বজ্রমেঘ - পর্ব ৪৩ - ফাবিয়াহ্ মমো - ধারাবাহিক গল্প

বজ্রমেঘ - ফাবিয়াহ্ মমো
          দুটো আর্দ্র চোখ শোয়েবের বুকের ভেতর লুকিয়ে আছে। সফেদ কাঁদার আবরণে ঢেকে আছে শাওলিন। পিঠময় ছড়ানো চুলে আঙুল বোলাচ্ছে শোয়েব। কিছুক্ষণ হলো শাওলিন নীরব। গোটা কাহিনির অর্ধেক অংশই বলা বাকি, শক্তি ও সংযম ফুরিয়ে আসছে যেন। এক মিনিট অন্তর চোখের পলক পড়ছে শোয়েবের। স্থির অটল চাহনি সিলিংফ্যানের ঘূর্ণনে সীমাবদ্ধ। শাওলিন মাথা উঠিয়ে চোখ মুছলে শোয়েবের ভয়ানক স্থিরতা দেখে হাত থমকে গেল। নিচুস্বরে ডাকল, 

  - শুনছেন?

শাওলিন দেখল কোনো ভ্রুক্ষেপ হলো না। এতোটা সময় কেউ নিষ্পলক থাকতে পারে? আচমকা ভয় পেয়ে গেল। শাওলিন হুড়মুড়িয়ে কাছে গিয়ে দুহাতে গাল চেপে বলল, 

  - আমি খেয়াল করিনি রাত দুটো বেজে গেছে। আপনি কী বিরক্ত? 

শাওলিনের নিষ্পাপ মুখ রাতের অন্ধকারে কালো-ছায়ায় ফুটে আছে। চোখ সয়ে আসা আঁধারে শোয়েব তাকাল বদনখানিতে। তখনো চোখের দৃষ্টি অপলক শোয়েবের, ছুরির মতো তীক্ষ্ম। শোয়েব হিম গলায় বলল, 

  - তারপর কী হলো? শায়খ মানুষটা কীভাবে তোমাকে দেখে রাখল? তোমার মা? উনি? 

শাওলিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে শোয়েবের গাল ছেড়ে দিল। দুটো হাতে জড়িয়ে ধরল শোয়েবের গলা। শোয়েবের কণ্ঠনালীর কাছে মাথাটা মিশিয়ে দিয়ে ধীরস্বরে বলল, 

  - অনেক কিছু জানা নেই। ছোটো ছিলাম। দাদাও জানার সুযোগ দেয়নি। সবসময় দেখে এসেছি শান্ত মানুষ। হাসিখুশি আর প্রাণবন্ত। বুঝতে দেয়নি হাসি আর সুখের পেছনে কী কষ্টগুলো হতো। 

কথাটা বলার শায়খের উজ্জ্বল চেহারাটা ভেসে উঠল পটে। শাওলিনের মনে আছে, শায়খ ওর প্রতিটি জন্মদিনে একসপ্তাহ আগে থেকে প্রস্তুতি নিতো। রাতে শাওলিন ঘুমিয়ে পড়লে সেসময় ঘরে ঢুকতো শায়খ, হাতে থাকতো নানান ব্যাগ। আলমারিতে তালা দিয়ে সেগুলো লুকিয়ে রাখতো সে। জন্মতিথির দিন ফজরের সময় উঠিয়ে দিতো শাওলিনকে। ঘুম ভেঙেই দেখতো শায়খের মাথায় সাদা টুপি। আযানের পর মসজিদ থেকে নামাজ পড়েই হাজির। টুপিটা না খুলেই ঝটপট বোনের জন্য নিয়ে এসেছে একটি শপিং ব্যাগ, যার ভেতরে সবসময়ের মতো একটি নতুন জামা। শাওলিন যখন পৃথিবীতে আসার পথে, শায়খ মাকে একটা রুমে ঢুকতে দেখেছে, তখন হাসপাতালের নার্স নবজাত শিশুর জন্য পোশাক চাচ্ছিল। নানাবাড়ির লোকেরা যখন ব্যাগ খুলছে, তখন শায়খ ত্রস্ত হাতে স্কুলব্যাগটা খুলল। ভেতর থেকে একটা কাঁথা নিয়ে দৌড়ে নার্সের হাতে দিয়ে বলল, 

  - আন্টি, এটা দিয়ে আমার বোনকে নিয়ে আসুন। 

নার্স মহিলা অবাক হয়ে নিজের হাতের দিকে, আরেকবার সামনে দাঁড়ানো দশ বছর বয়সি ছেলেটাকে দেখেন। সাদা জমিনের ওপর সুঁতোর কাজ, ফুল, পাতা, প্রজাপতির নকশা। স্তম্ভিত নার্স নির্বাক চোখে চলে যান। তারপর থেকেই শাওলিনের প্রতিটি জন্মদিনে নতুন জামা আনে শায়খ। সেই জামা পড়ে শায়খের সঙ্গে ঘুরতে বের হতো। কিছু দর্শনীয় জায়গা দেখে ভালো একটি রেস্তোরাঁয় খেয়ে রাতে ফিরতো দুই ভাইবোন। শাওলিন হাতমুখ ধোয়ার ফাঁকে শায়খ ওর ঘরে উপহার নিয়ে ঢুকতো। সেই উপহার হতো ভীষণ দামি। দাদাকে কতবার বলেছে, এতো টাকা নষ্ট করলে দাদা? কী দরকার ছিল এগুলোর? শায়খ তখন হতো কঠোর। অমন কথাবার্তা একদম সহ্য করতো না সে। তা দেখে শাওলিন চুপ হয়ে যেতো। নীরবে উপহারের মোড়ক খুলতো। শাওলিন সচ্ছল-অসচ্ছল দুটো পরিবেশ দেখেছে। জানে একটি টাকার মূল্য। উপহার খুললে নিজেকে সবচেয়ে ধনবান মনে হতো। আজ সে ঘটনাগুলো স্মরণ করে শাওলিন কেঁদে উঠল। গরম অশ্রুফোঁটা পরপর টের পেল শোয়েব। কানে শুনতে পেল ওর রুদ্ধস্বর, 

  - কলেজের প্রথম বর্ষ। সেদিন পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা। হঠাৎ পরীক্ষার মাঝখানে খবর এল আমাকে এক্ষুণি প্রিন্সিপালের রুমে যেতে হবে। পুরো ক্লাস আমার দিকে তাকিয়ে আছে। খাতা কলম ওভাবে রেখে আমি চলে গেলাম। স্যার আমাকে দেখে বললেন, আমার জন্য দুঃসংবাদ এসেছে। 

আচমকা গলাটা আঁটকে গেল শাওলিনের। শোয়েবকে খড়কুটোর মতো খামচে ধরল পাঁচ আঙুলে। ঘাড়ের চামড়ায় প্রতিটি নখের বিষশূল টের পাচ্ছে শোয়েব। ব্যথা নাকি অন্য কারণে, বোঝা গেল না। কপালের ডানকোণে একটা রগ ফুলে উঠল তার। শাওলিন বাঁধ ভাঙা অশ্রুতে নয়নসিক্ত করে বলল, 

  - সেদিন আমার জীবনে কেয়ামত নেমেছিল। পৃথিবীর কেয়ামত কেমন হবে জানি না। তবে মালবাহী ট্রাকটা শুধু দাদার ওপর দিয়ে যায়নি, আমার সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেছে। 

প্রতিটি কথা হেঁচকির কাছে জড়িয়ে যাচ্ছে। নিঃশ্বাস যেন উত্তাল। বুকের ভেতর তুমুল ঝড়। শাওলিন সংযমের বাঁধ ভেঙে হাউমাউ করে রাতের নৈঃশব্দ চিড়ে ফেলল। শোয়েব গভীরভাবে দম ফেলছে। একেকটি শ্বাস দীর্ঘ ও অতল। চোখদুটো থাইগ্লাসের বাইরে স্থির করে বৃষ্টির আলপনা দেখতে লাগল। আকাশে ফুটে উঠছে বজ্র ফাটল। ফরসা হতে চেয়ে আবার আঁধারে ফিরে যাচ্ছে রাতের কালিমায়। শোয়েব দীর্ঘসময় কিছু বলল না। শাওলিনকে থামানোর চেষ্টা করল না। আজ ও কাঁদুক। কিন্তু এরপর থেকে আর একবারও নয়। আজকের তারিখ যেন সাক্ষী থাকুক, এরপর যন্ত্রণার বৃষ্টি নয়, সুখের সায়রে নিয়ে যাবে। যেখানে স্বর্গ ও মর্ত্য বিলীন হয়। ওকে শেখাবে, জানাবে, বোঝাবে। নিজের সম পর্যায়ে গড়ে তুলবে। পৃথিবী ও সমাজের কাছে কঠোর, অনড় শক্ত করে দেবে। শির উঁচু রাখতে যা প্রয়োজন, ওর চরণতলে এনে দেবে সব। বুকের পাঁজরে যে হৃৎপিণ্ড আছে, সেটির স্পন্দন শুধুমাত্র ওর। 

শোয়েব এক অদ্ভুত গলায় মনের কাছে ওয়াদা করল, প্রকৃতির কর্তাকে নিঃশব্দের খামে চিঠি দিল।

' যা চাইনি, তা পেয়েছি। যা পেতে চেয়েছি, তাকে পেয়েও হারাতে দিবেন না। আমি আপনার ভালো বান্দা নই। নিয়মিত ইবাদত করি না। কিন্তু বিশ্বাসের জায়গা নষ্ট হয়নি। মানুষ যতই আমার বিশ্বাসে নিঃশ্বাস ফেলুক, কলঙ্ক রটাক, খারাপ বলুক। আপনি কুন থেকে ফায়াকুন করে দিন। পৃথিবী যদি কেড়ে নিতে চায়, আমি পৃথিবীর সঙ্গেই লড়ব।'

