কামিনী - পর্ব ৯৭ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          চন্দনের ঘ্রাণ, ধূপের ধোঁয়া এবং এক ধারে বাজতে থাকা ঘুঙুরের শব্দে যেন কক্ষটি হয়ে উঠেছে ধ্যানরত মানুষের মোক্ষ লাভের স্থান। 
 রাজমাতা প্রাচী কক্ষের একদম মধ্যবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়ে কাঁপছেন মৃদু। আঁখি দু'টোতে যেন লেগেছে ঘোর। তার মাঝে মাঝেই বোধ হচ্ছে তিনি বোধহয় নিদ্রারত স্বপ্নে অবস্থান করছেন। বাস্তবেতো সুরসুন্দরীর থাকার কথা নয়। এ যে প্রায় অসম্ভব ঘটনা, অসম্ভব দৃশ্য। তাছাড়া একটি প্রাসাদও বা এক লহমায় নিস্তব্ধপুরী হয়ে গিয়েছে কী করে? সবই তার মনের ভ্রান্ত ধারণা হয়ত!

  ঘুঙুর, উন্মাদ নৃত্যের দিকে দৃষ্টি নিপাত করে হতবিহ্বল রাজমাতা পুনরায় ডাকলেন। এবার কণ্ঠে আরেকটু শক্তি যুক্ত করেই বললেন,
 “সুরসুন্দরী.. আপনি, আপনি এখানে..”

 সেই চঞ্চল, দিকবিদিকশুন্য নৃত্যরত পদযুগল থমকে গেলো। থমকে গেলো লতার মতো দোলানো সেই অঙ্গটি। থেমে গেলো জাগতিক সমস্ত উচ্চ শব্দ। পুরো কক্ষ নিস্তব্ধ করে নারীটি ফিরে তাকালেন। ঠোঁটে তার সেই ক্রুব্ধ, অহং হাসি ঝুলিয়ে রঙ্গ করে শুধালেন,
 “হ্যাঁ, আমি। এখানেই তো থাকি আমি। জানিস না বুঝি?”

  বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কোনো এক অলৌকিক শক্তিতে বিরাজমান না হলে আজকের এই দৃশ্য দেখা সম্ভব নয়। কোনো মৃত মানুষ এমন করে প্রকাশ্যে অঙ্গ দুলিয়ে নৃত্য করছে, রঙ্গ করে কথা বলছে… এ-ও কি সম্ভব? 
 রাজমাতা কাঁপতে লাগলেন তীব্রতর ভাবে। তার ওষ্ঠে ওষ্ঠ চেপে আসছে বারংবার। গলা শুকিয়ে কাষ্ঠ হয়েছে সেই কখন!
 তিনি পুনরায় কক্ষের চারপাশে তাকালেন এ আশাতেই যদি কারো দেখা পান!
কিন্তু তাকে আশাহত করে দিয়ে শূন্য প্রাসাদ শূন্যই রইল। তিনি ঘর্মাক্ত, ভয়ার্ত মুখ-মন্ডলে হাত বুলালেন নিজের। কড়া চন্দনের ঘ্রাণ প্রতিবার নাসিকায় গিয়ে লাগছে প্রবল বেগে। 

 “কাঁপছিস কেন, রাজমাতা প্রাচী? না, না, ভুল হলো বড়ো। প্রাচী নয় তাপসী। তাই না?”

বহুবছর পর নিজের নামটি যেন রাজমাতা প্রাচীর কাছে নেহাৎই অপরিচিত মনে হলো। যেই নাম, পরিচয় তিনি মিশিয়ে দিয়েছিলেন সুরসুন্দরীর জীবন্ত দেহের সঙ্গে, সেই পরিচয় তার গায়ে বিঁধছে সূঁচালো কাঁটা হয়ে। 
 সুরসন্দরী পুনরায় নৃত্য শুরু করলেন। তার দেহের সেই স্রোতোবহা নৃত্যে ভয়ার্ত রাজমাতা জমে যাচ্ছিলেন যেন প্রায়। চিৎকার করে উঠলেন তিনি,
 “থামুন, থামুন। আর নয়। আমার হৃদয়ে এই শব্দ বড্ড ভারি ঠেকছে। থামুন।”

