পবনপত্র - পর্ব ৫১ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          আকাশটা ছেয়ে গেছে মেঘে। সূর্যটাও ঢেকে গেছে। পাশাপাশি ঠাণ্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে। রোদ নেই। তবু একটা চোখ ধাঁধানো আলো বাইরে। আর ঘরের ভেতরে হাওয়ায় ভেসে চলেছে একটা প্রশ্ন, “বাদল বলতে কি আসলেই কেউ ছিলো?”

সরু চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন মৌমিতা, “তোমার বিশ্বাস হয় না?”

সুস্মিতা মাথা নাড়লো, “না মানে, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। তোমার জীবনে অন্য কেউ ছিলো, এভাবে চলে গেছে। তবুও... কতো সহজে মানিয়ে নিয়েছো...”

“সহজ না। কঠিনই। আর এতো কঠিন বলেই তো আমাকে পাথর মনে হয়েছে তোমার কাছে, নিজের মেয়ের কাছে!”

“হ্যাঁ, কিন্তু... বুঝতে পেরেছি। আমার তাও বিশ্বাস হচ্ছে না।”

“বিশ্বাস করার দরকার নেই!”

“তুমি পরিষ্কার করে বলছো না কেন? হ্যাঁ–না, কিছু একটা বলো।”

মৌমিতা হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন, “প্রমাণ দেখতে চাও?”

সুস্মিতা ভ্রু কুঁচকায়, “মানে!”

তিনি উঠে দাঁড়ালেন। ড্রেসিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। আঁচলে বাঁধা চাবির গোছা ঝনঝন করে উঠলো। সেখানকার একটা চাবি দিয়ে উপরের ড্রয়ারটা খুললেন মৌমিতা। কিছু একটা খুঁজতে লাগলেন। ভেতরে হাতড়াতে হাতড়াতে তামাটে রঙের বড় চাবিটা বের করলেন। ড্রয়ার বন্ধ করে পুরোনো কাঠের আলমারিটার দিকে এগিয়ে গেলেন।

সুস্মিতা বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। কিছুটা বিস্ময়, কিছুটা অবিশ্বাস নিয়ে। আম্মু তবে আলমারির বামপাশটা সত্যিই খুলবেন এবার!

মৌমিতা সামনে গিয়েও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। গত ১৬ বছরে এই দ্বার খোলা হয়নি। ভেতরের অবস্থা এখনও অজানা। জিনিসপত্রগুলো অক্ষত আছে কিনা, উইপোকা খেয়ে ফেলেছে কিনা—এমন অনেক চিন্তাই ভর করলো তার মাথায়। তিনি দুরুদুরু বুকে চাবি ঘোরালেন। খট করে শব্দ হলো।
কপাট খুলতেই দেখা মিললো ধূলোর পুরু আস্তরণ আর মাকড়শার জালের। তিনি নাক-মুখ ঢেকে কেশে উঠলেন।

সব জিনিসপত্র একটা চাদর দিয়ে ঢাকা। চাদর সরিয়ে মৌমিতা একটা কাপড়ের ব্যাগ বের করলেন নিচ থেকে। তারপর ঘুরে দাঁড়ালেন। মেয়ের কাছে এসে তার দিকে এগিয়ে দিলেন জিনিসটা—ভাঁজ করে রাখা পুরোনো একটা পত্রিকা, হলদেটে হয়ে গেছে।

“ভাঁজ খোলো। থার্ড পেইজটা দেখো।”

মায়ের কথামতো সাবধানে ভাঁজ খুললো সুস্মিতা। তৃতীয় পৃষ্ঠার শিরোনামটার দিকে তাকালো। ‘মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত চার...’
পুরোটা পড়ার দরকার হলো না। চোখ নামাতেই দুটো অচেনা মুখ দেখা গেলো।
একজন বয়স্ক ব্যক্তি। পাশেরজন তরুণ, মুখে অস্পষ্ট একটা হাসি। পত্রিকার লেখাগুলোর পাশাপাশি ছবিদুটোও ঝাপসা, কালি উঠে গেছে।
সুস্মিতা নিচের নামগুলোতে চোখ বুলিয়ে আবার ছেলেটার ছবির দিকে তাকায়। চোখ ভিজে ওঠে অকারণেই।

মৌমিতা সামনে এসে বসলেন। বড় একটা অ্যালবাম রাখলেন মাদুরের উপর, “এটাও দেখো। এখানে অনেক পুরাতন ছবি আছে।”

সুস্মিতা চোখ মুছলো। অ্যালবামটা তুলে কোলের উপর রাখলো। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে অভিমানের সুরে বললো, “তুমি না বলেছিলে, তোমাদের বিয়ের কোনো ছবি নেই তোমার কাছে?”

“এমনি বলেছি!”

“এই ছবিগুলো আলমারিতে কেন রেখেছো?”

