পবনপত্র - পর্ব ২৮ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
নভেম্বর, ১৯৯৭ সাল।

নাটোর সদরে বাস ঢোকামাত্রই মৌমিতা খন্দকার একটু সচেতন হয়ে বসলো। তার দৃষ্টি এখনও জানালার বাইরে। সড়কের পাশে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি গাছপালা পেছনে ফেলে বাসটা ছুটে চলেছে। মেয়েটার মুখের উপর এসে পড়েছে শেষ বিকেলের সোনালি রোদ। চুলগুলোও উড়ছে মুখের উপর। বিরক্তি না এলেও সে চোখজোড়া বন্ধ করে। জানালার কাচটা অল্প সরানো, এতোটুকুতেই বাতাস আসছে খুব বেশি।

পাশে বসে থাকা অপরিচিত ভদ্রমহিলা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আপাতত এটাই মৌমিতার চিন্তার কারণ। তাকে সঠিক সময়ে জাগিয়ে তুলতে হবে, নাহলে বাস থেকে তাড়াতাড়ি নামা সম্ভব হবে না।
এসব ছোটখাটো বিষয়েই দুশ্চিন্তা করতে অভ্যস্ত মেয়েটা। তবে ভদ্রমহিলা তাকে অস্বস্তিতে ফেললেন না। বাস থামার কিছুক্ষণ আগেই ঝাঁকুনি খেয়ে তিনি জেগে উঠলেন।

বাস থামলো।
মৌমিতা কোলের উপর থাকা ব্যাগটা চেপে চারপাশে তাকায়। পুরুষ মানুষের সংখ্যা বেশি। একটু কৌশল করে বের হতে হবে। এখানে সুযোগসন্ধানী লোকের সংখ্যা কম নয়।

মারুফ খন্দকার দরজার সামনে পায়চারি করছেন আর ঘনঘন উঠোনের দরজাটার দিকে তাকাচ্ছেন। রাবেয়া খাতুন একসময় ধৈর্য হারালেন, ব্যস্ত হয়ে বললেন, “আপনি বসেন তো। কতোক্ষণ থেকে হাঁটাহাঁটি করছেন। পা ব্যথা হয়ে যাবে।”

মারুফ দরজার বাইরে তাকিয়েই ভ্রু কুঁচকে বললেন, “হোক!”

“আহা! অসুস্থ হয়ে যাবেন তো। এমনিতেও আপনার মাথা ব্যথা করে প্রতিদিন। একটু সাবধানে থাকবেন না?” রাবেয়া গম্ভীর হলেন, “মেয়েদুটো এখনও নিজের পায়ে দাঁড়ায়নি। বিয়েও হয়নি।”

মারুফ হাঁটাহাঁটি বন্ধ করে একদৃষ্টে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বাড়ির মূল দরজাটা একটু সরে গেলো। মেয়েটা ভেতরে ঢুকলো, পরনে কালো সালোয়ার কামিজ। কালো ওড়নায় মাথাসহ মুখটাও ঢেকে গেছে খানিকটা। সে ক্লান্ত ভঙ্গিতে ব্যাগটা ঘাড়ে ঝুলিয়ে পুনরায় দরজা লাগিয়ে দেয়। বাড়ির দিকে এগিয়ে আসতে আসতে তার মুখ থেকে সমস্ত ক্লান্তির ছাপ মিলিয়ে যায়। সে বারান্দার কাছাকাছি এসে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে ওঠে, “আসসালামু আলাইকুম।”

রাবেয়া কাছে এসে স্বভাবসুলভভাবে মেয়েটার মুখে-মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “ইশ, আমার মেয়েটা কতো শুকিয়ে গেছে!”

মৌমিতা প্রতিবাদ করলো না, মলিন মুখেই মিষ্টি হাসলো। মেয়ের অমনোযোগিতার সুযোগ নিয়ে রাবেয়া তার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে সরে দাঁড়ালেন, “হাত-মুখ ধোও, যাও।”

মৌমিতা মারুফের দিকে এগিয়ে যায়, “আব্বাও তো অনেক শুকিয়ে গেছেন।”

“শুকাবে না? অযথা চিন্তা করে সারাদিন। কয়েকদিন হলো আবার মাথাব্যথাও শুরু হয়েছে...”

মারুফ একটু বিরক্ত হলেন। মেয়েটা এতোদিন পর বাড়িতে ফিরলো, ঠিকমতো ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই এসব দুশ্চিন্তার খবর দেয়ার কোনো দরকার আছে?
এখন তেমন গরম নেই। মারুফের পরনে পাতলা স্যান্ডো গেঞ্জি। তবু তিরতির করে ঘামছেন তিনি। মৌমিতা খানিকক্ষণ কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইলো, তার কণ্ঠে কিছুটা উদ্বেগ ঝরে পড়লো, “এতো চিন্তা করে কী হবে, আব্বা? এমনি এমনি শুধু শরীরটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।”

মারুফ সাহেব বিগলিত হাসলেন। ঘর্মাক্ত হাতেই কপাল মুছে বললেন, “আসার সময় কোনো অসুবিধা হয়নি তো?”

“না। ভালোমতোই এসেছি। তবে এদিকে এসে বাসটা খুব ঝাঁকুনি দিয়েছে।”

“ট্রেনে যাতায়াত করাই ভালো। গতকাল একটা বাস অ্যাক্সিডেন্ট করেছে দেখলাম।”

মৌমিতা মাথা দোলায়, যদিও খবরটা সে জানতো না। রাবেয়া তাড়া দিলেন, “যাও যাও, কাপড় বদলাও তাড়াতাড়ি। একটু খাওয়া-দাওয়া করো। ওখানে যে কী খাওয়ায়, আল্লাহই জানেন।”

—————

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা।
মৌমিতা রান্নাঘরে ঢুকলো। করার মতো কোনো কাজ খুঁজে না পেয়ে সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। রাবেয়া শুরুতে তাকে সেভাবে খেয়াল করলেন না। পরে তার দিকে চোখ পড়তেই তিনি প্রায় আঁতকে উঠলেন, “ওমা! চুল ভেজা কেন মৌ? এই অবেলায় গোসল করেছো?”

মৌমিতা অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়ে, “হুম।”

“বাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই অনিয়ম শুরু।” তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে চোখ সরু করলেন, “ওখানেও এমন অনিয়ম করো নাকি?”

“আমার কোনো অসুবিধা হয় না। অভ্যেস হয়ে গেছে।”

“বাপের মতোন বদঅভ্যাস তোমার।”

পেছনে এসে দাঁড়ায় মৌমিতা, আম্মার কাঁধের উপর দিয়ে উঁকি দেয়, “কোনো সাহায্য লাগবে, আম্মা? কিছু করতে হবে?”

“উঁহু। তুমি তোমার আব্বার কাছে যাও তো। টেলিফোনে তো কিছুই বলতে চাও না। এখন গিয়ে বলো। ওখানকার পড়া শেষ, তারপরে কী করতে চাও, মাস্টার্স কোথায় করবা—গিয়ে দেখো, তোমার আব্বা প্রশ্নের ঝুড়ি নিয়ে বসে আছে।”

মৌমিতার ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসির রেখা দেখা দিলো, একটু রাগ করে হলেও সে স্নেহের সুরে বললো, “নিজের জন্যে এমন চিন্তা করলে দুইদিন পরপর অসুস্থ হতে হতো না।”

রাবেয়া মাথা নাড়লেন, “এখন গিয়ে একটু কথা বলো। চিন্তাটা কমিয়ে উদ্ধার করো!”

মৌমিতা তৎক্ষণাৎ চলে গেলো না। চুলোয় দাউদাউ করতে থাকা আগুনের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। এলোমেলো কিছু ভাবনা হয়তো উঁকি দিলো মাথায়।
দীর্ঘদিন পর বাড়িতে ফিরলেই তার স্বাভাবিক হতে সময় লাগে। এখানকার সবকিছু কতো আপন, তবু যেন নতুন করে মানিয়ে নিতে হয়। তাছাড়াও একটা বিষয় ভাবলে তার ভেতরটা খচখচ করতে থাকে। বছর কয়েক আগে সেই যে বাড়ি ছেড়ে যেতে হলো উচ্চশিক্ষার জন্য, এরপর আর কখনও ভালোভাবে ফেরা হয়নি। সেটা ভবিষ্যতেও আর হবে না। এটা তার বাড়ি থাকবে না। নতুন কোনো ঠিকানায় ঠাঁই হবে তার। নিজের সবচেয়ে কাছের, সবচেয়ে পরিচিত এই ছাদের নিচে আর কখনোই ভালোভাবে ফেরা হবে না।

মৌমিতা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে। তাকে দেখতেই মারুফ পত্রিকাটা ভাঁজ করতে লাগলেন, যেন মেয়ের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন।
সামনের সোফাটায় বসলো মৌমিতা, “আপনি কি ওষুধ খাচ্ছেন না ঠিকঠাক?”

মারুফ হেসে হেলান দিয়ে বসলেন, “এই কথা কে বললো? তোমার আম্মা?”

“যে-ই বলুক। কথা ঠিক কিনা, সেটা বলেন।”

“কথা... পুরোপুরি ঠিক না।”

“এই সপ্তাহে একবার ডাক্তার দেখান। আম্মা বললেন, আপনার মাথা অনেক ব্যথা করে। এগুলো নিয়ে হেলাফেলা করলে চলবে না। পরে যদি আরও অসুস্থ হয়ে—”

“আচ্ছা, দেখাবো ডাত্তার।”

মৌমিতা ভ্রু কুঁচকায়। মারুফ সাধারণত খুব ধীরেসুস্থে গুছিয়ে কথা বলেন। তার হঠাৎ ডাক্তারকে ‘ডাত্তার’ উচ্চারণ করায় মেয়েটা বিচলিত হলো। সে একধরনের উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কী বললেন? কাকে দেখাবেন?”

মেয়ের অবদমিত আশঙ্কা মারুফ টের পেলেন। তার মুখের মাংসপেশি দৃঢ় হলো সামান্য, একটু সময় নিয়ে তিনি সতর্কভাবে বললেন, “ডাক্তার দেখাবো।”

“আচ্ছা।” মৌমিতা মাথা দোলায়, তবে কপালের ভাঁজ সোজা হয় না। বলার মতো আর কিছু খুঁজেও পায় না। সে নিজেকে প্রশ্ন করে, অনর্থক বেশিই দুশ্চিন্তা করা হয়ে যাচ্ছে না তো?

বারান্দা থেকে জহির মিঞা ডেকে উঠলেন, “মারুফ? আছো নাকি?”

মৌমিতা তাড়াহুড়ো করে মাথায় ওড়না টেনে নেয়, সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। জহিরকে দেখতেই সালাম দিয়ে সোফার দিকে ইশারা করে, “চাচা বসেন।”

জহির এগিয়ে এলেন, সোফায় বসতে বসতে বলে উঠলেন, “তুমি কবে এসেছো, মা?”

“আজকেই। বিকালের দিকে।”

“পড়া তো শেষ হলো। এবার কী পরিকল্পনা?”

মৌমিতা দৃষ্টি নামিয়ে মেঝের দিকে তাকায়, সুতি ওড়নাটা কপালের উপর টেনে নেয়, “পড়া এখনও শেষ হয়নি। আমি মাস্টার্স করবো। পাশাপাশি চাকরির জন্যেও পড়ছি।”

“ওহ। ছোটটার কী খবর যেন?”

“ঢাকায়। আইন নিয়ে পড়ছে।”

জহির মারুফের দিকে তাকালেন, “ওখানেই আছে? আরেকবার না পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিলো, অন্য কোথাও সরাও নাই? এতো দূরে থাকতে অসুবিধা হবে না?”

মারুফ ডানে-বামে মাথা নাড়লেন, “না, অসুবিধা হয়নি এখনও। ভালোই আছে। ওর ইচ্ছা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। তাই ওখানেই রাখলাম।”

মৌমিতা একবার মারুফ, একবার জহিরের মুখের দিকে দেখে। দু'জন হঠাৎ এমন চুপ হয়ে গেলেন কেন, সে বুঝতে পারলো না। এখন হয়তো এখান থেকে চলে গেলেই ভালো হবে। মেয়েটা এক পা পিছিয়ে যেতেই জহির মিঞার পরবর্তী কথাটা তার কানে আসে, “তাহলে... আমি কি পাত্র দেখতে শুরু করবো?”

অপ্রস্তুত মৌমিতা আব্বার দিকে তাকায়। মারুফ বেশ শান্তভাবে সম্মতি জানিয়ে মাথা দোলালেন। মেয়েটা এবার যেন আকাশ থেকে পড়লো। পাত্র কি তার জন্যই দেখা হবে? সে তো স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে, পড়া এখনও বাকি। চাকরির জন্যেও আলাদা করে পড়তে হবে। এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসে বিয়ের আলাপ কেন? জহির চাচা প্রশ্ন করতেই পারেন নাহয়। কিন্তু মৌমিতাকে সবচেয়ে অবাক করেছে মারুফের প্রতিক্রিয়া। তার কাছে সবটা অবিশ্বাস্য মনে হলো। মনে হলো, আব্বা বুঝি ভুল করেই অনুমতি দিলেন!
সে ক্ষীণ স্বরে বলে, “আব্বা?”

মারুফ তার দিকে তাকালেন, “তোমার কোনো আপত্তি আছে?”

“কিন্তু... আমি তো...”

“কোনো পছন্দ আছে? থাকলে বলতে পারো।”

মৌমিতা আঁটসাট হয়ে দাঁড়ালো, মাথা নিচু করেও দৃঢ় স্বরে বললো, “আমি এখন বিয়ে করবো না।”

সোফা থেকে ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়ালেন মারুফ। জহিরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আবার পরে কথা বলি জহির ভাই। এখন থাক।”

জহির মিঞা চলে যাওয়ার পরেও খন্দকার সাহেব আর তার মেয়ে একটা অস্বস্তিকর নীরবতার মাঝে পড়ে রইলেন। মেয়েটার শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে মারুফ গলা খাঁকারি দিলেন, “আমার শরীরটা ভালো না মা। কখন কী হয়ে যাবে, কোনো ঠিক নেই। তোমাদের মাথার উপর কোনো অভিভাবক থাকলে আমি একটু নিশ্চিন্ত হতাম—”

অভিমানে মৌমিতার কণ্ঠ একটু কর্কশ শোনায়, “সেজন্য বিয়ে! নিজের খেয়াল তো রাখতে পারেন না। আমাকে বিয়ে দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে?”

মারুফ শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন, কোনো উত্তর দিলেন না। তার অভিব্যক্তি দেখে বোঝার উপায় নেই, তিনি আদতে কী ভাবছেন। মেয়েটা কোনো প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করতে পারলো না। সে সোফাটার পাশ ঘেঁষে এগিয়ে আসে, তুলনামূলক কোমল স্বরে বলে, “আমাকে একটু সময় দেন আব্বা। শুধু একটা চাকরি হয়ে যাক। আর কিছু নিয়ে চিন্তা করতে হবে না আপনাকে।”

মারুফের চেহারায় কোনো পরিবর্তন দেখা গেলো না। তিনি ভেতরে ভেতরে অনেকগুলো কথা সাজিয়ে নিলেন। কিন্তু মেয়ের মুখের দিকে তাকাতেই সেগুলো বলতে ভীষণ ক্লান্তি বোধ করলেন। তিনি কেবল দুটো শব্দ উচ্চারণ করতে পারলেন, “সময় নেই।”

তারপর আর কিছু বললেন না, কিছু শুনলেন না। চুপচাপ নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। মৌমিতা চরম বিস্ময় নিয়েও সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। ফুসফুস থেকে একটা কাঁপা কাঁপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। আব্বা চোখের আড়াল হতেই সে-ও পাশের ঘরটার দিকে পা বাড়ালো।

—————

ভোর হয়ে গেছে। বাইরে আবছা অন্ধকার এখনও।

জায়নামাজ ভাঁজ করে চেয়ারের উপর তুলে রাখলো মৌমিতা। সুইচ চেপে ফ্যানটা বন্ধ করলো। এমনিতেই বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা একটা পরিবেশ। সে গুটি গুটি পায়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। অন্ধকারের পাশাপাশি বেশ কুয়াশাও পড়েছে। উঠোনে একটু পানি জমেছে। বৃষ্টি হয়েছিলো নাকি গতরাতে? শন শন করে শীতল বাতাস বয়ে চলেছে এখনও।
মেয়েটা সাবধানে দরজা খুলে বারান্দা থেকে নেমে পড়ে। ধীরে ধীরে পা ফেলে এগিয়ে যায় বাড়ির পেছনের এলাকার দিকে।

আকাশটা বেশ আলোকিত দেখাচ্ছে এখন। সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। রোদ নেই, একটা সুষম উজ্জ্বলতা চারিদিকে।
গায়ের চাদরটা আরেকটু ভালো করে জড়িয়ে নিলো মৌমিতা। বেশ শীত শীত লাগছে। সে পুকুরের সামনের সরু কাঁচা রাস্তাটাতে গিয়ে দাঁড়ায়। পুকুরের পানি শুকিয়ে অনেক কমে গেছে। কিনারা জুড়ে ঘাস গজিয়েছে। হাওয়ায় দুলছে সেগুলো। মেয়েটা দীর্ঘ এক প্রশ্বাস টেনে শূন্যে তাকিয়ে রইলো।

এই বসতভিটে ছেড়ে কোনোদিন চলে যেতে হবে—এই তিক্ত ভাবনাটা হুট করেই মাথায় উঁকি দিলো। গায়ের চারপাশে দুই বাহু জড়িয়ে নিজের এলোমেলো চিন্তাগুলোকে একত্র করার চেষ্টা করলো সে। খুব একটা সফল হলো না। সে পিছিয়ে এসে জমির আল ধরে হেঁটে গেলো কিছুদূর। পূর্ব আকাশটা হলদেটে দেখাচ্ছে। নরম একটা রোদ পড়েছে চারপাশে।
উদ্দেশ্যহীনের মতো অনেকক্ষণ পায়চারি করার পর মৌমিতা আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে। আশেপাশে তাকাতেই দেখে, মারুফ এদিকেই আসছেন।
তিনি কিছুদিন যাবৎ সকালে উঠে হাঁটাহাঁটি করছেন, এটা মৌমিতা আম্মার কাছে শুনেছে। অভ্যেসটা ভালো, তবে মারুফ তা কতোদিন চালিয়ে যেতে পারবেন, সেটাই দেখার বিষয়। সাধারণত তিনি সকালে উঠেই অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মোটেও স্বাস্থ্যসচেতন নন।

মৌমিতা হাসিমুখে আব্বার দিকে এগিয়ে যায়, “আব্বা, কখন উঠলেন?”

মারুফ হাত দুটো পেছনে গুটিয়ে রেখেছেন। চিন্তামগ্ন হয়ে হাঁটছিলেন। মেয়ের সরল প্রশ্নে তার ধ্যান ভাঙে, “এই তো, ফজরেই।”

“ওহ। খেয়েছেন কিছু? খালি পেটে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না।”

মারুফ বিস্তৃত ফসলের মাঠে চোখ বুলিয়ে নিলেন। মেয়েটার জিজ্ঞাসা একপ্রকার উপেক্ষা বলে বললেন, “এখন কি চাকরির চেষ্টা করবে মা?”

মৌমিতার চেহারায় এবার একটু গম্ভীরতা দেখা দিলো। সে একপ্রকার কৈফিয়ত দিতে শুরু করলো, “চাকরির চেষ্টা তো করবো। আর মাস্টার্সও করবো, বললাম তো। ঢাকায় যাবো মাস্টার্সের জন্য। মার্জুও আছে ওখানে। ওর জন্যেও ভালো হবে। তাই না?”

মারুফ মাথা দোলালেন। দ্বিধা নিয়ে বললেন, “দেখো মা, বিয়েটা হয়ে গেলে ভালো হয়। যারা তোমাকে পড়তে দিবে, কোনো আপত্তি করবে না, এমন পরিবারেই কথা বলবো। আমিও তো চাই, তোমার পড়ায় কোনো সমস্যা না হোক। বিয়েটা হয়ে যাক, সংসারে সময় দিতে হবে না। শুধু একটা অভিভাবক থাকুক মাথার উপর।”

আব্বার সাথে সাধারণত এতো দীর্ঘ আলাপ হয় না মৌমিতার, তাও আবার এতো ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নিয়ে। হয়তো এই কারণেই সে বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনলো কথাগুলো। তারপর শান্ত ভঙ্গিতে নিজের মতামতটুকু জানালো, “আপনি তো আছেন। আপনি থাকতে আমার অন্য অভিভাবক লাগবে কেন?”

“আমার শরীরটা ভালো না মৌ মা। আমি তো থেকেও কিছু করতে পারছি না। এখন তোমার পাশে একটা মানুষের প্রয়োজন, যার সামর্থ্য আছে। তাছাড়া আমি কি আর সবসময় থাকবো?”

“ওসব চিন্তা করবেন না তো। শরীরটা একটু খারাপ হলেই আপনি আজগুবি চিন্তা করা শুরু করেন। নিজের স্বাস্থ্যের একটু খেয়াল রাখেন; তারপর দেখেন, সব অসুখ পালিয়ে যাবে, আর দুশ্চিন্তাও।”

মারুফ আশাহত হলেন। মেয়েটাকে কীভাবে বোঝাবেন? বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা যে তার নিজেরও খুব একটা নেই। এতো আদরের সন্তান পর হয়ে যাবে, তার প্রায় সম্পূর্ণ অধিকার পেয়ে যাবে অন্য কেউ। নিজ হাতে তিলে তিলে গড়ে তোলা প্রাণাধিক প্রিয় মানুষটাকে অন্যকারও হাতে তুলে দিতে হবে। তারপর মেয়েটা সুখী হবে কিনা—সেটাও ছেড়ে দিতে হবে ভাগ্যের হাতে। আপাতদৃষ্টিতে ‘শুভ’ এই কাজটি নিয়ে মারুফ মোটেও তাড়াহুড়ো করতে চান না। কিন্তু পরে যদি সময় না থাকে?
মার্জিয়াকে নিয়েও তার খুব চিন্তা হয়। আপাতত তিনি বড় মেয়েটার দিকে মনোযোগ দিতে চান। নিজে খুঁজে বের করতে চান একজন যোগ্য মানুষকে, যার কাছে মেয়েটার দায়িত্ব দিলে আর কোনো দুশ্চিন্তা থাকবে না।

মারুফ ডান হাতে কপাল চেপে ধরলেন। মাথায় আবার যন্ত্রণা হচ্ছে। মৌমিতা কাছে এসে দাঁড়ালো, উদ্বিগ্ন হয়ে বললো, “আব্বা? মাথা ব্যথা করছে?”

উত্তরের জন্য অপেক্ষা করলো না সে। আব্বার দুই কাঁধ দৃঢ়ভাবে ধরে বাড়ির দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলো।

মারুফ খন্দকারের ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে বছর তিনেক আগে। তারপর থেকেই তার শরীরটা খুব দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। শুরুর দিকে তিনি ওষুধ-পথ্য নিয়ে বেশ সচেতন ছিলেন। এখন এসবেও উদাসীনতা দেখাচ্ছেন তিনি। যেন একেবারেই হাল ছেড়ে দিয়েছেন। তবে একটা বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা বন্ধ করেননি—তার মেয়েদুটো ভালো থাকলেই হলো!

—————

দুপুর প্রায় দেড়টা বেজে গেছে।
খাওয়া শেষ হতেই মারুফ সোজা ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছেন। দোকানে ইদানিং দেরি করেই যান তিনি। ওসমানের পাশাপাশি আরেকটা ছেলে নিয়েছেন সেখানে। নতুন ছেলেটার নাম শফিকুল। সে বেচাকেনায় বেশ পটু, তবে তেমন বিশ্বস্ত নয়। এখন ওসমানের কাজই হলো শফিকুলের উপরে নজর রাখা।

মারুফ বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে ছিলেন। মাথার উপরে ধীরগতিতে ঘুরতে থাকা ফ্যানের দিকে চেয়ে কিছু ভাবছিলেন তিনি, তখনই রাবেয়া ঘরে এলেন। আঁচলে হাত মুছে ব্যস্তভাবে বললেন, “ওষুধ খেয়েছেন?”

পা দুলিয়ে খুব সহজভাবে উত্তর দিলেন মারুফ, “না।”

“ইশ! খাওয়ার পর কতোক্ষণ হয়ে গেলো, খেয়াল আছে?”

রাবেয়া জগ থেকে পানি ঢাললেন। ওষুধ খুঁজতে গিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললেন, “আপনার প্রেশারের ওষুধ কোথায়? শেষ নাকি?”

“হ্যাঁ!”

এবার রাবেয়া বিরক্ত হলেন। ঘর থেকে বেরিয়ে টেলিফোনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
মৌমিতা এতোক্ষণ রান্নাঘরে ছিলো। কাজ শেষে দরজায় এসে দাঁড়াতেই মায়ের বিরক্তিমাখা মুখটা চোখে পড়লো। সে এগিয়ে এলো, “কী হয়েছে?”

“তোমার আব্বার ওষুধ শেষ। কাউকেই কিছু বলেনি। ওসমান তো ফোন ধরছে না। এখন এই ভরদুপুরে—”

“আমি যাই আম্মা।”

বাইরে যাওয়ার কোনো আগ্রহ নেই মৌমিতার। কিন্তু এই মুহূর্তে অন্য একটা জেদ তার মাথায় চেপেছে। মেয়েটা প্রমাণ করতে চায়, সে দায়িত্ব নিতে পারে। এবং আপাতত কোনো অতিরিক্ত পুরুষ সদস্যের প্রয়োজন নেই পরিবারে। ওসব তথাকথিত অভিভাবকের কোনো দরকার নেই।

তাড়াহুড়ো করে কাপড় বদলে মেয়েটা বাইরে বেরিয়ে এলো। রিকশা নেই। তবে মোড় পর্যন্ত হেঁটে আসতে আজ খারাপ লাগলো না। ফার্মেসিগুলো বাড়ি থেকে একটু দূরেই, মূল শহরের দিকে।

বয়স্ক রিকশাচালক প্যাডেল ঘোরাচ্ছেন ধীর গতিতে। এই রাস্তায় রেলস্টেশন। মৌমিতা তুলে রাখা হুটের বাইরে উঁকি দেয়।
আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছে জায়গাটা। বাহ্যিক চাকচিক্য বেড়েছে, উন্নতি হয়েছে। ভিড় বেড়েছে, কোলাহলও বেড়ে গেছে।

মৌমিতা আবার ভালোভাবে হেলান দিয়ে বসলো রিকশায়। রেলস্টেশনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিবারই তার বাদলের কথা মনে পড়ে। এই জায়গাটা খুব পছন্দ ছিলো ওর। সময়ের সাথে সাথে সেই পছন্দ আর অপছন্দের মাঝামাঝি সূক্ষ্ম ব্যবধানটা অনেকটাই ঝাপসা হয়ে গেছে। বাহ্যিকভাবে বেশ দ্রুত বড় হয়েছে সে, ভেতরের দিক থেকে বড় হচ্ছে মন্থরগতিতে।
এই তো, বছর দুয়েক আগেও স্টেশনের পাশের ঐ চায়ের দোকানে দেখা হয়েছিলো। বাদল সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলো, “আচ্ছা, আপনি কি রান্না করতে পারেন?”

“পারবো না কেন?”

“আজকাল দেখি অনেক মেয়েরাই রান্না পারে না। শিখতেও চায় না।”

“মেয়েরা কখনো না কখনো ঠিকই শিখে ফেলে। কিন্তু বেশিরভাগ ছেলেরাই রান্না শেখে না।”

“ছেলে মানুষ রান্না শিখে কী করবে? ওটা মেয়েদের কাজ।”

“তুমি কি ছোটবেলা থেকেই নারীবিদ্বেষী?”

“দিলেন তো একটা অপবাদ! সত্যি কথাই তো বললাম, বিদ্বেষ ছড়ালাম কখন?”

ঐ সময় এই কথাগুলো শুনে মৌমিতা বেশ রেগেই গিয়েছিলো। এখন মনে পড়লে হাসি পায়।
ছেলেটার মধ্যে একটা ভাঙাচোরা পুরুষালি অহংকার আছে। বর্তমানেও তা আছে কিনা, কে জানে! আগের মতো আর ঠাস ঠাস করে তো কথা বলে না, ভালোই মেপে মেপে কথা বলে। সে যে বড় হয়ে গেছে—এটাই প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করে সর্বদা। তবু তাকে বড় মনে হয় না। এখনও সে অস্থির, চঞ্চল একটা মানুষ, ঝড়ের মতো। যাকে হারিয়ে ফেলার ভয় হয়। আঁকড়ে ধরতেও দ্বিধা কাজ করে। তবু আগলে রাখার ইচ্ছেটাও থেকে যায়।

মানুষের জীবন আর কয়দিনের? ছেলেটা অল্প অল্প করেই বাড়ুক। ছেলেমানুষি থেকে যাক নাহয় একটু আধটু। মৌমিতা চায় না বাদল বদলে যাক। যেমন আছে, তেমনই থাকুক। তবে বাদলের চাওয়াটা সে জানতে পারেনি এখনও।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp