নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া - অন্তিম পর্ব ২৭ - লাবিবা ওয়াহিদ - ধারাবাহিক গল্প

          সময় যত গড়াচ্ছে, ইসমাতের ভয়ের মাত্রা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। শেষ পর্যায়ে আছে সে। ভয়ে, আশঙ্কায় খাওয়া-দাওয়া কমে যাচ্ছে তার। রাতেও ঘুমাতে পারে না, ঘুমাতে গেলে খুব কষ্ট হয় নড়াচড়ায়। তখন সে রাত পার করে দেয় নানান দুশ্চিন্তায়। ইসমাতের সেই জিরো ফিগারের কিচ্ছুটি এখন নেই, স্বাস্থ্য বেড়েছে তার। গাল, গলা, হাত পা সবই ফুলেছে। সাহিদ তো ইসমাতের এই গ্লো আর গাল টেনে দেওয়া খুব উপভোগ করে। ইসমাত চোখ রাঙানি দিলেও আজকাল খুব একটা কাজের কাজ হয় না। উলটো এই ছেলেই তাকে ধমকায়। জীবনে এই দিনও যে দেখা লাগবে কে জানত?

এক রাতে ইসমাতের নড়াচড়ায় কষ্ট হচ্ছে। ডেলিভারির ডেটের আরও পাঁচ ছয়দিন আছে। সে না পেরে সাহিদকে ঠেলে ঘুম থেকে ওঠায়, প্রায়ই সে এই কাজ করে। সাহিদের ঘুমও তখনই ছুটে যায়। সে উঠে বসে ইসমাতকে ওপাশ থেকে এপাশ ফেরাতে সাহায্য করে। এই সময়টায় ইসমাতের চোখ-মুখ খিঁচে যায়। সাহিদ ইসমাতের ফুলে যাওয়া পেটে হাত রেখে বলল,
--"বাবু ডিস্টার্ব করছে?"

--"সে তো সবসময়ই করে।"

সাহিদ যেন শাসাল বাচ্চাকে। 
--"এইযে, আমার বংশধর! খবরদার মাকে জ্বালাবে না। কতবার করে বলি, কানে কথা যায় না? মা যে কষ্ট পায় দেখো?"

সাহিদ কথাগুলো শাসানোর ভঙ্গিতে বললেও ইসমাতের কাছে কিউট লাগে। সে ব্যথা ভুলে সামান্য হাসে। ওই হাসিটার জন্যই বুঝি সাহিদের এত এফোর্টস। পরপর সে পেটে চুমু দিল। ফিসফিস করে বলল, "এইতো, গুড বেবি।"

ওরা এখনো বাচ্চার জেন্ডার জানে না। সাহিদের জানার ইচ্ছে হলেও ইসমাত সরাসরি না করেছে। বলেছে বাবু আসলে তবেই জানা যাবে। ততদিন অবধি কোনো চালাকি নয়। ডাক্তারও ইসমাতের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে বলেনি। এই ব্যাপারটা সম্পূর্ণ বাচ্চার বাবা-মায়ের ওপর। তারা জানতে চাইলে ওনারা বলে নয়তো না। এদেশে কম-বেশি সবাই আগত বাচ্চার জেন্ডার জেনে তা নিয়ে পার্টি করে, জেন্ডার জানা উপলক্ষ্যে কতশত আয়োজন করে। 

ইসমাত ব্যথা ভুলে থাকার চেষ্টা করলেও কেন যেন অনুভব করল, ব্যথাটা সময়ে সময়ে বাড়ছে। সাহিদের ইসমাতের সাথে কথা বলতে বলতে চোখ লেগে গেছে। ইসমাত দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করার চেষ্টা করল। এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটল। কিন্তু ভোর হতেই ব্যথাটা এবার অসহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো ভাবেই সহ্য সীমানায় নেই। ইসমাত মুহূর্তেই খামচে ধরল সাহিদের হাত। এতেই সাহিদের ঘুম ছুটে যায়। ইসমাতের দিকে তাকাতেই দেখল ইসমাত দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে অস্বাভাবিক আচরণ করছে। সাহিদ তৎক্ষণাৎ নেহাকে কল লাগিয়ে ইসমাতের গাল, কপাল দেখছে, পেটেও হাত দিচ্ছে। ব্যস্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
--"কি হয়েছে ইসমাত? আমাকে বলো, আর ইউ অলরাইট? প্লিজ টক টু মি।"

