নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া - পর্ব ১৩ - লাবিবা ওয়াহিদ - ধারাবাহিক গল্প

নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া
          বিকালের আকাশটা আজ মেঘলা। এই মেঘলা দিনে সাহিদ এসেছে এক ফাইভ স্টার হোটেলে। তার মা জোরপূর্বক তাকে এখানে পাঠিয়েছে, বিভিন্ন ভাবে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করে। নয়তো তার এই বিকালের সময়ে এদিকে আসার কোনো ইচ্ছেই ছিল না। ইসমাত এখনো আসেনি, খুব সম্ভবত কোনো মিটিং এ ফেঁসে গেছে, সাভারে আছে সে। আসতেও তো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার আছে। সাহিদ এতকিছু না ভেবে একটা প্রাইভেট পুল পেল। ব্যাস, সে দ্রুত নেমে পড়ল। তার বৃষ্টি-বাদলার দিনে পুলে নামতে বেশ আরাম লাগে। কেমন বৃষ্টির পানি আর পুলের পানি মিশে একাকার হয়ে যায়। যদিও তার বৃষ্টিতে একটু সর্দির সমস্যা হয়, তবে সে তোয়াক্কা করল না।

সাহিদের জন্মদিন গিয়েছে সবে পাঁচ দিন। এক কাজিনের থেকে সে ফ্রান্সের দুটো টিকিট পেয়েছে। বেশ ভালোরকম একটা সুযোগ। কাজিন যদিও বলেছে দুজন যেতে, তবে সে একা গিয়ে ঘুরে আসার ফন্দিতে ছিল। সে কখনোই কোনো ট্যুরে মেয়ে মানুষ টানাটানি করেনি, ইসমাতকে তো আরও করবে না। সেদিন নাচের পর ইসমাতকে এখন আর গলা উঁচিয়ে কথা বলতে দেখা যায় না। কেমন যেন এড়িয়ে চলে, নজর লুকায়। এই ব্যাপারটা সাহিদ খুব উপভোগ করে। যাই হোক, ভাঙা রেডিয়োটা তো বন্ধ হয়েছে। মাঝেমধ্যে এসব নাটক করেও যে পার পাওয়া যায় জানা ছিল না। পরমুহূর্তেই আবারও ইসমাতের সাথে আজকের রাত কাটাতে হবে ভেবে কপালে ভাজ পড়ল। মা সেদিন তার ঘরে তোষক দেখার পর থেকেই আবারও বিভিন্ন চাল চালতে ব্যস্ত। বারবার তাকে এই সেই রিসোর্টের সাজেশন দিচ্ছে। ফ্রান্স যাওয়া নাকি বন্ধ। ফ্রান্সের ফ্লাইট অবশ্য আগামী মাসে, এই মাসটা সে ভরপুর শপিং করবে ভেবেছিল। কিন্তু মা আর তা হতে ইচ্ছে কোথায়?

 সাহিদ পুল থেকে উঠে দাঁড়াতে কোত্থেকে এক যুবতী মেয়ে এসে দাঁড়াল। সাহিদের বিরক্তিতে কপালে ভাজ পড়ল, এটা তো প্রাইভেট পুল। এখানে বাহিরের মানুষ আসছে কীভাবে? মেয়েটা অমায়িক হেসে বলল,
--"আমাকে চিনতে পারছেন? আমি কনটেন্ট ক্রিয়েটর রোদসী! আপনার সাথে যে আপনার জন্মদিনে দেখা হলো। আমি নর্থ সাউথে পড়ছি।"

কনটেন্ট ক্রিয়েটর? মুহূর্তেই তার মুখ জুড়ে বিতৃষ্ণা ছেয়ে গেল। রোদসী লাজ-লজ্জা ভুলে চোখ বড়ো বড়ো করে সাহিদের পেটানো শরীর দেখছে। সাহিদ তার গায়ে তোয়াল জড়িয়ে তাকে এড়িয়ে চলে যেতে নিলে সাহিদের হাত ধরে বসল। সাহিদ গরম চোখে তাকাল,
--"ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিট, মিস.. হোয়াটেভার।"

বলেই সাহিদ চলে যেতে লাগল। রোদসী তার পিছু নিল।৷ ততক্ষণে বৃষ্টি নেমেছে, সন্ধ্যা হয়ে আসছে। সাহিদ প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে ইসমাতকে মেসেজ করল,
--"আপনি কখন আসবেন? নাকি মমকে কল দিব?"

পরপর ইসমাতের মেসেজ এলো,
--"থার্টি মিনিটস!"

সাহিদ পিছে ফিরে দেখল মেয়েটা কেমন চিপকে আছে। 
--"এনি প্রব্লেম?"

--"ন..না মি. সাহিদ। আপনার সাথে আলাপের ইচ্ছে হলো.."

--"আই এভয়েড স্ট্রেঞ্জার্স! লিভ অর আই'ল কল সিকিউরিটি!"

রোদসী নামের মেয়েটাকে কিছুটা হতাশ দেখাল, সে চলে গেল। সাহিদ তৎক্ষণাৎ হোটেল ম্যানেজমেন্টকে ব্যাপারটা জানাল। তারা প্রাইভেট পুলের নাম করে একজন অচেনা-অজানা মেয়েকে পুলে ঢুকতে দিল কোন সাহসে? ম্যানেজার কাচুমাচু হয়ে বলল,
--"কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ছিল স্যার। কথা না শুনলে যদি.. মানে.. আমাদের রেপুটেশনের ব্যাপার তো!"

সাহিদ এতে চরম রেগে গিয়ে বলল,
--"ওহ আচ্ছা! একজন ভিআইপি কাস্টমারের প্রাইভেসির চাইতে রেপুটেশন বড়ো হয়ে গেল? শেইম! আপনাদের আমি দেখে নিব।"

ম্যানেজমেন্ট বিভিন্ন ভাবে সাহিদের কাছে ক্ষমা চাইতে লাগল। কিন্তু সাহিদ তাতে বিন্দুমাত্র কান দিল না। একটা ফাইভ স্টার হোটেলে এত বাজে সার্ভিস? আগে জানলে তো সে ভুলেও এখানে আসত না। যেসব ব্যাপার তার জন্য চরম ঘৃ ণার হয় তার সাথে সেসবই হচ্ছে। ঝামেলা গুরুতর হওয়ার আগেই ইসমাত এসে হাজির হলো। সে কোনোমতে ব্যাপারটা সামাল দিল। ম্যানেজমেন্টের লোকেদের বিদায় করে ইসমাত তাকাল সাহিদের দিকে।
--"ভেতরে চলো।"

সাহিদ ভেতরে গেল না। আবারও ফিরে গেল পুলের দিকে। কয়েকটা ডুব দিয়ে মাথা ঠান্ডা করা প্রয়োজন।
--"ফলো মি, ইসমাত। আম নট ডান য়েট!"

ইসমাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাহিদের পিছু নিল। সাহিদ পুলে গিয়ে আবারও তার বাথরোব খুলে ফেলল। ইসমাত অন্যদিকে চোখ ঘুরাল। তার মোটেও সাহিদের শার্টহীন শরীর দেখার ইচ্ছে নেই। সেটা সাহিদ বিশেষ খেয়ালও করেনি৷ সে এখনো তার প্রাইভেসি নিয়ে চিন্তিত। 
--"ইসমাত, আমি বলে রাখছি। খবরদার কেউ যেন এদিকে না আসে৷ আই ডোণ্ট লাইক স্ট্রেঞ্জার্স। পাহারা দিবেন, বুঝলেন?"

ইসমাত ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
--"আমি কী তোমার বডিগার্ড নাকি?"

--"বডিগার্ড না হন, বউ তো! নাচতে পারেন অথচ হাসবেন্ডকে সিকিউরিটি দিতে পারবেন না? সো ব্যাড!"

ইসমাত গরম চোখে তাকাল। এহ! সাহিদ এমন ভাবে বলছে যেন সে নাচার জন্য ম রে যাচ্ছিল? সাহিদই তো তাকে টেনে নিয়েছিল! এই ছেলে আস্ত এক গিরিঙ্গি! কখন কী করে, বলে— নিজেও জানে না। এই ইসমাতকে তার সহ্য হয় না, আবার বউ বউ করে মুখের লালা ফেলছে, অসহ্য! ইসমাত মিনমিন করে বলল,
--"তোমার মতো বেয়াদব ছেলে আমি জীবনে দুটো দেখিনি।"

--"সো হোয়াট? আপনি তো ঘুরেফিরে এই একমাত্র বেয়াদবের ঘাড়েই ঝুলে আছেন। স্যাড বলব নাকি সার্কাজম, ইসমাত?"

ইসমাত কথায় পারল না। সে একপাশে গিয়ে ছাউনির নিচেই বসে রইলো। হাতে তার ফোন। সে অফিসিয়াল কিছু ডকুমেন্ট দেখছে, ডিজাইন ডিপার্টমেন্ট থেকে পাঠিয়েছে। সাহিদ তখন মনের মাধুরী মিশিয়ে বৃষ্টির সাথে সুইমিং পুলে ডুব দিচ্ছে। এতেই বুঝি তার মাথাটা ঠান্ডা হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে রোদসীর ব্যাপারটা ভুলে গেল। এতক্ষণে সন্ধ্যা শেষে রাত নামছে। ইসমাতকে তার শাশুড়ি কল করেছে। সে সঙ্গে সঙ্গে কল রিসিভ করল। ওপাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠে ভেসে উঠল,
--"গেছ?"
--"জি আম্মা।"
--" ক্যান্ডেল ডিনারের ব্যবস্থা হয়েছে তোমাদের বেলকনিতে। আশা রাখছি এবার অন্তত সম্পর্কটাকে নিয়ে সিরিয়াস হবে।"

ইসমাত নীরব রইলো, সময় নিয়ে বলল, "জি।"
--"সাহিদ কোথায়?"
--"পুলে।"

--"হুঁ। আর কোনো অযুহাত শুনছি না ইসমাত। এবার আমি দাদী ডাক শুনতে চাই।"

ইসমাত এবারও নীরব। শাশুড়ি তাকে আরও কিছু জ্ঞান দিয়ে কল কেটে দিল। বৃষ্টি এতক্ষণে থেমে গেছে। সাহিদ বেশিক্ষণ ভেজা শরীরে থাকল না। সর্দি লাগার আগেই উঠে এলো, পুণরায় বাথরোবটা গায়ে জড়িয়ে নিল। তোয়ালে মাথা মুছতে মুছতে ফির ইসমাতের দিকে। ইসমাত এতক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে।
--"এবার ঘরে যাবে নাকি তোমাকে ফেলেই চলে যাব?"

সাহিদ ভ্রু কুঁচকে বলল,
--"লেকচার শুনেছেন নাকি? হঠাৎ ক্ষেপে যাচ্ছেন কেন?"

ইসমাত কথা বাড়াল না। ভেতরে চলে গেল রুমের দিকে। সাহিদ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে সেও চলে গেল। রুমে গিয়ে দেখল তার মা অনেক আয়োজনই করে রেখেছে। বেলকনিতে বিভিন্ন ক্যান্ডেল আর ফুলে ভর্তি। রুমেও ব্যতিক্রম নয়। যেন তারা হানিমুনে এসেছে। সাহিদ বিরক্ত হলো না। হেয়ার ড্রায়ারে চুল শুকাতে শুকাতে বলল,

--"মায়ের এত এফোর্ট দেখে করুণা হচ্ছে।"

ইসমাত একপলক তাকাল সাহিদের দিকে। পরপর সে বাথরুমে ঢুকে পড়ল। কিছুক্ষণের মাঝেই সে ড্রেস বদলে এখন একটা সুন্দর থ্রি-পিছ পড়ল। আঘানূরের। পাকিস্তানি ব্র‍্যান্ডেরই। ইসমাতের কেন যেন এই ধরণের নরম কাপড়ের বড়ো হাতার থ্রি-পিছগুলা খুব পছন্দ। তার কালেকশনে অনেক ধরণের থ্রি-পিছ আছে। একেকটার হাতা আর গলার ডিজাইনগুলোই বেশি আকর্ষণীয়। এগুলা বেশিরভাগ ইম্পোর্টেড। তার শাশুড়ি ইসমাতের পছন্দ অনুযায়ী আনান। 

ইসমাত বিছানায় বসল, বারান্দায় এখনো যায়নি। তার হাতে একটা প্যাকেট। সেটা আয়না দিয়ে দেখল সাহিদ। ভ্রু নাচিয়ে ফিরে তাকাল। চোখ-মুখে প্রশ্নের ছায়া। সেই নজর লক্ষ্য করেই ইসমাত নজর সরাল। অন্যদিকে ফিরে বলল,
--"তোমাকে তো জন্মদিনের উপহার দেওয়া হয়নি।"

--"এক্সপায়ার্ড বার্থডে গিফট?"

ইসমাত বিছানার পাশে র‍্যাপিং কাগজে মোড়ানো ছোটো গিফটটা রাখল। সাহিদ কিছুটা কৌতুহল নিয়ে গিফটটা হাতে নিল। 
--"টু ব্যাড.. ইসমাত! গিফট হাতে দিতে হয়।"

ইসমাত সে কথা শুনেও শুনল না। সে কেন যেন জন্মদিনের দিন দিতে পারেনি উপহার। এত এত গিফটের মাঝে তার অস্বস্তি হচ্ছিল। সাহিদকে দেওয়ার মতো বিশেষ কিছু নেই, এই ছেলে সবই পেয়েছে। ব্র‍্যান্ডেড কিছু পছন্দ হবে কিনা সে নিয়েও সে বেশ দোটানায় ছিল। শেষমেষ এই ছোটো উপহারের কথাই মাথায় এলো। আজ সাহস করে গিফটের মালিককে তা বুঝিয়ে দিল। তবুও কোথাও একটা খুঁতখুঁত লেগে আছে, পছন্দ হবে তো? সে মনে মনে চাইল, সাহিদ এটা ফেলে দিলেও তার সামনে যেন না ফেলে। এতে খুবই অপমা নিত হবে সে। 

সাহিদ দ্রুত হাতে প্যাকেট খুলে অবাক হয়ে গেল। একটা বক্স। বক্সের ওপরে তার প্রিয় এক এনিমে ক্যারেক্টার। এই চরিত্রকে ইসমাত প্রায়ই সাহিদের পিসি সেটআপের ওয়ালপেপারে দেখত। সাহিদ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
--"এটা কি?"

--"খুলেই দেখো।"

সাহিদ খুলে অবাক হয়ে গেল। একটা সুন্দর ব্লুটুথ। তার এনিমে ক্যারেক্টারের স্পেশাল এডিশন এটা। সাহিদের সংরক্ষণে বিভিন্ন লিমিটেড এডিশনের চরিত্রের জিনিসপত্র আছে। তবে এটা সত্যিই ভিন্নরকম। ব্লুটুথের উপরের কভারটাও কাঠের তৈরি। কি দারুণ কম্বিনেশন। সাহিদের ভাবমূর্তি প্রকাশ পেল না। সে বারান্দায় চলে গেল।
--"আসবেন নাকি কোলে তুলে আনতে হবে?"

ইসমাত তাকাল সাহিদের দিকে। সাহিদের হাতে এখনো তার উপহারটা। ইসমাত আশা করেছিল সাহিদ কিছু বলবে, কিন্তু সে কিছুই বলল না। ইসমাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের চেয়ার টেনে বসল। সাহিদ মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
--"স্মাইল ইসমাত, মম নিশ্চয়ই এখানে ফটোগ্রাফার রেখেছে আশেপাশে। আবার লেকচার শুনতে না চাইলে কিপ স্মাইল!"

ইসমাতও জানে, তার শাশুড়ি কিছু তো করেছে এই বারান্দাতে। তাই সেও না চাইতেও সাহিদের কথা মেনে নেয়। তার শাশুড়িকে দেখাতে হবে তো সে এফোর্ট দিচ্ছে। ইসমাত সাহিদের পাতে খাবার তুলে দিল। 

--"বাহ, আপনি তো দেখছি পাক্কা এক্ট্রেস!"

--"এক্ট্রেসের বোন আমি, কিছু তো গুণ থাকবেই।"

—————

ইসমাত আর সাহিদ আবারও নিজেদের জীবনে ফিরেছে বেশিদিন হয়নি। ইসমাত ব্যস্ত নতুন প্রজেক্ট নিয়ে, আর সাহিদ ব্যস্ত ফ্রান্সে যাওয়ার জন্য শপিং নিয়ে। এছাড়া বন্ধু, ম দ, গেম তো আছেই। ইসমাত জানে সাহিদ ফ্রান্সে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার নামেও যে টিকিট কাটা হয়েছে সেটাও জানে। কিন্তু প্রজেক্ট নিয়ে সে এতটা ব্যস্ত যে সাহিদের সাথে বসে যে দুটো কথা বলবে সেই সুযোগটুকু নেই। মাহফুজ সাহেব তাকে বেশ গুরু দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন। তিনি আবার গেছেন বিজনেস ট্রিপে, ইউকে তে। এখানে ইসমাত, রমযান সাহেব আর বাকি কয়েকজন সামলাচ্ছে সব।

সপ্তাহখানেক পর মাহফুজ সাহেব ফিরলেন। সেদিনই ঠিক বিকালের দিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় উত্তাল শুরু হলো। এক কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের প্রেস কনফারেন্স ইন্টারনেট জগতে ভাইরাল হলো। মেয়েটা আর কেউ নয়, রোদসী। সে কান্নারত মুখ নিয়ে মিডিয়ার সামনে বসা। বিরাট অভিযোগ নিয়ে। "আয়াজী এলিট"- এর একমাত্র বংশধর নিয়ে এই অভিযোগ। মেয়েটা মিডিয়ার সামনে কান্নাকাটি করে সবাইকে জানায় তার সাথে সাহিদের সম্পর্ক আছে। সাহিদের সাথে তার নিয়মিত বিভিন্ন হোটেলে যাতায়াত ছিল, সাহিদ নাকি তাকে ভোগ করত। এখন নাকি ছুক্বড়ে ফেলে দিয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রমাণ হিসেবে তাদের প্রাইভেট পুলের ঘনিষ্ঠ ছবি, আর করিডোরেও। 
 
সোশ্যাল মিডিয়ায় দারুণ রকম ভাইরাল হলো ব্যাপারটা। চারপাশ থেকে সবাই ধিক্কার জানাচ্ছে, কথা শোনাচ্ছে সাহিদকে। কুরুচিপূর্ণ বিভিন্ন মন্তব্যে সব জায়গায় ভরপুর। রোদসী সে রকম পরিচিত মুখ ছিল না, কিন্তু এটুকু কাহিনীতেই মেয়েটা অল্প সময়েই পরিচিত মুখ হয়ে উঠল, হুড়মুড়িয়ে বাড়ল তার ফলোয়ারের সংখ্যা।

এসবের কিছুই জানত না সাহিদ। সন্ধ্যার পর যখন বাইক নিয়ে এই হাইওয়েতে বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা করছিল তখনই তার ফোন হ্যাং করা শুরু করে। সে নিরিবিলি সব দেখে, বুঝে। মেয়েটাকে চিনতে তার অসুবিধে হলো না। সাথে এও বুঝল এগুলো খুবই নিখুঁত সাজানো পরিকল্পনা, একমাত্র তাকে ইমেজ ডাউন করার উদ্দেশে। যেই সাহিদ অল্পতেই হাইপার হয়ে যায়, সে আজ হাইপার হলো না। বরং সে অস্বাভাবিক নীরব রইলো। পরপর কয়েক ঘণ্টার মাঝে এটাও উঠে এলো, সাহিদের নাকি তাদের অফিসের একজন সিনিয়র মেম্বারের সাথে অবৈধ প্রেম। তার চরিত্র নিয়ে চর্চা সবখানে। আরেকটা ছবিও প্রকাশ পেল, যেখানে পার্কিংলটে সাহিদ একজন মেয়েকে পেসেঞ্জার সিটে বসাচ্ছে। সেই মেয়েটা ইসমাত, তবে ছবিতে তার পেছন সাইড বোঝা যাচ্ছে। এখানে যে শুধু একজন জড়িত, তা মনে হলো না। বরং সংগঠিত বিপরাট পরিকল্পনা। সাহিদের আর তার বাবার শত্রুর অভাব নেই। তার জন্মদিনের দিনই তাকে কোম্পানির পরবর্তী উত্তরাধিকার ঘোষণা করেছে। তাই তাকে নিচে নামানোটা অস্বাভাবিক না। 

সাব্বির ব্যস্ত ছিল তার বড়ো ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে। সে খবর পেতেই দ্রুত কল দিল বন্ধুকে। সাহিদ কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বলল,
--"যেখানে আছিস সেখানেই থাক। আসছি আমরা। ৩০০ ফিটে রাইড দিব। বাকিরা আসছে।"

--"হুঁ।"

কল কাটতেই সাহিদ আবারও তার ইনবক্স চেক করল। ইনবক্স স্ক্রল করতে গিয়ে একই নামের সে একটা নতিফি পেল। প্রায় অনেকদিন যাবৎ আনসীন। মেয়েটার নাম রোদসী, জ্বলজ্বল করছে। সে সিন করল মেসেজটা। যেই ছবি ফেসবুক জুড়ে ভাইরাল সেই ছবিটাই আরও অনেকদিন আগে এখানে দিয়ে রাখা। সাথে মেয়েটার একটা মেসেজ,
--"আমার আবদার মেটান নয়তো এই ছবিটি ভাইরাল করব। ক্যারিয়ার কিন্তু বর বাদ।"

"আপাতত পঁচিশ লাখেই চলবে।"

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সাহিদ এতদিন ইনবক্স চেক করার সুযোগই পায়নি। এই মেসেজ আরও আগে চোখে পড়লে হয়তো আজ এসব নাটক হতো না। এবারও সাহিদ অস্বাভাবিক নীরব। 

—————

অফিসেও এই খবর ছড়াতে বেশি সময় নিল না। সবখানে ইসমাতকে নিয়ে কানাঘুষা চলছে। এই গরম চর্চায় আরও ঘি ঢালছে সোহানের সেই চ্যালারাই। ইসমাতও সবেই শুনল, সারাহ এসে জানাল। এর মাঝে কোত্থেকে লিয়াকত এসে জানাল,
--"বসে বোলায় ম্যাডাম। এখনই যাইতে কইছে।"

ইসমাত বিলম্ব না করে দ্রুত পায়ে চলে গেল। তার চোখ-মুখেও চিন্তার ভাজ। হঠাৎ কেউ এভাবে সাহিদকে টার্গেট করবে সেটা ভাবতে পারেনি। মাহফুজ সাহেবের অফিসে গিয়ে দেখল তিনি শক্ত হয়ে বসা। মুখ জুড়ে গাম্ভীর্য। ইসমাত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তা দেখে তিনি বললেন,
--"বসো।"

ইসমাত বসল। মাহফুজ সাহেব বেশ রয়েসয়ে ঠান্ডা মাথায় বলল,
--"বর্তমান পরিস্থিতি কি দেখতে পারছ তো?"

--"জি বাবা।"

--"এখন কি বিয়ের ব্যাপারটা জানাজানি হলে তোমার আপত্তি আছে মা? দেখতেই পাচ্ছ, আমার ছেলেকে অকারণে ফাঁসানো হচ্ছে। আমি অবশ্যই ওদের শায়েস্তা করতে পারব, সকল প্রমাণ যোগাড় করতে পারব। তবে সবার আগে আমার ছেলের চরিত্রের হেফাজত জরুরি। তুমিও ভালো করে জানো, আমিও জানি.. আমার ছেলে আর যাই হোক কখনো মেয়েবাজিতে জড়ায়নি।"

ইসমাত এসব জানে। এতে কোনো প্রকার সন্দেহ নেই যে সাহিদ কখনোই মেয়েদের কাছ ঘেঁষেনি। এমনকি নিজের কাজিনকেও সে বিন্দুমাত্র সুযোগ দেয়নি। সাহিদের হাতে যা পাওয়ার আয়াছে, এতে সে চাইলেই রোজ কয়েকটা করে মেয়ে পরিবর্তন করতে পারত, অশালীন কাজ করতে পারত। কিন্তু ছেলেটা কখনো সেদিকে যায়নি। 

ইসমাত ভাবল না। সম্মতি দিল মাহফুজ সাহেবকে।
--"আপত্তি নেই, বাবা। জানাতে পারেন। আমিও এদিক থেকে বাকিটা দেখছি। যেই দিনের ছবি ভাইরাল হয়েছে, সেদিন আমিও সেই হোটেলেই ছিলাম। সাহিদ খুব চেঁচামেচি করেছিল তার প্রাইভেসি নষ্ট হওয়ায়। এখানে মেয়েটার অসৎ চক্রান্ত আছে, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।"

মাহফুজ সাহেব স্বস্তি পেলেন, কিন্তু পুরোপুরি নয়। ওনার সমস্ত শরীরে আ গুন বয়ে যাচ্ছে। হাটুর বয়সী মেয়ের কত বড়ো সাহস তার ছেলেকে বদনাম করার চেষ্টা করে। একে তো তিনি দেখে নিবেন। সাপের পাঁচ পা দেখেছে। কার সাথে লাগতে এসেছে এখনো জানে না।

—————

চার বন্ধু একসাথে তিনশো ফিটের হাইওয়েতে ধুমসে রাইডে ব্যস্ত। রাত প্রায় বারোটা। ওদের রাইড থামেনি সাব্বির হাসছে। সাহিদ বিরক্ত। কিছুক্ষণ আগের বিরতিতে সে সাহিদকে জিজ্ঞেস করেছিল,
--"কিরে, ভাবীকে শাড়ি দিসনি?"

--"না।"

সাব্বির হাসতে হাসতে বলল,
--"তুই যে এমন সিংহ থেকে ভীতু হবি জানতাম না রে! যদি সিংহর বাচ্চা হোস আমার ভাইয়ের বিয়েতে সেই শাড়ি পরিয়ে ভাবীকে সাথে করে আনবি।"

--"স্বপ্ন দেখতে থাক! শাড়িটা ফেলে দেইনি এটাই বড়ো কথা।"

--"এর মানে উপহার দিবি? হাহাহা।"

সেই কথোপকথনেই সাহিদ বিরক্ত। আকিব আর রুশান অনেকটা পেরিয়ে গেছে। সাব্বির বলল,
--"চল রেস লাগাই। যে আগে ওদের ছুঁতে পারবে সে ব্যাংককের টিকিট কাটবে। কতদিন থাইল্যান্ডের স্পা নেওয়া হয় না রে।"

বলেই ওরা রেইস শুরু করল। কিন্তু ভাগ্যে যে লেখা ছিল অন্যকিছুই। দূর্ভাগ্যবশত সাব্বিরের ব্রেকফেইল হয়। সাহিদ তখনো তাকে পার করার সম্পূর্ণ চেষ্টা করছে। দুজনের রেইসের মাঝে কোত্থেকে বড়ো এক ট্রাক এলো। সাব্বির দেখল ট্রাকটা তার খুব কাছে। সে চাইলেও বাইক কোনোভাবেই ঘুরাতে পারল না। মুহূর্তেই দুজনের এক্সিডেন্ট হলো। ছিটকে গেল দুজন দুদিকে। সাব্বিরের মাথায় হেলমেট ছিল না। তাড়াহুড়োয় আনতে ভুলে গিয়েছিল, বন্ধুর বিপদে সে চুপটি করে বসতে পারে নাকি?

 রক্তে ভেসে যায় রাস্তার একপাশ। সাব্বির ঝাপসা চোখে দেখল পথের আরেক পাশে সাহিদ পড়ে আছে। তার চোখের কোণ দিয়ে কয়েক ফোঁটা জল পড়ল। চোখের সামনে ভেসে আসল তার পুরো পরিবারের হাস্যোজ্জ্বল মুখগুলো। তাদের সাথে কাটানো ছোটো থেকে বড়ো সমস্ত স্মৃতি। বন্ধুদের সাথের স্মৃতি, আর সবশেষে.. রাইসা। কি এমন হতো, যদি আর একটাবারের মতো সে রাইসার দেখা পেত? তাকে জানাতে পারত কতটা ভালোবাসে সে ওই অদূরের মেয়েটাকে। মেয়েটা এখন কোথায় আছে? এই না দেখার তৃষ্ণা কী তার শেষ মুহূর্তেও কাটবে না? সে কি অভাগাই থেকে যাবে?

চারপাশে পিনপতন নীরবতা। তৃষ্ণা, অতিরিক্ত স্মৃতির যন্ত্রণার সাথে কাটল বুঝি সাত মিনিট? রাস্তার অপরপাশ থেকে যতটুকু জ্ঞান ছিল, সাহিদ ঝাপসা চোখে তার বন্ধুকে দেখল। হাত বাড়াতে চাইল সে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp