হ্যাব্রোর বাহু টান টান। উদোম বুকে দাগ পড়েছে গভীর। কিছু দাগ আড়াআড়ি হয়ে আছে লালচে হয়ে, কিছু দাগ থেকে ঢিমে তালে ঝরছে রক্ত। অথচ মুখ দিয়ে সে এখনো অব্দি একটা আর্তনাদও বের করেনি। দাঁতে দাঁত চেপে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে কেবল সহ্য করার। এবং এটাই বোধহয় কাপুরুষ রাজা ননীকান্তের রাগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতোই দেখতে একজন সুঠামদেহী পুরুষ অথচ স্বভাবে তারচে কতটা ভিন্ন! এত ব্যথায় জর্জরিত হয়েও টু শব্দ অব্দি করছে না। সে হলে তো এতক্ষণে প্রাণ বেরিয়ে যেতো হয়তো!
নিজেকে হ্যাব্রোর সাথে তুলনা করে যতবারই তার মনে হচ্ছে সে কাপুরুষ ঠিক ততবারই তার রাগ তীব্র হচ্ছে। নিজের কাপুরুষত্ব ধামাচাপা দিতে সে আরও চড়াও হচ্ছে। গমগমে স্বরে, কণ্ঠ উঁচু করে বলছে,
“যতক্ষণ না ওর মুখ থেকে চিৎকার বের হচ্ছে ততক্ষণ প্রহার করে যাও।”
তার এই আদেশ মাথা পেতে নিয়েছে তার দেহরক্ষীরা। বেধড়ক মারে ক্লান্ত করে তুলেছে হ্যাব্রোকে। তবুও হ্যাব্রো নির্লিপ্ত। নিজেকে নিয়ে তার চিন্তা নেই যে। তার চিন্তা সকলই কেবল রানির জন্য। তার কিছু হয়ে গেলে রানি যে আরও ভেঙে পড়বেন। এমনিতেই মানুষটা নিজের জন্ম হিসেবে মগ্ন। তার ভেতর আরেকটা ধাক্কা কি সামলাতে পারবেন?
রানির কথা ভেবেই সে কণ্ঠে আরেকটু জোর আনে। শক্ত করে বলে,
“আমাকে একটিবার মুক্ত করুন। অস্ত্রহীনকে মারা একটি রাজ্য ও রাজার জন্য লজ্জার। আমাকে নিজের হয়ে অস্ত্রটুকু ধারণ করার সুযোগ দিন কেবল।”
রাজা ননীকান্ত সেসব কথায় তোয়াক্কা করে না। আয়েস করে বসে রাজসিংহাসনে। হাসে মিটিমিটি।
হ্যাব্রো রাজাকে ভোলাতে চায়, রাগাতে চায়। কারণ রাগে মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নেয় সবসময়ই। ননীকান্তও নিশ্চয় রেগে কিছু একটা ভুল করবেই।
“আপনাকে রানি কামিনীকাঞ্চন সবসময় কাপুরুষ বলে গিয়েছেন। আপনি সবসময় আমাদের সাথে পেছন থেকে যুদ্ধ করেছেন অথচ রানি আপনার সাথে যুদ্ধ করেছেন সামনাসামনি। আপনার বাণিজ্য নষ্ট করেছেন। আপনার রাজ্যে অর্থ সংকট তৈরি করেছেন। যা করেছেন সরাসরি। অথচ আপনি করলেন কী? রানিকে নিজের রাজ্যে পেয়ে বন্দী করেছেন। নিরস্ত্র আমাকে আঘাত করছেন। আপনার পুরুষত্ব এতে কি লজ্জিত হয় না, রাজা ননীকান্ত? এটা লজ্জাজনক নয় বলুন? আপনার ঘৃণা লাগে নিজের উপর?”
হ্যাব্রোর ধিক্কারে ননীকান্তের মিইয়ে আসা রাগ ডাল-পালা ছড়িয়ে ফুঁসে উঠে। ক্রোধে উঠে দাঁড়ায় সিংহাসন ছেড়ে, “তোমার এত দুঃসাহস আমাকে এসব বলো? অস্ত্র দিলে তুমি কী এমন করে ফেলতে পারবে? আজ আমিও দেখবো। এই, ওকে বাঁধন মুক্ত করো। আমি দেখতে চাই ও কী করে।”
মন্ত্রী রাজার হটকারিতায় উদ্বিগ্ন হলো। আগ বাড়িয়ে বলতে নিলো, “রাজামশাই, আপনি কী করছেন…”
“আপনাদের নির্দেশে এখন আমি কাজ করব? যা বলছি তা-ই করুন।”
“আপনার ভেবে দেখা উচিত, রাজা। মন্ত্রীমশাই ভুল কিছু বলেননি। সেনাপতি হ্যাব্রো বীর যোদ্ধাদের মাঝে একজন। তার তলোয়ারের কৌশলের কাছে বহু বড়ো বড়ো যোদ্ধা হার মেনেছে।”
রাজা ননীকান্তের সেনাপতি খুব ধীরে রাজার কাছে ফিসফিসিয়ে বলল কথাগুলো। রাজা ননীকান্ত স্বভাবে হটকারিতা বেশি তা তার আশেপাশের সকলেই অবগত তাই তাকে সর্বোচ্চ ভাবে আটকানোর চেষ্টা করল।
এবার ননীকান্ত তার ভুল পুনরায় বুঝল। কিন্তু তবুও পুরুষত্বে একটু তো বাঁধা পড়লোই। সে নিজেও তো রাজা। সামান্য একটা সেনাপতির ভয়ে সে নিজের পুরষত্বকে নিলামে তুলবেই বা কীভাবে? তা-ও কিনা অস্ত্রবিহীন একজন মানুষ তার উপর ভারি হয়ে পড়বে। এ-ও হয় আদৌ? লজ্জাজনক নয় কি তা? সে এতটাই দুর্বল যে তার মন্ত্রী আর সেনাপতি অব্দি তাকে আটকাচ্ছে। তার মানে তারাও মনের অগোচরে তাকে কাপুরুষই ভাবে।
রাজার মন দ্বিধান্বিত হলো। নিজের এই পরাজয় স্বীকার করতে পারল না। বহুক্ষণ ভাবনার দোলাচালে থেকে শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিলো নিজের ক্ষমতা দেখানোর। সবার সামনে নিজের পুরুষত্বকে জাহির করার। সে বুক ভরে শ্বাস নিলো, পুনরায় আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
“আমি দেখতে চাই সেনাপতি হ্যাব্রো নিজেকে কীভাবে বাঁচান। খুলে দাও তাকে। এখুনি, এমুহূর্তে।”
রাজার এই সিদ্ধান্তে দ্বিধান্বিত মন্ত্রী একপলক তাকায় রাজার দিকে। পরপর হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে সেনাপতিকে বাঁধন খোলার ইশারা করে।
সেনাপতির দেহ তখন তীব্র মারে দুর্বল। তবুও বাঁধন খোলা পেয়ে তার ভেতর যেন নতুন উদ্যম খুঁজে পেলো। এতশত ছল তার নিজের প্রাণের জন্য নয়। কেবল আর কেবলমাত্র রানির প্রাণের জন্যই। রানি যে তার মৃত্যু সহ্য করতে পারবেন না। রানির মনে যে এখন কতশত প্রশ্নরা ঘুরছে। ভেঙে পড়েছেন তিনি। এ অবস্থাতে হ্যাব্রোকে হারালে তিনি দাঁড়াবেন কী করে?
হ্যাব্রো বিনা অস্ত্রেই এগিয়ে এলো। তার সামনে দাঁড়ানো ননীকান্ত বীর বেশে বুক উঁচু করে রাখল। হ্যাব্রো এগিয়ে আসতেই তলোয়ারের কৌশল অবলম্বন করল। কিন্তু হ্যাব্রো অভিজ্ঞ ভঙ্গিমায় সবগুলো কৌশল থেকেই বাঁচিয়ে নিলো নিজেকে খুব সুক্ষ্ম ভাবেই। রাজা ননীকান্ত ক্লান্ত হয়ে পড়লেন হ্যাব্রোর কৌশলে। হ্যাব্রো আপ্রাণ চেষ্টায় মগ্ন রইল। কিন্তু তার বুকে এত আঘাত পড়েছিল এতক্ষণ যে তার আর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তিতে কুলাচ্ছিলো না। চোখের সামনে ঝাপসা হতে লাগলো ক্রমশই।
হ্যাব্রোর ঝিমুনির হাবভাবে রাজা ননীকান্ত রাজ্য জয় করার আনন্দ পেলো। তলোয়ার দিয়ে আঘাত করলো হ্যাব্রো পিঠ বরাবর। তৎক্ষণাৎ গলগল করে বের হতে লাগল রক্তের গঙ্গাধারা। হ্যাব্রো হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল। শরীরে তার আর এক চিমটি শক্তি বেঁচে নেই। ননীকান্ত এই মোক্ষম সময়টাই কাজে লাগাতে চাইল। হাসতে হাসতে বলল,
“আমার কাপুরুষের দাগ আজ তোমার রক্তে মুছে ফেলবো। আজই শেষ..”
বলতে বলতে যেই না শেষ আঘাতটা করতে নিবে ঠিক সেই মুহূর্তেই তার ডান হাত কনুইয়ের থেকে ছিটকে পড়ল কয়েক মিটার দূরে গিয়ে। নিমিষেই, চোখের পলকে শরীর থেকে আলগা হয়ে যাওয়া হাতটির দিকে তাকিয়ে রাজা ননীকান্ত চিৎকার করে উঠল। তার শরীর ছিন্ন হাতটি তড়পাচ্ছে মাটির ভেতর জ্যান্ত মাছের মতো।
সকল দেহরক্ষীরা সেই দৃশ্যে আঁতকে উঠল। ভীতু পা পিছিয়ে গেলো সকলেরই। বিশাল স্তম্ভের পেছন থেকে সেই আতঙ্কিত দৃষ্টিকে আরও ভীত করে বেরিয়ে এলেন রানি কামিনীকাঞ্চন। সেই চোখ ভরা তেজ তার। বুক ভরা দম্ভ। ঠোঁটে সেই ক্রোধের আর তাচ্ছিল্যের হাসি। জৌলুশ উপচে পড়া শরীর রূপোর মতন ঝলমল করছে।
রাজার আর্তচিৎকারে ভারি হতে লাগলো প্রাসাদ। মন্ত্রী ইশারা করল দেহরক্ষীদের ছুটে যাওয়ার জন্য। কিন্তু রাজার কাটা হাতের বিশ্রী অবস্থা ভয় জন্মে দিলো উপস্থিত সকলের ভেতর। তার ভেতর কয়েকজন দেহরক্ষী সাহস করে এগুলো ঠিক। তলোয়ারও তুললো কিন্তু রানির তলোয়ারের কাছে তারা বড্ডই নাজুক। এক লহমায় প্রাসাদ ধারণ করল রণক্ষেত্রে। কারো মস্তক ছিন্ন হয়ে পড়ল দূরে, কারো বা বুকটা এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে গেলো। লাল রক্তে ভেসে গেলো সাদা মার্বেল পাথরের মেঝেটা। চিৎকারে চিৎকারে ভারি হয়ে গেলো প্রাসাদের প্রাচীর।
রানি তা দেখে উচ্চস্বরে হাসতে লাগলেন। তার চোখে মুখে ছিটকে আসা রক্তের ফোঁটায় তাকে দেখা গেলো ভয়ঙ্কর উল্কার মতো।
“বলেছিলাম রাজা ননীকান্ত, আমি ছাড়া পেলে আপনাদের সমস্ত কিছু আমি ধ্বংস করে দিবো। আমার কথা কখনো কেবলই বলার জন্য বলা নয়। আমি তা-ই বলি যেটা আমি করার ক্ষমতা রাখি। রানি কামিনীকাঞ্চনকে এ জনমে চিনতে পারলি না পরের জনমে না-হয় চিনে নিবি।”
বলেই রানি এগিয়ে এসে রাজার বুকে আঘাত করল। ননীকান্তের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। ক্ষমা চাওয়ার ভাষাটুকু যেন হারিয়ে ফেলেছে সে। রানি কামিনীকাঞ্চন কীভাবে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে গেলেন তা-ই তার কাছে অবিশ্বাস্যকর। বাকি সব তো পরের বিষয়।
মন্ত্রী, সেনাপতি এগিয়ে এলো এবারে। তাদের অস্ত্রের কৌশল বেশ। কিন্তু রানির প্রলয়ঙ্কারী রূপের কাছে সেগুলোও হয়ে উঠল নগন্য। দু'জনে কৌশলে আঘাত করার চেষ্টা করল রানিকে। প্রথমবারের প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হলো। দ্বিতীয় বার রানি আঘাত করতেই দু'জনে ছিটকে পড়ল কিছু পা পেছনে। তলোয়ারের ঝঙ্কার হ্যাব্রোর কানে খুবই ধীরে পৌঁছাতে পারছিলো। তবুও তার ঠোঁটে সে কি হাসি! রানি যখন যুদ্ধ করে হ্যাব্রো তখন কেবলই হাসে কারণ সে যে জানে, একবার যুদ্ধক্ষেত্রে নামলে জয় রানিরই হয়। পুরো পৃথিবী রানিকে জিতিয়ে দিতে এক হয়ে যায়।
রানিদের তলোয়ারের শব্দের তীব্রতা ছাপিয়ে ভেসে এলো বহু বহু কণ্ঠ, সমস্বরের সুর। মাটিতে লুটিয়ে থাকা মন্ত্রী, সেনাপতিরাও ভেবে পেলো না সেই সুরের উৎস কোথায়।
কোথা থেকে ভেসে আসছে এত কণ্ঠস্বর। হ্যাব্রো শেষবার কেবল কানে এতটুকুই শুনলো,
“আমাদের রানি ফেরত চাই, এখুনিই এখুনিই।”
ভোরের সদ্য উদিত হওয়া কমলা রোদে রানির সারারাতের যুদ্ধরত ক্লান্ত মুখটিও আবছা দেখতে পেলো হ্যাব্রো। কেমন দেবীর মতন লাগছে। যে দেবী গোগ্রাসে গিলে নেয় অসুরদের প্রাণ। যে দেবী ধরাকে করে শান্ত। এইতো সে-ই দেবী, এইতো তিনি দাঁড়ানো…
·
·
·
চলবে……………………………………………………