ইসমাত বহু কষ্টে বলল,
--"খুব ব্যথা হচ্ছে সাহিদ, আমি সহ্য করতে পারছি না।"

ইসমাতের চোখের কোণ বেয়ে জল গড়াচ্ছে। সাহিদ দ্রুত এম্বুলেন্স কল লাগাল। ওরা আসতেই ইসমাতকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলো। পথে এবার ইসমাতের চিৎকার করল, আর চুপ থাকা যাচ্ছে না, সহ্যও করা যাচ্ছে না। লেবার পেইন উঠেছে বুঝতে বাকি নেই। এমন এক মুহূর্তে সাহিদের নিজেকে প্রচন্ড অসহায় লাগছে। ইফরা আসবে বলেছিল, কিন্তু তার ভিসা বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু ও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। 

নেহারা তৎক্ষণাৎ রওনা দেয় হাসপাতালের জন্য। 

ইসমাতকে ওটিকে নেওয়া হচ্ছে, তার চিৎকার থামছে না। কান্নাও থামছে না। ইসমাতের হাত শক্ত করে ধরে আছে সাহিদ। এতক্ষণে একটুও ছাড়েনি এই হাত। ইসমাত বারবার বলছে, 
--"আমি ম রে যাব সাহিদ। সহ্য হচ্ছে না। নিতে পারছি না এত যন্ত্রণা। আমি পারব না।"

ইসমাত কাঁদছে। সাহিদ তখনো তাকে ভরসা দিচ্ছে।
--"আরেকটু সুইটহার্ট, এইতো আমি আছি। কিছুই হবে না তোমার। হুঁ?"

দ্রুত নরমাল ডেলিভারির ব্যবস্থা করা হয়। ডাক্তাররা এই পুরো প্রসেসিং-এ পেশেন্টের হাসবেন্ডকেও এলাউ করে। যাতে করে তারা দেখতে পারে একটি সন্তান জন্মদানে মা কতটা ব্যথা, কতটা কঠিন মুহূর্ত পার করে। সাহিদের মতো অধিক সাহসী ছেলেটা আজ ভড়কে আছে, তার উপর নিজ চক্ষে দেখাটা কোনো অংশে কম নয়। সাহিদ তাদের কথামতো মুখে মাস্ক আর গায়ে এপ্রোন পরে সবুজ। সাহিদ বারবার বলছে,
--"ইসমাত, ইসমাত.. রিমেম্বার দিস.. you are the only women i captured in my heart, মনে থাকবে? তুমি ফিরবে, সব ঠিক হবে। বুঝেছ?"

ওটির ঘর পুরো চিৎকার চেঁচামেচিতে ভর্তি। সাহিদ পুরো প্রসেসিং দেখে তার আত্মা কেঁপে উঠছে, ঠিক কতটা কষ্ট সহ্য করছে তার ইসমাত। একজন মায়ের বুঝি এত জঘন্য অনুভূতির শিকার হতে হয়? এক সময় সাহিদ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে চোখের জল আটকাতে পারল না। সেও এখন ঝাপসা দেখছে। সর্বশক্তি দিয়ে সে ইসমাতের হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় ধরে রেখেছে। ডাক্তার, নার্সরা বারবার করে বলছে সাহিদ যেন এই হাত না ছাড়ে। এই হাত ধরাটা পেশেন্টের মনোবল বাড়ায়।

অবশেষে এক ফুটফুটে বাচ্চার জন্ম হলো, ইসমাত মুহূর্তেই মিইয়ে গেল। বাচ্চা চিৎকার করে কাঁদছে। বাচ্চাকে সেই র ক্তমাখা অবস্থাতেই ইসমাতের বুকে দিল। বুকে বাচ্চার ছোট্ট মাথা স্পর্শ হতেই ইসমাত চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলল। হুঁ হুঁ করে কাঁদছে সে। ডাক্তার বাচ্চার মাথা আরও কিছুটা এগিয়ে দিল হাসিমুখে। ইসমাতের ঠোঁটের কাছে। ইসমাত কম্পিত ঠোঁটজোড়া তার কপালে ছোঁয়াল। ডাক্তার হাসি মুখে বলল,
--"শি ইজ আ প্রিটি লিটল গার্ল।"

