নভেম্বর পেরিয়ে এলো ডিসেম্বর।
সূর্য ওঠার সময় হয়ে গিয়েছে। ঘড়ির কাঁটা ছুঁয়েছে ছয়টা চৌদ্দতে। তবে সূর্য ওঠেনি, মেঘে ঢেকে আছে আকাশ। গতমাস থেকে সূর্য পুরোদমে ওঠার তেমন সুযোগ পায়নি। আকাশ সর্বক্ষণ মেঘলা থাকে। এতে করে প্রকৃতিতে শীতের আলোড়ন বেড়েছে কয়েকগুণে। ঘাসের ডগায় ডগায় শিশিরবিন্দুর আধিপত্য। মনে হচ্ছে কুয়াশায় মিলিয়ে গিয়েছে সবটা। রোযা ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। সদ্য ঘুম ভাঙা তার চোখমুখে লালিমা। পরনে নাইটগাউন, ওপরে শুভ্র রঙা চাদর জড়ানো। চুলগুলো এলোমেলো খোঁপায় বাঁধা। তার পিছুপিছু নূরজাহানও বেরিয়েছে। রোযা জুতোজোড়া খুলে ফেলল সিঁড়ির কাছে এসে। নূরজাহান মুখ খুলল কিছু বলবে বলে! অথচ বলল না রোযার ওমন উপভোগ্য চোখমুখ দেখে। অগত্যা নিজেও জুতোজোড়া খুলে নগ্ন পায়ে ঘাসের পথটুকু হাঁটল মালকিনের দেখাদেখি। থোর-তিতান ছুটে এলো তখুনি। ঘুরছে তার চারিপাশে। রোযাকে বেশ পছন্দ করে। রোযা হাঁটল বাগানের পাশটা জুড়ে। তার পিছুপিছু কিছুক্ষণ হেঁটে তিতান - থোর বসে পড়ল। ফুলগুলো শিশিরে ভিজে আছে কেমন। টগবগিয়ে আছে। নূরজাহান এযাত্রায় বলল -
‘ঠান্ডা লাগবে ম্যাডাম।’
রোযা হাসল, শব্দহীন। চাদরটা গায়ে আরও ভালোভাবে জড়িয়ে কুয়াশায় ঢেকে যাওয়া চারিপাশটা দেখতে দেখতে বলল, ‘এতটাও নাজুক তো নই আমি।’
‘নাজুক নন, সত্য? ননীর পুতুল বলে স্যার।’
রোযা চমকাল সামান্য। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে তাকাল। দেখল নূরজাহানের ঠোঁটে মৃদু হাসির রেখা। চোখে দুষ্টুমির ছটা। রোযা দৃষ্টি এড়াল, কানে ভাসল একটা গম্ভীর, গভীর কণ্ঠ। যা ভীষণ অনায়সে বলে বসেছিল, আমার ননীর পুতুল!
রোযার হৃৎপিণ্ডটা সাথে সাথে দুবার ঝাপিয়েধাপিয়ে আগের জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে তাকাল উত্তরদিকে, যেখানে থাকে আদিল মির্জার নিত্যদিনের ব্যবহৃত গাড়িগুলো। নেই গাড়িগুলো, মাঝরাতেই বেরিয়ে গিয়েছে। ফিরেছিলেও বেশ রাত করে — ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছাড়িয়ে একটা ছুঁবে তার একটু আগে। ফের চারটের আগে বেরিয়ে গিয়েছে। রোযার ঘুমও ভেঙে গিয়েছিল লোকটার যাওয়ার সাথে সাথে। আদিল অবশ্য সাবধানে তার ওপর থেকে উঠে ভীষণ সন্তর্পণে, নিঃশব্দে তৈরি হয়ে বেরিয়েছিল। অথচ রোযার ঘুমটা ছুটেছে আদিল উঠতেই। তবুও সে ঘুমের ভাণ ধরে পড়েছিল। তারপর আর ঘুম আসেনি। কিছুক্ষণ বিছানায় এপাশওপাশ করে অবশেষে উঠে পড়ল। হৃদিকে দেখে এসে ভোরটা উপভোগ করতে নেমে এলো। এযাত্রায় কদম বাড়াল পাশে রাখা টেবিল চেয়ারের দিকে। গিয়ে বসল চেয়ারে। নূরজাহান মিষ্টি করে শুধাল -
‘ম্যাডাম, কফি করে আনি?’
রোযা তাকাতেই নূরজাহান পুনরায় বলে, ‘আমার জন্যও সাথে।’
হেসে ফেলল রোযা। মাথা দোলাতেই নূরজাহান ভেতরে চলে গেলো। রোযা বা-গালটা বাহুতে কাত করে রেখে নির্নিমেষ চেয়ে থাকল কুয়াশার ভাঁজে ভাঁজে। অন্যমনস্ক হলো দৃষ্টি, ভাসা ভাসা হয়ে এলো। সঙ্গে সঙ্গে একটা মুখ উদয় হলো সে ভাসা ভাসা চোখে। অস্পষ্ট থেকে তা পরিষ্কার হতে থাকল ক্রমশ। কাটকাট একটা মুখ। ধূসর মণির তীক্ষ্ণ, ধারালো চোখ। যখন সরাসরি তাকাল তার চোখে মনে হলো হিংস্র এক সিংহ চেয়ে আছে। শিকার করার পূর্বে তাকে দেখে নিচ্ছে আপদমস্তক। চমকে উঠল রোযা। মাথাটা ঝাকিয়ে আশেপাশে চেয়ে বুঝল সে আদিলকে নিয়েই ভাবছিল আবারও। আজ নয় এমন। কিছুদিন ধরেই এমন হচ্ছে। রোযা অন্যমনস্ক হচ্ছে। এমনতো আগে হয়নি। রোযা তার ঊনত্রিশ বছরের এই জীবনে কখনো কাউকে নিয়ে এতো ভাবেনি। ক্রমশ সে শুধু হতবিহ্বল হয়ে অনুভব করে গেলো কিছু একটা পরিবর্তন হতে শুরু করেছে।
‘মম!’
ঘুমঘুম কণ্ঠের ডাক কর্ণগোচর হতেই রোযার ভাবনারা পালিয়ে কুয়াশার সাথে মিলে গেল। হৃদি ছুটে আসছে। পরনে কার্টুনের স্লিপিং পিজি সেট। কোকড়া চুলগুলোতে রাতে বিনুনি করে দিয়েছিল সে। তা আপাতত এলোমেলো হয়ে পাখির বাসাতে রূপান্তরিত হয়েছে। নগ্ন পায়ে হৃদি ছুটে এসে উঠেছে মায়ের কোলে। বুকে মিশে যেতেই, রোযা তার গায়ের চাদর দিয়ে ঢেকে ফেলল এইটুকুন শরীরটা। শুধু হৃদির মাথাটা বেরিয়ে আছে। বাচ্চাবাচ্চা চোখমুখ ঠান্ডায় লালিমার ছটা পড়েছে। বাচ্চাটার ঘুম পুরোপুরি হয়নি। মায়ের বুকে মিশে পুনরায় চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়েছে। রোযা নিঃশব্দে হেসে মুখ থেকে এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলো। নূরজাহান এলো তখুনি। মেয়েকে একহাতে বুকে আগলে অন্যহাতে বাড়িয়ে দেয়া কফির মগটা নিলো রোযা। নূরজাহান বলল -
‘প্রিন্সেসকে আমার কাছে দিন ম্যাডাম। আমি কোলে নিচ্ছি।’
ঘুমন্ত বাচ্চাটা বোধহয় শুনল সে কথা। বিপরীতে গুঙিয়ে আরও গাঢ়ভাবে নড়ে বোঝাল কারও কোলে যাবে না সে তার মা ব্যতীত। রোযা হেসে ফেলল। হৃদির পিঠ বুলিয়ে বলল -
‘বসুন নূরজাহান। থাকুক আমার কাছে।’
নূরজাহান বসল রোযার সামনে। কফির মগে চুমুক দিয়ে আচমকা শুধাল -
‘একটা প্রশ্ন করব ম্যাডাম?’
রোযা মগে চুমুক বসিয়ে তৃপ্তি পেয়েছে। কফিটা মজা হয়েছে। বলে, ‘করুন না।’
নূরজাহান সময় নিলো একটু। রোযার ঝলমলে, প্রাণবন্ত মুখে চেয়ে বলে বসল -
‘আপনার এখনকার লাইফ কেমন লাগছে, ম্যাডাম?’
এমন এক সাধারণ প্রশ্নে আশ্চর্য হলো রোযা। পলক পড়ল না অনেকক্ষণ। দেখল শুধু নূরজাহানের মুখ। ধীরে ধীরে দৃষ্টি শূন্যে পৌঁছে গেলো। কেমন লাগছে এই জীবন? প্রশ্নটা আবারও আওড়াল সে। কেমন লাগছে? কেমন? লাগছে? উত্তর পেলো না। নাকি সে উত্তরটা বুঝতে নারাজ? রোযা দ্বিধাদ্বন্দে থাকা মুখে চেয়ে নূরজাহান অনুতপ্ত হয়ে বলল -
‘কঠিন প্রশ্ন করে ফেললাম মনে হয়। দুঃখিত ম্যাডাম।’
রোযা জবাব দিতে পারে না। চোখে ভাসে তার এখনকার জীবন। একেক করে সব। নূরজাহান কথা ঘোরাল, ‘প্রিন্সেস একদম স্যারের মতন হয়েছে, তাই না ম্যাডাম?’
রোযার মস্তিষ্ক ঘুরে যায় সে কথায়। ভাসে আদিল মির্জার মুখ আর হৃদির মুখ। বাবা-মেয়ের চোখ, নাক, থুতনি একইরকম। ভ্রু জোড়াও একইরকম। আদিলের নাকের ডগায় আর ঠোঁটের নিচে তিল আছে। হৃদি বাবার নাকের ডগার তিল পেয়েছে। ঠোঁটের নিচেরটা পায়নি। দুজন পাশাপাশি থাকলেই তাদের সম্পর্ক বলে দেয়া যাবে।হঠাৎ কিছু একটা অনুধাবন করে রোযা বুকটা ছলাৎ করে উঠল। পরমুহূর্তেই হৃৎপিণ্ডটা ভার লাগল ক্রমশ। এতো খেয়াল করে সে আদিলকে কখন দেখল? যখন তারা একসাথে শোয়? যখন তারই গায়ের ওপরে পড়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়?
‘ম্যাডাম?’
রোযা চোখ তুলে তাকাল। চোখেমুখে দ্বিধা, সংশয়। নূরজাহান মৃদু হেসে হাতটা বাড়িয়ে ধরল রোযার কফির মগ ধরা হাতটা। আশ্বস্ত করতে হাতটা বুলিয়ে বলল -
‘খোদাতায়ালা যা করেন ভালোর জন্য ম্যাডাম…’
রোযা মুখ ফসকে বলে ফেলল, ‘এই ভালো, এমন জীবন তো আমি চাইনি নূরজাহান। আমি…এমন কাউকে চাইনি, আম…’
রোযা আর কিছু বলতে পারল না। নূরজাহান বুঝল না বলা কথাগুলোও। রোযার হাত থেকে মগটা নিয়ে টেবিলে রেখে আলতো করে ধরল হাতটা। ক্রমান্বয়ে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল -
‘আপনি হয়তো চাননি, ম্যাডাম। কিন্তু যে চেয়েছে, সে হয়তো ভীষণ আরাধনা করে আপনাকে চেয়েছে বলেই পেয়েছে। হতে পারে আপনি তার জন্য খোদাতায়ালার দেওয়া এক অনন্য উপহার।’
রোযা অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল নূরজাহানের মুখের দিকে। নূরজাহান ভীষণ স্বাভাবিক। তার চোখমুখের অভিব্যক্তি যে ভীষণ রহস্যময় লাগল রোযার কাছে। ভেতরের ধড়ফড়ানো ক্রমশ বাড়তে থাকল।
—————
সূর্য ডুবেছে, চাঁদ উঠেছে আকাশের বুকে। আলমগীর সওদাগরের মুখের হাসির নড়চড় হলো না আদিল মির্জার উপস্থিতিতে। স্বেচ্ছায় চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে দিব্যি হাত মেলাল। যেমন বড়ো ধরনের লোকসান ওপর ব্যক্তি তার করেনি। হাত ভেঙে ধরিয়ে দেয়নি ভাঙা থালা। আদিল ভদ্রলোকের আচরণে সন্তুষ্ট হয়। হাত মিলিয়ে ঝাঁকুনি তুলে বেশ কৌতুক সুরে বলল -
‘অহংকারের চেয়ে বাধ্যতা সুটস ইউ মোর, মিস্টার সওদাগর। আই লাইক ইট।’
আলমগীর সাহেবের হাতের আঙুল গুলো নড়ল মৃদু। রাগে হাত মুকরতে গিয়েও করলেন না। অভিব্যক্তিতে আসতে দিলেন না একচুল পরিবর্তন। সাবলীলভাবে বললেন -
‘বসো.. বসো। আমি তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম।’
আদিল বসল গিয়ে ফাঁকা সোফাটায়। তার এলোমেলো বসার ধরন। পেছনেই শান্ত, এলেন দাঁড়িয়ে আছে। বেশ বড়সড় রাইফেল হাতে দুজানার। শক্তি, সামর্থ্যের এক চমৎকার নিদর্শন। ওদিকে চোখ রাখলেন না আলমগীর সওদাগর। প্রয়োজনে মাথা নোয়াতে তিনি জানেন। এভাবে এভাবে তো আর এতদূর আসেননক। লাল রঙা মদ গ্লাসে ঢেলে আদিলের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলেন -
‘আমার নাতি কেমন আছে?’
আদিল নিলো না মদের গ্লাস। ভ্রু তুলে তাকাল। যেন কী প্রশ্ন করছে তা বোঝেইনি। আলমগীর সাহেব আস্তে করে বললেন -
‘যতই হোক, আমাদেরও তো র ক্ত আমিরা।’
আদিল বাঁকা হাসল। এযাত্রায় সূক্ষ্ম ভঙ্গিতে একটা সিগারেট ঠোঁটের ভাঁজে পিষে তা ধরাতে ধরাতে রহস্যময় ভঙ্গিতে টেনে আওড়াল -
‘তাই?...ইনট্রেস্টিং। আরও বলুন তো। আমি কিছু জানি না কেনো?’
আলমগীর সাহেব থমকালেন। এইমুহূর্তে বাচ্চা নিয়ে কথা বলে আগেই জল ঘোলাতে চাইলেন না। আদিল বরাবরই আমিরাকে নিয়ে ভীষণ হিংস্র। ঝামেলা করতে দুবার ভাববে না। খানিক চুপ থেকে কি ভাবলেন কে জানে! তিনি আলাপ ঘুরিয়ে ফেললেন -
‘সোবহান চৌধুরী গত হলো। ঋণা আপাতত একটু মেন্টাল প্রেসারে আছে। সোবহান চৌধুরীর পোলাপান গুলো ঝামেলা করছে। সম্পত্তির হকদার তো স্ত্রী হিসেবে ঋণা নিজেও! সেই হকের জন্য এতো ঝামেলা…’
কেবিনের দরজা খুলে প্রবেশ করল দিকপাল চ্যাটার্জি, আইন মন্ত্রী আব্দুল মান্নান। দুজানাই শুনলেন আদিলের বিদ্রুপ -
‘আপনার পারিবারিক আলাপ শোনার জন্য এখানে এসে বসিনি। এই আদিল মির্জার এতো ফালতু টাইম নেই।’
না, নিজেকে শান্ত রাখতে পারছেন না আলমগীর সওদাগর। ক্রোধ সামলে তাকালেন প্রবেশ করা আব্দুল মান্নানের দিকে। সে ভদ্রলোক এসে গদগদ করে বসলেন আদিলের পাশে। আদিলের ফুলো মাশলসে আঙুল দিয়ে গুতো মেরে বললেন -
‘মাই বয়, ইউ লুক স্ট্রং।’
আদিল ফিরে তাকাল না। দিকপাল চ্যাটার্জি হাসতে হাসতে বসলেন পাশে। আলমগীর সওদাগর মদের গ্লাসটা এগিয়ে দিলেন আব্দুল মান্নানের দিকে। ভদ্রলোক তা নিয়ে খেতে খেতে তাড়া দিলেন -
‘কীজন্যে ডাকছো তাড়াতাড়ি বলো। আমি একটা ইম্পর্ট্যান্ট মিটিংয়ে ছিলাম!’
আলমগীর সওদাগর মুখ বাঁকালেন। সব জেনেশুনে না জানার ভাব করছে কেমন! পাঞ্জাবির কলারে আবার লিপস্টিকেরও দাগ। মিটিং না ছাই! ঊনিশ বিশে বাঁধা পড়েছে তা বললেই হয়।
‘মন্ত্রী সাহেব, আমরা এক নৌকার মানুষ। একজন আরেকজনরে সাহায্য এটাই তো নিয়ম, নাকি? আদিল কি কাজটা ঠিক করতেসে?’
আব্দুল মান্নান আগ্রহ দেখালেন বেশ, ‘কী করেছে? শুনি!’
‘সোবহান চৌধুরীর পোলাদের সাহায্য করতেসে। কোনোভাবে আগাতে পারছি না।’
আব্দুল মান্নান মান্নান বেশ অভিনয় করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আদিলের দিকে ফিরে বলতে চাইলেন, ‘খুব খারাপ। এটা কি ঠিক হচ্ছে না আদি…’
আদিলের দৃষ্টি দেখতেই ভদ্রলোক চুপসে গেলেন। তার টাকার মেশিন রেগে গেলেইতো সমস্যা। তিনি থামলেন। আলমগীর সওদাগর বুঝলেন। নিজে বললেন -
‘দেখো, কোটিকোটি টাকার সম্পদ। ঋণার এতো মেহনত ওখানে…’
আদিল পায়ের ওপর পা তুলে তাকাল সোজা চোখে, ‘মেহনত তো অবশ্যই। বিছানায় এতকাল শুতে হলো।’
আলমগীর সওদাগর নিজের ক্রোধ সামলাতে পারলেন না। মুহূর্তে দাঁড়িয়ে উঠে চিৎকার করে ওঠেন, ‘আদিল নিজের সীমারেখা অতিক্রম কইরো না। ফলাফল ভালো হবে না কিন্তু!’
আদিল স্বাভাবিক বেশ, ‘ওয়াও, আম সো অ্যাফরেইড, মিস্টার সওদাগর।’
ক্রোধে দিশাহারা হলেন আলমগীর সওদাগর। মুখে যা এলো বলে ফেললেন -
‘সময় বাপকেও ছাড়ে না। তা তো তোমার চেয়ে ভালো জানার কথা না? পরিণতি কী হয় দেখছো না? কীভাবে মা রা পড়ল তোমার বা….’
আর বলতে পারল না আলমগীর সওদাগর। আদিল সিংহের মতন ঝাঁপিয়ে পড়ল। আলমগীর সওদাগরকে পিষে ধরল কাচের টেবিলের ওপরে। ঘুষি মুখ বরাবর বসাতে যেতেই আলামগীর সাহেব মাথাটা সরিয়ে ফেললেন। আদিলের ঘুষি পড়ল কাচে। সঙ্গে সঙ্গে কাচ ভেঙে ঢুকল হাতে। র ক্তে ভেসে গেল সবটা। সেভাবেই ক্রমান্বয়ে ঘুষি বসাল আলমগীর সওদাগরের মুখের ওপরে। শক্ত হাতের কয়েকটা ঘুষি চোয়ালে পড়তেই দাঁত ভেঙে র ক্ত বেরিয়ে এলো।
‘খান**** দেখিস নাই কী হাল করছি ওই কুত্তারবাচ্চাদের? কুত্তারে দিয়ে জানোয়ারের বাচ্চাদের মাংস খাওয়াইছি। আমা্রে শেখাইতে আসছস পরিণতি? আমি তোর পরিণতি লিখব।’
ততক্ষণে শান্ত আর এলেন তাদের বডিগার্ড দিয়ে জায়গা ঘিরে ফেলেছে। নৈবেদ্য পড়ল ঝামেলায়। আড়চোখ তুলে তাকাতেই শান্তর চোখের সাথে দৃষ্টি মিলল। ইশারা করে ছোটার ভঙ্গিমা ধরল নিজের বসকে রক্ষা করতে। সাথে সাথে শান্ত নৈবেদ্যকে পিষে ফেলল ফ্লোরের সাথে। দুটো ঘুষি মে রে আটকে রাখল। আব্দুল মান্নান সাহেব এইপর্যায়ে এসে আটকাতে চাইলেন। মার যা খাওয়ার ততক্ষণে খেয়ে ফেলেছেন আলমগীর সওদাগর। জ্ঞান হারানোর অবস্থায় ভদ্রলোক। আদিল উঠে দাঁড়াতেই শান্ত ছাড়ল নৈবেদ্যকে। ফিরে গেল বসের পেছনে। একটা রুমাল বের করে বাড়িয়ে ধরল। সে রুমাল দিয়ে হাত মুছতে মুছতে আদিল দরজার দিকে কদম বাড়াল। দিকপাল চ্যাটার্জি আর আব্দুল মান্নান নিজেদের মধ্যে চাওয়াচাওয়ি করে পালালেন আদিলের পিছু পিছু।
—————
গাড়ি ছুটে চলেছে নির্জন মাঝরাস্তায়। গন্তব্য, বাংলো। আদিল মাথা এলিয়ে রেখেছে সিটে। বসের শক্তপোক্ত, রাগে জমাট বাঁধা মুখ দেখে শান্ত আজ আর বাড়তি কোনো কথা বলল না। নামের মতোই শান্ত আছে সে। গাড়ির ভেতর দীর্ঘ সময় ধরে থমথমে নীরবতা বয়ে গেল। একসময় আদিল চোখ মেলল।
'নৈবদ্যকে রাতে আসতে বল। কাজ আছে।’
শান্ত সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিল, 'ইয়েস, বস।'
আদিল পাশ থেকে ল্যাপটপটা টেনে এনে ঊরুর ওপর রাখল। স্ক্রিন জ্বলে উঠতেই সরাসরি ঢুকে গেল সিসিটিভি ফোল্ডারে। মুহূর্তেই ভেসে উঠল বাংলোর বিভিন্ন প্রান্তের লাইভ ফুটেজ। এক এক করে সবগুলো স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে হঠাৎ থেমে গেল তার দৃষ্টি। লিভিংরুম। যা দেখল, তাতে অজান্তেই তার ভ্রু সামান্য উঁচু হয়ে উঠল। দ্রুত ব্লুটুথ কানে গুঁজে নিল সে -
লিভিংরুমে দাঁড়িয়ে আছে নূরজাহান, মরিয়ম বেগম আর শাপলা বেগম। তিনজনের চোখেই মুগ্ধতা। সাউন্ড বক্সে বাজছে পুরোনো এক বলিউড গান। হৃদি লাল একটা ওড়না গায়ে জড়িয়ে মায়ের সঙ্গে তাল মেলানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছে। রোযা গানের তালে তালে তাকে নাচ শেখাচ্ছে। হৃদি খিলখিল করে হাসছে, কখনো মায়ের চারপাশে ঘুরছে, কখনো হাত বাড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছে। নাচতে নাচতে রোযার গাউনটা বাতাসে বৃত্ত এঁকে উঠল। সঙ্গে ঘুরে উঠল তার কোমর ছাপানো চুল। হাসতে হাসতেই সে হৃদিকে কোলে তুলে নিল। মুহূর্তেই মা-মেয়ের প্রাণখোলা হাসিতে ভরে উঠল পুরো লিভিংরুম।
ঠিক তখনই…ঘুরতে ঘুরতে রোযার দৃষ্টি গিয়ে থামল এক কোণে জ্বলতে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরায়। মুহূর্তে থেমে গেল তার পাজোড়া। ঠোঁটের হাসিটাও মিলিয়ে গেল ধীরে ধীরে। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শব্দ তুলে কেঁপে উঠল হৃদস্পন্দন। সে চোখ ফিরিয়ে নিল। আবারও দ্বিধাভরে তাকাল ক্যামেরাটার দিকে। লোকটার নিশ্চয়ই এত সময় নেই, বসে বসে সিসিটিভিতে তাদের এসব দেখার? ঠিক তখনই হৃদি মুখ বাড়িয়ে রোযার গালে একটা চুমু খেল। জিজ্ঞেস করল মিষ্টি করে -
'কী হয়েছে? থামলে কেন, মম?'
রোযা মেয়ের দিকে তাকিয়ে জোর করে হাসল। মাথা নেড়ে আবার নাচতে চাইল। কিন্তু মনটা যেন অন্য কথা বলছে। কেন জানি মনে হচ্ছে ওপাশে আদিল মির্জা আছে।
এতক্ষণ আদিলের চোখ ছিল স্থির। রোযার ক্যামেরার দিকে তাকানো দেখে তার দৃষ্টি আরও নিবিড় হয়ে উঠল। অদ্ভুত এক মুগ্ধতা ধীরে ধীরে গ্রাস করল তাকে। সে ভেবেছিল, রোযা হয়তো বুঝে গেছে। এখনই সরে যাবে। কিন্তু পরমুহূর্তেই ঘটল সম্পূর্ণ উল্টোটা। রোযা আচমকাই সোজা ঘুরে দাঁড়াল সিসিটিভি ক্যামেরার দিকে। হৃদির ছোট্ট হাতটা নিজের হাতে নিয়ে ক্যামেরার দিকে তুলে নাড়িয়ে দিল। হৃদি কিছুই বুঝল না।মায়ের দেখাদেখি সেও নিষ্পাপ মুখে হাত নাড়িয়ে ‘হাই’ জানাতে লাগল অচেনা সেই ক্যামেরাকে। রোযা মেয়ের কাণ্ড দেখে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই একবার সোজা তাকাল ক্যামেরার লেন্সের দিকে।
ওপাশে…আদিলের বুকের ভেতর সময়ই থেমে গেল সাথে হৃৎপিণ্ড। শ্বাস আটকে রইল কণ্ঠনালিতে। স্ক্রিনজুড়ে ভেসে থাকা হাস্যোজ্জ্বল মুখটার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল সে। ওই হাসির রেশ কাটাতে বোধহয় এই গোটা জনমও কম পড়বে।
—————
হৃদিকে ঘুম পাড়িয়ে রোযা নিচে নেমে এলো। দেয়ালঘড়ির কাঁটা ততক্ষণে একটা বিশ ছুঁয়েছে। আদিল এখনো ফেরেনি। অন্যমনস্ক চোখে সে একবার প্রধান দরজার দিকে তাকাল। সাধারণত রাত একটা বাজতেই বাড়ি ফিরে আসে মানুষটা। আজ এখনো এল না কেন? সারাদিনেও একবার বাড়িতে আসেনি। এতটাই ব্যস্ত? অজান্তেই তার সুন্দর মুখের ভ্রুদ্বয় কুঁচকে রইল। বারবার দরজার দিকে তাকাতে তাকাতে একসময় সে গিয়ে দাঁড়াল প্রবেশদ্বারের কাছে। একটু দূরে সোজা হয়ে পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে ক্লান্ত।
এদিকে নূরজাহান তখনো জেগে। আদিল বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত তিনি কোনো দিনই ঘুমোতে যায় না সে। নীরবে এসে দাঁড়াল রোযার পেছনে। একবার রোযার মুখের দিকে তাকিয়েই সব বুঝে ফেলল। মুচকি হেসে বলল -
'ম্যাডাম, বডিগার্ড ক্লান্তকে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়?’
চমকে উঠল রোযা। আড়চোখে একবার নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল। যেন কিছুই হয়নি এমন ভান করে গম্ভীর গলায় বলল-
'কার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করব?’
নূরজাহান ঠোঁট টিপে হেসে ফেলল, 'ম্যাডাম, আমি তো কারও নাম বলিনি। শুধু বলেছি, জিজ্ঞেস করতে।’
কথাটা শুনে রোযার মুখ গোমড়া হয়ে গেল। চোখ রাঙিয়ে কিছু বলতে গিয়েও পারল না। খানিকটা লজ্জাও লাগল। এত সহজেই কি তার মন পড়ে ফেলা যায়? সে তখন মাত্র দু-এক কদম পিছিয়েছে, এমন সময় হঠাৎ ক্লান্তর গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো। কণ্ঠে আর সেই স্বাভাবিকতা নেই। বরফশীতল কঠোরতা -
'লোক নিয়ে আসব? বস ঠিক আছে?’
মুহূর্তেই রোযা তাকাল সামনে। ক্লান্ত ইতোমধ্যে নির্দেশ ছুড়ে দিয়েছে। ততক্ষণে স্থির ড্রাইভওয়েতে আচমকা ঝড় নেমে এসেছে। একের পর এক বডিগার্ড ছুটে বেরিয়ে আসছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গাড়িগুলো সারিবদ্ধ হয়ে ড্রাইভওয়ে আটকে দিল। চোখের পলকেই সবাই প্রস্তুত। আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না রোযা। ছুটে গেল সামনে। তার চোখেমুখে এমন আতঙ্ক, যা হয়তো সে নিজেও আগে কখনো টের পায়নি।
'কী হয়েছে? উনি ঠিক আছেন?’
ক্লান্ত থামল না। গাড়িতে উঠতে উঠতেই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল -
'বসের ওপর আক্রমণ হইসে, ম্যাডাম। পরে বলি… আসি।’
কথা শেষ হতেই ইঞ্জিন গর্জে উঠল। পরমুহূর্তেই গাড়িগুলো ঝড়ের বেগে গেট পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। নিশ্চুপ ড্রাইভওয়েতে কনকনে শীতের মধ্যে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল রোযা। কনকনে শীতের চেয়েও শীতল হলো তার হৃৎপিণ্ড। কেমন যেন মুষড়ে উঠছে। বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। এতো বাজে অনুভূতি! এতো বাজে অনুভূতি শেষ তার বাবার অসুস্থতায় হয়েছিল।
নূরজাহান শান্ত হয়েছে। বরাবরই সে নিজেকে এসময়ে শান্ত রাখতে মাহির, 'ম্যাডাম, স্যার ঠিক আছে। আপনি ভেতরে আসুন। ঠান্ডা লাগবে।'
রোযা নড়ল না। তার দৃষ্টি দরজার দিকচোখে ভাসল আদিলের চোখমুখ। যতবার ভেসে ওঠে ততবারই মনে হচ্ছে হৃৎপিণ্ড কেউ খামচে ধরছে। রোযার অবস্থা দেখে দ্রুতো এসে ধরল নূরজাহান।
‘ম্যাডাম, কিছু হবে না। শান্ত হোন।’
কিন্তু রোযা, তার কিছু একটা হচ্ছে! মনে হচ্ছে গোটা আকাশ ভেঙে পড়েছে মাথায়। নূরজাহান জোর করে ধরে আনল ভেতরে। লিভিংরুমের সোফায় বসিয়ে একগ্লাস পানি ধরিয়ে দিলো হাতে। কিন্তু রোযা খেলো না। নিয়ে বসে থাকল। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে তো ঘুরছে। রাত গভীর হচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা এসে ছুঁয়েছে তিনটায়। নূরজাহান এযাত্রায় বলে -
‘ম্যাডাম, আপনি গিয়ে ঘুমান। স্যার এলে আমি জানাব।’
রোযা আর কিছুই শুনল না। কোনো উত্তরও দিল না। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সামনের দিকে। কতক্ষণ কেটে গেল, তার হিসাব নেই। হঠাৎ পিনপতন নীরবতা চিরে ভেসে এলো একগুচ্ছ গাড়ির গর্জন। মুহূর্তেই পুরো বাড়ি ভরে উঠল সেই শব্দে। সঙ্গে সঙ্গে রোযা লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে একসময় দৌড়ে নামল সিঁড়ি বেয়ে। ঠিক তখনই গাড়িগুলো এসে থামল ড্রাইভওয়েতে। তার ব্যাকুল দৃষ্টির সামনে গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো আদিল। সেই মুখ, মানুষটা দেখে রোযা থমকে গেল। মনে হলো, এতক্ষণ ধরে থেমে থাকা তার হৃৎপিণ্ড চলতে শুরু করেছে। পরের মুহূর্তেই তার চোখ গিয়ে আটকাল আদিলের ডান হাতে। তাজা রক্ত টপ… টপ… করে পড়ছে ড্রাইভওয়ের মেঝেতে। মুহূর্তেই ছুটে গেল রোযা। গিয়ে দাঁড়াল আদিলের একেবারে সামনে। এই মুহূর্তে তার যেমন বোধ নেই। অন্যরকম সে। দিশেহারা কণ্ঠে শুধু শুধাল -
'কীভাবে হলো? এত রক্ত পড়ছে… ক্ষতটা চেপে ধরেননি কেন?’
বলতে বলতেই আদিলের র ক্তাক্ত ডান হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে তুলে নিল। তালুতে গভীর ক্ষত। অবিরাম রক্ত বেরিয়ে আসছে। থামার কোনো লক্ষণ নেই। রোযা কব্জিটা শক্ত করে ধরে বলল -
'আসুন…’
আর কোনো কথা নয়। হাত ধরে টেনে হাঁটতে শুরু করল। পুতুলের মতো আদিল তালে তাল মেলাচ্ছ। যেন আপাতত এই শরীর তার নিয়ন্ত্রণে নেই। দৃষ্টি সেঁটে রইল রোযার ওপরেই। ব্যস্ত হয়ে ছোটা শরীরটার ওপরেই। রোযা তাকে এনে বসাল লিভিংরুমের সোফায়। নূরজাহান তখনই এগিয়ে আসছিল। রোযা তাড়াহুড়ো করে বলে উঠল -
'নূরজাহান, দ্রুতো মেডিক্যাল বক্সটা এনে দিন।’
নূরজাহান ছুটে গেল। রোযার সমস্ত মনোযোগ তখন আদিলের ক্ষতবিক্ষত হাতজুড়ে। দুই হাতের তালুতে হাতটা নিয়ে ভালো করে দেখল। গভীর ক্ষত। তার ভ্রু কুঁচকেই রইল। চোখমুখে চিন্তার ভাঁজ। নিচু স্বরে বলে গেল কেমন -
'কী দিয়ে লেগেছে? এত গভীর ক্ষত… খুব ব্যথা করছে না?’
আদিল উত্তর দিতে পারল না। সে শুধু তাকিয়ে রইল রোযার উদ্বিগ্ন মুখটার দিকে। এমন মুখ সে আগে কখনো নিজের জন্য দেখেনি। রোযার এই পরিবর্তন! এরই মধ্যে নূরজাহান মেডিক্যাল বক্স এনে পাশে রেখে নীরবে সরে দাঁড়াল। রোযা দ্রুত মেডিক্যাল বক্স থেকে তুলো নিয়ে ক্ষতের ওপর চেপে ধরল। রক্ত ধীরে ধীরে মুছে স্যাভলন দিয়ে পরিষ্কার করতে লাগল। কাজ করতে করতেই, মাথা না তুলেই আস্তে জিজ্ঞেস করল -
'ব্যথা পাচ্ছেন বেশি?'
হাতের ব্যথা নয়। আদিলের বুকের ভেতরটা ব্যথা করছে। অসহ্যকর এক সুখে। সে খুব নিচু স্বরে উত্তর দিলো -
'হুম…’
রোযা সাথে সাথে মাথা আরও নিচু করল। ক্ষতের ওপর আলতো করে ফুঁ দিল। দিয়েই গেল। ফুঁ দিতে দিতে যত্ন করে আবার পরিষ্কার করল ক্ষত। অ্যান্টিবায়োটিক অয়েন্টমেন্ট লাগিয়ে সাদা ব্যান্ডেজ দিয়ে ডান হাতটা পেঁচিয়ে দিল ভীষণ সময় নিয়ে। এইপর্যায়ে যখন এতো কাছ থেকে মাথা উঠিয়ে তাকাল, সঙ্গে সঙ্গে থমকে পড়ল। চোখের খুব কাছে আদিলের মুখ। ধূসর চোখে দৃষ্টি পড়তেই রোযা হৃৎপিণ্ড গলায় উঠে আসে। বোধ ফিরল বুঝি। তার কাণ্ডকারখানা ভেসে উঠল মস্তিষ্কে। অথচ অনুশোচনা হলো না যখনই আদিলের এলোমেলো অবস্থা আর ক্ষ ত বিক্ষ ত হাতে দৃষ্টি পড়ল। চোখ নামিয়ে হাতটা আস্তে করে সোফার ওপরে রেখে শুধাল -
‘কী হয়েছিল?’
‘যা হয় প্রায়শই। আমাকে মে রে ফেলার ষড়যন্ত্র।’
রোযা চুপ হয়ে গেল। সময় নিয়ে আওড়াল, ‘সতর্ক থাকবেন আরও।’
আদিলের জবাবটা এলো সাথে সাথে, ‘আচ্ছা…’
রোযা বুঝল না কী করবে। আড়চোখে একবার চেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘খেয়েছেন কিছু? ব্যথার ঔষধ খেতে হবে।’
স্পষ্ট জবাব এক্ষেত্রে -
‘খাইনি।’
নূরজাহান আশেপাশে নেই। রোযা নিজেই উঠে গেল। প্লেট সাজিয়ে খাবার এনে আদিলের সামনে রেখে বুঝল লোকটার ডান হাতই ব্যান্ডেজ করা। আদিল নড়ছে না। চেয়ে আছে সেভাবেই, একভাবেই। কী এতো দেখে! রোযা উশখুশ করল কিছুক্ষণ। অবশেষে প্লেট নিয়ে ফের গিয়ে বসল পাশে। চামচ দিয়ে সবটুকু খাবার খাইয়ে, একটা প্যারাসিটামল খাইয়ে দিলো। পুরোটা সময় সে একজোড়া দৃষ্টি অনুভব করে গেলো। সে দৃষ্টিতে দৃষ্টি আর দ্বিতীয়বার মেলাতে পারেনি রোযা। অথচ পরমুহূর্তেই আদিল শুয়ে পড়ল সোফায়। মাথাটা গুঁজে ফেলল রোযার কোলে। রোযা পুতুলের মতো বসে থাকল। নড়লচড়ল না অনেকক্ষণ। একসময় বুঝল আদিল ঘুমিয়েছে। রোযা তাকাল, এলোমেলো চুলগুলো চোখে বিঁধল কেমন! অগত্যা সে চুলে হাত চালাল আনমনা।
—————
এই বাড়ির প্রতিটি কোণ চেনা হয়ে গেছে রোযার। কোন ঘরে কী আছে, প্রায় মুখস্থ তার। এমন কোনো রুম নেই, যেখানে সে ঢোকেনি। তৃতীয় তলায় আদিলের বেডরুম, জিমরুম, অফিসরুম.. সবই দেখা হয়ে গেছে তার। শুধু একটি ঘর অদেখাই রয়ে গিয়েছিল। ছাদের সুইমিংপুলের ঠিক পাশের ঘরটি। গতকাল হৃদিকে নিয়ে সুইমিংপুলে নামার সময় আচমকা চোখে পড়েছিল ওটা। সচরাচর নজরে পড়ার মতো না। সাদা দেয়ালের সঙ্গে এত নিখুঁতভাবে মিশে আছে সাদা দরজাটা যেন অস্তিত্বই নেই। দূর থেকে দেখলে বোঝারই উপায় নেই সেখানে কোনো প্রবেশপথ আছে। গতকাল তাড়াহুড়ো থাকায় আর খতিয়ে দেখা হয়নি তার। এখন সন্ধ্যা নেমেছে। আকাশে বসে আছে মস্ত বড় এক চাঁদ। ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখছিল রোযা। ওপরে থেকে পুরো প্রাসাদটাকে যেন কল্পনার কোনো রাজ্য মনে হচ্ছে। চারদিকে কঠোর নিরাপত্তা। অসংখ্য বডিগার্ড টহল দিচ্ছে। সিসিটিভির জাল ছড়িয়ে আছে পুরো এরিয়া জুড়ে।
সেসব দেখতে দেখতে ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে শেষ পর্যন্ত এই অচেনা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল রোযা। দরজা ঠেলতে গিয়েই থমকে গেল। খেয়াল করল হ্যান্ডেলের পাশে বসানো ছোট্ট একটি ডিজিটাল কীপ্যাড। স্ক্রিনে জ্বলছে, ডেট বসানোর স্থান। ডেট-লকড স্মার্ট ডোর! ভ্রু কুঁচকে গেল রোযার। পুরো বাড়ির আর কোনো ঘরেই তালা নেই। তাহলে এই একটি ঘর এত নিরাপত্তায় বন্ধ কেন? কিছুক্ষণ আগ অবধিও এতো আগ্রহ কাজ করেনি তার মধ্যে। অথচ মুহূর্তেই কৌতূহল কয়েক গুণ বেড়ে গেল। হিমালয় ছুঁয়ে ফেলল। কেনো এতো কড়া নিরাপত্তা এখানে? রোযা ভাবল, ঝটপট হৃদির জন্মদিনের তারিখ বসাল সে। না, দরজা খুলল না। কিছুক্ষণ ফের ভাবল। আদিলের জন্মতারিখ সেবার অনলাইন ঘাটাঘাটিতে মনে রাখা হয়েছিল। জুন মাসের ত্রিশ তারিখ তার জন্মদিন। তারিখটি দিল রোযা। এবারও ব্যর্থ, খুলল না। তাহলে কী বাবা-মায়ের জন্ম তারিখ বা মৃত্যবার্ষিকী? কিন্তু পরক্ষণেই মাথা নাড়ল। তার মন সায় দিচ্ছে না।
হঠাৎই চোখ পড়ল নিজের বাম হাতের অনামিকায়। হীরের এনগেজমেন্ট রিংটা জ্বলজ্বল করছে। রিংয়ের ভেতরের দিকে খোদাই করা দেয়া হয়েছে তার পরিচয়। রোযা স্থির হয়ে গেল।চোখেমুখে ফুটে উঠল দ্বিধা। সঙ্গে অকারণ এক লজ্জা। তার নিজের জন্মদিন? নিশ্চয়ই এতটাও বাড়াবাড়ি রকমের গুরুত্বপূর্ণ সে না। নিজেকেই নিজের ভাবনায় হাস্যকর লাগল রোযার। তবু চেষ্টা করে দেখতে তো ক্ষতি নেই। গভীর একটা শ্বাস নিয়ে নিজের জন্মদিনের তারিখটি টাইপ করল সে। আঙুল থেমে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর বিপ শব্দের অপেক্ষায় ছিল রোযা। কিন্তু কোনো সতর্কবার্তা এল না। বরং…ইলেকট্রনিক লকের শব্দ তুলে ধীরে ধীরে খুলে গেল দরজাটি।
রোযা জমে গেল। পলক ফেলতেও ভুলে গেল সে। ঢোক গিলল লোকটার এমন কাণ্ডে। কবে দিয়েছে এটা? ইদানিং? রোযার জন্মতারিখটাও মনে রেখেছে? কয়েক মুহূর্ত পরে ধীরে ধীরে ভেতরে পা রাখল। প্রথমেই লাইট জ্বালাল খুঁজে খুঁজে। ঘরটা অবাক করার মতোই সাধারণ। এমন লকটক করে একটা সাধারণ রুম আড়াল রাখার মানে কী? রুমে আছে একটি বেড।একটি কালো সোফা। টেবিল-চেয়ার। পরিপাটি, ছিমছাম একটি কক্ষ। এমন ঘরের জন্য এত নিরাপত্তা? তাও আবার তার জন্মদিনের তারিখ দিয়ে!
দরজাটা ঠেলে দিলো। পুরোপুরি বন্ধ হলো না, অল্প ফাঁক রয়েই গিয়েছে। উত্তর দিকের কাঁচের জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল। নিস্তব্ধ রাত আর চাঁদের আলো। এক মুহূর্ত পর ফিরে দাঁড়াতেই তার দৃষ্টি পড়ল সামনের দেয়ালে। আর সেই মুহূর্তেই যেন তার ফুসফুস থেকে বাতাস উধাও হয়ে গেল। দেয়ালজুড়ে টাঙানো বিশাল একটা ছবির ফ্রেম। আলোয় ছবিটা জ্বলজ্বল করছে। মেয়েটিকে চিনতে এক মুহূর্তও লাগল না রোযার। এটা তো সে নিজেই। আয়াত তালুকদার রোযা। উদভ্রান্তের মতো এগুল, কদম কেমন থেমে থেমে এলো। হাত কাঁপছে। এটা… কবে তোলা? এখনকার রোযা তো নয়! কত বছরের পুরোনো ছবি এটা? তার কাছেও যে এই ছবি নেই। কম্পিত আঙুলে ছবিটা ছুঁয়ে দিল সে। তারপর চোখ থেমে গেল ছবির কালো শাড়িটায়।
হঠাৎই সব মনে পড়ে গেল। রয়্যাল ক্যাফেতে যখন নতুন নতুন ঢুকেছিল। প্রথম নিউ ইয়ার ছিল ক্যাফেতে তার। কালো শাড়ি পরেছিল সে উদযাপন করতে। তাহলে এই ছবিটা সেদিনের। রোযার বুকের ওঠানামার গতি বাড়তে থাকে ক্রমশ। কাঁপতে থাকে ঠোট, হাত। মুহূর্তে আতঙ্কে পা নিজের অজান্তেই পিছিয়ে গেল কয়েক কদম। পরমুহূর্তে পিঠ গিয়ে ঠেকল এক শক্তপোক্ত, উষ্ণ বুকের ভাঁজে। থমকে গেল রোযা। ধড়ফড়িয়ে উঠল হৃদস্পন্দন। নিঃশ্বাস আটকে এলো। ভয়ে কাটা দিয়ে উঠল গা। ঘাড়ের কাছে অনুভব করল এক হিমশীতল স্পর্শ। তার কানের খুব কাছে ঝুঁকে এলো আদিলের রহস্যময় কণ্ঠ। যা শুনে কেঁপে উঠল তার অস্তিত্ব -
'অ্যাফরেইড, আর ইউ?'
এক মুহূর্ত থেমে আরও নিচু স্বরে ফিসফিস করে উঠল, 'লুক হাউ ফার আইভ কাম ফর ইউ, মাই বিলাভড...রোজ-আ।'
রোযা থরথর করে কেঁপে ওঠে। আতঙ্কে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। যখন ধড়ফড়িয়ে তাকাল ঘুরে। এতো কাছ থেকে আদিলের চোখমুখ দেখে অস্ফুটে বলে বসল -
‘ছবিটা কীভাবে পেলেন? রিসেন্টলি বাঁধাই করে টাঙিয়েছেন তাই না?’
বিপরীতে আদিল নুইয়ে এলো। মাথাটা রোযার উচ্চতা বরাবর এনে ভয়ার্ত চোখ দুটোতে চেয়ে আওড়াল -
‘হোয়াট ড্যু ইউ থিংক?’
রোযা পিছুল সমানে, কণ্ঠ বেড়ে গেল, ‘কীভাবে সম্ভব! এটা এখানে কেনো? কবে থেকে এখানে?’
আদিল আর আটকাল না। শুধু অনুসরণ করে তালে তাল মিলিয়ে এগুল, ‘যবে তোলা হয়েছিল তবে থেকে।’
রোযার পিঠ শব্দ করে ছবির সাথে গিয়ে ঠেকল। আদিল এসে দাঁড়াল সামনে। নিপুণভাবে রোযার আতঙ্কে, ভয়ে রীতিমতো নীল হয়ে যাওয়া সুন্দর মুখে চেয়ে রইল। কাঁপল রোযার কণ্ঠ -
‘কক্ষনো সম্ভব না। খুঁজে বের করেছেন ছবি, তাই না?’
আদিলের মুখটা আরও এগুল। নাকে নাক ছুঁই ছুঁই অবস্থা। আওড়াল সে -
‘একটা কালো ক্যামেরায় ছবি তুলেছিলে। সেদিন হাসছিলে তুমি। ভীষণ হাসছিলে। আমি দৃষ্টি সরাতে পারিনি। সেই হাসি ভুলতে পারিনি পুরোটা মাস।’
রোযা শক্ত করে চোখ বুজে ফেলল, 'আমি এখানে কাজ করতে এসে…’
রোযা পুরোটা বলতে পারল না। আদিল ফিসফিস করে বলে গেলো -
'তোমার আমার কাছে পৌঁছানো কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। প্রতিটা পদক্ষেপ আমার সাজানো ছিলো। তুমি শুধু হেঁটেছো। যে পথ ধরে আমার কাছে এসেছো… সেই পথটা আমি, আদিল মির্জা বানিয়েছি বলেই আসতে পেরেছো। এখন...আর ফেরার পথ নেই। আমি সব মুছে দিয়েছি। পেছনে ফিরে দেখো, আমি ছাড়া তোমার দৃষ্টির সীমানায় কিচ্ছু নেই।'
রোযার মাথা কাজ করল না। কোনোভাবেই না। একটা মানুষ তাকে ম্যানুপুলেট করে গেলো এতোগুলো বছর আড়ালে আবডালে! অজানা একজন লোক তার জীবন নিয়ে খেলল! এতো সাধের জীবনের সিদ্ধান্ত গুলো লোকটার ইশারায় হয়ে এসেছে? খারাপ ভালো ভাবনারা মাথায় এলো না তখুনি। শুধু বিশ্বাসঘাতকতা মনে হলো। নিজেকে পুতুল খেলনা মনে হলো। ক্ষোভ, ভয় সব মিলিয়ে রোযার হাত চলল। চড়ের সুক্ষ্ম আওয়াজ ভেসে বেড়াল। আদিলের মাথা হেলে পড়েনি আজ। তবে সামান্য বেঁকেছে। রোযা ফুঁসছে -
‘আপনি একটা সাইকো…আপনি….’
রোযা আর বলতে পারল না। একটা রুক্ষ হাত তার চোপাটা শক্ত করে ধরল। মনে হচ্ছে গুড়িয়ে ফেলবে। রোযা ব্যথা পেলেও গোঙাল না। রাগান্বিত চোখে চেয়ে থাকল সমানে। দুহাতে ঠেলল আদিলের শক্তপোক্ত বুক। আদিলের চোখমুখে সেরকমের ক্ষোভটা নেই। চড় খেয়ে বিরক্ত মাত্র। রোযার হাতজোড়া আটকাতে ভীষণ মসৃণ ভঙ্গিতে গলার টাই দিয়ে বেঁধে ফেলল। নাগিনীর মত ফোঁসফোঁস করা ঠোঁটজোড়ায় চেয়ে বলল -
‘আমার বাবা-মা অবধি চড় মারেনি সেখানে তুমি এই নিয়ে দুবার এই দুঃসাহস দেখালে।’
‘বেশ করেছি। আরও দেয়া উচিত। নির্লজ্জ, লম্পট। ছিহ! আমি আমাদের বাড়ি আজই ফিরব।’
বকাগুলো আদিল নির্বিকার মুখে শুনছিল। শেষের লাইন শুনে ভ্রু তুলে তাকাল -
‘স্বপ্নে হুম? তোমার বাড়ি, স্বামী সবই আমি।’
পরমুহূর্তেই আদিলের একটা হাত পেঁচিয়ে ধরল তার পাতলা কোমর। পেটে চেপে পরমুহূর্তেই তুলে ফেলল কাঁধে। রুমের ভেতরে, দেয়ালে দেয়ালে ভেসে বেড়াল গম্ভীর কণ্ঠের মৃদু আওয়াজের কথাগুলো -
‘ইউ ওয়ার অলওয়েজ মেন্ট টু বি মাইন রোজআ…..
ইউল নেভার এস্কেইপ মি… নট ইন দিস লাইফটাইম।’
·
·
·
চলবে……………………………………………………