পবনপত্র - পর্ব ৪৫ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          মারুফের শরীরটা বেশ ভালো। তাকে হুইল চেয়ারে বসানো হয়েছে। টেলিভিশনে কোনো অনুষ্ঠান হচ্ছে। তিনি মনোযোগ দিয়ে দেখছেন। আব্বার পাশেই সোফায় বসেছে মার্জিয়া।
রিপন দোকান থেকে ফিরেছে কিছুক্ষণ আগে। সে চটপট হাত-মুখ ধুয়ে বসার ঘরে এলো। রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে উঁচু স্বরে বললো, “আপা, রাতের রান্না হয়নি? আমার পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে।”

রাবেয়া উত্তর দেওয়ার আগেই মৌমিতা বেরিয়ে আসে রান্নাঘর থেকে, ভেজা হাতদুটো ওড়নার কিনারায় মুছতে মুছতে বলে, “কেবল তো সন্ধ্যা হলো। বিকেলে নাস্তা করেননি?”

“নাহ। আজকে বিকাল থেকে এতো কাস্টমার আসলো দোকানে, দম নেওয়ার সময়টাও পাইনি। শুক্রবারে অন্যসব দোকান-পাট বন্ধ থাকে তো।”

“ভালোই বিক্রি হলো তাহলে?”

“হয়েছে। ওসমান এখন অনেককিছু শিখেছে। ও হ্যাঁ, আজকে না মাহফুজের আসার কথা। এসেছিলো?”

মেয়েটা মাথা দোলায়, “হুম।”

মার্জিয়া বলে উঠলো, “মামা? এখানে বসেন। রান্না শেষ হতে দেরি আছে।”

রিপন সোফায় বসে পড়লো।
মৌমিতা বড় একটা শ্বাস টেনে পুরো বসার ঘরটাতে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো। নিঃশ্বাসটা ফেলেই নিজ ঘরের দিকে পা বাড়ালো।

মারুফের ঘরের দরজাটা খোলা। বিছানা এলোমেলো।
আব্বাকে খাট থেকে তোলার পর আর কিছুই গোছানো হয়নি। তোশকটা অনেকদূর নিচে নেমে এসেছে, চাদরটা একেবারে কুঁচকে রয়েছে। বাড়ির অন্যান্য মানুষগুলির দায়িত্ববোধের কথা ভেবে রুষ্ট হলো মেয়েটা। ঘরের ভেতরে চলে এলো। আলমারি থেকে আরেকটা চাদর বের করলো।
তার মনটা তেমন ভালো নেই। তবু বহুদিন পর আজ ঘরের কাজ করতে মন্দ লাগলো না।

বিছানা থেকে পুরোনো চাদর সরালো সে। তোশকটা বেশ ভারী। সেটাকে ঠিক জায়গায় রাখতে গিয়ে উপলব্ধি হলো, শরীর আসলেই বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
মৌমিতা তোশক উঁচু করে ধরলো, নিচে উঁকি দিলো। পৃথিবীর সব হাবিজাবি জিনিসপত্রে ভর্তি হয়ে আছে তোশকের নিচটা! এখান থেকে সব আবর্জনা সরাতে হবে।
সেগুলোর মাঝে নানান প্রকারের কাগজপত্র দেখা গেলো। কোনোটাই প্রয়োজনীয় বলে মনে হলো না। মেয়েটার চোখ পড়লো একটি অতীব প্রয়োজনীয় সামগ্রীতে। সে বুঝলো না যদিও।

ডায়েরিটা হয়তো একসময় বেশ পুরু ছিলো। পাতা ছিঁড়তে ছিঁড়তে এমন অবস্থা করা হয়েছে, দেখে কেবলই একটা মলাট মনে হচ্ছে। তাও আবার ছেঁড়া-ফাটা, জোড়াতালি করা একটি মলাট।
এসব অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেউ এখান থেকে সরায় না কেন? এজন্যই বিছানাটা এবড়োথেবড়ো হয়ে থাকে। অসুস্থ একটা মানুষের বিছানা একেবারে আরামদায়ক হতে হয়।

মৌমিতা হাত বাড়িয়ে ডায়েরিটা তুলে নিলো। তোশকটা ভালো করে বিছিয়ে দিলো খাটে। তারপর কৌতূহলবশত ডায়েরির ভেতরে একবার উঁকি দিলো। 

প্রথম পাতায় বড় করে লেখা ‘মারুফ খন্দকার’। মেয়েটা ভ্রু কুঁচকায়। আব্বার হাতের লেখা তো এমন নয়। পরক্ষণেই তার মনে পড়ে যায়, মারুফ সব্যসাচী।
তিনি অল্প বয়স থেকেই দু'হাতে লিখতে পারেন। সবাই খুব গল্পও করতো এটা নিয়ে। কিন্তু মৌমিতা আজীবন তাকে ডান হাতেই লিখতে দেখেছে।

অনেকেই বলে, বিয়ের পর মারুফ বাম হাতে লেখা ছেড়ে দিয়েছেন।
বড় মেয়েটাও তার মতো সব্যসাচী হওয়ার চেষ্টা করেছিলো। হতে পারেনি। মৌমিতা খন্দকারের ডান হাত মোটেও লেখার উপযুক্ত নয়। সে ডায়েরির পাতা ওল্টায়। সামনের কিছু পাতা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। তার চোখ আটকে যায় পরবর্তী পৃষ্ঠাটিতে।

“০৮ জানুয়ারি, ১৯৬৯:—

শুনিলাম, আয়েশার বিবাহ সম্পন্ন হইয়াছে। আমি তাহাকে শুভেচ্ছা জানাইতে চাহিয়াছিলাম। কিন্তু কেমন করিয়া তাহাকে আপনার বদনখানি দেখাইব? কী দুঃখে অথবা কী সুখেই বা দেখাইব?
সে আমাকে ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে। কিন্তু আমি কেন তাহাকে ছাড়িতে পারিলাম না?
প্রতিজ্ঞা করিয়াছিল, মারুফ খন্দকার ব্যতীত অন্য লোককে বিবাহ করিবে না, মরিয়া গেলেও তাহার দ্বারা ঐ কার্য সম্পন্ন হইবে না। সে জীবিত রহিল, মারুফও মরিল না। কিন্তু প্রতিজ্ঞা রহিল না। জানিতে পারিলাম না, কোন ত্রুটির কারণে শাস্তি পাইলাম।

যাহা হউক, দেশের অবস্থাও কিছু সুবিধার নহে। তজ্জন্য আমি ব্যক্তিজীবনের এইসব তুচ্ছ বিষয়াদি লইয়া আলাপ করিতে চাহি না।”

মেয়েটা চোখ ছানাবড়া করে তাকিয়ে থাকে লেখাগুলোর দিকে। তার সমস্ত শক্তি যেন শুষে নিলো কালো মলাটের মলিন ডায়েরিটা। সে অন্য হাতটা বাতাসে হাতড়ে অবলম্বন খুঁজলো, তোশকের উপরেই বসে পড়লো।

“০১ মার্চ, ১৯৭০:—

দেশের অবস্থা অতিশয় শোচনীয় হওয়া সত্ত্বেও আমি পুনরপি নির্লজ্জের ন্যায় নিজের ব্যক্তিগত সংবাদ লিখিতে বসিয়াছি।
আয়েশার পুত্র সন্তান হইয়াছে। সুখেই রহিয়াছে বৈ কি। আমি কেন ভুলিতে পারিতেছি না? তাহার নূতন সংসারে অশান্তির হেতু হইব কেন? আমি তো তাহার কেহ রহিলাম না। পরপুরুষ হইয়া গেলাম। তাহার স্বামীকে দোষারোপ করিব না। যাহার সহিত স্বপ্ন বুনিয়াছিলাম, সেই ব্যক্তিই যদি প্রতারণা করিতে পারে, তাহার স্বামী আর কী করিবে?

যাহা আমার হইবার কথা, তাহা নিজ ইচ্ছায় দূরে সরিয়া গেল। যাহাকে আমি আপনার সর্বস্ব দিয়া ভালবাসিয়াছিলাম, তাহার প্রতি এত ঘৃণা কোথা হইতে আসিল? তাহাকে কেন আমি ক্ষমা করিতে পারিতেছি না?”

মৌমিতা মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলো। বাইরে উঁকি দিয়ে এক ঝলক দেখলো তার আব্বাকে। এই লোকটার জীবনে আম্মা প্রথম নারী নন! আগেও কেউ ছিলেন, যার প্রতি এমন তীব্র অনুভূতি ছিলো মারুফের। আয়েশা নামের কেউ। এবং দুঃখের বিষয়, মৌমিতা সম্ভবত তাকে চেনে।

মাধ্যমিক আর উচ্চ মাধ্যমিকের সময় তার খুব কাছের একজন বান্ধবী ছিলো। তামান্না। শেষদিকে তার মায়ের সাথেও পরিচয় হয়েছিলো। তিনিই কি সেই আয়েশা? ভদ্রমহিলার একটা কথা মৌমিতার এখনও মনে আছে, ‘তুমি পুরোই তোমার বাবার মতো দেখতে।’
এই সাধারণ বাক্যটার পেছনে আরও অনেক ব্যাখ্যা থাকতে পারতো। তা নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করা হয়নি। এজন্যই হয়তো পেছনের কাহিনীটা নিজেই এসে ধরা দিলো।

মেয়েটা সটান হয়ে বসে। অনুমতি ছাড়া এই ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দেয়া উচিত হয়নি। সে ডায়েরিটা আগের জায়গায় রেখে দিতে মনস্থির করলো। নিস্তেজভাবে উঠে দাঁড়ালো। তোশকটা আরেকবার তুলতে গিয়ে সিদ্ধান্ত বদলে ফেললো সে।
আব্বা তো নিজেও বিনা অনুমতিতে বড় মেয়ের ডায়েরি পড়ে ফেলেছিলেন।

মৌমিতা চাদরের ভাঁজ খুললো, তোশকের উপর মেলে দিলো। বিছানা গুছিয়ে রেখে, ডায়েরিটা হাতে নিয়ে নিজ ঘরে চলে এলো। দরজাটা ভিড়িয়ে দিলো। খাটের কিনারায় গিয়ে বসলো পা ঝুলিয়ে।

বাঁহাতি মারুফ খন্দকারের জীবনের লুকোনো অধ্যায়টা জানার কৌতূহল সে দমন করতে পারলো না।

“১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১:—

দেশ স্বাধীন হইয়া গিয়াছে।
যুদ্ধে গিয়া বেশ মুশকিলে পড়িয়াছিলাম। সব হারাইতে বসিয়াছিলাম। আম্মা ভারী রাগ করিয়াছিলেন। তথাপি যখন বাটীতে ফিরিলাম, তখন তিনি রাগ করিয়া থাকিতে পারিলেন না। আমাকে দেখিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন।
দুই মাস হইল আব্বা পরলোক গমন করিয়াছেন। সংসারের হাল আমাকেই ধরিতে হইবে। বড় আপা কিছু আর্থিক সহায়তা করিতে চাহিয়াহিলেন, আমি তাহাকে ফিরাইয়া দিয়াছি।”

“০৯ নভেম্বর, ১৯৭২:—

একখানা পণ্যবিতান খরিদ করিয়াছি। নাম রাখিয়াছি—‘খন্দকার বস্ত্রবিতান’। ভালই চলিতেছে, মন্দ নহে।
আম্মাকে দেখিবার জন্য লোক রাখিব ভাবিয়াছি।”

“২৩ ডিসেম্বর, ১৯৭২:—

আয়েশার স্বামীর নাকি বদলি হইয়াছে। ঘুরিয়া ফিরিয়া এই শহরেই আসিয়া জুটিয়াছে। পৃথিবী এত ক্ষুদ্র কেন?
আম্মা আমার জন্যে পাত্রী খুঁজিতেছেন। আমি জানাইয়া দিয়াছি, বিবাহ করিব না।
তিনি কিছুতেই শুনিতে চাহিলেন না। তাহাকে বুঝাইতে পারিব না, আমি কেমন করিয়া ঐ একই হৃদয় হইতে অন্য নারীকে ভালবাসিব?
মানিলাম, আয়েশাকে আমি ঘৃণা করি, কিন্তু তাহাকে ভুলিবার উপায়ও যে খুঁজিয়া পাইলাম না।”

একটা বিদ্রুপাত্মক হাসি ফুটলো মৌমিতার ঠোঁটে। ডায়েরির রচয়িতার প্রতি একটু করুণা হলো।
সে পাতা ওল্টালো।

“২৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৩:—

দুই দিন হইল রাবেয়া খাতুনের সহিত আমার বিবাহ সম্পন্ন হইয়াছে।
ঠিক কী দেখিয়া তাহার পিতা আমাকে পছন্দ করিলেন—বলিতে পারি না।”

“০২ এপ্রিল, ১৯৭৩:—

আল্লাহ তাআলা আমার স্কন্ধে একখানা গুরুভার চাপাইয়া দিয়াছেন। আমার মতন অযোগ্যের অদৃষ্টে রাবেয়ার ন্যায় সুযোগ্য কন্যা থাকিতে পারে—ইহা কে জানিত?
ছোট শিশুটির ন্যায় সে আমাকে সর্বদা আগলাইয়া রাখে। সন্দেহ করি, আমি কি সত্যই তাহার ভালবাসার যোগ্য? তাহাকে দেখিলেই মন কেমন করিয়া উঠে। অপরাধ বোধ করি। আমাকে ভালবাসিয়া সে ঠকিবে না তো?
উপরন্তু আমাকে লইয়া তাহার স্নেহ আর আক্ষেপের সীমা নাই। আমি নাকি বড়ই শীতল স্বভাবের, কথা কহিতে চাহি না।
আম্মার সহিত রাবেয়ার বেশ ভাব হইয়াছে। উভয়ে হাসিয়া খেলিয়া আমার সম্মুখেই আমার নিন্দা করে।

আয়েশাকে আমি মন হইতে মুছিয়া ফেলিতে পারি নাই, ক্ষমাও করি নাই। কী করিব? অপরকে লাভ করা নহে, কাহারও প্রাপ্তি হইয়া থাকিতে পারাই হয়ত প্রকৃত সৌভাগ্য। সত্যই সৃষ্টিকর্তা আমাকে সুখ দিয়াছেন।
তবে বলিতে পারি না কেন, আয়েশার সুখ আমি সহিতে পারি না। এত ঈর্ষাপরায়ণ কভু ছিলাম না তো! আমি সুখে আছি, কিন্তু সেই সুখ ভোগ করিতে গেলে নিজের উপরে ঘৃণা আসিয়া পড়ে। তাহার সুখের কারণ কি আমি হইতে পারিব, যে ব্যক্তি নিজের সব ফেলিয়া আমাকে সম্বল করিয়াছে? আমি যে আমার সমস্ত ভালবাসা অপাত্রে ঢালিয়া নিঃশেষ করিয়াছি। আয়েশা আমাকে নিঃস্ব করিয়া দিয়াছে। ইহার ফল কি সে ভোগ করিবে না?”

মেয়েটা বড় একটা শ্বাস ফেললো। পরের পৃষ্ঠাটির দিকে তাকালো। মারুফের হাতের লেখা বদলে গেছে। এখান থেকেই তিনি ডান হাতে লিখতে শুরু করেছিলেন হয়তো।

“২০ জানুয়ারি, ১৯৭৪:—

বেশ শীত পড়িয়াছে।
রাবেয়া কিছুদিন হইল কিছুই খাইতে চাহে না। কী করিব, বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না।”

“০২ মার্চ, ১৯৭৪:—

রাবেয়া অন্তঃস্বত্ত্বা। শরীর ভাল নহে। খাইতে চাহে না। শুকাইয়া গিয়াছে। রাতে ঘুমাইতে পারে না। আমাকে কিছুই কহিতে চাহে না, আম্মাকেও কহে না। এমনি করিয়া তো চলিতে পারে না।

তাহার সহিত আমিও রাত্রে জাগিয়া থাকি। সে কান্নাকাটি করিয়া প্রত্যেক রজনী কাটাইয়া দেয়। আমার চক্ষু আর্দ্র হইয়া যায়। তাহাকে শুধু সান্ত্বনা দিতেও অপারগ আমি, অযোগ্য আমি।
স্ত্রীর পানে চাহিলে মন খারাপ হইয়া যায়। কে জানিত, মাতা হইয়া উঠা এত কষ্টদায়ক? তাহার কিছু বেদনা কি আমি ঋণ করিতে পারি না? কিছুক্ষণের জন্যে হইলেও সে যেন শান্তিতে ঘুমাইয়া লইতে পারে।”

“০৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৪:—

বিশ্বাস করিতে পারিতেছি না, আমি পিতা হইয়াছি!

অদ্য প্রভাতে আমার কন্যা সন্তান জন্ম লাভ করিয়াছে। তাহার ক্রন্দন ধ্বনিতে মুখরিত হইয়াছে আমাদিগের ক্ষুদ্র বাসভবন। ডাক্তারখানা হইতে ফিরিয়াছি বহুক্ষণ হইল।
সমস্ত দিবস গৃহ মস্তকে তুলিয়া রাখিবার পর, আমার কন্যা তাহার জননীর ক্রোড়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাইতেছে। সেইখান হইতে চলিয়া আসিতে মন চাহিতেছিল না। তথাপি, তাহাকে রাখিয়া আমাকে বস্ত্রবিতানে আসিতে হইল। ক্রয়-বিক্রয় ভাল চলিতেছে না।”

“১০ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৪:—

কন্যার নাম রাখিয়াছি মৌমিতা খন্দকার। সদ্য আকিকা করা হইয়াছে। সকলে বলাবলি করিতেছে, সে আমারই মুখশ্রী লাভ করিয়াছে। প্রার্থনা করি, তাহার নিয়তি আমার মত না হউক।”

মৌমিতার গলা থেকে কাঁপা কাঁপা একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। এতোক্ষণ ধরে সে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ করে বসে ছিলো। নিজেও খেয়াল করেনি।

“০৪ মার্চ, ১৯৭৫:—

বস্ত্রালয়ে যাইবার পূর্বে মৌমিতাকে ক্রোড়ে লইয়াছিলাম। সে তাহার ক্ষুদ্র হস্ত দ্বারা আমার একখানি অঙ্গুলি বেষ্টন করিয়া হাসিয়া উঠিল। কিন্তু যখন ছাড়াইয়া লইতে গেলাম, আমার ক্ষুদ্র জননী তাহার সর্বশক্তি প্রয়োগ করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। উপায়ান্তর নাই, আমাকে যাইতে হইবে।
গৃহের বাহির হইবার কালে, আমার চক্ষু হইতেও অশ্রু বহিতে লাগিল।
এই নিঃসঙ্গ মধ্যাহ্নে বস্ত্রালয়ে হিসাবের খাতা খুলিয়া বসিয়া আছি বটে, মনটি পড়িয়া রহিয়াছে বসতগৃহে।”

মেয়েটা এটাও খেয়াল করেনি, তার চোখ থেকে টুপ টুপ করে পানি ঝরতে শুরু করেছে। এক ফোঁটা অশ্রু গিয়ে পড়লো ডায়েরির পাতায়। সে তড়িঘড়ি করে সুতি ওড়নাটা চেপে ধরলো সেখানে, আলতো করে মুছে ফেললো। সামান্য দাগ রইলো তবু।
কালো মলাটের ভেতরে এর পরের প্রতিটা পৃষ্ঠা জুড়ে কেবল মৌমিতা খন্দকার। কিছুদূরে গিয়ে আরেকটা নাম যুক্ত হলো। মার্জিয়া খন্দকার। দুটো মেয়ের দিনলিপি মারুফ নিজেই লিখেছেন।
মৌমিতার চোখ বারবার ভিজে এলো।

মারুফের মা মৃত্যুবরণ করেছিলেন ১৯৮৭ সালে। সেই সময়ের পর থেকে মারুফ দীর্ঘদিন আর কিছুই লেখেননি ডায়েরিতে। একেবারে ১৯৯৩ সালের ঘটনা লিখেছেন।

“০৩ জানুয়ারি, ১৯৯৩:—

মৌমিতাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাখিয়া আসিলাম।
আমার জ্যেষ্ঠ কন্যা এই প্রথম সকলকে ছাড়িয়া এত দূরে থাকিতে চলিয়াছে। পূর্বে এরূপ অভিজ্ঞতা হয় নাই তাহার।

দ্বার হইতে আমাকে বিদায় জানাইবার সময় মৌ ক্রন্দন চাপা দিয়া রাখিয়াছিল। তাহার চক্ষু রক্তবর্ণ হইয়া গিয়াছিল। আমার বড় মায়া লাগিল। প্রাণ চাহিল, তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিতে, মা রে, ইহা তো মাত্র কয়েক মাইল। তুমি ডাকিলে আমি সাত সমুদ্র তের নদী পার করিয়া আসিব! একবার ডাকিয়া দেখ।
কহিতে পারিলাম না। আঁকড়াইয়া ধরিতে পারিলাম না। আমাদিগের মনের মধ্যে যেই দূরত্ব, উহাই মস্ত বড় হইয়া উঠিয়াছে।

আমি বাসে চড়িয়া বসিলাম। বাস চলিবামাত্রই আষাঢ় মাসের বৃষ্টির ন্যায় অশ্রু বহিতে লাগিল। এত লোকের সম্মুখে উহা আড়াল করিতে বেশ কষ্ট হইল। মনে পড়িল, যেইদিন এই কন্যা একেবারে পর হইয়া যাইবে, সেইদিন কীভাবে সব সামলাইয়া উঠিব?
এই মুহূর্তে যদি আমি মৃত্যুবরণ করি, তাহার মুখখানি আমার নসিব হইবে না।
আমার স্ত্রী জন্ম দিয়াছিল তাহাকে, আমি জন্ম লইয়াছিলাম পিতা রূপে। ইহকালে এই পিতৃত্বের মেয়াদ যেইদিন উত্তীর্ণ হইবে, আমার স্ত্রী এবং সন্তানরূপী দুই জননীকে যেন আমি একটিবার দেখিতে পারি। মৃত্যুকালে জলের তৃষ্ণা না মিটিলেও যেন অন্তরের তৃষ্ণা তুমি মিটাইয়া দিও, হে পরম করুণাময়।”

মৌমিতা শেষ কবে এভাবে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলো, নিজেও মনে করতে পারলো না। অনেকদিন হলো ভালোভাবে চোখের জল ফেলা হয়নি! মনের ভেতর কতো যে যন্ত্রণা জমে ছিলো। তাদেরকে মুক্তি দেয়াটা জরুরি হয়ে উঠেছে। ঝরে যাক। অশ্রুর সাথে সেগুলোও ঝরে যাক!
মেয়েটা চোখ মুছলো। সে ডায়েরির শেষ অংশে চলে এসেছে। এরপর মারুফ আর কিছু লেখেননি।
এই পৃষ্ঠায় তার হাতের লেখা একটু দুর্বোধ্য দেখালো। হয়তো কাঁপা হাতে খুব কষ্ট করে লিখেছিলেন। লেখাটা বেশি পুরাতনও না। প্রায় মাসখানেক আগের।

“০৯ নভেম্বর, ১৯৯৭:—

আয়েশাকে ক্ষমা করিয়াছি।

মৌমিতা যখন কহিল, সে তাহার অপেক্ষা অল্পবয়সী পাত্র পছন্দ করিয়াছে, তখনই চমকিত হইলাম। বাদলের সহিত আলাপ করিবার পর বুঝিলাম, আমার কন্যার অদৃষ্টে অঘটন রহিয়াছে।
বাদল মৌকে কত ভালবাসে, বুঝিলাম না। কেবল বুঝিলাম, সে বেশ জেদি।
এই জেদ যে এককালে আমিও করিয়াছিলাম। আজ কন্যার পিতা হইতে না পারিলে সেই ত্রুটি কোনকালেই ধরা পড়িত না।

কন্যার বিবাহ দিয়া বিদায় করা যে আমার মূল উদ্দেশ্য নহে। যদি ইহাই হইত, সেই কার্য বহু পূর্বেই সম্পন্ন করিয়া ফেলিতাম। চাহিয়াছিলাম—আমি মৌমিতার জন্যে যাহা করিতে পারি নাই, তাহা যেন ইহার স্বামী করিতে পারে।

ভালবাসা বড়ই সত্য। আমি অস্বীকার করিব না। কিন্তু এই বলিয়া, যাহাকে রাজকন্যার ন্যায় লালন করিতে পারি নাই, তাহাকে রাজরাণী রূপে দেখিবার সাধও কি মিটিবে না?

বাদল ভাল। সুজয় যোগ্য।
কিন্তু কথা হইল, আয়েশা যদি আমাকে বিবাহ করিত, সে কভু গাড়িতে চড়িতে পারিত না, পছন্দের সামগ্রী ক্রয় করিতে পারিত না, তাহাকে অভাবের সহিত সংগ্রাম করিতে হইত। তাহার পিতা নিশ্চয়ই ইহা কামনা করেন নাই।
আয়েশার দোষ নহে, সে তো প্রেমিকের ভালবাসা তুচ্ছ করিয়া জন্মদাতার নিকট ফিরিয়া গিয়াছে। অথচ কত অভিশাপ তাহারে আমি দিয়াছি! পাপ করিয়াছি বটে। তবে কি আপনার সন্তান দ্বারা ইহার প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইবে? আমার অপরাধের দণ্ড মৌ কেন ভোগ করিবে?

সুজয়ের নিকট মৌমিতা মন্দ থাকিবে না। আমার কন্যাকে এই কথা কেমন করিয়া বুঝাই? মৌমিতার জন্যে যাহা উত্তম, তাহাই যেন হয়, খোদা।”

মৌমিতা শব্দ করে কেঁদে উঠলো এবার। ডায়েরিটা বন্ধ করে পাশে রাখলো। দুই হাতে মাথা চাপড়ে ধরে অস্ফুটে বললো, “আব্বা! আয়েশা সুখী হননি। আয়েশা কখনোই সুখী হননি। স্বামীর নির্যাতন সহ্য করেছেন দিনের পর দিন। প্রথম বাচ্চাটাও মারা গেছে। আপনি যে সুখ-শান্তির মুখ দেখেছেন, সেটার এক কড়িও আয়েশা পাননি। অন্য কাউকে বিয়ে করলে আপনার মৌমিতাও সুখী হতে পারবে না আব্বা। আর বাদল...”

মেয়েটা চুপ করলো। কান্না থামালো। শূন্য দৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলো অনেকক্ষণ। কতোটুকু সময় কীভাবে পেরিয়ে গেলো, বুঝতেই পারলো না সে।

“মৌ? খেতে আসো।”

রাবেয়ার ডাকটা মৌমিতার কান অবধি পৌঁছালেও কাজ হলো না। গভীরভাবে কিছু ভাবার অবস্থায় সে নেই।
সে জানে, ঝোঁকের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বিপদজনক হতে পারে। তবু তার মনে কেবল একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে, বাদল যদি অন্যকারও সঙ্গেই সুখে থাকে!

হয়তো বাদল নিজেও এটা জানে। হয়তো কাউকে খুঁজেও পেয়ে গেছে। তাই নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়াটা সম্ভব হয়েছে তার জন্য। ঠিক আছে!
এখন তাদের মাঝে বাকি থাকা অনিশ্চয়তাটুকু মুছে ফেলার পালা। যা হবে, স্পষ্টভাবেই হোক।

ছেলেটাকে একটা চিঠি পাঠানো হবে। আগেরবার খুলনায় পাঠানো হয়েছিলো। এবার মেসে পাঠানো হবে। বাদল সেখানে থাকুক বা না থাকুক, মেয়েটার আর কিছু যায় আসে না। চিঠিটা তার কাছে পৌঁছে গেলে তো ভালোই হয়। না পৌঁছালে আরও ভালো!

“মৌ? কই তুমি? খাবা না?”

“জ্বী আম্মা। এখনই আসছি।”

চটজলদি কাগজ কলম নিয়ে বসে পড়লো সে। কাগজের উপর কলমটা রাখতেই মৌমিতার মনে হলো, সে বহুকাল যাবৎ লেখে না। কিছুই লেখে না। কলম ধরার কায়দাটাও যেন ভুলে গেছে। কথা সাজিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না, শব্দগুলো সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে।
এখন... কী উপায়?

মেয়েটা শুষ্ক ঢোক গিলে কাগজের উপর শক্ত হাতে কলম ধরলো, লিখতে শুরু করলো। গুছিয়ে লেখার অবকাশ আর নেই। বোঝানোর দিনও শেষ। ছেলেটা যদি না বোঝে, না-ই বুঝলো!

“বাদল,
তোমাকে কোথাও খুঁজে পেলাম না। হারিয়েই যেতে চাও যখন, আমি ছেড়ে দিলাম। তুমি তো এখনও আমাকে পেয়ে যাওনি, তাই না? তবুও এত অবহেলা! আমাদের বিয়ে হলে তুমি নাহয় মৌমিতা খন্দকারকে পেয়ে যাবে। আমি কি আমার বাদলকে আদৌ পাব কোনোদিন? মনে তো হয় না।
আমার নিয়তি আমি মেনে নিয়েছি। মেনে নিয়েছি, তুমি ধরা দেওয়ার মানুষ না।
পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও, না করলেও চলবে। আমি ক্ষমার অযোগ্যই।
আর একটা অনুরোধ, আমাকে ভুলে যাও।
ভালো থেকো।

ইতি
মৌমিতা”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp