বৈশাখের গরমে নাস্তানাবুদ পৃথিবীতে এক খণ্ড স্বস্তি হয়ে ভিড় করে সন্ধ্যার নরম আকাশটি। প্রেমিকের বুকের মতোই আরামপ্রিয় হয়ে উঠে চারপাশটা।
মাঝে মাঝেই বৈশাখের একটি ঝড়ো হাওয়া উঠে এই গ্রীষ্মের শহরকে একমুঠো শীত দিয়ে যায়। মনে হয় কাঁথা মুড়িয়ে ঘুমোলে পাওয়া যাবে এক টুকরো স্বর্গ।
জোহরা বসে আছে টেলিভিশনের সামনে। আজ তার এক খণ্ড সিলেটের সাক্ষাৎকার আছে টেলিভিশনে। মেজবাহ্ শেখের সেই দুটো চোখ দেখবে যে দুটো চোখে সে দেখে নিয়েছিলো গোটা সিলেটের সৌন্দর্য। পুরো দৃষ্টি এক ধারে তাই টেলিভিশনের পর্দায়। রিমোর্টটা রেখে এসেছে নিজের ঘরে গিয়ে। টুইটুবানির এমন চতুর চোখ কীভাবে যেন বের করে ফেলে রিমোর্টটা। সিনেমার পোকা এত ও! ওর জন্য দু’দন্ড শান্তি নিয়ে মেজবাহ শেখকেও দেখতে পারে না।
প্রেমা, জোহরার ছোটো বোন এসে বসেছে সোফায় তারই পাশে। ধপ করে বসাতে সোফাটা কিছুটা শব্দ করে উঠল। পুরোনোতো বেশ, কাঠটাও ম্যাড়ম্যাড় করে ওঠল। জোহরা ভারি বিরক্ত হলো ছোটো বোনের কাজে। কিন্তু বকতে হলো না তার মোটেও। তার আগেই রান্নাঘর থেকে হৈহৈ করে ছুটে এলো টুইটুবানি। হাতে ছোটো একটা চা-চামচ। নির্ঘাত বাবার জন্য চা বানাচ্ছিলো। এই কাজের মাঝেও সোফার শব্দটা ঠিক ওর কানে পৌঁছে গিয়েছে কেমন! এই আসবাবপত্রের সাথে যে ওর মানুষের চেয়েও বেশি সখ্যতা। এদের কষ্ট ও আগে অনুভব করে।
“ছোটো আপা, আপনার হাত-পা গুলা কি একটু সামলাইয়া চলতে পারেন না? সবসময় এমন করে চলেন কেন, হ্যাঁ? সোফাডা ভাঙলো নাকি হায়রে, হায়! আব্বারে বলতে হইবো, আপনারা দুইজন অনেক বেতালে চলেন।”
টুইটুবানির বেশি কথা বলার স্বভাব। তার উপর কথা এতটাই জোরে বলে যেন পথের সেই মোড় থেকেও শুনতে পায় মানুষ। টেলিভিশনের ভেতরে থাকা মেজবাহ্ শেখকে দেখতে যেন বেশ বিরক্ত করছে টুইটুইবানির এই কথাগুলো।
প্রেমা কপালে ফেলল তিন ভাঁজ। ধমকে উঠল কর্কশ ভাবে,
“উফ, টুইটুবানি! তুমি কি একটু ধীরে কথা বলতে পারো না? সবসময় দহরমমহরম একটা ব্যাপার আছেই তোমার ভেতরে।”
“আপনেরা কিন্তু আমারে অপমান করতেছেন, ছোটো আপা। বড়ো আপা বিকালে দোতালায় আমাকে বলল আমি না-কি তার সব পাউডার শেষ কইরা ফেলি। এখন আপনি বলেন আমি না-কি চিল্লাফাল্লা করি। ইমন ভাই না থাকলেই আপনেরা আমার লগে এমন করেন।”
প্রেমা চোখ ছোটো ছোটো করল। বিকেলের দোতালার ঘটনাটি যে তার জানা নেই তা তার মুখের ভঙ্গিতেই বোঝা গেলো। সন্দিহান স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“আপা দোতালায় গিয়েছিলো? কেন? প্রায় শুক্রবারই ওর দোতালা যাওয়া লাগে কেন?”
জোহরার এতক্ষণ ধ্যান টেলিভিশনে থাকলও দোতালার কথা উঠতেই কানখাড়া হয়ে গিয়েছিলো। প্রেমার বাঁকা দৃষ্টিতে ও প্রশ্নে এখন যেন তার ধরা পড়ে যাওয়ার উপক্রম।
কথা কাটানোর চেষ্টা করল, “তোরা কি থামবি একটু? একটা জিনিস মনোযোগ দিয়ে দেখতে দিস না।”
“মনোযোগ দেওয়ার কী আছে আপা? মাঝে মাঝে তুমি টেলিভিশনে এমন করে তাকিয়ে থাকো যেন গিলে খাবে টেলিভিশনকে।”
প্রেমার কথায় জোহরা অধৈর্য হলো এবার, “তোরা দু'টো সর সামনে থেকে। এখুনি যাবি। বড়ো বোনের সামনে ঝগড়া করছিস, খবরদারি করছিস। নূন্যতম ভদ্রতা জানা নেই, তাই না? যা বলছি।”
জোহরার কণ্ঠ এতটাই ক্ষিপ্ত ছিলো যে কোমড় বেঁধে ঝগড়া করতে আসা টুইটুবানি চুপ করেই কেটে পড়ল। প্রেমা গেলো না ঠিকই কিন্তু আর বললও না কিছু। থমথমে মুখ করে তাকিয়ে রইল টেলিভিশনে। ওর আবার আত্মসম্মান বোধ বেশি। কিছুর থেকে কিছু হলেই আত্মসম্মানে আঘাত লেগে যায়।
মেজবাহ্ শেখ তখন টেলিভিশনে সুপুরষটি সেজে বসে আছেন। পায়ের উপর পা তুলে। চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। সাদা পাঞ্জাবির উপর এই গরম কালেও নীল চাদরটি জড়াতে ভুলেননি। আচ্ছা লোকটা নীল চাদর পরেন কেন সবসময়? জোহরার মাথায় চট করে প্রশ্নটি এলো। প্রশ্নটি সে জমিয়ে নিলো বুকে। পরের সপ্তাহে শুক্রবারে কল দিয়ে সে সর্বপ্রথম এটাই জিজ্ঞেস করবে। যদিও লোকটার উত্তর দেওয়ার সম্ভাবনা কম তবুও ও জিজ্ঞেস করবে।
টেলিভিশনের উপস্থাপিকা তখন বেশ স্বচ্ছ কণ্ঠে প্রশ্ন করতে ব্যস্ত,
“আচ্ছা মেজবাহ্ শেখ, রাজনীতিতে আপনার আসার কারণ কি? কেবলই কি পিতৃতান্ত্রিক দায়িত্বে না-কি শখবশত? আপনিতো রাজশাহী ইউনিভার্সিটির ফিলোসোফি ডিপার্টমেন্টের ছাত্র ছিলেন। তাহলে ফিলোসোফি ছেড়ে রাজনীতি কেন?”
মেজবাহ্ শেখকে খুব স্বাভাবিক দেখালো। যেন এমন উত্তর দিতে দিতে মুখস্থ সব। ঝরঝরে পরিষ্কার কণ্ঠে উত্তর দিলেন,
“রাজনীতিতে কোনো কারণ নিয়ে আসিনি বোধহয়। এলে বলতে পারতাম।”
“আপনার কাছে কী মনে হয়? রাজনীতিতে যা দেখানো হয় সব সত্যি?”
“মোটেও নয়। আপনারা যা দেখেন তা বাদ দিয়ে সব সত্যি। সেই সত্যি আপনাদের কাছ অব্দি পৌঁছানো হয় না।”
“আমাদের এখানে আসা সকল রাজনৈতিক লোকেরাইতো বলেন সব সত্যি। আপনি বলছেন সত্যি না!”
“সবাই নামের জন্য বলে। কিন্তু আপনারাও জানেন এই বলা সত্যি নয়। তাহলে কেন প্রশ্ন করেন শুধু শুধু?”
“এটাতো আমাদের কাজ। প্রশ্নতো আমরা করবোই। আপনাদের নিয়ে জনসাধারণের ভেতর জানার আকাঙ্ক্ষা থাকে। আমরা সেটুকু মেটানোর চেষ্টা করি কেবল।”
“আমরাও সাধারণই। আমাদের বিশেষ ভাবার কিছু নেই। বরং আমাদের ভাবতে হলে দৈত্য ভাবুন, রা ক্ষ স ভাবুন। সবাই নয়, তবে বেশিরভাগ।”
“আপনি তবে কোনটা?”
“আপনি যেটা, আমিও সেটাই। যার সঙ্গে যেমন হতে হবে মেজবাহ্ শেখ ঠিক তেমন।”
জোহরা খেয়াল করলো টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠা উপস্থাপিকার মুখটিকে। শিপন জর্জেটের একটি নীল শাড়ি পরিহিতা মেয়েটিকে নির্দ্বিধায় সুন্দরী বলা চলে। যেমন-তেমন সুন্দরী না, দুর্দান্ত সুন্দরী। আর তার ঐ চোখগুলো, সেগুলো যেন কেমন করে মেজবাহ্ শেখের উপরেই নিবদ্ধ। এই চোখের ভাষা মেজবাহ্ শেখ বুঝলো কি-না জানা নেই কিন্তু জোহরা ঠিক বুঝল। প্রেমিকার চোখই তো চিনে যায় আরও একটি প্রেমময় চোখের ভাষা।
“এই শুক্লা আপুটা বেশিই হেসে হেসে কথা বলছে না, আপা? তুমি দেখো কীভাবে হাসছে।” প্রেমার কণ্ঠে একটা চাপা ভাব। টেলিভিশনের উপস্থাপিকাটাকে যে সে বেশ ভালো করেই চেনে। তার খালাতো বোন। সিলেটে বড়ো খালা থাকেন। খালার মেয়েই শুক্লা আপু। এখন পড়ছে অনার্সে। সাথে সাংবাদিকতাও করছে। শুক্লা আপুর বাবা সেখানের বেশ নামী-দামী ব্যবসায়ী সাথে আপু দেখতে সুন্দরী, সিনেমা-নাটকেও বেশ দেখা যায় বলে তার আলাদা একটা গুণগান সব জায়গায়। টুইটুবানিতো বেশ পছন্দ করে। সিনেমার ঘ্রাণ যেখানে পায় মেয়েটা সেখানটাকেই জয় জয় ধ্বনিতে মুখরিত করে তুলে। এজন্যই চাপা গলায় কথাটি বলেছে প্রেমা। নচেৎ ওর কানে কথা গেলে ছ্যাঁত করে উঠবে।
জোহরার কাছেও শুক্লা আপুর দৃষ্টিটিকে বিশেষ পছন্দ হয়নি। খটকা জেগেছে মনে। লোকটাও কেমন হেসে হেসে কথা বলছে! কোথায়, তার সাথে যখন কথা বলে তখন তো এত হাসে না। কেন হাসে না? শুক্লা আপু এত পরিচিতা, সুন্দরী বলেই কি হাসে?
দুই বোনের কথোপকথনের মাঝেই দরজায় টোকা পড়ল। বাবা বাহিরে যান প্রতিদিন ভাত ঘুম থেকে উঠেই। এরপর সন্ধ্যা নিভে এলে ঘরে ফিরেন। তার নিত্যদিনের রুটিনে এটা আছেই। অফিস থেকে ফিরেও প্রথমে বাহিরে যাবেন। এরপর সন্ধ্যায় এসে বসবেন সোফায়।
জোহরা ছুটে গেলো। দরজা খুলতেই দেখল বাবা এসেছেন। মুখটি থমথমে। হাতে একটি খাম। চিঠির খাম।
জোহরার দিকে খামটি এগিয়ে দিলেন তিনি ত্রস্ত হাতে। ভয়ঙ্কর রকমের গম্ভীর স্বরে বললেন,
“বেনামি চিঠি এসেছে। এখুনি এটাকে ছুঁড়ে ফেলো।”
জোহরা চিঠিটি বোকা বোকা হাতে চেপে ধরল। হতবিহ্বল ভঙ্গিতে তাকালো বাবার দিকে। প্রতিবার চিঠি এলেই বাবার মুখটা থমথমে হয়ে যায়। কোথা থেকে আসে চিঠি, কোন ঠিকানা থেকে, কোন প্রাপক পাঠায় যদিও তা উল্লেখ থাকে না তবুও তারা জানে চিঠিটি কার। চিঠিটি কে লিখেছে।
জোহরা হাপুসনয়নে তাকায়,
“পড়ে দেখেছো, বাবা?”
