতটা পরিবর্তন করে দেয়।

যখন ওরা এয়ারপোর্টের দিকে যাচ্ছিল তখন সাহিদ আচমকা প্রশ্ন ছুঁড়ল।
--"ফ্লাইট আসতে অনেক দেরী তাই না?"

--"হুঁ, আমরা আগে আগেই যাচ্ছি।"

--"আমার একটা শেষ অনুরোধ রাখবেন?"

ইসমাত তাকাল সাহিদের দিকে। সাহিদের হাতে পায়ে এখন কোনো পট্টি নেই, প্লাস্টার নেই। কতগুলো ক্ষত আগেই শুকিয়েছে। কিন্তু দাগ এখনো রয়ে গেছে। 

—————

রোদসী এই দুই মাস আরামেই ছিল। মাহফুজ সাহেবের হাত-পা ধরে পার পেয়ে গেছিল। এছাড়াও তাদের ওরকম পরিস্থিতি ছিল না যে জোরালো ভাবে রোদসীর বিরুদ্ধে কোনো স্টেপ নিবে। তাই বিষয়টা খুব সহজেই ধামাচাপা পড়ে গেল। সে তার অসৎ চক্রান্তে বিজয়ী হয়ে ফিরে এলো আবারও মিডিয়াতে। এখন তার আরও বেশি ফলোয়ার, দর্শক। ভক্তের ছড়াছড়ি সবখানেই।

রোদসী গুণগুণ করতে করতে গান গাইতে গাইতে তার ভ্লগের এডিট করছিল। যখন কলিংবেল বাজল, তখন সে ফুরফুরে মেজাজেই চলে গেল দরজা খুলতে। পিজ্জার অর্ডার দিয়েছিল। সেটাই বোধ হয় এসেছে। দরজা খুলতেই চমকে গেল। নড়চড়ের সুযোগ তো দূর, মুহূর্তেই একটা বড়ো পুরুষালি শক্ত হাত তার গলা চেপে ধরল। অত্যন্ত শক্তি এই হাতের বাঁধন, নিঃশ্বাস ফেলে কষ্ট হচ্ছে। রোদসী পিছিয়ে যেতে লাগল। একই ভাবে ভেতরে প্রবেশ করল সাহিদ। তার চোখ-মুখ রক্ত-লাল। হাতের বাঁধনে আরও শক্তি বাড়াল। রোদসী ছটফট করছে, নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। চোখ কেমন উলটে গিয়েছে তার। 

সাহিদ বাঘের মতো চাপা গর্জন দিয়ে বলল,
--"কী, কষ্ট হচ্ছে? তোর মতোই আমার বন্ধু শেষ বেলায় এমন ছটফট করেছিল বি*। তোর কারণেই ওইদিন আমার বন্ধু মরেছে। তার পরিবার ধ্বংস হয়েছে। তুই কী করে ভাবলি তোকে এত সহজে ছেড়ে দিব? তুই আমার চরিত্রে দাগ বসানোর ট্রাই করেছিস, ইটস ওকে। বাট তাই বলে তুই আমার কলিজায় হাত দিবি? এত বড়ো স্পর্ধা তোর? আমি সাহিদ মুস্তাহাব দেখব তুই স্বস্তির নিঃশ্বাস কেমনে ফেলিস। বেঁচে থাকতে তোকে আমি হেল দেখাব। মার্ক মাই ওয়ার্ডস, স্লা*!"
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp