" গাড়ি ঘুরাব? দেখুন, রেগে থাকা ঠিক হচ্ছে না। "
শোয়েব ম্যাসেজটার দিকে তাকিয়ে থাকল। লিখে পাঠাল,
- আমার উত্তর তুমি জানো। ঘুরাও!
আবার ম্যাসেজের আগমন হলো,
- ডেষ্কটপের কাছে কিছু রাখা আছে। দেখবেন। আশাকরি, আগামী ছুটিতে ঢাকায় দেখব।
শোয়েব ফোন পকেটে ঢুকিয়ে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে অফিস রুমের দিকে চলে গেল। দাদী পেছন থেকে রক্তের ফোঁটা দেখে অবাক। ভয় জড়ানো কণ্ঠে ডেকে উঠলেন,
- ফারশাদ! হাত কাটলো কীভাবে?
শোয়েব ত্রস্ত পায়ে যেতে যেতে বলল,
- কাঁচ ভেঙে।
কথাটা বলতেই শোয়েব ভেতরে মিলিয়ে গেল। দাদী আর কিছু বলার সুযোগ পেলেন না। কিছুটা দূরে ভাঙা, রক্তমাখা কাঁচের চুড়ি দেখলেন। ধাম করে দরজা খুলে ডেষ্কটপের কাছে গেল শোয়েব। কিবোর্ডের ঠিক পাশে সাদা কাগজ রাখা। পেপার ওয়েটটা সরিয়ে কাগজটা তুলে নিল শোয়েব। নিচের ঠোঁট কামড়ে কপাল কুঁচকে চোখের নীল তারা দুটো নাড়াল,
- একাডেমিক ক্যালেণ্ডার...
শোয়েব চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। এতক্ষণ শক্ত হয়ে থাকা চোয়ালটা ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে এল। ফোনটা তুলে এবার কল করল শোয়েব। ওপাশে দুবার রিং হতেই শাওলিন ধরল। কিছুক্ষণ দুপাশেই নীরবতা। কেউ একটা কথা বলল না। সেকেণ্ডগুলো দুজনের নৈঃশব্দ্য বিনিময় করছে। শাওলিন রুদ্ধ শ্বাস ছেড়ে বলল,
- মানুষ নীরবতার ভাষা বোঝে। না বুঝলে ঢাকায় আসার অনুরোধ করে না।
একটু পর আবারও বলল,
- রক্তমাখা হাতটা যত্ন করুন। হাতটা আমার।
কথাগুলো শুনতেই শোয়েব চোখদুটো বন্ধ করে ফেলল। ঠোঁটের কোণে জমে থাকা শক্ত রেখাটা মিলিয়ে গেল। শাওলিন কিছুটা সময় অপেক্ষা করে বলল,
- পৌঁছে খবর দিব। ছুটিতে আসবেন। রাখি।
শাওলিন চুপ করে রইল। ওপাশ থেকে নিঃশব্দ অভিযোগ পেয়ে কলটা কেটে দিল। শোয়েব শেষ সেকেণ্ড পর্যন্ত কানে ফোন ধরে রইল। তবু একটা কথা সে বলল না। শোয়েব একাডেমিক ক্যালেণ্ডারটা প্রিন্টার মেশিনে পাঠাল। বেরিয়ে আসা কপিগুলোর একটা দেয়ালে আঁটকে দিল। আরেকটি ভাঁজ করে ওয়ালেটে রাখল।
শাওলিন ব্যাগে ফোন ঢুকাতেই শ্রেষ্ঠা ডানপাশ থেকে বলল,
- রেগেছে?
শাওলিন একমুহুর্ত মাথা নিচু করে ধীরে ডানপাশে তাকাল। শ্রেষ্ঠার চোখের দিকে তাকিয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াল। শ্রেষ্ঠা হাত বাড়িয়ে শাওলিনের হাতদুটো শক্ত করে ধরতেই মৃদু গলায় বলল,
- তোর ডিপার্টমেন্টে সেভেন্টি পার্শেন্ট অ্যাটেণ্ডেন্স না থাকলে তোর ফিরতে হতো না। বুঝিয়ে বলিস। বুঝবেন।
শাওলিন কোলে রাখা ব্যাগের দিকে চোখ রেখে বলল,
- আমার ক্ষমতা হলে আমি ঢাকা ফিরতাম না। এই প্রথম কেউ আমাকে জোর করে থেকে যেতে বলছে।
শ্রেষ্ঠা হাত বাড়িয়ে শাওলিনের মাথাটা কাঁধে টেনে নিল। বোনের মতো সৌহার্দ্য সুরে বলল,
- তুই যে চুপ করে আছিস তখনই আমি বুঝেছি। তোর ফিরে যাওয়ার কারণ অনেকগুলো। ভাবী না।
- এখন যদি ইয়ার গ্যাপ দিই অথবা একটু সিজিপিএ খারাপ আসুক, মণি বিয়ের প্রসঙ্গ টেনে উনাকে অপমান করতো। আমি এখনো জানি না একটা মানুষকে এতো অপছন্দ হলে কেন তার কাছে বিয়ে দিতে হলো?
- এসব নিয়ে ভাবিস না। আর কেউ বুঝুক না বুঝুক আমি জানি তুই অনেক কিছু চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিস।
শাওলিন চুপ করে রইল। বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। জানালার কাঁচ অস্বচ্ছ হয়ে গেছে। খাগড়াছড়ির বাতাসে যে বিশুদ্ধতা সেটা শেষবারের মতো বুকভরে টেনে নিল শাওলিন। তারপর জানালা উঠিয়ে দিল নিঃশব্দে।
—————
ঢাকায় পৌঁছে শাওলিন ব্যস্ত জীবনে ডুবে গেল। জার্নির রেশ কাটাতে গোটা একদিন শুধু ঘুমাল। ঘুম থেকে যখন উঠল তখন পরদিন মাঝরাত। জোহরা দরজা ধাক্কাধাক্কি করেছে। কিন্তু শাওলিন ডাক শোনেনি। সকালে ক্লাসের শিডিউল দেখল। দুপুর দুটোয় একটা ক্লাস পড়েছে। সকাল নটায় তৈরি হয়ে নিল। পরনে সুতির কালো কামিজ, পাজামা ও ওড়না খয়েরি রঙের। চুলগুলো বাঁদিকে বেনী গেঁথে শাওলিন বেরোনের আগে ফোনটা দেখে নিল। হাস্যোজ্বল চোখদুটো নিমিষেই মলিন শূন্য হয়ে গেল। কোনো ম্যাসেজ নেই। দুটো দিন পেরিয়ে গেল। শাওলিন লিখে পাঠাল,
- কেউ এখনো নীরব থাকবে?
ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল শাওলিন। দীর্ঘসময় পরও উত্তর এল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বেরিয়ে পড়ল শাওলিন। ক্লাস করল, অ্যাসাইনমেন্ট টপিক লিখল, ল্যাব রিপোর্টের লেকচার শীট নিয়ে সন্ধ্যা সাতটায় বাড়ি ফিরল। জোহরা গ্লাসে পানি ঢেলে বললেন,
- তোমার দাদী শ্বাশুড়ি ফোন দিয়েছিলেন। সময় পেলে কথা বলো।
শাওলিন গ্লাসটা তুলে এক চুমুকে পানি খেয়ে বলল,
- আর কেউ দেয়নি?
জোহরা রান্নাঘরে যেতেই ঘুরে তাকালেন। ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করলেন,
- কার কথা বলছ?
শাওলিন অনিচ্ছুক হাসিতে রুমে যেতে বলল,
- ভাবীদের কথা বুঝিয়েছি।
ঘরে ফিরে হাতমুখ ধুয়ে নেভি ব্লু লাগেজটা খুলল শাওলিন। আসার সময় দাদী ব্যাগটা গুছিয়ে দিয়েছেন। শাওলিন মেঝেতে বসে লাগেজের ভেতর বেশ কিছু নতুন পোশাক দেখতে পেল। নতুন বানানো থ্রি-পিস, কিছু শাড়ি। সবকিছু বের করে রাখতেই হঠাৎ কপাল কুঁচকে গেল। হাত বাড়িয়ে আশ্চর্য হয়ে বলল,
- ডায়েরি! হারিয়ে গিয়েছিল তো!
কাঠ মলাটে চিরচেনা পুরোনো ডায়েরি। ওর বালিশের কাছে, টোটব্যাগের ভেতরে সবসময় রেখে দিতো। শাওলিন খুশিতে দুচোখ বন্ধ করে ডায়েরিটা বুকে জাপটে রইল। তারপর বিছানায় গিয়ে ডায়েরিটা খুলল শাওলিন। একটা মুখবন্ধ খাম। উপরে প্যাঁচানো অক্ষরে লেখা,
একান্তে দেখার অনুরোধ থাকবে।
- ফাতিমা নাজ মির্জা
শাওলিন ঘরের দরজা আঁটকে দিল। লাগেজ গুছিয়ে খামের মুখটা ছিঁড়ে ফেলল। ঝাড়া দিতেই কোলের ওপর তিনটা ছবি, একটা জীর্ণ কাগজের চিঠি, একটা কাঠের কলম পড়ল। কাঠটা কেমন অদ্ভুত কালো। নখ ঘষে দেখল কালো আস্তরের নিচে কাঠ আছে। ভ্রুঁ কুঁচকে শাওলিন প্রথমে ছবিগুলো দেখল। মায়াবী চেহারার একজন নারী। সোফায় বসে আছেন। ঘনকালো চুল খোঁপা করা। আশি-নব্বই দশকে শাড়ি পরার যে সৌন্দর্য ছিল, কালো জমিন সোনালি পাড় শাড়িতে তেমন অপরূপ লাগছে। পাশে একজন সুপুরুষ চেহারার ভদ্রলোক। চোখে চশমা। ধূসর স্যূট প্যান্ট বুটে স্ত্রীর কাঁধ জড়িয়ে রেখেছে। ঠোঁটে চোখে আন্তরিক হাসি। ছবির নিচে মলিন অক্ষরে লেখা - FARDIN ASAD MIRZA & MOSTAFA DILSHAD.
বাকি দুই ছবিতে দিলশাদের কোলে দুই বছরের ছেলেশিশু। কান্নায় চোখমুখ কুঁচকে ফেলেছে। শিশুটাকে দেখে শাওলিন হাসি দিতে ভুলল না। কিন্তু শেষ ছবিটা তুলে শাওলিন আবারও অবাক হয়ে গেল। ছবিটার ডানদিকে অনেকখানি নেই। যেন ছবিটা থেকে কাউকে আলাদা করা হয়েছে।
- ' ছবিটা কেন ছিঁড়ল?'
শাওলিন উল্টে পাল্টে ছবিটা দেখে রেখে দিল। ফুলের বাগানের পাশে কাঠের বেঞ্চ, সেখানে কেউ বসে ছিল, কিন্তু ছবিটা অসম্পূর্ণ। চিঠির ভাঁজ খুলে পুরুষালী হাতের লেখা দেখল শাওলিন। চিঠিটা মনোযোগ দিয়ে পড়ল।
স্নেহভাজনেষু ফারশাদ,
সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর মেহেরবানিতে তুমি মঙ্গল আছ। তুমি বহুদিন ধরিয়া কোনো পত্র পাঠাও নাই। তোমার আচরণ লইয়া তোমার দাদী বিমর্ষ হইয়া গিয়াছেন। তুমি আমার সিন্দুক হইতে একটি কলম খুঁজিয়া নিয়া গিয়াছ। পরে জানিতে পারিলাম উহা তুমি না বলিয়াই নিয়াছ। কলমটি তোমার মায়ের চিহ্ন। হৃদয়বিদারক সেই কালরাত্রির ক্ষতচিহ্ন বলিলেই উহা ঠিক হয়। তুমি অতি সত্ত্বর বাড়ি ফিরিয়া আসো। মুসলিম হইয়া খ্রিস্টানদের সহিত তোমার চলাফেরা অত্যন্ত চক্ষুশূল ঠেকিতেছে। কবে আসিবে তাহা পত্রপাঠে জানিয়া দিলে বিশেষ কৃতার্থ হইব।
- তোমার দাদা।
মির্জা।
শাওলিন কিছুক্ষণ নির্বাক রইল। বিয়ের রাতে নফল নামাজের কথা মনে পড়ল। একবারও সন্দেহ হয়নি শোয়েব ধর্ম থেকে দূরে। ইসলামের নিয়ম অনুসারে বিয়ে করেছে। কবুল বলেছে। গ্রহণ করেছে। সে খ্রিষ্টানদের সাথে মিশতো কেন? যার দরুন চিঠি লিখে উদ্বেগ জানাতে বাধ্য হয়েছিল? শাওলিন সবকিছু আগের জায়গায় রেখে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। ঘুম আসার আগ পর্যন্ত চিঠির প্রতিটি শব্দ বারবার মনে পড়ল।
—————
আগামীকাল ইনকোর্স পরীক্ষা। রাত জেগে সেল বায়োলজি কোর্সের নোটস দেখছিল শাওলিন। পড়ার ফাঁকে ফোনের দিকে নজর দিতে ভুলেনি। খাগড়াছড়ি থেকে আসার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেল। কোনো ম্যাসেজ নেই। একটা কলও না। মতিনের স্ক্রিন ভাঙা এন্ড্রোয়েড ফোনে শাওলিন কল দিয়েছিল। শোয়েব হাতে ব্যাণ্ডেজ করেছে। বাড়িতে একবেলা খেয়ে বেরোয়, রাত এগারোটায় ফেরে। ঢাকায় যে বাড়িটার কথা শুনেছিল সেখানে বাড়ির লোকগুলো চলে গেছে। ছয়মাসের ছুটিতে দেশে এসেছে। আর দুমাস বাকি। শাওলিন ঘুমের হাই তুলে আবার ফোনটাকে হাতে নিল। চেয়ারে পা তুলে বসতেই হোয়াটসঅ্যাপে লিখল,
- জেগে আছেন?
