ডিসেম্বরের প্রথম শুক্রবার।
সকালের সব কাজকর্ম আর খাওয়া-দাওয়া শেষে বেশ অলস একটা সময় কাটছিলো। রিপন বাড়িতে নেই। মৌমিতা বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে গ্রিলে হেলান দিয়ে। হালকা রোদ, আর মৃদু শীতল বাতাস বইছে। গাছের পাতাগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে উঠোনের ছায়াগুলোও দোল খাচ্ছে। বাকি সব প্রায় স্থির।
নীরবতা চিরে রাস্তা দিয়ে ক্রিং ক্রিং শব্দ তুলে একটা সাইকেল চলে গেলো। মেয়েটা হঠাৎ সচেতন হলো। অকারণে গলা বাড়িয়ে সেই সাইকেলের চালককে দেখার চেষ্টা করলো। সম্ভব হলো না। সাইকেল দূরে চলে গেছে। তবু যেন ক্রিং ক্রিং শব্দটা বেজেই চলেছে একনাগাড়ে। থামছে না। আবার স্পষ্ট শোনাও যাচ্ছে না।
মৌমিতা পেছনে ঘুরলো। টেলিফোন বাজছে। সে ভেতরে এলো, টেবিলটার সামনে এসে দাঁড়ালো। রিসিভার কানে ধরে বললো, “হ্যালো?”
“এটা কি মার্জিয়া খন্দকারের নাম্বার?”
প্রশ্নকর্তা একজন পুরুষ। অল্পবয়সীই হবে। এমনভাবে জিজ্ঞাসা করেছে, যেন সে খুব ব্যস্ত। মৌমিতা কোনো বাড়তি কৌতূহল দেখায় না, স্বাভাবিকভাবে জবাব দেয়, “জ্বী।”
“দেওয়া যাবে?”
“আপনি কে?”
“আমি ওর ব্যাচমেট, হাসিব। ডিপার্টমেন্ট আলাদা।”
“দিচ্ছি।”
মার্জিয়া আজকেও সকাল সকাল গোসল করেছে। বেশি দেরি হলে নাকি তার ঠাণ্ডা লাগে। এখন সে বিছানার উপর চুল ছড়িয়ে শুয়ে রয়েছে। মনটা খারাপ। রাতে ভালো ঘুমও হয়নি। তাই বারবার চোখ লেগে আসছে।
মৌমিতা দরজার সামনে এসে তাকে ডাকলো, “মার্জু? তোকে একজন ফোন করেছে।”
মেয়েটা চোখ ঘষতে ঘষতে পাশ ফিরে বোনের দিকে তাকায়। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলে, “কে?”
“তোর বন্ধু।”
“অ্যাঁ?”
“আরে আমি চিনি না। নিজে গিয়ে দ্যাখ।”
মার্জিয়া অনেক কষ্ট করে উঠে দাঁড়ালো। আপাকে পাশ কাটিয়ে বসার ঘরে চলে এলো। টেলিফোনের পাশেই রিসিভারটা রাখা। সেটা হাতে নিয়ে সে রুক্ষ স্বরে বললো, “কে?”
“আমি। কী খবর মর্জিনা? এতো সময় লাগে একটা ফোন ধরতে!”
মেয়েটা চমকে উঠলো। ঘুম ঘুম ভাবটা কেটে গেলো তখনই। সে একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, “তুমি?”
“হ্যাঁ। চিনেছিস তাহলে। আমি ভাবলাম, ভুলেই গেছিস।”
“আমার নাম্বার কীভাবে পেয়েছো?”
“তোর রুমমেট দিলো। কী যেন নাম? খুব কঠিন একটা নাম—”
“মৃন্ময়ী?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, তোদের সবার নাম কি ‘ম’ দিয়ে? মৃন্ময়ী, মর্জিনা—”
“মার্জিয়া।”
“একটা হলেই হয়।”
“আমার কাছে কী দরকার?”
ছেলেটা ক্ষণিকের জন্য চুপ করলো, তারপর তুলনামূলক গম্ভীর হয়ে বললো, “শুনলাম, তোর বাবা অসুস্থ। এখন উনি কেমন আছেন?”
“আছেন, আলহামদুলিল্লাহ। তুমি ভালো আছো?”
হাসিব আবারও সময় নেয় কথা বলতে, “বাব্বাহ! সূর্য কোনদিকে উঠলো আজকে? আপনি আমার খোঁজ নিচ্ছেন!”
মার্জিয়া অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো, “আচ্ছা, আর খোঁজ নেবো না।”
“ভালোই আছি।” হাসিব এবার নিজের কণ্ঠস্বর থেকে স্বভাবসুলভ রসিকতা পুরোপুরি সরিয়ে ফেললো, “শোন, তোর এমনিতে আর কোনো অসুবিধা নেই তো? মানে, বাকি সব ঠিকঠাক আছে, না?”
“হুম।”
“কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবি। এখন তোর মনে হতে পারে, আমাকে কেন জানাতে হবে? তবুও বললাম। শুধু জানালে তো আর কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে না। তাই না?”
“হুম।”
“মন খারাপ?”
মার্জিয়া 'না' উচ্চারণ করতেই যাচ্ছিলো, কিন্তু তার কণ্ঠরোধ হয়ে এলো। এই সামান্য একটা প্রশ্নে তার চোখ ভিজে আসার উপক্রম হলো।
“হ্যালো মর্জিনা?”
“ধ্যাৎ!”
“মন খারাপ করিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে। যাই হোক, ঢাকায় করে আসবি?”
“জানি না।”
“কান্না করছিস নাকি?”
“না।” মার্জিয়া একটা শুষ্ক ঢোক গিলে বললো, “রাখি। পরে কথা বলবো।”
“একটু দাঁড়া, আমি একটা নাম্বার দেই।”
“কিসের নাম্বার?”
“আমার হোস্টেলের।”
“ওহ। আচ্ছা, একটু ওয়েট করো। আমি লিখে নিচ্ছি।”
“ঠিক আছে।”
মেয়েটা ঘর থেকে খাতা কলম আনলো। হাসিবের দেয়া নম্বরটা টুকে নিয়ে ফোন কেটে দিলো। মনমরা হয়ে খাতার দিকে তাকিয়ে রইলো। কয়েকবার চোখ বুলানোর পর সে উপলব্ধি করলো, নম্বরটা ইতোমধ্যেই মুখস্থ হয়ে গেছে!
“মার্জু?”
আম্মা বারান্দা থেকে তাকে ডাকলেন। মার্জিয়া খাতাটা হাতে নিয়েই সেদিকে এগিয়ে গেলো।
রাবেয়া বুকের উপর হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মেয়েটা পাশে এসে দাঁড়াতেই তিনি উঠোনের দিকে তাকিয়ে শান্তস্বরে বললেন, “আমি যেটা বলি, তোমরা সবসময় সেটার উল্টোটা করো কেন?”
মেয়েটাকে একটু বিভ্রান্ত দেখায়, “কী করলাম?”
“মেইন গেটের সামনে কেন কাপড় ঝুলাতেই হবে? এতো বড় উঠানটা পড়ে আছে।”
সে কাঁচুমাচু করে বলে, “ওখানে রোদ ভালো পড়ে, কাপড় তাড়াতাড়ি শুকায়।”
“আর দিবা না। আজকে সুজয় আসবে। ভেতরে ঢুকেই মুখের উপর পড়বে গামছাটা। খুব ভালো দেখা যাবে? এখন তো আর তোমার আব্বাও হাঁটাচলা করে না। তোমার হয়ে ঐ গামছা ওখান থেকে সরাবে না কেউ। যাও, তুলে আনো। সব কাপড়ই শুকিয়েছে মনে হয়।”
কথা শেষ করেই রাবেয়া ভেতরে চলে গেলেন। মার্জিয়ার মনটা আবার বিষাদে ছেয়ে গেলো। গামছা সরানোর দরকার নেই। আব্বা যেন শুধু সুস্থ হয়ে ওঠেন, এর থেকে বড় কিছু সে চায় না।
আম্মা চোখের আড়াল হওয়ার পর মেয়েটা ছোট একটা শ্বাস ফেললো। তবে তার কপালে এবারও স্বস্তি জুটলো না। সে উঠোনের দিকে পা বাড়াতেই ঐ মেয়েটাকে দেখলো।
পরনে সুন্দর একটা সুতির শাড়ি। বেশ মানিয়েছে। দরজার সামনে ঝোলানো গামছাটা তাকে বিরক্ত করলো না, মুখ থেকে নিখাদ হাসিটাও মুছে দিতে পারলো না। মার্জিয়া নিরুপায় হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটার নাম আসমা। এই নাম সে কখনোই ভুলবে না। ভুলতে পারবে না।
আসমা যতো এগিয়ে এলো, মার্জিয়ার উৎকণ্ঠা ততোই বাড়তে লাগলো। সে পালিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজতে শুরু করলো। ততোক্ষণে জুনায়েদের স্ত্রী সামনে এসে দাঁড়ায়, মিষ্টি হেসে বলে, “ভালো আছো?”
মার্জিয়া এলোমেলোভাবে মাথা নাড়লো। তার ভঙ্গিতে কোনো স্পষ্ট উত্তর পাওয়া গেলো না। আসমা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বললো, “চাচা এখন কেমন আছেন?”
“ভালো।”
“আজকে বিকালে আমাদের বাড়িতে আসো? নাস্তার দাওয়াত থাকলো।”
আবারও ইতস্তত মাথা দোলায় মার্জিয়া। আসমার মুখের দিকে সরাসরি না দেখে বেশ অস্থিরভাবে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে।
“তোমাদের বাড়িতে কিশমিশ আছে?”
“না।”
“ওহ। তাহলে ওনাকে আনতে পাঠাই। আচ্ছা আমি যাই, তোমরা আসবা কিন্তু।”
মেয়েটা এবার কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখালো না। মাথাও নাড়লো না। পেছন থেকে মৌমিতা ডেকে উঠলো, “মার্জু, কী হয়েছে?” আসমাকে দেখে সে দরজার কাছে এগিয়ে এলো, “আরে আপনি! বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ভেতরে আসেন।”
“না না, পরে আসবো। আমি কিশমিশ নিতে এসেছিলাম। পায়েস বানাতাম—”
“আচ্ছা। নিয়েছেন কিশমিশ?”
“না।”
“একটু দাঁড়ান, আমি দিচ্ছি।”
“আছে?”
“হ্যাঁ, আছে তো।”
মৌমিতা রান্নাঘরের দিকে ছুটলো। তার ছোট বোনটার মুখ একেবারে কালচে বর্ণ ধারণ করলো। হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে।
বাড়িতে কী আছে, কী নেই—এসব না জেনে উত্তর দেয়াটা চরম বোকামি হয়েছে। কিন্তু এখন এই ভুলটা শুধরানোর উপায় কী?
জুনায়েদ ভাইয়ের স্ত্রী নিশ্চয়ই এখন তার দিকে বিস্ময় আর বিতৃষ্ণা নিয়ে চেয়ে রয়েছে। তাকে কি আদৌ বোঝানো সম্ভব, তার ঐ ‘না’ শব্দটার পেছনে কোনো রাগ ছিলো না, ক্ষোভ ছিলো না, অভিমানও ছিলো না। কোনো অনুভূতিই ছিলো না! অবশ্য বুঝিয়ে কী হবে? যা বদলেছে, তা আবার আগের অবস্থানে তো ফিরবে না। আসমার কাছে ভালো সেজে কী লাভ? কিংবা খারাপের তকমা পেলেও ক্ষতি কী?
মার্জিয়া আর দাঁড়িয়ে থাকলো না। হাতে থাকা খাতাটা বুকের সাথে চেপে ধরলো। ঐ অদৃশ্য চুনকালি মাখা মুখ নিয়েই নিজের ঘরে ফিরলো।
—————
তখন ভরদুপুর।
মৌমিতা সবে গোসল করেছে। চুল শুকায়নি পুরোপুরি, তাই খোঁপা বাঁধতে পারেনি। রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার সময় গ্রিলের জানালাটায় চোখ পড়লো তার। কয়েকবার চোখের পাতা ফেলে ভালোভাবে তাকালো সেদিকে। সুজয় এদিকেই আসছে।
ছেলেটাকে অ্যাপ্রোন ছাড়া সাধারণ পোশাকে আগে দেখা হয়নি। আজ একটা জ্যাকেট পরে এসেছে। বারান্দার সামনে এসে কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়ালো সে। দরজায় শব্দ করার আগে হাত দিয়ে নিজের চুল ঠিকঠাক করে নিলো।
মৌমিতা হেসে ফেললো। এই জানালা থেকে সব মোটামুটি স্পষ্ট দেখা গেলেও সুজয় কোনোমতেই টের পাবে না, তার দিকে কেউ তাকিয়ে রয়েছে। সে দরজায় কড়া নাড়লো। মেয়েটা খোলা চুলের উপরে ওড়না টেনে নিলো। নিজের চেহারায় কৃত্রিম গাম্ভীর্য এনে ধীর গতিতে এগিয়ে গেলো। দরজা খুলে আবেগ বিহীন স্বরে বললো, “আসসালামু আলাইকুম।”
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”
এই উত্তর দেয়ার ধরন দেখে মেয়েটি অসন্তুষ্ট হলো। সুজয় কি এবার নির্লিপ্ত থাকার প্রতিযোগিতা করছে তার সাথে?
ঘরের চৌকাঠের কাছে এসে মৌমিতা চাপাস্বরে বললো, “আম্মা? উনি এসেছেন।”
রাবেয়া খাটের এক কোণে বসে ছিলেন। শাড়ির আঁচলটা ঠিকঠাক করে উঠে দাঁড়ালেন। সুজয় এসে সালাম দিলো। তারপর মারুফের দিকে এগিয়ে এলো, “আপনি ভালো আছেন?”
মারুফ বিগলিত হেসে মাথা নাড়লেন। ইদানিং তাকে এভাবে হাসতে দেখা যায় না। মৌমিতা কিছুটা সময় মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলো আব্বার মুখের দিকে।
খাটের পাশে রাখা কাঠের টেবিলে সুজয় নিজের ব্যাগটা রাখলো। কিছু জিনিসপত্র বের করলো। গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে নিলো, এখন হয়তো রক্তচাপ মাপবে। সে হুট করেই পেছনে ঘুরলো, একটা কাগজ বাড়িয়ে দিলো মৌমিতার দিকে, “আপনার মেডিকেল রিপোর্ট। সেদিন যে টেস্টটা করাতে দিলেন, ওটার।”
মেয়েটা রিপোর্ট হাতে নেয়। চোখ বোলানোর ভান করে।
“হিমোগ্লোবিন কমে গেছে। ভালো করে খাওয়া-দাওয়া করবেন।”
রাবেয়া যেন একটা সুযোগ পেয়ে গেলেন। বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, “কিচ্ছু খেতে চায় না! কালকে রাতেও তো কতো জোর করে দুইটা ভাত খাওয়াতে হলো। কী যে করবো এই মেয়েকে নিয়ে!"
মৌমিতার অস্বস্তি সীমা ছাড়িয়ে গেলো। সে তড়িৎগতিতে মায়ের দিকে ঘুরলো, চোখের ইশারায় চুপ করতে বললো। রাবেয়া সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করলেন না। পাছে সুজয় এ দৃশ্য দেখে ফেলে, এই আশঙ্কায় মৌমিতা আবার স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। হাতে থাকা কাগজটা নিয়ে হম্বিতম্বি করে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
মার্জিয়া বিছানার এক কোণে বসে আছে দেয়ালে হেলান দিয়ে। হাতে একটা বই। তবে তার মনোযোগ সেদিকে নেই। সে নির্ঘাত কোনো দুশ্চিন্তায় নিমগ্ন। তার নখ কামড়ানোর ভঙ্গিমা দেখেই বিষয়টা অনুমান করলো মৌমিতা। মেডিকেল টেস্টের রিপোর্টটা ভাঁজ করে বালিশের উপর রাখলো। খাটের উপর হাঁটু গেড়ে বসে ছোট বোনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো, “মার্জু?”
সে তাকাতেই মৌমিতা দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে তার সামনে ধরলো। কিছু বুঝতে না পেরে মার্জিয়া জিজ্ঞেস করলো, “কী?”
“কোনটা?”
“কী আছে?”
“ধর একটা।”
মেয়েটা বেশ আগ্রহ সহকারে আপার বাম হাতের দিকে ইঙ্গিত করলো। মৌমিতার মুখ শুকিয়ে গেলো সঙ্গে সঙ্গেই।
“দেখি...” বলে মার্জিয়া বাম হাতটা ধরলো, আঙুল সরিয়ে দেখলো ভেতরে কিছু নেই। আফসোস করে বললো, “যাহ! ঐ হাতে আছে?”
ডান হাতের মুঠো খুলেও কিছু খুঁজে পেলো না সে। আপার দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে বললো, “দুটোই তো ফাঁকা!”
মৌমিতা ছোট একটা শ্বাস ফেলে। মার্জিয়ার পাশ ঘেঁষে বসে পড়ে সে। দু'জনই অকারণে নীরবতা পালন করলো বেশ কিছুক্ষণ।
মার্জিয়া নড়েচড়ে বসে আপার দিকে তাকায়। আপা একটুও নড়াচড়া করছে না। মূর্তির মতো স্থির হয়ে বলে রয়েছে। মুখ দেখে আঁচ করাও যাচ্ছে না, মনে কী চলছে। মার্জিয়া তার কাঁধে গাল রেখে বললো, “কোনটা উঠলো? বাদল, না সুজয়?”
মেয়েটা ব্যথিত গলায় বলে, “সুজয়।”
“আরেহ এসব দিয়ে কিচ্ছু হয় না! জীবনে কতোবার কতো রকমের লটারি করে দেখলাম। একটাও তো মিললো না।”
“সুজয় এসেছে।”
“কোথায়?”
“আব্বার ঘরে।”
মার্জিয়া মাথা দোলায়, “ওহ। তাহলে ওখানে যাও। দেখো, কী কী করে। শিখে রাখলে পরে কাজে লাগবে।”
সে আশা করেনি, আপা এতো সহজে রাজি হবে।
মৌমিতা কোনো আপত্তি না দেখিয়ে তৎক্ষণাৎ খাট থেকে নেমে পড়লো।
রাবেয়া ঘরে নেই।
সুজয় একটা চেয়ার নিয়ে টেবিলের সামনে বসেছে। দ্রুতগতিতে খাতায় কিছু একটা টুকে নিচ্ছে। জ্যাকেটের হাতা গুটিয়ে রেখেছে। খানিকক্ষণ আগেও তো হাতা স্বাভাবিক ছিলো। এই বাড়িতে এসে তার গরম লাগছে নাকি?
মৌমিতা এই ছেলেকে নিয়ে বিশদ ভাবতে চায় না। সে অপ্রস্তুত হয়ে আব্বার দিকে এক ঝলক তাকালো। তারপর চেয়ারের পেছনে এসে দাঁড়ালো। বিড়বিড় করে বললো, “এতো দেরি করে আসলেন কেন...”
ছেলেটা একটুও চমকালো না। যেন সে আগে থেকেই জানে, মৌমিতা এখানে এসে দাঁড়াবে। তার মাথার পেছনেও কি চোখ আছে নাকি! সুজয় লিখতে লিখতেই জবাব দিলো, “ট্রেন লেট ছিলো। শুক্রবার করে—”
“আমার জীবনে।”
“কী?”
“কিছু না।”
সুজয় এই প্রসঙ্গে আর কিছু বললো না। খাতাটা বন্ধ করে ব্যাগে ঢোকালো। তারপর উঠে দাঁড়ালো, “প্রেসক্রিপশনে কোনো পরিবর্তনের দরকার নেই। সব ঠিক আছে। ঐ ওষুধটা দিচ্ছেন নিয়মিত?”
“জ্বী।”
“আর কিছু লাগবে না। আসি।”
ছেলেটা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। মৌমিতা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। বসার ঘর থেকে মৃদু কোলাহল ভেসে এলে সে কান পেতে দেয়।
সুজয়কে জোরাজুরি করছেন রাবেয়া, দুপুরে এখানে খাওয়ার জন্য। এবং সে সম্ভবত রাজি হচ্ছে না।
মেয়েটা আব্বার খাটের একপাশে গিয়ে বসলো। মারুফ আজকাল কথা বলা আরও কমিয়ে দিয়েছেন। আগের মতো হুটহাট ‘মৌ মা’ বলে ডেকেও ওঠেন না। এই মানুষটার কি শুধু অবনতিই হবে দিন দিন?
মৌমিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই যাচ্ছিলো, তখন রাবেয়া ঘরে এলেন, বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন, “এই ছেলে একদম তোমার মতোই। এতো করে বললাম, তবু খাওয়ার জন্য রাজি করাতে পারলাম না।”
“চলে গেছে?”
“হ্যাঁ।”
মেয়েটা উঠে দাঁড়ায়। আম্মার সামনে কোনো তাড়াহুড়ো দেখায় না। সে ধীরে-সুস্থে ঘর থেকে বেরিয়েই বাইরে ছুট দেয়। বারান্দায় এসে উঠোনের দিকে তাকিয়ে দেখে, মানুষটা এখানে নেই।
সে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো। মূল দরজার দিকে পা বাড়ালো। দৌড়াতে গিয়ে তার মাথা থেকে ওড়না খানিকটা সরে গেলো, এলোমেলো হয়ে গেলো চুলগুলো।
দরজার কাছে গিয়ে দেখা গেলো, সুজয় এখনও বেশি দূর যায়নি। রাস্তায় পড়ে থাকা শীতের শুকনো পাতা মাড়িয়ে সে হেঁটে চলেছে। রাস্তা ফাঁকা। যানবাহন, জনমানব, কিছুই দেখা গেলো না।
“ডক্টর সুজয়?”
হঠাৎ এমন সম্বোধনে ছেলেটা যেন একটু চমকে যায়। পেছনে ঘুরে তাকায়। বাড়ির মূল ফটকের সামনে মৌমিতাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সুজয় আবার ফিরে আসে। সর্বপ্রকার আগ্রহ আর কৌতূহল চাপা দিয়ে সহজভাবে বলে, “জ্বী?”
মেয়েটা ইতস্তত করলো, “আমি, আরকি... আব্বা সুস্থ হয়ে যাবেন তো?”
একটা বড় শ্বাস টেনে ছেলেটা আশ্বাস দেয়, “হবেন, ইনশাআল্লাহ।”
মৌমিতা ভাবছিলো, সুজয় আরও কিছু বলবে। কিন্তু সে আর কোনো কথা না বলে চলে যেতে উদ্যত হতেই, মৌমিতা মুখ ফসকে বলে ওঠে, “আবার কবে আসবেন?”
কথাটা বলেই সে গোপনে নিজের জিভে কামড় বসায়। তার নিজেরও খুব ভালো করে জানা আছে, আগামী শুক্রবার সুজয়কে আবার আসতে হবে।
তাকে নিরুত্তর দেখে মৌমিতা নিজেকে একটু গুটিয়ে নেয়। অপ্রস্তুত হয়ে চোখ তুলে তাকায় একবার। তখন সুজয় হঠাৎ করেই খুব কাছাকাছি চলে আসে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে আঙুল দ্বারা মেয়েটার মুখের উপর থেকে একগোছা চুল সরিয়ে দিয়ে বলে, “যখন আপনি ডাকবেন।”
ঘটনার আকস্মিকতায় মৌমিতার হাত-পা অসাড় হয়ে এলো। ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেলো কিছুটা। বিস্ময়ের পাশাপাশি আরও কয়েক প্রকারের অব্যক্ত অনুভূতি তার সমস্ত চেতনাকে ঘিরে ধরলো। শুকনো মুখটা যেন আরও শুকিয়ে গেলো।
সুজয় অবশ্য তার প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষা করলো না। বরাবরের মতোই নির্বিকার ভঙ্গিতে হাঁটতে শুরু করলো। যেন কিছুই হয়নি!
·
·
·
চলবে……………………………………………………