সুরসুন্দরী থামলেন না। তীব্র শব্দে ঘুরতে লাগলেন। পায়ের মুদ্রা, হাতের মুদ্রা যেন ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা। এই প্রতিভা সুরসুন্দরী কেমন করে যে নিয়ে জন্মেছিলেন! 
রাজমাতা নিজের কর্ণদ্বয় চেপে বসে পড়লেন। বারংবার নিষেধাজ্ঞা জারি রাখলেন। তিনি কোনক্রমেই এই শব্দ শ্রবণ করতে চাচ্ছেন না। তার ভেতরের অস্থিরতায় দেহে কম্পন তৈরি করেছে। 
 সুরসুন্দরী থামলেন। থামতেই তার অপটু হাতে বাঁধা পায়ের ঘুঙুরটি ছিটকে, পিছলিয়ে গিয়ে পড়ল রাজমাতার সামনে। ‘ঝন্' করে একটি অদ্ভুত শব্দের পর পুরো কক্ষ পুনরায় নিবিড় হয়ে গিয়েছে। 
রাজমাতা বড়ো বড়ো করে শ্বাস নিচ্ছেন। মনে হচ্ছে যেন কঠোর শ্রমের কিছু করে এসেছেন। শ্বাস নিতে সে কি কষ্ট হচ্ছে তার!
 সুরসুন্দরী নিজোর ঠোঁটের দাম্ভিক হাসিটি বজায় রেখে দৃষ্টি রাজমাতার উপর নিক্ষেপ করেই ধীরে ধীরে গিয়ে বসলেন ওখানে থাকা সুবিন্যস্ত একটি কেদারায়। বড়ো আয়েস করেই বসলেন। যেন মনে হলো কোনো মজার দৃশ্য দেখছেন তিনি। 

  রাজমাতা বুকের ভেতর হাত রেখে নিজেকে স্থির করার চেষ্টা করলেন। তার এতক্ষণের ভ্রমে ডুবন্ত মস্তিষ্ক, চিত্ত ধীরে ধীরে একটি গোলকধাঁধার গণ্ডি অতিক্রম করার আপ্রাণ চেষ্টা করল। তিনি নিজের সঙ্গে ঘটা ঘটনাগুলো পূর্ব থেকে একবার পুনরায় সজ্জিত করে ভাবনায় মগ্ন হলেন। পুরো একটি রাজপ্রাসাদ এমন করে লোকশূন্য হতে পারে না কখনোই। একটি বদ্ধ কক্ষ এত বছর পর আচমকাই খুলে যেতে পারে না। যেই মানুষটি পৃথিবীতে নেই সে-ও এমন করে তার সামনে দৃশ্যমান হতে পারে না। কিন্তু এই সমস্ত ঘটনাই ঘটেছে। এবং সমস্তটাই এতই অস্বাভাবিক যে তার মনন ও মস্তিষ্ক ঠিকঠাক কোনো যৌক্তিক কারণ উত্থাপিত করতে পারল না নিজেকে বোঝানোর।

 “দীর্ঘ ভাবনায় কী এমন চলছে আমিও শ্রবণ করি। দেখি ধন্য হতে পারি কি-না।”
 সুরসুন্দরীর তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর এসে বিঁধলো রাজমাতার কানে। তিনি এই কণ্ঠের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করলেন তার প্রাসাদে অবস্থিত আরও একটি নারীকণ্ঠকে। তার কুটিল বুদ্ধির যেন ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরতে আরম্ভ করেছে। 

 রাজমাতার অস্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস থিতু হয়ে এসেছে ধীরে ধীরে। মুখের সেই ভয়ের ছাপ, দিকহারা, উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি সমস্তই স্থির হতে আরম্ভ করল। সুরসুন্দরী কেদারায় বসে সেই স্থির হওয়ার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলেন। তিনি রাজমাতার পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য শিকারী চোখে তাকিয়ে আছেন।
 রাজমাতার ঠোঁটের ভীতু বচন সরে গিয়ে ধরা দিতে লাগল হাসি। যুক্তি খণ্ডনের বিষয়ে এত বর্ষে তিনি বড্ড পাকা হয়েছেন কি-না! 

 “হাসছিস? হেসে নে, হেসে নে। এরপর পৃথিবীতেতো আর স্থান হবে না তোর।”
 রাজমাতা প্রাচী পা গুছিয়ে দাঁড়ালেন। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে শীতল কণ্ঠে বললেন, “রানি কামিনীকাঞ্চন, বড্ড দারুণ বুদ্ধি করেছিলে তুমি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, হেরে গিয়েছ।” 

 কথা থামিয়ে রাজমাতা পৈচাশিক হাসি টানলেন ঠোঁটে। যেন রানি কামিনীকাঞ্চনের সাজিয়ে রাখা খেলাতে জয়ী হয়ে গিয়েছেন বিনা যু দ্ধে। 
কেদারায় বসে থাকা সুরসুন্দরীর এতে এক বিন্দুও নড়চড় হলো না। তিনি মদ্যরসের পাত্রটিতে আলতো ভঙ্গিতেই ওষ্ঠ ছুঁয়ে রাখলেন। যেন রাজমাতার অহেতুক কথাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আবশ্যকতা তিনি অনুভবই করেননি। 

  রাজমাতার চোখে-মুখে যেই জয়ী হাসিটি ফুটে উঠেছিলো, প্রতিক্রিয়া না পেয়ে সেই হাসিটি যেন মৃদু দমে এলো। তবুও তিনি বুকের চাপা ভয়কে প্রশ্রয় না দেওয়ার জন্য পুনরায় বললেন,
 “তুমি আমায় ভীত করতে পারবে না, রানি কামিনীকাঞ্চন। রাজমাতা প্রাচী’র এ অব্দি আসার পথটুকু সুগম ছিলো না। আর না তো সহজবোধ্য, সহজসাধ্য। তাই আমায় তুমি তোমার এই বিছানো ছকে বাঁধতে পারবে না।”

 “প্রথমত আমি রানি কামিনীকাঞ্চন নই। দ্বিতীয়ত, আমি কোথায় বললাম ভয় পেতে তোকে? তুই নিজেই ভীত হয়েছিস। তোর চোখের মণি এখনো স্থির হতে পারেনি। অনবরত তুই কৌশল খুঁজছিস এখান থেকে বেরিয়ে যাবার। ভীত যদি না-ই হবি তবে এত উত্তেজনা কেন? না-কি নিজের অন্যায়গুলো চোখের সামনে ভাসমান দেখে অচঞ্চল হচ্ছিস?”

 “অন্যায়? কীসের অন্যায়? আমি কোনো অন্যায় করিনি।” বলতে বলতে রাজমাতা কক্ষের সামান্য বা’ দিকে ফিরে প্রাচীরে ঠেকানো তলোয়ারটি তুলে নিলেন অভিজ্ঞ ভঙ্গিতে। তুলে নিয়েই তাঁক করেন সুরসুন্দরীর উদ্দেশ্যে। এবার আর ভীতি নেই কার অন্তরে। কদাচিৎ অনুশোচনাও নয়। বরং আত্মবিশ্বাসের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়ে হুঙ্কার করে উঠেন,
 “রানি কামিনীকাঞ্চন হোন অথবা সুরসুন্দরী। আমার নিকট এলেই আজ আমি প্রাণ কেঁড়ে নিবো।”

 সুরসুন্দরী হুঙ্কারে ভয় পেলেন না বিশেষ। মদ্যরসের পাত্রটিতে আরেকটি আলতো চুমুক দিয়ে কেদারা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তার পার্শ্ববর্তী প্রাচীর থেকে একটি তলোয়ার তিনিও তুলে নিলেন। অগ্নির ছুটন্ত আলোয় ঝকঝক করতে থাকা সেই তলোয়ারে হাত ঘর্ষণ করতে করতে সাবলীল কণ্ঠে বললেন,
 “তবে তা-ই হোক। দেখি প্রাণ কার যায়? সুরসুন্দরীর চেয়ে অভিজ্ঞ তলোয়ার তুই চালাতে পারিস কি-না আমিও দেখি!”
 বলতে বলতেই তলোয়ারের দিক ঘুরাতেই রাজমাতার পোশাকের সামান্য অংশ কেটে ফেললেন। এত সুদক্ষ ভঙ্গিতে যে সামান্য আঁচ লাগল না অব্দি শরীরে। যেন ভয়ের শুভারম্ভ করলেন!

 রাজমাতার অদম্য তেজ থিতিয়ে এলো। তলোয়ার ধরে রাখা হাতটা পুনরায় কাঁপল। আরেকটিবার অবিশ্বাস্য ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন, 
 “আপনি, আপনি সত্যিই সুরসুন্দরী?”

 সুরসুন্দরী উত্তরে ভাষা, শব্দ প্রয়োগ না করে আবার তলোয়ার ঘুরাতেই নিজেকে রক্ষা করার জন্য রাজমাতা বসে পড়লেন। এবার তিনিও তার তলোয়ারটিকে চালাতে লাগলেন। নিস্তব্ধ কক্ষ জুড়ে তলোয়ারের রুক্ষ শব্দ শোরগোল শুরু করল। 
 সুরসুন্দরীর অভিজ্ঞ তলোয়ার রাজমাতার দক্ষতাকেও স্তম্ভিত করে দিলো। তিনি তলোয়ার ঘুরাচ্ছেন কিন্তু কোনোক্রমেই সামান্য আঘাত অব্দি সুরসুন্দরীর শরীরে করতে সক্ষম হলেন না। বরং তার বাহুতে লাগল, গলার কাছটায় লাগলো, হাতের তালুতে লাগল মৃদু মৃদু, সুক্ষ্ণ আঁচড়। 

  রাজমাতার হাত অবশ হয়ে গেলো। গলা শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে যেন সময়েরও আগে। শরীর দিয়ে ঠাণ্ডা ঘাম বেয়ে নামছে নিঃশব্দে। সুরসুন্দরীর তলোয়ারের দক্ষ হাত সম্বন্ধে তিনি অবগত। কিন্তু তাই বলে একটি মৃত আত্মার তলোয়ারের সঙ্গে সে লড়ছে? এত অলৌকিক ঘটনা ঘটছে তার সঙ্গে? এই ঘটনার ভীতি নিয়েই তো তিনি বহু বছর কাটালেন। শেষমেশ এটা হতেই হলো?
 রাজমাতার হাতের সবটুকু শক্তি নিঃশেষ হলো প্রায়। বাহু ঝাঁকুনি দিতে আরম্ভ করল। 
রাজমাতা কোনো ভাবেই এই ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে নিজের শক্তি জাহির করতে সক্ষম হলেন না। তলোয়ারের রুক্ষ তাড়নায় ছিটকে পড়লেন ভূমিতে। তলোয়ার গিয়ে পড়ল অনেকটা দূরে। তখনই সুরসুন্দরী তার অন্তিম আঘাটতুকু তলোয়ার উঁচিয়ে করতে নিলেই রাজমাতা আর্তনাদ করে উঠেন। ভয়ে কাতর স্বরে বললেন,
 “আমায় মারবেন না, সুরসুন্দরী। আমায় মারবেন না।”

 সুরসুন্দরী তলোয়ারটা ঠিক এনে রাখল রাজমাতার কণ্ঠের সামনে। এতটাই সামনে যে বিন্দু পরিমান নড়লেই তলোয়ারের ঐ সূঁচালো দিকটা তার কণ্ঠনালি এফোঁড়-ওফোঁড় করে বেরিয়ে যাবে।
 পুরো কক্ষ পুনরায় শব্দহীনতায় নিমজ্জিত হলো। রাজমাতার মনে হলো তার হৃৎস্পন্দনের শব্দ ব্যতীত আর শব্দ হচ্ছে না কিছুর। তখনই তার কপাল বেয়ে একবিন্দু ঘাম পড়ল সুরসুন্দরীর পায়ের কাছটায়৷ 
  জীবন-মৃত্যুর এই সন্ধিক্ষণে ভীত রাজমাতা অনুনয় করে উঠলেন,
 “আমায় ছেড়ে দাও, সুরসুন্দরী। আমায় ছেড়ে দাও।”

 “তুমি কি ছেঁড়েছিলে আমায়?” সুরসুন্দরীর কণ্ঠস্বর আগের মতোই জ্বলন্ত। ছেড়ে দেওয়া কিংবা ক্ষমা করার লক্ষণ মোটেও নেই।
 রাজমাতা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। সত্যিই তো! তিনি কি ছেড়েছিলেন? ছাড়েননি। কোনো হাহাকার পৌঁছাতে দেননি কারও শ্রবণেন্দ্রিয় অব্দি। সেই নিজের কৃতকর্ম জ্বলজ্বল করে উঠল তার দৃষ্টি সীমানায়। আকুতি করে বললেন,
 “আমার বড্ড লোভ জেগেছিলো মনে। বড্ড প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠেছিলাম। তাই আপনাকে ওভাবে তড়পে তড়পে শেষ করেছিলাম। আপনার দম্ভ, আপনার ঐশ্বর্য, আপনার সবটা জুড়ে রাজত্ব করা আমি মেনে নিতে পারিনি। সামান্য নর্তকী, গণিকা হয়ে রাজাসন পেয়ে ছিলাম, রাজপ্রাসাদে সংসার পেয়েছিলাম। আপনার কথায় আমি কীভাবে ছাড়তাম সেই স্থান? আমিতো আপনাকে বুঝানোর প্রয়াস করেছিলাম। আপনি তো নিজের নীতি-আদর্শে ঠাঁই দাঁড়িয়ে ছিলেন। রানির মৃত্যুর পর আপনার এমন দুর্ভাবনা জন্মালো যে আপনি এই সমস্ত ছেড়ে নিজে চলে যেতে চাইলেন এবং আমাকেও নিতে চাইলেন। আমি কী করতাম? এই সাম্রাজ্যের লোভ ছাড়তাম কেমন করে?”
 
 রাজমাতা কথা থামিয়ে বড়ো বড়ো শ্বাস নিতে লাগলেন। তার কৃতকর্মের অনুশোচনা চোখে-মুখে প্রদর্শিত না হলেও প্রাণের ভয়ে তটস্থ হয়ে গিয়েছেন। 
 সুরসুন্দরীর মণি স্থির হয়ে গেলো। জ্বলন্ত কণ্ঠে আঁচ কমে এলো মৃদু, “তাই বলে এত এত অমানবিক, নিষ্ঠুর হতে হলো?”

  “হলো, হলো, হলো। হলো বৈকি। কী করতাম আমি? রাজা সমস্ত সময় আপনার ভাবনায় মগ্ন থাকত। আপনার ঐ রূপ, ঐ লাস্যময়ী দেহের জন্য কিচ্ছুটি পাচ্ছিলাম না আমি। আমার হিংসা হওয়া কি স্বাভাবিক ছিলো না? আপনি এই প্রাসাদের কেউ না হয়ে এমন করে বিচরণ করে গিয়েছেন। তাই, তাই আমি বাধ্য হয়েছিলাম। বাধ্য হয়েছিলাম রাজার অবর্তমানে আপনাকে এই কক্ষে বন্দিনী করতে। আপনার জিহ্বা কেটে আপনাকে বাকহারা করতে। আপনাকে বিনা জল-খাদ্যে তড়পে তড়পে শেষ করে দিতে। বাধ্য হয়েছিলাম আমি।” কথা বলতে বলতে রাজমাতার চোখগুলো চকচক করে উঠল। পৈচাশিক আনন্দ দেখা গেলো তার চোখ দু’টিতে। তার কৃতকর্মের জন্য যে তিনি মোটেও অনুতপ্ত নন তা ঐ চকচকে চোখগুলো দেখলেই বোঝা যাচ্ছিল ঢের।

