এখন পর্যন্ত কোনো চিঠি আসেনি, আর না এসেছে কোনো ফোনকল। মৌমিতার চিঠি তো এতোক্ষণে গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ার কথা। মেয়েটা তবু ধৈর্য রেখেছে। সবুরে নাকি মেওয়া ফলে। দেখা যাক।
বাদলকে মাথা থেকে বের করে দেওয়া যাচ্ছে না। মৌমিতাকে পীড়া দিচ্ছে এসব ভাবনা। স্মৃতিপটে কতো যে ঘটনা ছড়িয়ে আছে, কিন্তু মুখের আদলটা ঝাপসা হয়ে এসেছে। একটা ছবি যদি থাকতো! ঐ মুখটুকু ব্যতীত প্রতিটা স্মৃতিই তাজা। কলেজের দিনগুলো, টিউশন ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ঘোরাঘুরি, দেরি করে বাড়ি ফেরা, মেয়েটার ব্যবহারিক ক্লাস শেষ হওয়া অবধি ছেলেটার অপেক্ষা।
এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে, মৌমিতার অতিরিক্ত কোনো ক্লাস থাকলেই বাদল শিউলি গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকতো, প্রতিবার একটা কথাই বলতো, “আমি অপেক্ষা করবো।”
সে যতোই অস্থির হোক না কেন, এই কথার খেলাপ করেনি কখনও। ওখানেই দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দিতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
ছেলেটাকে অপেক্ষা করাতে খুব কষ্ট হতো মৌমিতার। ইচ্ছে করতো সব ছেড়েছুড়ে দিনের পুরোটা সময় তার সাথে কাটিয়ে দিতে।
নিজ জেলার বাইরে পড়তে আসার পর একটু অসুবিধাই হয়েছিলো। বিকেলের আগে বাদলকে ফোনে পাওয়া যেতো না। আর কোনোদিন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলে বাদল নিজেই কল দিতো। কেবল তার কণ্ঠ শোনার জন্যই মেয়েটা ছটফট করতো সারাটা দিন। অথচ এখন দিনের পর দিন চলে যাচ্ছে, কোনো কথা নেই। কোনো যোগাযোগ নেই। সবকিছু এতো জটিল হলো কবে?
ডা. আজিম আজ তিন নম্বর কেবিনে এসেছেন মারুফকে দেখতে। রোজ আসতে পারেন না। বেশিরভাগ সময়ই নাসরিন তদারকি করে।
রোগীকে পর্যবেক্ষণ করে আজিম সাহেব বেশ নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে ঘোষণা দিলেন, “ওনার অবস্থা ভালোই। এটা ধরে রাখতে পারলে আর কোনো চিন্তা নেই। শুধু খাওয়া-দাওয়ার দিকে একটু লক্ষ রাখবেন। আর দেখবেন, উনি যেন কিছু নিয়ে দুশ্চিন্তা না করেন। আমরা চেষ্টা করে দেখি, কাল পরশুর মধ্যে রিলিজ দেওয়া যায় কিনা।”
রিপন মাথা দোলায়, “এমনিতে আর কোনো সমস্যা নেই, না?”
“চিন্তার কিছু নেই।”
“আচ্ছা।”
রিপন ডা. আজিমের সাথে কথা বলতে বলতেই বেরিয়ে গেলো। মার্জিয়া গিয়ে বিছানায় বসলো মায়ের পাশে, “ভালোই হলো। হসপিটালে এতোদিন থাকতে ভালো লাগে না।”
মৌমিতা লম্বা একটা শ্বাস ফেলে, “তুই তো সেদিনই এসেছিস। আমাদের আসার প্রায় এক সপ্তাহ হবে।” মারুফের দিকে তাকিয়ে তুলনামূলক নিচুস্বরে বলে সে, “রিলিজ দিলে ভালো। কিন্তু আমি আব্বার কোনো উন্নতি দেখছি না।”
মারুফ ঘুমাননি, চোখ বুজে শুয়ে রয়েছেন। মেয়েটার আক্ষেপ তার কানে পৌঁছালো না। তবে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা নাসরিন শুনলো। সে বিড়বিড় করে বললো, “চেহারা খারাপ হয়েছে।”
মৌমিতা পেছনে ঘুরে তার দিকে তাকালো, কিছু বললো না।
“যখন আসলেন, তখনও স্বাস্থ্য ভালোই ছিলো। এই কয়দিনে অনেক শুকিয়ে গেছেন।”
নাসরিনকে মৌমিতা তেমন পছন্দ করে না। তবে তার এই মন্তব্যে সে বিব্রতকর কিছু পেলো না। মেয়েটার চোখে করুণা নেই, কোনো সস্তা সহানুভূতিও নেই। যেন এই রোগাক্রান্ত অপরিচিত ব্যক্তি খুব অল্পদিনেই তার আপন হয়ে গেছে। হয়তো সেবিকারা এমনই হয়। মারুফকে সুস্থ অবস্থায় দেখলে কেমন লাগতো মেয়েটার? ঐ মলিন মুখখানার আড়ালে যে অমায়িক মানুষটা আছে, তার সাথে কি নাসরিনের কখনও পরিচয় হবে?
মৌমিতা ঠিক করলো, আব্বা সুস্থ হলে এই মেয়েটাকে একদিন বাড়িতে ডাকবে। যদিও এতোটা সামাজিকতা সে এখনও আয়ত্ত করতে পারেনি।
“ম্যাম, দুপুরে তো খাননি বোধহয়?”
মৌমিতার ধ্যান ভাঙলো, ডানে-বামে মাথা নেড়ে বললো, “না।”
“খেয়ে নিন তাহলে। রাতে মাহফুজ স্যার আসবেন, পেশেন্টকে আরেকবার চেক করতে।”
এবার অপ্রসন্ন দেখালো মৌমিতাকে। এই মেয়ের সবকিছুতে মাহফুজ স্যার! তাদের মধ্যে কি কোনো বিশেষ সম্পর্ক আছে? থাকতেই পারে। কিন্তু এতে বিচলিত হওয়ার তো কোনো কারণ নেই।
নাসরিন আর কথা বাড়ালো না, বেরিয়ে পড়লো। রাবেয়া তাগাদা দিলেন, “বেলা হয়ে গেছে। আরও কখন খাবা?”
তিনি উঠে দাঁড়ালেন, টেবিলে রাখা থালাগুলো প্রস্তুত করে নিলেন। সামান্য খুটখাট শব্দ হলো।
মার্জিয়ার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে এলো, সে তোতলাতে লাগলো, “আ... আম্মা—”
রাবেয়া তার দিকে এক ঝলক তাকিয়েই স্বামীর দিকে মুখ ঘোরালেন। মারুফের শরীর ভয়ানকভাবে কাঁপছে; চোখ খোলা, মণিদুটো উপরের দিকে স্থির হয়ে আছে। মৌমিতা ছুটে গেলো, তার হাতের তালু মালিশ করতে লাগলো, “আব্বা? আব্বা, কী হয়েছে?”
মার্জিয়া বিস্ফারিত নয়নে চেয়ে রইলো, নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস হলো না তার।
মারুফের আরেকটা হাত ধরলেন রাবেয়া, জোরে জোরে দোয়া পড়তে লাগলেন, উঁচু স্বরে বললেন, “মার্জু! কাউকে ডেকে আনো তাড়াতাড়ি...”
মেয়েটা দ্রুত ছুটে বাইরে যায়। দোয়া পড়ে অনবরত মারুফের কপালে ফুঁ দিতে থাকে বাকি দু'জন। তার হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে আসতে শুরু করে। দেহটা ঝাঁকুনি দিয়ে যাচ্ছে এখনও। অবস্থা যখন বেগতিক, রিপন আর নাসরিন এসে ঢুকলো ভেতরে। মার্জিয়া কোনোমতে আব্বার ডান পা মালিশ করতে লাগলো, চামড়াটা শীতল হয়ে এসেছে। ঐ তীব্র ঝাঁকুনির কারণে পা ঠিকমতো ধরে রাখাই মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।
নাসরিনকে আতঙ্কিত দেখালো। সে কয়েক রকম চেষ্টা চালিয়েও অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলো না। নিরুপায় হয়ে ডিউটি রুমে ছুটলো।
অল্পক্ষণের মধ্যেই সুজয় এলো কেবিনে।
“দেখি একটু—” বলেই সে মৌমিতার কাছ থেকে মারুফের বাম হাতটা নিলো। কব্জিতে আঙুল চেপে নাড়ির স্পন্দন পর্যবেক্ষণ করলো। খেয়াল করলো, মারুফের ডান দিকটা যেভাবে কাঁপছে, বাম দিকে কাঁপুনি তার চেয়ে কম। শরীরের এই পাশটা তবে সত্যিই অবশ হতে শুরু করেছে।
সুজয় একটু সরে আসে, বাম পায়ের নিচে নখ দিয়ে আলতো আঁচড় কাটতেই মারুফ পা সরালেন। অর্থাৎ তিনি এখনও অনুভূতি হারাননি পুরোপুরি। সময় আছে। কাঁপুনি কিছুটা কমেছে বলে মনে হলো। রিপনকে উদ্দেশ্য করে সুজয় বলে উঠলো, “আপনি একটু বালিশটা ধরেন তো, মাথাটা উঁচু করে ধরেন।”
রিপন খুব সাবধানে বালিশের নিচে হাত ঢোকায়, ঘাড়সহ মাথাটা যথাসম্ভব উঁচু করে তুলে ধরে। সুজয় এগিয়ে এসে সাহায্য করলো, পিঠের নিচে আরও দুটো বালিশ রেখে মারুফকে আধশোয়া করে বসালো। রাবেয়া ভাঙা গলায় ডাকলেন, “মৌয়ের আব্বা...”
মারুফ চোখের পাতা ফেললেন। স্বাভাবিকভাবে চারপাশে তাকালেন। সুজয় অভয় দিলো, “ব্রেইনের পেশেন্টদের মাঝে মাঝে এমন খিঁচুনি ওঠে। ওনাকে মেডিসিন দিতে হবে।”
আশেপাশের সবাই একটু শান্ত হয়ে দাঁড়ালো। সুজয়ের মনোযোগ গেলো পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে। সে দ্রুত মেয়েটার বাহু ধরে ফেললো, “আরেহ সাবধানে!”
মৌমিতা নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো ঠিকই, কিন্তু চারপাশের সবকিছু আবছা হয়ে এলো তার চোখের সামনে। সে টের পেলো না, তার গায়ে কেউ হাত দিয়েছে কিনা। কী ঘটছে, কিছুই বুঝলো না। মাথাটা ফাঁকা হয়ে গেছে।
“আপনি বসেন।” মেয়েটার হাত না ছেড়েই নাসরিনকে ইশারা করলো সুজয়, “নিয়ে যান ওনাকে—”
নাসরিন মৌমিতাকে ধরে পাশের চৌকি পর্যন্ত নিয়ে গেলো। রাবেয়া আঁচল দিয়ে মুখ মুছে বললেন, “হায় মাবুদ! কী হচ্ছে আমার পরিবারে—”
রিপন বলে ওঠে, “ওদের দুই বোনকে কিছু খেতে দেন আপা। একদম অসুস্থ হয়ে গেছে। মারুফ ভাইকে আমি দেখছি।”
মার্জিয়া তার আপার পাশে এসে দাঁড়ায়, দুই হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে, “আপা? ঠিক আছো?”
মৌমিতা ছোট বোনটার গায়ের উপর সব ভর ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে আব্বার দিকে।
মারুফ এখন প্রায় স্বাভাবিক। দেখে মনেই হচ্ছে না, কিছু সময় আগেই এতো বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। সুজয় মেয়েটার মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নাসরিনকে বলে, “প্রেশার মেশিনটা দেন তো।”
“জ্বী স্যার।”
মারুফের রক্তচাপ বেড়ে গেছে। আশঙ্কাজনক না হলেও বেশ লক্ষণীয়। সুজয় তাকে বিশ্রাম নিতে বলেছে। একজন পুরুষ কর্মচারীকে রেখে গেছে সাহায্যের জন্য।
—————
বিকেল ৫টা।
মমতাজ রিতাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। ভাইয়ের অসুস্থতার খবর কোনোভাবে তার কানে পৌঁছে গেছে। আজকেও রান্না করে এনেছেন।
বাকিদের সাথে কুশল বিনিময় হলে, রিতা গিয়ে মারুফের পাশে দাঁড়ালো, “মামা, ভালো আছেন?”
মারুফ ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
“চিনতে পারছেন না? আমি রিতা।”
তিনি মাথা নাড়লেন, “হুম।”
রিতা আর কিছু খুঁজে পেলো না বলার মতো। মমতাজ কাছে এলেন, আগ্রহের সাথে বললেন, “মারুফ? রিতা বৃত্তি পেয়েছে। এখন একটা পরীক্ষা দিলো, বুঝেছিস? পাশ করলে ও বিদেশে যেতে পারবে পড়ার জন্য। ওর জন্য দোয়া কর।”
মারুফ বিগলিত হাসলেন, ডান হাতটা উপরে তুললেন, “মা...”
ঐ কাঁপতে থাকা হাতটার নিচে মাথা পাতলো রিতা, তার গলাও কেঁপে উঠলো, “দোয়া করবেন মামা।”
মেয়েটার মাথায় হাত রেখে মারুফ অস্ফুটে কিছু উচ্চারণ করলেন। মমতাজ দ্রুত চোখের পাতা ফেলে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন, রাবেয়ার উদ্দেশ্যে বললেন, “রাতে কিন্তু তাড়াতাড়ি খাবা। তোমরা এতো দেরি করে খাও...” একটু নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “এতোটুকুতেই কাঁদলে হবে? মনটা শক্ত করো।”
রাবেয়া দ্রুত আঁচলে মুখ ঢাকলেন।
“ব্যাগ গুছিয়ে রাখো এখনই। আজ তাড়াতাড়ি বের হবো।”
“আমি যাবো না আপা। আপনি মৌ আর মার্জুকে নিয়ে যান।”
মৌমিতা চটপট বলে ওঠে, “আমিও যাবো না।”
মমতাজ বিভ্রান্ত হয়ে বললেন, “এখানে তো এতোজনের থাকার জায়গা হবে না।”
কেউ প্রতিবাদ করলো না, সম্মতিও জানালো না।
বিকেল গড়িয়ে গেছে তখন। মারুফ ঘুমিয়ে পড়েছেন। মৌমিতা বেরিয়েছে ফুপাতো বোন আর ফুপুর সাথে। রিতা কথা বলবে চিকিৎসকের সাথে। তার একটা প্রতিবেদনের জন্য নাকি দরকার।
কেবিনে রয়েছে কেবল তিনজন মানুষ। টেবিলের উপরে থাকা জিনিসপত্রগুলো গোছাতে গোছাতে রাবেয়া বললেন, “মার্জু, তুমি যাবা?”
“হ্যাঁ।”
তিনি একটু অবাক হয়ে পেছনে তাকালেন, “যাবা?”
“হুম। রিতা আপার সাথে থাকবো।”
“তোমার আব্বার শরীরটা খারাপ যাচ্ছে, হঠাৎ যদি কিছু একটা হয়ে যায়—”
“সেজন্যই যেতে চাচ্ছি।” মার্জিয়া আহত স্বরে বলে, “আমি সহ্য করতে পারবো না। আমার চোখের সামনেই যদি আব্বার কিছু হয়ে যায়, যদি আটকাতে না পারি... ঐ দৃশ্য আমার সারাজীবন মনে পড়বে। আমি তো আর বাঁচতেই পারবো না—”
“পাগলি!”
রাবেয়া কাজ ফেলে মেয়েটার পাশে এসে বসলেন, দুই হাতে জড়িয়ে ধরলেন তাকে। মার্জিয়া কোনো সান্ত্বনা আশা করেছিলো। কিন্তু তার আম্মা উল্টোটা করলেন। একেবারে শীতল আর যান্ত্রিক স্বরে বললেন, “সবাইকে তো একদিন যেতেই হবে। আমরা কেউই চিরদিন থাকবো না। কেউ যাবে আগে, কেউ পরে। কিন্তু কেউ মারা গেলে কি বাকিদের জীবন থেমে থাকে?”