বাচ্চার সাথে মায়ের স্কিন-টু-স্কিন কন্টেক্টের কারণে সে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে যায়।

 সাহিদ এই দৃশ্য দেখে বেডে কপাল ঠেকাল, ফোঁপাচ্ছে সে। এত মারাত্মক দৃশ্যের মুখোমুখি সে কখনোই হয়নি। তার স্ত্রী, তার ইসমাত.. সে ভাবতে পারছে না। সম্মান, ভালোবাসা, কর্তব্য যেন তার কয়েক গুণ বেড়ে গেল।

মায়ের কাছে বাচ্চাকে কিছুক্ষণ রেখে ওরা বাচ্চার কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা এবং ওজন মাপার পাশাপাশি তাকে ওয়াশ করে দিল। এই সময়টাতে বাচ্চা আবারও কাঁদল। কিছুক্ষণের মাঝেই তাকে সাদা তোয়ালে জড়িয়ে আবারও বাচ্চাকে মায়ের সংস্পর্শে আনতেই সে ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে গেল। ডাক্তার জানাল বাচ্চা আর মা দুজনই সুস্থ। সাহিদ বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকাতেই তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল, ঝুঁকে এলো তার স্ত্রী আর মেয়ের দিকে। চুমু দিল সে তার নতুন মায়ের কপালে। তার বিশ্বাস হচ্ছে না সে এখন এক মেয়ের বাবা। পরপর ইসমাতের কপালে গভীর চুমু দিয়ে বলল,
--"ইউ ডিড ইট ইসমাত। ইউ আর নাও আ সুপার ওম্যান, আ মাদার অফ মাই চাইল্ড।"

ইসমাত আহ্লাদে গলে গেল, ঝাপসা চোখে তাকাল সাহিদের দিকে। বাবুর মাথায় বৃদ্ধাঙ্গুল বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
--"সি ইসমাত, শি'জ সোও টাইনি। আমি লিল গার্ল। মাই প্রিন্সেস।"

কিছুক্ষণের মধ্যে সাহিদ কল দিল তার মাকে। শাহেলা যেন সাহিদের কলেরই অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে কল রিসিভ করতেই সাহিদ ভাঙা গলায় বলল,
--"মম, মম! আই হ্যাভ আ ডটার নাও। পিক সেন্ড করেছি, সি হার মম। সি হার!"

শাহেলা খুশিতে আত্মহারা হয়ে বাবুর ছবিটা দেখলেন। দেখেই খুশিতে ওনার চোখ ভরে আসল। বাড়ির অন্যান্য সদস্যরাও বাবুর ছবি দেখে হইহই লাগিয়ে দিল। শাহেলা রিকুকেও দেখাল। রিকু ছবিটা দেখে বারবার ফোনটা নেওয়ার চেষ্টা করছে। ছবিতে কি পেয়েছে কে জানে, তবে সে বারবার স্ক্রিনে তার নখের আঁচড় কাটতে উদগ্রীব হয়ে গেছে। তর্ষা তাই ওকে সরিয়ে দিল। আজ সেও খুশি। ফুপি হয়েছে বলে কথা। সাহিদ এখন অন্যকারো, এটা সে মন থেকেই মেনে নিয়েছে। এখন তো তার ডাক্তার প্রেমিকও আছে। সম্ভবত সামনেই বিয়ে।

নাতনির খুশিতে মাহফুজ সাহেব তৎক্ষণাৎ সব কাজ ফেলে বাড়িতে ছুটি এলেন। পুরো পরিবার মিলে বসে ওদের সাথে ভিডিও কলে কথা বলল। ছোট্ট পরীকেও সবাই প্রাণ ভরে দেখল। মাহফুজ সাহেব প্রশ্ন করলেন,
--"বাবুর নাম ঠিক করেছ? ওর তো সম্ভবত কয়েকদিনের মধ্যেই পাসপোর্ট করতে হবে।"

--"হুঁ ড্যাড, অলরেডি নোটিশ এসেছে। যত দ্রুত সম্ভব নাম দিয়ে পাসপোর্টের জন্য ইনফো জমা দিতে হবে।"

ইসমাত তখনো ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে। শাহেলা পাশ থেকে বললেন,
--"নাম কি ভেবেছ নাকি আমরা সবাই মিলে লেগে যাব?"

সাহিদ মুচকি হেসে তার মেয়ের দিকে তাকাল। একপলক ইসমাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
--"সাহমি..। সাহমি ইমরোজ হবে আমার মেয়ের নাম।"

—————

সাহমি ইমরোজের এখন চার মাস চলছে। দুপুরের এই সময়টায় সে এখন বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে মাকে পর্যবেক্ষণ করছে, ইসমাত তখন কাজ করছিল। হাত-পা ছুঁড়ে সে মাকে ডাকছে। মুখ দিয়ে সরল-মিষ্টি শব্দ বের করছে, যেন কথা বলছে। তার খিদে পেয়েছে। ইসমাত কোনো রকমে কিচেনের কাজ ফেলে ছুটল তার মিষ্টি মেয়ের কাছে। বাচ্চাটা সারা রাত বিরক্ত করে, আর দিনে ঘুমোবে। তবে সে তুলনামূলক শান্ত। কান্নাকাটি কমই করে। বোঝাই যায়, মায়ের স্বভাব পেয়েছে। 

সাহমিকে যখন সে খাওয়াতে ব্যস্ত তখন সাহিদ অফিস থেকে ভিডিও কল দিল। বাবা এখন মেয়ে বলতে পাগল। ইসমাত বাবুকে খাওয়ানো অবস্থায় কল রিসিভ করতেই সাহিদের কণ্ঠস্বর ভেসে আসল,
--"আমার মিনি ইসমাত কোথায়?"

বাবার কণ্ঠস্বর শুনেই মিইয়ে আসা সাহমির চোখ জোড়া খুলে গেল। কান খাড়া করে সচেতন হলো। সে খাওয়া ছেড়ে এদিক সেদিক বাবাকে খুঁজছে। বাবাপাগলী হয়েছে যে সে। ইসমাত মুচকি হেসে মেয়ের চোখের সামনে নিয়ে গেল ফোনটা। সাহিদ তার মেয়ের সাথে দুষ্টুমি শুরু করে দিয়েছে। বেশিক্ষণ কথা বলতে পারেনি, কিন্তু বাড়ি আসলে বাবার পুরোটা সময় তার মেয়ের। 

সন্ধ্যার পরপর সাহিদ এলো। এসে কোনো রকমে ফ্রেশ হয়েই ছুটেছে বিছানায়। মেয়ে একটু আগেই উঠেছে, কেমন গম্ভীর হয়ে আছে। যেন ঘুমের লাই কাটেনি। সারাদিন বাড়ির মানুষদের সাথে ইসমাতের ভিডিও কলেই থাকতে হয়। এই ইসমাতের শ্বশুর-শাশুড়ি কল দিবেন, এই ওর দাদী কল দিবেন, আবার শুটিং স্পট থেকে বাবুর খালামণি। এই করে করে ইসমাতের এখন মোবাইলের পাশাপাশি পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে ঘুরতে হয়।

সাহিদ এসেই বাবুর পেটে মুখ ডুবিয়ে দুষ্টুমি শুরু করে দেয়। সাহমি খিলখিল করে হাসে। এই দৃশ্য তৃষ্ণার্ত প্রাণীর মতো দেখে ইসমাত। এই দৃশ্য রোজ দেখেও পুরানো হয় না। সাহমি জন্মের পর সাহিদ আরও বদলে গেছে। ইসমাতকে যত ধরণের সাহায্য করা যায় সে করে। এমনকি রাতে যখন সাহমি কান্না করে তখন ইসমাত ঘুমায় আর সাহিদ তাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সাহিদের এমনিতেও রাতে ঘুম আসে না, মেয়ে আসাতে তার বরঞ্চ ভালোই হয়েছে। আগে তো গেমই খেলত রাত জেগে, এখন মেয়ে পালে। গুণগুণ করে গান গায়,
"বেবি শার্ক ডু ডু ডু ডু, বেবি শার্ক ডু ডুডুডু.. বেবি শার্ক।"

সাহিদ মেয়েকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, চা বানায়, মেয়ের দুধ গরম করে, টিভি দেখে। খেলা দেখতে বসলেও এক হাতে মেয়েকে নিয়ে সে খেলা দেখবে। হুটহাট খেলা দেখে চেঁচিয়ে উঠলে যখন মেয়ে ভয়ে কেঁদে দেয়, তখন সাহিদ আবারও জিভ কেটে মেয়েকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তার সব ভালো লাগে শুধু মেয়ে পটি করলেই সাহিদের মুখটা দেখার মতো হয়। এজন্য তাকে ডায়পার পরাতে হয়। ইসমাত এই দৃশ্য দেখে প্রায়ই হাসতে হাসতে বলে,
--"দ্য গ্রেট বেয়াদব সাহিদ মুস্তাহাব বাচ্চার ডায়পার চেঞ্জ করছে। বাংলাদেশে এটা দারুণ ব্রেকিং নিউজ হবে।"

সাহিদ মুখ বাঁকিয়ে বলবে,
--"নিজের বাচ্চা বলেই করি। আমার প্রিন্সেসের জন্য সাত খু ন মাফ।"

—————

ইসমাত সাহিদের দুষ্টুমি দেখে মিথ্যে অভিমান করে বলল,
--"হুঁ, এখন আমার চেয়ে সাহমি আপন হয়ে গেছে না? আগে বাড়ি ফিরলে একজন আমাকে খুঁজত, খোঁজ-খবর নিত। এখন আমিও যে আছি সেটাও মানুষ ভুলে যায়।"

ইসমাতের অভিমানী কথা-বার্তা শুনে সাহিদ মেয়েকে বিছানায় ফেলেই ওর কাছে চলে আসে। জোরপূর্বক বউকে নিজের সাথে আগলে চুমু খেয়ে বলল,
--"জেলাস ইসমি? বাবা-মেয়ের আদর সহ্য হচ্ছে না?"

--"না হচ্ছে না। বাবা হওয়ার আগেও তুমি আমার হাসবেন্ড! মেয়ে তো উড়ে এসে জুড়ে বসেছে।"

সাহিদ হেসে উঠল। ইসমাত মুখ ফিরিয়েই রইলো। কোনো কথা না বলেই আচমকা ইসমাতকে কোলে তুলে নিল। ইসমাত আঁতকে উঠে, সাহিদের ধান্দা বুঝতে মোটেও সময় লাগে না।
--"আসেন তবে আমার জেলাস ওয়াইফ, ডিনারটা অন্যকোথাও সেরে আসি?"

ইসমাত সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করল।
--"নামাও আমাকে সাহিদ! আমি মজা করছিলাম। আমি সত্যি রেগে নেই। মেয়ের কাছেই থাকো রে!"

সাহিদ ইসমাতের কোনো আঁকুতি শুনল না। সাহমি তখন সিলিং এ তাকিয়ে হাত-পা ছুঁড়ছে। একা একাই খেলছে সে, মুখের ভেতর বৃদ্ধাঙ্গুল গুঁজে নিজে নিজে কথা বলতে ব্যস্ত। বাবা-মার খুনশুটি কি আর সে বোঝে?

পরিশিষ্ট—

--"পাপা, হোয়ার ইজ মাই গিফট?"

বাবা-মেয়ে আজ ঘুরতে বেরিয়েছে। সাহিদ হাতের ছোটো পুতুলটা দেখিয়ে বলল,
--"ইটস জাস্ট আ ট্রেইলার প্রিন্সেস।"

--"আই নিড এলসা'স নিউ লিমিটেড এডিশন, পাপা।"

সাহিদ হাসল। বাবার মতোই মেয়েও বিভিন্ন এনিমে, কার্টুন চরিত্রের টয়, স্টেশনারি জমানোর অভ্যেস পেয়েছে। যদিও বেশিরভাগ ডিজনি। এখনো সাহিদের মতো এনিমে লাভার হতে পারেনি। সাহমির এখনো ওসব বোঝার বয়স হয়নি। বয়স হলে সাহিদ মেয়েকে নিজের সাথে বসিয়ে দেখাবে।

  ইসমাতের দেওয়া সেই এয়ারবাডস তো সাহিদ দুই বছরের মতো ইউজ করেছে। এরপর আবারও যখন একই এয়ারবাডস দিল নতুন চরিত্রের, সেটাই এখন অবধি ব্যবহার করছে। সাহিদ সাহমির গাল টেনে বলল,
--"এজ ইওর উইশ।"

 বাবার হাত ধরে পুতুলের মতো সাহমি ছোট ছোট পায়ে মলে ঘুরছে। বেশিক্ষণ হাঁটতে পারেনি, কিছুক্ষণের মাঝেই বাবার কোলে উঠে গেছে সে। বাবার কোল থাকতে সে কষ্ট করে হাঁটবে কেন? তাদের পেছনে সাহিদের সেক্রেটারি। এটা সেটা কিনে তার শপিং ব্যাগ দিয়ে সেক্রেটারি জেইনের হাত ভরপুর, তবুও সে টু-শব্দ করছে না।

সাহিদ আর ইসমাত বাংলাদেশে গিয়েছিল। তবে বেশিদিন থাকেনি। সাহিদ তার ডিগ্রিটা নিয়ে আবারও পাড়ি দিয়েছে ফ্রান্সে। ইসমাত থাকতে চাইলেও সাহিদ থাকেনি। তার খুব ইচ্ছে ফ্রান্সে তার মেয়েকে মানুষ করবে। এজন্য ইসমাতকেও ফিরে আসতে হয়েছে আপনজন ছেড়ে। তবে সাহিদ কথা দেয় বছরে একবার বা দুবার করে ঘুরে আসবে। 

ওদের শপিং শেষে ওরা পার্কিংলটে এলো। সাহিদের হাতেও দুটো ব্যাগ দেখা যাচ্ছে। 
--"আর কিছু লাগবে আমার প্রিন্সেসের?"

--"হুঁ, মাকে যেমন ফুলের বুকে দাও আমাকেও দিবে। আই লাভ ফ্লাওয়ার্স।"

সাহিদ মুচকি হেসে মেয়ের জন্য গাড়ির দরজা খুলে দিল। সেক্রেটারি কি বিষয়ে যেন তাকে বলছিল এজন্য সে মেয়ের দিকে খেয়াল করেনি, দরজা ধরেই দাঁড়ানো ছিল। চার বছর বয়সী পাকা সাহমি কিছুতেই গাড়ির সিটের নাগাল পাচ্ছে না। সে বারবার ওঠার চেষ্টা করছে। এক সময় হতাশ হয়ে বাবার দিকে ফিরল। 
--"পাপা, আই ক্যান্ট সিট! হেল্প মি।"

সাহিদ সবে খেয়াল করেছে, দ্রুত মেয়েকে কোলে নিয়ে গাড়ির ভেতরে বসল। সেক্রেটারি ততক্ষণে শপিংব্যাগগুলো গাড়ির ডিকিতে রাখছে। সাহিদ সাহমির কপালে চুমু দিয়ে নিজের সাথে আগলে নিল,
--"সরি মাই লাভ। পাপা একটু বিজি হয়ে গিয়েছিল।"

সাহমি খিলখিল করে হেসে দিয়ে হেসে বলল,
--"ইটস ওকে পাপা, আই ডোন্ট মাইন্ড।"

 ওরা যাওয়ার পথে গাড়ি থামাল এক ফুলের দোকানের সামনে। সাহিদ নিজে চোখে দেখে দুটো বুকে নিল৷ ছোটো বুকেটা সাহমি পেয়েই খুশি হয়ে গেল। সেটা দুহাতে বুকের সাথে আগলে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
--"আমরা কোথায় যাচ্ছি পাপা?"

--"কুইনকে সারপ্রাইজ দিতে। প্রিন্সেসের মা আমাদের কুইন, রাইট?"

সাহমির চোখ-মুখে উচ্ছ্বাস। সে উপচে পড়া হাসি দিয়ে বলল,
--"এন্ড ইউ আর আওয়ার কিং, পাপা।"

সাহিদের ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি খেলে গেল মেয়ের কমপ্লিমেন্টে। গাড়ি এসে দাঁড়াল তাদের অফিসের সামনে। ইসমাত এখনো সাহিদের সাথেই এই অফিসে কাজ করে যাচ্ছে। সে এখন মেয়ে, সংসার, স্বামী এবং অফিস সব নিজেই সামলে নিচ্ছে। একদম সুপার ওম্যানের মতো। আর তাকে দিনশেষে আগলে নিচ্ছে সাহিদ।

দুই বাবা-মেয়ে ইসমাতকে সারপ্রাইজ দিল। ইসমাত মেয়েকে দেখেই হেসে কোলে তুলে নিল। আদরে ভরিয়ে দিল তাকে। এতে সাহমি আরও আহ্লাদী হয়ে বলল,
--"মা, মা। সারপ্রাইজ পছন্দ হয়েছে?"

সাহমির গলায় 'মা' ডাক শুনলেই ইসমাত গলে যায়। তার বহুদিনের ইচ্ছে ছিল তার সন্তানরা তাকে মা ডাকবে। মা ডাক খুবই মোহনীয়, একদম হৃদয়ে এসে লাগে। সাহমিও না বুঝে তার মাকে এই ডাকে আরও গলিয়ে দেয়। মায়ের কাছাকাছি থাকলে ঘনঘন ডাকে। যেন ইসমাতকে মা বলে ডাকলেই সে আনন্দ পায়।

ইসমাত সাহমির থুঁতনিতে চুমু দিয়ে বলল,
--"খুব পছন্দ হয়েছে। আমার প্রিন্সেস সারপ্রাইজ দিয়েছে না?"

সাহমি খিলখিল করে হাসল। সাহিদ এগিয়ে এসে ওর হাতের বুকেটা ইসমাতের দিকে এগিয়ে দিল। মুচকি হেসে বলল,
--"হ্যাপি বার্থডে ইসমি।"

ইসমাত হাসল। হাসতে হাসতে বলল,
--"কালকে রাত থেকে আর কতবার উইশ করবে?"

--"যতবার ইচ্ছে হয়। আমার বউকে আমি বলছি, তোমার ফাটছে কেন?"

ইসমাত হাসল।
--"ফাটবে না বুঝি?"
--"একদম না।"

 সাহমি বলল,
--"মা জানো, আজ তোমার বার্থডে অথচ আমি নিজের জন্য গিফট কিনেছি এত এত গুলো। হিহিহি।"

--"তাই বুঝি মা?"

--"হুঁ, চলো না আমরা আইফেল টাওয়ার যাই। পাপা বলেছে এখনই নিয়ে যাবে।"

ইসমাত সাহিদের দিকে তাকাল। সাহিদের চোখে আঁকুতি, সেও যেন ইসমাতকে নিয়ে যেতে চায়। অগত্যা, ইসমাত ওদের সাথে রওনা হয়। ওরা আইফেল টাওয়ারের আশেপাশের বাগানে ঘুরছে। এক ফাঁকে সাহিদ ইসমাতের গলায় একটা পেন্ডেন্ট পরিয়ে দিল। ছোটো নীল পাথরের, আর তার পাশে দিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাদা পাথরের কাজ। খুবই আকর্ষণীয় এবং দামী এই পেন্ডেন্টটা। 

মেয়ের চোখের আড়ালে ইসমাতকে চুমু খেয়ে বলল,
--"এটা শুধুই বার্থডে গিফট না ইসমাত, এটা আমার মতো একটা উগ্র ছেলেকে বাবা বানানোর জার্নির ছোট্ট এক উপহার। আমরা তিনজন থেকে ছয়জন হলেও আমার এই ভালোবাসা তোমার প্রতি কখনোই কমবে না। আমি আজীবন তোমার প্রেমে 'দেওয়ানা সাহিদ' হয়ে থেকে যাব। আই লাভ ইউ, ইসমি।"

 "প্রেমে বাঁচা আর মরার মাঝে কোনো তফাৎ নেই, ঐ তো তারে দেখেই বাঁচি, দেখলে যারে প্রাণটা চলে যায়।"~ মির্জা গালিব।
·
·
·
সমাপ্ত……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp