মুহুর্তের জন্য পৃথিবীটা টলে উঠল। ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে সরে আসলো শাওলিন। স্তব্ধভাবে চলে গেল অফিস ঘরের বাইরে। কোথাও না তাকিয়ে দোতলায় শোবার ঘরে ফিরে মুঠোফোন তুলে নিল। এক মুহুর্ত ভাবল, চিন্তা করল। কল করল ফাতিমা নাজকে। দুবার রিং হতেই ওপাশ থেকে রিসিভের শব্দ ভেসে এল। বৃদ্ধা সহাস্যে কিছু বলার পূর্বেই শাওলিন বলে উঠল,
- আসসালামুয়ালাইকুম। কেমন আছেন দাদী?
- ওয়াআলাইকুমসসালাম। আমি ভালো আছি, শাওলিন। কাল পৌঁছেছ কটায়? যেতে অসুবিধে হয়নি তো?
- দাদী, কিছু জরুরি আলাপ করব। সময় হবে?
মেয়েটার কথার সুরে অদ্ভুত এক ভয় চিড়িক দিয়ে উঠল মনে। ফাতিমা নাজ বিচলিত স্বরে বললেন,
- কী ব্যাপারে শাওলিন?
- কিছু প্রশ্ন ছিল। দেখুন, আমি কোনো ভুল বোঝাবুঝি চাই না। আপনি বড়ো, চোখের সামনে আপনি ছাড়া কাউকে ভরসাযোগ্য লাগছে না।
ফাতিমা নাজ সতর্কভাবে প্রশ্নটা করেন,
- ফারশাদ কী অফিসে গিয়েছে?
সতর্ক ভাবটা পুরোপুরি টের পায় শাওলিন। হঠাৎ চকিতে ওর মনে পড়ে যায় ফোনটা যে ট্যাপ করা হয়। দ্রুত ফাতিমার কলটা কাটতে গিয়ে শাওলিন শান্ত সুরে জানায়,
- আপনাকে পরে কল দিই? চুলায় কিছু একটা পুড়ছে।
- হ্যাঁ, হ্যাঁ। নিশ্চয়ই! যাও যাও!
কথাটা শুনতেই ঝটিতি কল কেটে নিচে নামে শাওলিন। ফোনটা ঘরে রেখে সরাসরি বাইরে বেরিয়ে যায়। বাহির বাড়িটা চাকরদের জন্য তৈরি। সেখানে ত্রস্ত পায়ে পৌঁছে রোকেয়ার ঘরের সামনে করাঘাত করে শাওলিন।
- রোকেয়া? আছ?
ভেতর থেকে রোকেয়ার বিছানা ছাড়ার শব্দ হয়। একটু পর পাকা মেঝেতে ধপধপ আওয়াজ। লোহার কবজা খোলার আর্তনাদ ফুটতেই রোকেয়া ব্যস্ত গলায় বলল,
- ভাবীজান? কিছু লাগব?
- তোমার ফোনটা দেয়া যাবে? ব্যালেন্স আছে তো?
রোকেয়া হাতে করেই ফোনটা এনেছে। চৌঁচির খরার মতো ফোনের সমুখ কাঁচ ভাঙা। রোকেয়া ঝটপট বাড়িয়ে বলল,
- ট্যাকা আছে ভাবী। এই নেন। আর কুনো দরকার ভাবী?
শাওলিন দুহাতে ফোনটা নিয়ে মাথা না সূচক নেড়ে বলল,
- না। আর কিছু লাগবে না। আমার ফোনটায় চার্জ নেই বুঝেছ। একটা কল করা দরকার।
- আইচ্ছা ভাবীজান। কুনো সমেস্যা নাই। আমার ফুন আপনের ফুনই। যতখন লাগে নেন।
রোকেয়াকে ঘরে রেখে শাওলিন বাংলো বাড়িতে ফিরে এল। বাড়িতে কেউ নেই জেনেও চতুর দৃষ্টিতে চারপাশ লক্ষ করে দোতলায় উঠল। দাদীকে পুনর্বার কলটা দিতেই মুহুর্তের মাঝে রিসিভ করেন বৃদ্ধা। চাপাস্বরে শুধিয়ে উঠেন,
- কী হয়েছে বলো তো? রোকেয়ার নাম্বার থেকে দিলে যে?
শাওলিন বৃদ্ধার উৎকণ্ঠা টের পেয়ে বলল,
- দুশ্চিন্তা করবেন না, ঠিক আছি। আমার ফোনটা সমস্যা করছে।
বুকভার অবস্থাটা হালকা হলো। ফাতিমা নাজ স্বস্তির সুরে বললেন,
- ফারশাদ আসার আগেই যা প্রশ্ন করার শেষ করো। ও এলে কিছুই বলো না।
শাওলিন ভীষণ অবাক হয়ে ভ্রুঁ দুটো নিখুঁত কুঁচকে বলল,
- আপনি কী ভয় পাচ্ছেন?
- তোমার কী মনে হয়নি যে ভয় পেতে হবে?
শাওলিন অকপটেই স্বীকার করল,
- না। আমার তো এমনটা মনে হয়নি।
- তোমার সাথে কিছু আলোচনা করেছে?
- কোন ব্যাপারে?
ফাতিমা নাজ একটু ঢোক গিলেন। উনার বিছানার পাশে কাঁচের জগটায় পানি নেই। ঢকঢক করে একগ্লাস ঠাণ্ডা জল খেলে ভালো হতো। গভীর দম টেনে ফাতিমা শুরু করলেন, যেন মানস পটে এমন এক মুখায়বকে স্মরণ করছেন যা অতি ভয়ানক!
- তুমি সাবধানে কথা শুনবে। একদম সতর্ক থাকবে। ফারশাদের জীপ ঢুকছে কিনা লক্ষ রাখো।
শাওলিন সেই কণ্ঠে অদ্ভুত সংশয় টের পেল। শূন্য পরিপাটি বিছানায় উঠে জানালার বাইরে নিচে চোখদুটো রাখল।
- আপনি বলুন। আমি জানালা দিয়ে তাকানো। এলেই বুঝে যাব।
- ঠিক আছে।
একটু থেমে তারপর বলতে শুরু করলেন ফাতিমা নাজ মির্জা। আজ থেকে ক'বছর আগের কথা। শোয়েব আইনি জটিলতা সেরে বাবার সাম্রাজ্যকে দাদার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। দাদা মির্জা জীবিতাবস্থায় একটি উইল করে যান। সেই উইলানুযায়ী সবকিছুর মাথা হয়ে যায় শোয়েব। দুই চাচা তৌফিক ও খালেদ কোনো মতান্তর করেনি। তবে তৌফিক কালের পরিক্রমায় এক অদ্ভুত হিংস্রতায় বন্য হতে শুরু করে। ভেতরে ভেতরে শেকড় কাটতে শুরু করে শোয়েবের অলক্ষ্যেই। নিজের ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কগুলো কাজে লাগিয়ে শোয়েব তখন পুরোদমে ব্যস্ত সাম্রাজ্য বাড়াতে। বড়ো বড়ো ডিলারদের সঙ্গে চলে সর্বোচ্চ নিখুঁত চুক্তি। এরই মাঝে তৌফিক একটা অঘটন করে বসেন। আইনি মামলার গভীর প্যাঁচে ফেলে দেন শোয়েবকে। সদ্য সবকিছু গুছিয়ে ওঠা শোয়েব চাচার ছুরিতে রক্তাক্ত হলেও শিরদাঁড়া তখনো অটল রেখে চলল। পালটা মামলায় কাঠগড়া পর্যন্ত চাচাকে নাকানিচুবানি খাওয়ালো সে। বুঝিয়ে দিল আইনের ঘরে কার রাজ্যত্ব, বুদ্ধির যুদ্ধে কে তুখোড়। সেই থেকে বড়ো চাচা তৌফিক মির্জার শ্বাস-সহ সমস্ত কিছুই নখদর্পণে থাকে ভাতিজা শোয়েবের।
তৌফিকের ঘটনা বলে একটু কাশতে থাকেন ফাতিমা। শাওলিন ওপাশ থেকে অধীর গলায় বলল,
- তারপর কী হলো?
- বলছি।
কাশির দমক থামলেও ফাতিমার গলা তখনো খসখসে। যেন শিরীষ কাগজ! পাশে রাখা কাঁচের জগটার দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, পানি নেই। হাঁক দিয়ে কাউসারের মাকে ডাকলেন।
- কাউসারের মা? জগে পানি দিয়ে যাও।
ঠাণ্ডা পানি এনে দিলে এক চুমুকে গলা ভিজিয়ে নিলেন বৃদ্ধা। তারপর একটু নিচু স্বরে বললেন,
- তৌফিককে সামলানোর পর ফারশাদের সামনে আরেকটা মানুষ দাঁড়াল। খালেদ।
- ছোটো চাচা?
- হ্যাঁ। তৌফিক সম্পত্তির জন্য যতটা উন্মাদ ছিল, খালেদ ঠিক তার উল্টো। কিন্তু মানুষটা ছিল ভয়ংকর রকমের কট্টর। সেনাবাহিনীতে ছিল। দক্ষ, মেধাবী, চৌকশ ক্যাপ্টেন। পরে বিডিআরে যোগ দেয়। সীমান্তে পোস্টিং পাওয়ার পর একটা ঘটনা ঘটে।
ফাতিমা হঠাৎ থেমে যান। শাওলিনের কণ্ঠে চাপা উৎকণ্ঠা,
- কী ঘটনা?
- বিএসএফের সঙ্গে সংঘর্ষ। একজন বিডিআর সদস্য মারা যায়। এই ঘটনায় খালেদ তখন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। পাঁচজন বিএসএফ সদস্যকে গুরুতর আহত করে সে। তাদের মধ্যে দুজন পরে মারা যায়।
শাওলিনের ভ্রু কুঁচকে গেল। ফাতিমা এবার আরও ধীরে বললেন,
- এরপর আর খালেদ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। ২০০৯-এ সেই দরবার হলের ঘটনার পর তাকে কারাগারে থাকতে হয়। সেখানেই পঙ্গুত্ব বরণ করে।
কিছুক্ষণ নীরবতা চলল। শাওলিন ঢোক গিলে বলল,
- তারপর?
- দেশ ছেড়ে আমেরিকায় চলে যায়। কিন্তু যাওয়ার আগে একটা জিনিস রেখে যায়।
শাওলিন জানালা থেকে চোখ সরিয়ে নিল। উদগ্রীব কণ্ঠে বলল,
- সেটা কী?
- ফারশাদের সঙ্গে সম্পর্কটা।
ফাতিমার গলায় অদ্ভুত বিষণ্ণতা। তিনি ফের বললেন,
- তৌফিকের সঙ্গে শোয়েবের যুদ্ধ ছিল ক্ষমতার। খালেদের সঙ্গে ছিল রক্তের। ছোটোবেলায় যে চাচার কাঁধে উঠে ঘুরত, যে মানুষটার গলা শুনলে পুরো বাড়ি চুপ হয়ে যেত, একদিন সেই মানুষটাকেই ফারশাদ আর খুঁজে পেল না। কোথায় যেন সবকিছু হারিয়ে গেল।
শাওলিন কোনো কথা বলল না। ফাতিমা আবার বললেন,
- পা হারানো, দেশ হারানো, সম্মান হারানো মানুষটার কাছে ফারশাদ ছোটোবেলার সেই খালেদ চাচাটাকেই খুঁজত। কিন্তু তাকে আর পায়নি।
ফাতিমার মুখে সবটা শুনে নিশ্চুপ রইল শাওলিন। অনেকটা ক্ষণ আপন ভাবনায় ডুবে থাকলে ফাতিমা উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,
- ফারশাদ এসেছে?