“যার নাম নেই, পরিচয় নেই তার চিঠি কেন পড়ব?”
“বাবা…”
“চুপ একদম। কোনো বেইমানের জন্য এই ঘরে জায়গা নেই। মায়া, মমতার ঠাঁই নেই। মায়া দেখাতে হলে ঘরের বাহিরে গিয়ে দেখাও। যাও।” যাবের শিকদারের রামধমকে কেঁপে ওঠল জোহরা। এমনিতেই শুক্লা আপুর হাসি মুখটি এতক্ষণ বুকের ভেতরে খচখচে কাঁটা হয়ে বিঁধে ছিলো তার উপর বাবার ধমক যেন সেই কাঁটাতে হাতুড়ি চালানোর কাজ করল। জোহরার চোখ ছলছল করল।
রান্নাঘর থেকে ছুটে এলো টুইটুবানি। পরিস্থিতি সামাল দিতে ছিনিয়ে নিলো চিঠিটি। মোচড়াতে মোচড়াতে বলল,
“আমি ফেলে দিতাছি, আব্বা। আপনে আমারে বলতে পারলেন না? মেঝো আপারতো একটু মায়াময় শরীর। আপারে তো জানেনই।”
“তোর আপাকে বলে দে, মায়া দেখাতে হলে কুকুরবিড়ালকে দেখাতে। অমানুষকে নয়।”
“আচ্ছা আচ্ছা, আব্বা মাথা ঠান্ডা করেন। বহেনতো। চা বানাইছি।
এলাচি চা। আপনের তো পছন্দের।”
যাবের শিকদার আর কিচ্ছু না বলে মেয়েকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে বসার ঘরের বেতের চেয়ারটায় বসলেন। প্রেমা বাবার ধমক শুনেই টেলিভিশন বন্ধ করে দিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এখনও দাঁড়িয়ে আছে ঠাঁই।
টুইটুবানি ঘাড় ঘুরিয়ে যাবের শিকদারকে দেখল। আলগোছে চেপে ধরল জোহরার হাতটা। সতেরোর টুইটুবানি হয়ে ওঠল সাতচল্লিশের বয়স্ক মা। কত আহ্লাদ নিয়ে বলল,
“আপা, মন খারাপ কইরেন না। জানেনই তো আব্বার মাঝে মাঝে কী হয়!”
জোহরা মাথা নাড়ালো। গলা অব্দি ঠিকরে আসা কান্নাটিকে গিলে নিলো কায়দা করেই।
নরম হয়ে মাথা নাড়াল, “জানি। তুই যা চা নিয়ে। আমার মন খারাপ ধমক খেয়ে হয়নি। মন খারাপ হয়েছে এই ভেবে যে, বাবা আজ সারারাত ঘুমাতে পারবেন না। আমার চেয়ে বেশি ঝড় যে তার বুকে বইছে!”
—————
মেজবাহ্ শেখদের বাড়িটি আলিশান প্রাসাদের মতোই বড়ো। চারপাশে এত আলো ঝলমলে অবস্থা যেন দেখলেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়। তাদের ডাইনিং রুমে বিরাট একটি খাবার টেবিল পেতে রাখা। হরেক রকমের খাবারে সাজানো হয় সেই টেবিল রাতে। রাতের বেলাতেই বাড়ির সব ছেলেরা একত্রিত হয়। কথাবার্তা চলে দীর্ঘক্ষণ। খাবারটা ঠিকঠাক না থাকলে সেই আলাপচারিতা বজায় থাকে না। ধনাঢ্যের অহংকার চূর্ণ হয়।
যথারীতি আজও শেখ বাড়িতে সেই রাজভোজ শুরু হয়েছে। একপাশের চেয়ারগুলোতে বসেছে মেজবাহ্ শেখ, তার বাবা কবির শেখ, চাচা দোলন শেখ, চাচাতো ভাই হিমেল শেখ ও রাহাত শেখ আর ফুপাতো ভাই বছর চারের রৌদ্র।
আরেকপাশের চেয়ারগুলোতে মেজবাহ’র মা রেণুকা বেগম, বড়ো চাচী তাহমিনা বেগম, ছোটো চাচী রূপসা বেগম ও ফুপি টুপু বেগম বসেছেন। টেবিলের দুই প্রান্তের দু'টো চেয়ারে মেজবাহ শেখের দাদা মনির শেখ আর দাদী জামেলা ভাণু রয়েছেন। বিরাট পরিবার তার। সেই পরিবারের খাবার টেবিলে খাবার পরিবেশন করার জন্য রয়েছে দু'টো কাজের মেয়ে এবং পরিবারের বড়ো ছেলে হিমেল শেখের বউ রিমঝিম।
রিমঝিম আঁটসাঁট ঘোমটা চেপেই বেশ চোখ বুলিয়ে বুলিয়ে দেখছে কার পাতে কমছে কী। পরিবারের লোকেরা খাওয়া দাওয়ায় কেউ কারো চেয়ে কম না। বেশ খাদ্যরসিক বলা চলে।
দোলন শেখ মাছের মাথায় কামড় দিতে দিতে মেজবাহ ও তার বাবার কথায় ফোঁড়ন কাটলেন,
“মেজবাহ্, তুমি নাকি কালকে একটা চ্যানেলে সাক্ষাৎকারে গিয়েছিলে? আজ সাক্ষাৎকারটা চ্যানেলে দেখিয়েছে। অফিসের একজন বলল সেখানে তুমি না-কি নেতানেত্রীদের নিয়ে তেমন ভালো কিছু বলোনি?”
মেজবাহ্ বাবার সঙ্গে খুব দরকারি কোনো কথাতেই ব্যস্ত ছিলো তখন। চাচার অহেতুক প্রসঙ্গে তার মুখটা কেমন পাল্টে গেলো। ভরাট স্বরে প্রশ্ন করল, “খারাপ কী বললাম?”
“সে তো আর আমি জানি না, বাবা। কিন্তু সবাই বলাবলি করছিলো তুমি না-কি বেশ কড়া কড়া উত্তর দিয়েছো।”
মেজবাহ্ হাতটা টেবিলেই রাখল। সরাসরি তাকাল বড়ো চাচার দিকে। ভদ্রলোক বেশ আয়েশ করে মাথা চিবুচ্ছের। তরকারির তেল লেগে আছে ঠোঁটে। এমন বলিষ্ঠ শরীরের লোকটা মাথাটা খাচ্ছেন বাচ্চাদের মতো।
মেজবাহ্ ছোটো শ্বাস ফেলল। গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে জবাব দিলো,
“অন্যের কথা এত শুনতে নেই, চাচ্চু। তোমার নিজের যদি কিছু খারাপ লাগে তাহলে জিজ্ঞেস করো।”
“আব্বুতো ঠিকই বলেছে, মেজবাহ্। সাক্ষাৎকারটা আমি দেখেছি। তুই বলেছিস রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকা অনেকেই নাকি রা ক্ষ স। যে সেক্টরে কাজ করছিস সেই সেক্টরে এসব মানায়?”
হিমেলের কথায় মেজবাহ্ এবার খানিক বিরক্ত হলো বোধহয়। এঁটো হাতটা মৃদু নাড়াতে নাড়াতে বলল,
“যা সত্য তা-ই বলেছি। এখানে সবাই ই কমবেশি খারাপ কাজ করে। জনসাধারণের ভালোর নামে খারাপ করে। এটাতো মিথ্যে নয়। মেজবাহ্ শেখ সত্যি বলে বুক ফুলিয়ে।”
“কিছু সত্যি বলতে হয় না। তখন নিজেদের দলের লোকই শত্রু হয়ে যায়। বুকে বুলেটটা যেই ব ন্দু কের লাগবে তাকিয়ে দেখবি কেবল তখন, সেটা বন্ধুদের কারো।”
“এমন বন্ধু ও মানুষ মেজবাহ্ পোষে না। মেজবাহ্ পোষে কুত্তা।”
হিমেল হতাশ চোখে একবার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো। মেজবাহ্ ঠোঁটের বাঁকা হাসিটা স্পষ্ট এখনো। ছেলেটা এত একরোখা! একে বোঝানো দায়।
পুরুষদের এসব জরুরি কথাবার্তার মাঝেই তাহমিনা বেগম নিজের ছেলের বউয়ের উপর রুষ্ট হয়ে গেলেন। তরকারির ঝোল কিছুটা টেবিলে ফেলে দিয়েছে বলে। অসন্তুষ্ট গলায় ঝারি দিলেন,
“তুমি একটা কাজ যদি ঠিক মতো করতে! মন কোথায় থাকে? কাজের বেলা তো কাঁচকলা অকাজের বেলা বেশ পটু।”
রিমঝিম শাশুড়ির ধমক পেয়ে চমকে আরও গুটিয়ে গেলো। আড়ষ্ট মুখে বাটিটা রাখতে রাখতে নরম স্বরে বলল,
“খেয়াল করিনি, আম্মা।”
“তা খেয়াল করবা কেন। বাড়িতে কাজের লোকও তোমার চেয়ে ভালো খেয়াল রাখতে পারে সব।”
রিমঝিম কিচ্ছু বললো না প্রতিত্তোরে। বিনা দোষেও এই ভাষা মেনে নিলো মাথা পেতে। মেজবাহ্ একপলক তাকালো রিমঝিমের সেই নেতিয়ে আসা মুখটির দিকে। মেয়েটার এই অপরাধী ভাবটা তার মাথা ধরিয়ে দিলো। সবসময় এমন চোর চোর ভাবে থাকে কেন? একটু নিজের হয়ে প্রতিবাদ অব্দি করে না। এমন মেয়েদের মেজবাহ্ মোটেও পছন্দ করে না। নিজের ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ক্ষুব্ধ একটি শ্বাস ফেলল সে। খাবার টেবিল থেকে উঠতে উঠতে রিমঝিমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনারও উচিত একটা কুত্তা পোষা, রিমঝিম। মানুষদেরকেতো আর পোষ মানাতে পারলেন না। এবার একটা কুকুর পোষেন।”
কথা শেষ করে এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না সে। হনহন করে হেঁটে চলে গেলো নিজের ঘরের দিকে। ওর ঘরটা এই বাড়ির পাশে থাকা গেস্টহাউসের ভেতরে। ওর বাড়ির এত মানুষের কথাবার্তা ঠিক সহ্য হয় না বলেই ও সেখানটাতেই থাকে আজ বছর চারেক। ঠিক রিমঝিম আসার পরপর হয়ত! এমনই এক ঝামেলার পর…
বড়ো চাচী আর হিমেল ততক্ষণে খাবার টেবিলে খ্যাপে একসার। তাহমিনা বেগমতো রীতিমতো চেঁচিয়েই ওঠলেন,
“কত্ত বড়ো বেয়াদব হয়েছে এই ছেলে, ভাইজান, আব্বা! আপনার সামনে আমাদের ও কী ইঙ্গিত করে গেলো? একেতো নিজের ভাবিকে নাম ধরে ডাকে তার উপর মেয়েটাকে ও আমাদের নিয়ে উস্কায়? এত বেয়াদব!”
কবির শেখ মোটেও তর্কাতর্কি করলেন না। তর্ক করলেন না রেণুকা বেগমও। মনির শেখ পুত্রবধূর দিকে না তাকিয়ে বললেন,
“তুমিওতো পারো ওর সামনে পারিবারিক কূটনীতিগুলো না করতে। রাজনীতি সামলে সাংসারিক কূটনীতি কার ভালো লাগবে?”
“দাদাজান, আপনিও মেজবাহ'র পক্ষ নিচ্ছেন। ওকে আপনারা উচ্ছন্নে পাঠাচ্ছেন বলে দিলাম। এত বাড় ভালো না।” চেয়ার ছেড়ে ওঠে দাঁড়ালো হিমেল। পারছে না ও মেজবাহ্ শেখের নামসহ গিলে খাবে। সামান্য কথাতে এত ক্ষোভ কীসের এত? অপমান না ক্ষমতার ক্ষোভ?
—————
রাত হলেও ঘুমোয়নি জোহরা। মনটা বেশ ছটফট করছে। অনেকের কথাই মনে পড়ছে তার। সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে লোকটার কথা। আজ টেলিভিশনে এত্ত সুন্দর লাগছিলো মানুষটাকে। আর মিটিমিটি হাসছিল কেমন! শুক্লা আপুর জন্যই কি এমন হাসি হাসি মুখ হয়েছিলো? আগামী শুক্রবার আসতে আসতেতো সে মরেই যাবে এই উদ্বিগ্নে!
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল জোহরা। না, সে আর পারছে না এইসব ভাবতে। আজতো এখনও শুক্রবারই আছে। কল করার সময় আছে অনেক। না-হয় একটা কল করেই ফেলবে। কী আর এমন হবে এতে?
পা টিপে টিপে ঘর ছেড়ে বের হলো জোহরা। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধপুরী। ঘুমে মগ্ন হয়ে গিয়েছে সকলেই। টুইটুবানির ঘরের ফ্যানের খ্যাঁচখেঁচি শব্দটা ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না ঠিক। চারপাশে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিলো জোহরা। পা টিপে টিপে এক মিনিটের সিঁড়ি পার হলো তিন মিনিটে। উঠল দোতালায়। কিন্তু বিড়ম্বনা যে এখানেই! বাবার রুমটা দোতালার ঐ কোণাতে। কথা বলতে হবে সাবধানে। যদি বাবা জেগে যান তাহলে চির জীবনের মতো টেলিফোন উঠে যাবে বাড়ি থেকে।
জোহরা টেলিফোন কানে তুলে ফোন লাগালো। ভেবেছিলো লোকটা এই অসময়ের কলটি ধরবে না হয়ত! কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে প্রথম রিং’ই রিসিভার তুললো বিপরীতের মানুষটা। একদম স্বচ্ছ, ঝরঝরে, পরিষ্কার গলায় বলল,
“আপনি কি রাতেও ঘুমান না?”
ভ্যাবাচ্যাকা খেলো জোহরা। মেজবাহ শেখ এত দ্রুতই তাকে সাড়া দিবে যে, তা সে কল্পনাও করেনি। তাই চমকেও গিয়েছে খানিক। ভড়কানো স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“আপনি সজাগ?”
“না তো, ঘুমিয়ে আছি।”
জোহরা বুঝল তার প্রশ্নটি ভীষণ বোকা বোকা হয়েছে। তাই জিভ কাটলো সে। বুকে টিপটিপ করছে হৃদপিণ্ডটা। কী এক উত্তেজনা কাজ করছে তার! ভয়, ভালো লাগা মিলেমিশে হয়ে গিয়েছে একাকার।
জোহরা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“আপনি সজাগ কেন?”
মেজবাহ্ অচেনা মেয়েটির প্রশ্ন শুনে হাসলো। চেয়ারটাতে গা এলিয়ে দিয়ে বলল,
“সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় মনে হচ্ছিলো আপনি সাক্ষাৎকারটি দেখে আমায় আজ অনিয়ম করে হলেও ফোন করবেন। এবং প্রশ্ন করবেন, উপস্থাপিকা মেয়েটি নীল শাড়ি পড়েছে কেন? ভাবা যায়? আজকাল মেজবাহ্ শেখও জবাবদিহি করার জন্য রাত জেগে থাকে!"
ফোনের ওপাশে থমকে গেলো জোহরা। হা হয়ে গেলো মুখটি। এবং সত্যিই সে এই প্রশ্নটিই যে জিজ্ঞেস করত! লোকটা বুঝল কী করে? মন পড়ে ফেলার ক্ষমতা আছে না-কি তার?
জোহরা এতটাই উৎফুল্ল হলো যে প্রায় উচ্চস্বরেই বলল,
“আপনি বুঝলেন কী করে!”
পরপরই মেজবাহর কণ্ঠ না এসে কোণার ঘরটা থেকে ভেসে এলো যাবের শিকদারের কণ্ঠ, “জোহরা…”
·
·
·
চলবে……………………………………………………