মৌমিতা গম্ভীর হলেন, “ঐ আরকি... আমার বিয়ের পরের দিনই তো আব্বা মারা গেলেন। দিনগুলোর কথা মনে পড়লেই খারাপ লাগতো। সবারই ছবি আছে অ্যালবামে। আর সেই সময় আব্বার চেহারা এতো খারাপ হয়ে গিয়েছিলো... এগুলো দেখলেই আমার মাথা খারাপ হয়ে যেতো। এমনিতেও আমি শারীরিক, মানসিকভাবে খুবই অসুস্থ ছিলাম।
সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। তোমার আব্বু অনেককিছু করেছে আমাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য। কিছুই কাজে লাগছিলো না। অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছিলো। রাতের বেলা খারাপ স্বপ্ন দেখতাম, ঘুমাতে পারতাম না। পুরাতন ছবি বের করে আব্বাকে দেখতাম, কান্নাকাটি করতাম।

তোমার দাদি বলেছিলেন, এই জিনিসগুলো কোথাও সরিয়ে রাখতে। যেন নাগালের বাইরে থাকে। আমি ওনার কথা শুনলাম না। কারও কথাই শুনতাম না বলতে গেলে। কাউকে এগুলো ধরতে দিতাম না।
কিন্তু... যখন তোমার ভাইটা মারা গেলো, তখন বুঝলাম, আমাকে সব ভুলে যেতে হবে। নাহলে বেঁচে থাকা মুশকিল হয়ে যাবে। পরপর এতো গুলো মৃত্যু মেনে নিতে পারছিলাম না।
আমি ঐ সময়েই পুরাতন সব জিনিস আলমারিতে রেখে তালা দিয়েছি।
অবশ্য মাঝে মাঝেই হাত নিশপিশ করতো খুলে দেখার জন্য!”

সুস্মিতা অ্যালবামের দিকে তাকিয়েই বললো, “এটাতে তো অনেক পুরাতন ছবিও আছে।”

“হ্যাঁ। বিয়ের আগের ছবি আছে কয়েকটা। এখানে তোমার দাদাবাড়ির ছবিই বেশি।”

“এটা নানাভাই, তাই না?”

মৌমিতা ওদিকে তাকালেন, মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ। তখন আব্বা সুস্থ। আমি অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে, তখনকার ছবি।”

মেয়েটা চেয়ে রইলো। ছবিতে তার আম্মুর পরিবার। নানা-নানি সোফায় বসে আছেন। পেছনে দাঁড়িয়ে আছে মৌমিতা, আর মার্জিয়া।

“সবাই ঠিকই বলে আম্মু। তুমি একদম তোমার আব্বুর মতো দেখতে।”

“হুম।”

“তুমি বিয়ের আগে এত্তো সুন্দর ছিলে!” মায়ের একটা পুরোনো ছবির দিকে তাকিয়ে সুস্মিতা মুগ্ধ হয়ে বললো, “তোমাকে শাড়িতে অনেক সুন্দর লাগে। এখনও লাগে। কিন্তু এই ছবিটাতে একদম অন্যরকম লাগছে। ইচ্ছা করছে তাকিয়েই থাকি। আমার আম্মুটা কতো সুন্দর—”

“হয়েছে!”

“সত্যিই। দারুণ দেখাচ্ছে। এজন্যই তো একজন রীতিমতো লাফালাফি করতো, তোমাকে শাড়িতে দেখার জন্য!”

মৌমিতা রাগ দেখাতে গিয়ে হেসে ফেললেন। ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “অতো লাফিয়েছে বলেই দেখার সুযোগ পায়নি।”

“আচ্ছা, আব্বু কি জানে যে আলমারিতে এগুলো আছে?”

“হ্যাঁ। জানে।”

“নিউজ পেপারটার কথা জানে?”

“না।” মৌমিতা ডানে-বামে মাথা দোলালেন, “জেনে কী হবে? এতোদিন তো তালা দেয়া ছিলো। প্রায় ষোলো বছর পর দেখলাম।”

“এতোদিনে দেখার ইচ্ছে হয়নি একবারও?”

তিনি এবার বিরক্ত হলেন, ভ্রু কুঁচকে বললেন, “ইশ! কতো বেলা হয়ে গেছে। যাও, গোসল করে নামাজ পড়ো। আমারও অনেক কাজ পড়ে আছে। ইফতারের কিছুই রেডি করিনি।” হাত বাড়িয়ে অ্যালবামটা চাইলেন তিনি, “ওগুলো আমাকে দাও। রেখে দিচ্ছি।”

সুস্মিতা বায়না করলো, “আম্মু, আমি কয়েকটা ছবি নিয়ে রাখি?”

“কী হবে ঐ ছবি দিয়ে?”

“প্লিজ আম্মু। তোমার আগের ছবি আমি কখনোই দেখিনি। আর বিয়ের ছবিগুলোও। শুধু কয়েকটা নেবো। এমনিতে তো দেখতে পারবো না। আলমারি তালা দেওয়া থাকে।”

“আমার হাতে একদমই সময় নেই সুস্মিতা।”

"তুমি নাহয় যাও। আমার কাজ হয়ে গেলে আমি জায়গামতো রেখে দেবো।”

মৌমিতা হাল ছেড়ে দিলেন, “আচ্ছা। ওখানে একটা কাপড়ের ব্যাগ আছে, ওটার ভেতরে রেখে দিও। আর ঐ যে চাবি।”

তিনি চটপট উঠে চলে গেলেন।
সুস্মিতা মন দিয়ে অ্যালবাম থেকে ছবি বের করতে লাগলো। সে ভেবে রেখেছে, আম্মু-আব্বুর এই সুন্দর ছবিগুলো নিজের ডায়েরিতে লাগিয়ে রাখবে। ডায়েরিটা হয়তো এখন লেখার কাজে লাগবে না আর। নিজের না বলা কথাগুলো ভাগাভাগি করে নেয়ার মতো একজন মানুষ পেয়ে গেছে সে। সে জেনে গেছে, আম্মুর ঐ পাথুরে চেহারার আড়ালে খুব চমৎকার একজন মানুষ রয়েছেন।

মেয়েটা এটাও উপলব্ধি করলো—বাদলের সঙ্গে পরিচয়ের পর মৌমিতার আর ডায়েরির প্রয়োজন হয়নি কেন।
ছেলেটা নিজেই জীবন্ত একখানা ডায়েরি হয়ে উঠেছিলো। তথাকথিত বখে যাওয়া একটা মানুষ কিনা চুপচাপ, অসামাজিক আর শান্ত স্বভাবের মেয়েটার সবচেয়ে ভরসার স্থল হয়ে উঠেছিলো! কী অদ্ভুত ব্যাপার!