শোয়েব চোখের পাতা বন্ধ করল। বুকের ওপর শোয়া নিষ্পাপ প্রাণীটিকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে, নিজে ডানকাতে ফিরল। অশ্রুভেজা মুখের ওপর চুলের আব্রু সরিয়ে দিল শোয়েব। মেরুন রঙের সুতির শাড়িটার আঁচল আস্তে সরিয়ে নিজেকে সপে দিল সে। সফেদ কাঁথার নিচে দুটো দেহ এক হয়নি। বরং, প্রিয়তমা স্ত্রীর শাড়ির আবরণে উষ্ণ হচ্ছিল প্রিয়তম স্বামীর দেহ। 

—————

ফজরের আযানে পরিবেশ সুর মুখর। প্রতিটি মসজিদের স্বর মিলেমিশে শাওলিনের ঘুম ভেঙে দিল। চোখের ভারি পাতা দুটো মেলে পিটপিট করে তাকাল। কিছু দেখতে পেল না প্রথমে। ভারি শ্বাস, উষ্ণ বুকের চেনা ঘ্রাণ মুখে-নাকে টের পেল। শাওলিন বুঝতে পারল শোয়েব এখনো ওর মাঝে মিশে আছে। বুকের ওপর শাড়ির আঁচলটা আর নেই। সেটা এখন জায়গা করে নিয়েছে কারো পিঠের ওপর। কাঁথার মতো। আসল কাঁথাটা পরে আছে পায়ের নিচে। হাত দুটো ঢিল করে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাইল, কিন্তু ভাল্লুকের থাবা কী শিথিল করা যায়? তার উপর গায়ের শাড়িটাকে সে কাঁথা বানিয়ে ঘুমোচ্ছে। কীভাবে উঠবে শাওলিন? কিছুক্ষণ ব্যর্থ চেষ্টা সেরে একটা সিদ্ধান্ত নিল। শরীরী বল খাটিয়ে থাবার মতো বন্ধন থেকে আলাদা হলো, তারপর শাড়িটা ছেড়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ল শাওলিন। ব্লাউজ ও পেডিকোটের ওপর অন্য শাড়ি চাপাতে দ্রুত আলমারিটা খুলে ফেলল। হঠাৎ সারাঘর কাঁপিয়ে বাজ পড়ল, 

  - এই কোথায়..! 

শাওলিন আচমকা কেঁপে উঠল। চমকে উঠে ফিরে তাকাল পেছনে। শোয়েব সদ্য ঘুম ভাঙা চোখে কপাল কুঁচকে আছে। চোখেমুখে চরম বিরক্তি নিয়ে বলল, 

  - উঠেছ কেন? 

শাওলিন ঘড়ি দেখে উত্তর দিল,

  - ব্যাগ গুছাব।

শোয়েব কনুইয়ে ভর দিয়ে সামান্য উঁচু হয়েছিল। ভরটা সরিয়ে বালিশে মাথা রেখে বলল, 

  - ব্যাগ গুছাতে হবে না। যা যেভাবে রেখে এসেছ, সব ওভাবেই রাখা হয়েছে।

শাওলিন কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। পরক্ষণে মৃদু হেসে আলমারি থেকে একটা শাড়ি নিয়ে বাথরুমে যাচ্ছিল। যেতে পথে হঠাৎ পিছু ডাকল শোয়েব। পা থামিয়ে পিছু তাকায় শাওলিন। 

  - সংকোচ? 

শাওলিন কথাটার মানে বোঝেনি। শোয়েব ওর হাতের দিকে ইশারা করে বলল, 

  - আমার সামনেই পরো। 

শাওলিন তুমুল লজ্জায় আক্রান্ত হয়ে জড়সড় চোখে তাকাল। শোয়েব ওর রাতের শাড়িটা ঠিক কাঁথার মতো আষ্টেপৃষ্ঠে মুড়ে নিল। শাওলিনের দিকে তাকানো অবস্থায় শাড়ির খুশবুতে শ্বাস টেনে বলল, 

  - তুমি তুমি ঘ্রাণ। 

শাওলিন পা থেকে মাথার চুল পর্যন্ত শিরশিরিয়ে উঠল। আর একমুহুর্ত তাকিয়ে থাকতে পারল না। ঝটিতি চোখদুটো নত করল। বিছানা ঘেঁষে সুবিশাল কাঁচঘেরা জানালা। বাইরে আঁধার ফুরিয়ে ফ্যাকাশে আলোয় ভোর হচ্ছে। শাওলিন সময়ের হিসেব কষে আবার তাকাল। নীল চোখদুটোয় চোখ মিলিয়ে বলল, 

  - উঠে পড়ুন। আজ জাহাঙ্গীরনগর ঘুরাব। আপনি জানবেন আমাদের ক্যাম্পাস কত সুন্দর। 

ঘুমের আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো শোয়েব। গায়ে তখনো শাওলিনের শাড়িটা জড়িয়ে রেখেছে। এক ধাক্কায় জানালার থাইগ্লাস সরিয়ে দিল শোয়েব, হুঁ হুঁ করে ঢুকে পড়ল দলছুট ঠাণ্ডা হাওয়া। হাওয়ায় শোয়েবের প্রশস্ত কপালে কিছু অবাধ্য চুল ছুটোছুটি করতে লাগল। দৃশ্যটা মুগ্ধ চোখে দেখতে লাগল শাওলিন। কালরাতের রেশ অনেকখানি কেটেছে, কিন্তু বুকের কোথাও যেন এক রত্নি ভয়ের বীজ বপন হয়ে গেছে। রেবেকা মণি কীসের ইঙ্গিত দিয়েছিল, জানা যায়নি। কেন বাজে বাজে কথাগুলো বলল, রহস্যের আড়ালে গোপন। 

—————

শ্রেষ্ঠা বারান্দায় দাঁড়িয়ে চুপ করে আছে। উদাসী দৃষ্টিতে ভাবছে কিছু। হাতের ডানমুঠোয় ফোন। ফোনের একটা কোণ ভাঙা। মেঝেতে লক্ষ করলে দেখা যাবে ভাঙা অংশটা চুরচুরে কাঁচের মতো পড়ে আছে। গতরাতে খুব ভয়াবহ একটা ব্যাপার ঘটেছে। যার আঘাত ওই ভাঙা অংশটার মতো চূর্ণ। শাওলিনের খবর শুনে তখুনি স্কুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল শ্রেষ্ঠা। পথিমধ্যে শোয়েবের খবর পায় শাওলিন ঠিক আছে। রেবেকা নেওয়াজ উত্তেজিত হয়ে কিছু ঝামেলা করেছিল। যেটা মিটমাটের জন্য শোয়েব ঢাকায় আছে। কথাটা শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাসে বাড়ি ফিরছিল শ্রেষ্ঠা। এমন সময় পরিচিত একজন খবরটা দিল, রাহাতের পরিবার পাত্রী দেখছে। কাল পরশুর ভেতর বনানীর একটি নামকরা রেস্টুরেন্টে পাত্রীর মুখোমুখি বসতে চলেছে রাহাত। শ্রেষ্ঠা খবরটার সত্যতা যাচাই করতে কালরাত থেকে একশোর ওপরে কল দিয়েছে, কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে রাহাত কলগুলো ধরেনি। শ্রেষ্ঠার সন্দেহ হচ্ছে, ওর নাম্বারটা ব্ল্যাকলিস্টে ফেলেছে। হাতের ফোনটা দিয়ে আরেকবার কল করল। মনে মনে বলল, এবারই শেষবার। কিন্তু এভাবে কতবার যে শেষবার বলে আবার কল দিল সে হিসেব নেই। বাজতে বাজতে কল কেটে গেল। শ্রেষ্ঠা নির্বাক হয়ে কান থেকে ফোন নামিয়ে ঘরে ঢুকল। বাড়িতে কেউ জাগেনি। নিপা ছটার সময় উঠে যায়, কেননা আটটায় একটা ক্লাস থাকে। নিপা বোনকে হতভম্ভ দেখে কপাল কুঁচকে বলল, 

  - আপি, এনিথিং রং? 

শ্রেষ্ঠা গম্ভীর মুখে তাকাল। সেই শাণিত দৃষ্টিতে নিপা চোখ মেলাতে হিমশিম খেল। বোহো প্যাটার্নের কালো ব্যাগটা ছেড়ে নিপা শ্রেষ্ঠার সমুখে থেমে বলল, 

  - আপি, প্লিজ। কোনো ঝামেলা হলে বলো, পরে বলে প্রবলেম এক্সটেণ্ড করো না। 

নিপার কথায় শ্রেষ্ঠা বিছানায় বসে তাকাল। ছোটোবোনের দিকে শূন্য চোখে তাকিয়ে বলল, 

  - সাত বছরের সম্পর্ক, সব শেষ নিপা। রাহাত অন্য কাউকে বিয়ের জন্য রাজি হয়ে গেছে। 

আসমান থেকে পড়ল নিপা। সারামুখে বিস্ফোরণ নিয়ে বলল, 

  - অসম্ভব! কী যা তা বলছ তুমি? তোমার মাথা ঠিক আছে? 

শ্রেষ্ঠা কেমন যেন নড়বড়ে তক্তার ভঙ্গুর দশার মতো বলল, 

  - আমার কী হবে নিপা? আমি তো ওকে ভালোবাসি! আমার ভালোবাসা তো মিথ্যা ছিল না!

বোনের কথাগুলো অগোছালো লাগল নিপার। শ্রেষ্ঠাকে এমন অবিন্যস্ত কখনোই দেখেনি। শ্রেষ্ঠা সবসময় সদা হাসিতে মত্ত, চারপাশ রাঙিয়ে তোলে রঙিন তুলির মতো। সেই শ্রেষ্ঠা আজ কেমন সুরে কথা বলছে? নিপা ধপ করে মেঝেতে বসে বলল, 

  - আপি তুমি শান্ত হও। মাথা ঠাণ্ডা করো। আমাকে খুলে বলো কী হয়েছে। রাহাত ভাই তোমাকে কিছু বলেছে? সে জানিয়েছে এসব? 

শ্রেষ্ঠা কোণ ভাঙা ফোন তুলে বোনকে কিছু দেখাল। স্ক্রিনজুড়ে বিশ্বস্ত এক ব্যক্তির কথোপকথন। একপর্যায়ে একটা স্ক্রিনশট। সেখানে রাহাত স্পষ্ট একজনকে বলছে শ্রেষ্ঠার কাছ সময় চায়। সম্পর্কটা আদৌ রাখবে কিনা এ নিয়ে রাহাত পরিকল্পনা করছে। কথাগুলো পড়ে নিপা নিরাশ চোখে তাকাল। সাত বছর! কম কথা তো নয়! রাহাত নিজেই শ্রেষ্ঠার প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে নিয়মিত বিরক্ত করতো। কখনো অদ্ভুত সাহায্য করে, কখনো হঠাৎ কল দিয়ে, কখনো নিপাকে নানা উপহার দিয়ে দূত পাঠাতো। সেই রাহাত সময়ের পরিক্রমায় এতোটা বদলে গেল? নিপা ঢোক গিলে নিজেকে সামলাল। শ্রেষ্ঠার মানসিক অবস্থা চিন্তাও করতে পারছে না নিপা। বাইরে থেকে যতটা স্বাভাবিক লাগছে, ওর বোনটা ভেতর থেকে চুরমার। নিপা ফোনটা রেখে শ্রেষ্ঠার দুটো হাত নিজের মুঠোয় ঢেকে বলল, 

  - আমি ভাইয়ার সাথে কথা বলব। উনি কেন আর কী জন্য এমন কথাবার্তা বলছে এটা আমি শুনব। আপি, তুমি শান্ত থাকো। মাকে ভুলেও বুঝতে দিয়ো না। 

শ্রেষ্ঠা থমথমে পাথর চোখে তাকাল। চোখে যেন প্রাণ নেই, মরা মাছের মতো নিষ্প্রভ। চোখের সামনে সাতটা বছরের প্রেমময় মুহুর্তগুলো ভেসে উঠেছে। কখনো রমনার বটমূলে, কখনো জাহাঙ্গীরনগরের বটতলায়, কখনো সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজের কাছে, কখনো এদিক-ওদিক ঢাকাস্থ এলাকায়। নিপা বহুকষ্টে বোনকে ছেড়ে ক্যাম্পাসের জন্য বেরিয়ে পড়ল। পায়ে জুতা পরতে পর‍তে সিদ্ধান্ত নিল, আটটার ক্লাসটা করেই রাহাতের অফিসে যাবে। হাজার প্রশ্ন নিয়ে মুখোমুখি হবে নিপা। 

শ্রেষ্ঠা ফাঁকা ঘরে অসাড় দেহে বসে আছে। চোখ থেকে টপ টপ করে ঝরছে অশ্রু। মেঝেতে গোল বিন্দুগুলো সাক্ষী দিচ্ছে, শ্রেষ্ঠারও দুঃখ হয়। খুব বাজে, ভয়ংকর দুঃখ হয়। চিন্তার চাইতেও খারাপ এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। যেখানে সাতটা বছর এই ভরসায় ছিল রাহাত চাকরিটা পেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। চাকরি পেয়েছে। কিন্তু বিয়েটা ওকে নয়, পরিবারের গুছিয়ে দেয়া পাত্রীকে বিয়েটা করবে। হঠাৎ ফোনটা শব্দ ছেড়ে বাজতে লাগল। বুকটা ধড়াস করে কেঁপে উঠল! তৎক্ষণাৎ ফোনটার দিকে তাকালে মিইয়ে এল চাহনি। অস্তমিত সূর্যের মতো তেজহারা কণ্ঠে বলল, 

  - হ্যাঁ জানা, 

শাওলিনের নম্বরে সেই পুরুষটার গলা। ভারী, গম্ভীর, কিন্তু ভরসাপূর্ণ। মানুষটা গলার রাশ টেনে হালকা স্বরে বলল, 

  - কেমন আছ, শ্রেষ্ঠা? বাসায় আছ? 

গলায় কাঁটা আঁটকেছে যেন। শ্রেষ্ঠা কথাই বলতে পারল না। প্রশ্ন দুটোর মাঝে এমন কিছু ছিল, শ্রেষ্ঠার ইচ্ছে করল এই জঘণ্য ব্যথাটা নিয়ে কথা বলতে। শোয়েব আবারও প্রশ্ন গলায় শুধোল, 

  - তুমি ঠিক আছ তো? পাঁচ সেকেণ্ড পেরিয়ে যাচ্ছে, তুমি নিরুত্তর। এরকম তো কখনো হয়নি। 

শ্রেষ্ঠা দুই চোখে তর্জনী আর বৃদ্ধা আঙুল চেপে ধরল। চোখদুটো কোণ ঘেঁষে ঝর্ণার মতো দুফোঁটা অশ্রু গাল ভিজিয়ে নামল। শ্রেষ্ঠা নিজেকে সামলে নিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, 

  - একটু ঠাণ্ডা লেগেছে। গলাটা ভারি। আপনি ভালো আছেন? 

শোয়েব চুপ করে ছিল। কাঁটা ভ্রুঁয়ের কোণটা হঠাৎ উঁচুতে উঠল। গাড়িটা বাঁহাতে ড্রাইভ করছে। কানে ইয়ারপিস। স্বর, সময়, ভঙ্গিটা মনে মনে নিরীক্ষণ করে শোয়েব তীক্ষ্ণ গলায় বলল, 

  - কাল আবহাওয়া ঠাণ্ডা ছিল। কিন্তু এর চেয়েও ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় তুমি সার্ভাইভ করেছ, তোমার ঠাণ্ডা লাগেনি। শ্রেষ্ঠা তুমি কী ঠিক আছ? আমার কেন মনে হচ্ছে তুমি ডাউন ফিল করছ? 

কথাটা শুনে শাওলিন বাঁপাশ থেকে চমকে ফিরল। গাড়ি বেশ মসৃণগতিতে চলছে। রাস্তা বেশ ফাঁকা। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু শাওলিন আর সেদিকে মুগ্ধ চাহনি রাখতে পারল না। শোয়েব ভ্রুঁদ্বয়ের মাঝখানে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। কী হয়েছে শ্রেষ্ঠার? বারবার কেন মনে হচ্ছে মেয়েটা খুব ভয়ংকর কিছুতে আছে? শোয়েব বাঁদিকে তাকাল। কলটা দু সেকেণ্ডের জন্য মিউট করে শুধাল, 

  - তোমার বান্ধবি পাথর কেন? গলা ঠাণ্ডার কারণে ভার মনে হলো না। এই টোনটা ডিপ পর্যায়ের ডিপ্রেশড ব্যক্তির। ও কী ঠিক আছে? 

শাওলিন সন্দিহান মন নিয়ে কিছুক্ষণ ভেবে বলল, 

  - রাহাত ভাইয়ের সাথে কিছু হলো? উনি আজকাল অদ্ভুত আচরণ করছেন। মাল্টিন্যাশনালে জব পেয়ে উনি ঠিক আগের মতো নেই। 

শোয়েব কপালের কুঞ্চন সোজা করে ফেলল। বোঝা গেল কাহিনী। আবারও কলে ফিরে আদেশের গলায় বলল,

  - শ্রেষ্ঠা, শ্যামলীর কাছে আছি। নিচে নামো। ব্যাগ, মেকআপ লাগবে না। জাস্ট তুমি নামো। 

কথাটা বলেই কলটা কেটে দিল। শোয়েব এটুকু জানে শ্রেষ্ঠাকে বলতে দিলেই ও অস্বীকৃতি জানাবে। নিচে নামবে না। ঘরে নিঃসঙ্গতায় যুঝতে থাকবে। গাড়িটার বেগ আরো বাড়িয়ে শ্যামলীর একটা এলাকায় ঢুকল শোয়েব। পাশ থেকে শাওলিন পথ নির্দেশনা দিচ্ছে। শাওলিন মনে দ্বন্দ্ব বলে উঠল, 

  - আপনি যে ওকে নামতে বললেন, ও কী নেমে আসবে? 

শোয়েব আত্মবিশ্বাসে অটল থেকে বলল,

  - নামবে। আমার কথা অমান্য করবে না। 

ঠিক মিনিট পাঁচেকের ভেতর একটা আবাসিক এলাকার ছিমছাম বিল্ডিংয়ের কাছে থামল। হাতে ছাতা নিয়ে গেটের বাইরে একটি নারীমূর্তি দেখা গেল। শাওলিন দূর থেকে বুঝতে পারল ওটা শ্রেষ্ঠাই। বেশ অবাক হলেও প্রকাশ করল না। শোয়েব গাড়িটা এমনভাবে থামাল যেন শ্রেষ্ঠার পা বরাবর দরজাটা পড়ে। শ্রেষ্ঠা ছাতা বন্ধ করে গাড়িতে চড়ে বসল। শাওলিন পিছু তাকিয়ে দেখল চোখমুখ ফুলে আছে। নাক মোছার টিস্যুটা হাতের মুঠোয়। শাওলিন স্তম্ভিত চোখে শোয়েবের দিকে ফিরল। শোয়েব শান্তচোখে চক্ষু ইঙ্গিত করল। যেন বোঝাল "কী? আমার কথা মিলল?"। শোয়েব সামনে ঘুরে গাড়িটা স্টার্ট দিল। শাওলিন আশ্চর্য চোখে শ্রেষ্ঠার আপাদমস্তক দেখে বলল, 

  - তোমার এই অবস্থা কেন? 

শ্রেষ্ঠা জানালার বাইরে তাকানো। কোনো প্রত্যুত্তর করল না ওর। হাতের টিস্যুটা নাড়াচাড়া করছে। শাওলিন সামনে ঘুরে বসলো। শোয়েব বাঁ হাতের তালুতে স্টিয়ারিংটা গোল গোল ঘুরাতেই বলল, 

  - কী খবর? এই বয়সে কে মারল? 

শাওলিন আবারও বিস্ময় নিয়ে শোয়েবকে দেখল। শ্রেষ্ঠার সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক কবে হলো? একদিন মাত্র ওর ফোন থেকে অকাজটা করেছিল। তার দরুন এতো উন্নতি? শোয়েবের প্রশ্নে কিছুক্ষণ নীরব থাকলেও সমীহ সুলভ শ্রদ্ধা থেকে বলল, 

  - আপনি বলুন আমাকে কে মারবে? কার সেই সাহস? 

শোয়েব সাবলীল ভাবে উত্তর দিল,

  - এই অধিকার কারোর নেই। গায়ে হাত তুললে, কবজি থেকে ওই হাত কেটে দেয়া উচিত। 

  - আর যদি কেউ বিশ্বাসে মার দেয়? তখন কীভাবে শায়েস্তা করা উচিত? 

প্রশ্নটা শুনে শোয়েব চুপ হয়ে গেল। পাশ থেকে শাওলিন উৎসুক চোখে তাকানো। শোয়েব দীর্ঘ একটা ঢোক গিলে খুব শান্ত গলায় বলল, 

  - সুযোগ দেয়া উচিত। তারপর না শুধরালে ত্যাগ করা উত্তম। 

কথাগুলো বলার সময় বাঁদিকের চোয়ালটা বেশ কাঁপল। শাওলিন বুঝতে পারল না কেন এই অদ্ভুত ব্যাপারটা ফুটে উঠল। শোয়েব আড়চোখে শাওলিনের নিরীক্ষণ দৃষ্টি টের পাচ্ছিল। নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে শ্রেষ্ঠাকে বলল, 

  - সমস্যাটা কী প্রেম বিষয়ক? 

  - জ্বী। 

  - কী হয়েছে? যদি অসুবিধে না থাকে, খুলে বলো। দেখি কী করতে পারি। 

শ্রেষ্ঠা টিস্যু দিয়ে নাক মুছতে চাচ্ছিল। শাওলিন সামনের ড্যাশবোর্ড থেকে টিস্যুর বক্সটা বাড়িয়ে দিল। খপখপ করে অনেকগুলো টিস্যু নিয়ে চোখ, নাক, গাল মুছল শ্রেষ্ঠা। ততক্ষণে মনের কাছে কতগুলো ভাবনা সেরে বলতে লাগল। রাহাতের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে সবকিছু। শোয়েব মন দিয়ে শুনল, শাওলিন জানা ঘটনা আবারও জানতে লাগল। শ্রেষ্ঠা যখন পরিশেষে বলতে যাবে, ঠিক তখনি শোয়েব নিজের সেলফোনটা বের করে শ্রেষ্ঠার দিকে হাত উলটো করে দিল। স্বাভাবিক শান্তস্বরে বলল, 

  - নাম্বারটা সেভ করে দাও। 

শ্রেষ্ঠা দেখল ওর দিকে একটা ফোন বাড়ানো। ফোনের ওয়ালপেপারে কালো ব্যাকগ্রাউণ্ড। অদ্ভুত একটা প্যাঁচানো ফন্টে শুধু দুটি মাত্র লেখা জ্বলজ্বল করছে। সাদাবর্ণে AUGUST 20 . শ্রেষ্ঠা ফোনটা হাতে নিতেই বুঝল, এই লেখাটা বেশ অর্থপূর্ণ। আগষ্ট মাসের বিশ তারিখে বিয়েটা হয়েছে। শ্রেষ্ঠা মুখস্ত নাম্বারটা সেভ করে দিল। শোয়েব ফোনটা ফেরত নিয়ে বলল, 

  - কিছু দেখে ফেললে নাকি? 

শ্রেষ্ঠা সমুখে থাকা রিয়ারভিউ মিররে তাকাল শোয়েবের চশমা ঢাকা চোখদুটো উত্তর চাইছে। শ্রেষ্ঠা একপলক শাওলিনের দিকে চেয়ে মাথা নাড়াল। সম্মতিসূচক উত্তরটা দেখে শোয়েব মুচকি হাসলো। শ্রেষ্ঠা ইঙ্গিতপূর্ণে বলল, 

  - সেটা সবার আগে আমিই বুঝেছি। খাগড়াছড়ি ভীষণ সুন্দর। সেই সুন্দরের ভেতর জানাকে আঁটকে রাখতে প্রকৃতিও কম ছল করেনি। 

বৃষ্টিটা আচমকা ঘন হয়ে এল। উইন্ডশিল্ড জুড়ে পানির রেখা নামতে লাগল। ওয়াইপার দ্রুত ছুটছে, তবু সামনের দৃশ্য বারবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। সকাল হলেও আকাশ এতটাই কালো যে চারপাশে সন্ধ্যার আবহ নেমে এসেছে। শোয়েবের দুই হাত স্টিয়ারিংয়ে স্থির। শাওলিন একবার বাইরে তাকাল, তারপর আবার নিজের ভাবনায় ডুবে গেল। রেবেকা মণির শেষ কথাগুলো বারবার কানে বাজছে। "সাবধানে থাকো..." কেন বলেছিলেন? শাসানোগুলো কিসের ইঙ্গিত ছিল? ঠিক তখনই ধাম করে উঠল! প্রচণ্ড শব্দে পুরো গাড়িটা বাঁদিকে ছিটকে উঠল! লোহার সঙ্গে লোহার ভয়ানক সংঘর্ষ ঘটেছে! গাড়ির টায়ারগুলো ভেজা রাস্তার ওপর ঘর্ষণে জড়াল! শ্রেষ্ঠা হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে দরজার সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খেল, 

  - আহ!

ডান কনুই চেপে ধরল সে। মুখ বিকৃত হয়ে গেল ব্যথায়। শাওলিন সামনের ড্যাশবোর্ড আঁকড়ে ধরেছে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চিৎকার করে উঠল, 

  - এক্সিডেন্ট.. 

প্রথম ধাক্কায় শোয়েবও একমুহূর্তের জন্য কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। প্রবল শক্তিতে স্টিয়ারিং সামলে গাড়িটাকে সোজা রাখল। বুকের ভেতর সতর্কতার ঘণ্টা বেজে উঠেছে, কিন্তু কারণটা তখনও পরিষ্কার নয়। চোখের পলকে রিয়ারভিউ মিররে তাকাল সে। ঝুম বৃষ্টি ঘনঘটা। কুয়াশার মতো ঝাপসা রাস্তা। শোয়েব খুব নিচু গলায় নিজেকেই বলল,

  - টায়ার পাঞ্চার?

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই দূরে দুটি তীব্র সাদা আলো বৃষ্টির পর্দা ভেদ করে জ্বলে উঠল। আলো দুটি অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বড় হতে লাগল।সেকেন্ড কয়েকের মধ্যেই কালো রঙের একটি বড় এসইউভি স্পষ্ট হয়ে উঠল। গাড়িটা ওভারটেক করার চেষ্টা করছে না। বরং ঠিক তাদের পেছনেই ছুটে আসছে। শোয়েবের চেহারা বদলে গেল। চোয়ালের পেশি টানটান। নীল চোখদুটো আবার আয়নায় স্থির হলো। তার বহু বছরের অভিজ্ঞতা মুহূর্তেই উত্তর দিল, এটা দুর্ঘটনা নয়। ওরা ইচ্ছে করেই ধাক্কা দিয়েছে। আরও একবার ধাক্কা দেয়ার জন্যই পিছু নিয়েছে। বাইরে বাজ পড়ল। এক ঝলক সাদা আলোয় এসইউভিটার সামনের গ্রিল স্পষ্ট দেখা গেল। পরক্ষণেই আবার সব ঢেকে ফেলল ঝুমবৃষ্টি। ইঞ্জিনের গর্জন দ্রুত কাছে আসছে। শোয়েব শান্ত, কিন্তু ইস্পাতের মতো দৃঢ় গলায় বলল,

  - দুজনেই সিটবেল্ট শক্ত করে বাঁধো! 

শাওলিন কাঁপা গলায় বলল,

  - কী হয়েছে?

শোয়েব আয়না থেকে চোখ সরাল না। কয়েক সেকেণ্ড চুপ রইল। পেশাদার অভিজ্ঞ গলায় বলল, 

  - আমাদের পেছনে কেউ দুর্ঘটনা ঘটাতে আসেনি। 

কথাটা বলতেই অ্যাক্সিলারেটরে চাপ বাড়াল শোয়েব। ঝড়ের গতি তুলল অফ হোয়াইট ল্যাণ্ড ক্রুজার। শোয়েব শীতল গলায় বলল, 

  - মারতে এসেছে!
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp