বজ্রমেঘ - পর্ব ৪৬ - ফাবিয়াহ্ মমো - ধারাবাহিক গল্প

বজ্রমেঘ - ফাবিয়াহ্ মমো
          দুর্বার গতিতে চলছে ল্যাণ্ড ক্রুজার। রাত তখন পৌনে এগারোটা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে রাস্তার আলো ঝাপসা হয়ে আসছে। স্টিয়ারিংয়ে থাকা শোয়েবের চোখ বারবার বাঁদিকে ফিরছে। সেখানে ছোট্ট পরিসরে পা মুড়ে ঘুমিয়ে আছে শাওলিন। লম্বা আঁচলে শরীরটা মুড়িয়ে রেখেছে, অথচ কাঁপুনি থামছে না। শোয়েবের ভ্রুঁ কুঁচকে গেল। স্টিয়ারিং থেকে বাঁহাত সরিয়ে ওর বাহু ছুঁয়ে দেখল। গা ঠাণ্ডা। শোয়েব বাঁ ভ্রুঁ উচু রেখে বলল,

  - বারবার উঠছ কেন? 

শাওলিন চমকে ঘুম ঘুম চোখে তাকাল। চোখদুটো ছোটো রেখে বলল, 

  - কিছু না।

  - কিছু আছে।  
 
শাওলিন স্বীকার করল, 

  - একটানা বসে আছি। শিরদাঁড়ায় খুব ব্যথা হচ্ছে।  

শোয়েব জানালার কাঁচ ভেদ করে তাকাল। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। আবহাওয়া অধিদপ্তর খবর দিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে হঠাৎ নিম্নচাপের দরুন দেশে মাঝারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা। শোয়েব বাঁয়ে ফিরে বলল, 

  - এখনো বৃষ্টি হচ্ছে। গাড়ি সাইড করব? 

  - বাইরে যেতে না পারলে সাইড করে লাভ নেই।

শোয়েব সামনের রাস্তার তাকিয়ে ভাবতে লাগল। চোখের পলক স্থির। শাওলিন সিটের একটা কোণ দেখিয়ে বলল, 

  - সিটের এদিকটা একটু শক্ত। হেলান দিতে গেলে কোমরে ব্যথা পাচ্ছি। আমি পেছনের সিটে যাচ্ছি।

কথাটা বলে শাওলিন সিটবেল্ট খুলতে লাগল। শোয়েব মুখ ও হাত শক্ত করে ফেলেছে। পেছনের সিটে কিছুতেই যেতে দেবে না। নূন্যতম সেকেণ্ডে একটা উপায় বের করে বলল, 

  - দাঁড়াও, এক মিনিট।

শাওলিন ব্যস্ত হাতদুটো স্থির করতেই শুনলো, 

  - পেছনে যেতে হবে না। 

বলেই গতিটা নিম্ন করে গাড়ি পার্ক করল শোয়েব। শাওলিন বিভ্রান্ত চোখে তাকালে শোয়েব মাথা ঝাঁকিয়ে আশ্বস্তের গলায় বলল, 

  - এখানে এসো। 

শাওলিন তখনো ঘুম ঘুম রেশে আচ্ছন্ন। কথাটার সুক্ষ্ম ও মূখ্য ব্যাপার সহসা বুঝতে পারল না। সংশয় মন নিয়ে বলল, 

  - ওখানে কোথায় বলছেন? 

শোয়েব বুকের ওপর আড়াআড়ি সিটবেল্টটা খুলে বুঝিয়ে দিল কোথায় বসতে বলেছে। শাওলিন অপ্রতিভ হয়ে কাঁচুমাচু করতে লাগল। ওভাবে গাড়ি চালাবে কী করে? ভয়ংকর দুর্ঘটনার মুখোমুখি হবে না? শাওলিন নাকোচ করে বলল, 

  - না, এক্সিডেন্ট হবে। 

শোয়েব ভ্রুঁ আরো কুঁচকে ফেলল। কণ্ঠে ফুটল মৃদু ঝাঁঝের জেদ, 

  - এক্সিডেন্ট করব না, শাওলিন। কথা বাড়াচ্ছ।

একরোখা কণ্ঠের কাছে ইতস্তত করল শাওলিন। শোয়েব সামনে চোখ ফিরিয়ে এবার কঠোরভাবে বলল,  

  - তোমার শরীর ঠাণ্ডা হয়েছে। আর এসিতে ফল্ট। পেছনের সিটে কম্বল নেই যে বাড়তি সুবিধা পাবে। তাছাড়া আমি অনুরোধ করিনি। বসতে বলেছি। 

শাওলিন ড্যাশবোর্ডের নিচে এসির সেকশনটা দেখতে পেল। ফুয়েল ট্যাংকের পর আরেক অঘটন ঘটেছে। এসির শীত এই মানুষের ধাঁতে সইলেও শাওলিনের সইছে না। শোয়েব পাঁচ সেকেণ্ড বিরতির পর বলল, 

  - ওটা ঠিক হবে না। মোশাররফ ভালো ডাক্তার দেখায়নি।

গাড়ির ভেতরকার বাতিটা বন্ধ থাকায় শোয়েবের রাগে থমথম চেহারা শাওলিন দেখতে পেল না। আবছা ভাবে যেটুকু স্পষ্ট, আর কথা বাড়ানোর সায় পেল না ও। শোয়েব দুহাতের প্রবল বেড়িতে শাওলিনকে নিজের কাছে বসাল। শাওলিন এই অপ্রতিভ কাণ্ডে একটু দোনোমনা করলেও শোয়েবের উত্তাপ নিশ্বাস ওর চোখে মুখে ছুঁয়ে গেল। সাদা শার্টের কলার কখন নরম মুষ্টিতে আবদ্ধ হয়ে গেছে টের পায়নি শাওলিন। শুধু খেয়াল করল, শোয়েব বাঁহাতটা পেছনে নিয়ে সিটের সঙ্গে ঝুলোনো কালো স্যূটটা বুঝে নিল। শাওলিন যখন ভারসাম্যের খাতিরে বুকে মাথা রাখতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই জোর গলায় বাঁধা দেয় শোয়েব। 

  - শেষ হয়নি, দাঁড়াও। ঘুমানোর ব্যবস্থা করছি। 

কথাটা হাওয়ায় ঝুলিয়ে শোয়েব ওর চোখে চোখ রাখল। গাড়িতে ঘন আঁধার। এ ফাঁকে শার্টের বাটনগুলো পরপর খুলে ইনশার্টকে বেল্টের বাইরে বের করল শোয়েব। ওর কপালে ওষ্ঠাধর ছুঁয়ে শোয়েব শার্টের দুটো অংশ ধরে শাওলিনকে পুরোপুরি ঢেকে নিল। বাইরে ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ, ভেতরে নিবিড় নিস্তব্ধতা। চোখজুড়ে কী ঘুম, যেন কতবছর নির্ভার, নিঃসংকোচ হয়ে এমন স্বস্তি পায়নি কখনো। 

  - শিরদাঁড়ায় কোথায় ব্যথা? 

খসখসে আঙুলগুলো কালো ব্লাউজের নিচের বাঁধনটা খুলে নিয়ে শুধোল। সেখানে প্রবল পরাক্রান্ত আঙুলের স্পর্শ যেন সুখের নীড়ে ঠেলে দিচ্ছে। সেই ছোট্ট নীড়ে শিউরে উঠছে রমণীয় কায়া। আঙুলগুলো তখনো থামেনি। দস্যুর মতো ব্লাউজের পিঠে সবটুকু বাঁধন উন্মুক্ত করেছে। ক্রমাগত হাতের স্পর্শে শাওলিনের মন, মনের রাজ্য, সেই রাজ্যে প্রবেশের অনুমতিপত্র কোনো এক রাজার আগমনকে বোঝাচ্ছে। শাওলিন নিরুত্তর থাকায় শোয়েব মাথা নিচু করে সদ্য উন্মুক্ত হওয়া পেলব, নরম কাঁধে ওষ্ঠাধর নামিয়ে দিল। চোখের পাতায় প্রবল কুঞ্চন, মৃদু আর্তস্বরে অস্ফুট শব্দ করল ও। ঢাকায় আসার পর একেকটি সেকেণ্ড শোয়েব বাহুতে, বুলিতে, বন্দনায় একান্ত করে নিচ্ছে। কালো ভারি স্যুটটা দুহাতে শূন্য উঠিয়ে শাওলিনকে আপামর লুকিয়ে রাখল শোয়েব। আরো একবার উদ্বেগ স্বরে বলল, 

  - বললে না তো, কোমরের কোথায় ব্যথা হচ্ছে? এটারও সমাধান করে দিই। 

শাওলিন জোরে ঢোক গিলল। বলবে না বলবে না করেও অবাধ্য মন স্বর ফোটাল, 

  - কোমরের কাছে, একটু আগে প্রথম যে হুকটায় হাত দিয়েছিলেন। 

শোয়েব মৃদু হেসে সম্মতি বোঝাল। সে বুঝেছে যন্ত্রণা কোথায়। স্যূটের আড়ালে হাত ডুবিয়ে দিতেই নিঃশ্বাস আঁটকে রইল শাওলিন। ঠোঁটের হাসিটা আরেকটু চওড়া হলো শোয়েবের। কানের ওপর একচুল রেশম চুল সরিয়ে শোয়েব ঠোঁটদুটো এনে বলল, 

  - এভাবেই স্বীকার করবে। 

বলেই প্রখর স্পর্শে কানের ত্বক উনুন করে দিল। শাওলিন আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে কলারের কাঠামো মুচড়ে ফেলেছে। শোয়েব উনুন ত্বকে আঁচ ছেড়ে বলল, 

  - তোমার আমার জন্য গাড়ির পরিবেশটা অপর্যাপ্ত। আমি চাই না অপরিসর সিটে তোমার আর কোনো ব্যথা হোক। 

শাওলিন মৌণ মুহুর্তকে খণ্ড খণ্ড করল, 

  - আপনি বিয়ের আগে যেটুকু ছিলেন, বিয়ের পর বদলে গেছেন। 

শোয়েব ধীর গলায় বলল, 

  - তুমি স্ত্রী। আমার আবেদন, নিবেদন, চাওয়া তুমিই তো দেখবে। 

  - আপনার মন বড্ড নরম। আপনিও চান কেউ ভালোবাসুক। আপনারও অনুভূতির কাছে চাওয়া পাওয়া আছে। কিন্তু কাউকে তো দেখাননি। 

  - আমি এমন ছিলাম না। তুমি এই বাঁধ ভেঙে দিয়েছ। কতোটা শক্তি নিয়ে আমার জীবনে প্রবেশ করেছ, আজ তুমি দূরে থাকলে নিজেকে দুর্বল মনে হয়। 

  - জীবনের কাছে এতো কঠোর থাকলেন কেন? 

  - জীবন আমাকে সহজ থাকতে দেয়নি। 

  - মানুষের মাঝে থাকার নিয়ম। কিন্তু পরিবার ছেড়ে ছন্নছাড়া এক পাহাড়ি কোলে নিঃসঙ্গ রয়ে গেলেন। 

  - কিছু সঙ্গ জীবনকে অনিরাপদ করে দেয়। আবার কিছু সঙ্গ অনিরাপত্তার মাঝেও নতুন দিনের আলো দেখাতে আসে। তুমি আলো হয়ে পাহাড়ের পাথরটাকে টলিয়ে দিয়েছ। তুমি যতবার কথা বলেছ, তোমার ভাবনা চিন্তা আমাকে আকর্ষণ করেছে। 

  - সেই ভাবনাগুলো কখনো তো খোলাশা করলেন না? 

  - যদি বুঝতেই না চাও আমি কী অনুভব করি, আর কতটা গভীর ভাবে দেখছি, তখন এই ভাবনাগুলোর অপমান কেমন করে মেনে নিতাম? 

  - তাই ডি ব্লকের বাসাটায় একটা পার্সেল পাঠিয়ে দিলেন? স্বপ্নদর্শীকে নিজের সুঁতোয় বাঁধতে লাগলেন? 

  - আমি কী বেঁধে রাখতে সফল? হইনি বলেই তো মনে হয়। তাহমিদের হাত তোমার হাতে আংটির শোভা বাড়াচ্ছিল আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু তোমাকে দেখছিলাম। অথচ দাদী জানাল, নিয়তি তোমার সঙ্গে প্রথম সুঁতোটা বাঁধতে চেয়েছিল। 

  - ঘুরেফিরে পুরোনো আলাপে সুখ আছে? তাহমিদের আত্মহত্যা আজও আমার কাছে অদ্ভুত মনে হয়। যেন কেউ চায়নি সে বেঁচে থাক। 

শোয়েব ভারি শ্বাস ফেলল। বুকের কত গভীর থেকে বেরুল সেই দীর্ঘশ্বাস! শোয়েবের চোখ সামনের রাস্তায় নিষ্পলক। একটু সময় নির্বিকার থেকে বলল, 

  - সব কথা আজই শেষ করবে? আগামীর জন্য কিছু রাখবে না? শহরের এই জঞ্জাল পরিবেশে আমি আর এক মুহুর্ত থাকতে চাই না। গাড়িটা ছেড়ে দিই?

  - ছেড়ে দিন। 

শোয়েব দ্ব্যর্থ হাসলো। শাওলিনের চোখবোজা দৃশ্যের মাঝে গাড়িটা ছেড়ে দিল সে। দুপাশে চট্টগ্রাম মহাসড়কের পরিবেশ, মাতাল হাওয়ায় বৃষ্টির ঝাপটা ভেজা মৌসুমের আভাস দিচ্ছে। শোয়েব একটা টিউব খুলে বাঁহাতের চার আঙুলে মাখিয়ে নিচ্ছে। কড়া ঝাঁজালো ঘ্রাণে শাওলিন প্রথমে কিছু বলল না। কিন্তু হঠাৎ টের পেল, পিঠে ঠাণ্ডা মলমের মালিশ। শিথিল হয়ে আসছে পিঠ। ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল শাওলিন। বালিশে গাল রাখার মতো বুকে মুখ গুঁজলো। নিবিড় ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেল ও।  

—————

সিলেটের কোয়ার্টারে ঘুম ভাঙল রেবেকার। হাই তুলে বাঁদিকে তাকিয়ে হাসলো। কালরাতের মধুর মুহুর্ত এখনো মনকে উত্তেজিত করছে। যখনই এমন দিন আসে, তখন ইচ্ছে হয় নিঃসঙ্গতার অভিশাপ ঘুচিয়ে দিতে। মানুষটাকে ধাক্কা দিয়ে রেবেকা ডাকতে লাগল, 

  - এই ওঠো না, সকাল দশটা বাজে তো। 

মানুষটা ঘুম থেকে জাগল, কিন্তু বিছানা ছাড়ল না। পেটের কাছে কাঁথা খামচে রেবেকার দিকে ফিরে বলল, 

  - তোমার জোরাজুরিতে কাল থেকে গেলাম। এখন একটু আরামের ঘুম ঘুমাতে দেবে না? 

রেবেকা টিপ্পনি কেটে বলল, 

  - লাটসাহেবের কলটা এলেই দুনিয়া উলটে ফেলবে। 

মানুষটা হেসে উপুড় থেকে সোজা হয়ে শুলো। মাথার নিচে একটা হাত উলটে করে বলল, 

  - সকাল সকাল শূ.. টার নাম নিয়ো না। শূ... বাচ্চা সব কাজ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে নিজে ফূর্তি করছে তোমার ননদ নিয়ে। 

রেবেকা গায়ে পোশাক চড়াতে চড়াতে বলল, 

  - ওই ঢঙির কথা বলো না। ডানা গজিয়ে বড্ড সাহস দেখাচ্ছে। আমারই কথা শোনে না, বোঝো! কী বাড়টা বেড়েছে। 

  - তুমি না মানুষ সামলাতে জানো? 

  - শোয়েব যতদিন নাক না গলালো, ততদিন তো ঠিক ছিল। 

  - তোমার সবচেয়ে বড়ো ভুল কী জানো? 

  - কী? শায়খকে বিয়ে করা? 

  - না। শাওলিনকে ঢাকায় পড়তে দেয়া। না ও সিলেট থেকে যেতো, না ঢাকায় গিয়ে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে খাগড়াছড়ি ঘুরতো। শোয়েবের চোখে পড়াটা ঠিক হয়নি, রেবা। 

বলতে বলতে ধ্যানমগ্ন হলো সে। সেভাবেই বলতে লাগল অদ্ভুত স্বরে, 

  - সেদিন তোমার ননদকে শুধু দেখেনি, মেয়েটাকে নিজের জীবনে টানার চিন্তাও করছিল।

  - চেষ্টা কম করিনি তাহমিদের জন্য। জেঠি পর্যন্ত শাওলিনকে পছন্দ করে ফেলেছিল। আর তুমি তো জেঠিকে জানোই, একবার কিছুতে চোখ পড়লে ওটা উনার চাই-ই চাই। 

  - তাহমিনা ফুপুকে জন্মের পর থেকে হিংসাই করতে দেখেছি। বাবার সাথে টাকা নিয়ে কতবার ঝামেলা যে পাকালো। ফারদিন আঙ্কেল মিটমাট না করলে আজ খুনাখুনি পর্যায়ে সম্পর্ক থাকতো। 

  - আচ্ছা, একটা কথা বলো দেখি। শোয়েবের বাবা কী এমন রেখে গিয়েছে যার জন্য তোমার এখনো ওর গোলামি করছ? 

  - গোলামি কী জিনিস? কার গোলামি? ওই শূ... বাচ্চাকে? ও একটা খা.. ছেলে। ওর মা জাদু না করলে ফারদিন আঙ্কেলের মতো লোক পাগল হয়? বাবা আজও বলে, ফারদিন আঙ্কেলের মনটা উদার। উনি নিমোকহারামকেও পানি খাইয়ে তৃষ্ণা মিটাবেন এমন মহৎ! 

  - তাহলে এই মহৎপ্রাণের ছেলে হয়ে শোয়েব কী আমার ননদকে ওই কাজে দিবে? 

  - ভাবভঙ্গি দেখে তো মনে হয়নি। এমনকি স্টেটসে পর্যন্ত জানায়নি বিয়ে করেছে। তার মানে কী দাঁড়ায়? ফারশাদ চায় না ম্যারিড লাইফটা আলোচনার কেন্দ্রে আসুক। 

  - স্টেটসের ব্যবসা বাংলাদেশে আনাটা চাট্টিখানি কথা না। এদিকটা ভাবলে সত্যিই ভয়ংকর লাগে। কীভাবে পারছে? বাঘা বাঘা লোককে হাতের মুঠোয় রাখা...  

  - সবাই বলে ওর ব্রেন ভয়ানক শার্প। চতুর চোখ দিয়ে কাঁচের পুরুত্ব মেপে ফেলে এমন খেলুড়ে ও।

  - তাহলে স্টেটসের গর্ভমেন্ট এখনো শোয়েবকে চায়? 

  - না চাইলে ওর অ্যাকাউন্টে ডলার দিবে কেন? 

  - সবকিছু ছেড়েছুড়ে এলে কেন হাজার হাজার ডলার দিচ্ছে? 

  - কারণ এটাই ওর যোগ্যতা, সোনা। তুমি এখনো খেলোয়াড় দেখনি। দেশের ভেতর এক অদ্ভুত নিয়ম পাকিয়ে রেখেছে। যা তুমি-আমি চিন্তাও করতে পারব না। 

  - দেখো, আর যাই করো, আমি প্রিয়জন হারাতে চাই না। তুমি নিজেকে রক্ষা করো। অনেক সহ্য করেছি, আর ধাঁতে সইবে না। তোমার বউকে তালাক দিচ্ছ কবে? 

  - কিছু্টা দিন লাগবে। এখনো ওদিকটা ধরে দেখিনি। ফারশাদ এই ব্যাপারে টাইট। যদি আভাস পায় আমি ডিভোর্স দিচ্ছি, ও আমাকে জিন্দা রাখবে না! 

  - আশ্চর্য, তোমার ইচ্ছে তালাক দেবে! সেখানে ও কেন ক্ষমতা দেখাবে? 

  - ভাইদের প্রতি যেমন তেমন, কিন্তু ভাবীদের সম্মানে ষোল আনা কঠিন। একজনের চোখে পানি দেখলে, বান্দা আমাদের ছেড়ে দিবে না।  

রেবেকা কোনো কথা বলতে পারল না। যদি ভাবীদের নিয়ে এতো কঠোর হয়, নিজের বউয়ের বেলায় কেমন খতারনক হবে? ব্যাপারটা ভাবতে পারল না রেবেকা। এখন সত্যিই মনে হচ্ছে ওই ঘুরতে দেয়াটা মস্ত বড়ো ভুল হয়েছে। এই ভুল কখনো শুধরানো যাবে না।

—————

সকাল পৌণে দশটা বেজেছে। মাথার ওপর প্রখর সূর্য। বিছানার চাদর যেন সদ্য চুলার উত্তাপ থেকে উঠিয়ে আনা হয়েছে এমন গরম। শ্রেষ্ঠা ছোটোবোন নিপার ওভারসাইজ লম্বা টিশার্ট গায়ে গলিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরোচ্ছে। এমন সময় ফোনটা তারস্বরে বেজে উঠল। টাওয়েলে মুখ মুছতে মুছতে টেবিল থেকে ফোনটা উঠাল। তখনো চিন্তা করেনি এই অজ্ঞাত নাম্বারটা কার। রিসিভ করে কানে ঠেকাতেই কে যেন আতঙ্কের গলায় বলল, 

  - শ্রেষ্ঠা! শ্রেষ্ঠা, তুমি কোথায়? তুমি বাসায় আছ? 

ব্যক্তির গলাটা চিনে ফেলে শ্রেষ্ঠা। কপালে অস্বাভাবিক কুঞ্চন ফেলে বলল, 

  - রাহাত? তুমি এটা? এই নাম্বার কার? তুমি এমন ভাবে কথা বলছ কেন? 

রাহাত প্রচণ্ড অস্থির গলায় বলল, 

  - দেরি কোরো না! নিচে নামো! এক্ষুণি নামো! আমি তোমার বাসার সামনে। 

কথাটা শুনে ভড়কে উঠল শ্রেষ্ঠা। চকিতে টাওয়েল ফেলে ধপধপ করে বারান্দায় ছুটে গেল। গ্রিলের ওপাশে দূর রাস্তার কাছে একটা মনুষ্য অবয়ব দেখা যাচ্ছে। শ্রেষ্ঠা মনে মনে কিছু আঁচ করে বলল, 

  - কী হয়েছে খুলে বলো! 

  - এখন সময় না খুলে বলার! দোহাই, নিচে নামো! 

ঠোঁটের একটা কোণ দাঁত কামড়ায় শ্রেষ্ঠা। বাঁহাতে গ্রিল ধরে দূরের রাস্তায় তাকিয়ে বলল, 

  - তুমি আমাকে হিন্ট না দিলে কিছুতেই নামব না। 

রাহাতের কণ্ঠে বিস্ময়ের সুর, 

  - তুমি আমাকে অবিশ্বাস করছ? 

শ্রেষ্ঠা দৃঢ়ভাবে বলল, 

  - হ্যাঁ। তুমি সেটারই যোগ্য! 

রাহাত প্রচণ্ড জোরে ইটের টুকরোতে লাত্থি মারল। ফুটপাথ থেকে রাস্তার মাঝখানে ইটের টুকরোটা ছিঁটকে পড়ল। নিরুপায় হয়ে এবার মিনতি ঝরল গলা দিয়ে, 

  - শ্রেষ্ঠা, তুমি আমার ক্ষতি করছ। তোমাকে অনুরোধ করছি এমনটা কোরো না! আমি বাবা-মার বিরুদ্ধে যেতে পারব না, কারণ আমার বাবা ভীষণ অসুস্থ। হার্টে রিং পরানো হয়েছে। এই চাকরিটা আমার খুবই দরকার। আমার ইমিডিয়েট বস যদি উনার শ্যালিকার জন্য না বলতেন, বিয়েটা আমি তোমাকেই করতাম! কসম কেটে বলছি!  

কসম কাটা শুনে মেজাজ আরো বিগড়ে গেল। দাঁতে দাঁতে চিবিয়ে বলল, 

  - কসম ওয়ার্ডটা আর একবার মুখে আনলে আমি জুতা দিয়ে মারব! লজ্জা করে না তোমার? কসম কেটে সম্পর্কের ওয়াদা করেছিলে, আজ একই সুরে কসমের গীত গাইছ! 

রাহাত যেন শুনতেই চাইল না। ধৈর্যহারা কণ্ঠে বলল, 

  - তোমার কোন ভাই আমার বিরাট সর্বনাশ করে দিচ্ছে! তোমার বাপও যে ক্ষতি করল না, সেই ক্ষতিটা কে করছে? নাম বলো আমাকে! নাম বলো!

কপালের খাঁজ মসৃণ হয়ে গেল। শ্রেষ্ঠা আর একটা কথাও বলল না। বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলেও কান থেকে ফোন সরিয়ে ফেলেছে। মস্তিষ্কের নিউরন যেন জানান দিচ্ছে, কাল সকালে গাড়ির ভেতর কারো ফোনে নাম্বার সেভ করেছে। তখনই মনটা কেমন যেন কু আভাস দিচ্ছিল। সে কী একরাতের ভেতর রাহাতের টুঁটিই চেপে ধরল? বেচারা ডাঙায় তোলা মাছের মতো ছটফট করছে! পায়চারি করছে ফুটপাথে। চুল টেনে ধরছে। কখনো এ বরাবর তাকাচ্ছে। শ্রেষ্ঠা চোখ বন্ধ করে ফেলল। মনে মনে জেদ ধরল একটা। আজ গুলশানে যেতে হবে। নাযীফকে সব বলতেই হবে! কিছু একটা খুব অমিল! খুব ভজকট পাকানো! হয়ত এই সূত্রের জটটা নাযীফের জানা!

—————

বাংলোর অফিস ঘরের বাইরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে মতিন লাল। চেহারায় ভোলাভালা আচ্ছাদনটা খসে পড়েছে। চোখদুটো ঈগলের মতো শাণিত। ঘড়িতে দুপুর বারোটা। সূর্যের তাপ খাগড়াছড়িতেও জনপ্রাণ অতিষ্ঠ করছে। মতিন বাঁদিকের সিঁড়িটায় পঞ্চমবারের মতো দৃষ্টি হেনে সামনে তাকিয়ে ফিসফিস করল, 

  - কী করতাছস তোরা! আইস্সা পড়ব তো! 

ভেতর থেকে কেউ ফিসফিস করেই বলল, 

  - আইতাছি, আইতাছি! খাড়ুই থাহেন। 

  - এক প্যাচাল কতখন ধইরা হুনি? 

রাগে গজগজ করতেই সামনে বন্ধ দরজাটা নিঃশব্দে খুলে খেল। ভেতর থেকে বিড়ালের মতো হালকা পায়ে বেরোল রোকেয়া। গলার কণ্ঠমণিটা ভীষণ করছে। ভীত চোখে অস্থিরভাবে তাকাচ্ছে। দ্রুত মতিনের দিকে বলল,

  - সরেন সরেন! জুলদি করেন!

  - পাডায় কোনে? 

ভেতর থেকে 'পাডা' জবাব দিল, 

  - তুমি পাডা কারে কইলা? তুমারে না কইছি পাডা কইবা না!

  - ছুপ কর পাডা! তুই পাডাই! 

মোখলেস রাগে নাক ফোলাল। রোকেয়ার দিকে অভিযোগের সুরে বলল, 

  - বু, হেরে কিছু কও। হুদ্দাই পাডা ডাকে। 

রোকেয়া কপালের ঘাম ঝরিয়ে ডালাটা বন্ধ করে ফেলেছে। মোখলেসকে এক ধমক দিয়ে বলল,  

  - এ ছ্যাড়া, কামে হাত দে! 

মোখলেস হন্তদন্ত হয়ে বাক্সের একপ্রান্ত দুহাতে তুলে ধরে। রোকেয়া উঠানোর চেষ্টা করতেই আরেকজনকে ধমকাল, 

  - আফনে কী চাইয়ে চাইয়ে দেখবেন? ধরেন না ক্যা! 

মতিন ঝটপট কোমরে গামছা বেঁধে বাক্সের আরেক প্রান্ত শূন্যে ওঠাল। তিনজন মিলে যতটা সম্ভব, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। অফিস ঘর থেকে হলঘরে পৌঁছছে, হঠাৎ মোখলেসের চোখ কোথায় যেন স্থির হয়ে গেল। হাত থেকে প্রায় ছেড়ে দিল বাক্স, কিন্তু রোকেয়া শেষ মুহুর্তে ধরে ফেলেছে। মতিন ভয়ংকর একটা গালি দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু মোখলেসের চোখ দেখে কথা আঁটকে গেল। কী যেন ভেবে মতিন ধীরে ধীরে মাথা পিছু ঘুরাল। তাকাতেই সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠেছে! ঠোঁট দুটো নড়তে থাকলে রোকেয়া বলে উঠল, 

  - ভাবীজান.. আফনে.. ইট্টু আগে দেখলাম.. হে হে.. গা ধুইয়ে ফেলছেন? 

রোকেয়ার এলোমেলো কথায় শাওলিন সিঁড়ি ধরে একধাপ নিচে নামে। ডানহাতে রেলিংয়ের কাঠ ছোঁয়া। পরনে মৃদু গোলাপী সুতির শাড়ি। প্রশস্ত পাড়টা গাঢ় গোলাপী বর্ণের। ছোটো হাতার ব্লাউজটা পাড়ের রঙে ম্যাচিং। বাঁহাতে আঁচলের ভারত্ব নিয়ে শাওলিন প্রত্যেককে দেখে বলল, 

  - আপনারা কোথায় যাচ্ছেন? 

আমতা আমতা করল মতিন। কিন্তু ভীত হাসি ছাড়া কিছুই স্পষ্ট হলো না। পরিস্থিতি সামলাতে রোকেয়া বলে উঠল, 

  - ভাবীজান, বাইরে যাই। ভাইজান গাড়ি পাঠাইছে। 

শাওলিন তীক্ষ্ম চোখে বাক্সটা দেখছিল। রেলিং থেকে হাত তুলে দেখাল,

  - কাঠের বাক্সটায় কী? লেবার না পাঠিয়ে আপনাদের কষ্ট দিচ্ছে কেন? 

নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল তিনজন। কেউ একটা শব্দ করল না। আশা ভরসা যেন রোকেয়ার ওপর ছেড়ে মতিন ইঙ্গিত বোঝাল। রোকেয়া অপ্রস্তুত হলেও ক্ষণিকের ভেতর চেহারাটা হাস্যোজ্জ্বল করে বলল, 

  - রাফান ভাইজানে এক্সিডেন্ট করছে তো ভাবীজান। আজকা নাকি আইবো। ইটু আগে পার্থ ভাইজান খবর দিয়া কইল, এই বাক্সডা গাড়িত তুইলা দিতে। 

  - পার্থ সাহেব কলে বলেছেন? 

  - হেমুনডাই তো কইল। 

শাওলিন খটকা মনে তাকিয়ে রইল। ঘরের মানুষটা কখন বেরিয়ে গেছে খুব সকালে। শাওলিন ওদের কাছে কারণ জানতে চেয়েছিল, কিন্তু ভদ্রলোক কিছু বলে যায়নি নাকি। মোখলেস ঠোঁট কামড়ে রোকেয়ার দিকে তাকাল। রোকেয়া ইঙ্গিত বুঝে শাওলিনকে হাসি দিয়ে বলল, 

  - ভাবীজান, তাইলে যাই? এইডা বহুত ভারি। আলগান যাইতেছে না। 

  - হ্যাঁ, যাও। সাবধানে হেঁটো। 

শাওলিন বাঁধা দিল না। সিঁড়ি থেকে নামতে নামতে তারা হলঘর পেরিয়ে সদর দরজা টপকে গেল। শূন্য দরজায় তাকিয়ে শাওলিন অফিস ঘরটা দেখল। হঠাৎ ভ্রুঁ দুটো ভীষণ কুঁচকে এল। অদ্ভুত সন্দেহে দরজা ঠেলে ঢুকল শাওলিন। বাতাসে গন্ধ শুঁকে কেমন অস্থির লাগল! এখানে কেমিক্যালের গন্ধ কীসের? মেঝে, দেয়াল, ছাদে তাকাল শাওলিন। কোথাও রাসায়নিক দ্রব্য নেই। কিন্তু ঘরের বাতাসটা ভারি। বাঁদিকে বইয়ের সাম্রাজ্য, ডানদিকে চেয়ার সমেত ডেক্সটপ। শাওলিন নিজের অজান্তেই ডেক্সটপের কাছে রিভলবিং চেয়ারটা আঙুলে চেপে ধরল। সমুখে আবারও চালু হয়ে গেছে মনিটর। কিছু মেইল আসার ইঙ্গিত নোটিফিকেশনে বোঝাচ্ছে। অন্যসময় হলে প্রস্থান করতো শাওলিন, কিন্তু আজ বেপরোয়া কৌতুহল ওকে আচ্ছন্ন করে দিয়েছে। উচুঁ চেয়ারটায় বসলো ও। কিবোর্ড টেনে মাউসে ক্লিক করল। স্ক্রিন বদলে গেল চটান। শুকনো ঢোকে মেইলটা খুলল শাওলিন। প্রথমে চোখে পড়ল প্রেরকের নাম।

Dr. Victor Hale
Chairman, Executive Research Council.
M. Advanced Research Group
New York, USA.

FARSHAD,

‘Project A.’ is no longer your assignment.

4 years ago, you were sent to Bangladesh to locate the missing component and execute the final phase.

You succeeded.

The location has been identified. The preliminary data has been recovered. Do not complete the ‘FINAL PHASE’. Leave everything exactly where it is. Your extraction has been authorized. Your residence, access and previous clearance have already been reinstated.

Whatever you discovered in Bangladesh, leave it there. You were sent there to complete a research objective, not to build a life.

I have also been informed that you are married.
Congratulations.

I don't know what she means to you yet.
But I know one thing.
Men like us don't get ordinary lives.

P.S: If your wife knows nothing, keep it that way. If she knows something, bring her.
We may need her.

— Victor Hale .
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp