ফজরের নামাজ পড়া হয়নি। দেরিতে ঘুম ভেঙেছে। নামাজের সময় পেরিয়ে গেলে আর উঠতেও ইচ্ছা করে না মৌমিতার। তবুও সে উঠে বসলো।
আব্বাকে আর কিছুক্ষণ পরেই খাওয়ানো হবে। তাছাড়া অনেক কাজ আছে। রিপন কাজের বুয়ার খোঁজ করতে চেয়েছিলো। এখন পর্যন্ত কাউকে পাওয়া যায়নি। মার্জিয়া তো বেশিদিন থাকতে পারবে না। সামনে পরীক্ষা আছে। মৌমিতাকেও তাড়াতাড়ি মাস্টার্স শুরু করতে হবে। দেরি হয়ে যাচ্ছে। একটা চাকরির খুব দরকার।
হঠাৎ মনে পড়লো, চাকরি নিয়ে আপাতত মাথাব্যথা নেই।
গত রাতে একজনকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। মেয়েটা মাতব্বরি করে নিজেই গিয়ে চিঠিটা ফেলে এসেছে ডাকবাক্সে। ভালো হয়েছে!
জানালা খুলতেই ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠলো। যদিও আকাশ অন্ধকার। শোঁ শোঁ করে বাতাস বইছে। কামরাঙা গাছটার ডালপালা দুলছে, পাতাগুলো খসখস শব্দ করছে।
মার্জিয়ার ঘুম ভাঙেনি। বিছানায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে রয়েছে সে। তার গায়ে মোটা কাঁথাটা ভালোভাবে মুড়িয়ে দিতে গিয়ে মৌমিতার মনে পড়লো, আজকে লেপ কম্বল বের করে রোদে দেয়ার কথা ছিলো। কিন্তু আবহাওয়ার যা অবস্থা! দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করে দেখতে হবে, রোদ ওঠে কিনা।
মৌমিতা হাতখোঁপা বাঁধতে বাঁধতে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকলো, “আম্মা? মামা কি চলে গেছেন?”
রাবেয়া ঘুরে তাকালেন, “দোকানে যায়নি। ওর অন্য কাজ আছে। তাড়াতাড়ি না ফিরলে ফোন করে জানাতে চেয়েছে।”
“ওহ। আব্বাকে খাওয়াতে হবে এখন। কে তুলে বসাবে?”
“রিপন তো বললো, তাড়াতাড়ি চলে আসবে। কতোক্ষণ লাগে, দেখি।”
“জুনায়েদ ভাইকে ডাকতে হবে নাকি?”
“জুনায়েদ বাড়িতে নেই।”
“ওহ।”
মার্জিয়া ঘুম থেকে উঠেই রান্নাঘরে চলে এসেছে। সে দরজায় এসে আপার পথরোধ করে দাঁড়ায়। চোখ কচলে বলে, “আজকে আমি রান্না করবো।”
মৌমিতা তাকে মৃদু ঠেলা দিয়ে বেরিয়ে এলো, “তোর তো ঘুমই ভাঙেনি ঠিকমতো। এতো ঘুমাস কেন?”
“আমি ভোরে উঠেছিলাম। উঠে দেখি, কারেন্ট নাই। পানি নাই। তারপর আবার শুয়ে পড়েছি। এখন গোসল করবো।”
রাবেয়া তরকারি নাড়তে নাড়তে হেসে বললেন, “দুইজনই অনিয়মের ঢেঁকি! একজন ভোরে গোসল করে, আরেকজন রাতে।”
“আপনার বয়স হয়ে যাচ্ছে আম্মা। উল্টাপাল্টা বাগধারা বলছেন। ওটা অকাজের ঢেঁকি।” মার্জিয়া ব্যস্তভাবে বললো, “পাতিলে একটু পানি গরম করেন তো। আজকে খুব ঠাণ্ডা পড়েছে। আব্বা তো এখনও খাননি, না?”
“না। তোমার মামা আসুক।”
“কখন আসবেন?”
“বুঝতে পারছি না। তখন তো বললো, দেরি হলে ফোন দিবে—”
বসার ঘরের টেলিফোনটা ক্রিং ক্রিং শব্দে বেজে উঠলো। মৌমিতা আনমনা হয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঐ ঘরে চলে গিয়েছিলো। কিন্তু ফোনের দিকে কর্ণপাত না করে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো সোফার পাশে।
“ঐ তো মামা ফোন দিচ্ছেন।” মার্জিয়া ভ্রু কুঁচকে চেঁচিয়ে উঠলো, “আপা! ফোনটা ধরো। হা করে দাঁড়িয়ে আছো যে?”