- না। আপনি বলুন। তারপর?
- ভাইদের সঙ্গে বোঝাপড়া হলো।
- ভাইদের সঙ্গে?
- হ্যাঁ।
ফাতিমা নাজ কণ্ঠ আরও নিচু করলেন। সাবধানে বললেন,
- কিন্তু সেই বোঝাপড়ার ভেতরেই ফারশাদের কিছু ঘটনা চাপা পড়ে যায়। এমন কিছু, যা পরিবারের বাইরের কেউ দূরের কথা, পরিবারের ভেতরের কেউ জানত না।
শাওলিন কৌতুহলে দপদপ করে উঠল। জানালার বাইরে থেকে নজর হটে গেল অজান্তে। ফাতিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
- তৌফিকের বড়ো ছেলে আহসানকে দেখেছ না?
- জ্বি।
- আইন পড়েছিল। মেধাবী ছেলে। নিজের বাবার মতো উগ্র না। বরং হিসেবি। শোয়েবের সঙ্গে সমানে সমান দাঁড়ানোর যোগ্যতা ছিল তার।
শাওলিন এবার ঢোক গিলল। কপাল কুঁচকে নিতেই বলল,
- তারপর?
- ফারশাদ একদিন ওকে একটা বড়ো ডিলারের সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তির কাজে পাঠাল।
- আহসান ভাই রাজি হয়েছিলেন?
- খুশিমনে।
ফাতিমার চোখের সামনে ঘটনাগুলো দেখতে পাচ্ছেন। যেন ছবির মতো চলমান।
- তিন দিন পর ছেলেটা নিজেই এসে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াল।
শাওলিন যারপরনাই স্তব্ধ। স্তব্ধ স্বরে বলল,
- কেন?
- সেটা কেউ জিজ্ঞেস করেনি।
- উনিও করেননি?
- ফারশাদ জানত।
ফাতিমা যেন রহস্য করে থামলেন। শাওলিনের মনে হলো, এই জায়গাটাতেই যেন আসল কথাটা লুকিয়ে আছে। চকিতে কথাটা বলল,
- উনি কিছু করেছিলেন?
ফাতিমা কোনো সরাসরি উত্তর দিলেন না। যেন সাবধানতার চূড়ান্ত কলের ভেতরেই বুঝিয়ে বললেন,
- ফারশাদ সরাসরি কাউকে ধরতো না। আগে বুঝিয়ে দিত, তার সঙ্গে লড়াই করার ফল কী হতে পারে। তারপর অন্য পক্ষ নিজেই সরে যেতো।
শাওলিনের গলা শুকিয়ে এলো। চোখের সামনে তাহমিদের মুখ মনে পড়ছে। রেবেকার কথা স্মরণে আসছে। চট করে প্রশ্নটা মুখ ফসকাল,
- আহসানের ভাইয়ের ক্ষেত্রেও এমন কিছু হয়েছে?
- বলতে পারো। কিন্তু প্রমাণ নেই।
শাওলিন কোনো কথা বলল না। একটু থেমে ফাতিমা আবারও বললেন,
- তৌফিকের মতো নাকানিচুবানি খাওয়ায়নি। মামলা-মোকদ্দমায় জড়ায়নি। শুধু অহংকারটা ভেঙে দিয়েছিল। এমন শিক্ষা দিয়েছিল, এরপর আর কোনো ভাই ওর সামনে দাঁড়ানোর সাহস করেনি।
শাওলিন জানালার বাইরে তাকাল। মনে হলো, এই পরিবার নিয়ে অনেক কিছু জানার আছে। এখানে কেউ কাউকে সরাসরি আক্রমণ করে না। কেউ কাউকে হারায় আইন দিয়ে। বুদ্ধি দিয়ে। ক্ষমতা দিয়ে। আর কখনো নীরবতা দিয়েও। ফাতিমা তখনো বলছিলেন,
- সেই সময় থেকেই ভাইদের মধ্যে একটা অদৃশ্য নিয়ম তৈরি হয়। ফারশাদের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। কিছু ঘটনা জানতে চাওয়া যাবে না। আর ফারশাদের ব্যাপারে . .
হঠাৎ থেমে গেলেন ফাতিমা। দরজার কাছে একটা কালো ছায়া। মুহুর্তেই মুখটা বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি বিছানা থেকে নামতেই সুক্ষ্ম শব্দে সতর্ক হলো ছায়াটা! দ্রুত গতিতে পালিয়ে গেল বাইরে থেকে। ফাতিমা দরজার কাছে পৌঁছে বাইরে উঁকি দিয়ে দেখলে। কিন্তু বাইরে সম্পূর্ণ ফাঁকা।
- দাদী? আপনি শুনতে পাচ্ছেন?
শাওলিনের প্রশ্নে ভ্রম ভাঙল ফাতিমার।
- হ্যাঁ, শাওলিন। শুনছি, শুনতে পাচ্ছি।
ফাতিমা চটপট দরজাটা ভালোভাবে আঁটকে দেন। বিছানায় ফিরে নাতবউ শাওলিনকে প্রচণ্ড ফিসফিস করে বলেন,
- বেশিক্ষণ কথা যাবে না।
শাওলিন অপ্রতিভ মুখে শুধাল,
- আড়ি পেতেছে?
- হ্যাঁ। দরজার বাইরে একটা ছায়া ছিল। কী শুনেছে জানি না। বাইরে উঁকি দিলাম, কিন্তু পালিয়ে গেছে।
শাওলিন নিরুত্তর রইল। চোখের সামনে যেন মেইলের কথাগুলো ভাসছে। কোনো সাধারণ মেইলের মতো ছিল না। এই ব্যাপারে বলার জন্য যেই ঠোঁট খুলেছে, ঠিক তখনই গমগমে আওয়াজে সচকিত হলো শাওলিন। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখল কালচে সবুজ দেহের জীপটা সদর্পে গেট দিয়ে ঢুকছে। উপর থেকে গাড়ির ভেতর বলিষ্ঠ দুই হাত দেখতে পেল স্টিয়ারিংয়ে। গাঢ় খয়েরি শার্টের স্লিভ দুটো গোটানো অবস্থায়। ঘর্মাক্ত ত্বক। শোয়েব মুখ উঁচু করে তাকালে শাওলিন সপাটে জানালা থেকে সরলো। বুকে কাঁপন নিয়ে দাদীর উদ্দেশ্যে বলল,
- আজ এখানেই থাকুক। সময় করে আবার কল দেব। ভালো থাকবেন, দাদী।
ফাতিমা কণ্ঠের পরিবর্তন বুঝে কথা বাড়ালেন না। ভীষণ শান্তভাবে বলেন,
- নিজের খেয়াল রেখো। মনে রাখবে, যতক্ষণ আছি আমার কোনো নাতবউকেই সমস্যায় পড়তে দেব না।
- রাখি, দাদী। আল্লাহ হাফেজ।
কুশল শেষে কল কাটে শাওলিন। ফোন থেকে কলটার সমস্ত তথ্য মুছে ফোনটা কোমরের একদিকে লুকিয়ে নেয়। দেখানো যাবে না ওর হাত রোকেয়ার ফোন। নইলে হাজার প্রশ্নতীড়ে কতবার বিদ্ধ হতে হবে সে হিসেব নেই। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চেহারা থেকে কৌতুহল, সংশয়, চিন্তার ছাপ সরিয়ে নিল। মিহি বর্ণের গোলাপী শাড়িটা ঠিক করে নিচে নামলো সিঁড়ি ধরে। সদর দরজা দিয়ে দৃঢ় পায়ে ঢুকছে শোয়েব। চোখ দুটো যেন বাইরে থেকেই সিঁড়ির দিকে স্থির। আপাদমস্তক লক্ষ করছে স্ত্রীর সমস্তটা। বাদ যায়নি ওর চোখের চাহনিতে এক সুক্ষ্ম পরিবর্তনটা। মনে মনে প্রাজ্ঞ দিকটা বলছে, কিছু দেখেছ ফারশাদ? মনকে ঠাণ্ডা করে সে এগিয়ে চলল। বাঁহাতে ঝুলানো স্যূটটা হলঘরের সোফায় রেখে বলল,
- মিটিং ছিল। তোমাকে বলে যাবার সুযোগ পাইনি। উঠেছ কখন?
শাওলিন চশমার কাঁচে ঘোলাটে ধূলো দেখতে পেল। নিচে পৌঁছে শোয়েবের সমুখে দাঁড়িয়ে দুহাতে চশমাটা টেনে নিয়ে বলল,
- আপনি বেরোনোর পর। গোসল করবেন, নাকি হাতমুখ ধোবেন?
- গোসল।
- তাহলে সেরে আসুন। খাবার গরম করছি।
- শাওলিন,
- জ্বি।
- ওই মিষ্টি গলাটায় ঠাণ্ডা সুর কেন? আমার অনুপস্থিতিতে কিছু হয়েছে, যা আমি জানি না?
শাওলিন আঁচলের একটা প্রান্ত দিয়ে চশমাটা মুছে দিচ্ছে। হাতটা যেন চকিতে থমকাল। এতোটা নিখুঁত জরিপ করছে ভেবে পায় না ও। শাওলিন নত মুখটা শোয়েবের দিকে উঁচু করে বলল,
- সব কথা কী এখনই বলবেন? আগামীর জন্য রেখে দিবেন না?
শোয়েব তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির ঝিলিক ফোটাল। কাল যে কথাটা গাড়িতে বলেছিল সেটি এখন পালটা উত্তরে শোনাল। পরিচ্ছন্ন চশমাটা এগিয়ে দিলে শোয়েব গোটা কবজিটাই থাবা মেরে ধরল,
- ওই চোখ দুটোর ভেতর কিছু চলছে। পড়তে পারছি। কিন্তু ধরতে গেলেই ফুড়ুৎ করে পালাবে। কী নিয়ে উশখুশ জানাবে। কিন্তু তার আগে গোসলটা সেরে আসি।
কবজি খামচানো হাত উপরে তুলে শাওলিনকে কিছু দেখাল শোয়েব। তার বিশাল থাবার ভেতর ছোটো হাতটার কাঠামো কতটুকু এ যেন প্রত্যক্ষ করে বোঝাল ঠিক এমনভাবেই আবদ্ধ আছে শাওলিন। শাওলিন কিছু বলতে যাবে তার আগেই পিলে চমকে উঠল! কঠোর আঙুলগুলো নরম চামড়ার কাছে গভীর হয়ে বসে যাচ্ছে। নিচে না তাকালেও শাওলিন বুঝল, কোমরের কোনদিকটায় হাত পড়েছে। দুদিকের চোয়াল খিঁচিয়ে উঠল ওর। চোখজোড়া শোয়েবের নীলমণিতে নিবদ্ধ। শোয়েব এক অদ্ভুত চাপা হাসিতে নিচের ঠোঁট কামড়ে ছিল। ভ্রু নাড়িয়ে বোঝাল, 'এখানে কী?' পেডিকোট ও শাড়ির শক্ত বাঁধনের চাপ থেকে মুক্ত করে নিতে লাগল মোবাইলটা। শোয়েব কিছু না বুঝতেই চামড়ায় করুণভাবে ঘষটে উঠাল সে। পাতলা ত্বক ফোনের ভাঙা কাঁচের সঙ্গে চিঁড়ে গেল। শাওলিন চোখ কুঁচকে 'উহঃ!' করে আর্তনাদ করতেই খামচে ধরল পেটের বাঁপাশ। শোয়েব মোবাইলের চোখা কোণগুলো দেখতেই চোখ বিস্ফোরিত করে তাকিয়েছে। পলকের ভেতর ওর অবস্থা দেখে দুই হাঁটু মেঝেতে গেড়ে বসেছে। মোবাইলটা ফেলে ঝড়ো হাতে ওর খামচানো হাত সরিয়ে দিল। শাড়ির আব্রু হটিয়ে জায়গাটা দৃশ্যমান করল। উজ্জ্বল ত্বক কেটে রক্তের গাঢ় রেখা , বিন্দু বিন্দু রক্ত ঠেলে বেরিয়ে আসছে। শোয়েব দাঁত খিঁচিয়ে উঠল।
- কাঁচ ভাঙা...
শাওলিন চোখ কুঁচকে রইল। আগুনের মতো জ্বলছে নরম চামড়া। মনে হচ্ছে যেন কাঁচ দিয়ে আঁচড় নয়, গোটা চামড়াটাই উঠে গেছে। শোয়েব একহাতে জায়গাটা উন্মুক্ত রেখে অন্যহাতে পকেট থেকে রুমাল বের করল। চেপে ধরতেই শাওলিন ঠোঁটটা দাঁতে পিষে ধরল। ব্যথাটা স্নায়ু থেকে স্নায়ুতে সয়ে নিতেই কানে এল সেই হিমবরফ স্বর,
- রোকেয়ার ফোন তোমার কাছে কেন?
শাওলিন ধীরে ধীরে মুখ নিচু করল। হাঁটুতে বসা শোয়েব ক্ষিপ্ত চাহনিতে চোয়াল খিঁচিয়ে আছে। পেটে পাঁচ আঙুলে রুমালের চাপ, আঙুলগুলো দৃঢ় ভাবে ফুটে উঠেছে। শাওলিন একই ক্রোধে বলল,
- জবাব দেয়াটা আপনার দরকার।
- কী ব্যাপারে জবাব?
- আপনি বিচক্ষণ। কিছু ভেঙে বলার দেখছি না। অফিস ঘরে কীসের মেইল সেটাই জানান।
শোয়েব এক মুহুর্ত অটল তাকিয়ে রইল। তারপর বসা থেকে উঠে দাঁড়াল, হাতটা ওর পেটে রুমাল চেপে ধরেই। গভীরভাবে একবুক দম ছাড়ে শোয়েব,
- বিয়ের একমাসও হয়নি। তুমি অবিশ্বাস শুরু করে দিলে। কালরাতেও তোমাকে বোঝাতে চেয়েছি, তুমি কিছুই বুঝলে না।
শাওলিন ভ্রু দুটো একত্র করল,
- কী বোঝানো হয়েছে? আমার ডায়েরি পড়ে আপনি দুর্বল?
শোয়েব চোখ বন্ধ করে নিজেকে আঁটকায়। কণ্ঠার হাড় যেন অস্বাভাবিক ধীরে নিচে নামল। পরক্ষণে চোখ মেলতেই শান্ত সুস্থির গলায় বলল,
- দুর্বলতা প্রকাশ করলেই মানুষ মূল্যহীন হয়ে যায়। প্রথম অপমানটা তার কাছ থেকেই আসে, যাকে সে গুরুত্ব দিতে চায়।
শাওলিন ঠিক কোন কোণে ধাক্কাটা খেল, তা ও নিজেও ঠাওর করতে পারল না। মুখের কঠিন শব্দগুলো আর ঝরার সুযোগ হলো না। রাগত চাহনি ঠাণ্ডা হতে হতে বলছিল,
- দুর্বলতা প্রকাশ করা অপরাধ না। আপনাকে অপমান করাটাও আমার উদ্দেশ্যে না।
- বলার আগ পর্যন্ত সবকিছুই সম্মান। বলে দিলাম, জুটল অপমান।
- আপনি ভুল ভাবছেন। স্বাভাবিক ভাবে চিন্তা করুন। আমার রাগটা কোনদিকে সেটা বুঝুন। একটা সম্পর্কে বিশ্বাস, ভরসা, স্বচ্ছতা থাকতে হয়। আপনি স্বচ্ছতাকে বারবার ঢেকে দিচ্ছেন। চাপ পড়ছে বিশ্বাসের ওপর। জন্ম নিচ্ছে খারাপ চিন্তা।
শোয়েব রুমাল সরিয়ে নিল, চোখদুটো ওর চোখে স্থির রেখে। রক্তের দাগটুকু ফরসা কাপড়ে দেখেও দেখল না। ভাঁজ করে পকেটে ঢুকিয়ে শাওলিনকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। সিঁড়িতে দৃপ্ত পদক্ষেপের শব্দ হলেও একটু পর ধাম করে লাগানো শব্দটা কাঁপিয়ে দিল শাওলিনকে। চমকে উপরে তাকাল ও। কাঠের দরজাটা ভাঙলো কিনা, বোঝা যাচ্ছে না।
—————
ঢাকার পৈতৃক বাড়িতে একপাশের সবুজ বাগানে ঘুরে ঘুরে দেখছিল মিথিলা। পরিবেশটা শান্ত, স্নিগ্ধ। সূর্যের দহন কম। অনেক ক্ষণ ধরে চিন্তাটা মাথায় পুষে শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিল সে। হাতে থাকা ফোনটা দিয়ে কল করল এই প্রথম। কানে চেপে কলের শব্দগুলো শুনতে থাকলে ওপাশ থেকে খট করে রিসিভ হলো। বিনীত গলায় শান্ত ভাবে সালাম দিয়ে বলল,
- কেমন আছেন, ভাবী?
মিথিলা ঘাসফুল মাড়িয়ে পায়চারী করে বলল,
- আমি ভালো আছি, শাওলিন। তোমার কী খবর? তুমি দেখছি একটু স্বার্থপর। ঢাকায় ছিলে কিন্তু দেখা করলে না।
শাওলিন দুপুরে সেই শীতল যুদ্ধের পর বাংলো বাড়িতে ঢোকেনি। বাহির বাড়ি, তথা রাবেয়াদের ঘরের একপাশের চৌকিতে বসে আছে। ওরা দুবোন পাশের ঘরে। শাওলিন শিক দেয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
- ভেবেছিলাম যাব। কিন্তু ব্যস্ততার জন্য সম্ভব হলো না।
- মশাই কেমন আছে?
- ভালো আছেন।
মিথিলা নিচের ঠোঁট কামড়ায়। সামান্য চিন্তা করে কথাটা বলল,
- তোমাকে বিশ্বাস করে একটা কথা বলব?
শাওলিন অপ্রতিভ সুরে বলল,
- জ্বি বলুন।
- আসলে কথাটা বলা ঠিক না। কিন্তু না বলেও পারছি না। শোয়েবের সঙ্গে তোমার সম্পর্কটা কেমন?
শাওলিন মিথিলার ইঙ্গিতটা অন্যকিছু ধরেনি। নিজের স্বচ্ছ ভাবনা থেকে বলল,
- ভালো।
- না, মানে বলতে চাইছি স্বামী-স্ত্রী হিসেবে কেমন?
শাওলিন বিব্রত হয়ে তবু বলল,
- জ্বী, ভালো।
মিথিলা আরো গভীরে প্রশ্ন করল। সামান্য আগল ভেঙে বলল,
- তোমাকে গ্রহণ করেছে?
চরম লজ্জায় রক্তিম হলো শাওলিন। অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নিজের ভাবীকেই কিছু বলেনি, সেখানে স্বামীর ভাবীকে এসব জানাবে? মুহুর্তেই শক্ত গলায় দৃঢ়ভাবে বলল,
- আপনি এগুলো কেমন প্রশ্ন করছেন?
কাট কাট কথায় থমকাল মিথিলা। জিভের ধার দেখে চকিতে সাবধান হলো। শাওলিন দমে রইল না। কণ্ঠে রাগ মিশিয়ে বলবে, ঠিক তার আগেই মিথিলা আমতা আমতা করে বলল,
- তোমার অন্যকিছু মনে হলে দুঃখিত, শাওলিন। দেখো, ওভাবে বলতে চাইনি। তুমি ওর সাথে মানিয়ে নিতে পারছ কিনা . .
- এগুলো আপনার সঙ্গে আলোচনা করব কেন?
- আমি তোমার খারাপ চাই না। কিন্তু শোয়েবের ব্যাপারে একটা কথা বলতে চাই, খারাপ ভাবে নিয়ো না।
কপালে বিরক্তির ভাঁজ নিয়ে শাওলিন বলল,
- কী কথা?
- আমার জমজ বোন আছে। দু মিনিটের ছোটো, ইথিলা। ইথিলার সঙ্গে একটা ব্যাপার ঘটেছিল। তাই বলতে চাচ্ছিলা...
শাওলিন দুম করে মিথিলাকে থামিয়ে বলল,
- দেখুন, আমি হয়ত প্রসঙ্গটা জানি না। আমার এ ব্যাপারে জানার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। অতীতে যাই ঘটুক, এটা যার ঘটনা, তার কাছ থেকেই শুনতে চাইব। অন্যের মুখ থেকে শুনলে কথা সবসময় ক থেকে কলকাতা হয়। এটা বিরাট ঝামেলা।
- হ্যাঁ। তা অবশ্য ঠিক বলেছ। অন্যের কাছ থেকে শোনা কথা কিছু কিছু বিকৃত হয়।
- কিছু না, পুরো ভাবার্থটাই বিকৃত হয়। আমি উনার কাছ থেকে শুনব। আপনি আমার ভালো চেয়ে কিছু জানাতে চেয়েছেন এর জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমি আসলে বিশ্বাসযোগ্য মাধ্যম ছাড়া যত্রতত্র কিছু কানে নিই না।
মিথিলা কৃত্রিম হাসিতে সায় বোঝালেও মনে মনে সবই বুঝতে পারল। শাওলিন যে তাকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে দিল এটা বুঝতে দেরি হয়নি। মনে মনে তীব্র ক্ষোভ জন্মালো, এই মেয়েটা তার চিন্তার চেয়েও কঠিন। কথার মধ্যেই সুক্ষ অপমান করে দিয়েছে। মিথিলা কথার মোড় বদলে বলল,
- আর দুই কী তিনমাস আছি। তারপর তো প্রবাসে ফিরে যাব। তুমি কিন্তু ঢাকায় এসো শাওলিন। শ্বশুরবাড়িটা দেখে যেয়ো।
- জ্বী, ভাবী। উনি কখনো সময় করলে নিশ্চয়ই যাওয়া হবে।
শেষ বাক্যেও আলপিন ফুটিয়ে শাওলিন চুপ রইল। মিথিলা অনিচ্ছার হাসিটা বাতাসে ঝুলিয়ে রাখল কিছুক্ষণ। কুশল শেষে কল কাটলে মিথিলার মুখ ক্ষোভে কঠোর হতে লাগল। হাতের মুঠোয় স্মার্টফোনটা শক্তভাবে ধরলো।
শাওলিন অদ্ভুত ভাবে কিছুক্ষণ থম ধরে রইল। হাতের ফোনটার দিকে প্রশ্ন, কৌতুহল, দ্বিধা সব ঘনীভূত হচ্ছে। মিথিলা ভাবী কেন হুট করে কল দিলেন? কিছু না বলা, নিষিদ্ধ ঘটনা জানাতে? কেন? কী দরকার উনার? অন্যদিকে কণ্টকাকীর্ণ মন ফোনের অন্য ঝামেলায় অস্থির হচ্ছে। কলের কথাগুলো শুনে ফেললে ব্যাপারটা কেমন হবে? যদিও মন বলছে মানুষটা ওর সব কথা শোনে না। কিছু কিছু শোনে, যখন ও কাছে থাকে না। কিন্তু এখন শাওলিন তার সবচেয়ে কাছে। হঠাৎ দরজার কাছে ছায়া দেখা গেল। শাওলিন ছায়া থেকে সামনে তাকাতেই রোকেয়া কাঁচুমাচু করে বলল,
- আপনেরে ডাকতেছে।
- কে ডাকে?
- ভাইজান।
- বলে দাও এখানে থাকব।
রোকেয়া ভেতরে প্রবেশ করল। শাওলিনের কাছে মেঝেতে বসে বলল,
- রাগ করছেন ভাইয়ের লগে?
শাওলিন চৌকির প্রান্ত আঙুলে চেপে ধরল,
- আমাকে বোঝাতে এসো না দয়াকরে। আমি জানি আমি কী করছি।
শাওলিনের কুঁচকানো কপাল, ডাগর চোখের ক্রোধ, ঠোঁটের জেদটুকু দেখল রোকেয়া। ফিক করে হেসে উচ্ছ্বল গলায় বলল,
- রাগ কইরেন না, ভাবী। কী লইয়া ঝামেলা পাকছে তা কবার পাই না। ভাইজান ডাকলে যাইতে হয়।
শাওলি রাগ নিয়ে বলল,
- ডাকলেই যেতে হবে কেন? উনার রাগ থাকতে পারে, আমার থাকতে পারে না?
পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এল রাবেয়া। হাতে কলম। চোখে উদ্বিগ্ন ছাপ। বুর দিকে তাকিয়ে ভাবীর দিকে শুধাল,
- ভাবী, বুর ফুনে কল দিতাছে। আপনেরে ডাকে।
শাওলিন বিরক্ত হয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। ওরা দুবোন দেখল শাওলিন বাংলোর পথ ধরেনি, জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে। দুবোন নিজেদের ভেতর দৃষ্টি বিনিময় করল। রোকেয়া তৎক্ষণাৎ উঠোনে পা দিয়ে দৌড়ে ছুটে বলল,
- ওইদিকি কই যান? যাইয়েন না। সাপখোপ আছে ভাবী। চলেন, ফিইরা চলেন।
শাওলিন দুহাতে শাড়ি উঁচু করে সুডৌল পা দুটোয় মচমচ পাতা ভেঙে এগোতে লাগল। মাথার ওপর সবুজ ঘন ছাদ। পাতার আচ্ছাদনে সূর্যরশ্নি দিনেও মাটি ছোঁয় না। ছায়া ছায়া বন্যবৃক্ষ। তার মাঝে এক চিলতে পথ। শাওলিনকে দেখে রাখতে পিছু পিছু রোকেয়া চলল। সুতির হালকা গোলাপী আঁচলখানা মাটির বুক ছুঁয়ে চলেছে। রোকেয়া খপ করে আঁচল তুলে ডানহাতে ধূলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,
- আপনেরেই দেখলাম আঁচল লম্বা কইরা পরতে। লম্বা আঁচল পছন্দ?
শাওলিন সামনে মগ্ন থেকে বলল,
- হ্যাঁ। আঁচল যত লম্বা, আমার ততই পছন্দ।
রোকেয়া কী বুঝে মিচকি হাসি দিল। হাসিটার অর্থ ধরা গেল না। আঁচলটা মুঠোয় নিয়ে মনে মনে ভাবছিল, নারীর আঁচলে পুরুষের বাঁধতে হয়। এই আঁচলে ঢেকে দিতে হয় স্বামী, সন্তান, সংসার জীবনের সুখ-দুঃখ। দুঃখের বেলায় বোঝাতে হয় না, সহ্য করতে হয়। আর সুখের বেলায় দেখাতে হয় না। সুখে নজর লেগে যায়।
- কই যাইতাছেন ভাবী? আপনেরে তো একলাও ছাড়ন যাইব না।
শাওলিন সাবধানে পা ফেলে এগোচ্ছিল। ধারালো কিছুতে পা বিঁধে চামড়া ছড়ে যাচ্ছে। তবু শাওলিন প্রসন্ন সুরে বলল,
- মতিন ভাই একটা ঘরের সন্ধান দিয়েছিলেন। ঘরটা এদিকে কোথাও।
রোকেয়া বিস্ময়ে বলল,
- কন কী! ওই ব্যাডার কতা হুইনা এতদূর আইছেন? সারছে গো!
- কেন? কী হলো? ঘর নেই?
- আপনে জানেন ওইটা কীয়ের ঘর? ওইডা এন থিকা হেই দূরে ভাবী। হেই নদীপাতার ওইহানে পড়ছে।
- নদী?
খুশির ঝলক লাগল শাওলিনের কালো চোখে। শাওলিন উদগ্রীব কণ্ঠে আবার শুধাল,
- নদীটা কোথায়? নাম কী?
রোকেয়া ওর উচ্ছল খুশিটা টের পেয়ে বলল,
- ভাইজান কইতে পারে, ভাবী। আপনে ফিইরা চলেন। হেয় যদি হুনে আপনে ওইদিকে যাইতাছেন আমগোর কল্লা নামায়ে ফেলব।
শাওলিন উত্তর করল না। নিরুত্তর হয়ে সোজা পথ ধরে হাঁটতে লাগল। একপর্যায়ে জঙ্গল আরো ঘন, আঁধার, বুনো ঝোঁপঝাড়ে আচ্ছন্ন হলো। চারপাশ কেমন ঝিমঝিম করছে। রোকেয়া পেছন থেকে ভীত স্বরে বলল,
- আপনের ডর করে না গো? আমার তো পরাণ ধুকপুকায়!
- কীসের ভয়? জঙ্গলী জানোয়ারের ভয় নেই। ওরা হিংস্র হলেও মানুষের চেয়ে খারাপ না।
কথাটা শেষ করতেই নদীর কুলকুল ধ্বনি শাওলিনকে থমকে দিল। চোখের সামনে পরিষ্কার টলটলে জল! রূপোর মতো নদীর বুকে স্রোত কেটে যাচ্ছে। রোকেয়া পেছন থেকে পাশে এসে দাঁড়াল। শাওলিন মুগ্ধ চোখে হাসি দিয়ে বলল,
- কতযুগ পর নদী দেখছি!
হঠাৎ শাওলিন গানের দুটি কলি গেয়ে উঠল। সুর বেঁধে গেল ওর মিষ্টি গলায়,
- এই জীবন যেন নদীর মতো গতিহারা, ওগো তোমার আকাশ দুটি চোখে, আমি হয়ে গেছি তারা।
পাশ থেকে রোকেয়া শাওলিনকে দেখে শুধু হাসছিল। এতোটা প্রাণোচ্ছল এই রমণী! ওই হাসিহীন চেহারায় কখনু ভাবতে পারেনি রোকেয়া। কতটা ক্ষণ সেখানে কেটে গেল শাওলিন ধারণা করতে পারল না। হঠাৎ রোকেয়ার ডাকে ভ্রম ভেঙে তাকায়।
- ভাবী, আপনে এই ঘর খুঁজতাছেন না?
শাওলিন নদী সংলগ্ন কিছুদূর একটি ছোটো ঘর দেখতে পেল। কাঠ, বাঁশ দিয়ে ভীষণ মজবুত করে বানানো উঁচু ঘর। সিঁড়ির বদলে মই দিয়ে উঠতে হয়। রোকেয়া বাঁশের তৈরি মই দিয়ে তরতর করে উপরে উঠে বলল,
- এইদিকে কী যে ঠাণ্ডা গো, ভাবী। নদীর কাছ বইলা সূজ্জের তাপই নাই। দেহেন, আইয়েন উপরে।
শাওলিন দুটো সুন্দর গোলাপী ঠোঁটে খিলখিল করে হেসে উঠল। বাতাসে চুলের খোপা খুলে পিঠে ছড়িয়ে পড়েছে। শাড়ির বহর সামলে খুব সাবধানে মইয়ের ধাপে ধাপে পা ফেলে উঠল শাওলিন। ভেতরে ঢুকতেই চক্ষু ছানাবড়া! মেঝের একদিকে নরম তক্তপোশ, লম্বা কোলবালিশ, দুটো ছোটো সাদা বালিশ যত্ন করে গুছানো। সাদা রঙটা এতোটাই ধবধবে যেন সদ্য ধোয়া হয়েছে। চর্তুদিকে কাঠ-বাঁশে তৈরি চারকোনা জানালা। শোঁ শোঁ করে দাপুটে হাওয়া ঢুকছে সেখান দিয়ে। ঘরে ঢোকার আগে এককোণে কলস দেখেছে। সেখানে দেখল কলস ভর্তি সুপেয় পানি। সামান্য পানিতে হাত-পা ধুয়ে তক্তপোশে গা ছেড়ে দেয় শাওলিন। রোকেয়া এ অবস্থা দেখে চোখ কপালে তুলে বলল,
- করতাছেন কী? আল্লা, উঠেন উঠেন! আপনে এইহানে থাকলে আমগোরে জবর দিব!
শাওলিন সাদা বালিশের নিচে একটা ভাঁজ করা কাঁথা পেল। এটাও ছিল ধৌত পরিষ্কার। নিয়মিত যত্নের সুস্পষ্ট প্রমাণ। কাঁথা খুলে গায়ে নাকে ঘ্রাণ টেনে নিল। ঠোঁটের কোণে ফুটল চেনা চেনা হাসি। কোমর অবধি জড়িয়ে শুয়ে পড়ল শাওলিন। চুলগুলো বালিশে ছড়িয়ে রোকেয়ার দিকে জানাল,
- তুমি চাইলে চলে যেতে পারো। আমার একা যেতে কোনো সমস্যা নেই।
- না না, আল্লা! উঠেন ভাবী! আপনে সুন্দর মানুষ, এইসব জায়গা ভালা না। বাতাস লাগব ভাবী, চলেন চলেন।
- এই ঘরে তো মানুষই থাকে। তাই না?
- হ, ভাবী। ভাইজান থাহে।
- তার মানে অশরীরী আত্মা থাকে না?
- ওইটা ক্যামনে কই? ভাইজান থাহে এইটা জানি।
- যদি আমাকে সুন্দর বলো, সে তো সুদর্শন। আমাকে জ্বীন ধরলে, তাকে পরী ধরবে।
রোকেয়া হাবার মতো তাকিয়ে থাকে। কী বলবে বুঝতে পারে না।
- আপনে এইহানে থাকবেন ক্যান? আল্লা গো!
- দেখো, শহরে বড়ো হয়েছি। বনের এতো কাছে কখনো থাকিনি আমি। ওই বনকর্মী মানুষটা এমন জায়গায় কেন থাকে . . এটুকু জানতে চাই। অবশ্য মনে হচ্ছে, উত্তর কিছু কিছু জেনেছি।
একটু থেমে কাঁথাটা সাবধানে পেটের ওপর টানলো। মলম দেবার পর চিড়বিড় ব্যথাটা কমে এসেছে। রোকেয়ার দিকে ফিরে বলল,
- যাও রোকেয়া। তুমি এখন ফিরে যাও। আমি ঘণ্টাখানেক থাকব। চিন্তা করো না।
রোকেয়া নিরুপায় তাকিয়ে রইল। যদিও এখানটা ভীষণ নিরাপদ। ঘরের এককোণে আত্মরক্ষার জিনিস সাজানো। চাইলে জ্যান্ত মানুষকে শুইয়ে ফেলা যায়। রোকেয়া ডানহাতে মাথা চুলকে বেরিয়ে গেল চুপচাপ। কিন্তু আর একবার পেছন ফিরে তাকাল। শাওলিন ডানদিকে মুখ করে শুয়ে আছে। চোখ দুটো খোলা নাকি বন্ধ, তা বোঝা গেল না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………