লিখেও পুরোটা কেটে দিল শাওলিন। পাঠাল না। শেষবার অনলাইন ছিল যেদিন শাওলিন ঢাকায় ফিরেছে। ঘরের বাঁদিক থেকে প্রশ্নটা এল,
- এই জানা, কী মুখস্ত দিতাছস?
শাওলিন চমকে রুমমেটের দিকে তাকাল। ঐশ্বর্য সমস্ত শীটস, নোটস দিয়ে বিছানাটা জঙ্গল বানিয়ে রেখেছে। ওর অবস্থা দেখে শাওলিন বলল,
- এভাবে হবে না, ঐশ্বর্য। বারবার বলছি তুই ডেফিনেশন মুখস্ত করা ছাড়। ডায়াগ্রামগুলো দেখ। প্রশ্ন এলে ওখান থেকেই আসবে।
ঐশ্বর্য কলম কামড়ানো রেখে সারা বিছানায় জঙ্গল দেখে বলল,
- ধুর বা&ল, এই বা&লের পড়া ভাল্লাগে না। চল তো বাইরে যাই। কোন কামলায় এই বালের টপিক পড়ব কে জানে।
শাওলিন আশ্চর্য হয়ে বলল,
- তুই কালকে আন্সার করবি কী? জহির স্যার তোকে প্রথম দেখাতেই ফার্স্ট বেঞ্চে বসাবেন।
- বা&ল ফালাক। চল, বাইরে যামু। তোর পড়া আগেই হইছে আমি জানি। কুয়ারা দেখায়া বইসা থাকিস না চল।
- কোথায় যাবি?
- অর্পাদের রুমে। ওরাও পড়তেছে না।
শাওলিন টেবিলে চোখ ফিরিয়ে বলল,
- আমি যাব না। লেকচার বাকি আছে। তুই যা।
ঐশ্বর্য রুম ত্যাগ করল। ট্রাউজারের পকেটে লাইটার, সিগারেট ঢুকাতেও ভুলল না। কিছুক্ষণ পর শাওলিন দরজা আঁটকাতে গেল। হঠাৎ কানে কিছু রহস্যময় কথাবার্তা ভেসে এল,
- মেঘনার সাথে কথা বলছস? কী বলছে ওয়? শ্রেষ্ঠারে কালকে ডাকা হইব?
- শরীফ ভাই শ্রেষ্ঠারে সরতে বলব না। আজকা সকালে মনিরের লগে কথা কইছি। মনিরে কইলো দর্শন বিভাগের মোস্তাক তলে তলে ছাত্রদল মারাইতেছে।
- লীগ কইরা ছাত্রদলরে চাটে?
- দুই নাওয়ে পা রাখছে দেইখাই মোস্তাকরে একটু আগে ধইরা নিয়া গেল।
- পরশুদিন জাশির দুইটারে ধরছে। ঘটনা সত্য?
- হ। রাইতের বেলা নামাজ পড়তে বাইর হইছে। ওই টাইমে বাইক দিয়া শরীফ ভাইয়ের লগেটায় দেখছিল। পোলার নাম বায়েজীদ। ওয় শ্রেষ্ঠার কাছে খবর চালান দিতেই জালে মাছ আঁটকা।
- শ্রেষ্ঠারে সরাইতে হইব মামা। এই ছেড়ি খুব ফর্মে আছে। সবদিকে টান রাখতাছে। আজকা লীগের সভাপতির গ্রুপে আছে তো কালকা লীগের সেক্রেটারি গ্রুপের সাথে চা খাইতেছে।
- ওর হো* দিয়া চা ভরতে মন চায়। উপর থিকা নির্দেশ আইলে ওর কাছে আগে যায়। কোনদিন জানি খারাপি হইব। সময় আইতাছে।
দরজার ওপাশ থেকে পায়ের শব্দগুলো দূরে মিলিয়ে গেল। শাওলিন বাকরুদ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ কথা বলল না। ওরা কী শ্রেষ্ঠাকে পদচ্যুত করতে চাচ্ছে? বিছানায় ফিরে এল শাওলিন। রাজনৈতিক বিষয়ে কখনো আগ্রহ আসেনি। শ্রেষ্ঠা যে দলীয় আদর্শে বিশ্বাসী শাওলিন সেই দলকে ঘৃণা করে। শ্রেষ্ঠা এটা জানলেও কখনো শাওলিনের ওপর মতামত চাপিয়ে দেয়নি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে শ্রেষ্ঠা দলীয় ষড়যন্ত্রে বলি হতে চলেছে!
—————
পরীক্ষা শেষে ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হয় শাওলিন। এ সময় মিছিলের স্লোগানে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে গেল। মিছিলের নেতৃত্বে শ্রেষ্ঠা। ডানহাতে মাইক ধরে বজ্রমুষ্টিতে বাঁহাত শূন্যে উত্তাল করছে। বলিষ্ঠ স্বরে আগুনের গোলা ছাড়ছে,
দুর্নীতিবাজ ভিসির—
পদত্যাগ চাই!
পদত্যাগ! পদত্যাগ!
ফারহানার পদত্যাগ!
আরেকটি মিছিল মাওলানা ভাসানী হলের সামনে থেকে বের হলো। প্রথম সারিতে নাযীফ, সেলিম, জিদান। মিছিলে সবার হাতে কালো পতাকা। স্লোগানে কেঁপে উঠল চারপাশ,
"ভিসি তুমি কবে যাবা?"
"ভিসি তুমি চলে যাও!"
শাওলিন ফোন বের করে রোজাকে কল করল। রোজা কল ধরল না। বাধ্য হয়ে শ্রেষ্ঠার পরিচিত বায়েজিদকে কল করল। আশ্চর্যজনক হলেও মিছিল থেকে বেরিয়ে কলটা ধরল বায়েজিদ। শব্দের জন্য ঠোঁটের সামনে হাত রেখে বলল,
- হ্যাঁ জানা, বল।
- ভাই মিছিলটা কীসের? হঠাৎ কী নিয়ে আন্দোলন শুরু হলো?
- তুই জানস না? ভিসি ফারহানার কেস। ফারহানা বাসভবন সংস্কারের জন্য অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাৎ করছে।
- প্রতিনিধি দল যে দাবি রেখেছিল সেগুলো বাতিল?
- প্রতিনিধি দলের কাউরে ভেতরেই ঢুকতে দেয় নাই। এই কারণেই পোলাপান আরো খেপছে। তুই কই?
- আমি মাত্র পরীক্ষা দিয়ে বের হলাম।
- মাঠে নাম।
কথাটা বলতেই বায়েজীদ থামল। কার প্রশ্নের যেন উত্তর দিল। তারপর আবার কলে ফিরে বলল,
- সাধারণ শিক্ষার্থীরা মাঠে নামছে। ভিসির পদত্যাগ নিশ্চিত করে ছাড়ব!
কল কেটে দিল বায়েজীদ। মিছিলে দৌড়ে ছুটে শরীক হয়ে গেল। শাওলিন কঠোর চোখে তাকাল। টোটব্যাগে ফোন ঢুকাতেই মনে মনে ভেবে নিল কী করবে।
—————
বিকেল পাঁচটা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ভিসি লজের প্রধান ফটকের সামনে বাঁশের ব্যারিকেড। লজের সামনে পাঁচশোর বেশি শিক্ষার্থী। একপাশে ছাত্রলীগের দুটি গ্রুপ আলাদা আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে। বাম সংগঠনের শিক্ষার্থীরা নিজেদের ব্যানার নিয়ে এসেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা সামনের সারিতে বসে। সাংবাদিকদের ক্যামেরা ট্রাইপডে বসানো। একজন স্লোগান দিল,
- "দুর্নীতিবাজ ভিসির"
পেছন থেকে শতাধিক কণ্ঠ একসঙ্গে গর্জে উঠল,
- "পদত্যাগ চাই! "পদত্যাগ চাই!"
সাধারণ শিক্ষার্থীদের থেকে একজন স্লোগান দিল,
- "ফারহানা কামালের".... "পদত্যাগ চাই! পদত্যাগ চাই"!
জানালা দিয়ে অবস্থা দেখছিল সেগুফতা। সকাল থেকেই বাসভবন সংস্কারের বিপুল ব্যয়ের অভিযোগে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ। প্রতিনিধি দলকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সেগুফতা নেলপলিশ লাগানো তর্জনীটা কল অপশনে স্পর্শ করল। মুহুর্তেই কটা রিং যেতে ওপাশ থেকে কল ধরে বলল,
- হ্যালো।
সেগুফতা ফোন কানে চেপে বলল,
- শোয়েব বলব? না ফারশাদ বলব?
শোয়েব সামান্য বিরক্ত হলো। নির্বিকার কণ্ঠে বলল,
- পয়েন্টে আসুন।
সেগুফতা উত্তেজিত সুরে বলল,
- তোমার বউ রাস্তায় নেমে মিছিল করছে।
শোয়েব কয়েক মুহুর্ত নীরব রইল। পরক্ষণে শান্ত গলায় বলল,
- কেন মিছিলে যোগ দিয়েছে?
সেগুফতা কঠোর মুখে জানাতে লাগল,
- ভিসির পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে। তোমার বউ প্রথম সারি বসে নারী নেত্রীদের মাঝে স্লোগান দিচ্ছে।
- আমাকে কী করতে বলছেন?
- ওকে সরতে বলো ফারশাদ!
- ভিসিকে পদত্যাগ করতে বলুন। দুর্নীতির দায় শিক্ষার্থীরা কেন বইবে?
সেগুফতা কথার মাঝখানে বাইরে তাকাল। আরেকটি দল ইংরেজিতে স্লোগান দিল,
- "Our campus, our right!"
সমস্ত শিক্ষার্থী বলল,
- "Save the campus, join the fight!"
একই সুর, শব্দ, স্লোগান শোয়েবও শুনছিল। তবে ঢাকা থেকে নয়, খাগড়াছড়িতে। টিভির সরাসরি সম্প্রচারে সব দেখতে পাচ্ছে। কজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ভেতর এসে বসল। শোয়েব রিমোট তুলে টিভির সাউণ্ড বাড়িয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর আবার বাংলা স্লোগান,
চেয়ারখানা ছাড়তে নারাজ,
ক্যাম্পাস জুড়ে লাজে লাজ।
ছাত্র জাগে, শিক্ষক জাগে,
কে রাখিবে আজ?
শোয়েব স্লোগান দেয়া মেয়েটিকে দেখে মৃদু হাসি দিল। ঘরের ভেতর যে মেয়েটা রেবার কথা শিরধার্য মেনে নেয়, অন্যায়ের সামনে দাঁড়ালে সেই মেয়েটাই কেমন নির্ভয়ে কণ্ঠ তোলে! পাশ থেকে একজন নার্স বলল,
- স্যার, আপনার জন্য গ্লুকোজ রেখে গেলাম। রক্ত দেয়া হলে খেয়ে নিয়েন।
শোয়েব টিভি থেকে একপলকও চোখ সরাল না।
বাঁহাতের নীল শিরায় সূঁচ ঢোকানো। স্টিলের স্ট্যান্ডে ধীরে ধীরে ভরে উঠছে এক ব্যাগ রক্ত। ঠিক পাশের বেডে তেরো বছরের এক কিশোরী। সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন, মা আইসিইউতে। দুই বছর বয়সি ছোটো ভাই কপালে দুটো সেলাই নিয়ে স্বজনের কোলে কাঁদছে। জরুরি রক্তের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সময়মতো কোনো ডোনার মেলেনি। ডক্টর রেজাউল হক শোয়েবকে কল দিয়েছিলেন। এই মুহুর্তে বাচ্চা মেয়েটাকে বাঁচাতে একব্যাগ রক্ত দিচ্ছে শোয়েব। বাঁহাতের মুঠোয় হলুদ স্কুইশি বল। বলটায় হাসির আদল অঙ্কিত।
·
·
·
চলবে……………………………………………………