কামিনী - পর্ব ১০২ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          মোহনীয়, সুঘ্রাণে ভরা প্রাসাদের চারপাশটা উৎসবমুখর। বিভিন্ন রাজ্য হতে রাজা-রানি, রাজপুত্রদের যে আগমন ঘটেছে তা সেই প্রাসাদের গুঞ্জনেই বোঝা যাচ্ছে ঢের।
 রানি কামিনীকাঞ্চনের জৈতুন রাজ্যে আসার সংবাদটি প্রাসাদে ছড়িয়ে গিয়েছে এক লহমায়। অনেকেরই সে কী আকাঙ্ক্ষা তাকে একটি নজর দেখতে চাওয়ার কিন্তু নিজের রাজত্বের দম্ভ ছেড়ে তা প্রকাশও করতে পারছে না। কেউ কেউ প্রকাশ করেছে। রানি কামিনীকাঞ্চনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ব্যাকুলতা প্রকাশ করেছে। 

 চারপাশে রানির সম্পর্কিত চাপা গুঞ্জন দেখে জৈতুন রাজ্যের রাজমাতা স্বয়ং হতভম্ব হয়ে গেলেন। যদিও তিনি রানি কামিনীকাঞ্চন সম্পর্কে অবগত কিন্তু তাই বলে এই কন্যাটির যে এত খ্যাতি, যশ তা তিনি কল্পনাও করেননি। তার কাছেই বিভিন্ন রানিরা দেখতে চাওয়ার মর্জি পেশ করছেন বলেই তিনি এতটা হতবিহ্বল হয়েছেন। আকারে-ইঙ্গিতে কেউ না কেউ তার কাছে এসে চাপা স্বরে বলে যাচ্ছে, রানিকে যেন বৈঠকখানায় আনানো হয়। তাদের সঙ্গেও একটি আলাপ করিয়ে দেওয়া হয়। জৈতুন রাজ্যের রাজমাতা হাসিমুখে সকলের আর্জি শুনলেও ভেতর ভেতর কেবল চমকাচ্ছেন। আবার কোথাও একটা চাপা অহংকারও অনুভব করছেন এই ভেবে যে, সকলে ভাবছেন রানির সঙ্গে তাদের ভাব বেশি। এই সমস্তের নিশ্চয় একটি ভালো দিক রয়েছে। তিনি এতটুকু রাজনীতি তো বোঝেনই!

 রাজকন্যা মৃন্ময়ীর আজ সাজসজ্জার ধরণ ভিন্ন। তার কেশগুচ্ছে শোভাবর্ণ করে যেই প্রাচীর পুষ্পমাল্য সজ্জিত করা সেই পুষ্পটির ঘ্রাণ সবচে আলাদা ও ভিন্ন। সচারাচর যে পাওয়া যায় না এটি। চোখের সুরমার লাজ তার নারীর আঁখি ও মুখমন্ডলকে চঞ্চলতার রূপ দিয়েছে। তাকে রাজকন্যা লাগছে না মোটেও। লাগছে, বন্যের কোনো অদ্ভুত রূপসী, জাদুময়ী কন্যা। সদ্য ফুটন্ত পুষ্পরেণু। 
রাজমাতা কন্যার কক্ষে এসেছিলেন নিজের ভেতরের চাপা সেই উন্মাদনার কথা বলতে। কিন্তু এসে তিনি নিজের কন্যার মোহিত রূপে নিমজ্জিত হয়ে ঘোরগ্রস্ত হয়ে গেলেন যেন! 
 নিষ্পলক কন্যার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার কোলজুড়ে এই একটি মাত্রই কন্যার জন্ম হয়েছিলো। এরপর আর কোনো সন্তান লাভ করেননি তিনি। রাজা যদিও পরবর্তীতে আবারও বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন কিন্তু সেই রানির গর্ভ জুড়েও সন্তান দেননি স্রষ্টা। তাই পুরো রাজপ্রাসাদ জুড়ে চোখের মণি হয়ে বিরাজ করল এই কন্যাটি। সেই সমস্ত কিছু তাকে দেওয়ার চেষ্টা করলেন তারা, যে সমস্তকিছু সবচেয়ে বিলাসবহুল, আকর্ষণীয়, অধিক মূল্যবান। তবে রাজমাতার মনে কোথাও একটা পুত্র না হওয়ার ভাবনা চাপা উদ্রেক তৈরি করে ছিলো। তাই তিনি হয়ত খেয়ালই করেননি তার কন্যা রাজ্যের সমস্ত সৌন্দর্য, সৌহার্দ্য নিয়ে জন্ম নিয়েছে। আজ তিনি যেন সেটি উপলব্ধি করতে পারছে ঢের।

 রাজমাতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন মেয়েকে। আবেশিত ওষ্ঠে চুম্বন এঁকে দিলেন কন্যার সুন্দর ললাটে। তার অক্ষিকোটরে যে সেই কখন মেঘ জমেছে ঠিক টেরই পাননি।
মৃন্ময়ী নিজের মাতাশ্রীর এহেন বিহ্বলিত মুখ, চোখে জমা অশ্রু দেখে ফিক করে হেসে দিলো, 
 “কেমন লাগছে বলোতো আমায়, মাতা?”

 রাজমাতা এক মুহূর্ত সময় নিলেন না কন্যার উত্তর দিতে, “দুর্দান্ত। অম্বরে উদিত এক টুকরো নক্ষত্রের মতো।”

  “তাই? অনেক সুন্দর লাগছে?”

“হ্যাঁ, ভীষণ।”

 “রানি কামিনীকাঞ্চনের মতো সুন্দর? না তারচেয়ে বেশি?” মাতার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করে মিটিমিটি হাসতে লাগল মৃন্ময়ী। ঠোঁটের সেই দুরন্ত হাসিতে ও অযাচিত প্রশ্নে ভড়কে গেলেন রাজমাতা। তার মন্ত্রমুগ্ধের মতো দৃষ্টি বিভ্রান্তিতে রূপ নিলো। উত্তর এবার আর তৎক্ষণাৎ এলো না। তিনি যে মাতা। তার কাছে তার সন্তানই সর্বোচ্চ সুন্দরতম মানব কন্যা। কিন্তু এই উত্তরটুকু দিতে গিয়ে তার কণ্ঠ ম্লান হয়ে এলো। সত্যি কি তাই? 
 রানি কামিনীকাঞ্চনের যে রূপ তিনি প্রথম দর্শনে চাক্ষুষ দেখেছেন এরপর তিনি পৃথিবীর আর কারো রূপকেই সেই রূপের সঙ্গে তুলনা করার সাহস করে উঠতে পারছেন না। সেই নির্মল রূপ, শ'খানেক ইন্দুর সমষ্টিতে সৃষ্ট গায়ের বর্ণ, রজনীর আবেশে মিশেলে সোনালি ধারার বৃহৎ কেশ, হরিণীর ন্যায় নেত্র… এহেন রূপ এই ধরায় দ্বিতীয়টি নেই তিনি তা নিশ্চিত। তার কন্যা যে সেই রূপ থেকে বহু বহু দূরে তা-ও তিনি জানেন। কিন্তু মুখ ফুটে কি আর কন্যাকে তা বলতে পারেন? রানির সঙ্গে তুলনায় তার কন্যা কিচ্ছুটি নয়, কিন্তু তুলনা ব্যতীত তার কন্যা সবচেয়ে সুন্দরী এহেন কথা তিনি বলবেন কীভাবে মাতা হয়ে?

 “কারো তুলনায় তোমার এই ভুবনমোহিনী রূপ আমি ব্যাখ্যা করতে পারব না কন্যা আমার। তুমি তোমার মতোই অনন্য।” রাজমাতার কথা ঘুরিয়ে নেওয়ার প্রয়াসে মৃন্ময়ী পুনরায় হেসে উঠল সশব্দে। চোখগুলো হাসির তোপে ক্ষুদ্রাকার হয়ে এলো। সেই উজ্জীবিত, হাস্যরত স্বরে সে মাতাকে প্রতিত্তোর করল,
“কুটনীতি আমার সঙ্গে? বেশ, বেশ। জৈতুন রাজ্যের রাজমাতার কাছ থেকে এটিই আশাবাদী ছিলাম।”

  কন্যার ধরে ফেলার চতুরতায় কিছুটা লজ্জিত বোধ করলেন রাজমাতা। বিষয়টিকে বোঝানোর প্রয়াস করে বললেন,
“তুমি ভুল বুঝছো। আমি…”

 “আহা মাতা, অশান্ত হচ্ছো কেন? আমি তোমায় দেখতে চাইলাম। রানি কামিনীকাঞ্চন কী রূপ নিয়ে ব্রহ্মাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করছেন তা সম্পর্কে তোমার চেয়েও আমি বেশি অবগত। তাই আমি জানি আমাদের তুলনা নেহাৎই তুচ্ছ। অমন রূপ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করতে আরও সাতটি জন্ম তপস্যা করতে হবে।”
 কথাটি সমাপ্ত করেই নিজের মাতাকে হাসিমুখে জড়িয়ে নিলো মৃন্ময়ী। কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে কোনো ক্ষোভ, হিংস্রতা ছিলো না। ছিলো কেবল সমর্পণ। 

 রাজমাতা নিজেও এবার মত মেলালেন, “তা-ই তো দেখছি! সে যখন রথ থেকে নামলো আমি বোধকরি কিছু সময়ের জন্য আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। এ কী তার রূপ ছিলো!”

 “আমায় বললে না তুমি যে, আমি নক্ষত্র? আমি নক্ষত্র যেমন তিনি তেমনই শশী। নক্ষত্র সহস্র সহস্র থাকে কিন্তু শশী কেবল একমাত্রই। এখনো তো কার কণ্ঠ, বলার তেজ দেখোনি! দেখলে আরও বিস্মিত হবে।”

  “ভিন্ন কিছু আছে তার ভেতর। এমন কন্যা না জানি কেই-বা গর্ভে ধারণ করেছে!” বেশ আগ্রহের সঙ্গেই বললেন রাজমাতা। যেন তার জানার কী তীব্র ইচ্ছে। জানলে হয়তো সেই গর্ভধারিণীকে প্রশ্ন করতেন, কীভাবে এমন কন্যা গর্ভে ধরেছিলেন!

—————

 প্রভাতের প্রহর তখন বালিকার ন্যায় সদ্য শুভারম্ভ ঘটিয়েছে। রানিদের জন্য যেই কক্ষটি বরাদ্দ করা হয়েছে সেই কক্ষটির বাতায়ন ভেদ করে একটি উজ্জ্বল ভানু হাস্যরত মুখ নিয়ে তাকিয়ে আছে কক্ষের ভেতরের নিস্তব্ধতায়। 
 রানি আরশির সামনে বসে নিজের পোশাক গুছিয়ে নিচ্ছেন। সদ্য স্নান করে আসায় কার মুখটি পবিত্র গঙ্গার মতোই লাগছে। তার অঙ্গভঙ্গিতে সে কী এক ঘোর লেপ্টে আছে! হেমলক অপলক তাকিয়ে আছে সে দিকে। কাল তারা একই কক্ষে রাত্রিযাপন করা শর্তেও কেউ কারো সঙ্গে বিন্দুমাত্র আলাপ অব্দি করেনি। হেমলকের অনুশোচনা বোধ আলাপে বারংবার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। সেই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করার সাহস তার হয়নি। কিন্তু আজ আর সেই নিষেধাজ্ঞায় জোর নেই। লঙ্ঘনের সাহস জুগিয়ে নিয়েছে অন্তর। 

 ধীরে ধীরে আরশির ওখানে ঠিক রানির পায়ের সামনে গিয়ে বসল সে। আরশির সামনে থাকা অলক্তের একটি লাল টুকটুকে শিশি হাতে তুলে নিয়েছে। খুব সাবধানে রানির পদযুগল তুলে নিয়েছে নিজের ঊরুতে। 
রানি টু শব্দটুকু করলেন না হেমলকের এহেন কার্যের গতিধারায়। তিনি নিজ ধ্যানে নিজের কেশগুচ্ছে ধূপগন্ধী ছড়িয়ে নিতেই সমস্ত ধ্যান নিবদ্ধ করেছেন। হেমলক কক্ষে বিধায় কোনো দাসীকেও ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেননি তাই নিজের কাজটুকু নিজে করছিলেন।

 হেমলক গভীর ধ্যানে রানির শরৎ-এর অম্বরে উড়তে থাকা পুঞ্জীভূত নিনাদের ন্যায় কোমল, মোলায়েম পায়ে আঁকতে লাগল অলক্তের সেই তীব্র রঙটি দিয়ে। সেই পানীয় প্রসাধনীটি রানির গাত্রবর্ণে এমন করে চমকালো যেন রঙেরও নতুন একটি রূপ লাভ হয়েছে। 
 “রাজকন্যা মৃন্ময়ীর স্বয়ম্বরের কথাটি বললে না যে আমায়?” হেমলক প্রশ্ন করল ঠিক কিন্তু রানির মুখের দিকে এক পলক তাকালো না। যদি রানি তার দৃষ্টি ও প্রশ্নকে প্রত্যাখ্যান করে দেয় সেই আশঙ্কার। 

 কিন্তু কার দ্বিধা ভুল প্রমাণিত করে রানি বেশি সাবলীল কণ্ঠেই উত্তর করলেন,
 “ভেবেছিলাম মৃন্ময়ী স্বয়ং আপনাকে বলবে। চিত্রশিল্পী হেমলক পিয়ার্সের প্রতি তার আলাদা একটি আকর্ষণ রয়েছে কি-না!”

  “ওসব নেহাৎই তোমার মতিভ্রম।”

“তাই? রানি কামিনীকাঞ্চনের মতিভ্রম হয়েছে কখনো?”

 “এ বেলা হয়েছে হয়ত।” 

রানি ওষ্ঠ টেনে হাসলেন। যেন হেমলকের কথাটিকে নীরবেই প্রশ্রয় দিলেন।

  হেমলক পুনরায় নিজের শুষ্ক কণ্ঠকে ভিজিয়ে বলল, “তোমায় কিছু বলতে চাই। বলা উচিত বোধহয়!”

 রানি নিজের পা দু'টোকে দেখলেন। সামান্য সময়েই পা দু'টোকে জবা ফুলের মতো লাস্যময়ী লাগছে। খুব নিখুঁত হাতেই এই শোভাবর্ধন করেছে হেমলক।
সেই পা নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন রানি, “ব্যক্তিগত আলাপ আমরা নিজেদের রাজ্যে নাহয় করব! এখন নয়।”

 হেমলককে আর কিছু বলতে না দিয়েই বেরিয়ে গেলেন কক্ষ ছেড়ে। হেমলক উদাসী ভাঙ্গিতে শ্বাস ফেলল। যে অনুশোচনা বক্ষ জুড়ে ঘুরছে তা নিয়ে তার দিনযাপন করা কঠিনতম শাস্তি হয়ে উঠেছে। আর সে জানে, রানি ইচ্ছেকৃত সেই শাস্তিটি দীর্ঘ করছেন। এতটুকু সে ধরে ফেলেছে এবার।

—————

 জৈতুনের বৈঠকখানায় সেই কী শোরগোল! বেশিরভাগ রাজা-রানিই উপস্থিত এখানে। এই স্বয়ম্বরের অজুহাতে বেশ অনেকের সঙ্গেই অনেকের সক্ষ্যতা গড়ে উঠেছে। নতুন করে অনেকেই অনেকের সঙ্গে আলাপ করছে। 
 সেখানে দাসদাসীদেরও হুলস্থূল। রাজমাতার আদেশে কিছুক্ষণ পর পরই কিছু না কিছু খাবার নিয়ে তারা উপস্থিত হচ্ছে। সকলের আপ্যায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন রাজা। 

 সেই শোরগোল, কোলাহল এক লহমায় নিস্তব্ধতায় মুড়িয়ে ফেলল একটি নারীর আগমনে। দীপ্তিময় শোভায়, দেহের শুভ্র বস্ত্র যেন পদ্মের মতোই বিভোর করে ফেলেছে সকলের দৃষ্টিকে। ঠোঁটে তার যথারীতি বাঁকানো ভঙ্গিমার হাসি লেপে রানি কামিনীকাঞ্চন বৈঠকখানায় প্রবেশ করতেই কেউ কেউ তো ঘোরগ্রস্তের মতো আসন ছেড়েই উঠে গেলো। তার পেছন পেছন সেনাপতি হ্যাব্রো ও হেমলক এলো বাহুবন্ধনী হিসেবে। 
রানি কামিনীকাঞ্চন সকলের এই ভঙ্গিমায় একটুও ধ্যান না দিলেও মিটমিটিয়ে হাসি দেখা গেলো হেমলকের ঠোঁটে। তার রানির সে কী ক্ষমতা! সে হাসবে না? বেশিরভাগ তো উঠেই গিয়েছে রানিকে দেখে। হয়ত ভুলেও বসেছে তারা অবস্থান করছে কোথায়। 

 রাজকন্যা মৃন্ময়ীর মামীশ্রী তো হা হয়ে গিয়েছে প্রায়। রানি বসতেই সকলের ধ্যানে ভাঁটা পড়ল। মামাশ্রী তার হা হওয়া মুখটি বন্ধ করে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রাজমাতার উদ্দেশ্যে বলল,
 “ইনিই সেই রানি কামিনীকাঞ্চন? আপনি যার কথা বললেন?”

রাজমাতা স্বয়ং রানির দিকে দৃষ্টি স্থাপন করেই মাথা নাড়ালেন। অর্থাৎ ইনিই সেই অনন্যা। 

  সকলের অভিভূত দৃশ্য রানি কামিনীকাঞ্চনের দিক। দু-একজন রাজা তো নিজেদের রানির পূর্ব পরিচিত হিসেবে প্রকাশ করতে বললেন,
 “কেমন আছেন, রানি কামিনীকাঞ্চন? মনে আছে নিশ্চয় আমাকে? পশ্চিমের এক রাজ্যে সাক্ষাৎ হয়েছিলো?”

 রানি নিজের আসনে বসে নির্ভীক স্বরে জানালেন,
 “ভালো আছি। দেখা হয়েছিলো! আমার বিশেষ স্মরণে নেই এত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়।”
 কণ্ঠে কোনো অহং না থাকলেও তার কোমল বাচনভঙ্গিতে উচ্চারিত হওয়া কথাটি বোধহয় বিশেষ পছন্দ হলো না সেই রাজ-রাজাদের।

 জৈতুন রাজ্যের রাজা ও রাজমাতার মুখ আপনা-আপনি ঝুলে গেলো। রানির যেই ভঙ্গিমা, দেখছে আর অবাক হচ্ছে। 
 মৃন্ময়ীও পরিপূর্ণ তৈরি হয়ে এসেছে। আসতে আসতে রানির কথা শুনে না হেসে পারেনি। 

  সেখানের উপস্থিত আরেক রাজা এগিয়ে এলেন। রানির সামনে বেশ আন্তরিক হয়ে বললেন,
“আপনাকে দেখেছিলাম ক্যামিলাস রাজ্যে। রাজা হ্যাভেনকে ঘোড়া দৌড় প্রতিযোগিতায় বেশ দারুণ ভাবে হারিয়ে ছিলেন। আপনার হয়ত আমাকে মনে নেই কিন্তু আমার স্মরণে আছে। এমন তেজ সেই প্রথমই কারো ভেতর দেখেছিলাম। আজ আবার আপনার দেখা পেয়ে ভীষণ ভালো বোধ হচ্ছে।”

 ঘোড়া দৌড় প্রতিযোগিতায় রানির সফলতার কথা শুনে উপস্থিত মহলে যেন আরও নিস্তব্ধতা, বিস্ময় জেঁকে বসল। রানি সাদরে গ্রহণ করলেন নিজের প্রশংসা, “ধন্যবাদ।”

 রাজমাতা আগ্রহী স্বরে শুধালেন, “আপনি ঘোড়া দৌড়ও পারেন?”

“অবশ্যই। রানি ঘোড়া দৌড় হতে আরম্ভ করে তীর নিক্ষেপ, তলোয়ার চালানো, পাশা খেলা সমস্ততেই দুর্দান্ত। তাকে হারানোর সাধ্য করো হয়নি এ যাবতকালে।”
 হ্যাব্রোর গর্বিত বচন বৈঠকখানার সকলে হা করে যেন গিললো। কিন্তু বাঁধ সাধলো রাজকন্যা মৃন্ময়ীর মামীশ্রীর বেলাতে। তিনি কোনোক্রমেই মানতে পারলেন না রানি তাদের মৃন্ময়ী থেকে ভালো খেলতে জানেন। তাই তিনি সামান্য বিদ্রুপ করে বললেন,
 “তা কি সত্যি? আমাদের রাজকন্যা মৃন্ময়ীও পাশা খেলায় বিজয়ী। বেশ কিছু রাজ্যের রাজপুত্ররাও তার কাছে জয়ী হতে পারেনি। এতটাই অসাধারণ সে। মৃন্ময়ীর পাশা খেলা দেখলে রানি নিজেও চমকে যাবেন হয়ত।”

 মামীশ্রীর এহেন কথায় অসন্তুষ্ট হলো মৃন্ময়ী। সে মামীশ্রীকে থামানোর প্রচেষ্টা করবে তার আগেই হেমলক পিয়ার্স প্রতিত্তোরে বলল,
 “আমাদের রানির চেয়ে নিশ্চয় কম জানেন, এতটুকু নিশ্চিত।”

 হেমলকের এই হেলাটুকু মৃন্ময়ী এ পর্যায়ে হয়ত আর গ্রহণ করতে পারল না। হাসিমুখ বজায় রেখেই নিজের পারদর্শিতা প্রমাণ করতে বলল, “রানি অনন্য তা আমি অবগত। তবে এদিক দিয়ে আমি যে কম সেটি কিন্তু মানছি না।”

 “তাহলে না-হয় একবার চাক্ষুষ প্রমাণ হোক কে, কতটুকু দারুণ? আমরাও দেখি!” উপস্থিত একজন ভিন্ন রাজ্যের রানির কৌতূহলোদ্দীপক কথায় সকলেই যেন নিজের মনের ভাবের সঙ্গে মিল পেলো। পুরো বৈঠক মহলও সহমত পোষণ করল, “হোক, হোক।”

  মৃন্ময়ীও বোধহয় চাইল নিজেকে প্রমাণ করতে। রানি কামিনী সকল খেলায় তার দুর্দান্ত বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে এসেছেন সে কথা সকলের অবগত, মৃন্ময়ীও। তবে সে এটিও বিশ্বাস করে যে, পাশা খেলায় তাকে হারানোর সাধ্যি পৃথিবীতে কারও হয়নি। 

মৃন্ময়ীও তাই নিজেকে প্রমাণ করতে সম্মতি জানালো, “তাহলে রানি, একবার হোক খেলা?”

 রানি এতক্ষণ কেবল নিশ্চুপ থেকে এই বিস্তর কথোপকথন দেখছিলেন। একটিবারও নিজ থেকে কিচ্ছুটি বলেননি। কিন্তু এবার মৃন্ময়ীর কথাটি তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সকলে প্রতীক্ষা করে আছে তার প্রতিত্তোরের। বৈঠকখানার সেই উন্মুখ দৃষ্টিকে হিম ধরিয়ে রানি কথা বললেন। গমগম করল তার কণ্ঠ,
 “মিছিমিছি নিজেকে প্রমাণ করার যু দ্ধে আমি কখনোই সামিল হই না, রাজকন্যা মৃন্ময়ী। তবে হ্যাঁ, এটিকে যদি রোমাঞ্চকর করা যায় তবে না-হয় ভেবে দেখা যাবে।”

 মৃন্ময়ী কপাল কুঞ্চিত করল। রানির কথাটি বোধগম্য হলো না ঠিক তার, 
 “যেমন? কীভাবে সেটি করতে চাচ্ছেন?”

 “শর্ত অরূপ করে। খেলবো, জিতবো অথচ কিছু ছিনিয়ে নিবো না তা পানসে লাগাবে জয়কে। তাই চলো আমরা একটি শর্তে আসি। এই খেলাতে বাজি রাখব নিজেদের সবচেয়ে প্রিয় কিছু। যদি আমি জয়ী হই তবে জৈতুন রাজ্য আমায় সঁপে দিতে হবে। বলো রাজি?”

  রানির কথা বজ্রপাতের মতো আঘাত আনলো ভরা সভার নিস্তব্ধতায়। হেমলকসহ সকলেই এই শর্তে হতভম্ব হয়ে গেলো। জৈতুন রাজ্যের রাজাতো আঁতকে চিৎকার করেই উঠলেন প্রায়,
 “কী! কী বলছেন?”

 মৃন্ময়ী ভ্যাবাচ্যাকা খেলো না। তার জয়ের দম্ভ তাকে শান্ত রাখল, “ঠিক আছে, রাজি। আর আমি? আমি জয়ী হলে কী দিবেন?”

 রাজকন্যার এহেন ছেলেভোলানো সিদ্ধান্তে রাজা, রাজমাতা হতাশ হলেন, “রাজকন্যা মৃন্ময়ী, এই রাজ্যের সিদ্ধান্ত একা তোমার নয়!”
রাজমাতা নিজের রাজার সঙ্গে একমত হয়ে বললেন, “একদমই তাই। তাছাড়া রাজ্য নিয়ে কখনো পাশা খেলা যায় না!”

  অবস্থা, পরিস্থিতি আরও অধিক চঞ্চল হলো। সকলের ভেতর একটি টানটান উত্তেজনা। কী হতে চলেছে বোঝা মুশকিল। 
হেমলকের ভেতর ভাবনা বাড়ল। রানি যদিও হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানুষ নন তবুও বিষয়টা যেন কেমন অদ্ভুত হয়ে গিয়েছে। সামান্য খেলার বিনিময়ে এত বড়ো শর্ত?

  মৃন্ময়ীর আত্মবিশ্বাস তখন রাজ্য রক্ষার ভাবনার চেয়েও উঁচু হয়ে গিয়েছে। নিজের মাতা-পিতাকে সে থামিয়ে দিয়েছে চোখের ইশারায়। আশ্বস্ত করেছে জয় তারই হবে। 
এরপর পুনরায় সে রানির দিকে তাকালো উত্তরের আশায়। সে জয়ী হলে রানি কী দিবেন তা-ও তো জানতে হবে!

 রানি এক মুহূর্ত না ভেবেই নিজের দাম্ভিক স্বরে বললেন,
“তুমি যা চাইবে, তা-ই।”

  রাজকন্যা মৃন্ময়ী এবার হাসল। হাসতে হাসতে রানিকে প্রশ্ন করল, "আপনার প্রিয় সকল কিছুই কিন্তু ঝুঁকিতে। হারলে দিতে প্রস্তুত তো?"

 রানি সেই হাসির বিপরীতে নিজের তীক্ষ্ণ চাহুনি ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, "আমি হারতে শিখিনি।"

 "যদি হারেন! তাহলে দিবেন তো?"

রানি সম্মতি প্রদান করলেন তার শীতল কণ্ঠেই, "দিবো।"

"আর যদি না দেন?"

 "আমি এক কথার নারী। আমার কথা কখনো পরিবর্তন হয় না। আমি পুনরায় বলছি, তুমি যা চাইবে তা-ই দিবো।"

  এবার মৃন্ময়ীর হাসি প্রসস্থ হলো, "আমাকে চাইতে বললে আপনার সংসারের ভাগ চেয়ে বসবো কিন্তু। কথা থেকে সরবেন না যেন তখন।"
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp