পুলে ঝাঁপিয়ে পড়ার শব্দ ভেসে বেড়াল ছাদের আনাচে-কানাচে। এলেন পুল লেডারের পাশে বসতে বসতে অনিহাভরা দৃষ্টিতে তাকাল পুলে সাতরাতে থাকা শান্তর দিকে। কোট, শার্ট খুলে ছুঁড়ে ফেলে বেশ আয়েশ করে চোখ বুজে ভেসে আছে সে। ক্লান্ত তখনো সটান ভাবে দাঁড়িয়ে আছে পাশেই। দৃষ্টি নিবদ্ধ সেই ঘরের বন্ধ দরজার দিকে। মুখজুড়ে স্পষ্ট উদ্বেগ। অন্যদিকে এলেন আর শান্ত, দুজনই আশ্চর্য রকম নির্বিকার।ক্লান্ত শেষমেশ আস্তে করে না বলে পারল না -
‘ম্যাডাম ভয়ে আবার জ্ঞান হারাবেন না তো?’
শান্ত একটা ডুব দিয়ে ভেসে উঠল। ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে শুধাল -
‘ম্যাডাম হারাবে জ্ঞান?’
ক্লান্ত বুঝল না কথাটার মানে। মাথা দুলিয়ে বলল -
‘এত বড়ো একটা ব্যাপার। তাই স্বাভাবিক রিয়াকশন না?’
উত্তর দিল এলেন। তবে তাড়াহুড়ো করে না। সেও পরনের স্যুটসহ ঝাঁপিয়ে পড়ল পুলের ভেতর। একদম শান্ত যেখানে ঠিক সেখানে। শান্ত তার উদ্দেশ্য বুঝে আগেই এক ডুবে অন্য মাথায় গিয়ে উঠেছে। এলেন পরপর দুটো ডুব দিয়ে উঠে ক্লান্তর দিকে তাকিয়ে বলল -
‘জ্ঞান হারাতে পারে। তবে একটা চড় মারার পরে।’
শান্ত আড়চোখে তাকাল এলেনের মুখের দিকে। এলেনও তাকাল তার দিকে। নির্বিকার অভিব্যক্তি নিয়ে কয়েক মুহূর্ত চোখাচোখি করে দুজনই ফিক করে হেসে উঠল। শান্ত হাসতে হাসতে, জলের ওপরে ভাসতে ভাসতে গেয়ে উঠল -
'দেখলে তারে মনে হয় বড়োই ভোলাভালা,
ম্যাডাম, আপনার লাগি পরাণে তার দেয় অতিমাত্রায় দোলা…
আমরা কইলাম সবাই নো টেনশন, নো চিন্তা…
পাইসেন জীবনে ঝাক্কাস একটা পোলা,
পোলা তো নয় সে-তো আগুনেরই গোলা.. রেএএএএএএ!
পোলা তো নয় একখান আগুনেরইইই গোলায়ায়ায়া….’
গান শুনে ক্লান্ত মাথা ধরে বসে পড়েছে। মুখ চেপে হাসি আটকে রাখার তার ব্যর্থ চেষ্টা। বসের কানে গেলে পাছার চামড়া বেল্ট দিয়ে মে রে তুলে ফেলবে। এলেন তড়িৎ একবার চেয়ে নিলো রুমের বন্ধ দরজাটার দিকে। সব স্বাভাবিক দেখে তবেই খ্যাকখ্যাক করে হাসতে সে ডুবে গেলো। শান্ত তখনো থামল না। সে গলা চড়িয়ে গেয়ে যাচ্ছে। যেন আওয়াজ কম হয়েছে, আরও ভোল্টেজ বাড়াল আওয়াজের। সেই আওয়াজের সাথে ক্লান্তর অসহায় আর্তনাদ -
‘থাম বাপ, থাম। মা র খাওয়াবি!!’
—————
বদ্ধ রুমের সবগুলো বাতি জ্বালানো। উজ্জ্বল আলোয় চকচক করছে রুমের প্রতিটি কোণ। রুমের একপাশের সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে নিশ্চুপ ভঙ্গিতে বসে আছে আদিল। ঠোঁটের ভাঁজে চেপে রাখা আছে সিগারেট। একহাতে লাইটার চালিয়ে জ্বালাল তা। একমুখ ধোঁয়া টেনে নিয়ে নাকমুখ দিয়ে ছাড়তে ছাড়তে ধীরেসুস্থে তাকাল পাশে। সিগারেটটা তখন তার ডান হাতের আঙুলের ফাঁকে আলতো করে চেপে রাখা। বাম হাতটা সোফার হাতলে রয়ে গিয়েছে। আদিলের দৃষ্টি মিলল একজোড়া আগুন চোখে। চোখ দিয়ে আগুন ছোঁড়া গেলে এতক্ষণে আদিল জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যেতো সম্ভবত।
রোযা সোফার এক কোণে দু-পা তুলে বসে আছে। পা দুটো গোলাপি গাউনের নিচে পুরোপুরি অদৃশ্য। টাই দিয়ে বাঁধা হাত দুটো সামনে এনে রেখেছে। সুন্দর চোখজোড়া স্থির আদিলের ওপরেই। রীতিমতো চোখ দিয়ে আগুন ছুড়ে মারছে। রাগে তার বুক ওঠানামা করছে। নাগিনীর মতো ফোঁসফোঁস করছে। আদিলকে এমন নির্বিকার দেখে আরও ফুঁসে উঠল। তড়তড় করে বাড়ল রাগ -
‘আমাকে নিয়ে পুতুলের মতো খেলতে খুব ভালো লেগেছে তাই না?’
বিপরীতে আদিলের জবাবটা অস্পষ্ট শোনায়, ‘ওয়ান্ডারফুল।’
রোযার নাকের পাটা দুটো ফুলে উঠল। ক্রোধে কতক্ষণ একটা শব্দ উচ্চারণ করতে পারল না। আদিল খুব মনোযোগ দিয়ে দেখল রোযার রাগে র ক্তিম হয়ে আসা চোখ, গাল, নাক। রোযা নিজেকে শান্ত করে একের এক প্রশ্ন শক্ত গলায় করে গেলো -
‘কেনো প্রতারণা করেছেন আমার সাথে? কী ক্ষ তি করেছি আমি আপনার? আপনার বাচ্চার দেখভাল করার জন্য আমাকে ভালো অপশন মনে হয়েছিল তাইতো? এভাবে দিনের পরে দিন ম্যানুপুলেট করেছেন। ব্যবহার করেছেন। ধোঁকা দিয়েছেন। আমার বিশ্বাস ভেঙেছেন।’
আদিল ভ্রু তুলল। নাকমুখে শব্দ তুলে রিপিট করল শব্দটা, ‘ব্যবহার?’
কী ইঙ্গিত করল তা ভালোভাবে বুঝল রোযা! চোখ দিয়ে আগুন ছাড়ল একগুচ্ছ। আদিল বলে যায়, ‘যদি বলতেন ঠিক কীভাবে আপনাকে ব্যবহার করেছি?’
মশকরা করা হচ্ছে! তার জীবন ওলটপালট করে কী নির্বাক হয়ে আছে দেখো! আবার এখন সম্মানও দেখানো হচ্ছে! এমন আজ্ঞে আপনির সে গুল্লি মা রে! গুল্লি মারে এই লোককে সে! রোযার রাগে নিজের মাথার না সামনের নির্বাক মানুষটার চুলগুলো ছিঁড়তে ইচ্ছে করল। দাঁতে দাঁত পিষে বলল -
‘হাত খুলে দিন।’
‘আলাপটা শেষ করি, তারপর…’
রোযা তেতিয়ে গেলো নিজের মতন, ‘তারপর? তারপর আমি আমার বাড়ি যাব। কী করে আটকাবেন? কদিন আটকে রাখবেন? আপনার কতো ক্ষ মতা আমিও দেখব।’
আদিল উত্তর করল না। বুদ্ধিমান পুরুষের মতো চুপ করে রইল। রোযাকে ফোঁসফোঁস করতে দিলো সে। রোযা গজগজ করে গেলো অনেকটা সময় যাবতই। নিজের রাগ ঝাড়তে ঝাড়তে তা একসময় মিইয়ে গেলো আপনাআপনি। ভেতরে যা রয়ে গেলো তার নাম অজানা! রোযা শুধু বুঝল তার হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে। আড়ে আড়ে দেয়ালে থাকা ছবিটাতেও নজর বুলাল কবার। নিজের মুখের এতো বড়ো ছবি জীবনের প্রথম দেখা তার। দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখল আদিলের দিকে। চেয়েই আছে সে লোক। আদিল কণ্ঠে নমনীয়তা আনতে চাইলেও রুক্ষই শোনাল -
‘রাগ কমেছে?’