এতোক্ষণ যাবৎ অনেক কষ্টে ধরে রাখা অশ্রুকে আর আটকে রাখা সম্ভব হলো না। মেয়েটা কেঁদে উঠলো, “এতো তাড়াতাড়ি? আব্বার এতো তাড়াতাড়ি কিছু হতে পারে না। এখনও তো কিছুই হয়নি, আরও কতো কিছু বাকি। আমাদের দুই জনের বিয়ে হবে, বাচ্চা হবে, ওরা বড় হবে... আব্বা দেখবেন—”
“তুমি রেডি হও। আপারা ওখান থেকে এসেই কিন্তু রওনা দিবেন। আর দেরি করবেন না।”
মার্জিয়ার ভাঙা হৃদয়টা যেন আরও টুকরো টুকরো হয়ে গেলো আম্মার এমন নিষ্ঠুর আদেশে। তিনি কি একটু আশ্বাস দিতে পারতেন না? অথবা শুধু শান্ত হতে বলতেন। এই মুহূর্তে অমন করে বেরিয়ে যেতে বললেন!
মায়ের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে মার্জিয়া চোখ মুছলো, “আচ্ছা, যাই।”
—————
শুক্রবার, সাপ্তাহিক ছুটি। তার উপর শীতের রাত। হাসপাতালের করিডোর জনশূন্য।
মৌমিতা হাত-মুখ ধুয়ে কেবিনে ফেরার সময় দেখলো, ডিউটি রুমে ডা. আজিমের চেম্বারে আলো জ্বলছে। সে ওড়না দিয়ে কোনোমতে মুখটা মুছলো, কয়েক কদম এগিয়ে গেলো।
মাহফুজ কতো রাত পর্যন্ত থাকে? এখানেই থাকে, নাকি আবাসিক হলে ফিরে যায়? এই অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলো মনের ভেতর চাপা দিয়ে মেয়েটা ফিরে যাচ্ছিলো, কোনো কারণে সে আরেকবার চেম্বারের দিকে তাকালো। এরপর যা দেখলো, তা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না সে।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রমহিলা তাকে দেখে মুচকি হেসে এগিয়ে এলেন, “মৌমিতা? কেমন আছো তুমি?”
“আ... আপনি?”
শাহানা সুলতানা মেয়েটার বিস্ময় উপেক্ষা করলেন। ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলেন, “ইশ! এতো শুকিয়ে গেছো মা! খাওয়া-দাওয়া ঠিক রাখতে হবে তো। নাহলে শরীরটা খারাপ হয়ে যাবে। তোমার আব্বা কেমন আছেন? দুপুরে নাকি খিঁচুনি উঠেছিলো? সেজন্য দেখতে এলাম।”
মৌমিতা কথা গুছিয়ে নিতে পারলো না। তাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। শাহানা তার হাত ধরলেন, “বালাটা তোমার হাতে খুব মানিয়েছে। হাতটা শুকিয়ে গেছে। নিজের খেয়াল রাখতে হবে মা। ভেঙে পড়লে চলবে না। মারুফ ভাই ঘুমিয়ে গেছেন?”
উপর-নিচে মাথা দোলায় মেয়েটা।
“আচ্ছা। কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবে, কেমন? আমি সকাল পর্যন্ত আছি। এখন যাও, তুমিও রেস্ট নাও। তোমার আব্বাকে কি ডাক্তার আরেকবার দেখতে যাবে?”
“জ্বী।”
“আমি তাড়াতাড়ি যেতে বলবো তাহলে। নাহলে দেরি হবে। বেশি রাত করে ঘুমানো ঠিক না। যাও।”
উল্টো ঘুরেই হনহন করে হাঁটতে লাগলো মেয়েটা। তার মুখে একরাশ বিভ্রান্তি আর অস্বস্তি। এই মহিলা এখানে কেন? কে খবর দিলো তাকে?
শাহানা চেম্বারে ঢুকলেন, “আজিম ভাই কখন আসবেন?”
সুজয় ব্যস্তভাবে জবাব দেয়, “জানি না। আমার কথা হয়নি ওনার সাথে। আপনি বাসায় যাবেন না?”
“না। সকালে মারুফ সাহেবের সাথে দেখা করে চলে যাবো।”
“জেগে থাকবেন?”
“হ্যাঁ। মৌমিতার সাথে দেখা হয়েছিলো। ওকে বলেছি, কোনো দরকার হলে যেন আমাকে জানায়।”
ছেলেটার কোনো আশানুরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখে শাহানা জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের কি কথা হয়নি?”
“আপনি একটু বেশিই তাড়াহুড়ো করছেন না?”
শাহানা বিরক্ত হলেন, “আবার ঐ এক কথা! তোমার ভালোর জন্যই তাড়াহুড়ো করছি।” একটু বিরতি নিয়ে ধীরস্বরে বললেন তিনি, “আল্লাহ রক্ষা করেছেন। ভালোই হয়েছে, ঐ মেয়েটা পালিয়ে গেছে। ওর মা-বাবাকেও আমার পছন্দ হয়নি, চতুর লোকজন! মেয়ের আরেক জায়গায় সম্পর্ক আছে, সেটা বলবে না? আমার আগে থেকেই সন্দেহ ছিলো। তোমাকেও সাবধান করেছিলাম। যাই হোক, ভুলে যাও ওসব।”
সুজয় নির্বিকার হয়ে ফাইলগুলো গোছাতে থাকে। তার মা এবার আরও কোমল স্বরে বললেন, “মৌমিতাকে পারলে জানিয়ে দিও। ভালোভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে, বুঝেছো? নাহলে ভুল বুঝবে। আমি চাচ্ছি না এই সম্বন্ধটা ভেস্তে যাক। আমার খুব পছন্দ হয়েছে ওকে। তোমার কাছে কেমন লাগলো?”
“মোটামুটি।”
শাহানা হেসে ফেললেন, “আমার কাছে মিথ্যে বলছো! ওসব নাটক বন্ধ করো। আমি জানি তোমারও পছন্দ হয়েছে।”
“তাহলে জিজ্ঞেস করছেন কেন?”
—————
দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে মৌমিতা ক্লান্তভাবে এগিয়ে গেলো। রাবেয়া এখনও শুয়ে পড়েননি। এক কোণে বসে মারুফের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। মেয়ের উপস্থিতি টের পেয়ে বলে উঠলেন, “ডাক্তার কখন আসবে? অনেক রাত হলো।”
মৌমিতা ধাম করে বসে পড়লো, “অসহ্য!”
“কী হয়েছে?”
“ঐ যে ঐ মহিলা, কী যেন নাম... শাহানা সুলতানা। এখানে এসেছেন।”
“এভাবে কথা বলছো কেন? ওনার উপর রাগ দেখিয়ে কী হবে?”
মেয়েটা শান্ত হলো। আসলেই তো। ঐ ভদ্রমহিলার কোনো দোষ নেই। যিনি তো কেবল মারুফের অসুস্থতার কথা জেনে একটু দেখতে এসেছেন। কিন্তু জানলেন কী করে?
“আম্মা, আপনি ওনাকে বলেছেন, তাই না? কী দরকার ছিলো?”
“তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি না মৌ।”
“আব্বার অসুখের কথা আপনি বলেছেন ওনাকে?”
“না।”
“তাহলে কে বললো?”
“ওনার ছেলে ছাড়া আর কে বলবে? সুজয়ই বলেছে।”
“ওনার ছেলে জানলো কীভাবে?”
রাবেয়া অবাক হয়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন, “কী বলছো এইসব? সুজয় যে এতো দেখাশোনা করছে তোমার আব্বাকে। ও জানবে না?”
মৌমিতা শূন্য দৃষ্টিতে মায়ের মুখের দিকে চেয়ে রইলো।
“নাকি তুমি এখনও চিনতেই পারোনি? তোমাকে যে বায়োডাটা দেখতে দিলাম, একবারও দেখেছো? নামটাও দেখোনি? নাহলে তো জানার কথা, পাত্রের পুরো নাম মাহফুজুর রহমান সুজয়। রাজশাহী মেডিকেলে পড়েছে, এখানেই এফসিপিএস করছে। দেখোনি?”
মেয়েটার শরীর অসাড় হয়ে আসে। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। নিজের উদাসীনতার চূড়ান্ত ফলাফল আজ তার চোখের সামনে। ডক্টর মাহফুজ, ঐ তরুণ নিউরোলজিস্ট... সুজয়! যার সাথে তার বিয়ের কথা চলছে, যার মা একটা স্বর্ণের অলঙ্কার উপহার দিয়ে তাকে দোটানায় ফেলে রেখেছেন।
বাদলের প্রতিদ্বন্দী যে যথেষ্ট ক্ষমতাধর, এটা তার জানা ছিলো। কিন্তু শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা, বংশ, পারিবারিক আর আর্থিক অবস্থার দিক দিয়ে নয়, ছেলেটা আরেকটা দিক থেকেও বাদলকে টেক্কা দিয়েছে। বিনা পরিশ্রমে মৌমিতার মনে একটু একটু করে জায়গা দখল করতে শুরু করেছে। অস্বীকার করার উপায় নেই! বাদল এভাবে পিছিয়ে পড়লো? এভাবে!
কেবিনের দরজাটা খুলে গেলো। সুজয় সরাসরি মারুফের দিকে তাকিয়েই ভেতরে ঢুকলো। মৌমিতা চমকে উঠে ঘুরলো সেদিকে।
ছেলেটা মন দিয়ে নিজের কাজ করলো, মারুফের রক্তচাপ পরীক্ষা করলো, ফাইলে কিছু একটা দেখলো। তারপর আচমকাই মেয়েটার দিকে ফিরে তাকালো, ভ্রু কুঁচকে বললো, “কী হয়েছে?”
পরিচিত কণ্ঠটা যেন তীরের মতো বিঁধলো মৌমিতার কানে। সে আর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এলো কেবিন থেকে। ফাঁকা করিডোরে হনহন করে হেঁটে দূরের একটা বেঞ্চের কিনারায় গিয়ে বসে পড়লো। শরীরটা যেন একেবারে ভেঙে পড়তে চাইছে। সে কপালে হাত দিয়ে চুপ করে রইলো। কান্নাকাটি করার মতো গুরুতর কিছু হয়নি, তবু তার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগলো। চারপাশ সুনসান বলেই সে ভালোভাবে টের পেলো, শ্বাস নিতে কতোটা কষ্ট হচ্ছে তার।
“মৌ? কী হয়েছে মা?”
মেয়েটা এবার শব্দ করে কেঁদে ফেললো, মাথা তুললো না। শাহানা তাকে কাছে টেনে নিলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে আরেকবার প্রশ্নটা করতেই যাচ্ছিলেন, তবে করলেন না। তার মুখটা দুশ্চিন্তায় ছেয়ে গেলো। মারুফ খন্দকারের কিছু হয়ে যায়নি তো? একবার দেখা করতে যাওয়া উচিত। কিন্তু মেয়েটাকে এই অবস্থায় ফেলে কোথাও যেতে তার মন সায় দিলো না। সরাসরি প্রশ্ন করতেও দ্বিধা হলো। তিনি মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন। তারপর খেয়াল করলেন, সুজয় ঐ কেবিন থেকে বেরিয়েছে।
ছেলেটা এগিয়ে আসে, নিজের মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে থাকা মেয়েটাকে দেখে থেমে দাঁড়ায়। শাহানা মৌমিতার দিকে ইঙ্গিত করে ছেলেকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলেন—কী হয়েছে?
সুজয় মাথা নেড়ে জানায়, সে নিজেও জানে না কী হয়েছে। শাহানা একটু স্বস্তি পেলেন এটা ভেবে, মারুফের কিছু হয়নি। হয়তো মৌমিতা অনেক ভয় পেয়েছে কোনো কারণে। এমনিতেও অনেক ধকল যাচ্ছে তার উপর দিয়ে।
সুজয়কে দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে তিনি কৃত্রিম রাগের সুরে বললেন, “ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এদিকে আসো।”
অন্যকারও উপস্থিতি টের পেয়ে মৌমিতা দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে, চোখের পানি মুছে ফেলে। এতোক্ষণ আবেগের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে যে সে পাত্রের মায়ের সামনে এতো দুর্বলতা দেখিয়েছে—এই ভাবনাটা তাকে ভীষণ লজ্জায় ফেলে দিলো। পীড়াও দিলো। এতো যত্ন, এতো স্নেহ পাওয়ার পরে এই মানুষগুলোকে প্রত্যাখ্যান করার রাস্তাটা যে আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা শুষ্ক ঢোক গিলে সোজা হয়ে বসলো।
সুজয় ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। তার দৃষ্টি একবার মা, একবার হবু স্ত্রীর পানে ঘুরপাক খায়। শাহানা একটা বড় শ্বাস ফেললেন, “তোমাদের বোধহয় সেভাবে পরিচয় হয়নি। মৌ, ও হচ্ছে সুজয়। তুমি হয়তো জানো, তবু বললাম। মারুফ ভাইয়ের এই অবস্থায় বিয়ে নিয়ে আলাদা করে কিছু বলা হয়নি। তোমাদের কি কথা হয়েছে?”
সুজয় কিছু বললো না, তার চোখ মায়ের মুখ থেকে সরে মেয়েটার দিকে যায়। মৌমিতার দৃষ্টি তখনও মেঝেতেই আটকে রয়েছে। সে ডানে-বামে মাথা নাড়ে! শাহানা হাসলেন, “কথা হয়নি? কথা বলো তাহলে। আমি তোমার মায়ের সাথে দেখা করে আসি।”
তিনি তাদের দু'জনকে রেখে কেবিনের দিকে গেলেন। মৌমিতা চোখের কোণ দিয়ে এক ঝলক দেখলো ভদ্রমহিলাকে। উপলব্ধি করলো, করিডোর জুড়ে সে ছাড়া শুধু একজন মানুষ রয়েছে এখন। হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হারে বাড়তে লাগলো। ঘাড় নামাতেই ছেলেটার পায়ের দিকে চোখ যায় তার। সুজয় এগিয়ে কাছে আসে, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে, “চিন্তার কিছু নেই। আপনার বাবা আগের চেয়ে ভালো আছেন। ওষুধটা কনটিনিউ করতে হবে।”
তার উচ্চারিত শব্দগুলো মেয়েটার দুই কানের এদিক-ওদিক ঠোক্কর খায়। সে মাথাটা আরও নিচু করে। সুজয় হয়তো একটু বেশিই কাছাকাছি চলে এসেছে; তার শরীর থেকে পারফিউম, ঘাম আর অ্যান্টিসেপ্টিকের একটা মিশ্র ঘ্রাণ আসছে। মৌমিতা চোখ বুজে বড় বড় শ্বাস টেনে নেয়। নিজেকে বড্ড নির্লজ্জ আর বেঈমান মনে হলো তার। তবুও সে এই মুহূর্তে নিজেকে আটকাতে চাইলো না। এই মানুষটার উপর তার অধিকার আছে! কিছু সময়ের জন্য হলেও। সেই অধিকার জোর খাটিয়ে তার হাতে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে, অলংকার আকারে পরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মেয়েটার অনুভূতি সম্বন্ধে উদাসীন সুজয় কিছুটা ঝুঁকে আসে, রক্তিম হয়ে আসা মুখটার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলে, “আপনি কি... ঠিক আছেন?”
মৌমিতা সামনের ছোট চুলগুলো দ্রুত ঠিকঠাক করে নেয় কাঁপা হাতে। ছেলেটা এতো কাছাকাছি! হাতটাকে একটু বেপরোয়া হতে দিলেই তাকে ছুঁয়ে ফেলা সম্ভব। মুখ তুলে তার চোখে চোখ রাখার সাহস পায় না মেয়েটা। কোনোমতে মাথা নেড়ে জানায়, সে ঠিক আছে। সুজয় আর দাঁড়ায় না, চলে যায়।
মৌমিতা ভেবেছিলো, ছেলেটা আরও কিছু জিজ্ঞেস করবে। আব্বার প্রসঙ্গের বাইরে। এটা তার আশঙ্কা ছিলো, আশাও ছিলো! জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতে পারতো কিনা, সে জানে না। তবু দমিয়ে রাখা একটা প্রবৃত্তি যেন খিচখিচ করতে লাগলো ভেতরে। ছেলেটা যদি আর কিছুক্ষণ থাকতো!
মৌমিতা মাথা তুলে সোজা হয়ে বসলো, পেছনে হেলান দিলো। দূর-দূরান্তে সুজয়ের উপস্থিতি দেখলো না আর। বাতাসে তার সৌরভ মিশে আছে তবু। মেয়েটার ভ্রুজোড়া কুঁচকে গেলো। জোর করে শ্বাস আটকে রাখলো খানিকক্ষণ। সামান্য কেশে উঠলো।
তারপর সে মাথাটা এলিয়ে দেয় পেছনে, হাসপাতালের বিবর্ণ ছাদটার দিকে তাকিয়ে নিস্তেজ গলায় বিড়বিড় করে, “বাদল... তুমি কোথায়?”
·
·
·
চলবে……………………………………………………