রাত নেমেছে। যে গর্জন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার, সেখানে পদত্যাগ যেন সময়ের দাবি। রাত দুটোর দিকে একটি দলকে ভেতরে ডাকা হলো। এই আন্দোলনের মূখ্য আহ্বায়ক ছিল শামস রেজা। নেতৃত্বে থাকা কজন শিক্ষার্থী নিয়ে ভেতরে ঢুকল। শ্রেষ্ঠা ভিসির লজে ঢুকতে ঢুকতে একবার পিছু তাকাল। নাযীফের দিকে চোখ ইশারা করল। নাযীফ ধীরে মাথা নাড়াল। শাওলিন বুঝল ভেতরে যদি কিছু হয়, ফ্রন্টে দাঁড়াবে সোহানা। রক্তশীতল অনুভূতি হলো শাওলিনের। পাশ থেকে কেউ একজন বলল,
- যদি ব্ল্যাকমেইল করে, ডাইরেক্ট ভেতরে ঢুকব!
আরেকজন চাপা গর্জন করে বলল,
- একটা সাইরেন! যুদ্ধ ঘোষণা করতে দেরি হবে না। তারপর যা হবে, ডু অর ডাই।
শাওলিন কথাগুলো শুনল। এই ক্যাম্পাসে আসার পর সক্রিয় আন্দোলনে এই প্রথম যোগ দিল। হঠাৎ বাম বাহুতে টোকা পেল। চমকে পাশে তাকাল শাওলিন। যুদ্ধের কথা বলা মেয়েটা এক বোতল ঠাণ্ডা পানি এগিয়ে বলল,
- গলা শুকায়ছে না?
শাওলিন পানিটা নিয়ে হাসল। মেয়েটাও মুচকি হাসি দিয়ে মেয়েদের ভেতর ঠাণ্ডা পানি বন্টন করতে লাগল। শাওলিন খেয়াল করল টোটব্যাগে ফোন বাজছে। বোতলটা হাতে নিয়ে কিছুটা দূরে গেল শাওলিন। ফোনটা বের করতেই দেখল রেবেকার কল। দুপুর আড়াই থেকে একের পর এক কল দিয়ে চলেছে। শাওলিন কানে ফোন চেপে বলল,
- হ্যালো, মণি।
কথাটা মাটিতেও পড়তে পারেনি। ককর্শ কণ্ঠে রেবেকা গর্জে উঠল,
- সাহস দেখে কিছু বলার ভাষা পাচ্ছি না।
শাওলিন ওড়নায় হাত মুঠো করে বলল,
- আপনি ভুল আশঙ্কা করছেন। এটা রাজনীতির জন্য না, একটা অন্যায়ের প্রতিবাদ মণি।
- চুপ করো! আমাকে শেখাতে এসো না। তোমার যে বয়স সে বয়স আমিও পেরিয়েছি। নিজেকে বিরাট কিছু ভাবাতে চাও?
শাওলিন অবাক কণ্ঠে বলল,
- আমি বিরাট কিছু ভাবব কেন? আমার ক্যাম্পাসে একটা অন্যায় হচ্ছে, আমি প্রতিবাদ করব না?
- আর মানুষ নেই? ক্যাম্পাসে কী তুমি একা? যাদের এইসব অন্যায় লাগে, তাদের মিছিল। তুমি এসবে নাম ঢুকিয়ে টার্গেট হচ্ছ কেন? বাসায় ফিরো!
শাওলিন কথা বলল না। চোখের সামনে দুটো দৃশ্য দেখতে পেল। মাঠের একদিকে ছেলেরা এশার সালাতে দাঁড়িয়েছে। ইমামতি করছে স্নাতক চতুর্থ বর্ষের এক যুবক। আল্লাহু আকবর ভেসে এল। মাঠের অন্যদিকে বাকিরা নিজেদের মতো প্রতিবাদ চালাচ্ছে। কেউ মাঠ ছাড়বে না। শাওলিন শান্তভাবে ঢোক গিলে কান বদলাল। ফোন অন্যহাতে ধরে বলল,
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল। আর আপনি ঢাবির প্রাক্তন ছাত্রী। রাখি মণি।
কল কেটে দিল শাওলিন। পূর্বের জায়গায় ফিরে এসে বসল। অন্যদিকে রেবেকা ঠোঁটদুটো ফাঁক করে ফেলেছে। ধপ করে সোফায় বসে পড়ল সে। ঢোক গিলে ভাবছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি ইতিহাস হয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসের কারিগর। সক্রিয় আন্দোলন রক্তে ঢুকে গেলে মৃত্যুভয় থাকে না।
—————
ধানমণ্ডি, রাত আড়াইটা। অভিজাত এলাকাটা নির্জন থমথমে। দুটো নেড়ি কুকুর ঘেউউ স্বরে ডাকছে। মর্তুজা মেনশনের দোতলা থেকে উঁকি দিয়ে দেখল তাশফিয়া। পড়ার টেবিলে বসে কলেজের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন সময় বাড়ির নিচতলায় বিকট শব্দ হলো। চমকে চেয়ার থেকে ঘুরে তাকাল তাশফিয়া। বুকে তিনবার থুথু দিয়ে ভয় দূর করল। নিচতলা থেকে কান ফাটানো স্বরে টেলিফোন বাজছে। তাশফিয়া জানে এটা ওর বাবা আনোয়ার মর্তুজার স্টাডিরুম থেকে আসছে। দ্রুত নিচে নামতেই ঘুম চোখে আনোয়ারকে হেঁটে যেতে দেখল তাশফিয়া। আনোয়ার মর্তুজা ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেলেন। তাশফিয়া একবার ভাবল নিচে নামবে, কিন্তু পরমুহুর্তে মাঝ সিঁড়ি থেকে উপরে যেতে উদ্যত হলো। সবে এক পা উঠিয়েছে, এমন সময় ভয়ানক চিৎকার ভেসে এল। তাশফিয়া ভয়ে নিচে তাকাতেই বুঝল কণ্ঠটা বাবার! ধপ ধপ করে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গেল তাশফিয়া। আনোয়ার মর্তুজা মেঝেতে বসে আছেন। টেলিফোন তার থেকে নিচে ঝুলছে। তাশফিয়ার মনে কু ডাক দিল। দৌড়ে বাবার পাশে বসে শুধাতে লাগল,
- বাবা, কী হয়েছে? বাবা, বলো না!
আনোয়ার যেন মূর্তি বনে গেছেন। পিঠ সোফায় হেলান দিয়ে আছে। তাশফিয়া টেলিফোনের দিকে তাকিয়ে ওটা আগের জায়গায় রাখল। নিরুপায় হয়ে এক দৌড়ে মা, চাচি সবাইকে ডেকে জড়ো করল। আনোয়ার মর্তুজার চিৎকারে সবারই ঘুম ভেঙে গেছিল। স্টাডিরুমে পৌঁছে সবাই জানতে পারল তাহমিদ আর নেই। ঢাকার একটি হোটেলে আত্মহত্যা করেছে। মৃতদেহের পাশে একটি সুইসাইড নোট মিলেছে। সেখানে লেখা,
' আমি আর নিতে পারছি না। সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। তোমরা ভালো থেকো। '
—————
ভোর সাড়ে চারটায় অ্যালার্ম বেজে উঠল। শব্দটা বন্ধ করল শোয়েব। রাতটা নির্ঘুম কাটল। তার পূর্ণ মনোযোগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল। খবর পাচ্ছিল ভিসি পদত্যাগ করেনি। তবে শিক্ষার্থীদের সমস্ত দাবি মেনে নিয়েছে। অনৈতিক অর্থ বাজেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাণ্ডে যুক্ত হবে। ঠিক এমন সময় একটা অদ্ভুত কল এল। ইউএস থেকে কল আসার আগে ইঙ্গিত পায়, কিন্তু এই কল কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। ড্রেসিংটেবিলের কাছ থেকে ফোনটা তুলল শোয়েব। নাম্বারটা দেখে ফোন কানে ধরল। এক মিনিট কোনো কথা বলল না। তারপর ওপাশ থেকেই গম্ভীর স্বরে কেউ বলল,
- এতো রাতে কল দেয়ার ইচ্ছে ছিল না।
শোয়েব শান্ত ভাবে বলল,
- সমস্যা নেই।
- তাহমিদ আত্মহত্যা করেছে। ব্যাপারটা খুব ডিস্টার্বিং।
- ডিস্টার্বিং হওয়া স্বাভাবিক। কারণ সে আত্মহত্যা করবে না।
- আলামত এটাই বলছে সে আত্মহত্যা করেছে।
- মিথ্যা আলামত সাজানো খুব কঠিন কিছু না।
- আপনি এই ঘটনাকে মার্ডার বলছেন?
- সন্দেহ নেই।
- ডিজিএফআই কিছু আঁচ করেছে। তাদের লিষ্ট থেকে কিছু লোক নিরাপদে কাভার পাচ্ছে। এটা কাকতালীয় হতে পারে না।
- আমাকে কী করতে হবে?
- প্রাণ ঝুঁকিতে ফেলবেন না। একবার সন্ধান পেলে নাম নিশানা ঘুচিয়ে ফেলবে।
শোয়েব নিরুত্তর থাকল। কিছুক্ষণ ভাবনা সেরে বলল,
- পাঁচ মিনিট শেষ হচ্ছে। কল কেটে দাও তাশরিফ। নিজের প্রাণ ঝুঁকিতে ফেলো না।
- শেষ কথা। কাল এবং পরশু সাবধানে থাকবেন। যেকোনো সময় কিছু ঘটে যেতে পারে।
বিশেষ ফোনটি কেটে দিল তাশরিফ। শোয়েব ব্যবহৃত ফোনটি ক্লোজেটের লকআপে রেখে দিল।
—————
পরদিন সকাল থেকে আকাশ কালো। ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ব্যস্ত সড়কে হাঁটুজল পানি। পানি কেটে একের পর এক গাড়ি ঢুকে যাচ্ছে ধানমণ্ডির মর্তুজা মেনশনে। শোকের মাতম পরিবেশ ভারি করেছে। কিছুক্ষণ পরপর নারী গলার আহাজারি ভেসে আসছে। ময়নাতদন্তের পর লাশবাহী সাদা অ্যাম্বুলেন্সে তাহমিদের মরদেহ চলে এসেছে। রেবেকা খবর পেয়ে সিলেট থেকে রওনা দিয়েছে। দূর দূরান্ত থেকে আত্মীয়-স্বজন আসতে একদিন লাগবে। জানাজা সম্পন্ন হবে আগামীকাল বাদ জোহরে। খবরটা পেয়ে যায় শাওলিন। হলে নিজের রুমে শুয়ে আছে। ঐশ্বর্য দুটো স্যালাইন পানিতে গুলে ওকে এক বোতল দিল,
- এটা খা। তোকে আমার স্কুটিতে করে বাসায় দিয়ে আসব নে।
শাওলিন এক লিটারের সবুজ বোতলটা নিল। স্যালাইনের পানিটা ঢকঢক করে খেয়ে ঐশ্বর্যের দিকে বলল,
- তুই বাসায় যাবি না? হল তো ছাড়তে বলল।
ঐশ্বর্য নিজের বোতলটা নিয়ে বিছানায় বসল। মাথা না সূচক নেড়ে বলল,
- অর্পার বাসায় যাব। অর্পার বাপ-মা গ্রামে গেছে। ওখানে দেদারসে কদিন স্টে করা যাবে।
- আঙ্কেল শুনলে?
ঐশ্বর্য চোখ তুলে তাকাল। কঠোর চোখে তাকাতে গিয়ে নরম হয়ে গেল। মেঝেতে চোখ রেখে বলল,
- শুনলে আরকি? হাতখরচের টাকা বন্ধ করে দিবে। দিক গা। ওই বালের টাকা আমি চু*!
গালিটা শুনে শাওলিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
- গালিটা যাকে দিলি সে শুনল?
ঐশ্বর্য ব্যথিত চোখ তুলে তাকাল। রাগে কণ্ঠস্বর কাঁপতে কাঁপতে বলল,
- ওই লোক বাপ নামের কলঙ্ক! আমার চোখের সামনে আম্মুকে কুত্তার মতো মারতো। আম্মুকে গালাগাল দিতো। তার দোষ কী ছিল? আম্মু শুধু বলতো, যার তার সাথে শুইতে না। মদ খাইতে না। ওই শূয়ো*টা তারপরও শুইতো। মদ খাইতো!
শাওলিন বালিশে মাথা রেখে অন্যদিকে মুখ ঘুরাল। ঐশ্বর্য ভালো নেই। ছোটো থেকে বাবা-মায়ের বিরূপ দাম্পত্য ওর ছোট্ট মনে দাগ কেটেছে। ঐশ্বর্য ওর বাবাকে ঘৃণা করে। চরম ঘৃণা। ওর বাবার জন্যই মা ওকে ছেড়ে অন্য সংসারে চলে গেছে। সেখানে ঐশ্বর্যের জায়গা নেই। শাওলিন বহুক্ষণ পর বামের বেডে তাকাল। ঐশ্বর্য এখনো মাথা নিচু করে বসে আছে। মৃদু স্বরে ডাকল,
- ঐশ্বর্য,
ঐশ্বর্য ধীরে মাথা উঠাল। শাওলিন স্থির গলায় বলল,
- তুই টিউশন শুরু কর। অর্পার ছোটো ভাইকে তুই পড়াতে পারিস। হাতখরচের টাকা নিজে উপার্জন করলে তোকে কারো কাছে হাত পাততে হবে না।
ঐশ্বর্য থম ধরে বসে রইল। চোখদুটো অশ্রুতে টলমল করছে। শাওলিন তর্জনী তুলে ঐশ্বর্যের বেডে একটা প্যাকেটে দেখিয়ে বলল,
- সিগারেট ছেড়ে দে। যে সার্কেলটাকে বন্ধু মানিস ওরা সুখের মাছি। এরা সুখ ফুরালেই হারিয়ে যাবে।
ঐশ্বর্য একপলক সিগারেটের প্যাকেট দেখল। তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলল,
- কিন্তু সিগারেট না খেলে খুব যন্ত্রণা হয়, জানা।
- ওটা নেশা। নেশা কাটানোর ঔষুধ শুধুমাত্র জেদ। এই জেদ তোর ভেতর আছে। তোর বাবাকে দেখিয়ে দে, জেদের নেশাটা কেমন। হার মানিস না ঐশ্বর্য। পারবি।
ঐশ্বর্যের দুচোখ ঝরঝর করে অশ্রু ঝরাল। কিন্তু নিঃশব্দে চুপ করে রইল। শাওলিনের দিকে হাসি দিল। শাওলিন কিছু বলল না।
—————
ইনকোর্স, আন্দোলন, হল দখলের অস্থিরতায় চোখের পলকে দিনগুলো কেটে গেল। নিত্য এই ঘটনায় শাওলিন অপ্রকাশ্য এক মানসিক চাপে আক্রান্ত হলো। মাঝে তাহমিদের আত্মহত্যার খবর এবং সেখানে গিয়ে রেবেকার কটুক্তি আচরণ ওকে রেহাই দিল না। শ্রেষ্ঠা ছাত্ররাজনীতিতে সেদিনের পর আরো বেশি ব্যস্ত হয়ে গেছে। নাযীফ আজও স্বীকার করেনি তার ক্যামেরায় কী ছিল। রোজা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। প্লাটলেটস নেমে হাসপাতালে ভর্তি। শেষ ইনকোর্স পরীক্ষাটা কাল। শাওলিন পরীক্ষার পর হল ছেড়ে কলাবাগানের ফ্ল্যাটে ফিরবে। রাতে কিছুতেই ঘুম আসছিল না। রুমে ঐশ্বর্য মৃদু ভলিউমে গান বাজাচ্ছে। গানটাও করুণ সুরের। ঐশ্বর্য গুনগুন সুর তুলে বলল,
- জানা, একটা কথা বলতে চাই। তুই মানবি?
শাওলিন মুখের ওপর দুহাতে গল্পের বই ধরেছিল। বই সরিয়ে বলল,
- কী?
- ভাইয়ার ছবি তো দেখালি না?
শাওলিন বিয়ের তথ্য ঐশ্বর্যকে দিয়েছে। রুমমেট হবার দরুন ঐশ্বর্য কিছু ঘটনা বুঝতে পারতো। শ্রেষ্ঠা বা সোহানা সৎ থাকলেও রোজা গল্পের আসরে গোপনীয়তা রক্ষা করতো না। শাওলিন ফোন হাতে নিল। অনেক খুঁজেও স্বামী মানুষটার কোনো ছবি পেল না। কী লজ্জার কথা! বিয়ের একটা ছবিও ফোনে নেই। লজ্জায় মাথা কুটে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে চেক করল। হঠাৎ একটা ছবি কীভাবে যেন পেয়ে গেল। ছবিটা দেখেই গা কাঁটা দিতে লাগল। দুপাটি দাঁত শক্ত করল শাওলিন। নীল চোখদুটো! দ্রুত ফোনটা ঐশ্বর্যকে দিয়ে বলল,
- ছবি।
ঐশ্বর্য কপাল কুঁচকে শাওলিনকে দেখল। ছবিটা দেখেই কেমন জানি অস্থির হয়ে গেছে। ঐশ্বর্য ফোন হাতে নিয়ে গান বদলাল। শাওলিন দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে আছে। মুখের ওপর বই ধরে থাকলেও কানে নতুন গানটা শুনছে। শাওলিন মৃদু গলায় বলল,
- কেজিএফ ছবির এই গানটা আমার মুখস্ত। তোর এটা পছন্দ নাকি?
ঐশ্বর্য বিছানায় বসতে বসতে বলল,
- মেহবুবা গানটা শুনলেই ভালো লাগে। মনেহয় কল্পনার জগতে ভেসে যাচ্ছি।
শাওলিন মুচকি হাসলো। তবে কানে ঐশ্বর্যের হর্ষধ্বনি শুনতে দেরি হল না। অদ্ভুত আশ্চর্যে বলল,
- তোর স্বামীর চোখ এতো সুন্দর! কার জেনেটিক বৈশিষ্ট্য পেয়েছে?
শাওলিন কথাটা শুনে কেঁপে উঠল। মনে হলো প্রশংসাটা অন্য কাউকে করল না, ওকেই করল যেন। শোয়েবের কণ্ঠ, চাহনি, রাগ, অভিমান, ভালোবাসা সমস্ত কিছু ভেসে উঠল মনের পর্দায়। বিছানায় বসে শাওলিনকে শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরা। ঘামে ভেজা মাথায় শাওলিনের আঙুল ডুবিয়ে আদর। শাওলিন হাতের আঙুলগুলো দেখল। কতদিন তাকে স্পর্শ করেনি? কত সময়? ঐশ্বর্যের গলা আবার শুনতে পেল,
- সুপুরুষ ব্যক্তি। আমি সবুজ চোখ দেখেছি। কিন্তু নীল চোখ প্রথম দেখলাম।
শাওলিন পাশ ফিরে ঐশ্বর্যের দিকে তাকাল। হঠাৎই প্রশ্নটা করে বসল,
- নীল চোখ বাংলাদেশী কারো হয়?
ঐশ্বর্য ফোন থেকে চোখ তুলে বলল,
- হতে পারে, যদি পূর্বপুরুষদের কারো এই জেনেটিক সিম্পটম থাকে।
শাওলিন অন্যমনষ্ক হলো। ঐশ্বর্য ওর বিছানা থেকে শাওলিনের বিছানায় বসে বলল,
- একটা কথা বলি? জাস্ট আমার অবজারভেশন। আর কিচ্ছু না।
শাওলিন ভ্রম ভেঙে তাকাল। ঐশ্বর্য ছবিটার ভেতর চুলের কাট দেখিয়ে বলল,
- চুলের এই স্টাইলটাকে বলে ক্রু কাট। কানের আর ঘাড়ের দিকটা একদম ছাঁটা থাকে।
ঐশ্বর্যের কথায় শাওলিনের কপাল কুঁচকাতে থাকল। ঐশ্বর্য একটু থেমে আবার বলল,
- পরনে স্কাই ব্লু শার্ট। একটা ভাঁজ পর্যন্ত নেই। পায়ের জুতা ফুল পলিশড। মনে হচ্ছে একদম নতুন জুতা। এটা ডিসিপ্লিনের ইঙ্গিত।
শাওলিন ভ্রুঁ কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করছিল। ছবিটা তুলেছিল নাযীফ। জিদানের ক্যামেরা থেকে হঠাৎ ছবিটা ক্লিক করেছিল। কালচে সবুজ জীপের পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে শোয়েব। আকাশি নীল শার্ট। কালো প্যান্ট। চুলের কাটটা ভালোমতো দেখল শাওলিন। ঐশ্বর্য আঙুল দিয়ে ডানহাতে কিছু কড়া পরা দাগ দেখিয়ে বলল,
- ডানহাতের এই দাগগুলো আমার নির্লজ্জ বাপের হাতেও আছে।
শাওলিন চমকে বলে উঠল,
- এই দাগগুলো কীসের কারণে হয়?
ঐশ্বর্য সামান্য থামল। শাওলিনের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল,
- আমার বাবার হাতেও ঠিক এমন দাগ ছিল। পরে জানতে পারছিলাম, সারাক্ষণ অস্ত্র ব্যবহার করলে অনেকের এমন হয়।
শাওলিন জানে, বনবিভাগ থেকে বন্দুকের সাইলেন্স আছে। এটা খাগড়াছড়ি থাকতে দাদীর মুখে শুনেছিল। কিন্তু বন্দুক নিয়ে কখনো বেরুতে দেখতো না। এটা আশ্চর্য! ঐশ্বর্য শাওলিনের হাত ঝাকুনি দিয়ে বলল,
- কী রে! কী ভাবছিস?
শাওলিন চঞ্চল চোখে তাকাল। মনে দ্বিধার ঝড় নিয়ে বলল,
- যারা বন্দুক চালায়, তাদের হাতে এরকম দাগ পড়ে না? উনি ফরেস্ট অফিসার। বন বিভাগে কর্মরত।
ঐশ্বর্য কোনো কথা বলল না। কী যেন বলতে গিয়ে আঁটকে গেল। ছবিটায় আবার তাকিয়ে অদ্ভুত গলায় বলল,
- জানি না। হতে পারে। আবার নাও হতে পারে।
শাওলিন চুপ করে রইল। ঐশ্বর্য আর কোনো কথা বলল না। নিজের বেডে ফিরে গান বদলাল। শাওলিন মনে মনে আকাশ-পাতাল ভেবে চলল। আমেরিকায় বেড়ে ওঠা... খ্রিস্টানদের সঙ্গে চলা... পরিবারের সঙ্গে মিল নেই... পার্বত্যাঞ্চলে চাকরি... হাতে বিশেষ অস্ত্রের দাগ এতসব কিছু কাকতলীয় হতে পারে না। মনের গহীন থেকে শাওলিন প্রশ্ন করল, আপনি কে, ফারশাদ? আপনার অতীতের অংশ কোথায়? কেন সে অংশ সবাই ঢাকছে?
রাত গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। আকাশে টিমটিম করে ফুটছে নক্ষত্র। নির্জন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠাণ্ডা হাওয়ার উচ্ছলতা। ঐশ্বর্য ফোন স্ক্রল করছে। বিছানায় টেবিলল্যাম্প জ্বেলে, উপুড় হয়ে শুয়ে, শাওলিন টপিক সামারি লিখছে। এমন সময় রোকেয়ার নাম্বার থেকে অদ্ভুত কল এল। শাওলিন ভ্রুঁ কুঁচকে দেখল রাত তিনটারও বেশি বাজে। ওই বাড়িতে কিছু হলো নাকি? ভয়ে বুকটা সংকুচিত হয়ে গেল। শাওলিন ঝটপট কলটা ধরে কানে ঠেকাল। কিন্তু সহসা থমকে গেল। স্তব্ধ হতে হতে শোয়া থেকে উঠে বসছিল শাওলিন। রোকেয়া ওপাশ থেকে কল করে যা শোনাচ্ছে, তাতে গায়ের পশম কাঁটার মতো ফুটল।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড শুধু নিস্তব্ধতা। তারপর ধীরে ধীরে একেকটা নোট ভেসে এল। কেউ খুব যত্ন করে পরিচিত একটা সুর ছুঁয়ে যাচ্ছে। টাচ লেগে লাউড স্পিকার চালু হতেই সারা রুমে সুরটা ছড়িয়ে গেল। ঐশ্বর্য ধড়াস করে উঠে বসে বলল,
- পিয়ানো বাজাচ্ছে কে?
শাওলিন মূর্তিবৎ চোখে স্থির। কোনো কথা বলল না। ঐশ্বর্যের দিকে চেয়ে ফোনের দিকে ফিরে তাকাল। বুকের ভেতর এমন ধুকপুক হচ্ছে, যেন পাঁজর ভেঙে বাইরে ছিঁটকে যাবে। ঠোঁট কাঁপছে। ঐশ্বর্য চরম বিস্ময়ে মুগ্ধচোখে বলল,
- ঈশ্বর! এটা... এটা তো মেহবুবার সুর!
শাওলিনের ঠোঁট নড়ল না। শুধু ফোনটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল।
শাওলিন আরেকটু হলে জোরে শব্দ করে ফেলত। কিন্তু ওপাশ থেকে তখনই ফিসফিসিয়ে বলল,
- ভাবীজান, আমি, রাবেয়া। ভাইজান পিয়ানো বাজায়। শুনতাছেন? শুনতাছেন আপনে?
শাওলিন কলটা কানে ধরে নিচুস্বরে বলল,
- মাঝরাতে পিয়ানো বাজাচ্ছে? কেন?
- আপনে জানেন না?
- আমি তো এটাই জানি না বাড়িতে পিয়ানো আছে।
- কন কী! এইবার খাগড়াছড়িত আইয়েন। আমি দেখাবানি। অনেক বড়ো পিয়ানো!
শাওলিন থমকে গেল। আমেরিকায় বেড়ে ওঠা মানুষটা এই নির্জন রাতে পিয়ানো বাজাচ্ছে, এটাও কী অতীতের আরেক টুকরো, যা শাওলিন জানে না? ঐশ্বর্য কণ্ঠ খাদে রেখে বলল,
- অনেক সুন্দর বাজাচ্ছে! আমার হাতে কাঁটা দিচ্ছে দ্যাখ।
শাওলিন প্রত্যুত্তর করল না। পিয়ানোর ছন্দময় সুর হালকা হয়ে কমে যাচ্ছে। বুকে ঢিপঢিপে স্পন্দন নিয়ে শাওলিন বলল,
- দুটো বকা দিতে পারলি না? এতো রাতে জেগে আছে!
রাবেয়া ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল,
- ও মা গো! আমি পারুম না ভাবী। আপনে কবে আইবেন?
- কাল পরীক্ষা শেষ। ছুটি বুঝে আসব।
- শুক্কুর শনি বন্ধ দেয় না? আইয়া পড়েন হেসুম। ভাইজান আপনেরে পাইলে যে কী খুশি হইব!
- উনি হাসে কোথায় যে খুশি হয় বুঝিস?
- পুরুষ মাইষ্যের হাসন লাগে নাকি? দেখলেই বুজন যায়।
শাওলিন চোখ কোলে ফেলল। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। শান্ত গলায় বলল,
- রাবেয়া, এখন রাখি। ঘুমোতে হবে। রাকেয়া জাগার আগেই ফোনটা রেখে দে।
- আইচ্ছা, ভাবী। ভালো থাকেন। আর তাড়াতাড়ি আইয়া পইড়েন। দেরি কইরেন না।
শাওলিন কল কেটে তাকাল। ঐশ্বর্য জুলজুল চোখে তাকিয়ে দেখছে। শাওলিনের দিকে অদ্ভুত মোহগ্রস্ত সুরে বলল,
- ঝগড়া হয়েছে? আজও কল করতে দেখিনি। কিন্তু মাঝরাতে পিয়ানো বাজাচ্ছে। তাও তোর পছন্দের গানে সুর তুলে!
শাওলিন ভ্রুঁ কুঁচকে অকারণ বিরক্তির সুরে বলল,
- কালকের টপিক নিশ্চয় এগুলো থেকে আসবে না? শুয়ে পড় তো।
ঐশ্বর্য থতমত খেলে শাওলিন অন্যপাশ ফিরে শুলো। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তি, সুখমাখা আলোড়ন ছড়িয়ে যাচ্ছে। কাঁথাটা মুঠো করে চোখ বন্ধ করল শাওলিন। হঠাৎ মনে পড়ল ডায়েরির হলুদ পাতায় লিখেছিল,
আজ বহুদিন পর একটা গান পছন্দ হলো। মেহবুবা ম্যায় তেরি মেহবুবা। কিন্তু আমি কার হৃদয়ের মেহবুবা? গানটা সুন্দর।
—————
রাবেয়া কল কাটতেই মেঝেতে ছায়া দেখল। দীর্ঘদেহী অবয়ব। চিনতে পেরে পিঠের শিরদাঁড়া কেঁপে উঠল। রাবেয়া ঢোক গিলতে গিলতে মাথা তুলে তাকাতেই অবশ সুরে বলল,
- ভভভাইজান,
শোয়েব পিয়ানো ছেড়ে কখন উঠেছে খেয়াল করেনি। ঘরের ভেতর হলুদাভ আলো দীর্ঘ দেহটার গা ঠিকরে রাবেয়ার মুখে পড়েছে। রাবেয়ার দিকে লম্বা বলিষ্ঠ হাত বাড়াল শোয়েব। রাবেয়া কাঁপতে কাঁপতে হাতের বাটন ফোনটা পৌরুষ থাবায় তুলে দিল। শোয়েব ফোনের শেষ কলটা দেখলে রাবেয়া থতমত সুরে বলল,
- ভাবীরে কল দিছি, ভাইজান। ভাবী আপনের কণ্ঠ শুনতে চায়।
পাক্কা মিথ্যাটা ঝেড়ে দিয়ে রাবেয়া মাথা নিচু করল। এক্ষুণি রামধমকটা খায় কিনা ভয় হচ্ছে। শোয়েব এ কথায় ভ্রুঁটা কুঁচকেই রইল। ভারি গলায় শুধাল,
- মিথ্যা বলছিস?
রাবেয়া ঝড়ের গতিতে মাথা দুপাশ হেলিয়ে বলল,
- না না, ভাইজান। মিথ্যা কমু ক্যান? ভাবী আপনের সাথে কথা বলতে চায়। আপনের চিন্তায় রাইতে ঘুমাতে পারে না।
শোয়েব ফোনটার কোণে ছোট্ট নামটা দেখল। বৃদ্ধাঙুল ছুঁয়ে যেন নাম নয়, কল্পনায় নরম ঠোঁটদুটো ছুঁয়ে দিল। অন্য মনটা রাবেয়ার দিকে বলল,
- তুই এদিকে কী করছিস? রাতে এখানে কী?
রাবেয়া বগল তলে একটা খাতা এনেছিল। খাতাটা শোয়েবের দিকে বাড়িয়ে বলল,
- এইটা দেখাইতে আনছিলাম। খাতাডা একটু দেখেন ভাইজান। রোকেয়াবু এই খাতায় কী জানি লেইখা থোয়।
শোয়েব চোখ সরিয়ে খাতাটা দেখল। সেলাই করা সাদা খাতা। ভেতরে খুলে খুলে দেখতেই হঠাৎ এক জায়গায় চোখ আঁটকাল। চশমা ঢাকা চোখ তীক্ষ্ম হলো। তর্জনীতে ইঙ্গিত করে বলল,
- ফাইরুজ... এই নামটা। চিনিস?
- না ভাইজান। কিন্তু একটা কথা আছে। বুবু যেই পাঠশালায় পড়তে যাইতো সেইখানে এর সাথে কথা হইছে।
- কী কথা?
- সেইটা তো বলতে পারুম না। বুবু কইছিল খাতাডা একসময় আপনেরে দেখাইব। কিন্তু ভাইজান, বুবু কিছু জানে। আজকা যখন পাঠশালা থিকা আসতাছিল কিছু ব্যাডা বুবুর পিছু নিছিল। আল্লার রক্ষা মতিন ভাই নিতে আইছে।
শোয়েব খুব অবাক হলো। খাতাটা রোল করে ডানহাতে নিয়ে রাবেয়াকে ঘুমোতে যেতে বলল। দ্রুত ফিরে এল কামরায়। পিয়ানোর সামনে খাতাটা রেখে দ্রুত একটা কলম দিয়ে কিছু দাগ টানল। রোকেয়া খুব ছোটো ছোটো অক্ষরে লিখেছে পাহাড়ে এই লোকগুলা কেরা? কেন মাইয়াগো ওই জায়গায় লইয়া যায়? ভালা টাকা দিতাছে। কিন্তু টাকা দিতাছে কিল্লিগ্গা? ওই মাইয়ারা কী করতাছে? কথাগুলো পরপর পড়ে শোয়েব স্থির হয়ে গেল। রোকেয়া কী কোনো বিপদের দ্বার খুলেছে? ফাইরুজকে চিনতো?
—————
খাগড়াছড়ির সকালটা অন্যরকম স্নিগ্ধ। রোদে ডোবা বজ্রমেঘ বাংলো দাপুটে আদল বোঝাচ্ছে। নিচতলার হলঘরে ফাতিমা নাজ সোফায় বসে আছেন। এমন সময় পেছনে কারোর উপস্থিতি টের পান। হাতের বইটা রেখে পিছু তাকাতেই ফাতিমা ভিড়মি খেয়ে তাকান। দেখলেন শোয়েব দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ হাসতে গিয়ে থমকালেন ফাতিমা। ভ্রুঁ দুটো সতর্কভাবে কুঁচকে বললেন,
- কী হয়েছে, ফারশাদ?
শোয়েব অফিসের পরিপাটি বেশে নিচে নেমে এসেছে। বাঁহাতে ধূসরবর্ণ স্যূট। পরনে গাঢ় মেরুন শার্ট, স্যূটের রঙে ধূসর প্যান্ট। ফাতিমা একটা বিপদ আঁচ করে শুধালেন,
- সমস্যাটা কী?
পুরুষালী চোয়াল এভাবে যে কঠোর হতে পারে, দৃশ্যটা না দেখলে বিশ্বাস করতেন না তিনি। ভয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন ফাতিমা। হাত থেকে বইটা সোফায় ছেড়ে বললেন,
- আমি কিছু করেছি? তুমি রেগে আছ দাদু!
নীল চোখের পলক পড়ল না। স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে শোয়েব হিমকণ্ঠে বলল,
- বুকশেলফ থেকে ডায়েরি নিয়েছ?
ফাতিমা চোখজোড়া বিস্ফোরিত করলেন। পরক্ষণেই শান্ত, স্বাভাবিক হয়ে বললেন,
- ওই ডায়েরি তোমার না।
- ওটা আমার।
- কীভাবে এটা বলো? ওটা শাওলিনের না!
- শাওলিন আমার বউ। ওর সবকিছুতে আমার অধিকার। ডেষ্কের ড্রয়ার খুলে ছবিগুলো নিয়েছ কেন?
ফাতিমা থতমত খেয়ে বললেন,
- কোন ছবি? আমি কোনো ছবি দেখিনি। আমি শুধু ডায়েরিটা পেয়েছি। ওটা ওর লাগেজে ঢুকিয়ে দিয়েছি।
শোয়েবের মুখ টকটকে লাল। চোখজোড়া এমনভাবে এঁটে দিয়েছে যেন ওই চোখ দিয়েই খুন করবে। ফাতিমা সাহসী সুরে বললেন,
- তুমি জেদ করছ ফারশাদ। এই জেদ ভালো হবে না। সময় আছে সবকিছু জানিয়ে দাও। শাওলিন বিচক্ষণ। আমার বিশ্বাস, সময় নিবে, কিন্তু বুঝবে ও।
- পরামর্শ চাই না। শুধু স্পষ্ট করতে চাই, এই চাপ্টার থেকে দূরে থাকো। তোমাকে এই পর্যন্ত জায়গা দিয়েছি, নিজের ক্ষতি ডেকো না।
স্যূটটাকে হাত বদল করল শোয়েব। সকালের হিমস্নিগ্ধ বাতাসে কপালে ছোটো চুলের লুকোচুরি। ডানহাতে ব্যাকব্রাশ করে শোয়েব হাঁটা দিল। বাইরে এক পা পড়বে হঠাৎ দাদীর গলা ভেসে এল,
- সবার মুখ বন্ধ করতে পারবে না। কেউ না কেউ ঝাপসা তথ্য দেবেই। শাওলিন এখনো জানে না, আর রেবেকা কিছুই জানায়নি। তুমি অন্ধকারে রেখে মেয়েটাকে কষ্ট দিবে না।
শোয়েব গতিরোধ করে মাথা পিছু করল। সোনালি রোদ তার কাটাকাটা চোয়াল ঘেঁষে দাদীর চোখে পড়ল। শোয়েব কিছুক্ষণ হিম দৃষ্টিতে তাকিয়ে অদ্ভুত শান্ত গলায় বলল,
- যদি কেউ সীমানা ভুলতে চায়, ফারশাদকে যেন স্মরণ করে। তোমার মেয়ে তাহমিনা আমাকে অন্ধকারে রেখেছিল। তাহমিনার ছেলে তাহমিদের কী হয়েছে তোমার অজানা নেই।
- সবাই নিজের স্বার্থটা দেখে। তুমিও স্বার্থটাই দেখছ। তাহমিনাকে দোষী বলে নিজের দোষ ঢাকছ? তোমার উচিত না ওকে সব বলা?
- যে স্রষ্টা মানো, তার কসম। না বলার জন্য যা করতে হয় সব করে ছাড়ব। কোনো মির্জাকে যদি দেখি এই কাজ করেছে, জীবনের মেয়াদ বেশিদিন টিকবে না।
অদ্ভুত স্বরে বলে শোয়েব মাথা ফেরাল। বুটের গটগট শব্দ ছেড়ে বাইরে মিলিয়ে গেল। ফাতিমা হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, হিংস্র পশুর মতো ছোটো নাতী কথাগুলো বলল। যে হিংস্রতা সাড়ে চার বছর ধরে চাপা পরেছিল, সেটা আজ মুখোশ খুলে বেরুল।
—————
একইদিন ঢাকায় শাওলিনের ইনকোর্স পরীক্ষা শেষ হলো। রেবেকা ধানমণ্ডির মর্তুজা মেনশনে যেতে বলেছে। চারদিনের মিলাদ বাবদ অনুষ্ঠান আজ। বিভিন্ন মানুষ ভীড় করবে। বিয়ের দিন যে অপমানের শিকার হয়েছিল শাওলিন পণ করেছিল আর কখনো মর্তুজা বাড়িতে যাবে না। কিন্তু সকাল থেকে রেবেকাল কল,
- পরীক্ষা শেষ কয়টায়? তুমি এখানে আসছ কখন?
শাওলিন বিরক্ত চেপে বলল,
- এগারোটায় শেষ হবে। হল থেকে ব্যাগ গুছিয়ে বের হব।
- তাড়াতাড়ি করো। তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
কল কাটার পর শাওলিন হল থেকে ছোটো কাপড়ের ব্যাগটা নিয়ে বাস ধরল। ক্যাম্পাসের বাসের অপেক্ষায় থাকলে দেরি হবে। ধানমন্ডি পৌঁছে যখন মর্তুজা মেনশনের ভেতরে ঢুকল, শাওলিন দেখল প্রচুর মানুষ। সাংবাদিকদের একটা দল একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। শাওলিন চারিদিক দেখতে দেখতে তিনতলা ভবনের ভেতরে ঢুকে গেল। একজন ওকে দেখে বলল,
- এই মেয়েটা কে?
অন্যজন চোখের কোণ দিয়ে দেখে বলল,
- তাহমিদের পাত্রী! বিয়েটা মামাতো ভাইয়ের সাথে হয়েছে।
শাওলিন কথাটা শুনেও না শোনার মতো পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি ধরল। নিচতলায় অতিথিদের সমাগম। দোতলায় আরো মানুষ দেখে তিনতলায় উঠে গেল। রেবেকার ঘরে গিয়ে দেখল সেখানেও তিল ধারণের জায়গা নেই। মহিলারা বাচ্চা নিয়ে বাজার গরম করে রেখেছে। শাওলিন একজনকে জিজ্ঞেস করল,
- রেবেকা মণিকে দেখেছেন?
বাচ্চাকে কোলে দোল দিতে দিতে একজন শাওলিনকে দেখে বলল,
- তুমি শোয়েবের বউ?
অপ্রত্যাশিত প্রশ্নটা শুনে শাওলিন বিব্রত হলো। খেয়াল করল যে ঘরটা গমগম করছিল এখন নিশ্চুপ হয়ে গেছে। শাওলিন মাথা নাড়িয়ে বলল,
- জ্বি। রেবেকা মণি কোথায় বলতে পারবেন?
- রেবা মোর্শেদ খালার সাথে রান্নাঘরে। থাকলে ওখানেই আছে।
- আচ্ছা। ধন্যবাদ।
শাওলিন পা ঘুরিয়ে যেতেই শ্রবণপথে এল,
- রাশি খারাপ। রেবেকা কষ্টে বিয়ে ঠিক করছিল। কপাল দেখো, তাহমিদকে শেষ করছে।
শাওলিন দমবন্ধ করে কথাগুলো না শোনার চেষ্টা করল। রান্নাঘরেও ভীড়। কয়েক মুহুর্ত দাঁড়াতেই রেবেকা ওকে দেখে বাইরে বেরিয়ে এল। ছোটো ন্যাপকিনে হাত মুছতে মুছতে বলল,
- খাবার দিচ্ছি। হাতমুখ ধুয়ে খেয়ে নাও।
শাওলিন এমন অস্বাভাবিকতা দেখে খুব আশ্চর্য হলো। রেবেকার দিকে অবাক স্বরে বলল,
- আপনি আমাকে বিরিয়ানী কোরমা খেতে ডেকেছেন?
হাত থমকাল রেবেকার। চারপাশে কয়েকজনকে তাকাতে দেখে দ্রুত শাওলিনের ডান কবজি ধরে হনহন করে বাইরে নিয়ে গেল। করিডোরে দাঁড়িয়ে কপাল কুঁচকে বলল,
- অসভ্যের মতো কথা বলো কেন? তুমি কী জানো না বাড়িতে কী?
- আপনি কীভাবে আশা করেন যে বাড়িতে অপমান করল, সেখানে চুপচাপ খেতে বসব?
রেবেকা কঠিন চোখে তাকাল। রাগ সামলে বলল,
- কী চাও তুমি? ফ্যাসাদটাকে শোয়েবের মতো ঝুলিয়ে রাখতে চাও? এগুলো শিখিয়ে পাঠিয়েছে?
- আপনি উনাকে টানছেন কেন?
- টানব না কেন? ছোটো ভাইকে দেখতে এল না! নরপিশাচ শয়তান!
শাওলিন বহু কষ্টে শান্ত থাকল। এক মুহুর্ত স্থির হয়ে বলল,
- আপনি আমার সামনে গাল দিচ্ছেন মণি! আপনি নিজেও জানেন এই বাড়িতে কেন আসতে চাইনি!
রেবেকা আকাশ থেকে পরার মতো অবাক হলো। কণ্ঠে বিস্ময় জড়িয়ে বলল,
- মগজ ধোলাই করা শেষ? স্বামীর দুর্নামে পিণ্ডি জ্বলছে?
- এই বাড়িতে আপনার সামনে আমাকে অপমান করল, আপনিই উনার সাথে বিয়েটা দিলেন। নিজেই মগজ ধোলাইয়ের প্রশ্ন করেন? একমুখে কতবার কথা ঘুরাবেন?
কথাটা মাটিতে পরতে পারেনি, ঠাস করে এক থাপ্পড় শাওলিনের গালে পড়ল। নরম চামড়া আগুনের মতো জ্বলে উঠল। গালে হাত দিয়ে শাওলিন নির্বাক। রেবেকা কঠিন চেহারায় ফুঁসছে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
- মুখে মুখে তর্ক করো? দুদিনের মেয়ে আমাকে শেখাও? হ্যাঁ?
শাওলিন এই রেবেকাকে চিনে না। শায়খ দাদা এই নারীকে বিয়ে করেনি। গালের ভেতর মাংস কেটে রক্তের স্বাদ পাচ্ছে। হঠাৎ চোখ পরল রেবেকার পেছনে থাকা মোর্শেদার দিকে। মোর্শেদা কিছু মহিলাদের সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছিলেন। শাওলিন এতোগুলো চোখের সামনে মরমে ছোটো হয়ে গেল। মোর্শেদা রেবেকাকে টেনে নিয়ে গেলেন। শাওলিন পা ঘুরিয়ে ছাদে ওঠার সিঁড়ি ধরল।
—————
ছাদের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল শাওলিন। চোখে ছলছল করছে অশ্রু। ডানহাতের উলটোপিঠে বারবার মুছেও লাভ হচ্ছে না। মানুষ ভাবে, যে সবকিছু সহ্য করে তার কোনো অনুভূতিই নেই। শুধুমাত্র একটা মানুষকে মায়ের মতো বিশ্বাস করতে চেয়েছিল। কারণ দাদা নেই। কেউ নেই! রেবেকাকে আর চিনতে পারছে না শাওলিন। সে কী সত্যিই ওর পাশে ছিল? যে ভালোবাসে, কিন্তু অপমানের সময় চুপ করে থাকে। একবারও বলেনি, শাওলিনের দোষ নেই, ওকে বিয়েতে আমি রাজি করিয়েছি। ঠোঁট কাঁপছে, চোখে ঝাপসা পর্দা। দমকা বাতাস বেনী থেকে ছুটে আসা চুল উড়িয়ে দিচ্ছে সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে। বাঁহাতে চোখ মুছে ডানকাঁধে ঝোলানো টোটব্যাগ থেকে ফোন বের করল। কাউকে নয়, শুধু একজনের কাছেই কলটা করল। ধরল না। বাজতে বাজতে কেটে গেল। শাওলিন ফুপিয়ে উঠল। চোখ খিঁচিয়ে অন্তঃমনে বলছিল, ধরুন ... ধরুন। দ্বিতীয়বারও কলটা কেটে গেল। চোখ ঝাপসা! স্ক্রিনের Call ended লেখাটা আর স্পষ্ট দেখল না। দাঁত দ্বারা নিচের ঠোঁট কামড়াল শাওলিন। প্রচণ্ড ব্যথা হলো, জিভে রক্তের স্বাদ পেল। বুকের ভেতর যে ব্যথা হচ্ছে সেই ব্যথা তো ইঞ্চিও কমলো না। চোখের সামনে ফোনের স্ক্রিন নিভল। কিন্তু পর মুহুর্তেই হঠাৎ চমকাল শাওলিন। টকটকে লাল চোখে ফোনটা বাজতে দেখল। দ্রুত কলটা রিসিভ করল। ওপাশে সাড়া নেই, শুধু চেনা নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে এল। শাওলিন ঠোঁট কামড়ে সামলাতে চাইল। কিন্তু পারল না। নিজের অজান্তেই ফুপিয়ে কেঁদে উঠল শাওলিন। সংযমের বাঁধ ভেঙে গেল। শুধু ভাঙা কণ্ঠে বলতে পারল,
- আমি.. আর পারছি না জানেন. .
কণ্ঠে যেন বিষম ব্যথা। শাওলিন চোখ কুঁকড়ে অশ্রুরুদ্ধ হয়ে বলল,
- আমিই কেন . . বারবার আমিই কেন?
শোয়েব কোনো কথা বলল না। বুকের ভেতর ঝড়। চোখ স্থির। দুপুরের খাবার খেতে বসেছিল। মুহুর্তেই বিস্বাদ ঠেকল সব। নিঃশব্দে ঠোঁটদুটো নড়ল, শাওলিন। শাওলিন শুনতে পেল না। কলের সাড়াহীন নিষ্ঠুরতায় ভেঙে চূর্ণ হয়ে বলল,
- যাদের আপন ভেবেছি, আজ তাদেরই চিনতে কষ্ট হয়..
শেষ কথাটা বলতে মাথা নুয়ে ফেলল শাওলিন। আজ যেন দুচোখে অশ্রুর প্রতিযোগিতা। বারবার চোখ ডলায় ত্বক জ্বলছে। শাওলিন অশ্রু গিলে বলল,
- সবাই আমার সামনে দেয়াল তুলে দেয়। যেন আমি পাথর, দেয়াল ভেঙে ওপাশে কী আছে জেনে যাব। কেউ মানুষ মনে বলেই করে না।
চোখের পানি জামার হাতা ভিজিয়ে দিচ্ছে। শাওলিন নিঃস্ব ঠুনকো সুরে বলল,
- যার যখন ইচ্ছে হয় কথা শোনায়। কথা না শুনলে খারাপ আমি। আমার দিকটা কেউ ভেবে দেখে না। মুখে বলে 'শুধু তোমার জন্য ভাবি'। আদতে কেউ আমার জন্য নেই।
শাওলিন সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে শব্দ কমানোর জন্য। গলায় ঢোক গিলতে কষ্ট! চোখ ডলে ভেজা বাম হাতা রেলিংয়ে নামাল। ফোনের ওপাশ থেকে তবু কথা বলল না। শাওলিন নিগূঢ় ব্যথায় শেষ অবধি কলটা কেটে দিল। ফোনটা চালু রাখল না। টোটব্যাগের চেইন আঁটকে ব্যথাতুর ঠোঁটে আঘাত করল শাওলিন। জিভে রক্তের স্বাদ বাড়তে লাগল।
অপরপ্রান্তে, শোয়েব কান থেকে ফোন নামাল। খাবারের প্লেট ধাক্কা দিল ধাম করে। ছিঁটকে পানির গ্লাস কাত হয়ে একটু পর চুরমার শব্দ হলো। হাতের মুঠো এমনভাবে পাকিয়ে এসেছে, সবকটা নীল শিরা চামড়ার ওপর ফুলে উঠেছে।
—————
রেবেকাকে দোতলার একটা ঘরে আনলেন মোর্শেদা। দরজা চাপিয়ে মেয়ের দিকে হুঙ্কার গলায় বললেন,
- কী করলে রেবা? মেয়েটাকে ওভাবে মারলে?
রেবেকা রাগে কাঁপছিল। মায়ের দিকে হিসিয়ে বলল,
- কী করতে বলো? মুখের ছিরি দেখেছ? বস্তি কোথাকার! কীভাবে আমার মুখে মুখে তর্ক করল!
মোর্শেদা মেয়ের উগ্রতায় স্তব্ধ। নির্বাক হয়ে বললেন,
- তুমি শাওলিনকে বস্তি বলছ? রেবা, এগুলো কেমন ভাষা!
রেবেকা বিছানায় গিয়ে বসল। চেহারায় ঘাম, রাগের আঁচ। ঘন ঘন শ্বাস টানছে সে। কেমন উগ্ অস্থির ভঙ্গি। মোর্শেদা মেয়ের দিকে ক্ষুদ্ধ গলায় বললেন,
- মা মরা মেয়েটার গায়ে হাত তুললে, রেবা! এমন শিক্ষা তোমাকে দিয়েছি?
রেবেকা হিংস্র দৃষ্টিতে চোখ উঠাল। মায়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সে। নাক ফুলিয়ে দম ছেড়ে বলল,
- আমি ওকে বুকে করে রেখেছি। সেই মেয়ে আমার বুকের ভেতর বুলেট ঢুকিয়ে দিচ্ছে! আমার! এই রেবেকার!
মোর্শেদা মেয়ের ক্রোধ দেখে চুপ হন। এই মেয়ে উনার কথা শুনতে নারাজ। মোর্শেদা কয়েক মুহুর্ত নীরব থেকে বললেন,
- যে থাপ্পড় তুমি দিলে সেই থাপ্পড় যদি শোয়েব দিতো? তখন কী করতে?
রেবেকা চোখ গরম করে তাকাল। দাঁত চিবিয়ে বলল,
- রেবেকা নেওয়াজ কে, বুঝিয়ে দিতাম।
মোর্শেদা কিছু বললেন না। মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। স্থির চোখে বললেন,
- তুমি কী করেছ টের পাচ্ছ না। ভাবছ, ননদকে চড়-থাপ্পড় মারলে কিছুই হবে না।
রেবেকা কথার আগপাশ বুঝল না। মায়ের দিকে কয়েক সেকেণ্ড তাকিয়ে থাকল। কণ্ঠে তেজ নিয়ে শাষাল,
- প্যাঁচানো বন্ধ করো। মাথা গরম আছে কিন্তু!
মোর্শেদা নির্বিকার কণ্ঠে বললেন,
- শোয়েব যদি জানে তুমি কী করেছ, আজ রাতে ওর জীপ এখানে দেখবে রেবা।
মোর্শেদা ঘড়ির দিকে তাকালেন। তারপর দেখলেন রেবেকাকে। তিনি কিছু না বলে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলেন।
·
·
·
চলবে……………………………………………………