রোযা মাথাটা পাশে ফিরিয়ে রাখল। যেন সামনের ব্যক্তির মুখও সে দেখতে চায় না। প্রপশ্ন শুনে নাক ফুলাল। তাকাল শূন্যে, আওড়াল, ‘কত মেয়েকে এভাবে আড়ালে চেক করে বেড়িয়েছেন?’
‘এখানে যতজনের ছবি দেখতে পারছেন ততজন।’
রোযা ফের তাকাল সোজা আদিলের দিকে, ‘টাকা আছে, ক্ষমতা আছে আপনার। আমার মতন শখানেক মেয়েমানুষ অন্যান্য বাড়িতে পালতেই পারেন।’
আদিলের উত্তর সময় নিয়ে এলো, ‘আপনাকে সামলাতেই আমার হিমশিম খেতে হচ্ছে। আপনি একাই হাজার জনের সমান।’
রোযা চোখের দিকে আর তাকিয়ে থাকতে পারল না। দৃষ্টি রাখল আদিলের বুকের দিকে। তার মনে অনেক প্রশ্ন জমে আছে।কেনো সামনে আসেনি তখন? কেনো জানায়নি পছন্দের কথা? কেনো এভাবে আড়ালে থেকেছে? সে তো অনেক গুলো বছর যাবত তারই বাড়িতে কাজ করেছে, কখনো কেনো সেভাবে সামনে আসেনি? জানায়নি? কিন্তু মুখ দিয়ে বেরুল না।
তার দ্বিধাদ্বন্ধের মধ্যে আদিল উঠে দাঁড়াল। লম্বাচওড়া তার ছায়া ওখান থেকেই একটু রোযার ওপর পড়েছে। সরাসরি না তাকিয়েও খেয়াল করল আদিল তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। পরপর বড়ো ছায়াটা পুরোপুরি আড়াল করল তার পাতলা গড়নের শরীর। আদিল ঝুঁকে ডানহাতে আলতোভাবে ধরল রোযার মসৃন চোয়াল। চোয়াল ধরে উঁচু করল মুখখানা। গাল দুটোতে তার আঙুলের ছাপ পড়ে আছে। অথচ সেভাবে শক্তি সে ব্যবহার করেনি। একটু ছুঁলেই দাগ বসে যায়! ননীর পুতুল ব্যতীত কী আর? রোযা দৃষ্টি তুলে তাকাল ধূসর সে মণিতে। আর চোখ ফেরাতে পারল না। আদিলের কণ্ঠ ভেসে বেড়াল রুমের দেয়ালে দেয়ালে -
'চোখে তাকাও, দেখো। কী মনে হয়? তুমি মুখ ফিরিয়ে নিলে বাঁচব আমি?'
রোযার চোখের পলক পড়ল না। বেরুল না মুখ দিয়ে একটি শব্দ। আদিলের মুখ আরও ঝুঁকল। নাকে নাক স্পর্শ করল।
‘রোজআ…..’
আদিল বলে গেলো ফিসফিস করে, ‘তুমি চেয়েছো হাই স্যালারির জব, আমি তাই দিয়েছি। তুমি চেয়েছো স্বাধীনতা, আমি তোমায় উড়তে দিয়েছি। তুমি কিছু চেয়েছো আমি দিইনি তা এখনো হয়নি।’
আদিলের কণ্ঠ ভাসাভাসা হয়ে এলো, ‘বিপরীতে আমি শুধু চেয়েছিলাম তুমি আমার হাতের কাছে থাকো। যা ইচ্ছে করো কিন্তু আমার অধীনে থেকে।’
আদিলের ঠোঁট ছুঁয়ে গেলো রোযার বন্ধ করে নেয়া চোখের পাতায়, ‘আমিরা আমার বাচ্চা। ওর বাবা-মা দুটোই আমি। বাচ্চার জন্য মা নয়, আমি আমার জন্য স্ত্রী এনেছি। এখানে আমিরা ভাগ্যবান তোমায় মা হিসেবে পেয়েছে।’
রোযা অনুভব করল তার চোখের কোণ ঘেঁষে ছোটা জলের অস্তিত্বটুকু আদিল শুষে নিয়েছে। সাথে শুষে নিয়েছে তার ভয়, দ্বিধা। পরপরই অনুভব করল হাতদুটো মুক্ত হয়েছে। তারপরও সে চোখ মেলে তাকাল না। নড়ল না একটুও। ওভাবেই জিজ্ঞেস করল -
‘আর কি কি লুকিয়েছেন আমার থেকে?’
আদিল শুনল তবে জবাব দিলো না। রোযা চোখ খুলে দেখল আদিল বেরিয়ে গিয়েছে। দরজাটা আধখোলা। রোযা আধখোলা দরজার দিকে তাকিয়ে আনমনা ফিসফিস করে গেলো -
‘আর কি কি লুকিয়ে রেখেছেন? এতো রহস্য কেনো করে রেখেছেন সব?’
পিনপতন নীরবতা নামল। রোযা রুম থেকে বের হয় না। ওভাবেই বসে থাকে। ঠিক কতক্ষণ জানা নেই। হয়তোবা ঘণ্টাখানেকের বেশিই হবে। বা তারও বেশি। দরজাটা খোলার মৃদু শব্দ হলো। ছোটো ছোটো পা দুটো ভীষণ ধীরে ধীরে এসে থামল রোযার সামনে। ছোটো ছোটো চোখে চেয়ে পিটপিট করে ভীষণ সচেতন গলায় একবার মিষ্টি কণ্ঠে ডাকল -
‘মম!’
রোযা সঙ্গে সঙ্গে তাকাল। হৃদি দাঁড়িয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। চিন্তিত চোখে তাকে দেখতে দেখতে কোলে উঠে এলো। রোযার মুখটা দুহাতে ধরে জিজ্ঞেস করল কেমন বড়োদের মতো -
‘আর ইউ আপসেট, মা? ড্যাড কি তোমায় বকেছে?’
হৃদি কথা বলতে বলতে ঠোঁট ছোঁয়াল রোযার গালে। আবার ডাকল। ঘনঘন ডেকে গেলো, ‘আমি ড্যাডকে বকে দিবো। অনেক বকব। তুমি কি চাও এখুনি বকি? বলো একবার!’
রোযা কি আর মন খারাপ করে থাকতে পারে? সম্ভব? সম্ভব না। দু-হাতে হৃদিকে বুকে জড়িয়ে ওর সারামুখ জুড়ে চুমু খেলো। এতে হৃদি আনন্দে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। খিলখিল করে হাসছে। তার প্রাণোচ্ছল হাসির ধ্বনি ভেসে বেড়াল অনেকটা সময় যাবত। হৃদি মায়ের বুক থেকে মুখ তুলে আশেপাশে চাইতেই দেখতে পেলো দেয়ালের বিশাল সে ছবিটা। মুহুর্তে মুখটা হাস্যকর করে ফেলল কেমন। হা করে চেয়ে আঙুল তুলে তোতলানো সুরে বলল -
‘মম, দ্যাটস ইউ। ইজন্ট ইট?’
রোযা নিজেও তাকাল। হৃদি ততক্ষণে নেমে গিয়েছে কোল থেকে। গিয়ে দাঁড়িয়েছে ছবির সামনে। বড়ো বড়ো চোখে দেখছে। ঘনঘন মাথা দুলিয়ে বলে-
‘মাই মম ইজ সো বিউটিফুল!’
রোযার দৃষ্টি নরম হয়ে আসে। ঠোঁটের কোণে এসে ভিড়েছে মৃদু হাসির রেখা। হৃদির ছটফটে হাবভাব দেখে সোফা থেকে নেমে এলো। কোলে তুলে নিলো। মেয়ের চোয়ালে ঠোঁট ছুঁয়ে আড়চোখে ছবিটা একবার দেখে বেরিয়ে এলো রুম থেকে। ছাঁদ ফাঁকা। সিঁড়ির দিকে ক্লান্তকে দেখা গেলো। হিমালয়ের মতন দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি নোয়ানো। তবে হাবভাবে বোঝা যাচ্ছে সামান্য চিন্তিত সে। রোযা পাশ কাটিয়ে সোজা দোতলায় চলে এলো। এতে হৃদি আশ্চর্য হয়ে বলে বসল -
‘মম, আমরা ড্যাডের রুমে যাব না?’
‘না! আমরা এখানেই শোব এখন থেকে।’
রোযা ততক্ষণে দরজা লাগিয়েছে রুমের। হৃদিকে বিছানায় শুইয়ে বাতি বন্ধ করে দিয়েছে। বেডসাইড ল্যাম্প জ্বলছে। নিজেও শুয়ে মেয়েকে বুকে টেনে নিলো। হৃদির এতে অবশ্য আপত্তি নেই। মায়ের সাথে ঘুমাতে পারলেই তার শান্তি। হৃদি মাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে, মা মা গন্ধে মুহূর্তে ঘুমিয়ে পড়লেও জেগে থাকলো রোযা। তার দুচোখে ঘুম নেই। যতবার ছবিটা চোখে ভাসে তার হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে ওঠে। অবিশ্বাস্য ঠেকে সব! এতো ঠান্ডা মাথার মানুষ! এতো ক্ষ মতা তার? একটা মানুষের জীবন এভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে? যা সে বুঝতেও পারেনি। আর কি করেছে যা রোযা জানে না? এখন যখন সে আগের স্মৃতি গুলো ভাবতে বসল অনুভব করল গত কবছরের পথটা নির্ভেজাল ছিলো। মসৃন, সে আরামে পাড় করে এসেছে। এতসব ভাবতে ভাবতে রোযার চোখদুটো লেগে এসেছিল সবেমাত্র। আচমকা অনুভব করল সে শূন্যে। চমকে তাকাল। কাঁচা ঘুম ভাঙায় চোখদুটো লাল হয়ে আছে। আদিলের মুখটা চোখের ভীষণ কাছে পেলো। মাত্রই গোসল সেরেছে। এলোমেলো ভেজা চুলগুলো কপাল ছুঁয়েছে তার। রোযা দৃষ্টি ঘুরিয়ে মুচড়ে উঠল আদিলের কোলে। পা দুটো সমানে নাড়িয়ে নামতে চাইল -
‘নামান —’
করিডোর পেরিয়ে আদিল তিনতলায় পৌঁছানোর সিঁড়ি ধরেছে। তাকাল না রোযার দিকে। সামনে চেয়েই বলল -
‘তোমার বুকে শুয়ে অভ্যাস খারাপ করে ফেলেছি। তুমি ছাড়া ঘুমাতে পারব না।’
রোযা চোখ রাঙিয়ে তাকাল। সাপের মতন ফোঁসফোঁস করল। নামার জন্য আরেকবার ঝামেলা করতেই আপত্তিকর জায়গায় শক্তপোক্ত হাতের চাপড় পড়ল দুটো। রোযা নাক ফুলিয়ে উঠল -
‘অসভ্য! লম্পট। কোন পাপের ফলে আপনার নজরে পড়েছিলাম তা আমার খোদা জানেন!’
এতটুকুই। ব্যস, রোযা আর ঝামেলা করল না। মেনে নিয়েছে ভাগ্য যেমন! সাধারণ একটা ব্যাপার। অথচ এতেই আদিলের যা বোঝার বোঝা হয়ে গেলো। স্বস্তিতে হৃৎপিণ্ড স্বাভাবিক ভাবে বিট করতে শুরু করল। কয়েক বছর আগেও কখনো কি ভেবেছিল কারও প্রতিক্রিয়া কল্পনা করে তার হৃৎপিণ্ড থমকে যেতে পারে? আদিল মির্জা ভয় পেতে পারে? তখন কেউ এসব বললে সে হয়তোবা কৌতুক ভেবে উড়িয়ে দিতো। এখন দেখো! কী হাল হয়েছে তার! প্রিয়তমার রাগ যে তার অস্তিত্বের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিছু। ভেতরের প্রশান্তি অবশ্য আদিলের শক্তপোক্ত চোখমুখে ভাসল না। সে সিঁড়িগুলো চড়ে রুমে পৌঁছে গোল বিছানায় রোযাকে শুইয়ে আর সময় দিলো না। পাতলা শরীরের ওপরে নিজের ভার ছেড়ে দিয়ে স্বস্তির শ্বাস নিলো। মুখটা মসৃণ ঘাড়ে গুঁজে খোঁচা দাড়িগুলো দিয়ে আচড়ে দিলো। বিপরীতে অনুভব করল রোযার কম্পন, অস্থির আচরণ। সরাতে চাইছে তাকে। জেগে উঠল আদিলের ভেতরের পৈশাচিক উন্মাদনার জন্তুটা। তবে তাকে গুরুত্ব পেতে দিলো না। ভেতরেই আটকে রাখল যেভাবে আটকে এসেছে। ওই জন্তুর যে ছাড়া পাওয়ার সময় আসেনি এখনো। আর একটু… একটু…একটু…
—————
নূরজাহান বেগম কপাল চাপলেন! এইতো খেয়াল করেছিলেন সম্পর্ক স্বাভাবিক হচ্ছে। অথচ কটা দিন ধরে দেখছেন সেই আবার আগের মতোই হয়ে আছে। উল্টো রোযাকে আরও অস্বাভাবিক লাগছে। থমথমে হয়ে থাকে তার চোখমুখ। সবার চোখের সামনে স্পষ্ট, তাদের দুজনের সম্পর্ক ভালো না। মরিয়ম বেগম একফাঁকে নূরজাহানকে জিজ্ঞেসও করেছিল কিছু হয়েছে কি-না! কিছু হলেও নূরজাহান কীভাবে জানবে? ম্যাডাম তো ভীষণ মন খারাপ করে থাকেন। কী এতো ভাবেন কে জানে?
আদিল ব্রেকফাস্ট শেষ করে বেরিয়ে এসেছিল কেবলই। গাড়িতে উঠবে তখুনি মেয়ের ডাক শুনতে পেলো। ফিরে তাকিয়ে দেখল হৃদি দৌড়ে আসছে। আদিল ঝুঁকে মেয়েকে কোলে নিয়ে বাম হাতের ওপরে বসিয়ে দিলো।
‘ড্যাড, তুমি কি মমকে বকেছো? ডিড ইউ?’
বাবার কোলে চড়ে, দুহাতে গলা জড়িয়ে কানের কাছে বিড়ালের মতন মিউমিউ করছে হৃদি। আদিল ডান হাতের ইশারায় শান্তকে থামার নির্দেশ দিয়ে তাকাল মেয়ের মুখের দিকে। কপাল থেকে চুলগুলো কানে গুঁজে দিয়ে আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল -
‘কেনো মনে হচ্ছে বকেছি?’
‘মম তোমাকে চোখ রাঙাচ্ছিল। ড্যাবড্যাব করে দেখছিল। মনে হচ্ছিল তোমার ওপর রেগেছে।’
আদিল নির্বিকার মুখে আদাপড়া বুঝিয়ে দিলো মেয়েকে, ‘আই অ্যাম হার হাজবেন্ড, ড্যাবড্যাব করে দেখবে, রাগ করবে এটা স্বাভাবিক। এরমানে দাঁড়ায় তোমার মম আমাকে চোখে হারায়, ভালোবাসে।’
এ কথা শুনে হৃদি বড়োদের মতো শ্বাস ফেলল। চোখমুখ জ্বলজ্বল করছে। বলল, ‘থ্যাংক গড। আমার মনে হয়েছিল তোমরা ঝগড়া করেছো।’
আদিল নিঃশব্দে মেয়ের গাল ছুঁয়ে দিলো। হৃদি গাল ফুলিয়ে বলল, ‘ঝগড়া করবে না কখনো হু? আমি মমকে আপসেট দেখতে পারি না। আই ফিল সাফোকেইটেড।’
মেয়ের ধূসর চোখে চেয়ে আদিল আওড়াল, ‘আমিও!’
হৃদি বুঝলা না, ‘হুম? ড্যাড?’
‘আই ফিল সাফোকেটেড টু।’
আদিলের বিড়বিড়িয়ে বলা কথাটুকু শুনে হৃদি হেসে বাবার গালে গাল ঘষে দিলো। শান্ত ডাকল তখুনি, ‘বস!!’
আদিল মেয়ের গালে চুমু খেয়ে নামিয়ে দিলো, ‘যাও, মায়ের কাছে যাও দোনা। ড্যাড ইজ বিজিই।’
হৃদি অসন্তুষ্ট হলো, ‘বিজিম্যান!’
আদিল মৃদু হাসল। মেয়ের মাথা বুলিয়ে দিলো, ‘যাই? হুম?’
‘তাড়াতাড়ি এসো।’
আদিল উঠে বসেছে গাড়িতে। গাড়িগুলো সাথে সাথে চোখের পলকে বেরিয়ে গেলো। সে দৃশ্য ওপর থেকে আড়াল হয়ে দেখল রোযা। তার দৃষ্টি সরল না অনেকক্ষণ। বুকের ভেতরে কেমন অজানা অস্থিরতা বিরাজ করছে। ক্রমশ সে অনুভূতির চাদরে হারিয়ে যাচ্ছে। অনুভূতি জমতে জমতে পাহাড়সম হচ্ছে বুঝি! রোযা আলতোভাবে চেপে ধরল হৃৎপিণ্ডের জায়গাটা। চোখ বুঝল।
‘এমন হওয়ার কথা তো ছিলো না… তবে?’
—————
নৈবেদ্য— আদিলের গোপন হাতিয়ার। আলমগীর সওদাগরের একেবারে ছায়াসঙ্গী হয়ে তাকে বসানো হয়েছে বহু আগেই। এতটাই নিখুঁতভাবে যে, সন্দেহের সামান্যতম আঁচও কেউ পায়নি। নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে খুব সহজে ডাকা হয় না। নৈবেদ্যও অতি প্রয়োজন ছাড়া কখনো যোগাযোগ করে না। আর যদি মাঝরাতে সে নিজেই চলে আসে, তবে বুঝতে হবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক নেই। আজও তাই হয়েছে। খবর পেয়েই রাতবিরেতে নিজের গোপন বাংলোয় এসে পৌঁছেছে আদিল। নৈবেদ্য রুমের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আদিলকে দেখেই আর সময় নষ্ট করল না -
'আলমগীর সওদাগর আমাকে বিশ্বাস করলেও শাহাদাত আর তার মেয়ে ঋণা সওদাগর আমাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না। গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হলেই আমাকে সরিয়ে রাখা হয়। আজ হাসপাতাল থেকে ফেরার পর অচেনা-অজানা কয়েকজন লোক এসেছে বাড়িতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রাইভেট রুমে ছিলো ওরা। কী নিয়ে কথা হয়েছে জানি না। ভীষণ গোপনীয়তা বজায় রেখেছে সবাই। তবে… একটা জিনিস নিশ্চিত শুনেছি, বস। আপনার নাম।'
এক মুহূর্ত থামল। গলায় চাপা অস্থিরতা -
'তবে আমার ধারণা মতে বস আপনাকে নিয়েই আলোচনা হয়েছে। বড় কোনো ষড়যন্ত্র করছে। হতে যাচ্ছে।'
ঝাড়বাতির সাদা আলো এসে পড়েছে আদিলের মুখে। ধূসর চোখদুটো কাচের মতো জ্বলে উঠেছে, অথচ মুখাবয়বে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন নেই। কোনো উত্তর না দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো রুমের মাঝখানে রাখা সবুজ ভেলভেটে মোড়া বিলিয়ার্ডস টেবিলের কাছে। কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিল। শান্ত নীরবে কিউ স্টিক এগিয়ে দিল। আদিল সেটি হাতে তুলে নিয়ে নীল চক ঘষল অগ্রভাগে। তারপর সামান্য ঝুঁকে টেবিলের ওপর ভর দিল। কব্জির টানটান শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল তাতে। চোখ স্থির হয়ে রইল ছড়িয়ে থাকা বলগুলোর ওপর। দৃষ্টি না সরিয়েই প্রশ্ন করল -
'চেনা কেউ ছিল না ওদের মধ্যে?'
নৈবেদ্য ভ্রু কুঁচকে ফেলল। স্মৃতি হাতড়াল। ছিলো কী? সতর্ক থাকতে গিয়ে চেয়েও মুখ দেখাটা পরিষ্কার ভাবে হয়ে ওঠেনি।
'পুরো মুখ দেখতে পারিনি, বস। ইচ্ছে করেই নিজেদের আড়াল করে রেখেছিল। তবে…'
সে একটু ইতস্তত করল -
'আমার মনে হয়েছে, ওদের মধ্যে একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাই ছিল।'
রুমে নিস্তব্ধতা নামল। আদিলের মুখে তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া ফুটল না। কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শান্তর চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। এলেন বিরক্ত স্বরে গর্জে উঠল -
'বস, ওই মাদারফাকার হঠাৎ ম রার জন্য এতো লাফাচ্ছে কেনো? টিকিটটা আগে কেটে দিই? অনেক বেশি উড়তেসে!'
নীরব আদিলের সমস্ত মনোযোগ তখনও টেবিলের ওপর। ঠাস! সাদা কিউ বলটা বিদ্যুতের মতো ছুটে গিয়ে পরপর তিনটি রঙিন বলে আঘাত করল। মুহূর্তের ব্যবধানে কালো বলটি নিখুঁতভাবে গিয়ে পড়ল পকেটে। টেবিলজুড়ে কয়েক সেকেন্ড শুধু বলগুলোর সংঘর্ষের শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে থাকল। শব্দ থেমে যেতেই আদিল ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। কণ্ঠ শোনাল রাতের আঁধারের চেয়েও রহস্যময় -
'এতো সহজে? উহুঁম। ওর আমি খুব আদরযত্ন করতে চাই, এলেন। ওর ভাই আমার হাত থেকে ওরে কীভাবে বাঁচাবে আই'ল লাভ টু ওয়াচ দ্যাট!'
নৈবেদ্য তখনো অস্থির হয়ে রইলো, ‘বস, আরেকটা ব্যাপার!’
আদিল ইশারায় বোঝাল বলতে। নৈবেদ্য বলে গেলো।
—————
বুধবার দিন সন্ধ্যায় ক্লাবে পৌঁছেছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রায় সবাই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ডাক কে এড়াতে পারে? কার সে দুঃসাহস? দিকপাল চ্যাটার্জি, আলমগীর সওদাগর থেকে ধরে আইন মন্ত্রীও এসে পৌঁছেছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর মেজাজ অবশ্য আজ বেশ চমৎকার। চোখমুখ জ্বলজ্বল করছে তার। আদিল মির্জা এসে পৌঁছাল তখুনি। আব্দুল মান্নান তড়তড় করে চেপে পাশে বসার জায়গা করে দিলেন। আদিল বসল গিয়ে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবারে গলাটা পরিষ্কার করে জানালেন -
‘একটা সুখবর আছে!’
দিকপাল চ্যাটার্জি আগ্রহী হলেন, ‘কী মন্ত্রী সাহেব? আব্দুল মান্নান সাহেবের মতন এই বয়সে, মাানে বুড়ো ঘনঘন বিয়ে করার সুখবর নাকি?’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর উজ্জ্বল মুখটা নিভে গেলো মুহূর্তে। তার নিশ্চুপ মুখ দেখে সবার যা বোঝার বোঝা হয়ে গিয়েছে! আব্দুল মান্নান গর্জে উঠলেন -
‘দিকপাল মুখে লাগাম টানো।’
দিকপাল চ্যাটার্জি চুপ করে গেলেন। আব্দুল মান্নান বলে গেলেন শান্ত হয়ে, ‘বয়স তো আমাগো বেশি না। শুধু চুল গুলা পাইকা গেসে বাতাসেএএএ! তাইতো মন্ত্রী সাহেব?’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী গলাটা পরিষ্কার করে নিলেন। আড়চোখে তাকালেন নির্বিকার আদিলের দিকে। আদিলের কালো গ্লাভস পরা ডান হাতে মদের গ্লাস। যাতে সে এখনো ঠোঁট ছোঁয়ায়নি। পরনে কালো স্যুট। পায়ের ওপরে পা তোলায় কালো চকচকে জুতোটা আলোয় চকচক করছে। আব্দুল মান্নান আদিলের কাঁধে গুঁতিয়ে বললেন -
‘শোনো, বাপ। ব্যাডা মানুষের জীবনে নারী ছাড়া আছে কী? কিছু নারীর টেস্ট না নিলে এই জীবন বৃথা!’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পাশেই তার ছোটো ভাই। চুপচাপ আছে। আড়চোখে আদিলকেই দেখছে। আদিল অবশ্য ফিরে তাকায়নি। একমুহূর্তে দাঁড়াল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী। সর্বপ্রথম তিনি এসে দাঁড়ালেন আদিলের সামনে। বললেন -
‘ফ্রাইডেতে আমার বিয়ে। চলে এসো।’
বলতে বলতে তিনি একটা কার্ড আদিলের হাতে ধরিয়ে দিলেন। পরপর বাকিদের হাতেও ধরালেন একেক করে। শান্তর মুখটা দেখার মতো হলো। আদিলের পেছনে দাঁড়ানো ও অগোচরে নাক কুঁচকে ফের নির্বিকার হলো। আদিল তাকাল হাতের কার্ডের দিকে। স্ট্যান্ডার্ড একটা কার্ড। বেশ পয়সা গচ্ছা করে বানানো হয়েছে! দিকপাল চ্যাটার্জি কপাল কুঁচকে ফেললেন। পরমুহূর্তেই চেহারা স্বাভাবিক রেখে যত সম্ভব নরম হয়ে জিজ্ঞেস করলেন -
‘মন্ত্রী সাহেব, এইটা কয় নাম্বার বউ?’
রুষ্ট হলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী। চোখ রাঙিয়ে তাকালেন। তবে কিছু বললেন না। চামড়া ওতটাও মোটা না। শুধু বললেন -
‘আয়োজন করে বিয়ে তো আমিও প্রাপ্য বলো? আমার হবু স্ত্রীর বয়স কম। সে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ে করতে চেয়েছে। সমুদ্রের পাশে। তাই আরকী!’
আব্দুল মান্নান ঠোঁটে দাঁত পিষে দুষ্টু ইঙ্গিতে বললেন, ‘ভালোই প্রেমে মজছেন মন্ত্রী সাহেব!
খানিক লজ্জাই পেলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী। ভুল তো বলেনি। তাকে দিয়ে যেহেতু এতকিছু করাতে পেরেছে নিশ্চয়ই তিনি ভালোভাবে প্রেমে পড়েছেন এই বয়সে এসে। দিকপাল চ্যাটার্জি আগ্রহ দেখালেন -
‘বেশ সুন্দরী মনে হইতেসে!’
গর্বিত দেখাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে। তখুনি প্রাইভেট এই রুমের দরজায় টোকা পড়ল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর চোখজোড়া চকচক করে উঠল। জানালেন -
‘তোমাদের সাথে আলাপ করার জন্য এনেছি ওকে।’
বলতে বলতে তিনি এগিয়ে গিয়ে নিজে দরজা খুলে ধরলেন। কমবয়সী এক তরুণী। পরনে একটা ব্রান্ডের হাঁটুর ওপরে থাকা মিনি ফ্রোক। যার হাতা নেই বললেই চলে। ফর্সা পা দুটো দৃশ্যমান। চকচক করছে তা। একজোড়া হাই হিল পায়ে। কাঁধ সমান কার্লিচুল। ভীষণ চমৎকার, আকর্ষণীয় একটা মুখ। ঠোঁটে ডার্ক রেড লিপস্টিক। হাঁটার ধাঁচ, তাকানোর ধাঁচই অন্যরকম। যেকোনো পুরুষের বুকে উষ্ণতা ছড়িয়ে দিতে পারে। রুমের প্রত্যেকেই ড্যাবড্যাব করে দেখছে আগন্তুক এই তরুণীকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী তরুণীর কোমর চেপে ভীষণ গর্ব নিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন -
‘মিট মাই হবু স্ত্রী, রীভা।’
রীভা ভীষণ চমৎকার হেসে হাত নাড়িয়ে বলল্, ‘হাই এভ্রিওয়ান।’
আব্দুল মান্নানের দৃষ্টি সরছিলোই না তরুণীর ওপর থেকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী চোখ রাঙালে তবেই দৃষ্টি সরিয়ে তাকালেন পাশে আদিলের দিকে। যার চোখ মদের গ্লাস থেকে সরেনি। নির্বাক, যেমন সবসময় থাকে। স্বরাষ্ট্র স্ত্রীকে নিয়ে সোফায় বসে একেকজনের নাম ধরে ধরে পরিচয় করালেন। আদিলকে ওমন নির্বিকার দেখে থমকালেন না। সে এমনই তিনি জানেন। বললেন -
‘এই হচ্ছে আদিল মির্জা।’
রীভা ভীষণ চমৎকার হেসে মন্ত্রীর গায়ে ঢলে পড়ল। তার বুকে আঁকিবুঁকি করে উষ্ণতা ছড়িয়ে বলল, ‘চিনি তাকে। তাকে কে না চেনে?’
পরপর তাকাল আদিলের দিকে। গুরুগম্ভীর ওই মুখে চেয়ে বলল, ‘শুনেছি তিনি বিয়ে করেছেন? আমাদের বিয়েতে তার স্ত্রীকে দেখব তো? সেই ভাগ্য হবে তো সুইটহার্ট?’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ভীষণ নরম হয়ে বললেন, ‘কেনো হবে না সোনা?’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী তাকালেন আদিলের দিকে। বললেন, ‘বিয়েতে এসো আফিল। ম্যাডামকে সাথে এনো।’
আদিল উত্তর দিলো না। রীভা হেসে বলল, ‘আপনারা সবাই আসবেন কিন্তু!’
—————
ফেরার উদ্দেশ্যে দিকপাল চ্যাটার্জি গাড়িতে ওঠার আগে আদিলের কানের কাছে গিয়ে বলল, ‘এই মন্ত্রী কী খেলা দেখাতে চাইতেসে? বুড়োটাকে আসলেই এই বয়সে প্রেমে পড়ল?’
আদিল তাকাল সামনে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী তার অল্পবয়সী বউ নিয়ে গাড়িতেউঠে বসেছে। পেছনের গাড়িতে উঠেছে তার ছোটো ভাই। যে আড়চোখে আদিলের দিকে তাকিয়েছে। আদিল আওড়াল -
‘পড়তেই পারে।’
আব্দুল মান্নান এসে দাঁড়ালেন, ‘মন্ত্রীর এই বউটাকে আমার আমার লাগল!’
দিকপাল চ্যাটার্জি নাকমুখ কোঁচকালেন, ‘সব মেয়েরেই তো আপনার আপনার লাগে।’
‘কিন্তু এইটা তো মাইয়া না। পুরাই সেক্সি অপ্সরা। ওই বুইড়া হ্যান্ডেল করতে পারব এমন মাইয়ামানুষ?’
দিকপাল চ্যাটার্জি আদিলের দিকে তাকিয়ে নিজের সন্দেহটুকু জানাল, ‘সুবিধার লাগল না। কেমন যেন! ঠিকঠাক বোঝাতে পারতেসি না। মাইয়াটারে একটু বেশিই গোছানো লাগল।’
আব্দুল মান্নান, দিকপাল চ্যাটার্জি সব বাকিরা বেরিয়ে যাচ্ছেন। তাই দেখতে পেলেন না আদিলের ঠোঁটের কোণে বসা রহস্যময় হাসিটুকু।
—————
বৃহস্পতিবারে তেমন শীত পড়েনি যতটা আজ অর্থাৎ শুক্রবারে পড়েছে। শীতের তাপমাত্রা বেড়েছে কয়েকগুণে। বাইরে রীতিমতো কুয়াশায় ঢেকে ছিলো সারাসকাল। এইতো দুপুরের দিকে পুরোপুরি কেটেছে তা। রোযা তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে উপভোগ করছে আশপাশটা। ভেতরে বেডরুমের বিছানা ফাঁকা। আদিল অনেক রাত করে ফিরে দুটো ঘণ্টাও থাকেনি। বেরিয়ে গিয়েছে ফের, বাকিটুকু রাতে আর ফেরেনি। রোযা তাকাল অদূরে দাঁড়ানো সদরদরজার দিকে। রাতভর বিছানায় এপাশওপাশ করে সে কারও অপেক্ষা করেছে তা যতবার মস্তিষ্ক জানায় ততবার রোযা চোখমুখ বুজে ফেলে। অসহায় অনুভব করে! দরজায় টোকা পড়ল তখুনি। রোযা বারান্দা ছেড়ে প্রবেশ করল ভেতরে। আওয়াজ তুলল -
‘আসুন!’
নূরজাহান একটা চাকাওয়ালা স্টিলের গার্মেন্ট র্যাক ঠেলে ভেতরে আনছে সাথে করে। ওতে সাজানো কয়েকরকমের শাড়ি। কয়েকরকম কাপড়ের। পিওর সিল্ক, সাটিন সিল্ক, কাতান…ইত্যাদি! রোযার মনে পড়ল আদিলের কথাগুলো। বলেছিল শুক্রবার তাদের সেন্টমার্টিন যেতে হবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বিয়ের জন্য। নূরজাহান বলল -
‘ম্যাডাম, আজকের অনুষ্ঠানের জন্য কোনটা ভালো লাগে দেখুনতো? আপনি যা পরবেন তাতেই মানাবে! আপনাকে প্রত্যেকটা রং, প্রত্যেকটা কাপড় মানিয়ে যায়।’
রোযা নিঃশব্দে হাসল। বলল, ‘আমাকে কয় রঙে আর কয়ধরনের কাপড়ে দেখেছেন শুনি?’
নূরজাহান ঠোঁটে ঠোঁট টিপে হাসি চাপিয়ে বলে, ‘রং আর কাপড় দেখতে হবে কেনো? আপনাকে দেখলেই বলা যায়।’
রোযা মাথা দুলিয়ে বোঝাল তর্কে পারবে না। এগিয়ে গেলো র্যাকের সামনে। প্রত্যেকটা শাড়ি ছুঁয়ে অবশেষে শুভ্র রঙেরসাটিন সিল্কের শাড়িটা বেছে নিলো। শাড়ির সাথে ব্লাউজও পেলো। হাই নেক আর বড়ো হাতার এক ফিটিং ব্লাউজ। নূরজাহান বলল -
‘ম্যাডাম, লাঞ্চ করে তবে তৈরি হয়ে নিন?’
রোযা তাকাল ঘড়ির দিকে। মাথা দুলিয়ে বেরুল নূরজাহানের সাথে। লাঞ্চ করে তৈরি হতে হতে বাজল প্রায় চারটা। অনেক সময় নিয়ে তৈরি হয়েছে সে। নিজের হাতে পছন্দ করে পরেছে কানের দুল, হাতের বালা দুটো। এক রঙের সাদা শাড়ি, সাদা ব্লাউজের সাথে কানের ছোটো দুলটা লাল পাথরের। হাতের বালা দুটোও… লাল রঙের। ভীষণ ছোটো লাল টিপটা কপালে পরে বড়ো আয়নার সামনে দাঁড়াল রোযা। একপল নিজেকে দেখে পরমুহূর্তেই নিস্তব্দ হয়ে পড়ল। এতো সুন্দর করে, এতো নিখুঁতভাবে সে সেজেছে। কেনো? কার জন্য? নূরজাহান মুগ্ধ না হয়ে পারল না। সে হতবিহ্বল হয়ে বলল -
‘রঙটা আপনার গায়ের সাথে মিশে গিয়েছে ম্যাডাম। চোখ ফেরাতে পারছি না। মাশাআল্লাহ্!’
রোযার ভেতরটা সাথে সাথে অশান্ত হয়ে পড়ল। নিজেকে আরেকটিবার দেখতে পারল না। মনে হলো সে আয়নায় আদিলের প্রতিবিম্ব দেখছে। মুগ্ধ, নেশাগ্রস্ত একজোড়া ধূসর চোখ চেয়ে আছে আয়নার মাধ্যমে তার দিকেই। ধুকপুক করে উঠল হৃৎপিণ্ড। অস্থির ভাবে চোখ বুজে কপাল চাপড়ে আওড়াল -
‘নূরজাহান আমি আর যেতে চাচ্ছি না।’
নূরজাহান হেসে বলে, ‘মজা করবেন না ম্যাডাম। আপনাকে ছোঁয়ার জন্য মার্জনা করবেন।’
বলেই রোযাকে মজার ছলে পেছন থেকে ঠেলেঠুলে বের করছে। রোযা অবশ্য কথায় কথায় বলেছে মাত্র। শান্ত অপেক্ষারত ছিলো। রোযাকে নামতে দেখে একপল চেয়ে সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি নামাল। ম্যাডাম আসুন, বলে আগে আগে বেরুল গাড়ির দরজা খোলার জন্য।
—————
গাড়ি ছুটেছে বাংলোর উদ্দেশ্যে। ওখান থেকে আদিল মির্জার প্রাইভেট হেলিকপ্টার করে রওনা হবে তারা সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশ্যে। শান্ত ড্রাইভিংয়ে বসেছে। পাশেই ক্লান্ত। রোযা ব্যাকসিটে, বাইরেটা দেখতে দেখতে শুধাল -
‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী তো বেশ বয়স্ক দেখলাম। তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করছেন?’
শান্ত বিদ্রুপ করে, ‘ম্যাডাম, দ্বিতীয় নয়। চার পাঁচটার পরে এটা ছয় সাত নাম্বার হতে পা—’
শান্ত আর কিছু বলতে পারল না। সতর্ক হলো। সামনে থেকে গাড়ি ধেয়ে আসছে, সোজা তাদের দিকে। হঠাৎ তীব্র গতিতে এসে ধাক্কা মার তাদের গাড়িটা ফ্রন্টে। লাফিয়ে উঠল তাদের গাড়ি। ক্লান্ত দ্রুতো বলল -
‘ম্যাডাম, শক্ত হয়ে বসুন।’
বলেই ও কাঁচ খুলে পিস্ত ল ধরা হাত বের করে শুট করছে। ততক্ষণে তাদের গাড়িগুলো ঘিরে ধরা হয়েছে। ভয়ে রোযার হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠল। পরপরই দেখল সামনের গাড়ি থেকে একজন বেরিয়ে এসেছে। চিনতে অসুবিধে হলো না রোযার। ঋণা, আদিল মির্জার এক্স ওয়াইফ। এক্স ওয়াইফ, আদিলের স্ত্রী ছিল। হৃদির জন্মদাত্রী মা! মস্তিষ্ক কথাটা প্রথমবারের মতন পুনরায় উচ্চারণ করল, আদিলের স্ত্রী! পরপরই মনে হলো তার হৃৎপিণ্ড স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। স্তব্ধ হয়েছে তার সর্বাঙ্গ। ঋণা দাঁড়িয়েছে গাড়ির সামনে। উদ্দেশ্য বুঝতে এতটুকুই যথেষ্ট। রোযার মুখোমুখি হতে চাইছে! রোযা সাথে সাথে বেরুল না। বসে রইল থম মে রে। শান্ত নির্বাক গলায় বলল -
‘ম্যাডাম, শক্ত হয়ে বসুন। টান দিব গাড়ি…’
রোযা সামনে চেয়ে থেকে হঠাৎ বলল, ‘বের হব, শান্ত।’
শান্ত চমকে ফিরে তাকাল। রোযা চেয়ে আছে সামনে দাঁড়ানো নারীর দিকে। বিনাবাক্যে ক্লান্ত ইতোমধ্যে দরজা খুলে বেরিয়ে গিয়েছে। এসে খুলেছে রোযার পাশের দরজা। শান্তও বেরিয়েছে। বেরিয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের পেছনের গাড়িতে থাকা বডিগার্ডগুলোও। রোযা বেরিয়ে এলো ধীরেসুস্থে। শাড়ির আঁচল পিঠ থেকে ঘুরিয়ে এনে অন্যহাতে ধরে ধীরেসুস্থে একেকটি কদম ফেলে সামনে এসে দাঁড়াল ঋণার। ঋণার দাঁড়িয়ে আছে নির্বিকার চোখমুখে। আপদমস্তক সজ্জিত একজন নারী। পরনে শাড়ি। বেইজ রঙের। আকর্ষণীয় পেট দৃশ্যমান পুরোপুরি। ব্লাউজে তেমন কাপড় নেই। একটুও শরীর ঢাকতে পারেনি। ঋণা হিলে শব্দ তুলে এসে দাঁড়াল রোযার আরও কাছে। সাথে সাথে শান্ত তেড়ে এলো -
‘সাবধান!!’
ঋণা বিদ্রুপের সাথে বলল, ‘এতো প্রটেকশন! অবশ্য প্রটেকশন তো দিবেই। নাহলে দু সেকেন্ডে মা রা পড়বে যে! নিজের বলতে আছে কী? নাথিং! অ্যাবসুলেটলি নাথিং। আসছে তো ফ্রম আ ভেরি ব্রোক ফ্যামিলি!’
রোযা হাসল। তার মৃদু হাসি রিনরিনে ধ্বনি ভেসে বেড়াল, ‘রাইট নাউ হোয়াট ডু ইউ হ্যাভ মিসেস চৌধুরী?’
ঋণা নাক সিঁটকাল, ‘জিজ্ঞেস কর তোর পেছনে যারা আমার কী আছে! ঋণা সওদাগর নাম……’
পরমুহূর্তেই ঋণা ডাবল মিনিং প্রশ্নটা বুঝে হিসহিস করল। পরমুহূর্তেই বাঁকা হেসে গলা নামাল -
‘যা নিয়ে তুই এতো প্রাউড হচ্ছিস, দ্যাট ওয়াজ মাই ম্যান, আদিল মির্জা ওয়াজ মাই হাজবেন্ড। এই ঋণা সওদাগরের। আমি আমার হাজবেন্ড ফি….’
রোযা ভেতরের র ক্ত দাউদাউ করে ফুটে উঠল। চোখদুটো মুহূর্তে র ক্ত লাল হয়ে উঠল তার অজান্তেই। আর একটা শব্দও শুনতে পারল না। মস্তিষ্ক কাজ করার আগেই কাজ করল তার কদম, তার হাত। নরম হাতটা আজ যেন দানবীয় হয়ে উঠল। ঝড়ের বেগে, অপ্রত্যাশিতভাবে দুহাতে টিপে ধরল ঋণার গলা। কানে বাজল তারই মুখ দিয়ে বেরুনো কথাগুলো -
‘আমার স্বামী.. আদিল মির্জা এই আয়াত তালুকদার রোযার স্বামী। এই মুখ দিয়ে আরেকবার উচ্চারণ কর, এই রাস্তায় তোর মুখ পিষে ফেলব।’
ঋণা হতবিহ্বল হয়েছে। কল্পনার বাহিরে ছিলো এমন আচরণ। এইজন্যই সে প্রস্তুত ছিলো না। বোধ ফিরতেই আগুন ঝরল চোখ দিয়ে। শান্ত এসে বাঁধা দিতে পারল না। তার আগেই রোযার গালে চড় পড়ল। মাথাটা হেলে পড়ল ডানপাশে। ঋণা তেড়ে রোযার চুল ধরতে চেয়েছিল। শান্ত এসে ধরবে কী! তার আগেই এক অবিশ্বাস্য তান্ডব হয়ে গেলো। রোযা চোখের পলকে শাড়িটা সামলে ঘুরে গিয়ে ডান পা টা তুলে লাথি বসিয়েছে ঋণার পায়ের কাছে। হঠাৎ পায়ে আক্রমণ পেয়ে ঋণা ঝুঁকতেই, ঘুরে এবারে লাথি বসিয়েছে তার ঘাড়ে। ঋণা মুখ থুবড়ে পড়তেই তার বডিগার্ড সব সতর্ক হয়ে এসে দাঁড়িয়েছে সাথে। শান্ত আর ক্লান্ত কিংকর্তব্যবিমুঢ়! শান্ত ডান হাতটা একমুহূর্তের মুখের কাছে চলে গিয়েছে অবিশ্বাস্যে।
আহত বাঘিনীর ন্যায় গর্জন দিয়ে ওঠা ঋণার দিকে রোযা এগুল বাঁধ সাধল ঋণার বডিগার্ড। ক্লান্ত এসে কয়েক ধাপে আটকে ধরল একটাকে। ঋণা ইতোমধ্যে উঠে দাঁড়িয়েছে। নিজেই নিজের বডিগার্ড সরিয়ে আক্রমণ করতে চাইলে ক্লান্ত এসে দাঁড়াল সামনে। রোযা তৎক্ষণাৎ এগুল না। নিস্পৃহ চোখে চেয়ে বলে গেলো -
‘ইন ইওর ড্রিমস। হি ইজ….’
রোযা ক্লান্তকে সরিয়ে এগুল। কাছাকাছি এসে আওয়াজ নামাল খানিক, ‘হি ইজ মাইন। ফরএভার।’
আর দাঁড়াল না। ঘুরে হাঁটা ধরল গাড়ির দিকে। বাতাসে আঁচল, চুল দুলল। ক্লান্ত দরজা মেলে ধরতেই উঠে বসল। ততক্ষণে সবাই গাড়িতে উঠে বসেছে। মিনিটের মধ্যে গাড়ি ছুটল। রোযা জানালা দিয়ে র ক্তাক্ত চোখে যতক্ষণ দেখা গেল দেখল রাগে ফুঁসতে থাকা ঋণাকে। অথচ চোখের আড়াল হতেই ধীরে ধীরে নীরবতা নামল। ভয়ংকর নীরবতা। মস্তিষ্ক সচল হলো। যা যা হয়ে গেলো তা পুনরাবৃত্তি করল মস্তিষ্ক। চোখে ভাসল তার আচরণ, তার বলা কথাগুলো। রোযা মুহূর্তে চোখ বুজে সিটে মাথা এলিয়ে দিলো অসহায় ভাবে।
—————
বারিধারা থেকে সেন্টি মার্টিন আনুমানিক তিনশো বিশ থেকে তিনশো পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরত্বে। আদিল মির্জার প্রাইভেট হেলিকপ্টার দিয়ে সেন্ট মার্টিন পৌঁছাতে উর্ধ্বে গেলে এক ঘণ্টা পঞ্চাশ মিনিট লাগতে পারে। রোযা এই প্রথম এই বাংলোর সম্পর্কে জানল বা দেখল। বাংলো থেকে আরও দূরে যাচ্ছে তারা। এখান থেকেই সে হেলিকপ্টারের আওয়াজ শুনতে পারেছে। কংক্রিটের বিত্তকার হেলিপ্যাডের ওপরে জেড ব্ল্যাক হেলিকপ্টারের রটার ব্লেড ঘুরছে সমানে। ঝড়ের মতো বালির ঝড় উঠেছে চারিপাশে। আদিল দাঁড়িয়ে আছে দূরত্ব রেখে। পরনে কালো স্যুটের ওপরে কালো অভারকোট যা হাঁটু ছুঁয়েছে। তার পেছনে এলেন সহ তার বডিগার্ডস। তাদের গাড়ি দেখেই হাতের সিগারেট ফেলে আদিল এগিয়ে আসছে। রোযা গাড়িতে বসে থেকে দেখল দাম্ভিক লোকটাকে। যাকে তার সামনে ওতটাও দাম্ভিক লাগতো না…
আদিল গাড়ির দরজা খুলে ধরে, ‘আসো…’
বলতে বলতে মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে ভেতরে তাকাতেই থমকে পড়ে তার দুনিয়া। রোযা পুতুলের মতো সেজেগুজে চেয়ে আছে তারই দিকে। চোখে! আদিল চোখ ফেরাতে পারল না। সম্মোহন হওয়ার মতোই চেয়ে রইল। একপর্যায়ে দৃষ্টি সরাল রোযা। আদিল হাত বাড়িয়ে দিলো ধরে নামার জন্য। ওই হাতের ওপরে সঙ্গে সঙ্গে হাত রাখল না রোযা। আদিল বুঝল বুঝি! আড়চোখে শান্তর দিকে চেয়ে বুঝল কিছু একটা হয়েছে! জিজ্ঞেস করবে তার আগেই রোযা হাত রাখল শক্তপোক্ত হাতের ওপরে। বেরিয়ে এলো শাড়ি সামলে। হাত সরিয়ে নিলো। শাড়ি গোছাল, আঁচল টেনে আনল পিঠ পেচিয়ে অন্যপাশে। ততক্ষণে আদিল তার কোমর বুঝে নিয়েছে যেন তার নামেই খোদা বানিয়েছেন। কোমরে হাত পেঁচিয়ে এগুতে এগুতে কণ্ঠ নামিয়ে শুধাল -
‘উচ্চতা ভীতি আছে? ভয় পাবে?’
হেলিকপ্টারের আওয়াজ ছাপিয়ে রোযা শুধু নিজের হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ শুনল। আওড়াল, ‘না….’
‘ভয় পেলে জানিও।’
রোযা তাকাল আদিলের মুখের দিকে। না হাসলে কী ভীষণ গম্ভীর লাগে দেখতে! এইমুহূর্তেও লাগছে। আপাতত সামনে চেয়ে আছে। ইশারায় কিছু একটা আদেশ করছে। রোযা লম্বা নাকে চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞেস করতে শুনল নিজেকে -
‘ভয় পেলে?’
আদিলের জবাব পরিষ্কার বেশ। ভাবতেও হয় না, ‘সেভাবে পৌঁছাব যেভাবে ভয় পাবে না।’
‘দেরি হবে না?’
‘দে ক্যান ওয়েট।’
রোযা চুপ করে গেল। পাশের লোকটা বুঝল না তার মনের অস্বাভাবিক অবস্থা। ততক্ষণে আদিল তাকে নিয়ে পৌঁছেছে হেলিকপ্টারের সামনে। তাকে উঠিয়ে নিজেও উঠে বসেছে। উঠেছে শান্ত, এলেন, ক্লান্ত, স্বপণ। বাকি কিছু বডিগার্ডস আগেই রওনা দিয়েছে। ইতোমধ্যে তারা সেন্ট মার্টিনের আকাশের নিচে।
—————
শীতের মাসে দিন ছোটো হয়ে আসে। সন্ধ্যা নামে দ্রুতো। হেলিকপ্টার তখনো আকাশের বুক চিড়ে ছুটছে। সূর্য ডুবে নেমেছে অন্ধকার। কুয়াশায় আশপাশটা অস্পষ্ট। রোযা চেয়ে থাকল অন্যপাশে, বাইরেটা দেখছে। অথচ সেদিকে তার মনোযোগ নেই। পাশে বসা নির্বিকার পুরুষ তার ধ্যানধারণায়। আদিল তখন কথা বলছে শান্ত, এলেনদের সাথে। তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। কোনো প্ল্যান বা কিছু! সেসবে রোযা মনোযোগ দিতে পারেনি। শুধু গম্ভীর, গভীর কণ্ঠখানাই বাজছে। পাশেই, তার গা ঘেঁষে বসা শরীরের উষ্ণা অনুভব করা যাচ্ছে। আদিল একফাঁকে তাকাল তার দিকে -
‘খারাপ লাগছে?’
‘উহুঁ…’
বিপরীতে রুক্ষ হাতটা তার মাথা থেকে বুলিয়ে গিয়ে থামল কাঁধে। নিজের সাথে আগলে রেখে পুনরায় ব্যস্ত হলো আলাপে। তার গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে বেড়াল হেলিকপ্টারের ভেতরে। এক ঘণ্টা বিশ মিনিটের মাথায় হেলিকপ্টার সেন্ট মার্টিনের আকাশে এসে পৌঁছাল। নিচে স্বচ্ছ সমুদ্রসৈকতের জলরাশীর উচ্ছ্বাস, ঢেউ বয়ে গিয়েছে। যা রাতে আঁধারে অস্পষ্ট দেখাল। নীল এই সমুদ্রের বুকে ভেসে আছে ছোট্ট প্রবালদ্বীপ। চারদিকে সারিসারি নারিকেল গাছ। দূর থেকেই নজরে পড়ল বিয়ের আয়োজন। সমুদ্রের কিনারা ঘেঁষে তৈরি করা হয়েছে বিশাল কাচঘেরা প্যান্ডেল। হাজার হাজার ঝাড়বাতি, ফেয়ারি লাইট আর সাদা ফুলে সাজানো পুরো এলাকা দূর থেকে জ্বলজ্বল করছে। নিরাপত্তার বলয় এতটাই কঠোর যে দ্বীপের একাংশ সম্পূর্ণ ফাঁকা করে রাখা হয়েছে অতিথিদের জন্য। রোযা দৃষ্টি ফিরিয়ে আনল। তাকাল নিচে। হেলিকপ্টারের উচ্চতা ধীরেধীরে কমতে শুরু করেছে। হেলিকপ্টার নামল হেলিপ্যাডের ওপরে। আদিল নামল পরপরই। হাত বাড়িয়ে দিতেই হাত রাখল রোযা। নামল ধীরেসুস্থে। আকাশের অর্ধখণ্ডিত চাঁদটা বারবার কালো মেঘে ঢেকে যাচ্ছে তো ফের উঁকি দিচ্ছে।
আদিল রোযার কোমর আগলে কিছুটা এগুলো সমুদ্রের দিকে। তাদের পেছনেই হেলিকপ্টার। শান্ত, এলেন সহ বাকিরা ভীষণ দূরত্ব রেখেছে। রোযার দৃষ্টি সমুদ্রে দেখে আদিল বলল -
‘প্রোগ্রাম থেকে ঘুরে এসে নিয়ে যাব।’
রোযা উত্তর করল না। আদিলের সাথে এগুলোও না। আদিল ফিরে তাকাতেই রোযাও তাকাল। মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ এমন প্রশ্ন করল যা শুনে মনে হয় স্নিগ্ধ বাতাসও ধীর হয়ে এলো -
‘কেনো বিয়ে করেছিলেন ঋণাকে?’
রোযার শ্বাস আটকে থাকল গলায়। অথচ যাকে প্রশ্ন করা হলো তাকে তেমন অপ্রস্তুত, চমকাতে দেখা গেলো না। সংক্ষিপ্ত উত্তরও এলো কেমন সঙ্গে সঙ্গে -
‘কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ ছিলো। ব্যবসায়িক কারণে!’
রোযা অটল দৃষ্টি রইল ধূসর চোখে, ‘কখনো তাকে ভালোবাসেননি?’
‘না…’
রোযা করে গেলো প্রশ্ন, ‘পছন্দ করেননি?’
‘না।’
রোযা ঢোক গিলল এই প্রশ্ন করার সময়তে। কণ্ঠ কাঁপল, সাথে চোখের পাপড়িও, ‘তাহলে হৃদি…কীভা…’
রোযা আর প্রশ্নটা করতে পারে না। হৃদি হয়েছে বলেইতো পেয়েছে সে! নীরবতা বয়ে গেল কিছুক্ষণ। রোযা আর তাকিয়ে থাকতে পারল না। দৃষ্টি যেই নোয়াবে আদিলের হাত পড়ল তার চোয়ালে। তাকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করল। মাথা নুইয়ে তার চোখের গভীরে তাকিয়ে সময় নিয়ে থেমে থেমে কণ্ঠ নামিয়ে আওড়াল -
‘আমি অচেতন ছিলাম। ড্রাগের ওপরে ছিলাম। দ্যাট ওয়াজ মাই ইনকম্পিটেন্স। যাই হোক না কেনো, আমি ওই রাতকে অস্বীকার করতে পারছি না। আই ডিড দ্যাট, অচেতন অবস্থাতেই হোক না কেনো। যার জন্যই আমিরা এসেছে আমার জীবনে।’
সমুদ্রের গর্জন, হেলিকপ্টারের আওয়াজ মিলেমিশে একাকার তখন। বাতাসের সাথে আদিলের জবাব মিলিয়ে গেল অনেকক্ষণ হলো। বিপরীতে রোযার প্রত্যুত্তর এলো না। আদিল আশা ছাড়ল যেমন। ফিরে তাকাল পেছনে। দু কদম পিছুল, আদেশ ছুঁড়বে শান্তদের উদ্দেশ্যে ফেরার জন্য ঠিক তখুনি হাতে স্পর্শ পেলো। মোলায়েম একটা হাত তার হাতটা টেনে ধরে রেখেছে। রোযা নিচের দিকে তাকিয়ে তখনো। পরনের সফেদ সিল্কের শাড়িটার আঁচল সযত্নে এযাত্রায় আদিলের হাতের কব্জিতে বাঁধল, ভীষণ সময় নিয়ে। তাকাল চোখ তুলে এবার। হতবিহ্বল ওই ধূসর মণিতে চেয়ে অকপটে বলে বসল -
'প্রেম মোবারক।'
আদিল বুঝল না। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে চেয়েই থাকল। রোযার কণ্ঠ নেমে এলো এবেলায়। সমুদ্রের আওয়াজের সাথে তা মিশল না বরঞ্চ আরও আকর্ষণীয় শোনাল -
'আপনাকে আমার প্রেম মোবারক মিস্টার মির্জা।'
আদিলের অস্তিত্ব থমকে গেল। পলক পড়ল না, বুকের ওঠানামা হলো না। কণ্ঠে গভীর থেকে শুধু একটা শব্দ বেরিয়ে এলো অবিশ্বাস্যের সুরে -
‘কী!’
‘এই আয়াত তালুকদার রোযার প্রেম আপনায় মোবারক।’
·
·
·
চলবে……………………………………………………