মৌমিতা মাথা ঘুরিয়ে সরু চোখে তাকালো বোনের দিকে। মেয়েটা বোনের তপ্ত দৃষ্টি উপেক্ষা করে দ্রুতপায়ে ঘরে গিয়ে ঢুকলো। সে বেশ অসামাজিক হয়ে যাচ্ছে দিন দিন! কিন্তু আম্মার এসব চোখে পড়বে না। তার ভাষ্যমতে, এটাও বড় মেয়ের দোষ। কেননা, ছোটরা বড়দের দেখেই শেখে।
মৌমিতা একেবারে ধীরে ধীরে হেঁটে এগিয়ে গেলো। ছোট বোনকে আর দোষারোপ করলো না। টেলিফোনে কথা বলার বিষয়টা আসলেই খুব বিরক্তিকর।
সে ত্যক্ত মুখে রিসিভারটা তুলে কানের কাছে ধরলো। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না! তবু ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে কোনো শব্দ শুনতে না পেরে সে বলে উঠলো, “হ্যালো? কে বলছেন?”
টেলিফোনের ঐপাশে এখনও নিস্তব্ধতা। রিসিভারসহ মৌমিতার হাত সামান্য কেঁপে ওঠে। ঐ কম্পন পৌঁছে যায় তার গলাতেও, “ব... বাদল?”
এবার একটু শব্দ হলো। মানুষটার গলা শোনা যায় প্রথমবার, “এসব কী উল্টাপাল্টা লিখেছেন! আমি কোথাও হারিয়ে যাইনি। আপনি আমাকে সবসময় এই কথা বলেন, আমি নাকি হারিয়ে যাই! আর আপনি?
কোথায় গিয়েছিলেন? কতোবার কল দিলাম আপনাকে। আপনার বাসায় গিয়েও ঘুরে এসেছিলাম। কোত্থাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
আপনি নিজেও কোনো যোগাযোগ করলেন না। কোথায় ছিলেন? বাসায় কবে ফিরলেন—কিছুই জানি না। আর এতো দিন পর আমার কথা মনে পড়লো আপনার? এই আজাইরা চিঠিটা পাঠানোর জন্যই আমাকে স্মরণ করলেন? কী বোঝাতে—”
বাদল বিরতি নিলো। একটানা কৈফিয়ত দিয়েই একটু কেশে উঠলো সে।
মৌমিতা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। নিজের শ্রবণেন্দ্রিয়কে এতো সহজে বিশ্বাস করতে পারলো না।
সত্যিই কি ঐ মানুষটাই কথা বলছে? এতোদিন পর, এখনও এমন অভিমান দেখিয়ে, অধিকার দেখিয়ে কথা বলছে! ঐ একটা চিঠির জন্যই? এটাতে এমন কাজ হবে জানলে মৌমিতা সেই কবেই পাঠাতো!
আগের কোনো প্রচেষ্টা তো কাজে লাগেনি। একটা চরম সিদ্ধান্ত নেয়ার পর বাদলের খোঁজ পাওয়া গেলো অবশেষে!
ছেলেটা বোধহয় কখনোই শুধরাবে না। সে ওভাবে কাশলোই বা কেন? আবার কোনো অসুখ-বিসুখ ধরালো নাকি? পাগল একটা!
“আপনি কি সত্যি সত্যি চলে যেতে বললেন আমাকে? নাকি এমনি বলেছেন? হ্যালো? হ্যালো... আমি আপনাকে অনেক খুঁজেছি, বিশ্বাস করেন। বুঝতে পারছিলাম না কী করবো। আপনি যে মেসে ফোন করেছিলেন, ম্যানেজার এটা আমাকে বলেইনি। আজকে জিজ্ঞেস করলাম, কেউ আমাকে খুঁজেছে কিনা। তখন বলে, হ্যাঁ, একটা মেয়ে ফোন দিয়েছিলো কয়েকবার। আগে বলেনি। ছাগল মার্কা ম্যানেজার!”
মৌমিতা চুপ করে রইলো। তার মুখ থেকে একটা শব্দও বের হলো না। চাইলেই সে অনেক প্রশ্ন তুলতে পারে।
এতো দিন পর কেন মেস মালিকের কাছে খোঁজ করার ইচ্ছে হলো? মেসে ফোন দিয়ে একবারও তাকে পাওয়া যায়নি কেন? এতো ব্যস্ততা! তাছাড়াও মৌমিতা নাটোরে ফিরেছে বহুদিন হলো। বাদল জানতে পারেনি, যোগাযোগ করার ইচ্ছে আদৌ ছিলো? সে যদি খুলনায় না-ই ফিরে থাকে, তাহলে আরেকবার দেখা করার চেষ্টা করলো না কেন? কিছু জানে না, ভালো কথা। আশেপাশে কারও কাছে একটা খোঁজ নিলে কি খুব ক্ষতি হতো? সে কি নিজের বিরুদ্ধে থাকা যুক্তিগুলো কখনোই দেখতে শিখবে না?
কোনো অভিযোগ করলো না মেয়েটা। কী লাভ? সময় তো ফুরিয়ে গেছে।
তার দৃষ্টি পড়লো দরজার দিকে। হাতে পলিথিনের থলে নিয়ে রিপন বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে, জুতো খুলছে। মাথা নুইয়ে কপালে হাত দিয়ে মৌমিতা নিজের মুখ আড়াল করার চেষ্টা করলো। কান থেকে রিসিভার সরালো না। রিপন তার দিকে না তাকিয়ে ঘরে চলে গেলো।
“হ্যালো? আচ্ছা... কেমন আছেন আপনি? কতোদিন হলো আপনার সাথে কথা হয় না। এতোবার করে ফোন দিয়েছি, তবু... বাদ দেন। আপনি ভালো আছেন?”
বাদল অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো উত্তরের আশায়, তারপর শান্তভাবে বলতে শুরু করলো, “মানলাম, আমার চাকরি হয়নি। আমি এখনও... বেকার। আপনাকে ঘরে তোলার সামর্থ্য নাই আমার। ঘরটাও নাই! অনেক অসুবিধা হবে হয়তো। কিন্তু... আমি... সব করতে পারি আপনার জন্য। বিশ্বাস করেন।
আপনাকে বলা হয়নি। আমি রান্না করতে পারি। আমার জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় হোস্টেলেই কেটেছে, আপনি তো জানেন। রান্না করা, বাসন মাজা, ঝাড়ু দেয়া, ঘর মোছা—আপনি যা বলবেন আমি তাই করবো। আমার চাকরি হওয়ার পরেও বাড়ির সব কাজ আমি করবো।
আমি জানি... আপনি অনেক চাপের মধ্যে আছেন। কিন্তু, তাই বলে, এই সিদ্ধান্ত কেন?
আমাকে আরেকবার সুযোগ দেয়া যায় না? আর একটু অপেক্ষা করা যায় না?
আচ্ছা, আমার কোন ব্যাপারগুলো আপনার পছন্দ না? বলেন একবার। আমি... সব বদলে ফেলবো। যেমন হতে বলবেন, আমি একদম সেরকম হয়েই চলবো। আপনি শুধু বলেন।”
মেয়েটা মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকে। অনুভব করে, ভেতরে সব ভেঙে যাচ্ছে। নিজেকে অনমনীয় বানিয়েও খুব একটা লাভ তো দেখা যাচ্ছে না। পাথর কি আর ভাঙন থেকে বাঁচতে পারে?
“আপনি নাকি আমার মেসে এসেছিলেন? ঐদিন আমি যশোর গিয়েছিলাম, একটা ইন্টারভিউয়ের জন্য। দোয়া করেন তো, এবার যেন চাকরিটা হয়ে যায়—”
মৌমিতা মুখ চেপে ধরলো। ডান হাতের বালাটা কব্জি থেকে সরে গেলো কিছুটা। তার চোখ জ্বালা করছে, অশ্রু যেন আটকে আছে কোথাও, কিছুতেই বেরোচ্ছে না। অস্বস্তি হচ্ছে, খুবই অসহ্য লাগছে।
বাকি সবকিছু উপেক্ষা করে তার রিসিভারের ওপাশে থাকা মানুষটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে করলো খুব। ছেলেটার কণ্ঠে কী ভয়ানক একটা অভিমান মেশানো! সে এমন করে কথা বলছে কেন? কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে। আসলেই অসুখ ধরালো নাকি?
“চুপ থাকবেন না প্লিজ। কিছুই বুঝতে পারছি না। চিঠিটা সিরিয়াসলি লিখেছেন? কী হয়েছে, একবার বলেন।
আমার বয়সটাই কি আপনার সমস্যা? তাহলে শুরুতেই একটা থাপ্পড় মারলেন না কেন আমাকে? কেন বললেন না যে আপনি কখনোই আমার হবেন না? চলেই যখন যাওয়ার ছিলো, বাদলের জীবনে আসলেন কেন? প্রতারণা করার জন্যই? সম্পর্কটা তো দুইজনেরই ছিলো, তাই না? সিদ্ধান্ত আপনি একা নিতে পারলেন? আমাকে একা করে দিলেন। কেন করলেন এরকম? এখন আবার চুপ কেন!
আচ্ছা, আপনার কি বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে? হ্যালো? আপনি—”
বাদল এগোতে পারলো না।
মেয়েটারও চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। গলার কাছে যেন অনেক ভারী কিছু দলা পাকিয়ে আছে। ঢোক গেলা যাচ্ছে না, শ্বাস নিতেও অসুবিধা হচ্ছে।
কানের পর্দায় একটা শব্দ ঠোকর খেলো। প্রতারণা! ছেলেটার তবে এটাই বলার ছিলো?
“আমারই ভুল। আমি ভেবেছিলাম, আপনি আলাদা। কিন্তু আপনি মোটেও আলাদা না। এতো বড়লোক মানুষ যখন বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে, ফিরিয়ে দিতে পারলেন না। তাই তো? সোনার বালাটাও ঐ জন্যেই খুলে রাখেননি। বুঝলাম।
আমাকে একবার বলতে পারতেন অন্তত। আমি প্রস্তুত হয়ে থাকতাম। জেনে রাখতাম, আপনি আর চাচ্ছেন না, আমি আপনার জীবনে থাকি। আমি পুরোনো হয়ে গেছি, আর ভালো লাগছে না আমাকে, ভালো কাউকে পেয়ে গেছেন।
কিন্তু নাহ! আপনি টাকাওয়ালা বাড়িতে বিয়ে তো অবশ্যই করবেন, তার আগে বাদলকে শেষ করে দিয়ে যাবেন। তাই নাহ? আমাকে এতোটাই ঘৃণা করেন?”
মৌমিতা এখনও মুখটা ডান হাতে চেপে আছে। তার যন্ত্রণার আঁচটুকু যেন ফোনের ঐ পাড়ে না পৌঁছায়। মাথার ভেতরে যেন কেউ অনবরত আঘাত করছে, ভেতরের সবকিছু ছিঁড়ে ফেটে একাকার হয়ে যাচ্ছে। সে তবু টু শব্দটিও করলো না।
বাদল অপেক্ষা করলো কিছুক্ষণ। তারপর কথা বললো, তার গলা ধরে এসেছে, “মৌমিতা, আপনি কি সত্যিই ঘৃণা করেন আমাকে? আমি কি এটা বিশ্বাস করে নেবো? কথা বলছেন না কেন? আজকে অন্তত একটা কথা বলেন। কতোক্ষণ চুপ করে থাকবেন? একবার, অন্তত কিছু বলেন—”
মেয়েটা এবার ছেলেটার গলায় স্পষ্ট দ্বিধা শুনতে পারলো, “একটা প্রশ্ন করি? আপনি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসেন? বলেন একবার। বলেন, ঐ চিঠিতে আপনি মিথ্যা লিখেছেন। বলেন, আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না। একবার বলেন?
এই সাত বছরে কখনও আপনার মুখ থেকে ’ভালোবাসি’ কথাটা শুনি নাই। বারবার শুধু আমিই বলে গেছি। আপনার কাছ থেকে সরাসরি না শুনেও মনে করেছিলাম, আমাদের মাঝে কিছু একতরফা নেই। কখনও শুনতে চাইনি সেজন্য।
আজকে কেবল নিশ্চিত হতে চাই, শুধু একবার বললে কী এমন ক্ষতি হয়ে যাবে?” ছেলেটা বড় একটা শ্বাস ফেলে, “আপনি... কতো সহজে বলে দিলেন, আমাকে ভুলে যাও! এতো সহজ? আপনার কাছে খুব সহজ মনে হয়, তাই না? আপনি বোধহয় সব ভুলেও গেছেন। আমাকে চিনতে পারছেন না। সেজন্য কথাও বলছেন না। আমি তো এখন আপনার কাছে অচেনা মানুষ!”
মৌমিতা খুব সতর্কতার সাথে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। লক্ষ রাখে, বাদল যেন ঘুণাক্ষরেও তা টের না পায়।
“আচ্ছা, বিয়ে করবেন কিনা, ছেড়ে যাবেন কিনা, সব আলাপ বাদ। আপনি অন্তত এটা বলেন... আদৌ আমাকে ভালোবেসেছিলেন কখনো? একটু হলেও? নাকি আমিই বোকার মতো মিথ্যে আশা নিয়ে বসে ছিলাম? সব মিথ্যে ছিলো? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।”
ছেলেটা বিরতি নিলো আবার। তার গলাটা ভেঙে গেছে, উচ্চারিত প্রতিটা শব্দই এমনভাবে কাঁপছে যেন পরবর্তী শব্দটা আর বলতে পারবে না। কিন্তু সে কাঁপা স্বরেই আরেকবার বলে ওঠে, “মৌমিতা... আমি ভিক্ষা চাচ্ছি! আপনাকে ভিক্ষা চাচ্ছি আমি। এখন পর্যন্ত যা-ই ভুল করেছি, সবকিছুর জন্য ক্ষমা চাচ্ছি। আমাকে খালি আর একবার সুযোগ দেন। মৌমিতা? শুনতে পাচ্ছেন?”
ওপাশে খটখট শব্দ হলো। বাদল সত্যি সত্যিই টেলিফোনটা নিরীক্ষা করতে শুরু করে দিয়েছে! হয়তো ভাবছে, কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই তার এই আকুলতা মৌমিতার কানে পৌঁছাচ্ছে না।
সে যদি বুঝতে পারে, সবকিছু শুনেও মেয়েটা চুপ করে আছে, তাহলে কি আরও রাগ করবে? নাকি... হাল ছেড়ে দিবে?
“হ্যালো?” ছেলেটার কণ্ঠ এবার ভয়াবহ রকমের ক্লান্ত শোনালো, “নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি যা ভেবেছি, তার সবকিছুতে আপনি। আপনাকে বাদ দিয়ে নতুন করে কিছু ভাবার শক্তি আমার নাই। আমার অবস্থা কী হবে, একবারও ভাবেননি? আপনি ছাড়া আমার কেউই নাই মৌমিতা। কী করবো আমি? কোথায় যাবো? কিছু একটা তো বলেন... চুপ থাকবেন না, প্লিজ।
আপনার কি সম্বন্ধ ঠিক হয়ে গেছে? আর কিছুই করার নেই? আচ্ছা, আমি কি আসবো? একবার দেখা করবেন? হ্যালো... চুপ করে আছেন কেন?”
আব্বার ঘর থেকে আওয়াজ আসছে। মারুফকে হয়তো এখন ওঠানো হবে।
মৌমিতা শক্ত করে রিসিভারটা ধরে রাখলো। রিসিভার ভেদ করে যদি ঐ মানুষটাকেও ছোঁয়া যেতো। কেবল শব্দের সাহায্যে আর কতোটুকুই বা বোঝানো সম্ভব? পৃথিবীর সব ভাষাই আজ ভীষণ তুচ্ছ মনে হচ্ছে।
“মৌমিতা! মিথ্যে হলেও একবার শুধু বলেন, আপনি আমাকে ভালোবাসেন। নাহলে যে আমার পুরো জীবনটাই মিথ্যা হয়ে যাবে। দেখেন, আমি কতো নির্লজ্জের মতো বারবার শুনতে চাচ্ছি! আপনাকে খালি একটা মিথ্যাই তো বলতে হবে, বেশি কিছু করতে হবে না। এরপর আর কখনোই কিছু চাইবো না আপনার থেকে। শুধু শেষবারের মতো একটা মিথ্যা শুনতে চাচ্ছি, শুধু একটা শব্দই তো...”
টেলিফোনের দুই পাশে নীরবতা নামে। কেউই কোনো কথা বললো না কয়েক মুহূর্ত। উভয়েরই মনে হলো, এভাবেই কেটে গেছে কয়েক যুগ।
বাদল কি কাঁদছে? মৌমিতা জানে না। ছেলেটাকে সে কখনোই কাঁদতে দেখেনি। তার মুখটা দেখার ইচ্ছে করলো খুব। মনে পড়লো, একটা ছবি চেয়ে নেওয়ার কথা ছিলো বাদলের কাছ থেকে। এখন চাইলে কি সে রাজি হবে?
“আমার সাথে কথা বলবেন না? এই কয়টা দিনে আপনার কী হয়ে গেলো? শেষবার যখন দেখা হলো, তখনও তো এরকম কিছু বললেন না। হঠাৎ কী হলো? নাকি আগে থেকেই অন্য কাউকে পছন্দ করে রেখেছিলেন? আপনি জানতেন, বিকল্প খুঁজতে হবে, কারণ বাদল আপনার যোগ্য না। এটাই?”
কথাটা বলতে গিয়ে ছেলেটার কতো যে যন্ত্রণা হলো, তা যেন টেলিফোনের রিসিভার হতে ঠিকরে বেরোলো, মেয়েটার কান ভেদ করে বুকে গিয়ে বিঁধলো।
“আমার সাথে কেন এমন করছেন মৌমিতা? কী হয়েছে আপনার? বলেন না! খালি কারণটা বলেন। হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত কেন? আমি কিছু করেছি? কেউ মানা করেছে আমার সাথে কথা বলতে? একটু কথা বললে কী হয়ে যাবে? আপনি এখন যেটাই বলবেন... আমি মেনে নেবো। সত্যিই। এই শেষবার বলছি।
আমার আর ভালো লাগছে না মৌমিতা। প্লিজ, কিছু তো বলেন। আপনার যা মন চায়, খালি একটা শব্দ হলেও বলেন। এরপর আর কোনোদিন বিরক্ত করবো না।”
মৌমিতা বড় একটা শ্বাস নিলো। এবার তাকে কিছু একটা বলতেই হবে। গলাটা একেবারে শুকিয়ে এসেছে। তবু বলতে হবে। কী বলা যায়?
বলার কিছু কি বাকি আছে? শুধু ঐ একটা শব্দ ছাড়া বাকি সব তো বাদলের জানা। আগে কখনো তা শুনতেও চায়নি ছেলেটা। কোনো বিশেষ দিনের অপেক্ষা করছিলো হয়তো। আজ ছেলেটা ঠিকই অনুমান করতে পারছে, ঐ বিশেষ দিন সম্ভবত কখনোই আসবে না।
তার চেয়েও বড় কথা—আজ বাদলকে কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না। নিজেকে সামান্যতম সক্রিয় দেখানোর সাহস হচ্ছে না। ছেলেটার সাথে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, সেটাই যেন রশির মতো পেঁচিয়ে ধরে আছে মেয়েটার গলা।
বাদল এখনও তাকে আপন ভাবছে। দূরের মানুষের প্রতি কেউ এভাবে ক্ষোভ দেখায় না, অভিমান করে না। কিন্তু মৌমিতা নিজেকে ছেলেটার কাছের মানুষ বলে দাবি করতে পারছে না কেন? তার এমন কেন মনে হচ্ছে, ঐসব দাবিদাওয়ার অধিকার সে হারিয়ে ফেলেছে?
বাদল শীতল স্বরে বলে, “আমাকে আপনি কখনোই ভালোবাসেননি। জানতাম। এতোদিন মানতে পারিনি। আজকে মানলাম।
মৌমিতা খন্দকার? কী ক্ষতি করেছি আমি? খুব বেশিই বিরক্ত করেছিলাম? আমার নিজের ভালো লাগা চাপিয়ে দিয়েছিলাম বুঝি? আমার সাথে এতোগুলো সময় কাটাতে বাধ্য করেছিলাম আপনাকে!
দুঃখিত, আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি নাহয় খারাপই। কিন্তু আপনি কেন অভিনয় করলেন আমার সাথে? খুব দরকার ছিলো? আমার সঙ্গে কী শত্রুতা? ধোঁকা দিলেন কেন? ঐ ডায়েরিটা ফেরত পাওয়ার জন্য?
আচ্ছা! আপনার ডায়েরি আমি ফিরিয়ে দেবো। প্রতারকের কোনো চিহ্ন রাখবো না নিজের কাছে।
আর আপনি যাকে খুশি বিয়ে করেন। ইচ্ছামতো কারও গলায় গিয়ে ঝুলে পড়েন! আপনার জীবন, আপনার সিদ্ধান্ত। আমার আর কিছুই করার নাই।
আমাদের মধ্যে তো কখনো কিছু ছিলোই না, তাই না? থাকেন আপনি আপনার মতো। আমার কিছু যায় আসে না। বাদল আপনাকে ঘৃণা করে। শুনেছেন?” দাঁতে দাঁত চেপে বললো ছেলেটা, “আমি... আপনাকে... ঘৃণা করি!”
ঠক করে একটা শব্দ হলো। তারপর কোথাও যেন কোনো আওয়াজ নেই, একটা অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা চারিদিকে। কেবল দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দটা শোনা যাচ্ছে, স্বাভাবিকের তুলনায় একটু বেশিই কানে লাগছে সেই আওয়াজ।
বাদল ফোন কেটে দেওয়ার বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেছে, মৌমিতা এখনও রিসিভারটা কানের কাছে ধরে রেখেছে। অবশেষে তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়ালো। সে অনেকক্ষণ যাবৎ আটকে রাখা দীর্ঘশ্বাসটা ছেড়ে দেয়। বিড়বিড় করে বলে, “আমি ঐ চিঠিটা না পাঠালে আমাদের আর কথাও হতো না। তুমি একবারও কোনো খোঁজ নিতে না। নিতে?”
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসে না।
“এতোদিন পর... এটা জানানোর জন্যেই এসেছো, যে তুমি আমাকে ঘৃণা করো? তুমি জানোই, সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সুন্দরভাবে শেষ হোক, এটা বাদল চাইবে কেন!”
বাইরে মৃদু বাতাস বইছে। টিনের চালে শব্দ হচ্ছে। রোদও তো উঠেছে। এই শীতের দুপুরে রোদের সাথেই বৃষ্টি নামবে নাকি?
মৌমিতা চোখ মুছলো, “তোমার বয়স, বেকারত্ব, কোনোটাই আমার সমস্যা না। যেটা আমার সমস্যা, সেটা তোমাকে কখনোই বোঝাতে পারিনি। হাজারবার করে বলেছি, তবু... তোমার মধ্যে ম্যাচিউরিটি কোথায় বাদল? কীভাবে ভরসা করবো তোমাকে? আমার তো নিজের একটা জীবন আছে।
জানি, আমি ছাড়া তোমার এতো আপন কেউ নেই। আর তোমার কাছে আমি এর থেকে বেশি আপন, এর থেকে বেশি সস্তা হতে পারবো না। ভালোবাসার চেয়ে তো জেদটাই বড় তোমার কাছে। ওটা নিয়েই থাকো।” সে বড় একটা শ্বাস ফেলে বলে, “আমাকে ভুলে গিয়ে যদি তুমি ভালো থাকতে পারো, তবে আটকে রাখবো কেন? তোমার কথাগুলো আমার মনে থাকবে। সারাজীবন। আমি প্রতারক। আমি বিশ্বাসঘাতক। তুমি আমাকে ঘৃণা করো। ঠিক আছে। ভালো থেকো।”
মৌমিতা রিসিভার রেখে দেয় সাবধানে।
মারুফকে সকালের খাবার খাওয়ানো হয়েছে। মার্জিয়া পানি গরম করতে দিয়েছে। এখনও কিছু খায়নি। বেলা হয়ে যাচ্ছে। সে খাটের কিনারায় চলে এলো, নামতে যাবে, তখনই আপাকে দেখলো।
মৌমিতা একেবারে নিস্তেজ হয়ে ঘরের চৌকাঠে হেলান দেয়। তার ভাবভঙ্গি দেখেই মার্জিয়া উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে, দ্রুত ছুটে কাছে আসে, “আপা! কী হয়েছে? ঠিক আছো তুমি?”
মেয়েটার গাল বেয়ে এখনও অশ্রুর ঝর্ণা বইছে। সে তবু খুব নিষ্ঠুর একটা হাসি আনে ঠোঁটের বাঁকে, ভর্ৎসনার সুরে বলে, “তোর বোন আজ থেকে মুক্ত, স্বাধীন। এখন আমি ইচ্ছামতো যার তার গলায় ঝুলে পড়তে পারবো!”
“কী বলছো এইসব?”
মৌমিতা দুই হাতে গাল মুছে ফেললো। সাথে সাথেই যেন অনেকটা শান্ত হয়ে গেলো সে, “মাথা ধরেছে। একটু ঘুমালেই ঠিক হয়ে যাবে।”
মার্জিয়া সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকায়, নরম গলায় বলে, “চা খাবা?”
“দে।”
সে আর দেরি করলো না। রান্নাঘরের দিকে ছুট দিলো।
টলতে টলতে বিছানায় গিয়ে বসলো মৌমিতা। কাত হয়ে শুয়ে পড়লো। চোখ বুজতেই কিছু পুরোনো স্মৃতি ভেসে উঠলো মানসপটে। বাদলের মুখাবয়ব আবছা দেখা গেলো। চোখের পাতা আরও দৃঢ়ভাবে জোর দিয়ে বন্ধ করলো মেয়েটা। ঐ মুখটা না দেখা অবধি সে শান্তি পাবে না। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও মনের মাঝে তার স্পষ্ট কোনো ছবি তৈরি করা সম্ভব হলো না। কেবল একের পর এক ব্যর্থ প্রয়াস চলতে থাকলো।
—————
মৌমিতা চোখ খুলেই দেখলো, শিয়রের কাছে আম্মা দাঁড়িয়ে আছেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে অনেক বেলা হয়ে গেছে। বাহিরটা আলোকিত, বেশ কড়া রোদ উঠেছে। সে নিজেও টের পায়নি, কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলো।
“আজকে সকালে যে কিছুই খেলে না মা। দুপুর হয়ে গেলো। এভাবে চলতে থাকলে কিন্তু আরও অসুস্থ হয়ে যাবা। এমনিতে রক্ত কমে গেছে, শরীরটা একদম ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। এখানে ভাত এনে দেবো?”
মেয়েটা কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে বসলো, ডানে-বামে মাথা নাড়লো, “না। ডাইনিংয়েই যাচ্ছি।”
“আচ্ছা।” রাবেয়া মেয়ের কপালে আলতো চুমু খেয়ে বললেন, “নিজের কথা সবার আগে ভাবতে হবে। বুঝেছো?”
“হুম।”
“কালকে শাহানা আপারা আসবেন। সুজয়সহ। সুজয়ের বাবাও আসবেন।”
ভ্রু কুঁচকে আম্মার দিকে তাকায় মৌমিতা, “কেন?”
“তোমার আব্বাকে দেখতে আসবেন। আর তোমার সাথেও কথা বলবেন।”
“ও।”
“আসো। ভাত দিচ্ছি।”
রাবেয়া বেরিয়ে যেতেই মৌমিতা উঠে দাঁড়ালো। খাওয়ার ঘরে না গিয়ে সোজা মারুফের ঘরে গিয়ে ঢুকলো সে। ধীরপায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেলো। কোমল স্বরে ডাকলো, “আব্বা?”
মারুফ জানালা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। তার ঠোঁটজোড়া কেঁপে উঠলো। কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না।
মৌমিতা আব্বার পায়ের কাছে বসে পড়লো। অসহায়ের মতো তার ব্যাধিগ্রস্ত দেহটাতে চোখ বুলিয়ে নিলো। মাংসপেশি শুকিয়ে এসেছে।
এই পা দ্বারা আর কোনোদিন হাঁটাচলা করা সম্ভব? আব্বা আর আগের মতো হাঁটবেন না, কথা বলবেন না—এসব মেনে নেয়া যে আরও অসম্ভব।
“মৌ? খেতে আসো।”
মৌমিতা উঠে দাঁড়ালো। মারুফের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, “খেয়ে আসি আব্বা।”
ভদ্রলোক মলিন হেসে মাথা নাড়লেন। তার শরীর থেকে আজকাল নবজাতকের মতো একটা সুবাস আসে। কার্যকলাপগুলোও অবুঝ শিশুদের মতো। তাই হয়তো সারাক্ষণ এই মানুষটার আশেপাশে থাকতে ইচ্ছে করে।
মৌমিতা ছোট একটা শ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
টেবিলের উপর গরম ভাতের থালা। রাবেয়া তরকারিসহ সবকিছু প্রস্তুত করে দিয়ে গেছেন।
মেয়েটা হাত ধুয়ে চেয়ার টেনে বসে পড়লো। মাথা ঘুরিয়ে একবার দেয়ালঘড়ির দিকে তাকালো। পৌনে দুইটা বাজে। ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটা টিকটিক শব্দে ঘুরে চলেছে।
ঘণ্টাখানেক আগে খুব বিশেষ একজন মানুষের গলার স্বরটা সে অনেকদিন পর শুনেছে। এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না, তার সাথে কথা হয়েছে। অবশ্য এটাকে কথা হওয়া বলে না। বাদল একাই বকবক করে গেছে।
গরম ভাত মেখে নিজের মুখে তুলে নিলো মৌমিতা। খাবারটা বেশ বিস্বাদ মনে হলো। তবু অসুবিধা হলো না। খালি পেটে সবই তৃপ্তি করে খাওয়া যায়। সেখানে তো আম্মার রান্নার হাত ভীষণ ভালো।
রান্নার প্রসঙ্গ আসতেই একটা কথা মনে পড়ে গেলো তার।
“ছেলে মানুষ রান্না শিখে কী করবে? ওটা মেয়েদের কাজ।”
২-৩ বছর আগে এই কথাটা যে বলেছিলো, সেই মানুষটা কিছুক্ষণ আগে নিজের কাঁধে রান্নাবান্নার দায়িত্ব তুলে নিতে চেয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য গৃহস্থালির কাজ করার প্রতিশ্রুতি জানিয়েছে। বিনিময়ে শুধু একটা জিনিসই চেয়েছে।
মৌমিতা যতোই অস্বীকার করুক, এতো দিন পর বাদলের কণ্ঠটুকুই তার অন্তরের অলিগলিতে মারাত্মক ঝড় তুলে দিয়েছে। সব বেসামাল করে দিয়েছে।
হঠাৎ করেই নিজের চুপ থাকাটাকে শতভাগ ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে হলো মেয়েটার কাছে। সে খুব ভালোভাবেই জানে, বাদলের জায়গাটা কাউকে দেয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু নিজ হাতে সবটাই শেষ করে দিয়েছে মৌমিতা। এতোক্ষণে উপলব্ধি করছে, সে আসলে কী হারিয়ে ফেলেছে।
বাদল তো চেষ্টা করেছিলো। এটাই কি বড় কথা নয়? আর চিঠিটা... ঝোঁকের মাথায় পাঠানো হয়েছিলো!
অস্থিরতায় মৌমিতার গলায় খাবার আটকে গেলো। সে কয়েক ঢোক পানি গিলে চুপচাপ বসে রইলো।
ছেলেটার উচ্চারিত প্রতিটা শব্দ কানের কাছে প্রতিধ্বনিত হলো বারবার। হৃদয়টা নতুন করে ক্ষতবিক্ষত হতে লাগলো।
মনটা কু ডাকছে।
বাদল এতোবার অনুরোধ করেছে। নিজেকে বদলে ফেলতে চেয়েছে। ভিক্ষা চাইতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। কিছুই বাকি রাখেনি। সব প্রচেষ্টা বিফলে যাওয়ার পর সে বলেছে, “ঘৃণা করি!”
মৌমিতার হাত কেঁপে উঠলো।
ছেলেটা নিজের পুরো আত্মসম্মানটুকু সুন্দরভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে মেয়েটার পায়ে অর্ঘ্য স্বরূপ নিবেদন করেছে। অথচ মেয়েটা করেছে উল্টো!
বাদলের আর সত্যিই কিছু করার নেই। তার কাছে যতো রকমের হাতিয়ার ছিলো, সব প্রয়োগ করা শেষ। এবার যদি তার মাথায় বাকিটুকুও শেষ করে দেয়ার চিন্তাভাবনা আসে?
মৌমিতা উঠে দাঁড়ালো। গলা দিয়ে আর খাবার নামবে না। বাদলের সাথে দেখা করতে হবে একবার হলেও। সে এখন নাটোরেই আছে। চিঠিটা যেহেতু পৌঁছে গেছে, মেসে গেলেই হয়তো তাকে পাওয়া যাবে। কিন্তু!
মেয়েটা চেয়ারের উপর হাত রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
ছেলেটা ডায়েরি ফেরত দিতে চেয়েছে—এটা মনে পড়তেই সমস্ত শরীর খিচখিচ করতে লাগলো। ঐ ডায়েরির প্রতি বাদলের আসক্তি সম্পর্কে মৌমিতা ভালোভাবেই অবগত। এটা যখন ফেরত দিতে চেয়েছে, তবে কি সে সত্যিই... ঘৃণা করে? সত্যিই আর কোনো চিহ্ন রাখতে চায় না? ঐ চোখদুটোতে যদি ঘৃণা দেখতে হয়, মৌমিতার পৃথিবী ওলটপালট হয়ে যেতে সময় লাগবে না।
বাদলের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা নেই। কিন্তু দেখা করাটাও জরুরি হয়ে গেছে।
মৌমিতা নিজেকে স্থির করলো। সে কোনোমতেই চায় না বাদল তাকে ঘৃণা করুক। তবে এই মুহূর্তে ডায়েরি ফেরত পাওয়ার ভাবনাটাই সবচেয়ে ইতিবাচক মনে হলো।
কেবলমাত্র বাদল যদি ডায়েরিটা ফেরত দিতে আসে, তাকে সব বুঝিয়ে বলা যাবে। তাকে বলা যাবে—কেন এই সিদ্ধান্ত, কেন ঐ চিঠিটা পাঠানো হয়েছিলো। ছেলেটা বুঝবে? তার কষ্ট তো আর লাঘব হবে না। সে যা চেয়েছে, তা তো মৌমিতা দিতে পারবে না। আর কিছু যখন দেওয়ারই নেই, তখন বোঝাপড়ার পরিকল্পনা করেই বা লাভ কী?
এ মুহূর্তে ডায়েরিটা পাওয়া মানে বাদলের ঘৃণার স্বীকৃতি। তবু মেয়েটা মনেপ্রাণে চাইলো, বাদল যেন তা ফেরত দেয়। শুধু এই একটা উপায়ই বাকি আছে, যেটার মাধ্যমে ছেলেটা নিজ থেকেই দেখা করতে আসতে পারে। তারপর নাহয় বাকিটা দেখা যাবে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………