কামিনী - পর্ব ৯৮ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          নিস্তব্ধ কক্ষ ভেদ করে যতটুকু শব্দ প্রাসাদের সমস্ত প্রাচীর জুড়ে প্রতিধ্বনিত করতে লাগলো সেই সমস্ত শব্দের উৎস হলেন রাজমাতা। তার দানবীয় হাসি তাণ্ডবের মতো প্রলয়ঙ্কারী রূপ ধারণ করেছে। হাসতে হাসতে তার চঞ্চল মণি দু'টো নিবদ্ধ হলো সুরসুন্দরীর মুখমণ্ডলে। 
 
  সুরসুন্দরীর মুখমণ্ডল অত্যাধিক শীতল। তার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই প্রকাশ্যে। এমন কোনো অভিব্যক্তি নেই যেটি দেখে রাজমাতা বুঝবেন, সুরসুন্দরী ক্রোধান্বিত হয়েছেন না-কি ভঙ্গুর। তবে হয়ত কিছুটা অন্যমনস্ক হয়েছেন। তার ঐ মুখাবয়বের বৈশিষ্ট্যকে থমথমে করে কিছু একটা ভাবনা ছুটছে যেন। গভীর ভাবে দৃষ্টি রাখলেই তা বোঝা যায় কেবল। 
 রাজমাতা এ-ই বোধহয় মোক্ষম সময়টুকু বোধ করলেন। অকস্মাৎ কৌশলী ভঙ্গিতে তলোয়ারের সামনে থেকে নড়ে গেলেন। সুরসুন্দরী টের পাওয়ায় আগেই তিনি নিজের তলোয়ারটি তুলে নিতে গেলেন। কিন্তু হলো না। তলোয়ার তোলার আগ মুহূর্তে তার হাতের তালু এফোঁড় ওফোঁড় করে সুরসুন্দরীর তলোয়ার রুষ্টতা দেখালো। রাজমাতা নেহাৎই বুঝে উঠতে পারলেন না প্রথম অবস্থায় কিন্তু যখনই বুঝে উঠলেন তখনই হৃদয় বিদারক চিৎকারে ফেটে পড়লেন। তার মনে হলো, কেউ যেন জ্বলন্ত আগুন তার হাতের মাঝে নিক্ষেপ করেছে। জ্বলে যাচ্ছে তীব্র যন্ত্রণায়। তার চোখে অব্দি অশ্রু চিকচিক করছে। 

  “রানি, রানি কামিনীকাঞ্চন, তুমি কী করলে এটি?” পীড়া ও ক্রোধে জর্জরিত কণ্ঠে হুঙ্কার করে উঠলেন রাজমাতা। তিনি এতটাই বিশ্বাসী স্বরে রানি কামিনীকাঞ্চনের নাম উল্লেখ করলেন যেন তিনি ধরেই নিয়েছেন তার সামনে সুরসুন্দরী নয়, রানি কামিনীকাঞ্চন দাঁড়িয়ে আছে। 
 তার এই তীব্র চিৎকারের বিপরীতে কোনো বাক্য এলো না, শব্দ এলো না। রাজমাতা নিজের হাতটি চেপে ধরে পুনরায় চ্যাঁচিয়ে উঠলেন,
“তোমার এত হৃদয়ের জোর, তাই না? নিজের স্বামীর এমন বিশ্বাসঘাতকতার কথা শ্রবণ করার পরেও সেই জোরে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধের জন্ম নেয়নি? হ্যাঁ? আমি কি একা দোষী? শাস্তি যদি ধার্যই করতে হয় তবে তোমার স্বামীকেও সেখানেই দাঁড় করাও।”

  রাজামাতার উচ্চবাচ্যের পরও বিপরীতের দিকের মানুষটা শান্ত শীতল ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। এমন যন্ত্রণার পরেও একটা মানুষ কীভাবে অনবরত নিজের দিকটা সমর্থন করে যাচ্ছেন! একটু অনুশোচনাবোধ অব্দি নেই।

  “কথা বলছো না কেন? সুরসুন্দরী হওয়ার সাধ এখনো মেটেনি? আমার সঙ্গে চতুরতা করতে এসেছো? তুমি রানি কামিনীকাঞ্চন, তা বুঝতে আমার খানিক সময়তো লেগেছিলোই কিন্তু আমি জানি আমি এ মুহূর্তে ভুল নই।”

  “আমি কখন বললাম আপনি ভুল? আপনি একদমই সঠিক পথেই আছেন, আমিই কামিনীকাঞ্চন। রানি কামিনীকাঞ্চন।” এতক্ষণে কক্ষের প্রাচীরে অবশেষে আরও একটি কণ্ঠ গিয়ে ধাক্কা খেলো। কামিনীকাঞ্চন নামটি ফিরে এলো তাদের দিকে। সুরসুন্দরীর বেশভূষায় থাকা রানি কামিনীকাঞ্চনের ওষ্ঠে অর্ধ চাপা হাসির রেখা ফুটে উঠল। 
রাজমাতার ভেতরে যেই অবশিষ্ট সংশয়টি ছিলো সেটিও পরিষ্কার হয়ে গেলো রানির দাম্ভিক কণ্ঠের নামটি শুনে। তবে তিনি সঠিক ছিলেন? ঠিক ধরেছিলেন! সুরসুন্দরীর সাজে রানি কামিনীকাঞ্চন ছিলো! তার সাথে ছলনা করে রানি তাকে মাত দিতে চাইল! কিন্তু তিনি-ও তো ছলের বিপরীতে ধারালো বাণ নিক্ষেপ করেছিলেন। হেমলক পিয়ার্সের এমন একটি তথ্য উদ্বোধন করেছিলেন, যেই তথ্য শোনার পর রানি কামিনীকাঞ্চনের এমন বল থাকার কথা ছিলো না। তবুও তিনি কীভাবে এখনও এত প্রাচুর্য নিয়ে তাকে আঘাত করার মানসিক শক্তি পেলেন? এ-ও সম্ভব? 

 রাজমাতা বি স্ফো রি ত নয়নে রানির দিকে তাকালেন। রানির মুখে কোনো শোক নেই। নিজের স্বামীর প্রসঙ্গে শোনা এমন কথাটির পর যেন তিনি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেছেন! 

 “তুমি, তুমি হেমলক পিয়ার্সের এমন সত্যিটি জেনে তবুও কীভাবে স্থির রয়েছ, রানি?” বিস্মিত নয়ন নিয়ে শুধালেন রাজমাতা। তার হাত থেকে যে গলগলিয়ে র ক্ত ঝরে পড়ছে, সেদিকে হুঁশ নেই মোটেও। 
 রানি নিজের স্থান থেকে নড়লেন সামান্য। দু'কদম এগিয়ে এসে রাজমাতার চোখের দিকে সরাসরি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন। তার চিবুক কঠিন হয়ে এসেছে। দৃষ্টি তীক্ষ্ণতর হয়েছে। 
 রাজমাতাকে পুরোপুরি প্রত্যক্ষ করে বললেন,
 “আপনি যেই অস্ত্র নব্য চালনা করতে শিখেছেন, সেই অস্ত্রবিদ্যায় আমি আপনার গুরু। রানি কামিনীকাঞ্চনকে আপনি আবেগের অস্ত্রে দমন করবেন? রানি কামিনীকাঞ্চনকে? রানি কামিনীকাঞ্চনের অনুভূতি অত লঘু নয়, রাজমাতা। কারো সামান্য কথায় আমার অনুভূতি পরিচালিত হয় না। আমি কাউকে সেই অধিকার প্রদানই করিনি। আমি কাউকে সেই সক্ষমতা প্রদান করি না যেই সক্ষমতা পেলে তলোয়ার ব্যতীতও আঘাত করা যায়। আমার সম্পূর্ণ কিছু আমি নিজে পরিচালনা করি। সেটা হোক আমার অনুভূতি কিংবা সিদ্ধান্ত।”

 রাজমাতা তাজ্জব হয়ে গেলেন। রানির কণ্ঠের কোথায় একবিন্দু দ্বিধা নেই, ভেঙে পড়ার লেশমাত্র নেই। নতুন করে উজ্জীবিত হয়েছে যেন তার শক্তিরা। 
 “রাজমাতা প্রাচী, এই ব্রহ্মাণ্ডে রাজনীতি ও কূটনীতিতে আমায় হারাতে পারে এমন কেউ এই যাবতকালে জন্মায়নি। আপনি আমায় সুরসুন্দরী মতো ভেবেছিলেন? আবেগের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিজেকে সাথে চারপাশের প্রাণগুলোকেও ধ্বংস করে দিবো! এতই দুর্বল মনে করেছিলেন আমায়? আপনার জন্য তবে দুঃসংবাদ শুনে রাখুন, এই ধরায় এমন কোনো মানবের জন্ম হয়নি যে আমায় আমায় দুর্বল করতে পারে।”

 “রানি কামিনীকাঞ্চন, আমার এই কথাগুলো তুমি ভরসা করো। আমি একটি কথাও মিথ্যে বলিনি। দোষী কেবল তো আমি নই। হ্যাঁ, আমি চেয়েছিলাম তোমায় নিঃস্ব করে ফেলতে। নিজের পুত্রকেও তাই আমি সঁপে দিয়েছিলাম সে খেলাতে। কিন্তু নির্বোধ সন্তান আমার, তোমার প্রেমে অন্ধ হয়ে আমার বিশ্বাসভঙ্গ করতে চেয়েছিলো। কী লাভ হলো? কী লাভ হলো এতে? আমি কি ছেড়েছি ওকে? ছেড়েছি ওর প্রাণকে? আমার সাথে ছল? আমার চেয়ে অন্য নারী ওর কাছে বড়ো হলো? কুপুত্র ও।”
 প্রথমদিকে রাজমাতার কণ্ঠটা সরল থাকলেই শেষ বাক্যগুলোতে তিনি তীব্র উত্তেজিত হয়ে গেলেন। নিজের মৃত পুত্রের প্রতি রাগে অন্ধ হয়ে গিয়েছেন। 

 নেহাৎ এই প্রসঙ্গটি রানি কামিনীকাঞ্চনের অজানা ছিলো বলেই তিনি চমকে উঠলেন। গগণ বক্ষ চিরে একখণ্ড বজ্রপাত যেমন করে নৃত্য করে ধরণীতে, তেমন তীব্র নৃত্য হলো রানির বক্ষে। তিনি অস্ফুটস্বরে প্রশ্ন ছুঁড়লেন, “রাজা হ্যাভেনের প্রাণ তবে আপনিই বধ করেছেন!”

  “তা নয়তো কী? বলেছিলাম ছল করতে। তোমার সখীর সঙ্গে মিলে তোমায় প্রতারিত করতে। সে করল না। উল্টো হেমলক পিয়ার্সের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে তোমায় দেখতে পেয়ে সে সমস্ত কিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলো। ওর জন্য গোটা জীবন আমি পরিশ্রম করলাম। ওকে রাজাসন দিবো বিধায় জ্যেষ্ঠ্য পুত্র হিসেবে পরিচয় করালাম। আর ও? তোমার প্রেমে নাকি অন্ধ হলো! তাই শেষমেশ আমার বাধ্য হতেই হলো। সুরসুন্দরীর কন্যার প্রণয়ে জাত, কূল হারিয়ে ফেলার চেয়ে ওর মৃত্যু ভালো। সুরসুন্দরীর মেয়ের জন্য কি-না এত দরদ? এত! নির্বোধ, মূর্খ পুত্র। ওরচে হেমলক পিয়ার্স ভালো। অন্তত নিজের মাতার জন্য দীর্ঘ জীবনের ছকতো কষেছিলো!”

 রাজমাতা বুদ্ধিমতী নারী। তিনি জানেন রানি কামিনীকাঞ্চনের কোথায় আঘাত করলে তলোয়ার মুষ্টিবদ্ধ করে রাখা হাত দুর্বল হয়ে যাবে। দুর্বল হযে যাবে উত্তপ্ত তেজ। উনি করলেনও তাই। 
 রাজমাতার অগোচরেই রানি যেন মৃদু কাঁপলেন। তলোয়ার ঢিলে করে ফেললেন আলগোছেই। 

  রাজমাতা কুটিল হাসলেন। তার ক্ষত-বিক্ষত হাতটি দিয়ে রানির গলা চেপে ধরলেন আচমকা। হিংস্র পশুর ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন। যার ফল স্বরূপ রানির হাতের তলোয়ারটি তীব্র শব্দে নিচে পড়ে গেলো। 
 “আমায় শাস্তি ধার্য করার আগে তোমার প্রাণই কেঁড়ে নিবো আমি। অপেক্ষা করো, রানি।”
 বলে আরও শক্তিশালী ভাবে রাজমাতা চেপে ধরলেন রানির কণ্ঠ।

রানি সর্বপ্রথম ডান হাতটি নিজের পেটে রাখলেন, বাম হাতটি দিয়ে রাজমাতার কনুই ধরে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করলেন। 
 রাজমাতা নিজের গায়ের সর্বোচ্চ জোর দিয়ে যেন চেপে ধরেছেন রানিকে। রানির শ্বাস আটকে যাওয়ার উপক্রম। রানি সেই অবস্থায় নিজেকে ধাতস্থ করলেন। ধস্তাধস্তির পর্যায়ে তার দু'টো হাত দিয়ে ছাড়িয়ে নিলেন নিজের গলাটি। এরপর হাত মুচড়ে ধরলেন রাজমাতার। রানির গলা রাজমাতার র ক্তে মাখামাখি হয়ে গিয়েছে। হাত এতটা প্রবল ভাবে মুচড়ে ধরলেন রানি যে রাজমাতা টিকতে না পেরে চিৎকার করে উঠলেন। তার ভয়ঙ্কর চিৎকারের পর উন্মুক্ত দোরটি দিয়ে দ্রুত প্রবেশ করলেন মন্ত্রী ত্রিপাদ কুমার, এরপরই এলো হেমলক। ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল রানির বাহু। বিচলিত কণ্ঠে বলল, “তুমি ঠিক আছোতো? ঠিক আছো?”

  রাজমাতাকে আটকে ধরলেন ত্রিপাদ কুমার। বাহির থেকে হাঁক ছেড়ে সে কয়েকজন দেহরক্ষীকে ডেকে এনে তাদের নিকট হস্তান্তর করল রাজমাতাকে। 
 রাজমাতা তখন কূটনীতির শেষ চালটি দিলেন,
 “আমায় শাস্তি দেওয়ার আগে তোমার নৈতিকতা নিশ্চিত করো, রানি কামিনীকাঞ্চন। নিজের স্বামীর থেকে প্রতারিত হওয়ার পরও যদি তাকে শাস্তি দেবার আবশ্যকীয়তা অনুভব না করো তবে ধরে নেবো তোমার নৈতিকতার পাঠ সব মিথ্যে। তুমিও প্রেমের কাছে অসহায়। তোমার মাতারই মতো। তোমার নীতি ঠিক থাকলে, আমায় তুমি শাস্তি দিতে পারো না। কখনোই না।”

 রানি জ্বলন্ত চোখে দেহরক্ষীদের দিকে তাকিয়ে হুকুম ছুঁড়লেন, “কারাগারে নিক্ষেপ করো উনাকে। দ্রুত।”

  “রানি, তোমার নীতি সব ভুল তবে? তুমিও তোমার মাতার মতো। মাতার মতো।”

“আমি আমার মাতার মতো নই, নই, নই। আমি রানি কামিনীকাঞ্চন। আমি কারো মতো নই। আমাকে কোনো বন্ধনই অনৈতিকতা করতে বাধ্য করবে না কোনোদিন। আমি কাউকেই ছাড়ি না, ছাড়ব না।” হেমলকের হাতটি বাহু থেকে আলগোছে সরাতে সরাতে হুঙ্কার করে বললেন রানি।

  রাজমাতা হেমলক ও রানিকে একবার পরখ করে কুটিল হাসলেন। হয়ত তিনি শাস্তি পাবেন, মৃত্যুদণ্ডও পেতে পারেন কিন্তু তিনি যেই শেষ অস্ত্রটি নিক্ষেপ করে দিয়ে গিয়েছেন এতে তিনি হাসতে হাসতে মৃত্যুবরণ করলেও রানির আর কোনোদিন সুখ মিলবে না। কোনোদিন নয়। এইবার ছলেও জয় তারই হলো। রানি কামিনীকাঞ্চন অব্দি হেরে গেলেন এবারও।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp