আজ জবা জারাকে নিয়ে এসেছে ইরফানের সঙ্গে দেখা করাতে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই জারা কেমন যেন চুপচাপ ছিল। সাধারণত ঘুম ভাঙার পরই ঘরময় পাখির মতো উড়াউড়ি করে বেড়ায় সে। আজ তা নয়। বিছানার এক কোণে বসে ছিল মুখ গোমড়া করে।
জবা মেয়ের সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল।
'কী হয়েছে মা?'
জারা মলিন চোখে তাকাল।
'মা...। বাবাকে দেখতে ইচ্ছে করছে।'
কথাটা শুনে জবার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
তবুও মুখে হাসি টেনে বলল,
'কখন যেতে চাও?'
'তুমি যখন নিয়ে যাবে।'
জবা কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই ছোট্ট মানুষটা এখনও জানে না বড়দের ভুলের শাস্তি কতটা নির্মম হতে পারে। জানে না, কখনও কখনও একটা সম্পর্ক ভেঙে গেলে তার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় নির্দোষ শিশুরা।
চোখের কোণে জমে ওঠা জল গোপনে মুছে ফোনটা হাতে নিল জবা। ইরফানকে কল করল।
কল রিসিভ হতেই আবেগহীন কণ্ঠে বলল,
'কোথায় তুমি?"
'বাড়ি।'
'কোথাও বের হবে?'
'না। কেন?'
'আমি জারাকে নিয়ে আসছি।'
কয়েক সেকেন্ড নীরবতায় কেটে গেল। তারপর ওপাশ থেকে প্রায় শিশুর মতো উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ ভেসে এলো,
'সত্যি! জলদি আসো।'
জবা আর কিছু বলল না। কল কেটে দিল।
কল কাটা মাত্রই যেন পুরো পৃথিবী বদলে গেল ইরফানের কাছে। দীর্ঘদিন পর এমন একটা সুখবর পেয়েছে ও। হঠাৎ করেই তার নির্জীব বাড়িটা যেন প্রাণ ফিরে পেল।চারদিকে তাকিয়ে দেখল ঘরগুলো এলোমেলো। সোফার পাশে ম্যাগাজিন পড়ে আছে। ডাইনিং টেবিলে অগোছালো কাগজ।
বারান্দায় শুকনো পাতার স্তূপ। মুহূর্তেই কাজের লোকদের ডাকল। বলল,
'সব পরিষ্কার করো এখনই।'
তারপর জবা আর জারার পছন্দের খাবার অর্ডার করল। কিন্তু এতে মন ভরল না।
রান্নাঘরে ঢুকে পড়ল নিজেই। জবা আর জারা ওর হাতের রান্না খুব পছন্দ করত। আজ আবার রান্না করবে ইরফান।
যদিও জানে, জবার মন আর ফিরে পাওয়া যাবে না। তবুও... বৃথা চেষ্টা আর কি!
ভালোবাসার মানুষকে খুশি করার ক্ষুদ্রতম সুযোগও হাতছাড়া করতে চায় না ইরফান।
এদিকে জারা যেন উৎসবের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। একটার পর একটা জামা পরে আয়নার সামনে দাঁড়াচ্ছে।
কখনো গোলাপি ফ্রক। কখনো নীল। কখনো আবার সাদা।
প্রতিবারই এসে জবাকে জিজ্ঞেস করছে,
'মা, এটা ভালো লাগছে? মা, এটা পরলে বাবা খুশি হবে? মা, আমি কি সুন্দর লাগছি?'
জবা প্রতিবারই হাসছে, কিন্তু প্রতিবার হাসার সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতরটাও একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছে। মেয়েটা তার বাবাকে কতটা ভালোবাসে! কতটা মিস করে!
অথচ বাস্তবতা হলো; এখন চাইলেও আর আগের মতো একসঙ্গে থাকা সম্ভব নয়।
ভাবতেই বুকটা ভার হয়ে উঠল। জারা খেয়াল করার আগেই জবা মুখ ফিরিয়ে চোখের কোণের জল মুছে ফেলল।
ঘণ্টাখানেক পর গাড়ি এসে থামল ইরফানের বাড়ির সামনে। গেট খোলার আগেই জারা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল।
'বাবা! বাবা!'
বলে দৌড়ে ভেতরে ঢুকে গেল। মনে হচ্ছিল ছোট্ট একটা ঝড় ছুটে যাচ্ছে। ইরফান যেন আগে থেকেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। মেয়েকে দেখার মুহূর্তেই তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
'জারা!'
পরের মুহূর্তেই জারা দৌড়ে গিয়ে বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ইরফান দুহাতে শক্ত করে মেয়েকে জড়িয়েক ধরল। তারপর একের পর এক চুমু খেতে লাগল কপালে, গালে, মাথায়।
যেন এতদিনের সমস্ত অভাব এক মুহূর্তে পূরণ করে নিতে চাইছে।
মেয়ের শরীরের পরিচিত গন্ধটা বুকভরে টেনে নিল সে। এমন সময় হঠাৎ অনুভব করল, ওর
চোখ ভিজে যাচ্ছে। কখন যে চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে, ও নিজেও বুঝতে পারেনি।
জারা ছোট্ট হাত দিয়ে বাবার গাল ছুঁয়ে বলল,
'আমি তোমাকে খুব মিস করি বাবা।'
ইরফানের বুকটা কেঁপে উঠল। আটকে আসা কণ্ঠে বলল,
'আমিও মা। আমিও তোমাকে অনেক মিস করি।'
দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল জবা।বাবা-মেয়ের সেই আলিঙ্গন দেখে তার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।
কিছু সম্পর্ক ভেঙে যায়।
কিছু ভালোবাসা মরে যায়।
কিন্তু বাবা আর সন্তানের বন্ধন,
সেটা ভাঙার ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো বিচ্ছেদের নেই।
ইরফান জবার দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলল,
'থ্যাংক ইউ।'
জবা কোনো উত্তর দিল না। শুধু ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটুকরো হাসি ফুটল। সেই হাসিতে ছিল না উষ্ণতা, ছিল না অভিমানও। যেন বহু ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে আসা এক মানুষের ক্লান্ত সৌজন্য।
ইরফান ধীর কণ্ঠে বলল,
'ভিতরে আসো।'
গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই জবার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। এই বাড়িটা একসময় তার ছিল। এই দেয়ালগুলো, এই বারান্দা, এই সিঁড়ি, এই বাগান; সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তার এক যুগেরও বেশি সময়ের হাসি, কান্না, ভালোবাসা, অভিমান।
কত বিকেল কেটেছে এই উঠানে। কত রাত কেটেছে এই ছাদের নিচে। কত স্বপ্ন গড়ে উঠেছিল এখানে। অথচ আজ...। আজ সে এখানে অতিথি। একজন বাইরের মানুষ।
ভাবনাটা বুকের ভেতর সূক্ষ্ম ছুরির মতো বিঁধল।
ভেতরে ঢুকেই ইরফান ব্যস্ত হয়ে উঠে বলল,
'বসো জবা।'
তারপর জারার দিকে তাকিয়ে বলল,
'মা, আজ তোমার পছন্দের সব খাবার অর্ডার করেছি।'
আবার জবার দিকে ফিরল।
'আর তুমি? তোমার জন্য কফি বানাবো? তোমার সেই ফেভারিট কফি?'
জবার গলা কেমন আটকে এল। জঅভিশপ্ত মন। মানুষের মন সত্যিই বড় বেইমান। যে মানুষটাকে সে ঘৃণা করতে চায়, তার স্মৃতিগুলোই বারবার এসে হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে।
কাগজে-কলমে তাদের বিচ্ছেদ হয়েছে মাত্র দুই মাস। কিন্তু বাস্তবে? বাস্তবে ওরা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আলাদা। একই ছাদের নিচে থেকেও কত দূরে ছিল ওরা!
কোনো স্পর্শ ছিল না। কোনো দাম্পত্য ছিল না। শুধু নামহীন এক সম্পর্কের মৃতদেহ বয়ে বেড়ানো ছিল। আর এখন সেই সম্পর্কও শেষ চিরতরে।
এদিকে জারা পুরোনো বাড়িতে ফিরে যেন খাঁচা থেকে ছাড়া পাওয়া পাখি হয়ে গেছে। এক রুম থেকে আরেক রুমে ছুটে বেড়াচ্ছে।
হাসছে। চিৎকার করছে। মাঝে মাঝে পুরোনো খেলনা খুঁজে পেয়ে আনন্দে লাফিয়ে উঠছে।
আর জবা? সে সোফার এক কোণায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে। যেন এখানে তার থাকার কোনো অধিকার নেই।
হঠাৎ ইরফান এসে ওর সামনে মেঝেতে বসে পড়ল। ধীরে ধীরে জবার দুটো হাত নিজের হাতে তুলে নিল। ওর চোখে জল টলমল করছে। গভীর অনুশোচনায় ভেঙে পড়া এক মানুষের চোখ। কাঁপা কণ্ঠে বলল,
'শুনেছি ডিভোর্সের পর তিনমাস পর্যন্ত সব স্বামী স্ত্রী আবার এক হওয়ার সুযোগ থাকে। সুযোগটা আমরা কাজে লাগাতে পারি না?'
জবা চুপ। ইরফান আরও কাছে সরে এল। বলল,
'জারার জন্য হলেও, আমরা কি আবার শুরু করতে পারি না?'
জবা চোখ বন্ধ করল। এক মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতর পুরোনো স্মৃতিগুলো ঝড় তুলল।
তারপর কঠিন হাতে নিজের বেইমান মনকে শাসন করল।
ধীরে ধীরে হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। জানালার কাছে গিয়ে থামল। বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে। ধূসর আকাশ। ভেজা গাছপালা।
আর ভেতরে এক মৃত সম্পর্কের শেষ নিঃশ্বাস। জবা জানালার বাইরে তাকিয়েই বলল,
'না।'
একটি মাত্র শব্দ। কিন্তু শব্দটার ভেতর ছিল অসংখ্য ভাঙা রাতের আর্তনাদ। ইরফানের বুক কেঁপে উঠল। জবা ধীরে ধীরে বলল,
'আমি আর ভাঙতে পারব না, ইরফান। তাই ভাঙা কোনো স্মৃতিকেও আমি আর জীবনে রাখতে চাই না।'
কথাটা শেষ হতেই ইরফান উঠে এসে ওর পা জড়িয়ে ধরল। বলল,
'প্লিজ জবা...। আরেকটা সুযোগ দাও। প্লিজ...।
ওর কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল।ঠিক তখন পিছন থেকে ফারিস ডাকল।
'জবা।'
জবা ঘাড় ঘুরে তাকাল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে ফারিস। বৃষ্টিভেজা আলো এসে পড়েছে ওর মুখে। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল জবা। তারপর মৃদু হেসে বলল,
'আমার হাতটা ধরবেন, ফারিস ভাই?'
ফারিস স্পষ্টই কিছু বুঝতে পারল না। তবুও এক সেকেন্ড দেরি করল না। হাত বাড়িয়ে দিল। জবা শক্ত করে সেই হাত ধরল। তারপর ইরফানের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
'জারার সঙ্গে সময় কাটানো শেষ হলে কল করো। আমি এসে ওকে নিয়ে যাব।
একটু থামল।'
তারপর যেন শেষ দরজাটাও বন্ধ করে দিল।
'আর হ্যাঁ, ইদ্দত শেষ হলেই আমি বিয়ে করব। তোমার জীবনে ফিরে আসার কোনো ইচ্ছা আমার আর নেই।'
কথাগুলো ইরফানের বুকে গলিত সীসার মতো ঢুকে গেল। উপরের ব্যালকনিতে দোলনায় খেলতে থাকা জারাকে ডাকল জবা।
'মা!'
জারা দোলনা ছেড়ে দৌড়ে এল।
'হ্যাঁ মা?'
'তুমি চাইলে আজ সারাদিন বাবার সঙ্গে থাকতে পারো।'
জারার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল,
'ইয়েইই!'
'আমি সন্ধ্যায় এসে তোমাকে নিয়ে যাব।'
'তুমি থাকবে না?'
জবা কষ্ট লুকিয়ে হাসল।
'না সোনা। অফিসে অনেক কাজ আছে।'
'আচ্ছা।'
জারা আবার ছুটে গেল। জবা আর একবারও পিছনে তাকাল না। ফারিসের হাত ধরে ধীরে ধীরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। আর ইরফান...!
সে বসে রইল। অসহায়ের মতো। নিঃস্বের মতো। চোখের সামনে শুধু দুলছিল জবার আকাশি রঙের শাড়ির আঁচল যা মেঝে ছুঁয়ে দূরে চলে যাচ্ছে।
ধীরে ধীরে দূরে চলে যাওয়া সেই আঁচল যেন তার জীবনের শেষ আশাটুকুকেও সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছিল। বাড়ির বাইরে এসে জবা গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
মনে হলো অনেকক্ষণ পানির নিচে ডুবে থাকার পর অবশেষে শ্বাস নিতে পারছে। ফারিস এখনও বিস্মিত। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। ও জবার দিকে তাকিয়ে বলল,
'কী হলো?'
জবা হালকা হেসে বলল,
'তখন হঠাৎ ফোন করে বললাম চলে আসুন। আপনি চলে এলেন। এখন এসে সব দেখে নিশ্চয়ই কিছুই বুঝতে পারছেন না?'
'সত্যি বলতে কিছুই বুঝছি না।'
জবা আকাশের দিকে তাকাল। মেঘের ফাঁকে একটু আলো ফুটছে। তারপর শান্ত গলায় বলল,
'আমি জানতাম, আমি সামবপ গেলে ইরফান আবার কোনো না কোনো নাটক করবে। তার যোগ্য জবাব দেওয়ার জন্যই আপনাকে ডেকেছিলাম।'
ফারিস ভ্রু কুঁচকাল। বলল,
'শুধু এ জন্য?'
জবার ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটল।
'না। আরেকটা বিষয়ও নিশ্চিত হলাম।'
'কী বিষয়?'
'এখন বলব না।'
'তাহলে কবে?'
কোনো একদিন বলব।'
তারপর হালকা করে মাথা চেপে ধরে বলল,
'এখন চলুন। আমার খুব মাথা ব্যথা করছে। খিদাও লাগছে।'
'কী খাবি?'
'পাস্তা আর কফি।'
ফারিস হেসে উঠল।
'চল তবে। আজ কফি আমার পক্ষ থেকে।'
জবাও মৃদু হাসল। দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। পিছনে পড়ে রইল এক বাড়ি। একটা ভাঙা সংসার। আর একজন মানুষ, যে অনেক দেরিতে বুঝেছে, ভালোবাসা হারিয়ে গেলে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদও মানুষকে সুখী করতে পারে না।
—————
অনেকদিন পর খাদিজার সঙ্গে দেখা হলোা জবার। ছোট্ট সেলাই কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল খাদিজা। মুখে প্রশান্তির ছাপ, চোখেমুখে আত্মবিশ্বাস। জীবন তাকে বহুবার আঘাত করেছে, কিন্তু ভেঙে ফেলতে পারেনি।
জবাকে দেখেই খাদিজা মুচকি হাসল।
জবা এগিয়ে গিয়ে সালাম করল,
'আসসালামু আলাইকুম, আপা।'
'ওয়ালাইকুম আসসালাম।'
খাদিজার কণ্ঠেও ছিল আন্তরিক উষ্ণতা। জবা চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে বলল,
'আপনার বাবু কেমন আছে?'
খাদিজার মুখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
মায়ের মুখে সন্তানের কথা উঠলেই যেমন আলো ফুটে ওঠে, ঠিক তেমন। মুখটা হাসি হাসি করে বলল,
'আল্লাহর রহমতে ভালো আছে। আর তোমার কারণে ভালো আছে, আলহামদুলিল্লাহ।
জবা হালকা হাসল। সেদিনের কথা মনে পড়ে গেল ওর। সেদিন রাগের মাথায় খাদিজাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু রাস্তায় ফেলে দেয়নি।
পৃথিবী যতই নিষ্ঠুর হোক, একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীকে একা ছেড়ে দেওয়ার মতো কঠিন মন জবার ছিল না। মানুষ ভুল করতে পারে। পাপ করতে পারে। কিন্তু একজন মায়ের গর্ভে বেড়ে ওঠা নিরপরাধ শিশুকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কারও নেই।
তাই খাদিজার জন্য আলাদা বাসার ব্যবস্থা করেছিল জবা। দশটা সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছিল। কিছু দক্ষ কর্মী নিয়োগ দিয়েছিল।
বেশ কয়েকটা অর্ডারের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। বাকিটা করেছে খাদিজা নিজে।
নিজের পরিশ্রমে। নিজের আত্মসম্মানে।
আজ সেই দশটা মেশিন এখন ত্রিশটা হয়েছে।
নয়জন কর্মী বেড়ে হয়েছে ত্রিশজন। ছোট্ট একটি সেলাইঘর এখন প্রায় ক্ষুদ্র কারখানায় রূপ নিয়েছে।
জীবনকে নতুন করে গড়ে নিয়েছে খাদিজা।
নিজের ছেলে আর নিজের সম্মান নিয়ে। জবা চারপাশে তাকিয়ে বলল,
'সবকিছু কেমন চলছে আপা?'
খাদিজার চোখে তৃপ্তির ঝিলিক ফুটে উঠল।
'আলহামদুলিল্লাহ, খুব ভালো।'
'কই দেখি, আমার ভাগ্নে কোথায়?'
খাদিজা হাসল।
'ঘুমাচ্ছে। ডাকব?'
'না না।'
জবা মাথা নেড়ে বলল,
'বাচ্চাদের কাঁচা ঘুম ভাঙানো ঠিক না। জেগে উঠলে অনেক কাঁদে।'
'তাহলে বসো। আমি চা নিয়ে আসি।'
'আজ আর বসব না আপা। অফিসে জরুরি কাজ আছে।'
খাদিজা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মনে হলো কিছু বলতে চাইছে, আবার সংকোচেও ভুগছে। শেষ পর্যন্ত ধীরে ধীরে বলল,
'ইরফান কেমন আছে?'
প্রশ্নটা শুনে জবার মুখের হাসিটা একটু থমকে গেল। খুব সামান্য। এতটাই সামান্য যে খেয়াল না করলে বোঝার উপায় নেই। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে জবা বলল,
'ভালো আছে।'
তারপর ঠোঁটের কোণে একরকম ক্লান্ত হাসি ফুটিয়ে যোগ করল,
'যে টাকার জন্য আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছিল, সেই টাকা তো তাকে দিয়েই দিয়েছি। এখন হয়তো সে সেসব নিয়েই সুখে আছে।'
কথাটা বলার সময় কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না। কোনো রাগও ছিল না। শুধু ছিল একরাশ ক্লান্তি। যেন অনেক কেঁদে ফেলা মানুষের চোখে আর জল অবশিষ্ট থাকে না।
খাদিজা চুপ করে রইল। কিছু কথা আছে, যেগুলোর উত্তর দেওয়া যায় না। শুধু শুনতে হয়। আর নীরবে মানুষের কষ্টটুকু অনুভব করতে হয়।
জবা আকাশের দিকে একবার তাকাল। দুপুরের রোদ ঝলমল করছে। জীবনও হয়তো এমনই। কেউ ঝড় পেরিয়ে রোদ খুঁজে পায়।
আবার কেউ রোদে দাঁড়িয়েও বুকের ভেতর একটা অদৃশ্য মেঘ বয়ে বেড়ায়।
—————
ছয় মাস পর....
পৌষ মাস চলেছে। তবুও এ সময়ে বৃষ্টি হচ্ছে খুব। আর এমনই বৃষ্টি যে থামার নামই নিচ্ছে না। সারাদিন ধরে আকাশ কেঁদেছে। সন্ধ্যার পর সেই কান্না আরও গভীর হয়েছে। এখন রাত। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশ আর পৃথিবীর মাঝখানে যেন এক বিশাল জলরাশি ঝুলে আছে। দূরে দূরে বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে গর্জে উঠছে মেঘ। তারপর আবার ঝুপঝুপ শব্দে বৃষ্টি নামছে। সাথে বেড়েছে শীতের তীব্রতা।
জবা নিজের ঘরের আলো নিভিয়ে জানালার পাশে বসেছিল। গায়ে চাদড় জড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল। অন্ধকার ঘরে শুধু বৃষ্টির শব্দ। অদ্ভুত এক বিষণ্নতা ছড়িয়ে আছে চারদিকে। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি নাম। ফারিস ভাই।
নামটা দেখতেই না চাইলেও জবার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। কত অদ্ভুত! কিছু মানুষকে দেখলে মন ভালো হয়। আর কিছু মানুষের নাম দেখলেই...। জবা কল রিসিভ করল।
'হ্যালো।'
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না। শুধু বৃষ্টির শব্দ। মনে হলো ফারিস হয়তো বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। দুজনেই চুপ। কেউ কোনো কথা বলছে না। তবুও নীরবতাটা অস্বস্তিকর লাগছে না। বরং মনে হচ্ছে এই নীরবতারও একটা ভাষা আছে। যে ভাষা শুধু ওরা দুজন বোঝে।কিছুক্ষণ পর ফারিসের গভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
'ঘুমিয়ে পড়েছিস?'
জবা জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
'না।'
আবার কয়েক সেকেন্ড নীরবতায় কাটল। তারপর ফারিস বলল,
'তোদের উত্তরের বারান্দায় আয়।'
জবার বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল, কিন্তু কিছু বলল না। নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল।
ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে উত্তর পাশের বিশাল কাঁচঘেরা বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে তখনও ঝরছে বৃষ্টি।
বারান্দায় পৌঁছে কাঁচের ওপারে তাকাতেই জবা থমকে গেল। ফারিস দাঁড়িয়ে আছে।
সম্পূর্ণ ভিজে। মুষলধারে বৃষ্টির পানিতে তার চুল কপালের ওপর লেপ্টে আছে। শার্ট ভিজে গায়ের সঙ্গে মিশে গেছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো অবিরাম ঝরে পড়ছে তার কাঁধ বেয়ে।
তবুও সে নড়ছে না।
শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জবার দিকে।
দুজনের মাঝখানে কেবল একটা বিশাল কাঁচের দেয়াল। স্বচ্ছ। তবুও অতিক্রম করা অসম্ভব। যেন তাদের জীবনের মতো। একজন এপারে। আরেকজন ওপারে। দুজনের মাঝখানে অদৃশ্য কত নিয়ম, কত দূরত্ব, কত না-বলা কথা।
ফারিস ধীরে ধীরে হাত তুলে কাঁচের উপর রাখল। জবার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর খুব ধীরে নিজের হাতটা তুলে রাখল ঠিক ফারিসের হাতের বিপরীতে।
একটা কাঁচের দেয়াল তাদের আলাদা করে রেখেছে। তবুও সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল,
দুজনের হাত যেন স্পর্শ করে আছে। বাইরে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। ভিতরে নিঃশব্দে কাঁপছে দুটি হৃদয়। কেউ কোনো কথা বলছে না। তবুও এত কথা যেন কখনও বলা হয়নি।
ফারিস কাঁচের ওপাশ থেকে তাকিয়ে রইল জবার চোখে।
সেই চোখে ক্লান্তি আছে। অসংখ্য না-ঘুমানো রাত আছে। ভাঙা স্বপ্ন আছে। আর আছে এক সমুদ্র গভীর বিষণ্নতা।
ফারিসের বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।
কতবার ভেবেছে, যদি এই কাঁচটা না থাকত!
যদি পৃথিবীর সব দূরত্ব এভাবে মুছে যেত!
যদি জবার চোখের জলগুলো নিজের হাতে মুছে দিতে পারত!
কিন্তু কিছু ইচ্ছে মানুষকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। পূরণ করার জন্য নয়। শুধু ভালোবাসার প্রমাণ হিসেবে।
হঠাৎ আকাশ চিরে বিদ্যুৎ চমকাল। সাদা আলোয় এক মুহূর্তের জন্য দুজনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আর সেই ক্ষণিক আলোর ভেতর জবার মনে হলো, এই পৃথিবীতে একটা মানুষ আছে, যে কিছু না চেয়েও তাকে ভালোবেসে যাচ্ছে। বছরের পর বছর। প্রতিদানের আশায় নয়। অধিকারের দাবিতে নয়। শুধু ভালোবেসে যাওয়ার জন্য।
আর সেই উপলব্ধিটাই জবার বুকের ভেতর কোথাও অদ্ভুত এক ব্যথার জন্ম দিল। বৃষ্টির শব্দ আরও জোরালো হলো। কাঁচের ওপরে জমে থাকা জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
মনে হলো, আকাশের কান্না আর মানুষের কান্না মিলে আজ একাকার হয়ে গেছে।
ফারিস ইশারায় বারান্দার দরজা খুলতে বলল। জবা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।
দ্রুত দরজা খুলে বিস্মিত কণ্ঠে বলল,
'ফারিস ভাই! দেশে কবে আসলেন?
এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল,
'এই শীতে, এই বৃষ্টিতে ভিজছেন কেন? জলদি ভিতরে আসুন!'
কথা শেষ না করেই একরকম হাত টেনে ফারিসকে ভেতরে নিয়ে এল।
ফারিসের শার্ট পুরো ভিজে বুকের সঙ্গে লেপ্টে আছে। চুল থেকে টুপটাপ পানি ঝরছে। জবা ছুটে গিয়ে তোয়ালে নিয়ে এল। তোয়ালেটা ফারিসের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
'দ্রুত গা মুছে নিন। আমি বাবার কাপড় আনছি। ঠান্ডা লেগে যাবে তো!'
ফারিস হঠাৎ ওর হাতটা ধরে ফেলল। জবা থমকে দাঁড়াল। ফারিস এক টানে ওকে কাছে এনে ধীরে ধীরে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
'ঠান্ডা লাগবে না।'
তার চোখদুটো গভীর হয়ে উঠল। বলল,
'তুই যে আগুনে জ্বালাচ্ছিস, তারপর ঠান্ডা লাগার প্রশ্নই ওঠে না।'
জবার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। চোখ নামিয়ে ফেলল। কী উত্তর দেবে বুঝতে পারল না। বৃষ্টির পানিতে ভেজা ফারিসের শার্ট বুকের সঙ্গে লেপ্টে আছে। জবার অদ্ভুত লাগছে। তীব্র এ ঠান্ডায় বৃষ্টিতে ভিজে ফারিসও কাঁপছে। জবা ফিসফিস করে বলল,
'কাপড় পাল্টে নিন। জ্বর হবে আপনার।'
'হোক জ্বর। তাতে তোর কী?'
প্রশ্নটা শুনে জবা আরও অস্বস্তিতে পড়ে গেল। বিষয় ঘোরাতে বলল,
'দেশে কবে আসলেন?'
ফারিস মৃদু হাসল। বলল,
'এসেই তোর কাছে আসলাম।'
তারপর অনেকদিনের জমে থাকা ক্লান্তি মিশে গেল কণ্ঠে। বলল,
'তোকে দেখার জন্য চোখ দুটো শুকিয়ে যাচ্ছিল।'
একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,
'চোখে তাকিয়ে দেখ, বুকে মাথা রেখে দেখ কতটা শুকনো আমার পৃথিবী।'
জবার গলা শুকিয়ে গেল। ঢোক গিলল ও। কিছু বলতে পারল না। মনে মনে ফারিস বলল,
'ফারিস ভাই, মদ খেয়েছে না কি?'
হঠাৎই ও এগিয়ে গিয়ে ফারিসের মুখের কাছে নাক নিয়ে গন্ধ শুঁকল। ফারিস অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। জবা বলল,
'মদটদ তো খাননি। তাহলে নেশাগ্রস্ত মানুষের মতো কথা বলছেন কেন?'
ফারিস হেসে ফেলল। সেই হাসির ভেতরেও ছিল বিষণ্ণতা। বলল,
'তুই যে নেশা ধরিয়ে রেখেছিস, তারপর অন্য কোনো নেশার দরকার হয় না।'
আর দাঁড়াতে পারল না জবা। দ্রুত সরে গেল।
যাওয়ার সময় শুধু বলল,
'জলদি গেস্ট রুমে যান। আমি কাপড় নিয়ে আসছি।'
কিছুক্ষণ পর কাপড় পাল্টে কম্বলের নিচে শুয়ে ছিল ফারিস। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। ঠান্ডা শরীরে বাসা বেঁধেছে। জ্বর এসে পুরো শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছে। জবা ভীষণ অস্থির হয়ে পড়ল। আজ বাড়িতে আর কেউ নেই। বাবা, মা, জারা সবাই আগের দিন বরগুনা গেছে।
পুরো বাড়িতে এখন শুধু ও আর ফারিস।
এই শীতের ঝড়ের রাতে ফারিসের হঠাৎ আগমন যেন ওর জীবনে ছোটখাটো কোনো ঘটনা নয়, একেবারে ভূমিকম্প।
জ্বরের ঘোরে ফারিস কাতরাচ্ছে। জবা দ্রুত ডাক্তারকে কল করল। সব শুনে ডাক্তার কিছু ওষুধের নাম বললেন। সৌভাগ্যবশত ওষুধগুলো বাড়িতেই ছিল। জবা নিজ হাতে ফারিসকে ওষুধ খাইয়ে দিল। পানি খাওয়াল।
মাথায় ভেজা কাপড় দিল।
তারপর উঠে চলে যেতে চাইলে হঠাৎ ফারিস ওর হাতটা ধরে ফেলল। জবার বুক কেঁপে উঠল। ফারিস চোখ মেলে তাকাল। জ্বরের ঘোরে চোখদুটো আরও গভীর লাগছে। কাঁপা গলায় বলল,
'জবা...!'
'একটা নিষিদ্ধ দাবি করি তোর কাছে?'
জবা চুপ। ফারিস মৃদু স্বরে বলল,
'আজ আমার বুকে একটু মাথা রাখবি?'
ওর গলা ভেঙে গেল। বলল,
'আমার খুব কষ্ট হচ্ছে রে। কেন যে তোকে এত ভালোবাসলাম! এখন না পারছি তোকে ভুলতে, না পারছি অন্য কাউকে এই মনে জায়গা দিতে।'
জবা স্থির হয়ে রইল। তারপর...! হয়তো এই মানুষটার এত বছরের অপেক্ষার কাছে সে হেরে গেল। হয়তো এত নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে আর ফিরিয়ে দেওয়ার শক্তি রইল না। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ফারিসের বুকে মাথা রাখল।
মুহূর্তেই ফারিস দুহাত দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল। চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
'আহ শান্তি। এ জীবনে এত শান্তি আমি কখনো পাই নি।'
ঘরের বাইরে তখনও বৃষ্টি ঝরছে। অবিরাম।অবিরত। আর ঘরের ভেতরে বহু বছরের একতরফা ভালোবাসা প্রথমবারের মতো একটু আশ্রয় পেল।
কতক্ষণ এভাবে কেটে গেল কেউ জানে না।
একসময় জবা অনুভব করল, ফারিসের শরীরের তাপমাত্রা কমছে। শ্বাসপ্রশ্বাসও স্বাভাবিক। সে ঘুমিয়ে পড়েছে। গভীর, নিশ্চিন্ত ঘুমে। জবা ধীরে ধীরে মাথা তুলল। অনেকক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। ঘুমন্ত মানুষের মুখ এত শান্ত হয়?
তারপর সাহস করে হাত বাড়িয়ে ফারিসের গালে আলতো স্পর্শ করল। মনে মনে বলল,
'কেন এত ভালোবাসলেন আমায়? আর কেন-ইবা এত কষ্ট পাচ্ছেন।'
সকালে ঘুম ভাঙল ফারিসের। ঘুম থেকে উঠে নিজেকে ধাতস্থ করতে বেশ সময় লাগল ওর। মনে পড়ল নিজের করা পাগলামীর কথা৷ লজ্জায় তখন মাটিতে মিশে যাচ্ছিল ও।
কিছুদিন যাবত জবাকে দেখার জন্য মনটা ভীষণ পুড়ছিলো ওর। মাস তিনেক আগে লন্ডন চলে গিয়েছিল। কাজে নিজেকে ডুবিয়ে ফেলেছিল, কিন্তু শত ব্যস্ততায়ও মাথা থেকে জবা বের হয়নি। আর কদিন যাবত তো মনে হচ্ছিল জবাকে সামনে থেকে এক নজর না দেখলে মরেই যাবে। তাই ইমার্জেন্সি টিকিট কেটে চলে আসল দেশে।
দেশে ফিরেই সোজা জবার বাড়ি আসল। বৃষ্টি ছিল। ঝড় ছিল। কিন্তু সেদিকে খেয়াল করার সময় কোথায় ছিল? ওর মাথায় তখন একটাই চিন্তা জবাকে দেখতে হবে। একবার। শুধু একবার। এখন মনে হচ্ছে সবকিছু ভীষণ বোকামি হয়েছে। ঝোকের মাথায় কাজগুলো করলেও এখন অস্বস্তি হচ্ছে। একবার ভাবল, জবা ঘুম থেকে ওঠার আগেই চুপচাপ পালিয়ে যাবে।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
জবার কণ্ঠ ভেসে এল,
'ফারিস ভাই নাস্তা রেডি। নিচে আসুন।'
ডাইনিং টেবিলে বসে ফারিস অস্বস্তিতে মাথা নিচু করে রইল। কিন্তু জবা এমন স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে যেন গত রাতে কিছুই ঘটেনি। যেন সবটাই স্বাভাবিক। যেন কোনো অস্বস্তি নেই। কোনো প্রশ্ন নেই। কোনো দাবি নেই। তবে কী ওসব ফারিসের মনের ভুল।
নাস্তা করতে করতে জবা বলল,
'কদিন থাকবেন এবার?'
ফারিস কাপের দিকে তাকিয়ে বলল,
'শীঘ্রই চলে যাব।'
'ওহ।'
একটি মাত্র শব্দ। কিন্তু কেন জানি সেই শব্দের ভেতরে হালকা একটা শূন্যতা শুনতে পেল ফারিস। তবুও কিছু বলল না। শুধু মনে মনে ভাবল,
'এই মেয়েটা কী দিয়ে তৈরি? এত বড় ঝড়ের মধ্যেও কীভাবে এত স্বাভাবিক থাকতে পারে?'
তারপর নিজেই উত্তর খুঁজে পেল। কারণ সে জবা চৌধুরী। সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজের অনুভূতিগুলো আড়াল করে রাখতে জানে।
—————
আজ ফারিস লন্ডন চলে যাবে। রাত দুটোর ফ্লাইট। এখনই ঢাকা রওনা হতে হবে। এরপর দেশে আসতে অনেক দেরী আছে।
জবা তখন অফিসের কাজে ডুবে ছিল। টেবিলজুড়ে ফাইলের স্তূপ, ল্যাপটপের স্ক্রিনে একের পর এক রিপোর্ট। কাজের চাপ এতটাই ছিল যে দুপুর থেকে একবারও ঠিকমতো শ্বাস নেওয়ার সময় পায়নি। ঠিক তখনই খবর এলো, ফারিস এসেছে।
খবরটা শোনার পর মুহূর্তের জন্য থমকে গেল জবা। অদ্ভুতভাবে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কেন কাঁপল, সে প্রশ্নের উত্তর জবা নিজেও জানে না।
ফাইলগুলো বন্ধ করে, অসমাপ্ত কাজগুলো টেবিলে ফেলে রেখে দ্রুত বেরিয়ে এলো।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল ফারিস।
সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। এক হাতে গাড়ির চাবি। অন্য হাত পকেটে ঢুকানো। চেহারায় সেই চিরচেনা শান্ত হাসি।
জবাকে দেখেই মৃদু হেসে বলল,
'আমার ফ্লাইট রাত দুটোয়। এখন ঢাকা রওনা হব।'
কথাটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু জবার মনে হলো কেউ যেন নিঃশব্দে বুকের ভেতর থেকে কিছু একটা তুলে নিয়ে গেল। একটা অদ্ভুত শূন্যতা এসে বসলো হৃদয়ের মাঝখানে। তবুও ও কিছু বুঝতে দিল না। শুধু জিজ্ঞেস করল,
'চলে যাচ্ছেন?'
'হ্যাঁ৷'
'কেন?'
ফারিস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
'থেকে যাওয়ার কারণ তো নেই কোনো?'
জবার মুখে আঁধার নামল। মলিন মুখে ফিসফিস করে বলল,
'কেন ভালোবাসলেন আমায় এত? কারণ কী ছিল?'
ফারিস হাসল। একটা শান্ত, ক্লান্ত, অথচ আশ্চর্য রকমের কোমল হাসি। বলল,
'কারণ তো জানি না।'
সে কিছুক্ষণ জবার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
'ভালোবাসার জন্য কোনো কারণ তো লাগে না। কারণ তো ভালো না বাসার জন্য খোঁজে মানুষ। ভালোবাসতে চাইলে কোনো কারণ খোঁজে না।'
বাতাসে জবার খোঁপা থেকে বেরিয়ে আসা কয়েকটি চুল উড়ছিল। ফারিস সেদিকে তাকিয়ে বলল,
'যদি শুধু কারণ বলতে বলিস, তবে একটা কারণ বলা তো সম্ভব নয়...।'
একটু থামল ফারিস। চোখে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে রইল জবার দিকে বলল,
'এই যে দাঁড়িয়ে আছিস। চুলের খোঁপায় একটা কলম গুঁজে রেখেছিস। অফিসের কাজে ব্যস্ত হয়ে হয়তো খেয়ালও করিসনি।'
জবা অবচেতনভাবে খোঁপায় হাত দিল।
ফারিস মৃদু হেসে বলল,
'জানিস, এই মুহূর্তে তোকে কী অসাধারণ লাগছে?'
জবা কিছু বলল না। ফারিস বলল,
'এই দৃশ্যটাও ভালোবাসার একটা কারণ হতে পারে।'
নিস্তব্ধতা নেমে এলো। দুজনেই চুপ। হাজারটা কথা ছিল। কিন্তু কোনো কথাই মুখে আসছিল না। শেষ পর্যন্ত ফারিসই নীরবতা ভাঙল।
'চললাম। ভালো থাকিস। নিজের খেয়াল রাখিস। সাবধানে পথ চলিস।'
সে ঘুরে দাঁড়াল। জবার বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। কেন উঠল সে জানে না। শুধু মনে হলো, মানুষটা চলে গেলে কিছু একটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। মন বারবার বলছে ওকে যেতে দিও না। কিন্তু মুখে বলার সে সাহস হলো না। তবে তাড়াহুড়ো করে ডেকে উঠল,
'ফারিস ভাই!'
ফারিস থামল। পেছন ফিরে তাকাল।
জবা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
জবা তাড়াহুড়ো করে বলল,
'আবার কবে আসবেন?'
ফারিসের চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা নেমে এলো। মনে হলো উত্তরটা সে নিজেও জানে না। অবশেষে মৃদু হেসে বলল,
'জানি না।'
দুটি শব্দ। মাত্র দুটি শব্দ। কিন্তু সেই দুটি শব্দের ভেতরে যেন লুকিয়ে ছিল হাজার মাইল দূরত্ব, অগণিত অপেক্ষা, আর এক জীবনের না-পাওয়া ভালোবাসা।
ফারিস চলে গেল। জবা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যতক্ষণ না গাড়িটা চোখের আড়াল হয়ে গেল। তারপরও। আরও অনেকক্ষণ।
·
·
·
চলবে……………………………………………………