ভালোবাসি সুচরিতা - পর্ব ০৪ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

ভালোবাসি সুচরিতা - মম সাহা
          ঢাকা থেকে একটি গাড়ি ছুটে চলছে মহাসড়ক দিয়ে। গাড়িটির ভেতর থেকে একটি মহিলা কণ্ঠের ফুঁপানো কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। সঙ্গে চিক্কণ স্বরে কাঁদছে আরও একটি মেয়ে। 
থমথমে মুখে গাড়িতে অবস্থান করছে বাকিরা। কোনো রা নেই। জড় বস্তুর মতোই বসে আছে তারা। মধ্য রাত বলে রাস্তা একদম শূন্য, ফাঁকা। সামনে সিলেটগামী বাসটি ব্যতীত আপাতত এই রাস্তায় দেখা নেই কিছুর। গাড়ির ভেতরে আলো নেভানো। 

 “আহা ঝুমা, থামতো তুই। অনেকটা পথ বাকি এখনো। এতটা পথ কাঁদতে কাঁদতে গেলে শরীর অসুস্থ হয়ে যাবে তোর।”
 যাবের শিকদারের মৃদু ধমকের সাথে জোহরার সম্মতিও ভেসে এলো,
“হ্যাঁ, ফুপি, কেঁদো না আর। আমরাতো যাচ্ছিই। টুইটুবানি তুইও কাঁদিস না, থাম।”
 দ্বিতীয় বাক্যটি বলার সময় অন্ধকার হাতড়ে নিজের পাশে বসা টুইটুবানিকে আগলে নিলো জোহরা এক হাতে। একটি উষ্ণ সান্ত্বনা পেতেই টুইটুবানির কান্নার আহ্লাদ বাড়ল। ফুঁপিয়ে ওঠল সে,
 “মেঝো আপা, ইমন ভাই ঠিক আছেতো? কত কইরা ভাইরে বলি অন্য সদরে না যাইতে কিন্তু সে একটা কথাও শুনে না। আব্বার মতোই গোঁয়ারা হইয়া যায় মাঝে মাঝে।”

অন্য সময় হলে যাবের শিকদার নির্ঘাত টুইটুবানির এমন কথার বিপরীতে রামধমক দিয়ে কাঁপিয়ে ফেলতেন কিন্তু আজ পুত্রশোকে কাতর বলেই গলায় ধমকের জোর এলো না। বরং নিজেও মনে মনে হয়ত সম্মতি দিলেন। সত্যিই ছেলেটা মাঝে মাঝে এত অবাধ্য হয়ে উঠে! কতবার ওকে বলা হয়েছিলো এমন হুটহাট শহর না ছাড়তে কিন্তু ছেলেটা শুনলে তো!

  গাড়িতে উপস্থিত প্রত্যেকের মনই অত্যাধিক খারাপ। সিলেট থেকে জোহরার খালা যখন কল করে জানালেন ইমন আহত হয়ে হসপিটালে ভর্তি হয়েছে, শিকদার পরিবারের উপর দিয়ে যেন তখন ঝড় বয়ে গিয়েছিলো। জোহরা আর টুইটুবানিতো যাবের শিকদারের চেয়েও বেশি ভেঙে পড়েছিলো। দু’টোই কান্না জুড়ে দিয়েছিলো পাল্লা দিয়ে। 

যাবের শিকদারের সংবাদটা শুনে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলেও মেয়ে দুটোর জন্য শক্ত থাকতে হয়েছিলো তাকে। তবে সেই সময় কেবল তিনি নন আরও একজন শক্ত ছিলো; সে প্রেমা। টুইটুবানি আর মেঝো আপাকে কোনোরকম টেনেহিঁচড়ে পোশাক পাল্টাতে সাহায্য করেছিলো সে। বাবাকে ঘর থেকে ফোন নাম্বারের ডায়েরিটা এনে দিয়েছিলো। ফুপুকে কল দেওয়ার কথা সে-ই মনে করিয়ে দিয়েছিলো।
 ফুপা তার সরকারি চাকুরিজীবী। এত রাতে ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার জন্য ফুপার সাহায্য সবচেয়ে বেশি দরকারী ছিলো। এবং এই বিপদেও প্রেমার সেই বুদ্ধিটি ঠিক ঠিক কাজ করল। ইমনের খবর পেতেই তাদের ফুপা- রহমান খান তার পরিচিত এক ড্রাইভারসহ মাইক্রোবাস নিয়ে হাজির হলেন। সঙ্গে এসেছিলেন ফুপি, ফুপাতো বোন ও ভাই দুটো। ওরা শিকদার বাড়িতেই রয়ে গিয়েছে প্রেমার সঙ্গে। এত মানুষ এতদূরে যাওয়াও আরেক বিপত্তি বলে প্রেমা নিজেই থেকে গিয়েছে। কারণ জোহরা আর টুইটুবানির যে অবস্থা ছিলো, এদের না নিয়ে এলে এরা বোধহয় কাঁদতে কাঁদতে সেখানেই মরে যেত। বাড়িতে এদের আটকে রাখা যেত না কোনোভাবেই।

 টুইটুবানির কান্না থামবার নাম নেই। ফ্যাচফ্যাচ শব্দে এমন করে নাক টানছে যে এক পর্যায়ে রহমান খান বিরক্তই হলেন,
 “এই টুইটুবানি, তুমি থামোতো। এই মাঝরাতে তোমার কান্নার জন্য গাড়িটা না আবার ডা কা তদের পাল্লায় পড়ে যায়! এমনিতেই পথঘাট ভালো নয়।”

  “ফুপা আপনে এমন কথা কইতে পারেন? ইমন ভাই আমাগো কত্ত শান্তশিষ্ট মানুষ! সেই মানুষটার কিছু হইছে শোনার পরও আমি চুপ থাকতে পারি? ইমন ভাইয়ের মতো আদর আমারে কেউ করে নাই কোনোদিন।” ক্রন্দনরত কণ্ঠেই প্রতিবাদ করে ওঠল টুইটুবানি। ওর পছন্দের ইমন ভাইয়ের জন্য ও কাঁদবে সেখানে বাঁধা দেওয়ার কে উনি?

 “এতো মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি!” রহমান খান কথাটি কিছুটা হেলা করেই বললেন মুখ বাঁকিয়ে। 
টুইটুবানির ক্রন্দনরত ফোলা চোখগুলো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল ড্রাইভারের সিটের পাশে বসে থাকা রহমান খানের দিকে। এমন করে দূরছাঁই করা কথা তাকে বলতে পারলেন ফুপা? অপমানে টুইটুবানি চেপে ধরল নিজের মুখটি। কান্নার যেন আর বেশি শব্দ না হয় তাই এত জোরেই চেপে ধরল যে শ্বাসও আটকে যাবে।

  “রহমান, হুঁশ রেখে কথা বলবে। যেখানে যেটা বলা মানায় না সেখানে সেটা বলবে না। ভুলে যেও না এই যাবের শিকদার বেঁচে আছে এখনো। আর যাবের শিকদারের কন্যা টুইটুবানি।”

“আরে ভাইজান, আমি আসলে এমন বুঝাতে চাইনি..”

 “থামো। তুমি সরকারি চাকুরি করো বলে নিজেকে খুব চালাক ভাবতে এসো না। তোমার মতো হাজার রহমান চড়িয়ে খাই আমি।” যাবের শিকদারের উত্তপ্ত, চাপা কণ্ঠে রহমান খানের মুখটি নিভে এলো। কিন্তু টুইটুবানির চোখ ভরে গেলো আরও। আব্বা, আব্বা তার হয়ে কথা বললেন? আব্বা বললেন এমন বুক ফুলিয়ে যে, টুইটুবানি তার মেয়ে? আব্বার তার জন্য এত মায়া? নিজের ছেলের এমন দুঃসময়ে আব্বা টুইটুবানির কথা ভাবলেন?
 রাস্তায় আধো আলোয় জোহরা টুইটুবানির মুখটি থেকে টেনে সরিয়ে দিলো হাতটা। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, 
“কাঁদতে চাইলে কাঁদতে পারিস, টুইটুবানি। তোর কান্না করায় কেউ বাঁধা দিবে না। মুখ চেপে ধরছিস কেন? কে, কী বলল তাতে কী এসে যায় তোর? তুই তো জানিস ইমন ভাই তোর কাছের মানুষ। সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। তোর আপনের চেয়েও আপন। তাহলে তুই থামবি কেন? কারো জন্য মায়া করতে রক্তের আর সম্পর্কের প্রয়োজন হয় না। বুঝলি?”

  ঝুমা বেগমের যেন বিশেষ পছন্দ হলো না জোহরার এমন শুনিয়ে শুনিয়ে বলা কথাগুলো। ভাইয়ের পাশে বসেই তিনি নাক-মুখ ছিঁটকে বললেন,
 “ভাইজান, আপনার মেয়েদের শাসন করা উচিত।”

  “তুই চুপ কর। শাসন সর্বপ্রথম তোকে করা উচিত ছিলো।” ভাইয়ের ধমকে চুপ করে গেলেন ঝুমা বেগম। মুখে ভেংচি কাটলেন ঠিক।

—————

  সিলেটের জিন্দাবাজার এসে যখন গাড়ি থামলো দীর্ঘ সাত-আট ঘন্টার পর তখন সিলেটের চা বাগানের ভেতর থেকে সূর্য উঠে এসেছে আকাশের প্রায় মধ্যভাগের কাছাকাছি। সকাল তখন নয়টা। গাড়ির ভেতর থাকা প্রতিটা মানুষ ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। দীর্ঘ জার্নি ও কান্নার ফলে টুইটুবানির চোখ মুখ শুকিয়ে গিয়েছে। ওদিকে জোহরার হয়েছে ভিন্ন দশা। চোখ ফুলে হয়েছে একাকার। ওর যে চোখে সমস্যা। একটু কাঁদলেই চোখগুলো লাল হয়ে ফুলে যায় বিশ্রী ভাবে। 

  গাড়ি থেকে নামতেই সূর্যের তীর্যক রশ্মিতে চোখটা জ্বলে উঠল জোহরার। ভনভন করছে মাথাটিও। একটু চা খেতে পারলে যদিও ভালো লাগতো কিন্তু এখন চা খাওয়ার পরিস্থিতি নেই। 
যাবের শিকদার গাড়ি থেকে নেমেই ছুট লাগালেন হসপিটালের ভেতরে। সাদা ঝকঝকে হসপিটালটায় মানুষের আনাগোনা বাড়েনি এখনো। প্রাইভেট হসপিটাল বলেই হয়ত চারপাশটা নিশ্চুপ। ফিনাইলের তীব্র ঘ্রাণ এসে নাকে লাগতেই জোহরার মাথা আরেকটু ফাঁকা ফাঁকা লাগল। গা গুলিয়ে এলো। 

দোতালার বামদিকে আসতেই যাবের শিকদারের সঙ্গে দেখা হলো শুক্লার। মেয়েটার গায়ে একটি হলদে রঙের থ্রি-পিস। মসৃণ চুলগুলো কোমড় অব্দি ছাড়ানো বলে মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ছে তা। যাবের শিকদার এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়েই ছুটে এলেন শুক্লার দিকে। উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লেন, 
 “ইমন ঠিক আছে, আম্মু? কী অবস্থা আমার ছেলেটার?”

 শুক্লার কণ্ঠস্বর অত্যাধিক নরম, ধীর, শান্ত, “ঠিক আছে, খালু। এত চিন্তা করবেন না। মাথায় আর বা'হাতে আঘাত লেগেছে সামান্য। প্রথমতো রক্ত দেখে ভেবেছিলাম অনেক বেশি ক্ষত হয়ে গিয়েছে। পরে ডাক্তার জানালেন ভয়াবহ কিছু হয়নি তবে হ্যাঁ, কিছুদিন বিশ্রামে থাকতে হবে।”

 “সত্যি সত্যি তেমন কিছু হয়নি তো? না-কি তুমি আমায় সান্ত্বনার জন্য বলছো?”

 “সত্যি সত্যিই কিছু হয়নি, খালু। আপনি যান না ভেতরে। গিয়ে শান্ত চোখে দেখুন, বুকটা ঠান্ডা করুন।” শুক্লা কথার ফাঁকে কেবিনটা দেখিয়ে দিতেই যাবের শিকদার চট করে চলে গেলেন কেবিনে। 

  পেছন পেছন এসে দাঁড়িয়েছে জোহরাও। শুক্লা আপুর কথাটি শুনেছে সে। ভাইয়ার যে গুরুতর কিছু হয়নি সেটা শুনেই শান্ত করেছে নিজের মনকে। শুক্লা আপু বানিয়ে কিছু বলার মানুষ না। তাই সে যেহেতু বলেছে তাই ধরে নেওয়া যায় সত্যিই বলেছে। 
 জোহরাকে দেখে নিজ থেকে এগিয়ে এলো শুক্লা৷ বেশ আন্তরিক কণ্ঠে বলল, “তুমিও যাও ভেতরে। দাঁড়িয়ে আছো কেন? যাও, দেখে আসো।”

 শুক্লা আপুকে দেখে এই বিপদের মাঝেও জোহরার চট করে একটি কথা মাথায় চলে এলো। গত শুক্রবারে মেজবাহ্ শেখের সামনে শুক্লা আপুর সেই হাস্যরত মুখটি। গভীর চোখগুলো! কী এক মহা মুশকিল!
 এমনও বিপদে তার ঐ লোকটার কথা মনে পড়তে হলো? লোকটা পাগল করে ছেড়েছে তাকে। সেই শুক্রবারে শেষ কথা হলো আজ মঙ্গলবার! কতগুলো দিন মনে হচ্ছে যেন। মনে হচ্ছে যেন বছর পেরিয়ে যুগ হবে হবে! কাউকে ভালো লাগলে মন কি এতই উতলা হয়ে ওঠে? দিনকেও মনে হয় বছর?

  ইমনের মাথায় মোটা একটি ব্যান্ডেজ। হাতেও একটা ভারি ব্যান্ডেজ। চোখ-মুখ এক রাতেই শুকিয়ে গিয়েছে। ওজন কমে গিয়েছে যেন দশ কেজি! 
কেবিন ভর্তি করে দাঁড়িয়ে আছে সকলে। যাবের শিকদারতো একদম ছেলের মুখের কাছটায় দাঁড়ানো। বুক ভেঙে যাচ্ছে তার। ছেলেটা বড়ো আদরের যে! তিনি হয়ত প্রকাশ করেন না কিন্তু ছেলেমেয়েদের তিনি নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। সেই ছেলেমেয়েদের যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে তার বুক ভেঙে যায়। তার এই দুনিয়ায় রয়েছে কে? এই তিন-চারটা ছেলেমেয়ের মুখ দেখেইতো বেঁচে আছেন তিনি!

  কানে সূঁচালো কান্নার কণ্ঠ পৌঁছাতেই ইমনের ঘুমন্ত মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে উঠল। মাথায় মনে হলো যেন চেপে আছে একটি চালের বস্তা। ইমনতো খানিকটা সময় বুঝেই উঠতে পারল না তার শরীরটা এত ব্যথা কেন লাগছে? একটু নড়তে কেন পারছে না?
 বহু জল্পনাকল্পনা ও যু দ্ধ করে যখনই চোখের পাতা খুলল, দেখতে পেলো বাবার আতঙ্কিত দু'টো চোখ, থমথমে মুখটিকে। তার পেছনেই দাঁড়িয়ে থাকা ওড়নায় মুখ চেপে কাঁদতে থাকা টুইটুবানিকে। তার ব্যথায় জর্জরিত ভারি শরীরটা নিমিষেই হালকা হয়ে গেলো। রোগা মুখটিতে ফুটে উঠল হাসি। কথা বলতে চেয়েও কয়েক সেকেন্ড শব্দ বের হলো না গলা দিয়ে। 
 বহু কষ্টে অসুস্থ, জীর্ণ স্বরে বলল, 
“তোমায় এমন চিন্তিত দেখতে আমি মাথা কেন, গোটা শরীর ভেঙে চুরমার করে দিতে পারি।”

 তার ঐ অসুস্থ মুখের হাসি আর কথা শুনে যাবের শিকদারের চোখ থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। উনি চেপে ধরলেন ছেলের হাতটি। অথচ টুইটুবানি কেঁদে উঠল আরও শব্দ করে। টানা নয় ঘন্টাতেও মেয়েটার কান্নার বিরাম মেলেনি। এত জল কারো চোখে থাকে আদৌ? আর তার কান্না দেখে ইমন ভাইও বা হাসছে কেন এমন করে!

 —————

 আজ দুপুরে খেতে পারেনি মেজবাহ্। সারাদিনই রাজনৈতিক মিটিং নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। এত ব্যস্ত যে একটা গ্লাস জল অব্দি ছুঁতে পারেনি। এই দীর্ঘ মিটিং'র পর বিরতি মিলেছে তার মাত্র। গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজেছে সবে। বেশিরভাগ দুপুরগুলোই তার খাওয়া হয় না। সময় পায় না তেমনটা নয়, কখনো কখনো আগ্রহও আসে না তেমন। তবে শুক্রবার দুপুরে সে মন ভরে খাবার খায়। তৃপ্তি নিয়ে খেতে হয় তাকে। তৃপ্তি নিয়ে এই যে সে প্রতি শুক্রবার ভোজন করে তা প্রায় আট মাস হলো। আগে করতো না কিন্তু সেদিন শুক্রবারে…
 মেজবাহ্’র চোখের সামনে স্পষ্ট হলো অতীত;

 মেজবাহ্’র দিন ভীষণ ব্যস্ত যাচ্ছিলো। কাজ থেকে মাথা তোলা দায়। বিকেল তখন সাড়ে চারটা হয়ত! মেজবাহ্'র ফোনটি বেজে উঠল। কাজে মন ডুবিয়েই ফোনটি তুলল মেজবাহ্, 
 “হ্যালো, কে?”

 জোহরার স্বভাব অনুযায়ী প্রথম দুই-এক মিনিট নীরবেই কেটে গেলো। একদম একান্তেই। মেজবাহর কাজে ডুবে থাকা মনটি চট করে ধরে ফেলল ফোনের ওপাশের মানুষটি কে। কোনো কথা, ইশারা, শব্দ ছাড়াই সে বুঝে ফেলল অজ্ঞাত মেয়েটি তাকে স্মরণ করেছে। 
 “দু'মিনিট কি নীরবতা পালন করতেই হয় আপনার? সবাইকেই কল দিয়েই এই নীরবতাটুকু পালন করেন না-কি কেবল আমার বেলাতেই এই নিয়ম?”

 মেজবাহ্'র অনর্গল প্রশ্নের বিপরীতে জোহরার কণ্ঠটি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল, 
 “কেবল আপনার বেলাতেই। আমার দেখতে ভালো লাগে যে, কাজে মগ্ন বিশিষ্ট নেতা মেজবাহ্ শেখ আমার জন্য দু'টো মিনিট সবকিছু থেকে ছুটি নেয়। পৃথিবীতে মেজবাহ্ শেখের ঐ দুই মিনিট কেবল আমার।”

  মেজবাহ্ এমন আজগুবি আনন্দে ভীষণ অবাক হয়ে যায়, 
“একজনের সময় অপচয় করে এত আনন্দিত কে হয়?”

 “সময় অপচয় না তো, এটাকে বলে ইনভেস্টমেন্ট। অর্থাৎ বিনিয়োগ।”

  “বিনিয়োগ? কেমন বিনিয়োগ এটা আবার?”

“যখন সুদ সমেত ফেরত পাবেন, তখন বুঝবেন। বলুন এবার কী দিয়ে খেলেন?”

 মেজবাহ্ অকপটেই জানালো, “খাইনি।”

“খাইনি মানে? দুপুরে না খেলে পিত্তি পড়ে না পেটে? দেশ সেবা করতে এলেন অথচ নিজের সেবা করতে ভুলে যান? জানেন না আপনার জন্য কত মানুষ ভাবে? তাদের কী হবে বলুন তো আপনার কিছু হলে?”

জোহরার কী রাগ হলো! ফোনের ওপাশের সেই রাগ, বাচ্চা মেয়েটির অভিযোগ ছুঁয়ে গেলো মেজবাহ্’র বুঝদার বুকটিকেও। সে হেসে ফেলল জীবনের প্রথম শব্দ করে,
 “কত মানুষগুলো কে, কে শুনি?”

মেজবাহ্'র হাসি জোহরার রাগান্বিত মুখটিকে এক মুহূর্তেই লজ্জায় রাঙিয়ে ফেলল যেন। থতমত খেলো সে, “আছে তো অনেক মানুষ।”

 “অনেক মানুষগুলো কে কে?”

  “জানি না।”

 “কিন্তু আমিতো জানি।”

“জানেন? জানলে খান না কেন?”

 “খেলে কি আর জানতাম আজ আমার পেটে পিত্তি পড়বে বলে দেশবাসীরা এত ভাবে!”

“জানবেন না কেন? দেশের মানুষ যে আপনাকে ভালোবাসে, বোঝেন না?”

  মেজবাহ্’র যেন হাসি থামবার নাম নেই, “বুঝবো কী করে? সবাই তো আর টেলিফোন করে এমন ভাবে বলেনি! বললে না-হয় বুঝতাম।”

সেই ঘটনার আজ আট মাস হয়ে গেলোও মেজবাহর স্মৃতিপটে আজও স্পষ্ট। অতটুকু একটা মেয়ে কি-না তাকে অভিযোগ করে, রাগ দেখায়? সে-ও রাগ মাথা পেতে নেয়! কেন? কীসের এত দায় তার? 
 মাথা থেকে ঝেরে ফেলতে চায় মেজবাহ্। অথচ পারে না। একটা নরম কণ্ঠ বুকের ভেতর বাজতে থাকে রাত-দিন।

মেজবাহ্'র ভাবনার মাঝেই হনহনিয়ে তার অফিসরুমে ঢুকল সিকান্দার। মুখ চোখ তার বিশেষ সুবিধাজনক লাগছে না। ঢুকেই হড়বড়িয়ে বলল,
 “ভাই, ঘটনাতো একটা ঘটে গিয়েছে।”

মেজবাহ্'র আবেশিত মনে সিকান্দারের এই হড়বড়ানো কথা সংঘর্ষ ঘটালো। চোখ বন্ধ রেখেই জানতে চাইল,
 “কী ঘটনা ঘটে গেলো? মেয়েদের মতো ভূমিকা করে কথা বলিস কেন?”

সিকান্দার চোখ বাঁকালো। ভাই তাকে যেন কী ভাবে? সবসময়ই খোঁচা মারে। মেয়েদেরতো খোঁচা মারার স্বভাব। সে কি বলতে গিয়েছে এটা? 
 চোখ বাঁকিয়ে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল, “ইমন শিকদারতো আহত হয়ে হসপিটালে ভর্তি হয়েছে। বেশ ভালো আঘাতই পেয়েছি শুনলাম।”

 কথাটা মেজবাহ্'র কানে যেতেই চট করে খুলে ফেলল সে চোখ দু'টো, “হসপিটালে ভর্তি?”

 “হ্যাঁ, ভাই।”

“কোন হসপিটাল?”

 “জিন্দাবাজারেরই একটা প্রাইভেট হসপিটালে।”

মেজবাহ্ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে তাড়া দিয়ে বলল,
 “জলদি গাড়ি বের কর। হসপিটালে যেতে হবে।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp