নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া - পর্ব ২০ - লাবিবা ওয়াহিদ - ধারাবাহিক গল্প

নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া
          সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল। সেলিমের গোপন প্রেমের ইতি ঘটেছে। অনলাইনে শোনা যায় ম্যাচুয়াল ব্রেকআপ। এ নিয়ে সবাই কেমন হা-হুতাশ করছে। বেশিদিন হয়নি তার গোপন প্রেম জানাজানি হয়েছে। আর সময় না পেরোতেই আবার ব্রেকআপ। অহেতুক সাংবাদিকরা তার আগে-পিছে ঘুরছে কারণ জানার জন্য। আরও কত গা জ্বালানো প্রশ্ন যে তাদের ঝুলিতে আছে তাও বোঝা যায়। এজন্য সেলিম সর্বদা এদের এড়িয়ে গেছে। নিজের মন-মানসিকতা ঠিক নেই, আবার মানুষজনের কত কৌতুহল। সবই যে ভিউ ব্যবসা, সেটা সে জানে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সে এখন ট্রেন্ডিং-এ আছে কিনা। ব্রেকআপ হয়েছে অথচ কারো মাঝে কোনো দুঃখের লেশমাত্র নেই। সবাই যেন উৎসব করছে সেলিমের ব্রেকআপের কথা শুনে। 

সেটে ইফরা যখন স্ক্রিপ্ট দেখছিল তখন আড়চোখে লক্ষ্য করে সেলিম একপাশে কপালে হাত চেপে বসা। তার কানের কাছে ম্যানেজার কিছু একটা নিয়ে অবিরত বলে যাচ্ছে। সম্ভবত কোনো শিডিউল নিয়ে কথা হচ্ছে। ইফরা তার নিজের ম্যানেজার আহেরের দিকে তাকাল। সে নীরবে একপাশে দাঁড়িয়ে এক সেটের কর্মচারীর সাথে ফ্লার্ট করছে। এই ছেলে যেখানেই যায় সেখানেই কাউকে না কাউকে পটিয়ে ফেলে। এ নিয়ে বেশ বিরক্ত ইফরা। কোন কুলক্ষণে এটাকে সে ম্যানেজার করেছে? আহের তার ক্লাসমেট ছিল কলেজ জীবনের। বিশ্বস্ত লোক ভেবেই হায়ার করা। কিন্তু এই ছেলের সবেতেই বাড়াবাড়ি। কলেজ জীবনের ফ্লার্টিং এর স্বভাবটা এখনো যায়নি। 

ইফরাকে তার দিকে এমন রক্তচক্ষু করে তাকিয়ে থাকাটা খেয়াল করেই আহের তৎক্ষণাৎ মেয়েটার থেকে বিদায় নিল। খুব দ্রুত পায়ে এসে দাঁড়াল ইফরার পাশে। বেচারা ইফরাকে কখনো ভয় পায়, আবার পায় না। আহের হাসার চেষ্টা করে বলল,
--"এমনি.. আমার বোনের জন্য শাড়ি কিনব তো। তার থেকে জিজ্ঞেস করছিলাম কোনো পরিচিত আউটলেট আছে কিনা।"

ইফরা ভ্রু কুঁচকে বলল,
--"রোজ আমার কাছে বিভিন্ন ব্র‍্যান্ড, আউটলেট থেকে শাড়ি, ড্রেস পিআর আসে। তুমি আমার থেকে তো কখনো জিজ্ঞেস করোনি। তুমি বলতে চাইছ তোমাকে আমি বিশ্বাস করব? বাহানা তো শক্ত হলো না।"

আহের হালকা গলা খাঁকারি দিল। হাসার চেষ্টা করে বলল,
--"আচ্ছা, সরি ইফরা.."

--"কল মি ম্যাম!"

আহের চুপসে গেল। ইফরাকে সে নাম ধরেই ডাকে। কিন্তু ইফরা যখন রেগে থাকে, তাকে দিয়ে গাধার খাটুনি খাটায়। আর ম্যাম ডাকাটা তো বাধ্যতামূলক। কত হাত-পা ধরে যে ইফরাকে শান্ত করে সে। কিন্তু সে তো নিজের অভ্যাসও বদলাতে পারে না। আজ ইফরাকে মানালে পরেরদিন সেই একই কাজ করে আহের।।কন্ট্রাক্টের জন্য ইফরা এটাকে সরাসরি বেরও করতে পারছে না। ইচ্ছে তো মাথাটা কখন যেন ফাটিয়ে দেয়।

ইফরা নিজের রাগ সংবরণ করল। সেটে সে কিছুতেই তার ঘরের রূপ দেখায় না। সদা হাসি-খুশি এবং বিনয়ের হয় সে। ব্যক্তিগত কারণ ছাড়া কাউকে কখনো হাসতে হাসতে অপ মান করেনি সে। যাদের করেছে তারা সেই অপ মানের যোগ্য। 

আহের কথা কাটাতে চাইল। নাটকীয় সুরে বলল,
--"কি লাগবে বলুন ম্যাম। আপনার খেদমতে হাজির আমি আহের।"

ইফরা ইশারা করল সেলিম আর তার ম্যানেজারের দিকে। ইশারাই যেন যথেষ্ট ছিল। আহের সঙ্গে সঙ্গে বলতে শুরু করল,
--"সেলিম ভাইয়ের ব্রেকআপের পর সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল। সেলিম ভাই সমস্ত ইন্টারভিউ, জার্নালিষ্টদের কাটাতে চাচ্ছে কিন্তু কিছুতেই হচ্ছে না। রোজ ঘনঘন কল, ইমেইল আসছে ম্যানেজারের কাছে। সবাই তাদের চ্যানেলে সেলিম ভাইকে নিতে চায়, তার ব্রেকআপ সম্পর্কে জানতে চায়। সেলিম ভাই বলতে আগ্রহী না। এদিকে তার ম্যানেজারও দেখা যায় তাকে এসব ইন্টারভিউর জন্য মানানোর চেষ্টা করছে। টাকা-পয়সার ব্যাপার তো। সেটাই বুঝাচ্ছে।"

ইফরা সেলিমের ম্যানেজারের দিকে তাকাল। বয়স তার বত্রিশ-তেত্রিশ এর ঘরে। নাম সম্ভবত সুজয়। লোকটা সেলিমের অনুভূতির চাইতে টাকা-পয়সা আর ফেমকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ইফরা মিনমিন করে বলল,
--"হারামি ম্যানেজার!"

আহের ইফরার কথাটুকু শুনল। সে মুহূর্তেই বুক ফুলিয়ে বলল,
--"দেখেছেন ম্যাম! আমি ম্যানেজার হিসেবে কত পারফেক্ট। আপনাকে কখনো কোনো কন্ট্রোভার্সিতেই আমি জড়াতে দেই না। আপনার ভ্যালু বজায় রেখেছি। সেলিম ভাইয়ের ম্যানেজারের মতো এত হারামিও না।"

ইফরা আবারও গরম চোখে তাকাল। আহের থমকে গেল। ইফরা কাট কাট গলায় বলল,
--"আমার কখনো কন্ট্রোভার্সিই হয়নি। তুমি কবে সব ম্যানেজ করলে?"

আহের ভাবল, সত্যিই তো। ইফরা তো কখনো কোনো কন্ট্রোভার্সিতেই জড়ায়নি। মুহূর্তেই হতাশ দেখাল আহেরকে। এজন্যই বুঝি ম্যাডামের চোখে তার কোনো দাম নেই? আহের বিড়বিড় করল,
--"আসলেই তো, ম্যাডাম কন্ট্রোভার্সিতে জড়ায়নি কেন? জড়ানোর কথা না? না জড়ালে আমি নিজেকে প্রুভ করব কী করে?"

সেলিম তার ম্যানেজারকে ভাগিয়েছে। মাথাটা ভীষণ ধরেছে। এমনিতেই সারা রাত ঘুম হয়নি, এখন সকাল থেকে ম্যানেজার সুজয় কেমন প্যারা দিচ্ছে। সেলিমের মুখের ক্লান্তি, দুঃখ ভাব সবই মেকআপে ঢেকে গেছে৷ তাকে দেখে ক্লান্ত লাগলেও, কৃত্রিমতার কারণে তার নির্ঘুম রাতের ছাপ মুখে বোঝা যাচ্ছে না। সেলিম মনে মনে ঠিক করে নেয়, সে মুভ অন করে গেলেই সবার আগে এই ম্যানেজারকে বের করবে সে। এর উস্কানি সেলিমের একদমই পছন্দ হচ্ছে না। অথচ এই সুজয়ই তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ছিল। আর এই বিশ্বস্ত মানুষটাই আজ তার অস্বস্তি, অনুভূতির থেকে লাভটা বেশি দেখছে। আসলেই, বিপদে মানুষ চেনা যায়। 

সেলিমের চোখের সামনে কেউ কফি ধরতেই সেলিম মাথা তুলে তাকাল। ইফরা মিষ্টি হাসির সাথে মগটা ধরে আছে। সেলিম হাসার চেষ্টা করল, বিনয়ের সাথে কফির মগটা নিল। অল্প স্বরে ধন্যবাদ জানাতেও কার্পণ্য করল না। ইফরা চেয়ার টেনে তার পাশে বসল। 
--"ভাইয়া, আপনাকে খুবই উসকোখুসকো লাগছে।"

--"কি বলছ? তাহলে তো আরেকবার মেকআপ আর্টিস্টকে ডাকা লাগবে। এমনিতেই ডায়লগ ডেলিভারিতে আজ বেশ জড়িয়ে যাচ্ছি। ঝাড়ি তো কম খেলাম না।"

ইফরা হাসল। হাসি আটকে বলল,
--"আর মশকরা করবেন না তো ভাইয়া। আপনাকে অত বাজেও লাগছে না।"

--"জীবনটাই যে মশকরা হয়ে গিয়েছে ইফরা। সামান্য মশকরায় আর কী আসে যায়?"

সেলিমের তাচ্ছিল্য শুনে ইফরার এবার খারাপই লাগল বটে। মানুষটার ভেতরে কত ঝড় বয়ে যাচ্ছে তা বাহিরের কেউ টের পাচ্ছে না। পাবেও না, সবার চোখ যে অন্ধ নিজস্ব স্বার্থে।

ইফরা কপালে চিন্তার ভাজ ফেলে বলল,
--"পার্সোনাল প্রশ্ন করলে কিছু মনে করবেন?"
--"তোমার সাথে বাউন্ডারি নেই। করতে পারো।!

ইফরা আশেপাশে সতর্ক নজরে তাকাল। সে চাইছে না তাদের মধ্যকার আলাপ পাঁচকান হোক। সে মিনমিন করে প্রশ্ন করল,
--"সব তো ঠিকই যাচ্ছিল, হঠাৎ ব্রেকআপের কারণ? কোনো সমস্যা হয়েছে ভাইয়া? আপনাদের তো বিয়ের প্ল্যান ছিল।"

ইফরার প্রশ্ন আগেই প্রেডিক্ট করতে পেরেছিল সেলিম। এজন্য এই প্রশ্নে সে কোনোপ্রকার প্রতিক্রিয়া করেনি। তবে মুখের থেকে তাচ্ছিল্য ভাবটা উড়ে গেছে, এটা নিশ্চিত। সেলিম দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চাপা গলায় বলল,
--"সমস্যাটা শুরু হয়েছে আমাদের সম্পর্কটা জানাজানি হওয়ার পর। সাধারণ মানুষদের ভাষ্যমতে আদিবা কালো। আমার তো সুদর্শনের সাথে যায় না। এ নিয়ে পাবলিকলি তাকে প্রচন্ড বুলির শিকার হতে হয়। রোজ রোজ এই মানসিক যন্ত্রণা আর সইতে পারছিল না আদিবা। খুব বাজে প্রভাব পড়েছে তার ওপর। সে বাবার রাজকন্যা, ভালো ফ্যামিলি থেকে বিলং করে। কখনো কারো এত সাহস হয়নি তাকে নিয়ে কটু কথা বলার। এজন্য প্রভাবটা বেশিই পড়েছে। তার বাবা এ নিয়ে আমার ওপর খুব রাগারাগি করেছে। এখন তুমিই বলো, আমার এতে দোষটা কোথায়? আমি কতজনকে থামাতে পারব?

তবুও আমি চেষ্টার কোনো বাকি রাখিনি। বারবার ছুটে গেছি আদিবার কাছে। বিয়েও করব বলে কথা দিয়েছি, বিশ্বাস করো ওর বাবার কাছে আমি ডেটও চেয়েছি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। আঙ্কেল আমার মুখের ওপর সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ওনার মেয়েকে অন্য কোথাও বিয়ে দিবেন, যেখানে তার রূপ, সম্মান নিয়ে টানা-হেঁচড়া করবে না। অন্তত প্রাপ্য সম্মানটুকু দিবে, যা আমার সাথে থাকলে এক জীবনে সম্ভব নয়।"

ইফরা আঁতকে উঠল, শেষের দিকে সেলিমের গলাটা কেমন জড়িয়ে গেছে। ভেঙে ভেঙে আসছিল। ইফরা বড্ড সাহস করে করুণ মুখটার দিকে তাকাল। এখানে সেলিম এবং আদিবা আপু দুজনেই ভিক্টিম। পাবলিক ফিগারের নামে তাদের দিন-রাত হেয় করা যেন আজকালকার সাধারণ মানুষদের স্বভাব। একজন পাবলিক ফিগারের কাকে পছন্দ, কে কি করবে সেটা নিশ্চয়ই এই টক্সিক মানুষগুলো ঠিক করে দিবে না। তাদের অতিরিক্ত বুলির জন্য আজ সুন্দর সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে, দুজন মানুষ ধ্বংস হয়েছে। এতে কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই। তারা তো ব্যস্ত কখন কার পিছে চুগলি করবে, কটুকথা শোনাবে আর মানসিক ভাবে তাকে বিধ্বস্ত করবে। বাঙালি কাউকে মানসিক ভাবে মে রে দিতে খুবই ভালোবাসে কিনা। ইফরার রাগে ইচ্ছে করছে সে কটা কঠিন জবাব দিয়ে আসুক। কিন্তু তাতেই বা কি হবে? কজনের জ্ঞান আছে সেসব শোনার? উলটো নির্লজ্জ, বেহায়ার মতো সব ভুলে সেই কটু কথা বলেই তো দিনশেষে পৈশাচিক আনন্দে মুখোরিত হবে। অথচ দোষ না করা পাবলিক ফিগারদের জীবনটা এরাই করুণ ভাবে তছনছ করে দেয়। এদের কী রূহের বদদোয়ার ভয় নেই?

সেলিম থেমে, নিজেকে কিছুটা সামলে বলল,
--"সবচেয়ে কষ্টের কি জানো? আদিবা নিজেও আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সে আমার সাথে যোগাযোগ পর্যন্ত করতে চাচ্ছে না। যখন বললাম আমি অভিনয় জগত ছেড়ে দিব, তখন মেয়েটা তার কসম দেয়, আমি যেন এই জগত না ছাড়ি। সব ঠিক আছে, কসমটা কেন দিল ইফরা? সে তো জানে আমি তাকে ছাড়া থাকতে পারি না। হাজারো ব্যস্ততায় এই মেয়েটাকে আমার লাগেই। ওকে কীভাবে বোঝাব আমার চোখে আদিবা কত সুন্দর? মানুষের কী দরকার ছিল আমার পার্সোনাল বিষয়ে ইন্টারফেয়ার করার? মা মলা যে দেব, কয়জনকে দেব? দিলেই বা কোন লাভটা হবে?"

ইফরা সেলিমকে কি বলবে তা ভেবে পেল না, শুধু পাশে ছায়ার মতো থেকে গেল তাদের নেক্সট শুট আসা অবধি।

—————

প্যারিস সময় সকাল নয়টা। কোনো রকমে ব্রেকফাস্ট করিয়ে সাহিদকে টেনে নিয়ে এসেছে ইসমাত। আজ সাহিদকেও সে অফিসের কাজে ঢুকিয়েছে। এতে সাহিদ প্রচন্ড বিরক্ত। চোখ তার লাল। সারা রাত গেমস খেলে ভোরের দিকেই ঘুমিয়েছিল সে। কিন্তু ইসমাতের জন্য বেশিক্ষণ ঘুমানো যায়নি। একে তো কাউন্সিলের চাপ, তার উপর ওই বুড়ো সাইকোলজিস্টটা কি কানপড়া দিয়েছে কে জানে। সপ্তাহখানেক ধরে ইসমাত তার পিছুই ছাড়ছে না। সবসময় কি সঙ্গীর প্রয়োজন হয়? ইসমাতকে সে বিরক্ত করে হাতে গোণা কয়েক ঘণ্টা, সেখানে পুরো দিনের ঝাল তুলে ইসমাত একাই। এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না। কথায় কথায় মাথায় চাটি মা র তেও ছাড়ছে না। এ নিয়ে সে মাকেও কতবার রাগ করে বলেছে। কিন্তু শাহেলা তার এসব কথা হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন, খুবই বিরক্তিকর সময় চলছে তার। ইসমাতকে তার এই সহ্য হয় আবার হয় না। নিজের ভাবনা, মানসিকতা কিছুই যেন নিয়ন্ত্রণে নেই। সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। কোথায় একটু একা বসবে, সাব্বিরের সাথে সময় কাটাবে তা না।

 ওদিকে সাব্বিরকে যখনই দেখে, সাব্বিরও তাকে টিজ করে এই বলে যে সে ইসমাতের প্রেমে পড়েছে, কিন্তু বুঝতে পারছে না। এই মানসিক ট র্চা র মানা যায়? সাহিদ এই বিষয়ে বড্ড দোটানায় আছে, সে কী করে ইসমাতের প্রেমে পড়বে? প্রেমে পড়ার নির্দিষ্ট কারণও সে জানে না। হ্যাঁ, এটা ঠিক মাঝেমধ্যে ইসমাতের যত্নে কিছুটা মিইয়ে যায়। তবে এসব তার ইগোইস্টিক বিবেক মানতে নারাজ। সে বারবার সাব্বিরের টিজে অস্বীকার করে যায়। সাব্বির তো গতকাল রাতেও বলল,
--"তুই ইসমাতের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিস। আর কারো অভ্যাস হয়ে যাওয়াটা প্রেমেরই লক্ষণ সাহিদ। এই অভ্যাসকে তুই মনে-প্রাণে আগলে রেখেছিস, অস্বীকার করিস না।"

তখন সাহিদ ভেবে পায় না উত্তরে কি বলবে। শুধু দোটানার মাঝেই আটকে রয়। মস্তিষ্ক তখন শূন্য অনুভব হয়। সাব্বির তাকে প্রতিনিয়ত অনুভব করায়, সাহিদ কতটা নির্ভরশীল ইসমাতের প্রতি। সবকিছু খুবই জ ঘ ন্য ভাবে তাকে মনে করানো হয়।

তাদের আনঅফিসিয়াল অফিসে এসেও সাহিদের বিরক্তি কমল না। সে বেশ রুষ্ট গলায় ইসমাতকে ডাকল,
--"আমি কিন্তু একবারও বলিনি আমি এখানে অফিস করব।"

সাহিদের কথা না শুনেই ইসমাত একগাদা ফাইল তার টেবিলে রাখল। সাহিদ এখানে সিইও'র আসনে বসা। ইসমাত ফাইলগুলো দেখিয়ে বলল,
--"বাবা বলেছেন আজ থেকে তুমি অফিসে বসবে। যতটা সম্ভব সময় দিবে এবং তাকে আপডেট করতে থাকবে। বিদেশের মাটিতে বিশ্বাস করার মতো নিজের মানুষের দরকার আছে। ভালো ভাবে ফাইল গুলো দেখে নাও। হিসাব, ডিজাইন, প্লেস সবই একে একে আছে।"

--"আমি বাধ্য নই আপনাদের কথা শুনতে।"

--"তুমি বাধ্যই। বাবা বলে দিয়েছেন৷ হিসাবে গড়মিল করলে সেসব তোমার পকেটমানি থেকে তুলবেন। রেন্টের খরচ থেকে যাবতীয় খরচ বন্ধ করে দিবেন। এখন তুমি কি চাও, প্যারিসের মতো জায়গায় মানুষের দরজায় দরজায় গিয়ে দাঁড়াবে? তোমার মতো সোনার চামচের বড়ো হওয়া ছেলের সাথে তা পোষাবে? ভাবো। ভাবনা এবং সিদ্ধান্ত তোমার হাতে।"

সাহিদের মনে হলো ইসমাত জায়গা মতো তার দিকে পাটকেল ছুঁড়ে বলছে সিদ্ধান্ত নিতে। সোজা ভাষায় জুতো মে রে গরু দান। মুখটা তেতো হয়ে গেল তার। সব যদি তার সিদ্ধান্তই হতো, এত হুমকি আগে দিল কেন? ইসমাতকে দেখেও মশকরা লাগছে না। সে বরাবরই নিজের কাজের প্রতি বেশ মনোযোগী থাকে। দায়িত্ব, কর্তব্যে এক চুলও ছাড় দেওয়ার পাত্রী নয়। তার ডেডিকেশনের প্রশংসা কম শোনেনি সাহিদ। 

--"আমি রাস্তায় থাকলে আপনি কি করবেন?"

--"আমার তো জব আছে, তোমার কি আছে? আমি তো মানিয়ে নিতেই পারব।"

--"আর ইউ কিডিং মি?"
--"আ'ম ড্যাম সিরিয়াস।"

এই পর্যায়ে সাহিদ হতাশ হলো। যেই বাবার ব্যবসাজনিত ব্যাপার থেকে সবসময় দূরে পালিয়ে এসেছে, সেখানে সেই বাবাই তাকে কি বাজে ভাবে ফাঁসিয়ে দিলেন। আসলেই, মাহফুজ সাহেবের ব্রেইনটা খুবই সার্প। তার বিচক্ষণ স্বভাব, ব্যবসার ক্ষেত্রে ঈগল চক্ষু খুবই তীক্ষ্ণ এবং নিখুঁত। এবার সে ব্যবসায়ের দিক থেকেই টোপটা ফেলেছে। এখানে সাহিদের চেনা কেউ নেই, চাকরির মতো অবস্থাও নেই। পুরোপুরি নির্ভরশীল সে বাবা আর ইসমাতের উপর। এটা তার বড্ড ইগো হার্ট করল। সে বিড়বিড় করে বলল,
--"নাহ, সাহিদ ফেল ইন লাভ উইদ হার? ইমপসিবল সাব্বির।"

সাহিদ নিজেকে সামলে তাকাল ইসমাতের দিকে। ইসমাত খুবই বিচক্ষণ চোখে সাহিদকে পড়ছে। সে কল্পনা করছে আগের সাহিদকে। আগের সাহিদ রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না। আগেরজন হলে এতক্ষণে এখানে ভাঙচুর লেগে যেত। ফাইল সব ছিঁড়ে এলোমেলো হতোই হতো। কিন্তু আজ এরকম কিছুই না। খুবই সূক্ষ্ম এক পরিবর্তন সে দেখতে পাচ্ছে। এই পরিবর্তনটা অবশ্য আজকের না। সাব্বিরের মৃ ত্যুর পর থেকে। সাহিদ এক দুবার তার সাথে খারাপ ব্যবহার করে ফেললেও আগের মতো তীক্ষ্ণ, ঘৃ ণাময় হয় না এই ঝগড়াগুলো। বরং ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আবার দুজনের মাঝে শোধবোধ হয়ে যায়, ভুলে যায় ঝগড়ার মুহূর্তটা। যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব নিয়ে চলে দুজনে। 

সাহিদ আরামদায়ক চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিল। পায়ের ওপর পা তুলে খুবই গম্ভীর মুখে বসল। গায়ে পরনে তার ফর্মাল রূপালি রঙের স্যুট। ভেতরে সাদা শার্ট। সে আঙুলের ভাজে সিগারেট নিতে নিতে বলল,
--"এসব করে আমি কি পাব মিসেস?"

বোল্ড.. ইসমাত বিড়বিড় করল। তার এক মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছে সাহিদ তার বস, আর সে সামান্য কর্মচারী। ইম্যাচিওরিটিগুলো কোথায় যেন গায়েব হয়ে গেল, নাকি সাহিদ সব আড়াল করে নিল, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ইসমাত চোখ-মুখ শীতল। ধীরে-সুস্থে জবাব দিল,
--"অফিসটাই তোমার, সাহি.."

--"কল মি স্যার, মিসেস। অফিসে আমি আপনার বস, রাইট?"

ইসমাত আবারও অপ্রস্তুত হলো। সাহিদ তাকে এভাবে শুধু 'মিসেস' ডাকছে কেন? বুকের হৃদপিণ্ডটা অস্বাভাবিক হয়ে এসেছে। সাহিদের এই ধরণের আচরণ অভাবনীয়। এটা সাহিদের নতুন কোনো চাল কিনা কে জানে? তবুও সে সংযত করল নিজেকে। পুরোদমে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে বলল,
--"আপনি কি চান, স্যার?"

--"বলে দিবেন আপনার ফাদার-ইন-ল কে। আমি এখানে আসব, যাব নিজের ইচ্ছায়। কাজ করবও নিজের ইচ্ছায়। আমার এই টাইম ওয়েস্টের জন্য পার মান্থ স্যালারি যেন আমার একাউন্টে ঢোকে।"

ইসমাত তখনো নীরব, মাথা দোলাল। সাহিদকে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ দেওয়াটা প্রতি বাবা-মায়েরই ঘাম ঝরানো ইচ্ছে। তারা নিশ্চয়ই সাহিদকে না করবেন না। তারা যে এটাই চাচ্ছিলেন। সাহিদ জেদের বশেই হোক, আপনা-আপনি অফিসের দায়িত্ব নিতে চাওয়াটা সুখবর। ইসমাত তখন মিথ্যে বলেছিল, শ্বশুরমশাই তাকে ওমন কোনো হুমকিই দেননি সাহিদের জন্য। শুধুমাত্র ইসমাতকে অনুরোধ করেছিলেন ছেলেটাকে যেন ঠিকঠাক বুঝ দিয়ে রাজি করাতে পারে। শ্বশুরমশাই অবশ্য শুনেছিলেন ইসমাতের পরিকল্পনা। তা শুনে কি যে হেসেছিলেন ভদ্রলোক। ইসমাতের তখন যেন পরান ঠান্ডা হয় এই হাসি শুনে। তার মরহুম বাবার কথা মনে পড়ে যায় বারবার। ইসমাতের বাবা-মা কেউ নেই, অথচ সাহিদের থেকেও সে তাদের গুরুত্ব বোঝে না। এটা বহুদিন যাবতই দেখেছে সে, চুপচাপ তত্ত্বাবধানে রেখেছিল।

 যখন সাহিদ মৃ ত্যুর সাথে লড়ছিল তখনই নিজে নিজে প্রতিজ্ঞা করে সাহিদকে সে সবকিছুর অনুভব করাবে, তাকে একজন স্ত্রী হয়ে সোজা পথে টেনে আসবে। সে যত ঝড়ই আসুক।

ইসমাতের সম্মতি দেখে সাহিদ হাসল। সিগারেট ধরাতে গেলে ইসমাত তা মুখের থেকে কেড়ে নিল। এতে অসন্তুষ্ট হলো সাহিদ। ইসমাত তা পরোয়া না করে বলল,
--"এটা অফিস। স্মোক এলাউ নয়।"

--"মাই অফিস, মাই রুলস— মিসেস ইসমাত। আমি স্মোক করব কি করব না সেটা আপনার থেকে নিশ্চয়ই শুনব না।"

ইসমাত ভ্রুক্ষেপ করল না। সটান মে রে দাঁড়িয়ে রইল। বিরক্ত হয়ে সাহিদ আবারও মুখ খুলল,

--"আপনার ফাদার-ইন-লকে বলে দিবেন, লাভ-লোকসান সব আমি বুঝব। ফান্ডিং থেকে শুরু করে সবকিছুর ইনফরমেশনও আমার চাই।"

--"ফাইল দেয়া আছে স্যার। এখানে বসছি আমি, দরকার হলে ডাকবেন।"

ইসমাত ঘণ্টাখানেক যাবৎ সাহিদের ফাইলের পৃষ্ঠা উলটানো দেখছে। শুরু দিকে হম্বিতম্বি করলেও সে মনোযোগী হয়েছে। আগ্রহ নেই, তবুও কপালে কেমন ভাজ পড়েছে। ইসমাত চাপা হাসল। এটাই তো চেয়েছিল সে। সাহিদ যতই অস্বীকার করুক তার ব্যবসার প্রতি আগ্রহ নেই। কিন্তু ঘুরেফিরে সে ব্যবসায়ীদেরই বংশধর। বাপ-দাদার রগে রগে ব্যবসার প্রতি স্পৃহা, চরম নেশা। সেই র ক্ত সাহিদও পেয়েছে। মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এত সহজ? ইসমাত নিজেও এই র ক্তের সম্পর্কে বন্দী, এজন্য এতটা ডেডিকেশন তার কাজের প্রতি। সাহিদের ক্ষেত্রে তো সে শুধু আন্দাজে ঢিল ছুঁড়েছে। কিন্তু তা আলৌকিক ভাবে সত্যি হয়ে যাচ্ছে। ছেলেটা সত্যিই ডুবে গেছে। চোখে এড়াচ্ছে না ভুল গুলো। 

সাহিদ ইসমাতের দিকে মাথা তুলে তাকাতেই ইসমাত এগিয়ে এলো। সাহিদ তার হাতের ফাইলে ইঙ্গিত করে বলল,
--"এটার এই অবস্থা কেন? ফিনানশিয়াল ফাইলে এত গ্যাপ কেন? কয়েক লাখ, কোটি দেখছি এদিক সেদিক করা। এটার কী এক্সপ্লেইন দিবেন মিসেস? আমার পাই টু পাই এক্সপ্লেইন চাই। যারা রেসপন্সিবল, তাদেরো ডাকুন। ঠিকঠাক অফিসই শুরু হলো না আর শুরুতেই এত কারসাজি! আনবিলিভেবল।"

ইসমাত সূক্ষ্ম চোখে দেখল সাহিদের কার্যকলাপ। বড্ড গুরুতর লাগছে ছেলেটাকে। ইসমাত দেখাতে বলল কোন কোন পয়েন্টে সমস্যা। সাহিদ এক দুটো ভুল করলেও বাকিটা ঠিকঠাক দেখিয়ে দিল। ইসমাতের বিচক্ষণ ইন্টারভিউতে সাহিদ পাশ করে গেছে। ইসমাত চরম সন্তুষ্ট হলো। সাহিদের ভ্রু কুঁচকে গেল ইসমাতের মুচকি হাসি দেখে। 
--"হোয়াই আর ইউ লাফিং, ইসমাত? হাসার মতো কিছু বলেছি?"

--"উহু। তবে তুমি কাজের হয়ে বেরিয়েছ। ওটা নকল ফাইল ছিল, জাস্ট তোমাকে পরীক্ষা করতে।"

বলেই ইসমাত আরেকটা ফাইল এগিয়ে দিল। ওটায় সাহিদ দেখল সব ঠিকঠাকই আছে। কোনো গড়মিল নেই। এতেও সাহিদ বিরক্ত হলো, কতগুলা সময় নষ্ট করেছে সে। 

--"এটা ফানি না, ইসমাত। প্র‍্যাঙ্ক করলেন আমার সাথে? এই আপনার বিজনেসের প্রতি সিরিয়াসনেস?"

--"রিস্ক নেওয়ার আগে পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো। অলরেডি লাঞ্চ টাইম হচ্ছে। এখন বাড়ি যাই, আগামীকাল আমাকে তোমার প্রোপার স্কেজিউল দিবে। কবে আসবে, আর আসবে না। কতক্ষণ অফিস করবে, সব! বাবাকে তো সেই অনুযায়ী এমাউন্ট পাঠাতে হবে তোমায়, রাইট?"

সাহিদ সরাসরি না করল না। ভেবে-চিন্তে বলল, "হুঁ।"

এমন সময়ই অফিসে শাবাব এলেন। সালাম দিলেম তার নতুন স্যারকে। ইসমাতের সাথে কুশল বিনিময় করলেন। ইসমাতও কেমন সব ভুলে হেসে হেসে কথা বলছে। ব্যাপারটা অপছন্দ হলো সাহিদের। এমন সময়ই সাব্বিরের দেখা পেল সে। সাব্বির একপাশে দাঁড়ানো। হাসছে সাহিদের অবস্থা দেখে। সাব্বির উসকে দিয়ে বলল,
--"তোর বউ অথচ অন্য ব্যাটার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে! কই, তোর সাথে তো এভাবে হাসে না।"

সাহিদ গম্ভীর হয়ে রইলো, উত্তরে কিছুই বলল না। সাব্বির এতে আরও আশকারা পেয়ে বলল,
--"এবার একটু তো জ্বল বন্ধু! নয়তো তোর বউকে দেখবি তুই ছাড়া সবাই ছুঁয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে। তুই না সাহিদ মুস্তাহাব, তোর জিনিসে হাত দেওয়ার স্পর্ধা কার আছে?"

সাব্বির এভাবেই তাকে কতভাবে কত কি বলে গেল। এতে যা হওয়ার তাই হলো। সাহিদ আচমকা উঠে দাঁড়াল। পরপর মুখোমুখি দাঁড়াল শাবাবের। তার দিকে অসন্তুষ্ট নজরে তাকিয়েই ইসমাতের উদ্দেশে বলল,
--"উই আর লেইট, ইসমাত। লেটস গো!"

শাবাব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন,
--"স্যার, আমি ড্রপ করে.."

--"নো থ্যাঙ্কস। ইসমাত.."

বলেই সাহিদ ইসমাতের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। ইসমাত হতভম্ভ। হঠাৎ কি হলো এই ছেলের? আগে কখনো যে এমন আচরণ করেনি। সাহিদের এই রূপটা তার বেশ অচেনা। ইসমাতকে নিয়ে সে চলে যাওয়া ধরতেই শাবাব পিছুডাক দিল।
--"স্যার, বলাই তো হয়নি আগামীকালই আপনাদের আমার বাড়ি দাওয়াত। প্লিজ আসবেন, আমার ওয়াইফ এক সপ্তাহ ধরে অনেক কিছুই আয়োজন করেছে। আমার বাচ্চা ছেলে-মেয়েরাও আপনাদের সাথে পরিচয় হতে মুখিয়ে আছে।"

শাবাবের কথায় সাহিদ থামল৷ কেন যেন খুব আরাম অনুভব করল। এমন শান্তি শান্তি অনুভূতিটা শেষ হবে পেয়েছিল? সাহিদ পিছে ফিরে সম্মতি জানাল,
--"শিওর। টাইমলি চলে আসব।"

সাহিদ যখন ইসমাতকে নিয়ে লিফটে উঠল, ইসমাত তার মাথার চুলে হাত দিতে চাইল। কিন্তু তৎক্ষণাৎ সাহিদ তার হাতটা খপ করে ধরে ইসমাতের দিকে তাকাল। কেন যেন ইসমাত ভড়কে গেল। মিশে গেল লিফটের কাচের দেয়ালে। সাহিদও একই ভাবে এগিয়ে গেল। ইসমাতকে বন্দী করে ফেলল সাহিদের মধ্যে। আজ বুঝি ইসমাতের অবাক হওয়ার পালা। সাহিদ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
--"আ'ম নট এনি চাইল্ড.. ইসমাত। ডোণ্ট ডেয়ার টু স্লেপ মাই হেড! নট এনিমোর! নয়তো আমিও চরম অভদ্র হবো।"

ইসমাত বিমূঢ়, চোখ কপালে তুলেছে। সাহিদের হাতটা কোমর ছুঁইছুঁই। ইসমাত অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
--"সাহিদ! আমি তোমাকে মা র তে যাইনি।"

সাহিদ ইসমাতের কৈফিয়ত শুনল না। 
--"কিপ মাই ওয়ার্ডস ইন মাইন্ড।"

বলেই সাহিদ দূরে সরে দাঁড়াল। এতক্ষণে বুঝি ইসমাত দম ফেলতে পারল। কিছু কিছু পরিবর্তন মানা যায়, কিন্তু এরকম দম বন্ধকর কিছু? ইসমাত ভাবলেই কেমন গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিল এর থেকে দূরে সরে থাকবে, তার নিজেরও এসব শক থেকে উঠে আসার অধিকার আছে।

—————

দাওয়াতের জন্য সাহিদ ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে বসা। সাহিদ সবসময়ই কালোতে কম্ফোর্ট। তার কালেকশনের বেশিরভাগই কালো। এবারও তাই। এখানে ওমন গরম নেই যে কালো পরা যাবে না। বাংলাদেশে এত জন্য বেশ সমস্যা পোহাতে হতো। কালোতে গরম লাগে বেশি। উত্তাপ যেন শুষে নেয় এই কালো। তবুও কালো রং কখনো তার জন্য অপছন্দের কারণ হয়নি।

ইসমাতের তখনো হয়নি। এজন্য সে অপেক্ষার নামে দুটো সি গারেট শেষ করেছে। তৃতীয়টা ধরানোর আগেই ইসমাত বের হয়ে এলো। ইসমাত আজ একটা গাউনের মতো ওয়েস্টার্ন পরেছে। এই ড্রেসটা মেরুন রঙের, খুবই গাঢ়। যা বেশ খাপ খাইয়ে গেছে তার উজ্জ্বল গায়ের রঙের সাথে। এই ড্রেসটা সে নিজের টাকা দিয়েই প্যারিস থেকেই নিয়েছে। প্রথম দেখায় এত চোখে লেগে গেছিল যে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

উঁচু কালো হিল, চুলগুলো কার্ল করে কিছু অংশ ডান কাঁধে এনে রাখা। গলায় ছোটো ডায়মন্ডের পেন্ডেন্ট। মুখের সাজও ড্রেসের সাথে মানানসই। আজ ইসমাতের নাকে ক্ষুদ্র এক নথ উঁকি দিচ্ছে। তার সাজ দেখে সাহিদের আর সিগারেট ধরানো হলো না। সেটা হাতে নিয়েই সাহিদ বেকুবের মতো তাকিয়ে আছে ইসমাতের দিকে। ইসমাত সেই নজর খেয়াল করলেও উপেক্ষা করল, কেমন যেন শিরশির অনুভূতি হচ্ছে। সাহিদ সেই উপেক্ষার ধার ধারল না, একই ভাবে চেয়েই রইল। ইসমাত তখন তার পার্স সিলেকশনে ব্যস্ত। 

সাহিদ তৃতীয় সিগারেটটা আবারও প্যাকেটে ঢুকিয়ে উঠে দাঁড়াল। হাতে তুলে নিল লম্বা কোটটা। দুজন নিরিবিলি বেরিয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় সাহিদ কিছুটা কাছাকাছি এলো ইসমাতের। ম্যান পারফিউম তখনই নাকে এসে ধাক্কা খেল। ইসমাত ভ্রু কুঁচকে বলল,
--"কী?"

--"উই'র কাপল, ইসমাত। কাছাকাছি থাকাটাই নরমাল।"

--"এত কাছে থাকতে হবে না।"

ওরা নেমে আসতেই দেখল বাড়িওয়ালীকে। বৃদ্ধা ওদের দেখে চমৎকার হাসলেন। 
--"এনি ডিনার ডেট?"

সাহিদ মুহূর্তেই ইসমাতের কোমর আগলে কাছে টেনে নিল। ইসমাতকে নড়চড়ের সুযোগটাও দিল না। মুচকি হেসে বলল,
--"ইয়াহ। উই'র পার্ফেক্ট, আরেন্ট উই?"

--"অফ কোর্স, অফ কোর্স— ইয়াং ম্যান। মেইড ফর ইচ আদার।"
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp