শারমিন আরা খারাপ মানুষ নন। ধনাঢ্য পরিবারের বড় হয়েও বাকিটা জীবন তাকে সংগ্রাম করে কাটাতে হয়েছে। মেরুদণ্ডহীন স্বামী বা এই সংকীর্ণ সংসার কোনোকিছুই তার মনঃপুত ছিল না। ভালো ছাত্রী হওয়া সত্বেও উচ্চশিক্ষা ছেড়ে উনুনে মনোযোগ দিতে হয়েছে। নিজের শখ-আহ্লাদ সব মাটি চাপা দিতে হয়েছে, কারণ সংসারে মেয়েদের মানিয়ে চলতে হয়।
তারপর আসল মায়মুনা। প্রেমের বিয়ের সুবাদে হঠাৎ করে সংসারের সব নিয়ম তার জন্য ঠুনকো হয়ে উঠল। সে উশৃংখলদের মতো গান গায়, হাসাহাসি করে, কাজ রেখে সাহিত্য চর্চা করে। সব বিষয়ে মতামত দেয়, প্রয়োজনে তর্ক করে। অকাট্য নিয়মগুলোকে সে বলে গোঁড়ামি! এরকম করতে করতেই নিজের আলাদা সংসারও জুটে যায় তার।
সাহেরা বানুও বিশেষ কিছু বলে না, ছোট ছেলে রাগ করবে কিনা! শারমিনআরার পৃথিবী বড় বেইনসাফ মনে হয়।
তার দেবরের কারণে যতটুকু সচ্ছলতা ছিল তাও ছাড়খাড় হয়ে যায়। মায়মুনা আর তার ছেলে এসে বসে তার ঘাড়ে! তখন কি একটু অমানবিক আচরণই করে ফেলতেন তিনি? প্রথমদিনগুলোর ক্ষোভ মেটাতেন?
অতশত আসলে ভাবার সময় ছিল না। তখন সংসার চলমান রাখতে তাকে ডবল শিফটের চাকরি করতে হতো। এই বেলা আর কারো বারণ ছিল না।
তারপর যখন একদিন হুট করে মায়মুনা একেবারের জন্য চলে যায়? শারমিনআরা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি। এও সম্ভব!
কিন্তু হ্যাঁ! মায়মুনা তার নাবালক ছেলে রেখে নিরুদ্দেশ হয়েছে। তারপর তো সব ঠিক হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু না, মায়মুনা গিয়ে বাসা বাঁধল তার মাথায়। উঠতে, বসতে, শুতে খালি তার চেহারা ভাসতো। অপরাধবোধ ছিল হয়তো। কিন্তু শারমিনআরা শান্তি পেত না একদম। মাহিরের নিরীহ ডাগর ডাগর চোখজোড়াও সে সহ্য করতে পারতো না একদম।
আচ্ছা কোনোদিন কি তাকে কাছে এনে বসিয়ে খাইয়েছিলেন তিনি? কতই আর বয়স ছিল হ্যাংলা পাতলা ছেলেটার? মাথায় হাত রাখলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেত?
আজ মনে হচ্ছে আসলে মায়মুনার সাথে তার ঈর্ষাকে সন্তান পর্যন্ত না টানলেই পারতেন। এরকম একটা হীরের টুকরো ছেলে তো তার গর্ভে জন্ম নেওয়ার কথা ছিল না।
নমনীয়তা আর দৃঢ়তার এমন মিশ্রণ তার সামনে দাড়ানো মাহির ছাড়া বোধ হয় আর কারো নেই।
রুমের থমথমে বাতাসের মাঝে শারমিন আরা কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এলেন। মাহিরকে ডেকেছেন নিজের ঘরে, একান্তে। নিজের ভেতরের জ্বলন্ত বিবেককে শান্ত করতে, ওনার নিজের অতীতকে উল্টেপাল্টে প্রমাণ করতে ইচ্ছে হলো যে উনি কোনো রক্তপিপাসু ডাইনি ছিলেন না। ওনার গলায় এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা আর আর্তি ঝরে পড়ল,
কিন্তু মাহির... আমি... আমি তো তোমার কখনো গায়ে হাত তুলিনি, তুলেছি কি বলো? বল না? আমার নিজের রায়হান,রামিমদের জন্য আমি যখনই যা রেঁধেছি, তোমাকে কি এক ভাগ দিইনি? ওদেরকে যখনই নতুন জামা কিনে দিতাম, না?
-দিতেন চাচী।
-সবকিছু তোমার জন্যও একটা আনতাম না? আমি তো তোমাকে একদম না খাইয়ে রাখিনি! বলো? তাহলে এমন হচ্ছে কেন?
শারমিন আরা হন্যে হয়ে নিজের স্মৃতি হাতড়াতে লাগলেন, কিন্তু নিজের পক্ষে দাঁড় করানোর মতো এতগুলো বছরে খুব কম জিনিসই খুঁজে পেলেন ওনার ঝুলিতে। ওনার চোখ দুটো অপরাধবোধে ছলছল করে উঠল। বুক হাসফাস করতে লাগল।।
মাহির নিজের জায়গায় পাথরের মূর্তির মতো হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওনার এই আকুলতা দেখে ওর চোখে কোনো প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠল না। কোনো তৃপ্তি ও জাগল না। শুধু নিজের মা'র শেষ স্মৃতি ভেসে উঠল।
ও পুরোনো ক্ষোভ উগরে দিল না। বরং ওর বড় বড় শান্ত চোখ দুটো ওনার মুখের ওপর রেখে খুব মৃদু স্বরে বলল,
আপনার বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই, চাচী। বিন্দুমাত্র না। আপনি আজ যা যা বললেন, তার প্রতিটা কথাই সত্যি। আপনি আমাকে খেতে দিয়েছেন, পরতে দিয়েছেন। আর আপনার আশ্রয়ের জোরেই আজ আমি এতদূর পড়াশোনা করে এই মাহির আহমেদ হতে পেরেছি। সেজন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।
মাহিরের নির্ভার শান্ত স্বর শারমিন আরার বুকে তীরের মতো বিধল। মাহির বলতে লাগল,
আমি এই পরিবারের প্রতি আমার কোনো দায়িত্ব থেকে পালাচ্ছি না। এত বছর যেভাবে এই সংসার টেনেছি, ভবিষ্যতেও ওভাবেই টানব। রায়হানের বিয়ে, মিনি-দিনার পড়াশোনা যখন প্রয়োজন হয় আসবো। দাদীর দেখভাল সব আগের মতোই থাকবে। আমি প্রতি মাসে খরচের টাকা ঠিক সময়ে পাঠিয়ে দেব।
-তাহলে চলে যাবে কেন বাবা? যেও না! হুট করে ভুল সিদ্ধান্ত নিও না।
শারমিনআরা প্রায় মরিয়া হয়ে মাহিরের হাতটা খপ করে ধরে ফেললেন, যেতে হবে না মাহির! আমরা... আমরা সবাই মিলে মানিয়ে চলব। তোমাদের ওপরে খুব কষ্ট হয় তাই না? নিচে! নিচে চলে আসো। আমি রুম খালি করে দিচ্ছি। কথাটা শোনো?
আমি নিজেই তোমার বউয়ের সাথে কথা বলব, ওরে আমি রান্নাঘরের কোনো কাজে হাত দিতে দেব না। আমরা সবাই একসাথে এক ঘরেই থাকব, তুমি- তুমি ঘর আলাদা কোরো না!
মাহির ওনার দিকে তাকিয়েতেতো হাসি হাসল। ওনার হাত থেকে নিজের হাতাটা আলতো করে ছাড়িয়ে নিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বলল,
আপনি এখনো মূল ব্যাপারটা ধরতেই পারেননি, তাই না চাচী? ভাবছেন আমার সিদ্ধান্তের কারণ, আমার স্ত্রীকে দিয়ে রান্নাঘরে মরিচ বাটানো হয়েছে কিংবা নোংরা বাসন মাজানো হয়েছে? আমি নিজে কোনো কাজকে ছোট মনে করি না, আর আমার আয়নাও কাজকে কখনো নিজের সম্মানের নিচে মনে করে না। সমস্যাটা কাজের ধরণ নিয়ে ছিলই না কোনোদিন।
সমস্যাটা ছিল আপনাদের নিয়ত, আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি আর মানসিকতা নিয়ে। আপনারা আয়নাকে এই সংসারের পেছনের খাটুনির কাজগুলোর যোগ্য ঠিকউ মনে করেছেন, কিন্তু আজ কী রান্না হবে - সেই সিদ্ধান্তের যোগ্য মনে করেননি। ও নিজের হাত পুড়িয়ে মসলা বাটবে, সেটা আপনাদের কাছে খুব স্বাভাবিক। অথচ ও এই বাড়িতে আসার পর, আজ পর্যন্ত একটা দিনও ঝামেলা ছাড়া নিজের স্বাধীনতায় আমার জন্য এক বেলা পছন্দমতো কিছু রাঁধতে পারেনি। প্রতিটা জিনিসের জন্য ওকে আপনাদের মুডের ওপরে নির্ভর করতে হয়েছে। এমনকি এই সংসারের বাজারের টাকা যেখানে আমি নিজে দিই সেখানেও আমার নিজের স্ত্রীর আপনাদের অনুমতি ছাড়া এক ফোঁটা তেল খরচ করার অধিকার ছিল না!
মানিয়ে নেওয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে, চাচী। আর আয়না... ও আর এই ঘরের একটা অপমানও সহ্য করবে না। স্বামী আর স্ত্রী তো আলাদা কোনো সত্ত্বা নয়, দুটো শরীর কিন্তু একটা আত্মা। আমি আর আয়না আলাদা কেউ নই। আমার এই সাতাশ বছরের জীবনে আমি একাই আমার আর আয়নার - আমাদের দুজনের ভাগের অবহেলা, লাঞ্ছনা আর অপমান একাই সহ্য করে কোটা পূরণ করে ফেলেছি। এখন আর এক ফোঁটা নেওয়ার জায়গা আমাদের নেই।
মাহির এবার স্তব্ধ শারমিন আরার চোখের দিকে সোজা তাকাল, চাচী আমি জানি আপনার জীবনটা সহজ ছিল না। আমি এও জানি, আপনি কেন আমার মাকে এত ঘৃণা করতেন। কারণ আমার মা এই ঘরের সেসব প্রথা মেনে নেয়নি, যা আপনি নিজের পুরো যৌবন বিসর্জন দিয়ে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। অন্যায় ছিল কিন্তু যদি দাদীর দিকে তাকাই এই সমাজে ওনাকেও ওনার যৌবনে কতটা সংগ্রাম আর অবহেলা সহ্য করতে হয়েছে। তারও বিবরণী শোনা যাবে। কিন্তু সমস্যাটা কোথায় জানেন?
শারমিনআরার কাছে মাহিরের গলার স্বর এবার ইস্পাতের মতো শক্ত শোনাল,
সমস্যা হলো, আপনাদের জেনারেশনের কোনো একজন নারীও নিজের জায়গায় শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বলতে পারেননি যে অনেক হয়েছে! এই নোংরা চক্র আজ আমার সাথে এইখানেই শেষ! আমি যা সহ্য করেছি, আমার পরের জন বা আমার ঘরের বউকে আমি তা সহ্য করতে দেব না।
আপনারা কেউ এই কুৎসিত চক্রটা ভাঙার চেষ্টা করেননি। বরং আপনারা প্রত্যেকে নিজের ভেতরের সেই জমে থাকা বিষ আর অপমানটা পরের জেনারেশনের ওপর চাপিয়ে দিয়ে শান্ত হতে চেয়েছেন!
মাহিরের কথা আজীবনের চেনা দ্বিচারিতার মুখোশটা টেনে এক ঝটকায় খুলে দিল। ও শেষবারের মতো বলল,
কিন্তু এই চক্রটা আজ এই মুহূর্তেই থামতে হবে। আমার স্ত্রী এই নোংরা মানসিকতার বোঝা আর এক কদমও সামনে বয়ে নিয়ে যাবে না। ও নিজের সম্মান নিয়ে বাঁচবে, আর ওরে ভালো রাখাটা আমার একমাত্র দায়িত্ব। কাল সকালেই আমরা চলে যাচ্ছি। দোয়া রাখবেন।
—————
চিলেকোঠার ঘরটাতে রাতের নিস্তব্ধতা ছেয়ে আছে।
সারা ঘরের মেঝে জুড়ে জামাকাপড়, ছোট-বড় কন্টেইনার আর বইপত্র ওলটপালট হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এই কয়েক ঘণ্টার নোটিশে একটা আস্ত সংসার গুটিয়ে ফেলা চাট্টিখানি কথা নয়। ঘরের এই অগোছালো, বিধ্বস্ত রূপের মাঝখানে আয়না নিজে খাটে বসে বারবার চারপাশে তাকাচ্ছে।
তার নিজের চেহারাটাও বড্ড দিশেহারা আর বিপর্যস্ত দেখাচ্ছে।
সে কোনোদিন ভাবেনি এই ঘরটার প্রতি তার এতখানি মায়া জন্মে যাবে! অথচ আজ এই প্রতিটি জিনিস হাত দিয়ে তোলার সময় বুকের ভেতরটা কেমন টনটন করে উঠছে। এই চিলেকোঠার ঘরটাতেই তো ওর বিবাহিত জীবনের শুরু। এখানেই ও নিজের অদ্ভুত, শান্ত স্বামীটাকে প্রথম চিনতে পেরেছিল। ওর ছোট ছোট, নিঃশব্দ যত্নের ধরনগুলো দেখে দেখে নিজের অজান্তেই কখন যে ও লোকটার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল, আজ তা হিসাব করতে গেলে নিজেরই অবিশ্বাস্য লাগে।
এই চার দেয়ালের ভেতরেই আয়না নিজের হৃদয়ের চারপাশে তৈরি করে রাখা সেই শক্ত, দুর্ভেদ্য সুরক্ষার দেয়ালটা প্রথমবার ভেঙে ফেলতে পেরেছিল। নিজেকে আবেগপ্রবণ হতে দেওয়া, নিজের ভেতরের নরম, কোমল নারীত্বকে পুরোপুরি আলিঙ্গন করার সাহস ও এই ঘরেই পেয়েছিল।
সে তো ভেবেছিল কোনোমতে দিন পার করে চলে যাবে, কখনো ভাবেনি এই পাথুরে ইটের দেয়ালেও ওর নিজের এত গভীর একটা শিকড় গজিয়ে যাবে। এক ফোঁটা অবাধ্য চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ার আগেই আয়না সেটা শাড়ির আঁচল দিয়ে চট করে মুছে নিল।
দরজায় একটা হালকা ধাক্কা লাগল। আয়না মাথা তুলে দেখল দিনা দাঁড়িয়ে আছে।
মেয়েটার ফর্সা মুখটা রাগে আর চরম অস্থিরতায় পুরো লাল হয়ে আছে। সে ঘরে ঢুকেই খুব উত্তেজিত গলায় বলে উঠল,
আপনারা কি আসলেই কাল সকালে চলে যাচ্ছেন? মাহির ভাইয়াকে একটু বুঝিয়ে বলতে পারবেব না?কেন এভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে? আপনি বললে ভাইয়া ঠিকই শুনবে!
আয়না নিজের হাতের কাপড়ের ভাঁজটা রেখে দিনার দিকে তাকাল। ওর নিজের চোখ দুটো তখনো মায়ায় আচ্ছন্ন। ও কোমল স্বরে বলল,
দিনা তুমি যা-ই ভাবো না কেন, ওর এই সিদ্ধান্তের পেছনে আমার বিন্দুমাত্র কোনো হাত নেই। আমি নিজেও জানতাম না তোমার ভাইয়া আজ এমন কিছু করতে যাচ্ছে। ঠিক কী কারণে ওর ধৈর্যের বাঁধটা হুট করে ভেঙে গেল তা আমি জানি না, তবে আমার মনে হয় ও যা করেছে, মঙ্গলের জন্যই করেছে।
দিনা ভুরু কুঁচকে তাকাতেই আয়না আলতো হেসে বলল, এতগুলো বছর ধরে এই সংসারের দায়িত্ব এক হাতে টানতে টানতে ও ভেতর থেকে পুরো ক্ষয়ে যাচ্ছিল। আমি চাই ও একটা সুস্থ, স্বাভাবিক জীবন বাঁচুক। ও এমন সব মানুষের মাঝে থাকুক, যারা ওকে স্রেফ একটা টাকা কামানোর মেশিন বা দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যম না ভেবে।
ও ঠিক কেমন মানুষ তার জন্য ওকে ভালোবাসুক। ওর পরিশ্রমকে সম্মান করুক, ওকে দেখে বুক ফুলিয়ে গর্ব করুল। আর সত্যি বলতে, এই বাড়ি থেকে আমাদের চলে যাওয়াটা তোমার জন্যও ভালো হবে।
দিনা আচমকা ধাক্কা খেল। সে পুরো হতবাক হয়ে বলল, আমার জন্য ভালো হবে মানে? কী বলছেন এসব?
আয়না কাপড় গোছানো বন্ধ করে সোজা হয়ে বসল। তারপর আলতো করে ঘুরে দিনার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। সেই চাহনিতে ছিল তীক্ষ্ণ দূরদর্শিতা।
আয়নার ওই সরাসরি তাকানো দেখামাত্রই দিনা মুহূর্তের মধ্যে ভেতরে ভেতরে কেমন গুটিয়ে গেল। এক তীব্র অস্বস্তি আর আড়ষ্টতা এসে ওকে গ্রাস করল, কারণ ও বুঝতে পারছিল আয়না আসলে কোন দিকে ইঙ্গিত করছে।
দিনার মস্তিস্কে তখন গত কয়েক মাসের অস্থিরতার স্মৃতি এক নিমেষে ভেসে উঠল।
তাদের বিয়ের অনেক সময় পার হয়ে গেলেও দিনা গত কয়েক মাস ধরে অনেক অস্থিরতায় ভুগছিল। কারণ ও খুব স্পষ্ট টের পাচ্ছিল, এই দম্পতির মাঝখানের দূরত্বটা পুরোপুরি হাওয়া হয়ে গেছে। এককালে যে মাহির ভাইকে সে সবসময় গম্ভীর আর দূরবর্তী দেখত, সেই মাহির ভাই এখন ওনার দিকে কেমন তৃষ্ণার্ত নজরে তাকিয়ে থাকে। দিনা ভেবেছিল সে নিজের ভেতরের সেই পুরনো বালিকাভুল অনুভূতিগুলো কবেই ঝেড়ে ফেলেছে, ও এগুলো থেকে মুভ অন করে গেছে। কিন্তু না!
যখনই ও ওদের দুজনকে এত কাছাকাছি দেখত, ওর বুকের ভেতরটা আগের মতোই তীব্র যন্ত্রণায় পুড়ে খাক হয়ে যেত।
বিশেষ করে কয়েকমাস ধরে ও যখন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখত মাহির ভাইয়া নিঝুম অন্ধকারে নিচে নেমে আসছে আর গরম পানির ফ্লাস্ক ভরে বড্ড যত্নে নিয়ে যাচ্ছে, তখন দিনার নিজের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতো, দম আটকে আসত। ওদের সম্পর্কটা কতটা গভীরে আর কতটা উঁচুতে পৌঁছে গেছে!
একদিন এই অস্থিরতা দেখে মিনি ওর হাতটা শক্ত করে ধরে আক্ষেপের গলায় বলেছিল, তুই এত বোকা কেন রে দিনা? তুই এখনো নিজের ভেতরের ওই ফিলিংসগুলো নিয়ে আটকে আছিস? বড় হ একটু! মাহির ভাইয়ার চোখে প্রথম দিন থেকেই ভাবী ছাড়া আর কোনো মেয়ের কোনো অস্তিত্ব ছিল না, কোনোদিন থাকবেও না।
দিনার ঘোর কাটল আয়নার কথায়। দিনা একটু আমতা আমতা করে ভাবল মিনি কি তবে ভাবীকে সবকিছু বলে দিয়েছে?
আয়না দিনার মনের ভাবটা বুঝতে পেরে মৃদু হাসল, তোমার মাথা এত খাটানোর প্রয়োজন নেই দিনা। মিনি আমাকে কিচ্ছু বলেনি। আমার নিজের দুটো চোখ আছে, আর আমি খুব দীর্ঘ সময় ধরেই এই সত্যিটা জানি। তুমি নিজেকে যতটুকু চালাক ভাবো, তুমি আসলে ততটা নও। তোমার চোখ আর তোমার আচরণ অনেক আগেই তোমার গোপন কথা বলে দিয়েছে।
দিনা চরম লজ্জায় আর অপমানে একদম কুঁকড়ে গেল। ও যেন ঘরের মেঝেতে মিশে যেতে চাচ্ছিল। মাহির ভাইয়ের স্ত্রী ওর জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আর গোপন ব্যর্থতার কথা এভাবে সামনাসামনি বলে দেবে ও ভাবতেও পারেনি।
আয়না ওর অবস্থা দেখে গলা আরও নরম করে বলল,
এ নিয়ে এত লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই দিনা। আমি এই জিনিসটা নিয়ে কখনো তোমার প্রতি মনে কোনো ক্ষোভ রাখিনি, আর ভবিষ্যতেও এই টপিক নিয়ে আমি তোমার সাথে বা এই বাড়ির কারো সাথে একটা শব্দও উচ্চারণ করব না। এটা এখানেই শেষ।
কিন্তু তোমার নিজের ভালোর জন্যই বলছি নিজের মনটাকে এবার এই জায়গা থেকে পুরোপুরি সরিয়ে নাও। অন্যথায়, এই অবাস্তব ফিলিংস তোমার সারা জীবনের জন্য একটা স্থায়ী লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
দিনা কাঁপানো গলায় কোনোমতে নিজের ভেতরের সবচেয়ে বড় ভয়টা মুখে এনে জিজ্ঞেস করল,
বলে দিয়েছেন? আপনি কি ভাইয়াকে সব বলে দিয়েছেন? ভাইয়া জানে?
আয়না মাথা নাড়ল,
না। আমি ওরে কিচ্ছু বলিনি। আর কেনই বা বলব? ও নিজের বোনদের কতটা অন্ধের মতো ভালোবাসে, তা তো তুমি নিজেই জানো। আমি চাই না ওর ভালোবাসায় কোনোদিন কোনো আঁচ লাগুক বা ওর মনটা ভেঙে যাক।
আয়নার মুখ থেকে এই কথাটি শোনা মাত্রই দিনা আর একটা সেকেন্ডও সেই ঘরে দাঁড়ানোর শক্তি খুঁজে পেলো না। এক বুক লজ্জা আর অদ্ভুত কৃতজ্ঞতা নিয়ে সে উল্টো পায়ে প্রায় ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। এক বাক্যেই সে দিনার অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছে।
আয়না দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার নিজের ওলটপালট হয়ে থাকা সংসারের দিকে তাকাল। রাতটা ফুরিয়ে আসছে, আর মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা... তারপরেই এই পুরোনো খাঁচা ছেড়ে ওরা ডানা মেলবে এক নতুন আকাশের দিকে।
—————
দিনা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই ঘরের দরজায় আবার মৃদু শব্দ হলো।
আয়না মাথা তুলে দেখল মাহির এসে দাঁড়িয়েছে। মানুষটাকে বাইরে থেকে দেখতে ভীষণ শক্ত আর অবিচল লাগলেও, আয়না ওর চোখ দেখে বুঝতে পারল ভেতরে ভেতরে বড্ড একা আর দিশেহারা বোধ করছে।
নিজের আজীবনের চেনা আশ্রয়, নিজের পরিবারকে এক ঝটকায় পেছনে ফেলে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা মুখে যত সহজ, বুকে ততটা নয়। কিন্তু আয়নার সামনে ও নিজের সেই দুর্বলতা প্রকাশ করতে চাচ্ছে না, জোর করে একটা শক্ত আর সাহসী ভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
মাহির ঘরে ঢুকে আয়নাকে গোছগাছ করতে দেখেও কিছু বলল না। ও ধীর পায়ে হেঁটে ছাঁদে গিয়ে দাঁড়াল। রাতের মৃদু বাতাস ওকে ছুঁয়ে যাচ্ছে, আর ও শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে।
আয়না ওকে হুট করে ডিস্টার্ব করল না। ও জানত, এই মুহূর্তে মাহিরের নিজের সাথে কিছুটা সময় কাটানো প্রয়োজন। ও চুপচাপ আরও কয়েকটা কাপড় ভাঁজ করল, তারপর আলতো পায়ে হেঁটে ছাদে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
তাদের কোনো কথা হলো না। কোনো কৈফিয়ত বা সান্ত্বনার সস্তা সংলাপও আদান-প্রদান হলো না। আয়না স্রেফ পেছন থেকে ওর চওড়া, শক্ত পিঠটা জড়িয়ে ধরল। নিজের গাল ওর পিঠে ঠেকিয়ে ও মাহিরকে বোঝাতে চাইল, যা-ই হয়ে যাক না কেন, এই পৃথিবীতে ও একা নয়।
মাহির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়নার হাত দুটোর ওপর নিজের হাতের তালু রাখল। তারপর আলতো করে ঘুরে ওকে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিল।
বেশ কিছুক্ষণ ওভাবে কাটার পর আয়না ওর বুকের ওপর চিবুক রেখে ওপরের দিকে তাকাল। ওর বড় বড় চোখ দুটোতে রাজকীয় মায়া। ও খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
আচ্ছা মাহির... তোমার কি মনে হয় ভবিষ্যতে কখনো এই সিদ্ধান্তের জন্য তোমার আফসোস হবে? উইল ইউ রিগ্রেট ইট?
মাহির ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। ওর চটুল স্বভাব আবার একটু ফিরে এল,
তুমি কি খুব রেগে যাবে যদি ভবিষ্যতে কখনো আমার একটু আফসোস হয়?
আয়না হালকা হেসে ওর বুকে মুখ লুকালো,
একদম না! রাগব কেন? তোমারও মুড সুইং হওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে। তুমি যা ইচ্ছে তা-ই করতে পারো, তারপর নিজের সিদ্ধান্তের জন্য আফসোসও করতে পারো। আমরা মানুষ, আমাদের সব ধরণের ইমোশন ফিল করার স্বাধীনতা থাকা উচিত। আই ওন্ট মাইন্ড অ্যাট অল।
মাহিরের ঠোঁটের কোণে এবার এক চমৎকার হাসি ফুটে উঠল। ও নিচু হয়ে আয়নার কপালে গভীর একটা চুমু খেল। সেভাবেই থাকল অনেকটা সময়।
আয়না ওর বুকের বোতামটা আঙুল দিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
তবে... স্রেফ আমার কথা চিন্তা করে বা আমার ওপর বেস করে এই সিদ্ধান্ত নিও না প্লিজ। সেটা হলে আমার নিজের ভেতরের গিল্ট ফিলিংটা সারাজীবন থেকে যাবে। আমার মনে হবে আমার জন্যই তোমার পরিবারটা-
-না, আয়না।
মাহির ওর কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিল। ওর গলার স্বর এবার ভীষণ সিরিয়াস আর গভীর শোনাল, আমি এই সিদ্ধান্ত নিজের জন্য নিয়েছি। আমি আজ নিচে দাঁড়িয়ে আবিষ্কার করলাম আমি নিজেও না বুঝে ওই কুৎসিত, টক্সিক চক্রটার একটা অংশ হয়ে যাচ্ছিলাম। আমি নিজের ওপর হওয়া অন্যায়গুলো দিনের পর দিন মুখ বুজে সহ্য করেছি, আর ভাবতাম শান্তি বজায় রাখছি। চলুক না। ওদের আমার প্রতি বিতৃষ্ণা জায়েজ।
কিন্তু আমি কোনোভাবেই এই বিষাক্ত চেইনটা তোমার ওপর পাস হতে দিতে পারি না। এটা আজ আমার সাথে ওখানেই শেষ হতে হবে।
মাহির আয়নার দুই কাঁধ ধরে ওকে সোজা করে দাঁড় করাল, এখন থেকে তুমি, আমি আর আমাদের নিজেদের একটা ছোট্ট পরিবার হবে। যেখানে কোনো টক্সিসিটি থাকবে না, কোনো অদৃশ্য দেয়াল থাকবে না। আমার স্ত্রীকে নিজের ভেতরের আলো, নিজের চিন্তাভাবনা, নিজের পার্সোনালিটি একটা চার দেয়ালের বদ্ধ উনুনে পুড়িয়ে ছাই করতে হবে না। শুধু এই কারণে যে তার স্বামী তার মৃত বাবার ফেলে যাওয়া ঋণের বোঝা আর কর্তব্যের পাহাড় আজীবন নিজের পিঠে বয়ে বেড়ানোর অন্ধ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল! শুধু এই কারণে যে তার স্বামী ওকে এই সংসারের একটা অ্যাকোমোডেশন ভেবে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে বলেছিল!
-চুপ! তুমি কখনো আমাকে এসব বলোনি!
মাহির একনাগাড়ে কথাগুলো বলে আয়নার দিকে তাকাল, আমি বড্ড দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছি আয়না, তুমি আমাকে কতটা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছ। আর আমি তোমাকেও অবহেলা উপহার দিচ্ছিলাম। কিন্তু আর না!
আয়না ওর নিজেকে দোষারোপ করা কথা শুনে ভীষণ রাগ হয়,
হুম, সত্যিই! বড্ড বেচারী আমি! কী যে কষ্ট আমার!
ওর এই আদুরে ভঙ্গি দেখে মাহির আর নিজের গম্ভীর ভাব ধরে রাখতে পারল না। ও শব্দ করে হেসে ফেলল। এতক্ষণের সমস্ত মেঘলা হাওয়া যেন এক নিমেষে কেটে গেল।
আয়না মাহিরের কলারটা টেনে ধরে ওর চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে প্রত্যয়ী গলায় বলল,
ভবিষ্যতে আমাদের সামনে যা-ই আসুক না কেন, যত কঠিন পরিস্থিতিই হোক তুমি খুব ভালো করে জানো তো মাহির, আমি সবসময় তোমার ঠিক এই পাশটাতেই থাকব?
মাহির ওর চোখের দিকে তাকাল। আয়নার ওই ডাগর চোখ দুটোতে আজ কোনো আড়ষ্টতা নেই, আছে এক মহাসমুদ্র সমান ভরসা। মাহির এক বুক তৃপ্তি নিয়ে বলল,
আমার এই সাতাশ বছরের জীবনে, আমি কোনো কিছুর ব্যাপারে এতটা নিশ্চিত কোনোদিন ছিলাম না, যতটা নিশ্চিত আমি তোমার এই কথার ব্যাপারে, আয়না।
কথাটা বলেই মাহির একটু থমকে গেল। ও আয়নার চোখের পাতার কোণে জমে থাকা হালকা জলকণাগুলো খেয়াল করল। ও নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, আমি ঘরে ঢোকার সময় দেখছিলাম তোমার চোখে পানি। তুমি কি সত্যিই এই চিলেকোঠা, এই বাড়িটা খুব মিস করবে?
আয়না চট করে চোখ নামিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল,
আরে না, ও কিছু না। গোছগাছ করতে গিয়ে কেমন যেন-
কিন্তু কথা শেষ করার আগেই আয়না পুরোপুরি ভেঙে গেল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এতক্ষণের জমানো সমস্ত মায়া আর কষ্ট এক দলা কান্না হয়ে ওর গলা চিরে বেরিয়ে এল। ও হুট করেই মাহিরের বুকে মুখ লুকিয়ে ছোট বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
মাহির একদম অপ্রস্তুত হয়ে গেল। ও পরম আদরে আয়নাকে নিজের বুকের মাঝে আরও শক্ত করে পিষে ধরল। ওর পিঠে, চুলে হাত দুটো বুলিয়ে ও আয়নাকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। ওর কপালে, চুলে বারবার চুমু খেয়ে ও নিজের উষ্ণতা দিয়ে ওর ভেতরের সমস্ত কষ্টটা শুষে নিতে চাইল।
আয়না মাহিরের শার্টের কাপড়টা মুঠো করে ধরে কান্নায় ভেজা গলায় বলতে লাগল,
আমি... আমি যেখানেই যাই না কেন মাহির, আমার সারাজীবনের একটা বড় অংশ এই চিলেকোঠার ঘরেই ফেলে রেখে যাব। আমি এই জায়গাটা আজীবন বেশি মিস করব। কারণ... কারণ এই ঘরটাতেই আমি প্রথমবার নিজের মাহিরকে পেয়েছি। এই চার দেয়ালের ভেতরেই আমি প্রথম জানতে পেরেছি আমার মাহিরের ভালোবাসায় নিজেকে সঁপে দেওয়াটা কতটা স্বস্তির, কতটা শান্তির!
মাহির আর কোনো কথা বলল না। নিঝুম রাতের চাঁদের আলোর নিচে, নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিটাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
—————
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। নিচে দুটো ট্যাক্সি এসে দাঁড়িয়েছে। মাহির নিচে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো সব তদারকি করছে। বাড়ির বাকিরা কেউ বারান্দায়, কেউ দরজার আড়ালে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে এই বিদায় দেখছে, কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা নেই।
আয়না সব শেষে ধীর পায়ে সাহেরা বানুর ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।ভেতরের আবহাওয়াটা তার চেয়েও বেশি থমথমে।
সাহেরা বানু খাটের ওপর টানটান হয়ে বসে ছিলেন। ওনার বৃদ্ধ মুখটা রাগে, অপমানে আর এক চরম জিঘাংসায় পুরো কুৎসিত দেখাচ্ছিল। আয়না ওনার কাছে গিয়ে আলতো করে সালাম করতেই বৃদ্ধা ঝটকা মেরে নিজের পা দুটো সরিয়ে নিলেন। ওনার চোখ দিয়ে যেন আক্ষরিক অর্থেই আগুন ঝরছিল।
তিনি দাঁত কিড়মিড় করে অত্যন্ত কর্কশ গলায় অভিশাপ উগরে দিলেন,
অলক্ষ্মী ছুঁড়ি! আমার ভরা সংসারটা তুই এক রাতে ছারখার করে দিলি! আমার বুড়ো বয়সের ছায়া, আমার একমাত্র ভরসা মাহিরকে তুই আমার বুক থেকে টেনে হিঁচড়ে কেড়ে নিয়ে গেলি! আমি তোরে কত ভালোবাসতাম, আর তুই ওরে আমার পর করে দিলি? এখন এই সংসার কেমনে চলবে? তোরে আমি মন থেকে অভিশাপ দিচ্ছি তুই জীবনে কোনোদিন সুখী হতে পারবি না! কোনোদিন না!
ওনার এই বিষাক্ত অভিশাপ শুনে অন্য কেউ হয়তো কেঁদে ফেলত, পিছিয়ে যেত। কিন্তু আয়না একটুও কাঁপল না। সে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে ওনার খাটের পাশেই একটা মোড়ায় খুব শান্তভাবে বসল। ওনার রাগী চোখের দিকে নিজের চোখ দুটো স্থির রেখে শীতল গলায় বলল,
দাদী, এই অভিশাপ আর দোয়ার একটা নিজস্ব ব্যাকরণ আছে। এগুলো আসলে মুখের কথায় কারো গায়ে লাগে না। এগুলো নির্ভর করে মানুষের নিজের কর্মের ওপর আর ওপরওয়ালার ইনসাফের ওপর। অভিশাপ তখনই পূরণ হয়, যখন অন্য পক্ষ সত্যি সত্যিই সেই শাস্তির যোগ্য হয়। তাই আপনার এই মুখের কথায় আমি বিন্দুমাত্র চিন্তিত নই।
আয়না ওনার কুঁচকে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে ও নিজের গলার স্বর আরও এক ডিগ্রি নামিয়ে বলল, বরং আমি আশা করব আপনার নিজের আয়ু ফুরিয়ে যাওয়ার আগে আপনি আল্লাহর কাছে নিজের করা পাপগুলোর জন্য একটু ক্ষমা চেয়ে নেওয়ার সময় পাবেন।
সাহেরা বানু আচমকা যেন এক চরম ধাক্কা খেলেন। ওনার মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি তোতলামো গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন,
কী... কী বলছিস তুই? কীসের পাপ? মুখপুড়ী, তোর এত বড় সাহস! তুই আমার ঘরে দাঁড়িয়ে আমারে পাপী বলিস?
আয়না একটুও দমল না। ও বিছানার চাদরটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে বলল,
আমি আশা করব দাদী, আপনি আল্লাহর কাছে সেই দিনটার জন্য তওবা করবেন যেদিন আপনি আমার শাশুড়ি, অর্থাৎ মাহিরের মায়ের কাছে গিয়ে ওনাকে এই পরিবার ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য বাধ্য করেছিলেন।
আপনি ওনার মগজে এই বিষটা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যে সে যদি এই বাড়িতে থাকে, তবে মাহির এই সংসারে কোনোদিন নিজের জায়গা পাবে না। মাহির যে আজ এই ঘরে এত অবহেলা আর লাঞ্ছনা সহ্য করছে, ওনার কোনো পরিচয় তৈরি হচ্ছে না তার একমাত্র কারণ হলো ওনার নিজের মায়ের এই ঘরে উপস্থিতি!
আপনি ওনাকে বুঝিয়েছিলেন, ওনার চলে যাওয়াটাই ওনার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গল। আর তা সহ্য করতে না পেরেই একজন মা নিজের কলিজার টুকরো ছেলেকে ফেলে নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন!
সাহেরা বানু এবার আক্ষরিক অর্থেই কাঁপতে লাগলেন। ওনার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছিল, কপাল দিয়ে ঠান্ডা ঘাম বেরিয়ে আসছে। ওনার জীবনের সবচেয়ে বড় এবং অন্ধকার গোপন সত্যটা এই মেয়েটা আজ এভাবে টেনে বের করবে, ওনার সুদূরতম কল্পনাতেও ছিল না। ওনার বুকটা ভয়ে হাঁসফাঁস করতে লাগল। তিনি থতমত খেয়ে হন্যে হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
তুই... তুই এইসব আবোলতাবোল কথা... আমার নাতির কান পর্যন্ত বিষিয়েছিস? এইজন্যই মাহির আজ আমার ঘর ছেড়ে যাচ্ছে? তুই ওরে সব বলেছিস?
আয়না ম্লান একটা হাসি হাসল,
না দাদী। আমি ওকে একটা শব্দও বলিনি। কিন্তু আমি নিশ্চিত ও এই সত্যিটা অনেক আগে থেকেই জানে। ও সব জানত।
-কী বলিস তুই!
-হ্যাঁ, দাদী। আপনি কি একটা বারও ভেবে দেখেননি মাহির প্রতি মাসে নিয়ম করে আপনার সব ওষুধ কিনে আনে ঠিকই, কিন্তু ও কোনোদিন ওই ওষুধের ফাইলটা আপনার বেডসাইড টেবিলে নিজের হাতে এনে রাখে না?
ও সবসময় মিনি বা দিনার হাত দিয়ে পাঠায়। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে ও কোনোদিন আপনার এই ঘরের চৌকাঠ পার হয় না। ও যখন বাড়ি থেকে বের হয় বা বাড়ি ফেরে, ও কোনোদিন আপনার দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আপনার দোয়া চায় না। কেন করে না, কোনোদিন ভেবেছেন?
আয়না ওনার আরও কাছে এগিয়ে এল,
কারণ ও সব জানত। কিন্তু ওর বুকের ভেতরটা ওর মায়ের মতোই বিশাল। ওর ভেতরে এত ক্ষমা করার ক্ষমতা ছিল যে ও আপনার এই কুৎসিত অপরাধটা জানার পরও কোনোদিন আপনার সাথে দুর্ব্যবহার করেনি, মুখ ফুটে কিচ্ছু বলেনি। সো, আমি বলব আপনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। কারণ মাহির আর ওর মায়ের কাছে সামনাসামনি দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাওয়ার মুখ বা যোগ্যতা কোনোটিই আপনার এই জীবনে আর অবশিষ্ট নেই।
বৃদ্ধা এবার একদম নিথর, স্তব্ধ হয়ে বিছানায় মিশে গেলেন। ওনার মুখ দিয়ে আর একটা শব্দও বের হলো না।
আয়না এবার মোড়া ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ও শাড়ির আঁচলটা অপর পাশের কাঁধে এনে সাহেরা বানুর দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো বলল,
আর হ্যাঁ, শেষ একটা কথা আপনাকে জানিয়ে যাই। আপনি সপ্তাহে অন্তত দুবার করে আমাকে ডেকে গোপনে সুক্ষ্মভাবে সাবধান করতেন আমি যেন এখন কোনো বাচ্চার প্ল্যান না করি, কারণ নতুন বাচ্চা আসলে মাহিরের মনোযোগ এই বড় সংসার থেকে পুরোপুরি উঠে যাবে! ও নাকি আর এই বাড়ির দায়িত্ব টানবে না!
আপনার সেই কুৎসিত মানসিকতার দিন আজ এই মুহূর্তেই শেষ হলো। এখন থেকে মাহিরের নিজের একটা আস্ত, পরিপূর্ণ সংসার থাকবে। ও নিজের স্বাধীনতায় নিজের নতুন ঘর সাজাবে, ও নিজের পছন্দমতো তিন বেলার খাবার খাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা ও ঠিক যতগুলো সন্তান চায়, ও ততগুলো সন্তানের বাবা হবে। আমার স্বামী এই জীবনে আজ পর্যন্ত যতখানি অবহেলা পেয়েছে, ও এখন থেকে তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ভালোবাসা, সুখ আর সম্মান পাবে। ও যা যা ডিজার্ভ করে, ও তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু পাবে।
বলেই আয়না এক সেকেন্ড আর সেই ঘরের বদ্ধ, দমবন্ধ করা বাতাসের মাঝে দাঁড়াল না। সে অত্যন্ত তৃপ্তি নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে সোজা নিচে নেমে এল।
বাইরে তখন ভোরের মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে মাহিরের মুখে। গাড়ি স্টার্ট নিয়েছে। আয়না মিনির কাছে থেকে বিদায় নিয়েছে আগেই।
শারমিনা আরার সাথে দৃষ্টি বিনিময় হলো। তিনিই আয়নাকে এই সত্যের ব্যাপারে জানিয়েছেন।
আয়না রামিমকে বলল, বাসাতে একটু গুছিয়ে নেই। তারপর সবাইকে নিয়ে এসো কেমন? না হলে কিন্তু তোমার ভাইয়া মন খারাপ করবে।
রামিম মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
আয়না এসে ওর পাশে বসল, আর মাহির ওর হাতটা নিজের উষ্ণ হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল।
ট্যাক্সিটা ধীর গতিতে চেনা গলিটা পার হয়ে এক নতুন গন্তব্যের দিকে ছুটে চলল।
—————
তিন দিন তাদের হোটেলে থাকতে হলো, চারদিনের মাথায় বাজেটের মধ্যে মানানসই একটা বাসা তাদের পছন্দ হলো। মাহির এর নতুন অফিস থেকে কাছে। সাত তলা বিল্ডিং এর চারতালার ছোট্ট ছিমছাম দুই বেডরুমের ফ্ল্যাট। চারপাশে খোলামেলা আছে।
তবে লিফ্ট না থাকায় মাহিরের একটু মন খারাপ হলো। ছাদের চাবি নিতেও হয়তো ঝামেলা হবে।
যতটা আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজের বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। কতটা সুখ বা সুরক্ষা সে দিতে পারবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে আয়নার উৎসাহ দেখে মনোবল পাচ্ছে।
আয়না টুকটুক করে ঘর পরিষ্কার করছে। কি কি কিনতেই হবে তার লিস্ট করছে। চড়ুই পাখির মত ছোটাছুটি করছে। এখন তাকে দেখতে পাক্কা গিন্নি লাগছে! ব্যস্ততায় মাহির দুদণ্ড বসার সময় পাচ্ছে না। নিজে দাড়িয়ে থেকে মজুরদের দিয়ে সব আসবাবপত্র সাজাচ্ছে। আয়নাকে জোড় গলায় বলেছে, রুম থেকে বেরোতে না।
আয়না ভাত মাখিয়ে তাকে অন্য কাজের বাহনায় ডাকল। মাহির ছুটে এসে কারণ দেখে বিরক্ত হলো। আয়না মুখে লোকমা তুলে দিয়ে বলল, হয়েছে? কতক্ষণ লাগলো? তোমাকে ভাতের জন্য বাচ্চাদের মতো বলতে হয়!
সন্ধ্যার দিকে তাদের নতুন বাসা খালি হয়ে যায়। খাট ছাড়াও ড্রয়িংরুমের নিচে একটা তোষক বিছানো হয়েছে আপতত। আয়না ফোনে কাসিফ আর কামিনীর সাথে কথা বলছিল। মাহির চা বানিয়ে এনে তাকে দিল। তারপর একদম গা ঘেঁষে বসল।
আয়নার তার মতিগতি সুবিধার লাগল না। সে কল কেটে দ্রুত স্বামীকে মনোযোগ দিল।
-এই লোক! চা পড়বে তো।
মাহির বলল, দুকাপ আনা উচিত হয়নি। এক কাপ ইজ মোর রোমান্টিক।
আয়না বলল, নেক্সট টাইম!
মাহির তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, হাউ…হাউ এবাউট সাম আইসক্রিম?
আয়না আহ্লাদ করে বলল, নাউ?
মাহির বাধ্য ছেলের মতো হ্যাঁসূচক মাথা নাড়ল।
আয়না হাসতে হাসতে তাকে কাছে টানল। মাহির পরম যত্নে স্ত্রীর স্নিগ্ধতায় মগ্ন হলো।
জানালার কাছে তাদের পুরনো রেডিও রাখা। সেখানে মধুর সুরে বাজছে, হে সখা, মম হৃদয়ে রহো।
হে সখা, মম হৃদয়ে রহো।
সংসারে সব কাজে ধ্যানে জ্ঞানে হৃদয়ে রহো।
হে সখা, মম হৃদয়ে রহো।
হে সখা, মম হৃদয়ে রহো।
নাথ, তুমি এসো ধীরে সুখ-দুখ-হাসি-নয়ননীরে,
নাথ, তুমি এসো ধীরে সুখ-দুখ-হাসি-নয়ননীরে,
লহো আমার জীবন ঘিরে-
লহো আমার জীবন ঘিরে
সংসারেসব কাজে ধ্যানে জ্ঞানে হৃদয়ে রহো।
হে সখা, মম হৃদয়ে রহো।
হে সখা, মম হৃদয়ে রহো।
·
·
·
সমাপ্ত……………………………………………………