ছবিগুলো ভালোভাবে গুছিয়ে বিছানার উপর রাখলো সুস্মিতা। অ্যালবামটা বন্ধ করলো। মাদুরের উপর থেকে সযত্নে তুলে নিলো পুরোনো খবরের কাগজটা। এক পলক তাকালো ছেলেটার দিকে। ফ্যানের বাতাসে পত্রিকার পাতাগুলো বারবার এলোমেলো হয়ে যেতে চাইলো, মেয়েটা সতর্কতার সাথে সেটা ভাঁজ করে ফেললো।
আলমারি থেকে কাপড়ের ব্যাগটা বের করলো। ব্যাগের ভেতরে আরেকটা জিনিস দেখলো সে। খবরের কাগজে মোড়ানো... আম্মুর ডায়েরি! সুস্মিতা অভিভূত হয়ে জিনিসটা বের করলো।

আম্মু তাহলে ডায়েরিটা আর খোলার সাহস পাননি, ওভাবেই রেখেছেন।
এই ডায়েরির মাধ্যমেই তো একজন ব্যক্তি ঝড়ের মতো এসেছিলো তার জীবনে, আবার ঝড়ের মতো বিদায় নিয়েছে। মৌমিতা হয়তো আবার ঐ ঝড়ের মুখোমুখি হতে চাননি।

তবে মৌমিতার মেয়েটার ভীষণ কৌতূহল হলো। তার শরীরেও যে খন্দকার বংশের রক্ত বইছে!
সে অ্যালবামটা খাটের উপর রাখলো। বাইরে উঁকি দিয়ে দেখলো একবার। আম্মু হয়তো গোসলে গেছেন। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত তাকে দেখা গেলো না।

সুস্মিতা একটা স্বস্তির শ্বাস ফেললো। ডায়েরির উপর থেকে পত্রিকার আবরণটা এমনভাবে সরালো যেন আবার আগের মতো করে ঢেকে দেয়া যায়।
প্রথম পাতাতেই একটা লেখা পেয়ে গেলো, “খবরদার, পড়বেন না!”

কাঁপা কাঁপা একটা শ্বাস ফেললো সে। আম্মু তখনও বাম হাতে লিখতেন, এখনও লেখেন। লেখা তবু অনেকখানি পাল্টে গেছে। সুস্মিতা পৃষ্ঠা ওল্টানোর চেষ্টা করলো, পাতাগুলো কেমন যেন লেগে লেগে আছে। ডায়েরির ভেতর থেকে হঠাৎ ঝুপ করে কিছু পড়ে গেলো মেঝেতে। একটা ভাঁজ করা কাগজ।
মেয়েটা সেটাকে হাতে তুলে নিলো। ভ্রু কুঁচকে খানিকক্ষণ চেয়ে থাকার পর তার সমস্ত শরীর শিউরে উঠলো।
একটা চিঠি? এই কাগজটা কি ডায়েরিতে আগে থেকেই ছিলো, নাকি...

মেয়েটা সটান দাঁড়িয়ে দরজার দিকে তাকালো। যান্ত্রিক ভঙ্গিতে সব জিনিস গুছিয়ে রেখে কাপড়ের ব্যাগটাতে ঢোকালো। দায়িত্ব সহকারে বন্ধ করলো আলমারিটা। চাবি রেখে দিলো ড্রয়ারে।
তারপর অ্যালবাম থেকে তুলে নেয়া কয়েকটা ছবি আর ডায়েরি থেকে পাওয়া কাগজটা নিয়ে চুপচাপ নিজের ঘরে ফিরে এলো।

মৌমিতা ততোক্ষণে গোসল সেরে বেরিয়েছেন। তিনি দরজার সামনে এসে মেয়েকে নির্দেশ দিলেন, “সুস্মিতা? গোসল করো। তোমার গায়ের জামাটা ঘেমে একেবারে ভিজে গেছে।”

সুস্মিতা মাথা নাড়লো। কাগজটাকে নিজের স্কুল ব্যাগের উপরের পকেটে রেখে গোসলে গেলো।
মাথায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ঘুরছে। ডায়েরির ভেতরে কাগজটা কি মৌমিতাই রেখেছিলেন? রেখেছিলেন হয়তো। এমন হতেই পারে, গোলাপের পাপড়ির মতো এটাও রাখা ছিলো। বাদল হয়তো সরায়নি।

কাগজটা নিয়ে মেয়েটার ভীষণ কৌতূহল হচ্ছে। কিন্তু সে তাড়াহুড়ো করলো না। আম্মু জানলে আবার রাগ করতে পারেন। তাই একটা সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করাই শ্রেয়।

—————

এখনও আসরের আজান দেয়নি। বাহিরটা তবু অন্ধকার হয়ে এসেছে। কিছুক্ষণ আগেও যে ভ্যাপসা গরমটা ছিলো, তা এখন আর নেই। জানালা খোলা। ঘরটা শীতল বাতাসে ভরে উঠেছে। পর্যাপ্ত আলো নেই। দিনের বেলা বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালাতে সুস্মিতার ভালো লাগে না। সে জানালার পর্দাটা আরও ভালোভাবে সরিয়ে দিলো। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।

এমন আবহাওয়ায় নানাবাড়ির কথা খুব মনে পড়ে। আজ একটু বেশিই মনে পড়লো।

মেয়েটা ঘরের ছিটকিনি লাগিয়ে খাটে উঠে বসলো। ব্যাগ থেকে কাগজটা বের করলো। উল্টেপাল্টে দেখলো একবার।
সে হঠাৎ করেই উপলব্ধি করলো, সাংঘাতিক কিছু ঘটে গেছে। যেটা মৌমিতা বলেননি তাকে। কিংবা হয়তো নিজেই জানতে পারেননি!

সুস্মিতা নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে নেয়। কাঁপা হাতে খুব সাবধানে চিঠির ভাঁজ খোলে। এতো বছর ধরে একভাবে পড়ে থাকায় কাগজটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। সে ছোট নিঃশ্বাস ফেলে চিঠিটাকে ভালো করে দেখে।

কাগজের এপাশ-ওপাশ মিলে, চার পৃষ্ঠা জুড়ে লেখা বিশাল চিঠি। ছোট ছোট অক্ষরে ঠাসা।
প্রথম লাইনে হয়তো ‘প্রিয় মৌমিতা’ লিখেছিলো এই চিঠির প্রেরক। পরে ‘প্রিয়’ শব্দটা কেটে দিয়েছে। কিন্তু কলমের কালির আড়ালে জ্বলজ্বল করছে ঐ শব্দ।
কালিগুলো লেপ্টে গেছে কাগজের কিছু জায়গায়, একটু ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু লেখা স্পষ্ট, একটুখানিও মুছে যায়নি। কেবল কারও চোখে পড়ার অপেক্ষায় ছিলো যেন। এতো দীর্ঘ সময়ও লেখাগুলোকে মলিন করতে পারেনি। কতোটা মমতা দিয়ে লিখলে কলমের কালির কাছে সময় হেরে যায়!

“মৌমিতা,

ভেবেছিলাম আপনার সাথে আর কখনোই কথা বলব না। যোগাযোগ করব না। কিন্তু আমাদের কথা এখনও শেষ হয়নি। আপনার নিশ্চয়ই আর ইচ্ছে নেই যোগাযোগ করার। কিন্তু আমার অনেককিছুই বলার আছে। আমাকে এমনিতেও অনেক ভুল বুঝেছেন আপনি। আর চুপ করে থাকতে পারছি না।

আপনি নিজের উপর কোনো রাগ রাখবেন না। যা ঘটেছে, তাতে আপনার দোষ নেই। তবু অকারণে কষ্ট পাবেন কেন? নিজেকে যেন আর কখনোই ঘৃণা করবেন না, অনুরোধ রইল। আপনি কোনো ভুল করেননি। আমি করেছি। আর আমি অনুতপ্ত। মিথ্যে বলছি না, সত্যিই আমার খুব খারাপ লাগছে।

কেবল আমি চাইলেই আমাদের জীবনটা রঙিন হতে পারত। কিন্তু আমি ঝুঁকি নিতে চাইলাম। আমাদের জীবন সাদা কালোই থেকে গেল। আমি জোর করে আপনার জীবনে ঢুকে পড়লাম। আপনার সাজানো গোছানো পৃথিবীটা নষ্ট করে দিলাম। আজ প্রথমবার মনে হচ্ছে, আমাদের রাস্তা শুরু থেকে আলাদা হলেই বুঝি ভালো হত। সে প্রসঙ্গে আর না যাই।

আমি নিজেকে কোনোদিনই আপনার থেকে দূরে সরিয়ে নিতে পারতাম না। আপনি নিজেও হয়ত জানেন এটা। আপনার উপরে অজান্তেই এত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। জানি না এই অভ্যেস কবে কাটবে। আদৌ‌ কাটবে কিনা। কয়েকটা দিন আগেও আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতাম, এই দুনিয়ায় আমার নিজের একটা মানুষ আছে।

কিন্তু সত্যি বলতে, সেদিন একজন বাবার সামনে দাঁড়িয়ে, একজন প্রেমিক পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। আপনাকেও জানানো উচিত, বাদল নয়, এই পৃথিবীতে আপনার সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী মারুফ খন্দকার।
আপনার বাবা সেদিন বলেছিলেন, আমাকে বিয়ে করলে আপনি কোনো নির্ভরযোগ্য অভিভাবক হয়ত পাবেন না। এই নিষ্ঠুর বাস্তব কথাটা শুনেও আমি জেদ ছাড়িনি। নিজের সাথেই বাজি ধরেছিলাম, শেষমেশ আমি আপনাকে ঠিকই পেয়ে যাব।
তখন আপনার আব্বা নিজের প্রাক্তনের কথাও বললেন আমাকে। বললেন, এত বছর পর আপনার অবস্থা দেখে তিনি নিজের প্রাক্তনকে ক্ষমা করতে পেরেছেন। আমার মধ্যে নাকি তিনি নিজেকে খুঁজে পেয়েছিলেন।
আমাকে বললেন, মৌমিতাকে তুমি একবার আমার চোখে দেখো। প্রেমিকা না, সন্তানের মত করে দেখো।
তিনি প্রকৃতপক্ষেই আপনার ভালো চেয়েছেন। আমি তো সেটা চাইনি। আমি শুধু আপনাকে চেয়েছি।

বাবাকে ডাকতে না পারার যন্ত্রণা আমি বুঝি। তিনি জীবিত আছেন, তবু কত বছর হয়ে গেল তার মুখটাও দেখিনি। আমি তাকে কখনোই তেমন পছন্দ করতাম না। তবু দেখতে ইচ্ছে করে, ডাকতে ইচ্ছে করে।
ভয় লাগছিল, একটা ভুলের কারণে যদি আপনার অবস্থাও আমার মত হয়। যদি আপনার আব্বাও আপনার থেকে দূরে সরে যান।
কেউ না জানুক, বাদল জানে, আপনি আপনার আব্বাকে অনেক ভালোবাসেন।

আমার বড় বোনের কথা বলেছিলাম, মনে আছে? সে ভালোবেসে পালিয়ে বিয়ে করেছিল এক বেকার লোককে। তিনি ব্যবসা করেন, চাকরি হয়নি। আপা এখনও তাকে ভালোবাসে। তবু তাদের সংসারে শান্তি নেই। ধীরে ধীরে অদ্ভুত একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। আমি ঐ লোকের দোষ পাইনি, আপারও দোষ পাইনি। হয়ত কারও অভিশাপের ফল।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, এক সময় সবাই মেনে নেবে। সব ঠিক হয়ে যাবে। অথচ এই ঝুঁকিটা নেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না।
হাজারটা ঝড়-বৃষ্টিতে নিজেকে ক্ষয় করে যে মানুষগুলো আমাদেরকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন, দুইদিনের অনিশ্চিত আবেগের জন্য তাদের সাথেই যদি প্রতারণা করি, তাহলে শান্তি থাকবেই বা কীভাবে?

এতকিছু জানার পরে, বোঝার পরেও আমি আপনার বাবাকে বলেছি যে আপনার মেয়ে ডাকলেই আমি চলে আসব, তখন কেউ আটকাতে পারবে না। আমার জেদ এটাই ছিল, যে যা-ই বলুক।
জানি না কেন এমন মনে হচ্ছিল, আপনি বাকিদের মত করবেন না। আমার পরিবারের মত করে ফেলে যাবেন না আমাকে। আমারই থাকবেন আপনি।

তবে আপনার আব্বার সাথে কথা হওয়ার পর নিজেকে একেবারে গুটিয়ে নিয়েছিলাম। খুব হীনমন্যতায় ছিলাম। যখন হুঁশ ফিরল, আপনার সাথে কথা বলার সবরকম চেষ্টা করলাম। হন্যে হয়ে খুঁজেছি আপনাকে। আপনার বাড়িতেও গিয়েছিলাম কয়েকবার। প্রতিবার দেখি, দরজায় তালা।
শেষবার যখন গেলাম, এক প্রতিবেশী ভাই জানালেন, আপনারা বাড়িতে নেই। কথা বলার সময় তিনি এমনভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন, যেন আমি বড় কোনো পাপ করে ফেলেছি।
এটা হয়ত কোনো গুরুতর বিষয় নয়। সমাজের লোক কী ভাবল, কী বলল—এসব নিয়ে আমার কখনোই মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু এবার কী যেন হয়ে গেল। আমার মধ্যে যতটুকু সাহস আর বিশ্বাস ছিল, সেটাও হারিয়ে ফেলেছিলাম ঐ ঘটনার পর। জিজ্ঞাসাও করতে পারিনি আপনি কোথায় গেছেন, কী কারণে গেছেন।

এরপর তো খাওয়া দাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছিলাম। ঘুম আসত না। ঐ কয়টা দিন যে আমার কীভাবে কেটেছে, যদি বুঝাতে পারতাম! অনেক প্রার্থনা করেছি, যেন একটা চমৎকার হয়ে যায়। আপনাকে ছাড়া যেন আমাকে বাঁচতে না হয়।

অবশেষে আপনার চিঠি পেলাম। সবসময় আপনার থেকে বড় বড় চিঠি পাওয়াটা আমার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গতকাল পাঠানো অল্প শব্দের ঐ চিঠিটাই যথেষ্ট ছিল বাদলকে তার আসল অবস্থান বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য।

আমি নিজেকে বাড়াবাড়ি রকমের যোগ্য মনে করছিলাম। আপনি বুঝিয়ে দিলেন, আমার যোগ্যতা আসলে কতটুকু। আমি কখনোই যোগ্য ছিলাম না। আপনি হয়ত একটু করুণা দেখিয়েছিলেন আমাকে, আমি সেটাকেই আরও বড় কিছু ভেবে ফেলেছি। বাস্তবতা মেনে নেওয়া এত সহজ ছিল না আমার জন্য। বিবেক বুদ্ধি আমার এমনিতেও নেই। যতটুকু আছে, সেটাও হারিয়ে ফেলেছিলাম।
আপনি ঠিকই বলেছিলেন, স্বার্থপর মানুষেরাই ভালোবাসে। আমি শুধু জানতাম, আপনাকে আমার খুব দরকার। আপনার যে আমাকে দরকার নেই, এটা বুঝিনি কখনো।

এমন না যে এখন খুব ভালো আছি। আপনার চিঠি এসে পৌঁছানোর আগে আমার সময় কাটছিল না। চিঠি পাওয়ার পরেও তেমনই মনে হচ্ছে। এখন আমার হাতে অফুরন্ত সময়।

যশোরে চাকরির একটা সাক্ষাৎকার দিয়েছি, বললাম না? ঐ চাকরিটাও আমার হবে না। কোনো প্রস্তুতি ছিল না। কোথাও মন বসছিল না। আপনার চিঠি পাওয়ার আগ পর্যন্ত এটা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। কিন্তু এখন আর কোনো চিন্তা নেই। ঐ চাকরি দিয়ে আমি কী করব? আমার আর কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। যা চেয়েছি, তা তো আর পাব না কখনোই।

আমি আসলেই কোনো কাজের না। এমনিই বেঁচে আছি। শুধু মাঝে মাঝে অন্ন ধ্বংস করে অন্যের হক নষ্ট করছি। সামান্য মনোযোগ পাওয়ার জন্য সবাইকে বিরক্ত করে এসেছি সারাজীবন। আমার কাছে যারা বিশেষ, তাদের কাছে নিজেকে একটু গুরুত্বপূর্ণ বানাতে গিয়ে না জানি কী কী বোকামি করেছি, জোর করে অন্যের জায়গা দখলের চেষ্টা করেছি।
এখন সব কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করছি। যার মনে স্থান পাওয়ার জন্য আমি সবচেয়ে বেশি মরিয়া ছিলাম, আজ তার কাছেই নিজেকে ঘৃণার পাত্র বানিয়ে ফেলেছি।

আচ্ছা, আপনি কেন আমার মিথ্যে আশা আরও আগে ভেঙে দিলেন না? কেন আমাকে এত প্রশ্রয় দিলেন? এত স্বপ্ন দেখার সুযোগ কেন দিলেন? নাহলে বোধহয় আপনাকে ভুলে যেতে এত কষ্ট হত না। অবশ্য আপনার এতে কী যায় আসে? আমার প্রতি হয়ত আপনার এখন আর কোনো অনুভূতিই কাজ করছে না। মানলাম অনেক অপরাধ করেছি। শাস্তি যখন দিবেনই, অন্যভাবে দিতে পারতেন। আমি খারাপ হতে পারি মৌমিতা, কিন্তু কষ্ট আমারও হয়।

গতকাল অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি আপনার সাথে। মানতে পারিনি ওভাবে হঠাৎ করে আপনি হাতছাড়া হয়ে যাবেন‌। জানি না কত কটু কথা শুনিয়েছি, কত আঘাত করেছি। আমাকে ক্ষমা করতে পারবেন কি? আমি তো পারছি না নিজেকে ক্ষমা করতে। আপনাকে আমি কষ্ট দিতে চাইনি, বিশ্বাস করুন। নিজের উপর খুব রাগ হচ্ছে, ঘৃণা হচ্ছে।
জানেন? আপনাকে ঘৃণা করার অনেক চেষ্টা করেছি আমি। ফোনে বলা ঐ মিথ্যেটাকে সত্যে রূপান্তর করার খুব চেষ্টা করেছি। ব্যর্থ হয়েছি। ভুলতেও তো পারছি না আপনাকে। আপনি ভুলে যেতে বলেছেন। কিন্তু কীভাবে ভুলব?

আমার জীবনের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক দিনগুলো এসেছে আপনার কারণে। কিন্তু আপনি একাধারে আমার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়।

আমার প্রতিটা স্মৃতি আর অভিজ্ঞতার মধ্যে যা কিছু সুন্দর, সব আপনাকে ঘিরে। আপনার সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে আমার জীবনের সব আঁধার কেটে গেছে। সেই আপনাকে আমি কীভাবে ভুলে যাই? আপনাকে ভুলতে হলে তো যত সুন্দর স্মৃতি আছে, তার পুরোটাই ভুলে যেতে হবে। ঐটুকু ছাড়া আমার কাছে এত মূল্যবান আর কিচ্ছু নেই।
যোগ্যতার বাইরে শুধু আপনাকেই তো পেয়েছিলাম। তবু মন ভরেনি। আর অল্প কিছু সময়ও যদি থাকতেন আপনি। পারলে নিজের প্রাণটাকে বিক্রি করে আপনার সাথে কাটানো আরও কয়েকটা মুহূর্ত কিনে নিতাম। কিন্তু পয়সা খরচ করে বাদলের জীবন কেউ কেনই বা কিনতে যাবে?

টেলিফোনে আপনি কাল একটা কথাও বললেন না। এতটুকু বললেও পারতেন যে আমার প্রতি আপনার সব ভালো লাগা শেষ হয়ে গেছে। কিছু একটা বলতেন। কেন চুপ ছিলেন?
আমার মনে হচ্ছিল, কেউ গলা টিপে মেরে ফেলছিল আমাকে। দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। শুধু একটা কথাই তো শুনতে চেয়েছি, ভালো হোক মন্দ হোক। বললে কী ক্ষতি হত?

এখন হাস্যকর লাগতে পারে আপনার কাছে, তবু বলছি। এতকিছুর পরেও যখন আপনি চুপ ছিলেন, আমি ধরে নিয়েছিলাম আমাদের সম্পর্ক শেষ, সব শেষ। তারপর শুধু আপনার কণ্ঠটা আরেকবার শুনতে চেয়েছি। আপনি সাড়া দিলেন না। কীভাবে বুঝাই কেমন লাগছিল আমার? আমি হাত পাতলাম ভিখারির মত, ভিক্ষা চাইলাম, আর আপনি সামান্য একটা গালিও দিলেন না। একেবারে এড়িয়ে গেলেন।
আমি একটাও খারাপ কথা বলতাম না যদি আপনি শুধু এটুকুও বলতেন, বাদল, আমার জীবন থেকে বেরিয়ে যাও। কিন্তু কিছুই বললেন না। আমার নিজেকে সামলানোর সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিলেন আপনি।

ফোন ধরেই শুরুতে আমার নামটা ডেকেছিলেন। যখন বুঝলেন যে সত্যিই আমি ফোন করেছি, তখন চুপ হয়ে গেলেন কেন? আমার সাথে কথা বললে অন্যায় হয়ে যাবে? হবে হয়ত। আমি আপনার কে? আপনি তো দু'দিন পর অন্য কারো স্ত্রী হয়ে যাবেন। আমাকে বোধহয় ভুলে যাবেন। না ভুললেও ঘৃণা করবেন নিশ্চয়ই? করতেই পারেন। ঘৃণা ছাড়া অন্যকিছু দাবি করতে পারছি না আপনার থেকে।

আমার কথায় কষ্ট পাবেন না। আমি জানি না কী আবোলতাবোল লিখে যাচ্ছি।
আজ হঠাৎ মনে হচ্ছে, আপনার মুখোমুখি দাঁড়াবার সাহস আমার নেই, অথচ আপনাকে না দেখে বেঁচে থাকাটাও অসম্ভবের কাছাকাছি। কী একটা ঝামেলায় পড়লাম বলুন তো!

ডায়েরি ফেরত দেওয়ার ইচ্ছে নেই আমার। তবু দিচ্ছি, কারণ এটা ছাড়া আপনার সাথে যোগাযোগ করার কোনো উপায় নেই। ভুল বুঝবেন না। আমি নিজেই যেতে চেয়েছিলাম এই কথাগুলো বলার জন্য। কিন্তু আপনি হয়ত আমার উপর রেগে আছেন। যদি আমার যাওয়াটা আপনার পছন্দ না হয়? আমাকে সামনাসামনি দেখে যদি আপনি মুখ ফিরিয়ে নেন, আমি সহ্য করতে পারব না।
এই ভয়ে আর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারছি না। কোনোমতে একটা অগোছালো চিঠি লিখতে হচ্ছে।
লেখার ব্যাপারে আমি খুব কাঁচা। ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।

বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না। আমি স্বার্থপর হলেও সবসময় চেয়েছি আপনি ভালো থাকুন। পৃথিবীতে আমার আপনজন আর তেমন কেউ নেই, কোনো চাওয়া-পাওয়াও নেই। আল্লাহ আমার ভাগের সুখটুকু যেন আপনার নামে লিখে দেন। এর চেয়ে বড় কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই আপাতত।

আরেকটা কথা বলি। মানুষের অতীত অনেকটাই পাগলা কুকুরের মত। আপনি যত দ্রুত দৌড়ে তার থেকে মুক্ত হতে চাইবেন, ততই সে আপনার কাছে আসার জন্য পেছনে ছুটতে থাকবে।
বাদলকে নাহয় আপনার হৃদয়ের এক কোণে অল্প একটু জায়গা দিলেন। ঘৃণা করেই হোক। তবু জোর করে মুছে ফেলবেন না, মুছতেও পারবেন না, শুধু হৃদয়টা অজান্তেই ক্ষয় হয়ে যাবে। আমি জেনেশুনে আপনার কোনো ক্ষতস্থান হয়ে উঠতে চাই না। কখনোই না।

আর কী লিখব? কিছু ভালো লাগছে না। খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আপনাকে নিয়ে সারাক্ষণ ভাবতে ভাবতে এটাই অভ্যেস হয়ে গেছে। এখন না ভেবে থাকতে পারি না। আবার ভাবতে গেলেও যন্ত্রণা হয়। ওসব ভাবনা, স্বপ্ন, আর কখনোই সত্যি হবে না। বুঝতে পারছি না, জীবনের বাকি সময়গুলো কীভাবে কাটাব।
আমি কিন্তু আপনাকে মানসিক চাপ দিচ্ছি না। আপনি আর ভাববেন না আমাকে নিয়ে। যা হওয়ার হবে। এসব কথা কাউকে বলতে ইচ্ছে করছিল, তাই এখানেই লিখলাম।

আমার আসলেই আর ভালো লাগছে না। খুব হাঁসফাঁস লাগছে। আপনাকে হারিয়ে আমি সব হারালাম। কিছুই থাকল না আমার।

একদিন হয়ত আপনিও বলবেন, আপনি ভুল মানুষের পেছনে এতগুলো সময় নষ্ট করেছেন। আর আমি সেই ভুল মানুষ। হ্যাঁ, আমি তাই।
আপনার কাছে যাকে সঠিক মনে হয়েছে, তাকে একবার দেখতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু দেখার সুযোগ নেই, ক্ষমতাও নেই। আশা করি, সেই মানুষটা আপনাকে খুব ভালো রাখবে। যেটা আমার দ্বারা হয়ত সম্ভব হত না।

যাই হোক। এখন আসি আসল কথায়। বাদল যে কী রকম জেদি আর ঈর্ষাপরায়ণ, তা তো আপনি জানেনই। বউয়ের সাজে আপনি একদিন অন্যকারও পাশে গিয়ে দাঁড়াবেন, এটা নিজের চোখে দেখার সাহস আমার নেই। তাই একপ্রকার পালিয়েই যাচ্ছি নাটোর থেকে।

আজ বিকেল ৫টায় ট্রেন। স্টেশনে আসবেন দেখা করতে। আপনার ডায়েরিটা আমাকে ফেরত দেবেন, এটা এখন আমার সম্পত্তি। জানি, এটা আপনার ব্যক্তিগত জিনিস। কিন্তু আপনি এই ডায়েরি ছাড়াও দিব্যি থাকতে পারবেন। আমি পারব না।

রবিবারে ট্রেন তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেয়। আপনিও তাড়াতাড়ি আসবেন। সেদিনের মত দেরি করবেন না। আর পারলে শাড়ি পরে আসবেন। আপনার যদি ইচ্ছে হয় আরকি। আমি একদমই জোর করছি না।

আপনি বলেছিলেন, যেন বড় একটা চিঠি লিখি আপনাকে। আমি গুছিয়ে লিখতে পারি না, হাতের লেখার উন্নতিও দেখছি না তেমন। তবু আপনার আবদার রাখার চেষ্টা করলাম। এই আমার শেষ চিঠি।
এবার আমার ইচ্ছেটা পূরণ করে দিন, শেষবারের জন্য হলেও একবার দেখা দিন, আরেকটাবার নাহয় করুণা করুন বাদলের প্রতি। ভালোবাসার দোহাই তো আর দিতে পারছি না। তাই করুণাই চাইলাম আবার। ডায়েরিটা আমার ফেরত চাই। আর কখনো এভাবে জেদ করব না। কথা দিচ্ছি।
তাড়াতাড়ি আসবেন কিন্তু। আমি অপেক্ষা করব।

ইতি
বাদল”

আজানের শব্দ শুনে সুস্মিতার ধ্যান ভাঙলো। কতোক্ষণ ধরে এভাবে স্তব্ধ হয়ে বসে থেকেছে—সে নিজেও জানে না। চোখ তুলে আশেপাশে তাকাতেই মনে হলো, ঘর ভীষণ অন্ধকার। মনে হচ্ছে, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। অথচ এটা আসরের ওয়াক্ত।
ওজু করে নামাজটা পড়ে নিতে হবে তাড়াতাড়ি। ইফতার তৈরিতে আম্মুকে সাহায্য করতে হবে।

মেয়েটা ধীরে সুস্থে চিঠিটা ভাঁজ করতে লাগলো। চোখদুটো ভীষণ জ্বালা করছে।

এই চিঠি প্রাপকের কাছে পৌঁছায়নি। যদি পৌঁছে যেতো, এই পৃথিবীতে হয়তো আজ সুস্মিতার অস্তিত্বই থাকতো না! এর পরিবর্তে খুব সুন্দর একটা সংসার হতে পারতো, মৌমিতা খন্দকার আর বাদল নামের ছেলেটার। আম্মু তখন পাথর হতেন না। এখন যে নির্মল হাসিমুখটা ছবির ফ্রেমে বন্দী হয়ে আছে, সেটা আজও অমলিন থাকতো হয়তোবা। কোনো মফস্বল শহরের একটা কিনারায় গড়ে উঠতে পারতো সুন্দর দু'জন মানুষের আবাসস্থল।

“আপু? আপু... যাহ! আম্মু দেখো, আপু আবার দরজা বন্ধ করে বসে আছে!”

সৌম্য হয়তো আবার মসজিদে যাচ্ছে। ছেলেটা কখন ফিরেছে—টেরই পাওয়া গেলো না!

সুস্মিতা ভাঁজ করা কাগজটা ব্যাগের সামনের পকেটে রেখে দিলো। তার মাথায় বড়সড় একটা পরিকল্পনা চলছে।
অনেক হয়েছে ভুল বোঝাবুঝি! এবার মৌমিতা খন্দকারকে সত্যিটা জানাতে হবে। এতোগুলো বছর ধরে তিনি ঐ একটা মিথ্যে বিশ্বাস করেছেন। প্রাক্তনের কাছে শোনা শেষ কথাটিকেই চূড়ান্ত সত্য ধরে নিয়েছেন।
এবার জানাতে হবে, বাদল কখনোই তাকে ঘৃণা করেনি। সে হয়তো নিজেই ভুল বুঝে বিদায় নিয়েছে। একইভাবে ভুল বুঝেছে।

একটা মৃত মানুষের প্রতি এখনও অভিমান পুষে রেখেছেন মৌমিতা। ঐ অভিমান তাকে আজও স্বস্তি দিচ্ছে না।
আম্মুকে এবার জানাতে হবে আসল ঘটনা। দুই পক্ষের ভুল বোঝাবুঝি তো আর মিটবে না।
সুতরাং যে মানুষটা এখনও বেঁচে আছে, সে অন্তত সত্যিটা জানুক। মৃত মানুষটাকে আর ভুল না বুঝুক।

দরজায় টোকা দিলেন মৌমিতা, “মা, কোনো অসুবিধা হয়েছে? দরজা বন্ধ করে রেখেছো কেন?”

নিজেকে স্বাভাবিক করতে নিজের সাথেই অনেক যুদ্ধ করলো মেয়েটা, গলা উঁচিয়ে বললো, “না আম্মু, আমি... আসছি।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp