আছিয়া হসপিটালের ঝকঝকে সাদা লাইটের নিচে গুটিসুটি মেরে বসে আছেন। তিনি আপাদমস্তক খাস পর্দা মেনে চলা এক সম্ভ্রান্ত নারী। পুরো শরীর ঢাকা কুচকুচে কালো রঙের বোরকায়। মাথার ওপর থেকে ঝুলে পড়া বড় নিকাব আর টেনে দেওয়া নেকাবের কারণে মুখের কোনো অংশই বাইরে থেকে দেখার উপায় নেই। শুধু চোখের জালিটার ওপাশ থেকে দুটো বিষণ্ণ চোখ অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দুই হাতে পরা কালো সুতি কাপড়ের হাতমোজা, পায়েও ঠিক একই রঙের মোজা জড়ানো।
দীর্ঘ বছরের বৈবাহিক জীবনে আলাউদ্দিনের মতো ফেরাউন ওনার শরীরের ওপর হাজারো পাশবিক অত্যাচার চালালেও, ওনার পর্দার আব্রু আর ভেতরের পবিত্রতাটুকু কোনোদিন কেড়ে নিতে পারেনি।
কারো অস্থির পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে৷ কেউ আসছে। নিশ্চয়ই রুমেল! ওর কক্সবাজার থেকে আজই জরুরি ফ্লাইটে হাসপাতালে আসার কথা।
মধ্যরাতে আলাউদ্দিনকে হাসপাতালে আনার পর তার অবস্থা দেখে ইমার্জেন্সির ডাক্তাররা আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেনি। তারা দ্রুত তাকে আইসিইউ-তে নিয়ে লাইফ সাপোর্টে ঢুকিয়ে দেয় এবং রক্তের কিছু পরীক্ষা করতে বলে। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর জানা যায়, এক ভয়ংকর ব্যাকটেরিয়ার বিষাক্ত ইনফেকশন আলাউদ্দিনের পুরো রক্তে ছড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় সেপসিস। আর এই রক্তের বিষক্রিয়া থেকেই মূলত তার শরীরে পচন ধরেছে, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
তবে ডাক্তারদের মতে, সেপসিস আসল রোগ নয়, এটা কেবল একটা উপসর্গ। রক্তের মূল রিপোর্টে দেখা গেছে, আলাউদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে এইচআইভি পজিটিভ ছিল। মরণব্যাধি ভাইরাসটি বহু বছর ধরে গোপনে তার শরীরে বাসা বেঁধেছিল। সে কোনোদিন রক্তের পরীক্ষা করায়নি বলে রোগটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, অর্থাৎ এইডস-এ রূপ নিয়েছে। আর এইডসের কারণেই তার শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একদম শূন্যে নেমে গেছে, যার ফলে সামান্য ইনফেকশনেই পুরো শরীরে পচন ধরেছে।
আজ ভোররাতের দিকে আলাউদ্দিনের মগজে একটা বড় ধরণের স্ট্রোকও হয়ে গেছে। এইডসের কারণে ওনার ব্রেইনের স্নায়ুগুলো আগে থেকেই দুর্বল ছিল, ক্ষয়প্রাপ্ত ছিল, তাই স্ট্রোকের ধাক্কাটা একদমই সামলাতে পারেনি।
আছিয়ার বয়স খুব বেশি নয়, এই বিয়াল্লিশ বছর। দেখলে মনে হয় বত্রিশের প্রাপ্তবয়স্ক নারী। বিগত বছরগুলোতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বহুবার তাকে স্বামীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে হয়েছে৷ তিনিও এইডসে আক্রান্ত হয়েছেন কি না তা নিশ্চিত হতে ডাক্তার ওনারও রক্তের টেস্ট করিয়েছেন৷ আর মাত্র কিছুক্ষণ, তারপরই সেই ভাগ্যনির্ধারণী রিপোর্ট ওনাদের হাতে চলে আসবে।
অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, আছিয়ার ভেতরে কোনো রকম অনুভূতিই কাজ করছে না৷ নিজের আসন্ন মৃত্যুর পরোয়ানার কথা ভেবেও ওনার মনে বিন্দুমাত্র ভয় কাজ করছে না, আবার আইসিইউ-তে মরণাপন্ন অবস্থায় শুয়ে থাকা জানোয়ারটার জন্যও ওনার মনে এক ফোঁটা সহানুভূতি বা খারাপ লাগা জাগছে না৷ জাগবে কী করে? এই পিশাচ লোকটাকে তো তিনি কখনো ভালোবাসতেই পারেননি৷ জন্মদাতা বাবার শেষ মৃত মুখটাও অবধি আছিয়াকে দেখতে দেয়নি আলাউদ্দিন! আজ তবে কার জন্য ওনার চোখ দিয়ে জল পড়বে?
আলাউদ্দিনের আকস্মিক অসুস্থতা কাজলীর পরিবারের জন্য স্বস্তি হয়ে ধরা দিল। ঝুনুবিবি আর কাশেম মিয়ার মেরুদণ্ড আলাউদ্দিন, সেই মেরুদণ্ডই হাসপাতালে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। ক্ষমতার খুঁটিটাই যখন আলগা হয়ে গেছে, তখন কি আর ওদের দাপট আগের মতো দেখা যাবে?
হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফেরার পর ঝুনুবিবি কিংবা কাশেম মিয়ার হম্বিতম্বি চোখে পড়েনি কাজলীর। আলাউদ্দিন যদি টপকে যায়, তবে বস্তির সর্দারের গদি, দায়িত্ব কার হাতে উঠবে সেই চিন্তায় ওদের ঘুম হারাম। ক্ষমতা যদি আলাউদ্দিনের বড় ছেলে রুমেলের হাতে যায়, তবে ঝুনুবিবিদের টিকে থাকার কিছুটা হলেও আশা আছে৷ তবে সেই আশাও পুরোপুরি নিষ্কণ্টক নয়। কারণ, রুমেলের সাথে আবার বস্তির অন্য একটা বড় দলের খাতির আছে৷ নিজের গদি পোক্ত করতে রুমেল হয়তো ক্ষমতার ভাগাভাগিতে ওদেরও বস্তির মাতব্বরিতে রেখে দিতে পারে। আর যদি আলাউদ্দিনের ছোট ছেলেটা বাপের মুমূর্ষু অবস্থার খবর পেয়ে লন্ডন থেকে একবার দেশে চলে আসে, তবে সব শেষ! ঝুনুবিবি, কাশেম মিয়া একবারে পথে বসে যাবে।
ছোট ছেলেটা মায়ের নেওটা৷ আছিয়ার মুখের আদেশই ছেলের কাছে শিরধার্য। আর আছিয়া কখনোই ঝুনুবিবি, কাশেমকে পছন্দ করেননি।
ছোটটা বস্তির ক্ষমতা পাওয়া মানে সবার আগে বস্তি থেকে ওদের ঘাড় ধরে উৎখাত করা হবে। তাই আলাউদ্দিনের জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ের সঙ্গে, বস্তির ক্ষমতার মসনদ নিয়েও সংকট লেগে গেছে।
বাড়ি ফিরে কাজলী কারও বারণ শুনল না৷ দুর্বল শরীরটাকে টেনেটুনে ঠিক পরদিনই দুটো টিউশনি সামলাতে চলে গেল। বাকি দুটো টিউশনি হাতছাড়া হয়ে গেছে। অভিভাবকেরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তারা তাদের সন্তানকে কাজলীর মতো মেয়ের কাছে আর পড়াবে না। ওনারা মনে করেন, ওমন মেয়ের কাছে পড়ালে ছেলেমেয়েরা রসাতলে যাবে, নষ্ট হবে! যে মেয়ের সমাজে, দেশে চরিত্র নিয়ে এত এত কুৎসিত আলোচনা-সমালোচনা হলো, সে ওনাদের চোখে এক প্রকার নাপাকই হয়ে গেল! মেয়েটা আসলেই দোষী নাকি নিষ্পাপ সেটা তলিয়ে দেখার ন্যূনতম প্রয়োজনবোধও এই বিচারক সমাজ করেনি।
যে দুটো টিউশনি টিকে গেছে, তার মধ্যে একটির মা-বাবা ফেসবুকের ট্রল নিয়ে কিছুই জানেন না, আর না জানেন ওনাদের থেকে বহু দূরের ঝিলপাড় বস্তির নোংরা কাহিনি। তাই সেই ছাত্রটি রয়ে গেছে। আর চতুর্থ স্টুডেন্টের মা হলেন একজন সংগ্রামী সিঙ্গেল মাদার। তিনি সমাজ আর মানুষের কটু কথা শুনতে শুনতে নিজেই ত্যক্তবিরক্ত। একমাত্র তিনিই কাজলীর ভেতরের আসল সত্য আর কষ্টটাকে নিজের মন দিয়ে বুঝতে পেরেছেন৷ অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজলীকে পড়াতে আসতে দেখে তিনি উল্টো ওকে অনেক বকাবকি করলেন। কোনোভাবেই পড়াতে দিলেন না, বরং জোর করে নিজের বিছানায় শুইয়ে দিলেন৷ এটা-ওটা বানিয়ে খাওয়ানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।
টিউশনি শেষ করে ফেরার পথে মনটা কেমন যেন কু গাইতে শুরু করল কাজলীর৷ এত স্বস্তি ওর সহ্য হবে তো?
পথের বাঁকে হুট করে ইউসুফকে দেখতে পেল। পেছনের দিকে দুহাতে কী যেন একটা ধরে রেখেছে৷ আগেই বলেছি, কাজলীর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বড্ড প্রখর। ও মনে মনে ঠিকই আন্দাজ করে নিল, নিশ্চয়ই ওর জন্মদিন উপলক্ষে কোনো উপহার দিতে এসেছে। কাজলী মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, ও উপহার নেয়া তো দূর, তাকাবেও না।
যেতে যেতে খেয়াল করল, রোজকার ঢিলাঢালা টি-শার্ট রেখে আজ বেশ ফিটিং একটা শার্ট পরে এসেছে ও৷ তাতে ওর চওড়া, সুগঠিত শরীরটা বেশ ভালোই ফুটে উঠেছে। একদম মাকাল ফলের মতো। উপরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট! না, না এতটাও খারাপ না৷ একটু বোকাসোকা বলে মাকাল ফল বলা ঠিক হচ্ছে না৷ কাজলী নিজেই নিজের ভুল শুধরে নিল।
দ্রুত হেঁটে ইউসুফের পাশ কেটে চলে যেতে নিচ্ছিল, ইউসুফ বেশ সাহস সঞ্চয় করে বলে উঠল, “কাজলী, শুভ জন্মদিন!”
কাজলী থমকে দাঁড়িয়ে তাকাল ওর দিকে। এটাই ছিল ওর জন্মদিনের প্রথম শুভেচ্ছা৷ আর কেউ জানেও না, আজ ওর বিশ বছর পূর্ণ হলো৷ দরিদ্র মানুষেরা জন্মদিনের মতো বিলাসিতা কোনোদিন মনে রাখে না৷
মায়া মায়া দৃষ্টি মেলে ইউসুফ কাজলীর চোখের দিকে তাকিয়ে আছে৷ যদিও ওর চোখের কোণে ভয়ের ছাপটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তবুও জোর করেই চোখাচোখি ধরে রেখেছে৷ সে বোধহয় বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মনে মনে পণ করেই এসেছে, আজ সে কিছুতেই চোখ নামাবে না। কাজলী এক পলক ওর দিকে তাকিয়ে খুব ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, “থ্যাংক ইউ।”
কাজলী আবার চলে যেতে নিল। ইউসুফ বুক চিতিয়ে পথরোধ করে দাঁড়াল। ওর সাহসের উন্নতি দেখে কাজলী মনে মনে বেশ অবাকই হলো। দুই ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।
ইউসুফ আকারে বেশ ছোট একটা বেতের ঝুড়ি কাজলীর চোখের সামনে বাড়িয়ে ধরে থতমত গলায় বলল, “এটা... এটা তোমার জন্মদিনের উপহার।”
কাজলী রেগেমেগে কড়া কিছু একটা শোনাতে গিয়েও শেষমেশ মুখ ফুটে কিছু বলতে পারল না৷ পুঁচকে ঝুড়ির ভেতরের উপহারগুলো দেখে থমকে গেল৷ ঝুড়ি ভর্তি করে রাখা সকালের সুবাসিত একগুচ্ছ বেলি ফুল। ঠিক তার পাশেই রাখা নারিকেল পাতা দিয়ে হাতে তৈরি একটা আংটি আর একটা হাতঘড়ি! কাজলী বিস্ময়ভরা চোখে ইউসুফের মুখের দিকে তাকাল।
ইউসুফ ওর চোখের ভাষা পড়তে পেরে মুচকি হেসে বলল, “এই উপহারে কোনো টাকার ক্ষমতা বা পুতুপুতু সহানুভূতি লেগে নেই।”
কাজলীর বুকে কেমন এক অচেনা দোলা দিয়ে গেল। ইউসুফ ওর ভেতরের অনুভূতিকে আয়ত্ত্ব করে সেটাকে মূল্য দেয়ার চেষ্টা করছে! টাকার দাপট দেখিয়ে ওর মন গলানো যাবে না বলে, নারিকেল পাতা দিয়ে আংটি আর ঘড়ি বুনে এনেছে!
কাজলী হাত বাড়িয়ে অবচেতন মনেই ঝুড়িটা লুফে নিল। নিজের অহংকার বজায় রাখতে দুই কদম এগিয়ে গিয়ে আবারও পেছনের দিকে ফিরল। ইউসুফকে লক্ষ্য করে কড়া গলায় বলল, “গিফটের জন্য থ্যাংক ইউ৷ কিন্তু ইদানীং যা করছেন, তার কোনোটিই ঠিক করছেন না৷ প্লিজ আমাকে আর এভাবে ফলো করবেন না৷ আমার জীবন ফিরিয়ে আনার পেছনে আপনার একটা বড় অবদান আছে ভেবে যখন তখন পথ আটকে আমার সঙ্গে কথা বলার অধিকার পেয়ে গেছেন, এটা ভুলেও ভাববেন না৷”
বলেই কাজলী এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে হনহন করে চলে গেল। ও চোখের আড়াল হতেই ইউসুফ বুক চিড়ে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। আড়াল থেকে হাততালি দিতে দিতে বেরিয়ে এলো জামিল। ইউসুফের দিকে একটা পানির বোতল এগিয়ে দিল। ইউসুফ ঢকঢক করে পুরো বোতলের পানি এক নিঃশ্বাসে গিলে খেল৷ ওর ফর্সা মুখে ফুটে উঠল বিশ্বজয়ের হাসি।
জামিল হেসে ওর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, “তুই তো ভাই সত্যি সত্যি পাল্টায়া গেছস! প্রথম মিশনেই লেটার মার্ক নিয়া পাস৷ চোখে চোখ রাইখা বুক ফুলায়া কথা কওনের মিশনে তুই সফল। যাহ, তোরে ফুল মার্কস দিয়া পাস করায়া দিলাম। এইবার দ্বিতীয় মিশন শুরু…”
ইউসুফ বন্ধুকে অবাক করে দিয়ে মাঝপথেই বলে উঠল, “দ্বিতীয়, তৃতীয় মিশন বলতে কিচ্ছু নেই। সব প্ল্যান বাদ৷ ডিরেক্ট প্রপোজ করব, বিয়ের প্রপোজ!”
জামিল চমকে উঠে হা হয়ে গেল। বিস্ময় নিয়ে বলল, “তুই... তুই নিজের মুখে ওরে প্রপোজ করবি? তাও আবার ডাইরেক্ট বিয়ার কথা কবি? মাথা ঠিক আছে তোর?”
ইউসুফ মাথা ঝাঁকাল। ওর মুখটা আত্মবিশ্বাসে জ্বলজ্বল করছে৷ হাসপাতালের কেবিনে কাজলীর একদম কাছে বসে ওর উষ্ণ নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা, ওকে আলতো ছুঁয়ে দেওয়ার সুখ, ওর কণ্ঠের মিষ্টতার যে শান্তি ও একবার পেয়ে গেছে, তা ও আর হারাতে চায় না। লোভ মানুষকে খুন অবধি করায়৷ ইউসুফও অন্ধ লোভে পড়েছে, সে ভালোবেসে এই লোভ করছে! কাজলীর গায়ের গন্ধ, ওর কণ্ঠস্বর আর ওর পুরো অস্তিত্বটা জয় করার লোভ নিজের মনের ভেতর লালন করে চলেছে। আর এগুলো সে যেকোনো উপায়ে অর্জন করেই ছাড়বে।
জামিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলল, “এখন কেমনে বিয়া করবি? জীবনেও তোর বাপ-মা ওর সাথে বিয়া দিব না। বাপ-মা তো অনেক দূরের কথা, তোর বাড়ির কাজের লোকরাও এই সম্পর্কে রাজি হইব না।”
ইউসুফ শিশুর মতো হেসে বলল, “পরের চিন্তা পরে। আগে আমার কাজলী রাজি হোক।”
এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিতে পেরে ইউসুফের খুব আনন্দ হচ্ছে৷ এতদিনের চেপে থাকা ভারী বুকটা বড্ড হালকা আর শান্ত লাগছে।
কাজলী বস্তিতে ঢুকেই দেখল, সরকার থেকে বসানো পানির মটরের সামনে মানুষের বিশাল লম্বা লাইন লেগে আছে। এখানে প্রতিদিনই বিকালের দিকে এমন লাইন লাগে। প্রতিদিন ঠিক এই সময়েই মটরের পানি ছাড়া হয়। টিউবওয়েল চেপে পানি বের করা বড্ড কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই কষ্ট এড়াতে বস্তির অধিকাংশ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘরে মটরের পানি তোলে। কাজলী লাইনের একটু সামনের দিকে তাকাতেই চমকে উঠল। আরে! ভিড়ের মাঝখানে তার মা-ও যে দাঁড়িয়ে আছে!
বাসায় কি পানি নেই? তা না হলে তো ওনার এই লাইনে আসার কথা নয়। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে, উনি ঝিলমিল আপার সাথে হাত-পা নেড়ে ঝগড়া করছেন।
কাজলী হাতের ফুলের ঝুড়িটা আড়াল করে দ্রুত পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল। জোহরা বেগম আর ঝিলমিল একে অপরের দিকে আঙুল উঁচিয়ে সমানে চিৎকার করে চলেছেন,
“এই তুই ফইন্নি!”
‘তুই এক নম্বরের ফইন্নি!”
“এই ছোডলোক!”
“তুই ছোডলোক!”
“এই মাঘী!’’
“এই মাঘী!”
দুজনে সম্বোধন ছুঁড়ে একে অপরকে বকে যাচ্ছে৷ এর বাইরে কোনো কথা নেই। বাকিরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে বেশ মজা নিয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করছে।
পানি নিয়ে প্রায়ই এমন হুলস্থুল ঝগড়াঝাঁটি লেগে থাকে৷ আর জোহরার সাথে বস্তির প্রতিটা মানুষেরই জীবনে অন্তত একবার না একবার হলেও ঝগড়া হয়েছে! মহিলা ঝগড়া করায় ওস্তাদ। সারা দিন ঘরে অসুখে-কষ্টে নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকলেও, ঝগড়া বাঁধানোর সময় ওনার শরীরে কোথা থেকে যে এত শক্তি আর তেজ চলে আসে, তা একমাত্র ওপরওয়ালাই ভালো জানেন৷
কাজলী ধমক দিয়ে জোহরাকে চুপ করিয়ে দিল। তারপর ওনার হাতের পানির বালতিটা টেনে নিয়ে হনহন করে বাড়ির দিকে রওনা দিল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………