 সুরসুন্দরী তার তলোয়ার শক্ত করে ফলে অকপটেই সেটির সূঁচালো ঐ সুক্ষ্ণ কোণটি চামড়া ভেদ করে রাজমাতার গলায় লাগে। আর্তনাদ করে উঠেন রাজমাতা। প্রাচীরের দিকে নিজের মাথাটি আরেকটু পিছিয়ে নিতে নিতে বলেন,
 “আমায় ক্ষমা করুন। আমি তো সংসারের জন্যই এমনটি করেছিলাম। চেয়েছিলাম আপনার সংবাদ কারো নিকট অব্দি যেন না পৌঁছায়। তাই আপনার এই কক্ষটিকে অব্দি আমি নিষিদ্ধ করেছিলাম। লোহায় মুড়িয়ে লেপে দিয়েছিলাম হলাহল। যেন কেউ ছুঁলেই তার প্রাণনাশ হয়। কিন্তু হলো কী? শেষমেশ রাজাই আমার সংসারের সাধকে ধূলোয় মিশিয়ে দিয়ে নিজের প্রাণ দিয়ে দিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বোধহয় আপনি এখানেই আছেন কোথাও একটা। আমি এত যত্ন করেও কিচ্ছুটি পেলাম না আর আপনি সব পেয়ে গিয়েছিলেন। কেন? কেন? আপনি কেন সব পেয়ে যেতেন। আপনার অতি রূপ আমাদের অনেককিছু ধ্বংস করেছিলো তাই আপনাকেও আমি শেষ করে দিয়েছিলাম।” 

 “এতটুকুতেই কি তুই থেমেছিলিস?”

 “না, না, না। থামিনি। থামতে চেয়েছিলাম। কিন্তু যখন আপনার কন্যা কামিনীকাঞ্চনকে দেখলাম একদিন পুবের এক রাজ্যে। সেদিন যেন আমার সেই ক্ষোভ আবারও পুনরুজ্জীবিত হয়েছিলো। সেই একই অহং, দম্ভ, রূপ আমি নিতে পারিনি। তাই চেয়েছিলাম আপনার প্রজন্মকেও নাশ করে দিতে। ছল করেছিলাম বহু। অলক্ষ্যে অস্ত্রধারী রক্ষীদের পাঠিয়ে, তীর ছুঁড়ে। হয়নি, সেসব হয়নি বলেই নিজের পুত্রকেও সঁপেছিলাম সেই খেলায়। চেয়ে ছিলাম তাকে বলে না পারলে ছলে আটকাতে। কিন্তু আপনারইতো রক্ত, কৌশল কি আর কম রপ্ত করেছিলো? শেষমেশ কি-না আমার রাজ্যে এসেই দখল করল সব। আমার সামনে দিয়ে ঠিক যতবার অতিক্রম করত ততবার মনে হতো ওর প্রাণটা হরণ করে নিতে। কিন্তু নিজেকে দমিয়ে রেখেছিলাম। দমিয়ে রাখার কারণও ছিলো বৈকি। কারণ আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমি ব্যতীতও অন্যকেউও আপনার প্রজন্ম নাশ করার ছলে মগ্ন। তাই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলাম। নিয়েছিলাম সরিয়ে।”
  কথা বলতে বলতে বিজয়ী হাসলেন রাজমাতা। সুরসুন্দরীর তেজস্বীনি চোখ দুটিতে রাজ্যসম বিস্ময় ধরা দিলো আচমকাই,
 “অন্যকেউ!”

 “হ্যাঁ, অন্যকেউ। আমার পুত্রও রাজার মতো রূপে জগৎ ভুলেছিলো। কিন্তু সে ভুলেনি। সে চেয়েছিলো আপনার মতো দেখতে বলে আপনার কন্যাকে ধূলিসাৎ করতে। তার রাজ রাজত্ব শেষ করে দিতে। তার রাজত্বে তৈরিকৃত ছোঁয়াচে ব্যাধি ছড়িয়ে, অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করে…”

 “কে সে!”

 রাজমাতা উত্তরে হাসেন। রাহস্য করেন। 
 সুরসুন্দরীর হাতের বাঁধন সামান্য হালকা হয়। পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, “কে সে? কে”

 রাজমাতা হাসতে হাসতে বললেন, “আর কে? যিনি আপনার জন্য প্রাণ ত্যাগ করেছিলেন, এই রাজ্যের রানি, তাঁর পুত্র হেমলক পিয়ার্স। আপনার কন্যার সবচে’ আপন, প্রাণপ্রিয় স্বামী। রানি কামিনীকাঞ্চনের স্বামী- হেমলক পিয়ার্স।” কথা সমাপ্ত করে দানবীয় হাসিতে ফেটে পড়লেন রাজমাতা। সেই হাসি প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো উন্মুক্ত কক্ষের বুক চিরে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp